#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা২৫
পর্ব ২৫: [ সমর্পণ ]
━━━━━━━━━━━━━━━
হাসপাতালের করিডোরের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনিক। তার ঠিক পাশেই বেঞ্চে বসে আছে রাজীব এবং জিই - শু। ওয়ার্ডের ভেতরে এই মুহূর্তে দিয়া আছে। তারা অপেক্ষা করছে। কিছুক্ষণ বাদেই ভারী পদক্ষেপের শব্দ শোনা যেতেই অনিক মাথা কাত করে তাকালো। করিডোরের প্রান্ত বেয়ে ছুটে আসতে দেখলো আমারাকে। ওভারসাইজ টি শার্টের উপর একটা শাল জড়ানো, পিঠ ছোঁয়া চুলগুলো এলোমেলো ছড়িয়ে আছে কাঁধের চারপাশে। উজ্জ্বল ফর্সা ত্বক আতঙ্ক এবং তাড়াহুড়োয় ভীষণ রকম লালচে দেখাচ্ছে। ডরম থেকে সোজা ছুটে এসেছে স্পষ্ট, বিন্দুমাত্র সময় ক্ষেপন করেনি। তার পিছনে জারা, শার্ট আর ট্রাউজার পরনে। ভ্রুজোড়া কুঁচকে আছে অজানা অনুভবে।
আমারা পৌঁছেই খপ করে অনিকের দুহাত চেপে ধরলো। হাঁপ উঠে গিয়েছে তার। সেসব তুচ্ছ করে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
- দো.... দোহা...
অনিক নিজের অন্তরে এক গভীর আলোড়ন অনুভব করলো। আমারার কাঁধে দুহাত চেপে তার উত্তেজিত সত্তাকে যেন ভরসা দিলো অজান্তেই।
- রিল্যাক্স আমারা, দোহা ঠিক আছে।
প্রসারিত হলো কিশোরীর দৃষ্টি। বাকরুদ্ধ হয়ে জমে গেলো একদম। বুক ওঠানামা করতে থাকলো ভারী নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের দরুণ। কপাল এবং ঘাড়ে জমা ঘামের ফোঁটা চিকচিক করে উঠলো মৃদু আভায়। পিছন থেকে এগিয়ে জারা শীতল কন্ঠে বললো,
- ঠিক আছে মানে? তুই - ই তো মেসেজ করলি যে ও নাকি ফিনাইল....
- দোহা কোনো ফিনাইল খায়নি। ডাক্তার বলেছেন, শারীরিক দূর্বলতা আর মানসিক অবসাদের কারণে প্রেশার কমে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে।
রাজীব জারাকে শুধরে দিলো। অনিক একটি নিঃশ্বাস ফেলে মাথা ঝাঁকিয়ে নিজের নজর লুকিয়ে বললো,
- ওর পাশে ফিনাইলের বোতল পড়েছিল দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
- যাক ভালো। নাহলে ওই নির্লজ্জ্ব বেহায়াটাকে দুটো ঘুষি আর দুটো লাথি দেয়ার প্ল্যান করেই এসেছিলাম একপ্রকার।
জারা মিনমিন করে উচ্চারণ করলো। তবে আমারাকে স্থির মনে হলোনা। সে বারবার পাশের ওয়ার্ডের প্রবেশপথের দিকে গিয়ে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। ঠিক তখনি ভেতর থেকে পায়ে পায়ে বেরিয়ে এলো দিয়া, বরাবর মুখোমুখি হলো আমারার উদ্বিগ্ন দৃষ্টির। বিব্রত হয়ে কিশোরী সরে এলো। দিয়ার পরিশ্রান্ত এবং সতর্ক নজর তাকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলেও কোনো মন্তব্য করলোনা। অনিকের দিকে ফিরলো,
- দোহার একটু খেয়াল রেখো। আমি ফার্মেসী থেকে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে আসছি।
- আমরা ওকে দেখতে যেতে পারবো আপু?
প্রশ্নের বিপরীতে হাঁটতে হাঁটতে দিয়া জানালো,
- হুম, তবে সবাই একসাথে গিয়ে ভিড় করতে মানা করেছেন ডাক্তার। একজন দুজন করে যাও।
এটুকুই। দিয়া দ্রুত পদক্ষেপে আড়াল হয়ে গেলো দৃষ্টিসীমার। সবাই তাকালো একে অপরের দিকে। প্রত্যেকের দৃষ্টিই অতঃপর আপতিত হলো আমারার উপরে। জারা শান্ত কন্ঠে বললো,
- তুই যা মধু, আমরা এখানে আছি।
ঝট করে ফিরে তাকালো আলুথালু কিশোরী, একটি ঢোক গলাধঃকরণ করলো। তার দৃষ্টিতে কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়লো। শরীরের শালটা ভালোমত টেনে নিয়ে এক দীর্ঘ প্রশ্বাস টানলো আমারা, তারপর পায়ে পায়ে ওয়ার্ডের ভেতরে এলো।
ওয়ার্ডের ভেতরে কেউই নেই। মোট সাতটা বেডের সবকয়টা ফাঁকা। তিনটি বেডে জিনিসপত্র থাকলেও রোগীদের দেখা যাচ্ছে না। খুব সম্ভবত বাইরে কোথাও হাঁটাচলা করছে। আমারা ধীরপায়ে এগোলো। একদম এক প্রান্তে ঠিক বিশাল জানালার ধারের ধাতব বেডের উপরে বসে আছে দোহা। তার অবয়ব নজরে আসতেই আমারা শিউরে উঠলো। রুগ্নতার ছাপ প্রতিটি অঙ্গজুড়ে। মুখের ভারত্ব কমে এসেছে, তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে। জেল্লা ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে, শূন্য আঁখিজোড়ার নিচে কালির পসরা। উস্কখুস্ক চুল, যাতে অনেকদিন যাবত আচড় পড়েনি। বেডের ফ্রেমে বালিশ ঠেকিয়ে হেলান দিয়ে বসে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে জানালার দিকে। হাতে ক্যানোলা সংযুক্ত, স্যালাইন চলছে।
নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে এমন ভেঙে যাওয়া রূপে দেখে আমারার হৃদয়ে অদৃশ্য র*ক্তক্ষরণ হতে আরম্ভ করলো। ইচ্ছা হলো ছুটে গিয়ে বুকের মাঝে আঁকড়ে ধরে তার সব কষ্টের মোচন ঘটায়। কোনো না কোনো উপায়ে এক মুহূর্তের জন্য হলেও তাকে সকল যন্ত্রণা ভুলিয়ে দেয়। কিন্তু তা সম্ভব নয়, আর কোনোদিন হবেও না।
আমারা দোহার বেডের পাশে এসে থামলো, ছেলেটা তার উপস্থিতি টের পেয়েছে কিনা বোঝা যাচ্ছেনা। এখনো জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। এক টুকরো আকাশ ছাড়া বাইরে দেখার মতন কিছুই অবশ্য নেই। আমারা আস্তে করে টুলের উপর বসলো। কোনো শব্দ করলোনা। দোহার ফাঁপা দৃষ্টি অবশেষে তার উপর পড়লো, কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালোনা। স্থির তাকিয়ে রইলো। একবারের জন্যও পলক ফেললোনা।
দীর্ঘ এক মুহুর্ত নীরবতা। ঠিক অস্বস্তিকর নয়, বরং এক ব্যাখ্যাতীত অনুভূতিতে পরিপূর্ণ।
- সবকিছুর সমাধান যদি এতই সহজ হতো তাহলে পৃথিবীর জনসংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসতো।
অবশেষে ধ্বনিত হলো আমারার মন জুড়ানো শান্ত - কোমল কন্ঠস্বর। দোহা অজান্তেই চোখ বুঁজে ফেললো, দীর্ঘ এক প্রশ্বাসে বুক ভারী করলো। তার শুষ্ক অধরে ম্রিয়মাণ এক হাসির উৎপত্তি ঘটলো। আমারা প্রাণভরে দৃশ্যটুকু দেখলো।
- তোমার আম্মু চলে গিয়েছেন, কিন্তু তুমি কি তাতে ভালো আছো? যদি তুমি চলে যেতে, তাহলে তোমার আশেপাশের মানুষগুলো ভালো থাকতো?
জবাব এলোনা। দোহা ওই একইভাবে বসে আছে। চোখ বুঁজে রয়েছে, তিরতির কাঁপছে চোখের পাতা, যার সঙ্গে পাল্লায় নেমেছে অযত্নে ফেটে আসা ঠোঁটজোড়া। আমারা অদ্ভুত এক টান অনুভব করলো। উঠে দাঁড়িয়ে নিজের শালের প্রান্ত চেপে ধরলো দোহার গালে, মুছে নিলো ধীরে ধীরে জমতে থাকা ঘামের ফোঁটা। সামান্য কম্পিত হলো দোহা, তাকে সরিয়ে দিলোনা। বরং ঝুঁকে এলো ওই স্পর্শে। আমারা শাল সরিয়ে ফেলে নিজের কোমল হাতে ছুঁয়ে দিলো তার মুখ, শুষ্ক ঠোঁটে বৃদ্ধাঙ্গুল বুলিয়ে আনলো, যেন সজীবতা ছুঁইয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা। তার প্রশান্ত স্বর ধ্বনিত হলো,
- ফিনাইলের বোতল এমনি এমনি তোমার পাশে পড়েছিল না দোহা।
অবশেষে দৃষ্টি মেললো দোহা, সরাসরি তাকালো আমারার চোখের দিকে। ঠোঁটের হাসিটুকু অল্প একটু বিস্তৃত হলো তার।
- তুমি সবসময়ই জানো, কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা, তাইনা?
আমারার আঙুল তার গালে আরেকটু জোরের সঙ্গে চেপে বসলো। ভ্রুজোড়া কুঞ্চিত হলো অব্যক্ত আবেগের প্ররোচনায়। সামান্য ক্রোধ মেশানো কন্ঠে সে জবাব দিলো,
- হিসাবটা অনেক সহজ, এতে না বুঝতে পারার মতন কিছু নেই। তবে একটা বিষয় আমাকে কষ্ট দিচ্ছে অনেক। কি জানো?
- কি?
- তোমার সম্পর্কে আমার ধারণা ভুল। সংগ্রামী শক্ত খোলসের আড়ালে তোমার হৃদয় একটা কাপুরুষ বাদে কিছুই না।
হাসলো দোহা, খানিক শব্দ করেই। ক্যানোলা সংবলিত হাতটি তুলে নিজের মুখে আমারার হাতজোড়া চেপে ধরলো।
- এতদিনে কেউ আমাকে সত্যিকারে চিনতে পারলো!
কথাটা আমারার বুকে বিধলো দারুণভাবে। দাঁতে ঠোঁট কামড়ে ধরলো সে আবেগ দমাতে। দোহা কাছে সরে এলো, যেন জড়িয়ে ধরতে চায় আমারাকে। তবে ধরলো। জ্বলজ্বলে নয়নে জানালো,
- রুমের ফ্যানের সঙ্গে দড়ি বেঁধেও নেমে এসেছি। ছাদের রেলিংয়ে পা ঝুলিয়ে উঠেও ফিরে এসেছি। ভয় পেয়ে ফিনাইলের বোতলে চুমুক দিতে চেয়েও পারিনি। ঠিকই বলেছ, আমি একটা সত্যিকারের কাপুরুষ।
স্তব্ধ হয়ে থাকলো আমারা। নয়নজোড়া টলটলে হলো তার। ভীষণ রকম হতাশা এবং ক্রোধ ভাসলো তাতে। দোহার দুহাত এবার আলতোভাবে তার কোমরে স্থাপিত হলো। দৃশ্যমানভাবে ঢেউ খেলিয়ে কিশোরের কন্ঠতালু বেয়ে নেমে গেলো একটি শক্ত ঢোক। ফাঁপা দৃষ্টিতে অদ্ভুতুড়ে এক অনুভূতির দেখা মিললো। কুয়াশার ন্যায় আবছায়া, শিশিরের ন্যায় সিক্ত। ঠান্ডায় গম্ভীর হয়ে বসে যাওয়া কন্ঠে দোহা ফিসফিস করলো,
- আমি ফিরে এসেছি প্রিন্সেস, তবুও আমি ফিরে এসেছি। কারণ আমার চোখের সামনে শুধু দুইটা মানুষের মুখ ভেসে উঠেছিল। এক, আমার আপু। আর দুই...... তুমি।
একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে নামলো ফোলা টকটকে গাল বেয়ে। ঝুঁকে এসে দোহার কপালে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুঁজে নিলো আমারা, সেই বন্ধ চোখের পাতায় অশ্রু জমতে থাকলো ফোঁটায় ফোঁটায়। দোহা নিঃশব্দে অনুভব করে গেলো মুহূর্তটি, তার হাতের আঙ্গুলসমূহ ক্রমশ চেপে বসলো আমারার প্রশস্ত কোমরে।
- মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার স্মৃতি রেখে যায়। মানুষকে ভোলা যায়, কিন্তু স্মৃতি শুধুই যন্ত্রণা দেয়। শত্রু কিংবা মিত্র, মানুষ যখন স্মৃতি হয়ে, তখন সেই স্মৃতির ভার বহন করা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। জীবন থাকতে আর কোনোদিন কাউকে এমন কষ্ট দেয়ার কল্পনাও করোনা।
চোখ মেললো আমারা, দোহার নয়নে নয়ন মিলিয়ে ফিসফিস করলো,
- স্মৃতির দহনে অপরকে জ্বালানোর অধিকার সৃষ্টিকর্তা কাউকে দেয়নি, কাউকে না!
দোহা হাজার চাওয়া সত্ত্বেও আর কিছুই উচ্চারণ করতে পারলোনা। আমারার প্রশস্ত আঙুল খেলে চললো তার গালজুড়ে, রুগ্ন সত্তায় যেন প্রাণ ফেরাতে চায় তা।
- আজ থেমে গেলে এখানেই তোমার পরাজয়। অতঃপর ভবিষ্যতের ঘরে বসে আক্ষেপ ছাড়া করার কিছুই থাকবেনা। তখন ভাববে, যদি একটুখানি সাহস নিয়ে আরো একবার উঠে দাঁড়াতাম, আরো একবার মোকাবেলা করতাম, তাহলে আজ আমার ঘরে শান্তি উপচে পড়তো। আক্ষেপের চাইতে বড় কোনো যন্ত্রণা দুনিয়ায় হয়না.....
আমারার মাঝে আশফিকা হুবহু ছাপ দেখতে পেলো দোহা। নাক কুঁচকে এলো তার অশ্রু ঠেকানোর চেষ্টায়, সামনে ঝুঁকে প্রচুর সাহস নিয়ে আমারার বুকে আলতো করে ঠেকালো নিজের মাথা। কিশোরী তাকে দূরে সরিয়ে দিলোনা। আগলে নিলো, ঢাল হয়ে। তার মাথায় খেলে চললো শান্তনার এক হাত, সঙ্গে কানে ফিসফিসে আবেদন,
- তুমি পারবে। আর একটাবার শুধু, আর একটাবার উঠে দাঁড়িয়ে দেখো, পৃথিবী কত সুন্দর!
- সেই সুন্দর পৃথিবীতে তুমি কি আমার পাশে থাকবে?
জবাব এলোনা। জবাবের প্রয়োজন নেই। শুধুই নীরব অনুভব। একে অপরকে আলিঙ্গনের তীব্র শক্তি।
ওয়ার্ডের বাইরে থেকে উঁকি দিয়ে দৃশ্যটির সাক্ষী হলো অনিক - জারা, রাজীব এবং জিই - শু। অদ্ভুত এক আবেগে টলটলে হলো প্রত্যেকের অন্তর। তারা যে দোহাকে চেনে, সে তো সংগ্রামী দোহা! এটুকুতেই ভেঙে পড়লে দোহা— নামটার স্বার্থকতা কোথায়?
দোহা উঠে দাঁড়াবে, আবারো উঠে দাঁড়াবে। সংগ্রাম করবে।
কিন্তু দিনশেষে সেই সংগ্রাম যে আগের চাইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে তা তখন ঐ মুহূর্তে হাসপাতালের মাঝে দাঁড়িয়ে কেউই কল্পনা করতে পারলোনা। আমারাও না।
━━━━━━━━━━━━━━
এক সপ্তাহ পর।
সেন্ট পিটার্সবার্গ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
প্রিন্সিপাল নিজের চেয়ারে বসে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন টেবিলের বিপরীত প্রান্তে বসে থাকা দোহার দিকে। পরিপাটি অবয়ব, ধবধবে সাদা একটি হুডি আর জিন্স পরনে। চুলগুলো আঁচড়ে নেয়া, খানিক গুচ্ছ ছড়িয়ে আছে কপালে। কব্জিতে কালো বেল্টের হাতঘড়ি। সুস্থির নয়ন। সুদর্শন কিশোর মায়ায় আচ্ছাদিত চেহারায় অদ্ভুতুড়ে এক আভার প্রতিফলন। ফাদার ফ্রেড্রিকও একপাশে চুপটি করে দাঁড়িয়ে দেখছেন। প্রিন্সিপাল নিজের চোখের চশমা খুলে নিয়ে একটি নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
- আর ইউ শিওর? ইউ আর নট কামিং ব্যাক ইনটু সেন্ট পিটার্সবার্গ কলেজ?
দোহা মুখ তুলে তাকালো, শান্ত জবাব দিলো।
- আমি নিশ্চিত, স্যার।
প্রিন্সিপাল খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর ব্যক্ত করলেন,
- তোমার ক্লাসমেটরা এতকিছু করলো এরপরেও...
- আমি তাদের পেয়ে ধন্য এবং তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। সেন্ট পিটার্সবার্গ আমাকে আরো একটি সুযোগ দিয়েছে সেজন্য আমি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তবে ব্যক্তিগত কারণে আমার পক্ষে এই প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
- তুমি ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। আমার তোমাকে আটকানোর অধিকার নেই, তবুও চাইবো এখানে থাকো কিংবা অন্য কোথাও থাকো, সবসময় নিজের পড়ালেখা এবং ভালো ফলাফলের ধারা বজায় রাখো।
দোহা মৃদু হাসলো। একটি ফাইল বাড়িয়ে দিলো প্রিন্সিপালের দিকে।
- আমি একটি বেসরকারি কলেজে আবেদন করেছি, সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে ট্রান্সক্রিপ্ট এবং ছাড়পত্র পেলে আমি আমার দ্বাদশ শ্রেণীর পড়াশোনা সেখানে কন্টিনিউ করতে পারবো। স্যার, আমার ট্রান্সক্রিপ্টটা সাইন করে দিলে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকতাম।
প্রিন্সিপাল একটা নিঃশ্বাস টানলেন। ফাইল নিয়ে কাগজ ভালোমত পড়লেন। তারপর স্বাক্ষর করতে করতে বললেন,
- সেন্ট পিটার্সবার্গের যাত্রা তোমার জীবনের শিক্ষা হয়ে থাক। আর ভুল করোনা। প্রার্থনা করি, সৃষ্টিকর্তা তোমার মঙ্গল করবেন।
ফাইল ফিরিয়ে দিলেন তিনি। দোহা সেটি ফেরত নিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। সামান্য ঝুঁকে সম্মান জানিয়ে বললো,
- থ্যাংক ইউ স্যার।
ফাদার ফ্রেড্রিকের দিকে এগিয়ে দোহা মাথা তুলে তাকালো। ম্রিয়মাণ হাসি নিয়ে জানালো,
- আপনাকে আমি গুরুজন হিসাবে প্রচন্ড শ্রদ্ধা করি। আপনি আমাকে অনেককিছু শিখিয়েছেন, অনেককিছু থেকে আগলে রেখেছেন। ফাদার, আপনাকে সেইসবকিছুর জন্য ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।
ফ্রেড্রিক কয়েক সেকেন্ড চেয়ে রইলেন। তারপর কাঁপা কাঁপা হাত বাড়িয়ে দোহার মাথায় আঙুল বুলিয়ে দিলেন।
- মে গড ব্লেস ইউ মাই চাইল্ড। জীবনে অনেক অনেক বড় হও, এই আশীর্বাদ রইলো।
দোহা মাথা পেতে প্রার্থনাটুকু গ্রহণ করে নিলো। তারপর সামান্য হাসলো। শেষ একনজর ফাদার ফ্রেড্রিকের মুখে চেয়ে তারপর উল্টো ঘুরে সোজা বেরিয়ে এলো প্রিন্সিপালের কেবিন থেকে। বাইরের করিডোরের রেলিং ধরে দীর্ঘ এক প্রশ্বাস টানলো।
অবশেষে সে মুক্ত!
。
。
。
সেদিন বিকালবেলা।
আরো একবার গোধূলী ছুঁয়ে গিয়েছে ধরিত্রীকে। সেই কমলাভ আভার পর্দা ভেদ করে মেইল ডরমের বাইরে পা রাখলো দোহা। কাঁধে একটি ব্যাগ ঝোলানো তার, অপর ব্যাগটি রাজীব ধরে নিয়ে আসছে। পিছনে পিছনে অনুসরণ করছে অনিক এবং জিই - শু। চারজনের বন্ধুর দলটা প্রাঙ্গণে এসে থামলো। দোহা ঘুরে তাকালো পিছনে। অনিক দুই পা এগিয়ে ঠান্ডা আওয়াজে জিজ্ঞেস করলো,
- তুই শেষমেষ সত্যিই আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছিস?
হালকা হাসলো দোহা। হাত বাড়িয়ে বন্ধুর কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে বললো,
- ছেড়ে যাচ্ছি কোথায়? একই শহরেই তো আছি। মাসে দুমাসে দেখা হবেই। তাহলে ছেড়ে যাওয়ার কি হলো?
- শালা মান্দার! তোকে ছাড়া কলেজে কি আমরা বাদাম বেঁচবো?
অনিকের গালমন্দের বিপরীতে দোহা তাকে নিজের বুকে টেনে নিলো। সকলের সামনে শক্ত থাকলেও বিদায়লগ্নে অনিক নিজের চোখের অশ্রু লোকাতে তার কাঁধে মুখ গুঁজে দিলো। পিঠ চাপড়ে দোহা কোমল স্বরে বললো,
- পড়ালেখা করবি, দাপট দেখিয়ে বেড়াবি। তোর কাজের কি অভাব আছে?
অনিক জবাব দিতে পারলোনা। দোহাকে দ্বিগুণ জোরে আঁকড়ে ধরলো। দুহাত পিছনে তুলে রাজীব এবং জিই - শুকেও কাছে ডাকলো দোহা, বেঁধে নিলো বন্ধুদের একসঙ্গে, অমোঘ আলিঙ্গনে।
- একে অপরের খেয়াল রাখিস কেমন? আর মা*রামারি করতে হলে আমাকে খবর দিস, এক দৌঁড়ে চলে আসবো।
- হারামজাদা! ছেলেমানুষ হয়েও কাঁদতে বাধ্য করে!
- তুই আসলেই একটা হারামী! জঘণ্য হারামী!
রাজীব এবং জিই - শু একত্রে বলে উঠতেই দোহা হেসে তাদের ঝাঁকিয়ে দিলো সামান্য। বেশ কিছুক্ষণ বাদে বন্ধুদের আলিঙ্গন ভাঙলো অবশেষে। দুই পা সরে দাঁড়াতেই ফিমেইল ডরমের রাস্তা বেয়ে লম্বা পদক্ষেপে এগিয়ে আসতে দেখা গেলো জারাকে। টি শার্ট পরনে, ট্রাউজারের পকেটে হাত ভরে রেখেছে। মুখ পাথরের মতন থমথমে। দোহা এবং বাকিদের সামনে এসে সে থামলো। তারপর শুকনো কন্ঠে জানালো,
- তোকে আমার একবিন্দুও পছন্দ না। কিন্তু মানুষ হিসাবে তোর একটা দুইটা গুণ আছে। সেজন্য.... ভালো থাকিস। গুডবাই।
সোজাসাপ্টা বিদায় বাণীতে দোহার ঠোঁটে বিস্তৃত হাসি ফুটলো। হাত বাড়িয়ে সে প্রথমবারের মতন জারার হাত ধরে হ্যান্ডশেক করলো।
- যথেষ্ট। ধন্যবাদ কালোজিরা।
পাশে দাঁড়ানো অনিকের দিকে দৃষ্টি ফেলে মৃদু আঁচে দোহা আবারো বললো,
- আমার এই বন্ধুটা আবার মাথা নষ্ট পাবলিক। মাঝে মাঝে ব্রেইনে শর্ট সার্কিট হয়ে গেলে দুইটা গোত্তা লাগিয়ে ঠিক করে দিস, কেমন?
অনিক চোখ পাকিয়ে তাকালো,বাকিরা ফিক করে হেসে ফেললো। এমনকি জারার অধরেও অতি সূক্ষ্ম এক হাসির দেখা পাওয়া গেলো।
দোহা আশেপাশে তাকালো, কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে কোথাও দেখতে পাচ্ছেনা। জারা বিষয়টা খেয়াল করলো। একটা নিঃশ্বাস ফেলে জানালো,
- ও আসবে না। লেকের পাড়ে বসে আছে।
দোহা একটি ঢোক গিললো, তারপর কাঁধের ব্যাগটি জিই - শুকে ধরিয়ে দিয়ে নিঃশব্দ দ্রুত পদক্ষেপে এগোলো লেকের উদ্দেশ্যে।
জায়গাটি একইরকম আছে। স্নিগ্ধ, স্বচ্ছ, মন জুড়ানো প্রশান্ত। দোহা গাছের ছায়া মাড়িয়ে ধীরে ধীরে প্রবেশ করলো। লেকের পাড়ে হাঁটু আঁকড়ে চুপচাপ বসে আছে ভারী শরীরের মেয়েটি। এরকম গোটানো অবস্থায় তাকে দেখাচ্ছে ঠিক একটি বলের মতন। ভীষণ কোমল, স্নিগ্ধ, মায়াবী। গোধূলীর আভা প্রতিফলিত হচ্ছে গোলগাল চেহারায়। ডাগর ডাগর আঁখিজোড়ায় গভীর দৃষ্টিপাত, অদূরে ভেসে বেড়ানো রাজহাঁস যুগলের উদ্দেশ্যে। কলকল ধ্বনি এবং হাওয়ার শনশন আওয়াজ। মন মাতানো আখ্যান। দোহা চুপচাপ এগিয়ে গিয়ে ঠিক আমারার পিছনে একটি পাথরের উপর বসে পড়লো। কিশোরী তার উপস্থিতি টের পেলেও ফিরে তাকালোনা। নীরবে অনুভব করে গেলো শুধু।
দোহা সামনে তাকালো, পিঠ ছুঁয়ে ধীরে ধীরে আরো নিচে নামতে থাকা চুলের রাশি লক্ষ্য করলো। রাবার ব্যান্ড দিয়ে ঝুঁটি করা, তার প্রান্তে সূর্যমুখী ক্লিপ। জন্মদিনে যেটি উপহার দিয়েছিল সে আমারাকে। অজান্তেই হাত বাড়িয়ে সেটি খুলে নিয়ে নিজের জ্যাকেটের প্রান্তে আটকালো দোহা। তারপর আমারার চুল থেকে রাবার ব্যান্ডটি খুলে নিলো। সামান্য কেঁপে উঠলো কিশোরী, মুখ খুললো,
- কি করছো তুমি?
আমারার প্রশ্নের বিপরীতে জবাব এলোনা দোহার। তার পিঠ ছোঁয়াপ্রায় কেশের মাঝে কিশোরের লম্বাটে আঙুল খেলে চললো, সযত্নে গুছিয়ে আনলো একগুচ্ছ। বিনুনীর ভাঁজে ভাঁজে গাঁথতে লাগলো এক অপূর্ব মালা।
- তুমি চুল লম্বা করছো। ঠিক আমার পছন্দমতন।
সামান্য হেসে বললো দোহা। আমারা উত্তর করলোনা, লালিমা ছেয়ে গেলো উভয় ফোলা গালজুড়ে। মুখ লুকিয়ে নিলো সে হাতের বাঁধনের মাঝে। দোহা সন্তপর্নে বিনুনী পাকিয়ে অন্তিম প্রান্তে রাবার ব্যান্ড বেঁধে দিলো। তারপর ঝুঁকে সেই প্রান্তে নিজের অধর ছুঁয়ে ফিসফিস করলো,
- মুক্ত হও তুমি। শুধু তোমার বিনুনীর ভাঁজে ভাঁজে জড়িয়ে থাক আমার আঙ্গুলের স্পর্শ।
হৃদস্পন্দন ক্ষণিকের জন্য থমকে গেলো সম্পূর্ণ। বিষাদ এবং সুখের এক মিশ্র অনুভূতি, অন্তরকে খিঁচে নিলো যেন। দোহা দুহাতের তালুতে আমারার মাথা ধরে সামান্য তুলে নিজের সঙ্গে দৃষ্টি মেলালো। উভয়ের প্রজ্জ্বলিত নয়ন মোকাবেলা করলো একে অপরকে। দোহার কন্ঠ কেঁপে উঠলো, গভীরতম নয়নে ভাসলো এক অব্যক্ত অনুভূতি।
- আমার অন্তরের মতন অপবিত্র স্থানে তোমার ঠাঁই না হোক। তুমি মহিমান্বিত হও কোনো অমর সৃষ্টির পাতায়।
ঝুঁকে এলো সে, আলতো করে কেশগুচ্ছ ছড়ানো কপালে ছুঁয়ে দিলো নিজের কম্পিত ঠোঁট। আমারা চোখ বুঁজে নিলো, সেই বদ্ধ পাতা বেয়ে গড়িয়ে নামলো একফোঁটা অবাধ্য অশ্রু।
- সবকিছুর শেষে.... শুধু নোলক থাক দোহার।
বৃদ্ধাঙ্গুলে আমারার চোখ বেয়ে গড়ানো অশ্রুটুকু মুছে নিয়ে দোহা তার কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিস করলো,
- পারলে কোনোদিন আমাকে ক্ষমা করে দেয়ার চেষ্টা করো, নোলক আমার।
এই প্রথম এই শেষ। একটিমাত্র বাক্য। তাতে মেশানো অনুশোচনা, অপরাধবোধ, অপ্রাপ্তি, বিরহ যাতনা, সিদ্ধান্তের বোঝা.... আরো নাম না জানা কত কি?! আমারা কিছুই বলতে পারলোনা বিপরীতে।
দোহাকে কোনোদিনও ক্ষমা না করার যে প্রতিজ্ঞা সে করেছিল, তা কি এরপরও বজায় থাকবে? প্রচন্ড ইচ্ছা হলো বলতে, অভিমানী গলায় চেঁচিয়ে উঠতে,
“ যেওনা দোহা! আমাকে ফেলে যেওনা! আমি তোমাকে ভালোবাসি! অনেক আগে থেকে ভালোবাসি! ”
কিন্তু আমারার কন্ঠে সবকিছুই দলা পাকিয়ে গেলো। এক হাতে আনমনের দোহার হাঁটু চেপে ধরা ছাড়া সে আর কিছুই উচ্চারণ করতে পারলোনা। ঐভাবেই দুজন বসে রইলো, দীর্ঘক্ষণ। নীরবে - নিভৃতে বিলিয়ে গেলো একে অপরের অনুভূতি। তারপর যখন দিবাকর পশ্চিমে হেলে অস্ত যেতে আরম্ভ করলো, তখন দোহা উঠে পড়লো। আমারার হাতটি নিজের মুঠোয় পুরে উভয়েই পায়ে পায়ে কলেজের প্রাঙ্গণে এসে পৌঁছালো। গেটের সামনে ইতোমধ্যে অপেক্ষমাণ সবাই। দোহা এগিয়ে গিয়ে রাজীব এবং জিই - শুর কাছ থেকে নিজের ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিলো। এক হাতে ব্যাগের হাতল চেপে অপর হাত পকেটে ঢুকিয়ে সে ফিরে তাকালো, অন্তিমবারের মতন। দেখলো বন্ধুকে, সহপাঠীকে এবং....
না পাওয়া প্রেমকে।
বুকটা ভারী হয়ে এলো প্রচন্ড। দৃষ্টি ঝাপসা হতে লাগলো। দোহা তাই নাক টেনে দ্রুত উচ্চারণ করলো,
- ভালো থাকিস। গুডবাই।
হাসার চেষ্টা করলো দোহা খানিক। অনিককে দেখলো, রাজীবকে দেখলো, জিই - শুকে দেখলো, জারাকে দেখলো। আমারার ছোট গোলগাল চেহারায় দৃষ্টি পড়তেই ভাংচুর হয়ে অন্তর ধুলিস্যাৎ হয়ে গেলো তার।
“ ভালোবাসি......”
উচ্চারিত হওয়ার বদলে উচ্চারিত হলো,
- গুডবাই প্রিন্সেস।
ওই প্রিয় মুখে যাতনার ছাপ দেখার ভয়ে সঙ্গে সঙ্গে উল্টো ঘুরে গেলো দোহা। গেট পেরিয়ে সড়কের ধার ধরে এগোতে শুরু করলো গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। কিছুদূরের স্টপ থেকে বাস ধরবে, তারপর বাসায় যাবে। নিজের বাবার বাধ্য ছেলে হবে, গুন্ডা ছেলে নয়। সমর্পণ করবে নিজেকে, ভাগ্যের দুয়ারে। এই তার সিদ্ধান্ত।
এই পরাজিত সৈনিক আমারার যোগ্য নয়....
হেঁটে যেতে যেতে একটাবারও আর পিছন ফিরে তাকালোনা দোহা। জ্যাকেটের হাতায় চোখের অশ্রু মুছে নিলো।
সেন্ট পিটার্সবার্গের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছেলেমেয়েগুলো একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো তার ক্রমশ ম্রিয়মাণ হয়ে যেতে থাকা অবয়বের দিকে। দোহা কারো বন্ধু, কারো বা শত্রু, কারো বা... প্রেম। যাই হোক না কেনো, ছেলেটার অস্তিত্বের সহজাত প্রভাব আর কেউ কোনোদিনও ভুলতে পারবেনা। যেমন তার ছোঁয়া, তার হাসি, তার ক্রুব্ধ দৃষ্টি কিংবা তার চঞ্চল প্রফুল্লতা কখনো ভুলতে পারবেনা সেন্ট পিটার্সবার্গের সাধারণ এক দেয়াল অবধি।
বরফের মতন নিথর হয়ে তাকিয়ে রইলো আমারা। দৃষ্টিজুড়ে টলটলে পানিতে ঝাপসা হয়ে এলো দোহার অবয়ব। চলে যাচ্ছে, বহুদূরে। মুখে হয়ত বলেনি, কিন্তু আমারা জানে, দোহা আসবেনা।
দোহা আর কখনো তার সামনে অধিকারের দাবী নিয়ে দাঁড়াবে না।
দোহা তাকে..... ভালোবাসবে না।
—চলবে—