#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা২৬
পর্ব ২৬: [ বছর পেরিয়ে....] - ( প্রথমাংশ )
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
সাল ২০১৪।
অক্টোবর মাস।
অর্কেস্ট্রার মৃদু ধ্বনিতে গোটা হল পরিপূর্ণ। মৃদু হাসি এবং গ্লাসের টুংটাং আলোড়ন। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে অভিজাত সুগন্ধীর সুবাস। ফ্লোরে বেশ কতক কপোত কপোতী অর্কেস্ট্রার সুরে সুরে হালকা তালে নাচতে ব্যাস্ত। পরিবেশটি আরামদায়ক। উপস্থিতমাত্র এর আভিজাত্য টের পাবে।
একপাশে নিজের বাবা মায়ের সাথে দাঁড়িয়ে আছে আমারা। খয়েরী বর্ণের ঢোলা গাউন তার পরিধানে, যার বুকজুড়ে সিলভার জরির কাজ। লম্বা খোলা চুল পিঠের নিচ অবধি ঠেকেছে। আশেপাশের কার্যক্রমে তার বিন্দুমাত্র মনোযোগ নেই। মীর চৌধুরী এবং আশফিকা চৌধুরী আহমাদ গ্রুপের কর্ণধার রাহিম আহমাদ এবং মণিকা আহমাদের সঙ্গে কথা বলছেন। তাদের পাশে বাধ্য ছেলেটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সৌরভ আহমাদ। উভয় ছেলেমেয়ে আনমনে শুনে চলেছে নিজেদের পিতামাতার বক্তব্য।
মীর মৃদু হেসে নিজের হাতের ড্রিঙ্কসের গ্লাসে চুমুক দিয়ে রাহিমের দিকে তাকিয়ে বললেন,
- ঠিকই বলেছেন মিস্টার আহমাদ, বাচ্চারা চোখের সামনে ধীরে ধীরে বড় হয়ে গিয়েছে।
- রাইট? এইতো সৌরভের নাইনটিন্থ বার্থডেতে ওকে ইতালি নিয়ে গেলাম শুধুমাত্র লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আর্টওয়ার্ক দেখার জন্য।
রাহিম হাসতে হাসতে জানালেন। মীর মাথা নেড়ে বললেন,
- হুম, আমিও শুনেছি ওর আর্ট সিঙ্গাপুর এক্সিবিশনে প্রেজেন্ট হয়েছে। ব্যস্ততার কারণে জয়েন করা হয়নি কিন্তু অনেক প্রশংসা কানে এসেছে। গুড সৌরভ, কিপ ইট আপ।
- ওহ, ধন্যবাদ আংকেল।
সৌরভ লাজমাখা হাসিতে জানালো। পাশ থেকে সৌরভের মা মণিকা আহমাদ ছেলের কাঁধ ঝাঁকিয়ে দিয়ে বললেন,
- তা আমারা, তোমার কি খবর? ভার্সিটি জয়েন করেছ?
আমারা এতক্ষণে নিজের নামের সম্বোধন শুনে ফিরে তাকালো। তারপর শান্ত কন্ঠে জানালো,
- জ্বি আন্টি, এখনো জয়েন করিনি তবে আমি মিউজিক নিয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করার কথা ভাবছি।
- মিউজিক?
চোখ কপালে তুললেন মণিকা।
- এতকিছু থাকতে মিউজিক কেনো?
মৃদু হেসে আমারা ব্যক্ত করলো,
- ইটস মাই প্যাশন। যেমনটা সৌরভ আঁকতে পছন্দ করে তেমন আমি লিখতে এবং কম্পোজ করতে পছন্দ করি।
- ওসব মিউজিকের কোনো ভবিষ্যত আছে? নাম তো গায়ক গায়িকাদের হয়, যারা গান লেখে তাদের না।
আমারা প্রশান্ত দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো, মৃদু হাসলো শুধু, কোনো জবাব দিলোনা। তার পাশে দাঁড়ানো মীর পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুতই মেয়ের কাঁধে হাত জড়িয়ে হাসিমাখা কন্ঠে জানালেন,
- সে মেয়েদের একটু আধটু শখ থাকা উচিত বৈকি, তাইনা মিসেস আহমাদ? বিয়ের পর বিজনেস আর ব্যস্ততার মাঝে সময় অতিবাহনের জন্য কোনো শখ চর্চার প্রয়োজন আছে।
- বিয়ে, রাইট!
রাহিম হঠাৎ নিজের গ্লাস তুলে মীরের দিকে তাকিয়ে বললেন,
- আমি আপনার প্রোপোজাল কনসিডার করেছি মিস্টার চৌধুরী। সত্যি বলতে আহমাদ এবং চৌধুরী পরিবারের মেলবন্ধনের আইডিয়াটা কিন্তু দারুণ!
জমে গেলো আমারা। ঝট করে ফিরে তাকালো মীরের মুখপানে। কিসের মেলবন্ধন? আশফিকার প্রতিক্রিয়াও একই, অর্থাৎ তিনিও এই বিষয়ে কিছুই জানেন না। মীর অবশ্য স্ত্রী কিংবা কন্যা কারোর দৃষ্টিতেই ভ্রুক্ষেপ করলেন না। বিস্তর হেসে রাহিমের দৃষ্টি মোকাবেলা করলেন,
- আই নো রাইট? দুটো পরিবার একসাথে হলে ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যে আমাদের আধিপত্য দমানোর সাধ্য কার? তাছাড়া আমাদের ছেলেমেয়েরাও বড় হচ্ছে, ইটস হাই টাইম দে ফাইন্ড দেয়ার পার্টনার।
আমারার হাত মুষ্টিবদ্ধ হলো শক্তভাবে। দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো ভিন্নদিকে, মুখ থমথমে হয়ে উঠলো। আশফিকা মৃদু হাসি নিয়েই একপাশ থেকে মীরকে টেনে নামিয়ে ফিসফিস করলেন,
- এসব কি বলছো তুমি মীর?
- জাস্ট শাট আপ অ্যান্ড লেট মি টক!
তিনি পুনরায় রাহিম আহমাদের দিকে চেয়ে হাসলেন।
- সৌরভ এবং আমারাকে একসঙ্গে দারুণ মানাবে!
গুরুজনেরা সবাই গুঞ্জন তুলে হাসলো। মণিকা হাত বাড়িয়ে সৌরভকে কাছে টেনে বললেন,
- আপনার প্রস্তাব অতীব লোভনীয়। সত্যিই আমরাও খুবই খুশি হতাম চৌধুরী পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক করতে পেরে। তবে....ইউ নো?
তার অপরিণত বাক্য সমাপ্ত করলেন রাহিম, ছেলের পিঠ চাপড়ে দিয়ে হাসতে হাসতে জানালেন,
- লুক অ্যাট মাই সনস সাইজ! আই মিন... নো অফেন্স বাট আমারা এবং সৌরভকে পাশাপাশি একটু অদ্ভুতই লাগবে, তাইনা? হাহাহা....
মীরের অধর থেকে হাসি এক মুহূর্তের জন্য উধাও হয়ে গেলো। বাক্যটি পরিষ্কার করার প্রয়োজন নেই। কমপ্লিট রিজেকশন স্পষ্ট। যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপার বিষয়টি সম্পূর্ণই আমারার শারীরিক গঠনের জন্য। উপলব্ধিটি অত্যন্ত কষ্টদায়ক। মণিকা সেই অভিজাত খোলসের ফাঁপা আবেদনময়ী হাসি বিস্তৃত রেখেই বললেন,
- মেডিকেল কন্ডিশনেরও ব্যাপার আছে। অবশ্যই কোনো পরিবারই চাইবেনা তাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম কোনো কন্ডিশনে পড়ুক বা অস্বাভাবিক হোক। ইউ নো হোয়াট আই মিন, রাইট? আমারা ইয আ সুইট গার্ল, আমি শিওর ও ওর পারফেক্ট কাউকে ঠিকই একদিন খুঁজে পাবে।
- জ্বি জ্বি অবশ্যই।
মীর চৌধুরী অধরে জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে সম্মতি জানালেন। আমারা টেবিলের উপরের ট্রে থেকে জুসের গ্লাস তুলে নিয়ে চুমুক দিয়ে ফিরে তাকালো সৌরভের বাবা - মার উদ্দেশ্যে। তীর্যক হাসি নিয়ে বললো,
- জ্বি আন্টি, আপনার চিন্তাকে স্যালুট জানাই, এবং আংকেল আপনাকেও। আপনারা খুবই ভালো বাবা - মা, চমৎকারভাবে সন্তানের জন্য চিন্তা করেন।
রাহিম এবং মণিকা উভয়েই থমকে গেলেন। হাস্যোজ্জ্বল আমারার গোলগাল মুখের দিকে চেয়ে রইলেন।
- কিন্তু আফসোস, আমার বাবাই শুধু ব্যবসা বৃদ্ধির দিকটাই দেখল। তার বোঝার দরকার ছিলো, তার মেয়ে মোটা, সমাজের মাপকাঠিতে ভীষণই বেমানান। এইযে সৌরভের মতন একজন হ্যান্ডসাম কিন্তু মেরুদণ্ডহীন ছেলের পাশে তাকে দেখাবে বৃহদাকার। ইউ নো? বিয়ের ভালো ভালো ফটো আসবেনা। সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো যাবেনা আমার বউ কত রূপবতী! বাড়ির বউকে সৌন্দর্যের বিচারের বাজারে তোলা যাবেনা! লোকমুখে ছিঃ ছিঃ পরে যাবে! ভীষণ অসম্মানের ব্যাপার হবে সেটা।
ক্রোধে ফুঁসে উঠলেন রাহিম এবং মণিকা। পাশ থেকে মীরের হাত চেপে বসলো আমারার কোমরে। তবে সে বেপরোয়া, মাথা কাত করে সামান্য একটু হাসলো শুধু।
- ওহ, এক্সকিউজ মি, আমাদের আসলে একটু অন্যদের সাথেও কথা বলা উচিত। সময়ের জন্য ধন্যবাদ মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আহমাদ।
মীর দ্রুতকন্ঠে উচ্চারণ করে একপ্রকার তাড়াহুড়ো করেই আমারাকে সরিয়ে নিলেন একপাশে। ভ্রু কুঁচকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
- হোয়াট দ্যা হেল ইউ ওয়্যার স্পিকিং দেয়ার?
- দ্যা ট্রুথ?
আমারার সোজাসাপ্টা জবাবে তেঁতে উঠলেন মীর,
- তুমি ওনাদেরকে অপমান করেছ।
- হুম, আর ওনারা তোমাকে সম্মান দিয়েছে।
- আমারা, তোমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে।
- রাইট, যতক্ষণ না তুমি আমাকে না জানিয়ে না শুনিয়ে হুট করে কারো সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব আদান - প্রদান শুরু করে দিলে।
মীরের দৃষ্টিতে ভীষণ এক ক্ষোভ ভাসলো,তবে তিনি কিছুই বলতে পারলেন না। আশফিকার দুই হাতের শক্ত বাঁধনে আবদ্ধ হয়ে গেলো তার বাহু। তারপরই গম্ভীর শীতল কন্ঠস্বর,
- মীর, প্লীজ ফলো মি।
প্রতিবাদের কোনো সুযোগ না দিয়ে মীরকে একপ্রকার টেনে নিয়েই আশফিকা হলের দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। দম্পতি আড়াল হয়ে যেতেই আমারা চুপচাপ কাউকে কিছু না বলে উল্টো ঘুরে হাঁটতে আরম্ভ করলো। উদ্দেশ্য হলের উপরের টেরেস।
- আমারা...!
পিছনের ডাকটি কানে যেতেই সে থামলো, ঘুরে তাকিয়ে দেখলো সৌরভকে। ছেলেটি হালকা দৌঁড়ে এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে নরম সুরে বললো,
- আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি। বিশ্বাস করো, আমি কিছুই জানতাম না। মাত্রই জানলাম। আর আমার বাবা - মা যেভাবে কথাগুলো বলেছে সেভাবে বলা একদমই উচিত হয়নি। প্লীজ, ডোন্ট মাইন্ড।
আমারা স্থির চেয়ে থাকলো সৌরভের মুখপানে। তারপর মাথা নেড়ে জানালো,
- আমি কিছু মনে করিনি সৌরভ। বাট নেক্সট টাইম.... স্পিক ইন ফ্রন্ট অব ইওর প্যারেন্টস, ডোন্ট অ্যাপোলোযাইয লাইক আ কাওয়ার্ড! মেরুদন্ড নিজেকে গড়তে হয়, বাজারে কিনতে পাওয়া যায়না।
এটুকুই। উল্টো ঘুরে গেলো আমারা, আড়াল হয়ে হয়ে সিঁড়ির গোঁড়ায়। সৌরভ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে চেয়ে রইলো তার চলে যাওয়ার পথের দিকে।
。
。
。
অক্টোবর মাসের হাওয়া শীতল। টেরেসে পা রাখতেই তাই শিউরে উঠলো আমারা। তার উভয় পা টনটন করছে। হিলজোড়া খুলে এক কোণায় রেখে দিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলো সে রেলিংয়ের দিকে। পায়ের তালুতে ঠান্ডা মেঝের স্পর্শে শিরশির করে উঠলো শিরদাঁড়া। পরোয়া করলোনা। রেলিংয়ে হাত রেখে অসীম আকাশে উদিত এক টুকরো চাঁদের উদ্দেশ্যে চেয়ে রইলো। মাথা ঝাঁকালো। মসৃণ চুলরাশি তার ছড়িয়ে পড়লো চারপাশে। হাওয়ার দোলায় উড়তে লাগলো। চোখ বুঁজে প্রাকৃতিক আবেদনটুকু গ্রহণ করে গেলো কিশোরী....উহু। আঠারোতে পদার্পণ করা অষ্টাদশী।
- র*ক্তপাত ছাড়াই মা*র্ডার করা কেউ তোর থেকে শিখুক!
ঈষৎ কর্কশ এবং ভাবগম্ভীর কণ্ঠটি কানে যেতেই আমারা আপনমনে হাসলো। ফিরে তাকানোর প্রয়োজন নেই। সে জানে কে এসেছে। পায়ে পায়ে তার পাশে এসে থামলো অস্তিত্বটি। তার লম্বাটে ছায়া প্রতিফলিত হলো মেঝেতে। চাপা বর্ণের ত্বক চিকচিক করে উঠলো চাঁদের আভায়। মাথা ঘুরিয়ে মায়াবী দৃশ্যটি প্রাণভরে দেখলো আমারা। অঙ্গে জড়ানো স্কিনি ব্ল্যাক টপ এবং গাবার্ডিন প্যান্ট। গলায় পার্লের চোকার। কাঁধসমান চুল, ঠোঁটে হালকা খয়েরী লিপস্টিক। টানা আঁখিজোড়ার মাঝে আইলাইনার টানা। যেন ফ্যাশন ম্যাগাজিন থেকে বেরিয়ে আসা কোনো ডার্ক স্কিন্ড মডেল।
- তোকে আজকে সত্যিই ব্ল্যাক প্যান্থারের মতন দেখাচ্ছে।
বিস্তৃত হাসলো জারা, রেলিংয়ে ঝুঁকে বললো,
- আর তোকে লাগছে বি*ষদাঁতওয়ালা নাগিন!
- আহ্, তোর এসব ইউনিক ইউনিক সম্বোধন যে কবে বদলাবে!
- হাহাহা, সিরিয়াসলি গার্ল! আমি শুধু দূর থেকে দেখছিলাম, তুই যখন ওদের কথার জবাব দিলি, মনে হলো যেন তোর পিছনে সাত মাথাওয়ালা ইচ্ছাধারী নাগিনকে ফনা তুলে থাকতে দেখলাম! ভালোই করেছিস, নাহলে জুসের বোতলটা আজকে আহমাদ টাকলুর মাথায় ভা*ঙতাম আমি!
সশব্দে হেসে উঠলো আমারা। মুখে হাত চাপা দিয়ে হাসতে হাসতে বললো,
- তোকে এসব অনিক শেখাচ্ছে তাইনা?
- ওটা তো একটা ডাস্টবিন। ওটা আবার শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা রাখে নাকি? নিজেই যক্ষ্মার রোগীর মতন ধুঁকছে। তুই উল্টোটা বলতে পারিস। ওই ডাস্টবিন ব্যাটা আমাকে দেখে শিখছে।
- গুড ইভনিং মা ’ লেডিস!
জারা ক্ষণিকের জন্য জমে গেলো নিজের জায়গায়। ঠিক পাশ থেকেই অতর্কিতে উঁকি দিলো অনিকের মুখ। বিস্তৃত হাসি ঠোঁটে, ঝরঝরে দাঁতের ঝলক। দুহাতে মোট তিনটি গ্লাস। জারা এক ঝটকায় পিছনে সরে গেলো। অনিক বাঁকা হেসে জিজ্ঞেস করলো,
- আমি জানি আমি লেডিসদের মাঝে হট টপিক। তাই বলে এভাবে আলোচনা করতে হবে? মেয়েসুলভ লজ্জা তো একটু থাকা উচিত বল?
- তুই মেয়ে! তোর বন্ধুরা মেয়ে! তোর আঠারো গুষ্টি মেয়ে!
জারার আক্রোশের বিপরীতে খিলখিল করে হাসলো অনিক। সে জানে, জারাকে রাগানোর সবথেকে কার্যকরী উপায় তাকে মেয়ে বলে সম্বোধন করা।
- ওকে ওকে, নো ঝগড়াঝাঁটি ফর টুডে। নে, জুস খেয়ে ঠান্ডা মাথা বরফে জমিয়ে নে।
অনিক একই রকম দেখতে দুটো আমের জুসের গ্লাস আমারা এবং জারাকে দিলো। আমারা নিঃশব্দে নিজের গ্লাসে চুমুক দিলেও জারা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অনিকের হাতে ধরা স্বর্ণালী তরলপূর্ণ গ্লাসের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর অতর্কিতে খেঁকিয়ে উঠলো,
- ওটা কিসের জুস শালা?
অনিক ক্ষণিকের জন্য জমে গেলো, একটি শক্ত ঢোক গিলে দৃষ্টি এড়িয়ে তোতলাতে তোতলাতে বললো,
- ইয়ে মানে... সুইট পাম্পকিন...
- দে তো টেস্ট করে দেখি।
অনিক সহসাই গ্লাসটি সরিয়ে নিলো, যা বোঝার বুঝে গেলো জারা। একপ্রকার হুংকার দিয়ে উঠলো,
- আমাকে জুস আর হুইস্কির পার্থক্য শেখাস রামছাগল?
- কাম অন! আই অ্যাম অলরেডি নাইন্টিন!
আমারা সানন্দে নিজের জুস পান করতে করতে অনিককে জানালো,
- যদি মাথায় হুইস্কির বোতল ভা*ঙার ইচ্ছা না থাকে তাহলে গ্লাসটা গচ্চা দিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে পারিস, এখনো গুণে গুণে পাঁচ সেকেন্ড সময় আছে।
- ফাইন ফাইন!
একটি নিঃশ্বাস ফেলে মাথা ঝাঁকিয়ে গ্লাসের হুইস্কিটুকু টেরেসের টবে ফেলে দিয়ে আনমনে ঠোঁট ফুলিয়ে ফুলের চারাগাছকে উদ্দেশ্য করে অনিক বললো,
- হ্যাঁ ভাই, তুই খা, খেয়ে একটু দেলুলু হ। আমার কপাল থেকে এই সুখ ঝামা দিয়ে ঘষে তুলে ফেলেছে ওই কালোজিরার বাচ্চা কালোজিরা!
সন্তুষ্ট হয়ে আনমনে বিজয়ীর হাসি হাসলো জারা। আমারা বান্ধবীর প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে সন্তুষ্ট হলো। বছরের পরিক্রমায় জারার মাঝে একটুখানি পরিবর্তন এসেছে। সে আর আগের মতন সবসময় নিজেকে গুটিয়ে রাখেনা। অন্তত, বন্ধুদের সামনে নয়। অদ্ভুত হলেও সত্য সময়ের পরিক্রমায় অনিকের দল এবং তারা উভয়ে কিভাবে যেন অদৃশ্য এক বন্ধুত্বের বাঁধনে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। হয়ত নিজেদের জীবনের খারাপ সময়টা একসঙ্গে মোকাবেলা করেছে তাই? কে জানে! কি দরকার উত্তরের? এইতো বেশ চলছে।
অনিক উঠে এলো। তাদের পাশে দাঁড়ালো। আমারাই প্রথম নীরবতা ভেদ করে শুধালো,
- তোর ক্যানাডা যাওয়ার বিষয়টা তাহলে কনফার্ম?
অনিকের উজ্জ্বল মুখে সামান্য মলিনতার ছাপ পড়লো। মাথা দুলিয়ে সে সায় জানালো,
- হ্যাঁ, টরেন্টোতে সবকিছু ফাইনাল করা হয়ে গিয়েছে। নভেম্বরের শুরুর দিকে ফ্লাইট। ড্যাড চায়, গ্র্যাজুয়েশন ওখান থেকেই করে আসি।
- হুম, ভালো সিদ্ধান্ত।
আমারা এবং অনিকের কথোপকথনের মাঝে জারা কিছুই বললোনা। নিঃশব্দে নিজের আধ খাওয়া জুসের গ্লাসটা রেলিংয়ে রাখলো। দৃষ্টি তার সুদূরে, চাঁদের ফালির দিকে। পাশ থেকে অনিক হাত বাড়িয়ে নীরবে তার গ্লাসটি তুলে নিয়ে ঠোঁটে ছোঁয়ালো, অতি সাধারণভাবে। লম্বা একটা চুমুক দিলো ঠিক যেখানটায় জারা কিছুক্ষণ আগে চুমুক দিয়েছিল। দৃশ্যটি নজরে আসতেই জারার চাপা ত্বকে অদ্ভুতুড়ে এক লালচে আভার উৎপত্তি ঘটলো, দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে নিজের দূর্বার হৃদস্পন্দনকে দমালো সে। আপনমনে হাসলো অনিক।
আমারা তাদের নীরব আবেদনটুকু খেয়াল করলো ঠিকই, তবে মন্তব্য না করে তাদের সময় দিতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে জানালো,
- আমি নিচে ফিরে যাচ্ছি, হয়ত মামণি খুঁজছে। তোরা আয়, একটা দারুণ ড্যান্স না করে বাসায় ফিরে গেলে আজকের দিনটাই বৃথা।
কেউ কোনো প্রতিবাদ করার আগেই আমারা নিজের হিলজোড়া পায়ে গলিয়ে আড়াল হয়ে গেলো অদূরে। জারা নিজের বান্ধবীর পথপানে চেয়ে ক্ষীণ কন্ঠে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো,
- দোহার কোনো খবর আছে?
অনিক থমকে গেলো। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে জানালো,
- নাহ্।
- কোনো পাবলিকে চান্স পায়নি?
- নাহ্।
একই জবাব অনিকের। জারা একটি নিঃশ্বাস ফেললো। তারপর হঠাৎই দুহাতে রেলিং চেপে ধরে বললো,
- এইযে তুই ক্যানাডা চলে যাচ্ছিস, তোর সাথে দেখা করতে আসবেনা?
অনিক কাঁধ ঝাঁকালো, এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালো,
- মেসেজ করেছিলাম, দুইদিন আগে। জবাব দেয়নি এখনো।
পরিহাসের হাসি ফুটলো জারার অধরে।
- ছেলেটা নিজের কথা রেখেছে। সত্যিই হারিয়ে গিয়েছে।
দমকা এক শীতল হাওয়া বয়ে গেলো। শিউরে উঠলো জারা। তৎক্ষণাৎ অনিক নিজের কোটের বোতাম খুলে তার কাঁধে ছড়িয়ে দিলো। স্তব্ধ যুবতীকে সামান্য একটু কাছে টেনে কোমরে অতি আলতোভাবে দুহাত স্পর্শ করে গভীর দৃষ্টিতে তাকালো।
- জারা.....
প্রথমবারের মতন “কালোজিরা ” সম্বোধনের বদলে নিজের আসল নামটি অনিকের কন্ঠে শুনে বিস্ময়ের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেলো জারা। অনিক হাত বাড়িয়ে দিলো, তার কপালে ছড়িয়ে পরা চুলের গোছা কানের পিছনে সযত্নে গুঁজে দিয়ে কোমল এক মায়াবী কন্ঠে আবেদন করলো,
- নভেম্বরের তিন তারিখ আমার ফ্লাইট। এক তারিখ আমার সাথে দেখা করিস। শুধু তুই আর আমি....প্লীজ! আমার তোকে কিছু বলার আছে!
জারা কোনো জবাব দিতে পারলোনা। সম্মোহিত নয়নে চেয়ে রইলো অনিকের মুখপানে। চাঁদের আলো প্রতিফলিত হয়ে অনন্য দেখাচ্ছে যা।
━━━━━━━━━━━
মীর এবং আশফিকা ফাঁকা বারান্দার পাশে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। ক্রোধে ফুঁসছেন আশফিকা, অপরদিকে মীরকে দেখাচ্ছে ভীষণ রকম শীতল।
- তুমি পাগল হয়ে গিয়েছ মীর? মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে? তুমি কিভাবে একবারও আমার সঙ্গে আলোচনা না করে, আমারার সঙ্গে কথা না বলে সৌরভের পরিবারকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারো?
মীর জবাব দিলেন না। আশফিকা তাতে তেঁতে উঠলেন।
- কি সমস্যা তোমার মীর? আমারা এখনো ছোট, ওর পড়াশোনা বাকি, ক্যারিয়ার গড়া বাকি তুমি এখনি...
- বিয়ে না এঙ্গেজমেন্ট। অভিজাত পরিবারের মাঝে এমনি হয়ে থাকে তুমি খুব ভালো করে জানো আশফিকা। আমি আমাদের মেয়ের ভালোর কথাই চিন্তা করছি। বয়স আরো বাড়ার সাথে সাথে সমস্যাও বাড়বে, ইউ নো ওয়েল। তাছাড়া এঙ্গেজড হয়ে থাকতে কোনো সমস্যা হবার কথা নয়। আমার - তোমার এমনি হয়েছিল ইন কেইস ইউ ফরগট!
- সময় বদলেছে মীর।
ঠান্ডা কন্ঠে বললেন আশফিকা।
- তাছাড়া যে ভুল আমি করেছি সেটা আমি আমার মেয়ের সঙ্গে হতে দেবোনা।
- ভুল!
মীরের চেহারায় ক্রোধ ফুটে উঠলো। আশফিকা নির্ভীক অনুভবে মাথা দোলালেন।
- হ্যাঁ ভুল। মীর, তুমি নিজের মেয়ের ভালো চাওনা। তুমি আহমাদ পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তা চাও। তাদের বিজনেস রুটের ফ্রি রাইট চাও! তাদের ইনভেস্টমেন্ট চাও! নিজের বিজনেস এম্পায়ারকে একমাত্র শক্তিতে পরিণত করতে চাও! আমারা ইয নট ইওর ডটার, জাস্ট আ টুল টু অ্যাচিভ সাকসেস!
- হাউ ডেয়ার ইউ কোয়েশ্চেন মাই ডিসিশন!?
প্রচন্ড আক্রোশে কিছু বুঝে ওঠার আগেই মীরের হাত সশব্দে আছড়ে পড়ল আশফিকার গালে।
ঠাস!
সম্পূর্ণ জমে গেলেন আশফিকা। টলটলে দৃষ্টিতে তাকালেন মীরের দিকে। অবিশ্বাস ভাসলো তার নয়নে। ফিসফিস করে কাঁপা কন্ঠে তিনি বললেন,
- ডিড ইউ জাস্ট.... হিট মি?
- ইয়েস আই ডিড!
গর্জে উঠলেন মীর।
- তুমি আর তোমার মেয়ে, আমার জীবনের সবথেকে বড় অভিশাপ আশফিকা! তোমরা শুধু নিজেদেরকে মহান মনে করো। আমার মান - সম্মান, চৌধুরী পরিবারের ইমেজ হাটে বাজারে বেঁচে আসো তোমরা! তোমাদের জন্য সমাজে দিনদিন আমার মুখ ছোট হয়ে যাচ্ছে। তোমাদের এই অতি শিক্ষিত, অতি জ্ঞানী স্বভাবের কারণে। স্টপ দিস অলরেডী!
দাঁতে দাঁত ঘষে আশফিকা ব্যক্ত করলেন,
- মীর, তুমি আমাকে যা বলার বলো কিন্তু আমার মেয়েকে নিয়ে আমি তোমার মুখ থেকে একটাও কথা শুনবো না!
- আমার মেয়ে ও, ওকে নিয়ে যা ইচ্ছা হয় আমি বলবো, যা ইচ্ছা আমি করবো তাতে তোমার কি? ওকে ব্যবহার করছি স্বার্থ হাসিলের জন্য? বেশ করেছি! কি ছিঁড়বে তুমি আমার? চৌধুরী নামটা ছাড়া কিসের দেমাগ তোমার?
- হাহা, রাইট। তোমার মতন একটা মেয়েবাজ কাপুরুষের মুখে এসবই মানায়!
- আশফিকা!!!
দ্বিতীয় দফায় হাত তুললেন মীর। শক্তভাবে চোখ বুঁজে নিলেন আশফিকা। তবে এবার কোনো আঘাত টের পেলেন না। ঝট করে চোখ খুলে গেলো তার। স্তব্ধ হয়ে লক্ষ্য করলেন দৃশ্যটি।
মীরের হাত চেপে ধরে রেখেছেন.... জাইন! দীর্ঘদেহী বান্দার পরনে সাদা শার্ট এবং কালো সোনালী ক্রপস্যুট। চশমাটা চোখে নেই, কলারের সঙ্গে ঝুলছে। অত্যন্ত শান্ত মুখে স্থির তাকিয়ে আছেন। তবে মীরের ধরে রাখা হাতটি কাঁপছে প্রচন্ড শক্তিতে।
- ইউ...!
তীর্যক হাসলেন জাইন, তারপর জোরালো ঝটকায় মীরের হাতটি সরিয়ে দিলেন। কট করে উঠলো কিছু একটা, মীর কনুই চেপে ধরলেন, র*গে টান লেগেছে। জাইন দুহাত ফরমাল প্যান্টের পকেটে পুরে আশফিকাকে আড়াল করে তার মুখোমুখি দাঁড়ালেন। সুদর্শন মুখে ভেসে উঠলো এক বিস্তৃত তীর্যক হাসির ধারা। সহ্য করতে না পেরে মীর খেঁকিয়ে উঠলেন,
- লজ্জা করেনা একজন পুরুষ এবং নারীর কথোপকথনের মাঝে এসে দাঁড়াতে?
জাইনের হাসি বিস্তৃত হলো, বিপদজনক ভঙ্গিতে ঝুঁকে এলেন তিনি,
- নারীর শরীরে হাত তোলা কোনো কীটকে আমি পুরুষ মনে করিনা!
ধাম!
সঙ্গে সঙ্গে সজোরে জাইনের তীব্র মুষ্টিবদ্ধ হাত আ*ছড়ে পড়ল মীরের মুখ বরাবর। ছিটকে গিয়ে দেয়ালে ধাক্কা খেলেন তিনি। চেপে ধরলেন নিজের নাক। আশফিকা হতবাক হয়ে দৃশ্যপটে তাকিয়ে রইলেন।
#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা২৬
পর্ব ২৬: [ ৫৫৬ তম দিন ]- ( শেষাংশ )
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
নৈঃশব্দ্য।
সিঁড়ির ধাপের উপর একদম স্থির বসে আছেন আশফিকা। মুখ থমথমে, একপাশের গাল লালচে দাগে ছেয়ে গিয়েছে। শূন্য এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন অজানার উদ্দেশ্যে। কিছুক্ষণ বাদেই নিজের পাশে অপর একটি ভিন্ন উপস্থিতি টের পেলেন তিনি। তবে মাথা হেলিয়ে তাকালেন না। তার উদ্দেশ্যে একটি ঠান্ডা পানির বোতল বাড়িয়ে দিলো কেউ। আশফিকা সামান্য একটু নড়ে পাশে তাকালেন, দেখলেন জাইনকে। চশমার আড়াল থেকে প্রশান্ত নয়নে তাকিয়ে আছে বান্দা। ঈষৎ ইতস্ততা দূর করে বোতলটি নিলেন আশফিকা, চুমুক দিলেন। কণ্ঠতালু বেয়ে প্রশান্তিকর আবাহন খেলে গেলো যেন। ঠান্ডা হলেন বেশ খানিকটা। বোতলটা নামিয়ে তিনি নিজের অপর পাশে রাখলেন। পরিধানের গাউনের বিস্তৃত অংশ নেমে গিয়েছে সিঁড়ির কয়েক ধাপ অবধি, সেই উদ্দেশ্যে চেয়ে তিনি মৃদু কন্ঠে জানালেন,
- আপনার মীরকে আঘাত করাটা উচিত হয়নি মিস্টার আমিন, জেডকো গ্রুপের সঙ্গে চৌধুরী গ্রুপের পার্টনারশিপ এখানেই শেষ। কেউ ঠিক করতে পারবেনা, আমিও না।
কিঞ্চিৎ হাসলেন জাইন। মধ্যমায় চশমার ফ্রেমটি চোখে টেনে তুলে প্রশ্ন করলেন,
- মিসেস চৌধুরী, ইউ রিয়েলি থিঙ্ক আই গিভ আ ড্যাম অ্যাবাউট বিজনেস?
আনমনে একটি ঢোক গিলে অজান্তেই পাশ ফিরে চাইলেন আশফিকা। জাইন তার দিকে চেয়ে আছেন, নিষ্পলক।
- ব্যবসা, প্রতিপত্তি, অর্থ - সম্পদের তুলনায় বড় নিজের আদর্শ, নিজের মনুষ্যত্ব। সম্পদ গেলে আবার অর্জন করার সুযোগ আছে। মনুষ্যত্ব আর আদর্শ বিকিয়ে ব্যবসা করতে নামিনি আমি।
আশফিকা একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন, একবারের জন্যও নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারলেন না মানুষটির উপর থেকে। জাইন চশমা খুলে নিয়ে নিজের রুমালে মুছে নিতে নিতে বললেন,
- জীবনে অনেক ঠেকে যে শিক্ষা অর্জন করেছি একটা দুটো পার্টনারশিপের বিনিময়ে সেই শিক্ষা বর্জন করলে আমার বিবেকের কাছেই আমার মুখ থাকবেনা। আই ডোন্ট কেয়ার অ্যাবাউট পাওয়ার, আই কেয়ার অ্যাবাউট পিপল....মাই ওউন পিপল!
আশফিকা থমকালেন। চিনচিনে কিছু একটা ছড়িয়ে পড়লো তার বুকজুড়ে। যন্ত্রণা নাকি অনুভূতি? বোধগম্য হলোনা।
- আপনার এই প্রতিবাদী সত্তাই না একদিন আপনার কাল হয়ে দাঁড়ায়....
মিনমিন করে আশফিকা উচ্চারণ করতেই অতর্কিতে একটি ঘটনা ঘটলো। জাইন নিজের হাত বাড়িয়ে সহসাই তার বাহু চেপে ধরে খানিক জোরালো টানেই নিজের দিকে ফেরালেন, শক্ত কন্ঠে উচ্চারণ করলেন,
- আপনার সমস্যাটা কোথায় জানেন মিসেস চৌধুরী? আপনি ভীতু। আপনি ভাবেন “চৌধুরী ” নামটা ছাড়া আপনি কিছুই না। অথচ আপনি কখনো এটা দেখার চেষ্টাই করলেন না, চৌধুরী বাদেও আপনার নিজস্ব একটি পরিচয় আছে। মার্কেটে চৌধুরী কোম্পানির উন্নতির কারণ শুধু মীর চৌধুরীর নাম নয়। যে কাউকে জিজ্ঞেস করুন চৌধুরীদের ব্যাপারে, সবার আগে তারা নাম নেবে মাস্টারমাইন্ড আশফিকা চৌধুরীর!
স্তব্ধ হয়ে চেয়ে থাকলেন আশফিকা। জীবনে কেউ তাকে কখনো এমন করে বলেনি। দিনের পর দিন, বছরের পর বছরের আত্মত্যাগ, পরিশ্রমের পর নিজের সফলতার কারণ মনে হতো শুধুমাত্র চৌধুরী নামটার সংশ্লিষ্টতা। নিজের করে কিছু করার চিন্তা কখনো আশফিকা মাথায়ই আনেননি। মীর অত্যন্ত সুচারুভাবে তার মস্তিষ্কে এই চৌধুরী নামক বিষবৃক্ষ পুঁতে দিয়েছিলেন, যার শিকড়ের টান থেকে তিনি আজ অবধি মুক্ত হতে পারেননি।
জাইন অতর্কিতে খানিক বিব্রত হয়ে আশফিকার বাহু ছেড়ে দিলেন। খানিকটা দূরে সরে বসলেন। কন্ঠ পরিষ্কার করে বললেন,
- সরি, আই ওয়েন্ট টু ফার।
আশফিকা মাথা দোলালেন, এক পরিহাসের হাসি গোপন করে কোমল স্বরে শুধালেন,
- আপনার মতন কারো আমার জীবনে আরো আগে আসার দরকার ছিলো। যে নির্দ্বিধায় আমাকে দোষারোপ করে দেখিয়ে দিত আমার ব্যর্থতাটা কোথায়। তাহলে হয়ত আমি কোনো ভুলের পথে পা বাড়াতাম না।
- ইটস নেভার লেইট মিসেস চৌধুরী।
জাইনের কণ্ঠটি অস্বাভাবিক ধরণের নমনীয় শোনালো। আশফিকা জ্বলজ্বলে নয়নে তাকালেন পুরুষটির দিকে। অজানার উদ্দেশ্যে নিবিড় দৃষ্টিপাত সুদর্শনের।
- ভুল করাটা মুখ্য বিষয় নয়। মুখ্য বিষয় হলো ভুলটাকে আপনি শুধরে নিচ্ছেন কিনা! আমিও সাধুপুরুষ নই। এত বড় ভুল করেছি যে তার বোঝা আজ অবধি বয়ে বেড়াচ্ছে আমার জীবন।
থামলেন জাইন, কন্ঠতালু উঁচু হলো তার, অ্যাডামস অ্যাপেলে ঢেউ খেলিয়ে নেমে গেলো যেন একদলা অনুভূতি। প্রজ্জ্বলিত নয়নে ফিরে তাকালেন তিনি আশফিকার উদ্দেশ্যে,
- আমার গোটা জীবনটাই একটা ভুলের ভিত্তিতে গড়া। কিন্তু আমি থেমে যাইনি। আগলে নিয়েছি, মোকাবেলা করেছি, সমাধানের পথ খুঁজেছি। নিজেকে ভাগ্যের দয়ায় কিংবা অপরপক্ষের মায়ায় ছেড়ে দেইনি। মায়া বড় কঠিন জিনিস। মায়া যেমন আপনাকে বাঁচাতে পারে, তেমন ধ্বংস করতেও পারে। আপনি সেই মায়ার হাত ধরে বাঁচবেন কি নিঃশেষ হবেন সেটা একান্তই আপনার উপর নির্ভরশীল। ট্রাস্ট মি, কেউ আপনাকে শেখাতে পারবেনা, কেউ না। দিস ইয ইওর ওউন ব্যাটেল।
স্থির তাকিয়ে রইলেন উভয়ে পিতামাতা, একে অপরের দিকে। তারপর একটি নিঃশ্বাস ফেলে জাইন উঠে পড়লেন, চশমা চোখে পড়ে উল্টো ঘুরলেন চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।
- জাইন...?
থমকে গেলো উভয় পদক্ষেপ। নিজের টাইটেলের বদলে নামটির উচ্চারণ জাইনের অন্তরজুড়ে অদ্ভুত এক তড়িৎ খেলিয়ে দিলো। আশফিকা তখনো বসে আছেন সিঁড়ির ধাপে। রমণীর নমনীয় কন্ঠস্বর ধ্বনিত হলো সহসাই,
- আমাকে একদম সত্যি করে একটা কথার জবাব দেবেন। আমার জায়গায় আপনি থাকলে কি করতেন?
জাইন নিজের দুহাত মুঠো পাকিয়ে ফেললেন। অতঃপর শান্ত স্বরে জবাব দিলেন,
- মীর চৌধুরীকে ডিভোর্স দিতাম।
আশফিকা কেঁপে উঠলেন। ঝট করে ফিরে তাকালেন জাইনের দিকে। মৃদু পরিতাপের হাসি ফুটলো জাইনের অধরে,
- ইউ ওয়ান্টেড অনেস্ট আনসার। যে পুরুষ নিজের সন্তানকে অপদস্থ হতে লক্ষ্য করেও নিশ্চুপ থাকে, অথচ স্ত্রীর শরীরে হাত তুলতে কুণ্ঠাবোধ করেনা, সে স্বামী কিংবা বাবা, কোনোটাই হওয়ার যোগ্যতা রাখেনা।
আর দাঁড়ালেন না জাইন, লম্বা পদক্ষেপে হেঁটে দ্রুতই আড়াল হয়ে গেলেন দৃষ্টিসীমার। আশফিকা নিজের জায়গায় বরফ হয়ে থাকলেন, তার কানে বাজতে থাকলো চলে যাওয়া মানুষটার ভারী পদশব্দ।
━━━━━━━━━━━━━
আমিন ভিলা।
আজ পহেলা নভেম্বর তারিখ। আমারা টেবিলের প্রান্তে বসে পা দোলাচ্ছে আর অদূরে জাইনের কাজ দেখছে। একটা ম্যানিকুইনের উপর পিন বসিয়ে বসিয়ে কাপড়ের ভাঁজ ঠিক করছেন তিনি। একপাশে ক্যানভাসে নতুন ড্রেসের ডিজাইন আটকানো। সেটা দেখে দেখে কাপড় সেট করছেন সুচারু দৃষ্টিতে এবং দক্ষ হাতে। আমরা তার কাজ দেখতে দেখতে নিজের কল্পনার জগতে হারিয়ে গেলো ক্ষণিকের জন্য।
আজ ৫৫৬ দিন পূর্ণ হবে, আমারা দোহাকে একটিবারের জন্যও দেখেনি। কিশোর ছেলেটা পিটারবার্গের পথ ধরে সেই যে গিয়েছে, আর ফিরে তাকায়নি। সেদিনের স্মৃতিটুকু আজও আমারার নয়নপটের দগদগে প্রতিচ্ছবি। ভোলার চেষ্টা করেছে। সবকিছু ছেড়ে নতুনভাবে বাঁচতে চেয়েছে। সম্ভব হয়নি। এতকিছুর পরেও তার অবাধ্য বেহায়া অন্তর একের পর এক দিন শুধু গুণেই চলেছে। সকলের সামনে আমারা ভীষণ হাসিখুশি। নিজেকে নিজের মতন করে গ্রহণ করতে শিখছে সে, গড়ে তুলছে সবকিছু নতুনভাবে। সে হাসে, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়, ঘুরে - ফিরে, জীবন উপভোগ করে। দিনশেষে বদ্ধ ঘরের আড়ালে তার একলা অন্তর বিরহের দহনে দগ্ধ হয়। একরাশ অভিমান জমতে জমতে বুকটা বড্ড ভারী হয়ে গিয়েছে। কোথাও জায়গা হচ্ছেনা অনুভূতিটুকু তুলে রাখার। ওই মায়াবী মুখ, টানা টানা বিস্তৃত আঁখিযুগল আর নির্ঝর হাসিতে উদ্ভাসিত অধর সে হাজার চাইলেও ভুলতে পারছেনা।
“ প্রিন্সেস? ”
কলতান গুঞ্জরিত হয়ে চলে তার কানের মাঝে। সড়কের ভিড়ের মাঝে অসহায় নয়ন তার খুঁজেফিরে সত্তাটিকে। যদি একটাবার দেখা হয়! যদি একটাবার সে সামনে এসে দাঁড়ায়!
কিন্তু সে আসেনা। আমারার অভিমান, বিরহ, আবেদন, অনুভূতি কিংবা ভালোবাসা, কোনোকিছুই তাকে ফিরিয়ে আনতে যথেষ্ট নয়। সে যেন হারিয়ে গিয়েছে। উবে গিয়েছে কর্পূরের মতন। চির অধরা এক মরীচিকা, যা কোনোকালে আমারার ছিলোনা, হবেও না। এক সমুদ্রসম অশ্রু, নির্ঘুম রাত্রি, অভিমানী মন কোনোকিছুই তাকে ভেদ করতে পারবেনা কোনোদিনও।
অভিমানের পর্বত জমা হয় মনের কোণে, ডায়েরীর পাতায়। উপচে পড়ে কবিতার লাইন হয়ে, ঝরে পড়ে বিষাদের পংক্তি। পাতায় পাতায় লিখিত হয় বিরহের আখ্যান।
“ আমাকে হারালে তুমি বেশিকিছু হারাবে না
কিন্তু এই একমুঠো অল্পটুকুই তুমি হারিয়ে ফেলেছ প্রিয়~”
এরূপ কতই না রচনা ফুটে ওঠে কাগজের পটে। নির্বাক কাগজ শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে, নিজের মাঝে ভেসে ওঠা প্রতিটা যন্ত্রণাদায়ক শব্দ।
তবুও দিনশেষে আমারার অবাধ্য অন্তর গুণে যায়, আজ দোহাকে না দেখার ৫৫৬ তম দিন!
এতগুলো দিন তো দোহা তার কাছেও ছিলো না.....
- লিল বার্ড?
সম্বোধনটি কানে যেতেই নিজের ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবে এসে পড়লো আমারা। দ্রুতহাতে নিজের চোখের কোণে জমা অশ্রুটুকু মুছে নিয়ে সামান্য নাক টেনে ঘুরে তাকালো জাইনের দিকে।
- জ্বি আংকেল?
- তুমি ঠিক আছো? তোমাকে বিষন্ন দেখাচ্ছে।
জাইন উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন। আমারা সেটি লক্ষ্য করে মৃদু হাসলো।
- অবশ্যই আমি একদম ঠিক আছি। শুধু ভাবছিলাম জারার মাথায় কি চলছে।
জাইন জবাব দিতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তার অবয়ব সহসাই থমকে গেলো। চোয়াল ঝুলে পড়লো, হাতে ধরা পিনগুলো ধপাস করে গড়িয়ে পড়লো মেঝের উপর। তাতে আমারা তার দৃষ্টি লক্ষ্য করে তাকাতেই নিজেও জমে গেলো। ঠিক জাইনের মতন ঠিকরে এলো তার চোখ, অধর ফাঁক হলো মহাবিস্ময়ে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো, এ বাস্তব নাকি স্বপ্ন?
রুমের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে জারা। তার ফিনফিনে অবয়বজুড়ে জড়ানো হালকা সবুজাভ বর্ণের কামিজ। ওড়নাখানি কাঁধের দুপাশে ছড়ানো। কাঁধসমান চুলগুলো ছেড়ে দেয়া, কানের লতিতে ঝুলন্ত লম্বাটে চিকচিকে দুল। চাপা বর্ণের গালে হালকা একটু ব্লাশ এবং চোখে গাঢ় কাজল।
পুরোদস্তুর এক বাংলাদেশী যুবতী।
জাইন এবং আমারা এতটাই হতবিহ্বল যে কেউই কোনো প্রতিক্রিয়া করতে পারছেনা। তাতে জারা ভীষণ বিব্রতবোধ করলো। সামান্য নড়েচড়ে উঠলো,
- পাপা!
- মাই গড! অ্যাম্বুলেন্স! আই নিড অ্যাম্বুলেন্স!
বুক চেপে ধরলেন জাইন, হেলে পড়লেন একদিকে। পাশ থেকে আমারা লাফিয়ে উঠে তাকে ধরে ফেললো,
- আংকেল আপনি ঠিক আছেন?
- আমি একটুও ঠিক নেই। আমার ঘরে চোর ঢুকেছে। আমার মনটা চুরি করে নিয়ে গিয়েছে। পুলিশ ডাকো পুলিশ! আহ্হঃ....মাই পুওর হার্ট!
হিসিয়ে উঠে ব্যথা পাওয়ার ভান করলেন জাইন। আমারা থতমত খেয়ে গেলো। অপরদিকে জারা চোখ পাকিয়ে বললো,
- পাত্তা দিস না, পাপা ভ্যাল ধরেছে!
- তুমি এভাবে বলতে পারলে?
চোখমুখ কুঁচকে বাচ্চাদের মতন ঠোঁট ফুলিয়ে জাইন বললেন,
- আমার কোকো আমাকে একটুও ভালোবাসে না। যেদিন আমি থাকবো না, সেদিন বুঝবে।
- যেদিন আমি থাকবো না, সেদিন তুমি বুঝবে!
পাল্টা চোখ উল্টে বললো জারাও। তাতে হঠাৎ জাইনের মাঝে বিস্তর পরিবর্তন দেখা গেলো। তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেলো, তাতে ভর করলো স্থিরতা এবং চাপা আতঙ্ক। মেয়ের দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন তিনি। পিতার চেহারায় এমন ভাব লক্ষ্য করে জারা জিভ কাটলো, দ্রুতই ব্যক্ত করলো,
- স... সরি পাপা, আমি সেভাবে মিন করিনি...
- কোকো।
শান্ত কন্ঠ জাইনের। দুহাতের মাঝে আগলে ধরলেন তিনি মেয়ের মুখ, ঝুঁকে এসে নরম এবং অরক্ষিত এক কন্ঠে জানালেন,
- আর কখনো এমন করে বলোনা, কেমন? তুমি আমার সবকিছু। তোমাকে ঘিরেই আমার পৃথিবী। তুমি আছো বলেই আমি আছি। কক্ষনো পাপাকে ছেড়ে যেওনা, কেমন? পাপা বাঁচতে পারবেনা।
জারা দুহাতে নিজের পিতাকে শক্তভাবে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ গুঁজে দিলো।
- আমি কক্ষনো তোমাকে ছেড়ে কোত্থাও যাবেনা পাপা, আই প্রমিয।
তাকে আগলে নিয়ে দীর্ঘ প্রশ্বাস টানলেন জাইন। অতঃপর মৃদু হেসে কপালে স্নেহের চুমু এঁকে দিয়ে বললেন,
- অবশেষে তাহলে আমার মেয়েটা সত্যিই বাঙালি মেয়ে হওয়ার শখ টের পেলো, হুম? এই অসাধ্য সাধনের জন্য ওই ছেলেটাকে একটা বাহবা দিতেই হচ্ছে। নাউ, আই অ্যাম জেলাস অব হিম!
জারা কনুই দিয়ে জাইনকে গুতো দিতেই তিনি খিলখিল করে হেসে উঠলেন।
- ওই ডাস্টবিনের কথা আর বলোনা পাপা। ওকে নিয়ে জেলাস হওয়ার কিছুই নেই বুঝলে? নেহায়েত বছরের জন্য চলে যাচ্ছে তাই...
- হ্যাঁ হ্যাঁ, আমরা কিচ্ছু বুঝিনি বিশ্বাস কর, আমরা ফিডার খাই, আমরা তাই তাই তাই, মামাবাড়ি যাই খেলি।
আমারা মাঝখান থেকে বলে উঠতেই জারা তীব্র দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো। জাইন খিলখিল করে হাসলেন, পরক্ষণে জারাকে দ্বিতীয় দফায় সংক্ষিপ্ত এক আলিঙ্গন করে বললেন,
- ইউ নো কোকো, আমি জীবনে কখনোই কোনোকিছুর জন্য তোমাকে আটকাইনি, এবারেও আটকাবো না। তোমার উপর আমার বিশ্বাস আছে। যেটা তোমার হৃদয় চায়, সেটাই করবে কেমন? কারো চাপে বা উৎসাহে নয়, সিদ্ধান্ত হোক তোমার অন্তরের, আমি সাগ্রহে তা গ্রহণ করে নেবো। যদিও মেয়েজামাইকে আমি একটু বাজিয়ে না দেখে ছাড়ছি না....!
- পাপা প্লীজ!
- হাহাহা!
জারা ভীষণ লজ্জা পেলো। হনহন করে হেঁটে গিয়ে সে আমারার হাত চেপে ধরলো। বেচারী ইতস্তত করে বললো,
- ইয়ে মানে... আমি বলছিলাম কি জারা...অনিক তোকে একা যেতে বলেছে, মাঝখানে আমাকে নিয়ে টানাটানি করলে...
- চুপ! একদম চুপ! আর একটা কথা বললে ঠাটিয়ে গাল লাল করে দেবো!
জারা আমারাকে একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে বগলদাবা করে নিজের সাথে নিয়ে গেলো। জাইন তাদের পিছন পিছন গেলেন। দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলেন মেয়েদের, খুনসুঁটি করতে করতে ধীরে ধীরে আড়াল হয়ে যাচ্ছে দৃষ্টিসীমার। বুকের ভেতর তিনি একইসঙ্গে এক অসামান্য তৃপ্তি এবং ফাঁপা শূন্যতা অনুভব করলেন, কেন জানেন না। দুহাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে পড়লো প্যান্টের পকেটের ভেতর।
━━━━━━━━━━━━━
স্কাইহাই ক্যাফে লাউঞ্জ।
কিচেনের নিকটবর্তী টেবিলে মুখোমুখি বসে আছে অনিক এবং জারা। কাঁপা কাঁপা হাতে গ্লাসের পানিতে চুমুক দিচ্ছে জারা, যা একেবারেই তার স্বভাববিরুদ্ধ। অপরদিকে অনিক থমথমে মুখে স্থির চেয়ে আছে। তার দৃষ্টি আমারার উপর আবদ্ধ। যে এই মুহূর্ত দাঁত কেলিয়ে মনে মনে চম্পট দেয়ার পাঁয়তারা করছে। জারাও কিছু বলছে না, অনিকও কিছু বলছেনা। একজন আতঙ্কিত, অপরজন রাগান্বিত। দুজনের রোষানলের মাঝে পিষ্ট হচ্ছে আমারা নামক নিষ্পাপ শিশু! অজান্তেই টিস্যু কামড়ে আমারা বললো,
- আমি বরং যাই...
উঠতে নিলেও সম্ভব হলোনা। তার কনুই টেনে ধরে ধপাস করে বসিয়ে দিলো জারা। করুণ দৃষ্টিতে সে তাকালো অনিকের উদ্দেশ্যে। যেন ক্ষমা চাইলো বান্ধবীর ব্যবহারের কারণে। ওয়েটার এসে তিনজনের কফি দিয়ে গেলো প্রথমে। অনিক শান্ত দৃষ্টিতে লক্ষ্য করলো সবকিছু। ওয়েটার চলে যেতেই সে আমারার দিকে তাকালো,
- আমার তোকেও কিছু বলার ছিলো... আমারা।
গরম কফির কাপে ঝুঁকে স্তব্ধ হয়ে গেলো আমারা। ভ্রু কুঁচকে তাকালো অনিকের উদ্দেশ্যে। ছেলেটা পরনের হুডি টেনেটুনে সামান্য মাথা ঝাঁকালো, তারপর ঘাড়ে হাত ডলে জানালো,
- আমি চাইনা আমাদের কারো মাঝে আর কোনোপ্রকার লুকোচুরি থাকুক। আই নিড টু টেল ইউ বিফোর ইটস টু লেট।
আমারা নড়েচড়ে বসলো। তার সমস্ত মনোযোগ অনিকের উপর। পাশে বসা জারা নিজের অনুভূতি দমন করে ঠান্ডা কন্ঠে আদেশ করলো,
- বাবা আপনি ঝেড়ে কাশুন। মুখের উপর দুই তিনটা পড়লে আর কথা বলার অবস্থায় থাকবেন না!
অনিক ঢোক গিললো, ক্ষণে ক্ষণে সে দৃষ্টি ফেলে যাচ্ছে জারার কামিজ জড়ানো অবয়বে। ঠোঁট কাঁপলো তার সামান্য,অতঃপর মাথা ঝাঁকিয়ে বলেই ফেললো,
- আমারা আমি সরি। দোহাকে তোর মন নিয়ে খেলার কথাটা আমিই বলেছিলাম। ও রাজী হয়েছিল, বিশ হাজার টাকার বিনিময়ে।
স্তব্ধ হয়ে গেলো আমারা। নিজের জায়গায় সম্পূর্ণ জমে গেলো। পুতুলের মতন তাকিয়ে রইলো অনিকের দিকে। কোনো প্রতিক্রিয়া করতে পারলোনা। জারা টেবিলে চাপড় দিয়ে উঠলো,
- হোয়াট দ্যা হেল! ইউ ড্যাম সাইকো!
আশেপাশের মানুষদের দৃষ্টি লক্ষ্য করে জারা নিজেকে দমালো। ফুঁসতে ফুঁসতে ধপাস করে বসে পড়লো চেয়ারে। তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো অনিকের উদ্দেশ্যে, যে এই মুহূর্তে চেয়ারে কাচুমাচু হয়ে অপরাধীর ভঙ্গিতে বসে আছে।
- আমি জানি আমি অন্যায় করেছি। কিন্তু তখন নিজের ভুলটা বুঝতে পারিনি। প্রতিশোধের নেশায় আমি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তাই অমন একটা কাজ করতে আমার বাঁধেনি। আমি যেকোনো প্রকারে চৌধুরীদের উপর শোধ তুলতে গিয়ে.... আমি সরি আমারা। জানি সরি বললেই সব মিটমাট হয়ে যায়না, তবুও। আমি চাই তুই সত্যিটা জান কারণ, আমি আর পারছিনা। প্রতিনিয়ত মনে হয় আমি তোদের ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছি।
আমারা নিঃশব্দ। বিন্দুমাত্র ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া নেই শরীর কিংবা মুখে। অনিক তাতে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়লো, সাহায্যের আশায় জারার দিকে তাকালেও সে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। অনিকের স্বীকারোক্তি তাকে ভীষণ কষ্ট দিয়েছে স্পষ্ট। দীর্ঘ মুহূর্ত নীরবতা। তারপর মৃদু হাসির ঝংকার। পরিতাপের এক নির্মম হাসি। আমারা হাসলো, কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো,
- সবটা শুরু থেকেই সাজানো - বানোয়াট ছিলো। হি টুক মানি ফ্রম ইউ অ্যান্ড...
- হি ডিড নট!
অনিক হঠাৎ শক্ত কন্ঠে প্রতিবাদ করে উঠলো। একটি ঢোক গিলে করুণ দৃষ্টিতে আমারার দিকে তাকিয়ে জানালো,
- বিশ্বাস কর, ও আমার কাছ থেকে একটা টাকাও নেয়নি। আমার মুখের উপর ওই টাকা ও ছুঁড়ে মেরে বলেছিল যা হয়েছে সবটা ভুল হয়েছে! আমার উপলব্ধির কারণ শুধুমাত্র দোহা। আমি জানি আমি ভুল করেছি, আর সেটা স্বীকার করতে বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ নেই আমার। দোহাই আমাকে বুঝিয়েছে কি মারাত্মক অপরাধ করেছি আমরা। প্লীজ, তুই ওকে ভুল বুঝিস না। হি ট্রুলি.... কেয়ারড অ্যাবাউট ইউ।
- কেয়ারনেস ডায নট ওয়ার্ক লাইক দ্যাট। মিথ্যার বুনিয়াদে যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয়, সেটা কোনো সম্পর্কের কাতারেই পড়েনা। দোহা কোনোদিনও মন থেকে মধুকে চায়নি। ও ওর জীবনে এসেছিল, তোর কারণে। ওর জীবন থেকে চলে গিয়েছে, পরিস্থিতির কারণে। ফ্যাক্ট ইয ফ্যাক্ট অনিক! তুই অস্বীকার করতে পারিস না।
জারার কঠোর এবং দৃঢ় কণ্ঠের বিশ্লেষণে সম্পূর্ণ থমকে গেলো অনিক। মাথা নুইয়ে ফেললো, মিনমিন করে শুধু একটাই শব্দ উচ্চারণ করতে পারলো।
- সরি।
সহসাই নিজের চেয়ার ঠেলে উঠে পড়লো আমারা। দুহাতে নিজের মুখ ঘষে নিয়ে বললো,
- ইউ গাইয নো হোয়াট? আমি একটু....বাইরে থেকে হেঁটে আসছি।
ফিরে তাকালোনা আমারা। ক্যাফের বাইরে বেরিয়ে এলো। তাকে অনিক কিংবা জারা কেউই আটকালো না। যেতে দিলো। সামনের সড়ক পেরিয়ে অপর পাশের দোকানে ঠাসা ফুটপাথে এসে থামলো আমারা। শান্তির কোনো উপায় নেই। গিজগিজ করছে মানুষ। তবুও সে দাঁড়ালো, আকাশের দিকে তাকালো। অবাধ্য অশ্রুগুলোকে গড়াতে দিলোনা। তীব্র অনুভূতিতে মুষ্টিবদ্ধ হলো তার উভয় হাত। আশেপাশের পথচারীরা তাকে ফিরে ফিরে দেখলো। পরোয়া নেই।
কতক্ষন ঐভাবে দাঁড়িয়ে ছিলো আমারা জানেনা। অজান্তেই পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলো সে সামনের একটি পুরাতন বইয়ের দোকানে। যদিও কিনবে না, তবুও বইগুলো তুলে হাতড়াতে থাকলো সে। কিছু একটা করা দরকার। মনকে শান্ত করা দরকার। তার অপ্রকৃতস্থ নড়াচড়ার কারণে বইটি হাত গলে মাটিতে পরে গেলো। সহসাই ঝুঁকলো সে, বইটি তোলার জন্য। একই মুহূর্তে ভিন্ন একটি হাত এগিয়ে এলো, আমারার আঙুলে ঠেকলো সেই হাতের আঙুলের স্পর্শ। বইটি তুললো সে, সোজা হয়ে দাঁড়ালো। আমারা মাথা তুলে অস্পষ্ট নয়নে তাকালো। মনে হলো বুক ভেঙে জলোচ্ছ্বাস খেলে গেলো অনুভূতির।
দোহা ইসলাম।
অজান্তেই তার অবয়বে নজর বুলিয়ে আনলো আমারা। ফিনফিনে পাতলা অবয়ব খানিকটা হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে। আগের তুলনায় উচ্চতায় বেড়েছে বেশ। প্রশস্ত হয়েছে কাঁধ এবং বুক, শক্তিশালী হয়েছে পেশী। মুখটা আরো জেল্লাদার দেখাচ্ছে, টানা নয়নজোড়া প্রজ্জ্বলিত রত্ন। ছায়ার মতন চুলগুলো কপালের দুপাশে গড়িয়ে নেমে ঢেকে ফেলেছে। অঙ্গে জড়ানো সাদাকালো জ্যাকেট এবং ট্রাউজার। বাম হাতের তর্জনীতে একটি সিলভারের আংটি, আঙুলের আশেপাশে ছোটছোট ব্যান্ডেজ। গিটারের স্ট্রিংয়ের দাগ আড়ালে রেখেছে সেসব।
নিষ্পলক তাকিয়ে আছে দোহা। আমারাও। অবশেষে ৫৫৬ দিনের অপেক্ষার অবসান। কেমন অনুভূতি হচ্ছে অন্তরে? বলা দুষ্কর।
দোহার বিস্তৃত অধরজুড়ে অতি ধীরে স্মিত এক হাসির রেখে ফুটলো। তীক্ষ্ণ নয়ন ক্রমশ আর্দ্র হলো। বইয়ের মলাটে তিরতির করে কাঁপলো আঙুল, নিদারুণ অনুভবে। আমারাকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলো সে, নিজের বেহায়া দৃষ্টিতে। বুকটা ভরে এলো তার। বছর বছর বাদে নিজেকে জীবিত মনে হলো। তাই প্রশ্বাস টানলো প্রাণভরে।
- হ... হেই প্রিন্সেস...
আমারা কোনো জবাব দিতে পারলোনা। অপলক চেয়েই থাকলো। দোহা এগিয়ে এসে তার দুহাতের মাঝে বইটা ফিরিয়ে দিলো। ইচ্ছাকৃতভাবে তার কব্জিতে ছুঁয়ে দিলো আঙুল, অতি যতনে।
- মিসড মি?
ফিসফিস আবেদনে আমারা গুঁড়িয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো দুবাহু ছুঁড়ে দিয়ে ওই প্রশস্ত পুরুষালী হয়ে উঠতে থাকা বুকের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু পারলোনা সে। ভেতর থেকে সুগভীর অভিমান বাঁধ সাধলো মিলনে।
দোহা তাকে ঠকিয়েছে।
সেই প্রথম থেকেই ঠকিয়েছে।
এই উপলব্ধির পরেও কি সম্ভব? সম্ভব না।
দোহা যেন আমারার হৃদয় পড়তে পারলো। তাই দুই পা পিছিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কি যেন ভাবলো। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
- অনিক....ক্যাফের ভেতরে আছে রাইট?
দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে অল্প একটু মাথা দোলালো আমারা, বইটা চেপে ধরলো বুকের মাঝে। দোহা পাল্টা মাথা ঝাঁকিয়ে উল্টো ঘুরলো। পায়ে পায়ে এগোলো সামনে। তারপর হঠাৎই মাঝপথে জমে গেলো। ভূকম্পন অনুভব করলো যেন পায়ের তলায়।
আমারা সবেমাত্র বইটা দোকানে ফিরিয়ে দিয়ে সরে আসছিলো। সে হতবিহ্বল হয়ে লক্ষ্য করলো মাঝরাস্তা থেকে দোহা ছুটে আসছে। প্রচন্ড বেগে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সুনামির মতন তার শরীরে আছড়ে পড়ল দোহা, নিজের দুবাহুর শক্ত আলিঙ্গনে আড়াল করে নিলো তাকে। হাঁটু মুড়িয়ে বসিয়ে দিলো, জ্যাকেটের অন্তরালে মুড়িয়ে ফেললো তার গোটা শরীরকে। এরপরই....
ধাম! ধাম!
হৃদয়বিদারক চিৎকার, হাহাকার।
প্রচন্ড মানুষের ভিড়। দৌড়াদৌড়ি, হুড়োহুড়ি। সবকিছু থেকে তীব্রভাবে তাকে আড়াল করে রাখলো দোহা, নিজেকে ঢালের মতন ব্যবহার করে আমারাকে চেপে রাখলো। বিপর্যয় এবং তার মাঝে দুর্বোধ্য দেয়াল সে।
আমারা নিজের ডাগর ডাগর চোখে দোহার কাঁধের উপর থেকে দেখলো, দাউদাউ আ*গু*নে জ্বলছে স্কাইহাই ক্যাফে। ছা*দটুকু উড়ে গিয়েছে বি*স্ফো*রণের দাপটে। দানবাকৃতির আগুনের কুণ্ডলী ছাড়িয়ে গিয়েছে দূর আকাশের সীমানাকেও।
আমারা দেখলো, শুধু দেখেই গেলো। তার নয়নে প্রতিফলিত দাউদাউ প্রজ্জ্বলিত অগ্নিশিখা, কানে বাজতে থাকলো তীব্র সাইরেন আর অসহায় মানুষদের তীব্র আর্তনাদ।
ওই লেলিহান শিখার মাঝেই কোথাও একটা আছে.....
অনিক এবং জারা।
—চলবে—
[ 🙂🥀...........]