#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা২৪
পর্ব ২৪: [ সহজ সমাধান ]
━━━━━━━━━━━━━━━
শায়লা মা*রা গিয়েছেন আজ তিনদিন।
যন্ত্রণাদায়ক হলেও সত্য শেষ বিদায়ের জানাযাটুকুও জোটেনি তার ছেলে দোহার ভাগ্যে। তাকে পুলিশ স্টেশন থেকে ছাড়া হয়েছে পাক্কা একদিন পর!
দোহার বিরুদ্ধে কোনো কেইস হয়নি। রুহানের পরিবারের সত্যিকার অর্থে বিষয়টা পাবলিক অ্যাটেনশনে আনার ইচ্ছা ছিলোনা। তাদের পরিবারের মান সম্মানের ব্যাপার। তবুও দোহাকে উচিত একটা শিক্ষা দিতেই ক্ষমতার অপব্যবহারের পথ বেছে নেয়া। শেষ পর্যন্ত অনিকের বাবা এবং জারার বাবার হস্তক্ষেপে বিষয়টা সম্ভব হয়নি। খুব বেশি ঝামেলার পথে হাঁটেনি কোনো পক্ষই। ক্ষতিপূরণ হিসাবে পঞ্চাশ হাজার টাকার বিনিময়ে দোহাকে ছাড়িয়ে মিটমাট করা হয়েছে বিষয়টি। এর অর্ধেক দিয়া এবং বাকি অর্ধেক দিয়েছেন বাবুল।
দোহা দুইদিন আগে বাসায় এসে সেই যে রুমে ঢুকেছে, একটাবারের জন্যও তার মুখদর্শন হয়নি আর কারোরই। একমাত্র দিয়া বাদে কেউই তাকে জিজ্ঞেস করে দেখেনি সে ঠিক আছে কিনা। এমনিতেও ছেলেকে ঝামেলা থেকে রক্ষার জন্য পঁচিশ হাজার টাকা গচ্চা গিয়েছে বাবুলের, উপরন্তু দোহাকে সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকেও ছাড়পত্র দিয়ে দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে তিনি ভীষণ ক্ষেপে আছেন। শুধুমাত্র যদি শায়লার প্রয়াণের ঘটনাটা বাঁধা হয়ে না দাঁড়াতো, তবে হয়ত তিনি কিছু একটা করেই বসতেন। যত যাই হোক, দিনশেষে নিজের ছেলে বলে কথা!
চতুর্থ দিন সকালে দিয়া অনেক ডাকাডাকি - ধাক্কাধাক্কি করে দোহাকে টেনে হিঁচড়ে রুম থেকে বের করলো একটুখানি নাস্তা করানোর জন্য। ছেলেটাকে রোবটের মতন দেখাচ্ছে। চোখ জোড়ায় কালশিটে পরে গিয়েছে যেন, অদ্ভুত এক আবছায়া ছায়া ভাসছে নজরে। কোনো অনুভূতি নেই। ফাঁপা এক অস্তিত্ব, যার ভেতর থেকে সবটুকু প্রফুল্লতা শুষে নেয়া হয়েছে। চুলগুলো উস্কখুস্ক হয়ে ছড়িয়ে আছে কপালের চারপাশে। পরনের পুরাতন শার্টটা কুঁচকে আছে, একপাশে ছিঁড়েও গিয়েছে বেশ খানিকটা। পরোয়া নেই। তাকে ঠেলে চেয়ারে বসিয়ে দিয়া রান্নাঘর থেকে রুটি এবং আলুভাজি নিয়ে এলো। প্লেট নিয়ে বসলো চেয়ার টেনে। দোহা তাকিয়ে আছে টেবিলের উপর রাখা পানির গ্লাসের দিকে। যান্ত্রিক এক অস্তিত্ব। দিয়ার বুকফেটে কান্না এলো। দাঁতে ঠোঁট কামড়ে সেটুকু গিলে নিলো সে। শায়লার মৃ*ত্যু তার হৃদয়ে অসামান্য ছাপ ফেললেও বর্তমানে তার বিষাদ প্রকাশের সুযোগ নেই। কারণ, দোহা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। এই মুহূর্তে যদি সেও মুষড়ে পড়ে, তাহলে ছেলেটার আর কিছু থাকবে না। ধুঁকে ধুঁকে নিঃশেষ হয়ে যাবে।
- নে, আ কর তো ভাইয়া!
রুটিতে আলুভাজি মাখিয়ে দোহার মুখের সামনে ধরলো দিয়া। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। পুতুল যেন। শুধু নিঃশ্বাস প্রশ্বাস চলছে, ওইটুকুই। দিয়ার চোখ টলটলে অশ্রুতে ভরে এলো। সে এবার খানিকটা জোর করেই দোহার চিবুক চেপে ধরলো, জবরদস্তি করে খাবারটুকু মুখে ঢুকিয়ে দিলো। দোহা ফেলে দিতে উদ্যত হচ্ছিলো, দিয়া ধমকে উঠলো,
- এই খাবার ফেললে আমি ভীষণ কষ্ট পাবো কিন্তু!
জমে গেলো দোহা। শূন্য দৃষ্টিতে একনজর দেখলো বড় বোনকে। তারপর আবার মুখ ফিরিয়ে নিলো। অতি ধীরে চিবুতে লাগলো। দিয়া একটু আশ্বস্ত হলো। প্রায় আধঘন্টা যাবৎ সময় নিয়ে সে দোহাকে একটি রুটি পুরো খাইয়েছে কি খাওয়ায়নি এমন সময়ই কর্কশ তীক্ষ্ণ কণ্ঠটি ভেসে এলো,
- মহল্লায় লজ্জায় মুখ দেখানো যায়না, আর এখানে বসে আরামসে রাজার হালে গিলছেন উনি! বাপের হোটেল পেয়েছে তো, গিলবে না তো কি করবে?
দিয়ার হাত চেপে এলো, নিজের রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন শবনম। চোখেমুখে ভীষণ এক বিতৃষ্ণা এবং ঘৃণা। দোহার মাঝে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। অন্যান্য সময় শবনমের কথার পিঠে জবাব দিতে একটুও দেরী না করলেও বর্তমানে যেন সে এক নীরব দর্শকমাত্র। শবনম এগিয়ে এলেন, আঁচলে নিজের দুহাত ঘষতে ঘষতে ঘৃণার কন্ঠে বললেন,
- ছিঃ ছিঃ ছিঃ! আমার কথা মিললো তো? শেষমেষ জেলের ভাত গিলে তবে শান্তি হলো! পরিবারের মান - সম্মান সব ধুলিস্যাৎ হয়ে গেলো!
- মা, তুমি একটু চুপ করো, পরিস্থিতি বোঝো!
দিয়া প্রথমবারের মতন শবনমের সঙ্গে কণ্ঠ চড়িয়ে বলে উঠতেই তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি অত্যন্ত ক্রোধের সঙ্গে তার দিকে ফিরলো।
- সব তোমার দোষ দিয়া! তুমিই লাই দিয়ে দিয়ে ওকে মাথায় উঠিয়েছ! কোথায় এখন তোমার বড় কলেজ? কোথায় বড়লোকদের বড়লোকি ডিগ্রী? মাকে তো খেয়েছে! এবার বাপের ঘাড়ে চেপে বসেছে! গোটা পরিবারটাকে গিলে তবে এই ছেলের শান্তি হবে!
- মা!
হাহাকার করে উঠলো দিয়া রীতিমত। দুচোখ বেয়ে তার অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরতে লাগলো। কিন্তু দোহা? খটখটে শুকনো তার গাল, নয়নজুড়ে ভাসমান ধূ ধূ ফাঁকা প্রান্তর।
- আহ, শবনম। অনেক কথা হয়েছে, বাদ দাও, এদিকে আসো।
বাবুলের গম্ভীর কন্ঠ ভেসে এলো রুমের ভেতর থেকে। তাতে শবনম পিছনে ফিরে তাকালেন। কোমরে দুহাত চেপে উঁচু স্বরে বললেন,
- হ্যাঁ, আমি সবসময় সত্যি কথা বলি তো তাই তোমাদের বাপ মেয়ে কারোরই সহ্য হয়না। আমার কথার অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ পেয়েছ তো এবার না? ঠিকই পুলিশের দড়ি কোমরে পড়লো। সবে তো কলেজ থেকে বের করেছে! অপেক্ষা করো, এরপর আরো কতকিছু বাকি আছে দেখো শুধু! কোনদিন না মাস্তানের দল নিয়ে এসে তোমার কপালেই ব*ন্দুক ঠেকায়! দেখে নিও, তুমি মিলিয়ে নিও আমার কথা!
- তো কি করবো? ছেলে তো আমার! ঘাড় ধাক্কা দিয়ে কি বের করে দেবো রাস্তায়?
- তাই করলে হয়ত তোমার ভবিষ্যৎটা ভালো হতো। ফায়াজের কথা চিন্তা করেছ একবারও? ও তোমার ছেলে না? তোমার এই গুণধর গুণ্ডার থেকে ও কি শিখবে? ওকে নিয়ে স্কুলে গেলেও মানুষ তেরছা নজরে তাকায়। অন্যের পাপের ভাগীদার আমি হতে পারবোনা বাপু, না আমার ছেলেকে হতে দেবো!
স্বামী - স্ত্রীর কথোপকথনের মাঝেই দিয়া চুপচাপ চোখ মুছে দোহার মুখে খাবার তুলে দিতে গেলো। কিন্তু তার কব্জি পাকড়াও করলো দোহা, হালকা একটু মাথা দোলালো। দিয়া যা বুঝার বুঝে গেলো, আর সম্ভব নয়। মিনমিন কন্ঠে সে জানালো,
- একটুখানি অপেক্ষা কর ভাইয়া, আর একটু সহ্য কর। তোর জন্য আমি মেস দেখছি।
দোহা কোনো জবাব দিলোনা। হাত বাড়িয়ে গ্লাস তুলে শুধু দুই চুমুক পানি পান করলো। তারপর চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালো। তার শুষ্ক ভাঙা কন্ঠ ধ্বনিত হলো,
- আন্টি?
শবনম হঠাৎ শিউরে উঠলেন। ঝট করে ফিরে তাকালেন দোহার দিকে। দুহাত দুইপাশে ঝুলে আছে কিশোরের, নিবিড় ছাউনীঘেরা ফাঁপা দৃষ্টিতে চেয়ে আছে।
- আমি না থাকলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে তাইনা?
শবনম কয়েক মুহূর্ত নীরব চেয়ে থাকলেন, তারপর খানিক জেদ নিয়েই উত্তর করলেন,
- হ্যাঁ!
দোহা কিছু বললোনা, শুধু একটু মাথা দোলালো। তারপর চুপচাপ ঘুরে গুটিগুটি পায়ে নিজের রুমে আড়াল হয়ে গেলো। শক্তভাবে আটকে দিলো দরজা। দিয়া এবং শবনম উভয়ে চেয়ে রইলো দরজার দিকে। আপনমনে কিছু একটা গজগজ করতে করতে শবনম রুমে আড়াল হয়ে গেলেও দিয়া ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো। কিছু একটা ঠিক লাগছে না তার। দোহার আচরণ, অতীব শীতল। আনমনে একটি শক্ত ঢোক গিললো সে। দীর্ঘ প্রশ্বাস টেনে ভাবলো, এই সপ্তাহের মধ্যেই যেভাবেই হোক দোহাকে সরিয়ে নেবে এই বাসা থেকে। তার জন্য যদি দরকার হয়, আলাদা একটা ছোট্ট বাসা ভাড়া নেবে দুই ভাইবোন। দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে সে তখনি নিজের ফোন নিয়ে এক বান্ধবীকে কল করলো তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে।
━━━━━━━━━━━━━
নিজের কেবিনে বসে আছেন সেন্ট পিটার্সবার্গ কলেজের প্রিন্সিপাল। গত তিনদিন যাবৎ ভীষণ চাপের মধ্যে আছেন তিনি। রুহান এ যাত্রায় নির্বিঘ্নভাবে জীবিত আছে, তবে এখনো সে হাসপাতালে ভর্তি। তার ক্ষমতাবান পরিবারের চাপ মিনিস্টার অবধি পৌঁছেছিল প্রায়। তাড়াহুড়ো করে দোহাকে বহিষ্কার করে যা সামাল দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এখন পরিস্থিতি এটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকলে হয়।
- স্যার?
অ্যাসিস্টেন্টের ডাকে প্রিন্সিপাল মুখ তুলে তাকালেন।
- আপনার সাথে কয়েকজন স্টুডেন্ট দেখা করতে এসেছে।
- কোন গ্রেড?
- ইলিভেনথ।
তিনি নিঃশব্দে সম্মতি জানালেন। ভীষণ কৌতূহলোদ্দীপক তার হৃদয়। এই মুহূর্তে হঠাৎ স্টুডেন্টরা কেনো দেখা করতে চাইছে? এমনিতেও দোহা- রুহানের ঘটনাটার পর থেকে কেমন থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে কলেজ থেকে ডরম অবধি সব জায়গায়।
মিনিট দুয়েক বাদেই কেবিনে প্রবেশ করলো একদল কিশোর কিশোরী। প্রত্যেকের পরনেই কলেজের ইউনিফর্ম। চোখে চশমা পরে তাকালেন প্রিন্সিপাল, তীক্ষ্ণ নজরে দেখলেন সকলকে। এরমধ্যে অনেকগুলো মুখ তার চেনা।
- ইয়েস?
সামনে এগোলো আলুথালু শারীরিক গঠনের অধিকারী আমারা। অন্যান্য সময় তাকে কোমলহৃদয়ী কিশোরী দেখালেও বর্তমানে প্রতিটি অঙ্গজুড়ে গভীর এক আত্মবিশ্বাস। দৃঢ়চেতী ডাগর ডাগর দুই নয়ন। দুই হাতে ধরা ফাইলটা এগিয়ে গিয়ে সে আস্তে করে প্রিন্সিপালের টেবিলে রাখলো, ঠেলে দিলো সামনে।
- পিটিশন ফর দোহা ইসলাম।
ভ্রু কুঁচকে সঙ্গে সঙ্গে ফাইলটি তুলে নজর বুলালেন প্রিন্সিপাল। আমারার দৃপ্ত কন্ঠস্বর জানালো,
- সাইনড বায় টু হান্ড্রেড অ্যান্ড টুয়েন্টি সিক্স স্টুডেন্টস অব ইলিভেনথ গ্রেড, উই ওয়ান্ট হিম ব্যাক ওভার সেন্ট পিটার্সবার্গ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ.... স্যার।
সেন্ট পিটার্সবার্গের প্রিন্সিপাল হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন নিজের হাতের থাকা ফাইলে। যেখানে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায় স্পষ্টত খচিত শিক্ষার্থীদের স্বাক্ষর। একাদশ শ্রেণীর সর্বমোট দুইশো ত্রিশ জন শিক্ষার্থীর দুইশো ছাব্বিশ জনেরই স্বাক্ষর রয়েছে এখানে। এই পিটিশনের জন্য কম কাঠখড় পোড়ানো হয়নি তা পরিষ্কার। স্তব্ধ এবং বাকরুদ্ধ হয়ে তিনি মুখ তুললেন, দেখলেন সামনে দৃঢ়প্রত্যয়ী রূপে দাঁড়িয়ে থাকা আমারাকে। কোনো কাঁপন নেই, নেই বিন্দুমাত্র দ্বিধা কিংবা ভয়। প্রিন্সিপাল নজর বুলিয়ে আনলেন তার পাশে দাঁড়ানো অনিক এবং জারার দিকে। পিছনে দাঁড়ানো রাজীব, জিই - শু সহ আরো বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী। মুখ খুললেন তিনি।
- তোমরা এমন একটা ছেলেকে কলেজে ফেরত চাও? আর ইউ পিপল আউট অব ইওর মাইন্ড?
রাগান্বিত কণ্ঠের বিপরীতে কেউই কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। শুধু অনিক এগিয়ে এসে আরেকটি শিট বাড়িয়ে দিলো জবাবস্বরূপ। দৃপ্ত কন্ঠে জানালো,
- হি র্যাঙ্ক’ড সেকেন্ড ইন সেকশন ম্যান্ডেলা অ্যান্ড টেন্থ ইন এন্টায়ার কলেজ, উইথ এইটি ফোর পার্সেন্ট অব মার্কস। ফাইনাল এক্সামের রেজাল্ট শিট। তিনদিন আগে প্রকাশিত হয়েছে।
প্রিন্সিপাল শিট নিলেন, উভয় কাগজের দিকে তাকালেন। দোহা এমনিতেও স্কলারশিপ ধারণকারী স্টুডেন্ট, পড়ালেখায় ভালো হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে এত কুখ্যাত সুনাম কিংবা কুনামের পরেও একাডেমিক দিকটা বজায় রাখার হিসাব তিনি মেলাতে পারলেন না। বুঝতে একটুও বেগ পোহাতে হলোনা, ছেলেমেয়েরা তাকে এই তুলনাটাই দেখাচ্ছে। একটি নিঃশ্বাস ফেললেন তিনি। চোখের চশমা খুলে মৃদু তিক্ততার হাসি হেসে বললেন,
- ওয়াও, এমন দিনও দেখতে হবে আমি ভাবিনি। পিটার্সবার্গের শিক্ষার এতটা অধঃপতন হয়েছে যে স্টুডেন্টরা একজন মাইনর ক্রিমিনালকে ডিফেন্ড করা শুরু করেছে?
- হি ইয নট আ ক্রিমিনাল.... স্যার!
আমারার নমনীয় অথচ শক্তিধারী বাক্যে প্রিন্সিপাল তেঁতে উঠলেন। টেবিলে চাপড় দিয়ে উঠে গর্জন তুললেন,
- একজনকে আহ*ত করে হাসপাতালে পাঠানো ক্রিমিনালের কার্যক্রম নয়? আর ইউ সিরিয়াস আমারা চৌধুরী?
- দোহার ব্যবহার প্রভাবান্বিত ছিলো।
শান্ত জবাব আমারার। প্রিন্সিপালের নজরে আপন সুচারু নজর মেলালো সে।
- আপনার বাবা - মা - ভাই - বোন তুলে কেউ নিকৃষ্টতম বাজে কথা বললে আপনি কি করতেন স্যার? আমি দোহার পক্ষ নিচ্ছি না, কিন্তু ও যা করেছে তার পিছনে রুহানেরও সমান দায় আছে। সেই হিসাবে এটা মাইনর অফেন্স। এর জন্য বহিষ্কার কোনো সমাধান নয়। বহিষ্কার হলেও শুধু দোহা কেনো? রুহান কেনো নয়?
- নাকি রুহানের টাকা আছে বলে?
অনিকের প্রশ্নে সম্পূর্ণ জমে গেলেন প্রিন্সিপাল। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেন। পিছন থেকে এগিয়ে এলো রাজীব,
- আপনারা ব্যাপারটার সঠিক ইনভেস্টিগেশন করলেন না। কেনো জানতে পারি? কোর্টেও তো বাদী - বিবাদী পক্ষকে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সুযোগ দেয়া হয়। পিটার্সবার্গ তো আমাদের স্বচ্ছতার বাণী শেখায়। তবে এক্ষেত্রে দুর্নীতি কেনো?
- রুহানের প্রভাবশালী পরিবার আবার কারো পকেট ভারী করেনি তো স্যার?
নির্ভীক বক্তব্য জিই - শুর। কাঁপতে থাকলেন প্রিন্সিপাল। মুখ খুললেও কিছুই উচ্চারণ করতে পারলেন না বিপরীতে। সামান্য হাসলো অনিক। পকেটে দুহাত ভরে ঝুঁকে এলো, প্রিন্সিপালের নয়নে নয়ন মিলিয়ে বললো,
- আপনি বোধ হয় ভুলে যাচ্ছেন আমাদেরও প্রভাবশালী আব্বু আছে। চশমা পড়ে একবার ভালো করে দেখুন। রুহান কলেজের একমাত্র আলালের ঘরের দুলাল নয়।
শিরদাঁড়া বেয়ে এক শীতল স্রোত খেলে গেলো প্রিন্সিপালের। তাকালেন তিনি চারিদিকে। আমারা, দেশের অন্যতম স্বনামধন্য চৌধুরী গ্রুপের মালিকের মেয়ে। জারা, জেডকো গ্রুপের চেয়ারম্যানের মেয়ে। অনিক, রহমান গ্রুপের কর্ণধারের একমাত্র ছেলে। রাজীব, যোগাযোগমন্ত্রীর পি এসের ছেলে। জিই - শু, গুরুত্বপূর্ণ চাইনিজ কূটনীতিকের ছেলে। বাকিদের কথা নাহয় বাদই দেয়া গেলো। এই ছেলেমেয়েগুলোর গায়ে যদি একটা ফুলের টোকাও আসে, তবে সেন্ট পিটার্সবার্গ ধুলিস্যাৎ হতে সময় নেবে কি?
প্রিন্সিপাল ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়লেন। সব সিদ্ধান্ত তার হাতে নেই। জুরি বোর্ডই শেষ কথার মালিক। তবে তারাও হয়ত ধারণা করেনি এক সাধারণ ছেলের জন্য এইসব ক্ষমতাশালী পরিবারের ছেলেমেয়েরা একদিন রুখে দাঁড়াবে। বিষয়টা..... একইসঙ্গে মুগ্ধকর এবং ভীতিকর। আমারা দুহাত বেঁধে জানালো,
- আমাদের কথায় আপনি আতঙ্ক অনুভব করে থাকলে আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। তবে এখানে আমরা আপনাকে কিংবা কর্তৃপক্ষকে হুমকি দিতে আসিনি। পিটার্সবার্গ আমাদের ন্যায় অন্যায়ের ফারাক শেখায়, আমরা তাই ন্যায়ের সঙ্গ দিচ্ছি। আমাদের কাছে প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি আছে, কর্তৃপক্ষ চাইলে ইনভেস্টিগেট করতে পারে। পিটার্সবার্গ স্টুডেন্টদের প্রতিষ্ঠান রাইট? বিশ্বাস রাখি সিদ্ধান্ত ন্যায়ের পক্ষে আসবে। অন্যায়ভাবে কারো শিক্ষাজীবন ধ্বংসের অধিকার কারো নেই।
স্থির তাকিয়ে রইলেন প্রিন্সিপাল। কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। অতঃপর দুহাত ঘষে গম্ভীর কণ্ঠে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
- আর যদি জুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত না বদলায়?
কিশোর কিশোরীদের শান্ত দেখালো। এক মুহুর্ত নীরবতা। তারপর জারার ভারিক্কী কর্কশ কন্ঠ ঘোষণা করলো,
- দ্যান উই, দ্যা স্টুডেন্টস অব সেন্ট পিটার্সবার্গ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বয়কট দ্যা জুরি বোর্ডস ডিসিশন, অ্যান্ড গো অন স্ট্রাইক অ্যাগেইনস্ট দ্যা অথোরিটি!
প্রিন্সিপাল নিষ্পলক চেয়ে রইলেন, বুকে অদ্ভুতুড়ে এক কাঁপন ধরলো তার। এত বছরের চাকরিজীবনে একজন শিক্ষার্থীর জন্য এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা তাকে এই প্রথমবার করতে হচ্ছে।
━━━━━━━━━━━━━
দুইদিন পর।
গলিটার রংচটা দুইতলা বিল্ডিংয়ের সামনে এসে থামলো তিনটি সাইকেল। একপাশের নর্দমার পাশের খুঁটির পাশে সার দিয়ে সাইকেলগুলো রেখে হাত পা টানটান করলো একেকজন কিশোর। অনিক মাথার হেলমেট খুলে ঝুড়িতে ফেলে ব্যাগটা তুলে নিলো। ভেতর থেকে শক্ত কাগজটা বের করে আরো একবার স্বস্তিদায়ক নজর বোলালো।
“ সেন্ট পিটার্সবার্গ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ বহিষ্কারকৃত ছাত্র দোহা ইসলামকে পুনরায় ডরম এবং ক্লাসে ফেরার অনুমতি প্রদান করছে। তার বহিষ্কারনামা বাতিল করে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণে জুরি বোর্ড বদ্ধপরিকর। ”
নোটিশটি অনিকের চেহারায় ব্যাপক হাসির উৎপত্তি ঘটালো। অবশেষে একটুখানি হলেও আশার সঞ্চার। এ তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল। যার সূত্রপাত ঘটিয়েছিল আমারা। পিটিশনের আইডিয়া তার, অতঃপর তাতে বাস্তবতা দান করে অনিক। সকলের সহযোগিতায় তারা চেষ্টাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে। এই লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে অজান্তেই ছেলেমেয়েগুলো একে অপরের সঙ্গে অদৃশ্য এক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গিয়েছে। তাদের বেঁধে ফেলার সূত্র এক, দোহা।
- ভাই তুই শিওর এটাই দোহার বাসা?
রাজীব জিজ্ঞেস করতেই নিজের কল্পনার জগৎ থেকে বেরিয়ে অনিক আশেপাশে তাকালো। চুলে আঙুল বুলিয়ে বললো,
- কালোজিরা তো তাই বললো।
- কি অদ্ভুত! নিজের বন্ধুর ঠিকানাও এখন মানুষের কাছ থেকে জেনে নিতে হয়!
জিই - শু মাথা নেড়ে বলতেই অনিক এবং রাজীব উভয়ে মৃদু হাসলো।
- কিন্তু কালোজিরাই বা জানলো কিভাবে?
- আরে, গোপনে গোপনে সুনামি দোহাকে স্টক করে নাকি? ক্রাশ টাশ খেয়েছিলো?
কথাগুলো রাজীব এবং জিই - শু যে মজার ছলে বলছে তা বুঝতে পারা সত্ত্বেও অনিকের বুকের ভেতর অদ্ভুত জ্বলুনি হলো। খেঁকিয়ে উঠলো সে একপ্রকার,
- ইশ! ওই কালোজিরা খাবে ক্রাশ? পিরামিড এলিয়েন বানিয়েছে বিশ্বাস করলেও এই কথা জীবনে বিশ্বাস করবো না!
- আরে,তুই এত ক্ষেপে যাচ্ছিস কেনো?
- আন্দাজে কথা বলবি না শালারা!
রাজীবকে ধমকে হনহন করে সে বিল্ডিংয়ের ভেতর এগিয়ে গেলো। বাকি দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে মাথা হেলিয়ে পরে অনুসরণ করলো তাকে। দুইতলায় চলে এলো তারা। অনিক বাকিদের দিকে চেয়ে খানিকটা শক্ত হয়ে তারপর দরজায় নক করলো। প্রথম কয়েকবার কোনো জবাব এলোনা। তৃতীয়বারে দরজাটা হাট করে খুলে গেলো। দেখা গেলো শবনমকে। আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলেন তিনি অনিকদের। এই ছেলেগুলোকে শায়লার মা*রা যাওয়ার দিন দোহার পাশে দেখেছিলেন, বন্ধু হবে নিশ্চয়ই। দৃষ্টি ক্ষিপ্ত হলো তার।
- কি চাই?
- আন্টি, দোহা আছে? ওকে একটু ডেকে দেবেন?
- তোমাদের বন্ধু বাপু নবাব সিরাজউদ্দৌলার বংশধর। দরজা আটকে বসে থাকে। আমার ডাকে খুলবেনা। তোমরা যাও, পরে আসো।
- না মানে আন্টি, একটু যদি আসতে দিতেন। খুব জরুরী কথা ছিলো।
- আরে তাতে আমি কি করবো? সেই দুই ঘণ্টা আগে বাথরুমে গিয়েছে, এখনো বের হয়নি। আমি টেনে বের করব নাকি?
জমে গেলো অনিক। রাজীব এবং জিই - শুর সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করলো। সকলের চেহারায় অদ্ভুত এক আতঙ্ক এবং দুশ্চিন্তা চেপে বসলো। শবনম দরজা আটকে দিতে গেলেও অনিক একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকলো।
- আরে আরে! ওগো দেখো, তোমার ছেলের বন্ধুগুলোও কেমন গুন্ডা....
- বাথরুম কোথায়?
কর্কশ কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো অনিক। ফুঁসছে সে। হাতের কাগজটা মুচড়ে যাচ্ছে আঙুলের চাপে। বাবুল ভেতরের রুমে নিজের কাপড় ইস্ত্রি করছিলেন। হম্বিতম্বি শুনে তিনি দৌঁড়ে এলেন।
- আরে তোমরা...
- আই আস্কড হোয়্যার দ্যা হেল ইয দ্যা বাথরুম?!
রীতিমত হুংকার ছুঁড়লো অনিক এবার! তাতে বাবুল অবধি ভড়কে গেলেন। আনমনে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিলেন ডাইন ইন রুমের সঙ্গে লাগোয়া দরজাটা। অনিক ছুটে গেলো মুহূর্তেই। জিই - শু বলে উঠলো,
- কি অদ্ভুত! একটা ছেলে দুই ঘণ্টা ধরে বাথরুম থেকে বের হচ্ছেনা আর আপনারা এত নিশ্চিন্ত?
- আমার চু*লের মা - বাপ আপনারা!
না পারতে চেঁচিয়ে উঠলো রাজীব।
- দোহা... দোহা শুনতে পাচ্ছিস? দরজা খোল আমি অনিক! দেখ.... পিটার্সবার্গ তোকে আবার ক্লাসে ফেরার নোটিশ দিয়েছে, দোহা...!
কোনো জবাব নেই। শুধু অনিকের ধাক্কাধাক্কির আওয়াজ। আতঙ্কিত হয়ে চেয়ে রইলো সকলে। বাসার খোলা দরজা বেয়ে ওই মুহূর্তে ভেতরে ঢুকলো দিয়া। সে আজ বাসা দেখতে গিয়েছিলো। ঘরে এতো হম্বিতম্বি দেখে সে বাবুলকে জিজ্ঞেস করলো,
- বাবা....
- দোহা দরজা খুলছে না।
শিউরে উঠলো দিয়া অজান্তেই। কিছুই বুঝতে বাকি রইলনা। অনিকের দিকে তাকালো। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ টেবিলে ছুঁড়ে চিৎকার করলো,
- ভেঙে ফেলো! দরজা ভেঙে ফেলো!
- রাজীব, জিই - শু...
অনিকের ডাকে দুজন ছুটে গেলো। একত্রে সজোরে বাথরুমের দরজায় বারকয়েক ধাক্কা দিতেই পুরাতন দূর্বল ফ্রেম ভেঙে ধপাস করে দরজা খুলে হেলে পড়লো। সবার আগে বাথরুমে লাফিয়ে ঢুকলো অনিক। টাইলস বাঁধানো ফ্লোরে বালতির পাশে লুটিয়ে আছে দোহার শীর্ণ অবয়ব। চোখজোড়া বন্ধ। শরীরের টি শার্ট আর ট্রাউজার চুপচুপে ভেজা। একপাশে উল্টে পড়ে আছে ফিনাইলের বোতল, ছিপি খুলে ভেতরের তরলটুকু ছড়িয়ে আছে ফ্লোরের চারপাশে।
স্থবির হয়ে গেলো অনিক। রাজীব এবং জিই - শুর অন্তরে নীরব চিৎকার উঠলো।
- দোহা!
দিয়ার বীভৎস চিৎকারে কেঁপে উঠলো চারপাশ। সকলের অন্তর খামচে ধরলো অদৃশ্য শক্তি। অনিক ধপাস করে বসে পড়লো ফ্লোরে, দোহার মাথাটা কোলে তুলে হুংকার ছুঁড়লো,
- কল অ্যাম্বুলেন্স, রাইট নাউ!
- দেরী হয়ে যাবে, ওকে নিচে নামা আমি রাস্তা থেকে গাড়ি ধরে আনছি।
দ্রুত চিন্তায় বলেই জিই - শু হন্তদন্ত হয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটলো বাইরে। অনিক রাজীবের সাহায্যে দোহার শীতল হয়ে আসা ওজনদ্বার শরীরটা নিজের কাঁধে তুলে নিলো। কাউকে কোনরকম কৈফিয়ত না দিয়েই বাসার বাইরে চলে এলো, সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো বাইরে। তাদের অনুসরণ করলো দিয়া। দোহাকে কাঁধে নিয়েই ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটলো অনিক, তাকে সাহায্য করলো রাজীব। উভয়ের চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরছে।
- দোহা....ইউ বাস্টার্ড!
আপনমনে দাঁতে দাঁত চেপে ছুটতে ছুটতে বিড়বিড় করলো অনিক, সমস্ত অন্তর তার ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে।
—চলবে—