#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা২৭
পর্ব ২৭: [ নির্বাকতা ]
━━━━━━━━━━━━
কিছুক্ষণ আগে:-
আমারা চলে যাওয়ার পর প্রায় মিনিট কতক নিঃশব্দে বসে থাকলো অনিক এবং জারা। আশেপাশের মানুষের গুঞ্জন, হাঁকডাক কোনোকিছুই যেন তাদের প্রভাবিত করতে পারছেনা। উভয়ে আপন চিন্তায় বিলীন। অনিক কফির কাপের আড়ালে অভিব্যক্তি লুকিয়ে চেয়ে দেখছে জারাকে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে মেয়েটির প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কার্যক্রম। কিভাবে গভীরভাবে সে নিঃশ্বাস - প্রশ্বাস নিচ্ছে, গভীর চিন্তায় তিরতির করে কাঁপছে চোখের পাতা, অধর দাঁতে কামড়ে চলে অজান্তে, কানের লতিতে দুলের দোলন, শ্যামল মায়ায় উষ্ণ আবেদন....সবকিছু। নিজের হৃদস্পন্দন বেড়ে গিয়েছে, টের পেলো অনিক। চাপা এক অনুভূতি দরজায় কড়া নাড়ছে। এই সময়। হয়ত আজ, নয়ত কখনোই না।
অনিক অবশেষে সিদ্ধান্তে অটল রইলো। কফির কাপ নামিয়ে রেখে সামনে ঝুঁকলো। দীর্ঘ একটি প্রশ্বাস টেনে নিজের অবাধ্য স্পন্দিত হৃদয়কে শান্ত করলো। তারপর মৃদু কন্ঠে শুধালো,
- আমায় একটাবার মন থেকে ক্ষমা করা যায়না?
ভাবনার দুয়ার বন্ধ হলো। বাস্তবে ফিরে এলো জারা। তাকালো অনিকের গভীর নয়নমাঝে। এর পূর্বে এই দৃষ্টিতে কোনোদিন যে নির্মল আবেগ সে দেখেনি, আজ তাই দেখলো। টেবিলের উপর অনিকের রাখা দুহাত কাঁপলো ভীষণ। ভাঙা স্বরে সে বললো,
- জারা। আমি জানি, আমি ভালো ছেলে নই। আমি এই ছোট্ট জীবনে প্রচুর ভুল করেছি, অপরাধ করেছি। সত্যিকার অর্থে হয়ত কিছু কিছু কাজ ক্ষমার যোগ্যও নয়। আমি সেসব ফিরিয়ে নিতে পারবোনা। নিজেকে গোটা বদলে ফেলতেও পারবোনা। কারণ এটাই আমি, এটাই অনিক রহমান। কিন্তু সবকিছুর শেষে এই খারাপ ছেলেটাও একটা জিনিস চায়। মন প্রাণ দিয়ে, শুদ্ধভাবে, ভীষণ করে চায়।
জারা অনুভব করলো তার হৃদয় বাঁধ ভাঙা জোয়ারে ভেসে উঠছে। অনিক.....যে ছেলেটাকে নিয়ে না তো তার কোনো আগ্রহ ছিল, আর না ছিল কোনো পরোয়া। ভাগ্য আজ অদ্ভুতভাবে তাদের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। অন্তর ভরিয়ে দিয়েছে আবেগে যা উপেক্ষা করার যোগ্য নয়। আজ যদি জারা পিছিয়ে যায়, তাহলে তার হৃদয়কে অস্বীকার করা হবে। ছেলেটা খুব করে চাইছে একটুখানি ক্ষমা। চাওয়াটা কি বড়? হয়ত হ্যাঁ, কিংবা হয়ত না। তবে জীবনের এই পর্যায়ে এসে জারা আর চুপ থাকতে পারলোনা। দুহাত একটি অপরটির উপর স্থাপন করে সে শান্ত গলায় বলতে শুরু করলো,
- কি জানিস অনিক? আমারাকে আমি কেনো এতটা ভালোবাসি? কারণ ওর আর আমার মধ্যে অনেক মিল রে। ছোটোবেলা থেকেই মানুষ আমাদের বিচার করেছে, শারীরিক গঠনের জন্য, গায়ের রঙের জন্য। এই সমাজ আমাদের মতন ইম্পারফেক্ট মানুষগুলোকে মেনে নেয়না। আমার পাপা নিজের পরিবার ছেড়েছে, বাড়ি ছেড়েছে, একটা আশ্রয়স্থল ছেড়েছে আমার জন্য। কারণ তার আপন মানুষগুলো আমাকে গ্রহণ করে নিতে পারেনি।
অনিক স্তব্ধ হয়ে শুনে গেলো। জারা সবসময়ই চাপা স্বভাবের একটি মেয়ে। তবে আজ নির্দ্বিধায় সে জীবনের এমনকিছু অনিকের সঙ্গে বিনিময় করছে যা হয়ত আমারা ছাড়া আর কারো ভাগ্যে কোনোদিন জুটেনি। জারা কিছুক্ষণ থামলো, তারপর বললো,
- কলেজে প্রথমদিন আমারাকে দেখেই আমি বুঝে গিয়েছিলাম, মেয়েটা জীবনে অনেক ভুগবে, ঠিক আমার মতন। তোরা যখন আমাকে কালোজিরা বলে ক্ষেপানোর চেষ্টা করতি, তখন কোনো অনুভূতিই হতনা। কেনো জানিস? কারণ আমার অন্তরটা শক্ত হয়ে গিয়েছিল। এতটাই শক্ত যে অনুভূতি ছিল নিষিদ্ধ। আমার কারো প্রতি কোনো টান - দয়া - মায়া কিচ্ছু ছিলোনা। আমার জগতে ছিলাম আমি, আমার পাপা আর আমারা। এইটুকুই আমার জীবনের সবথেকে আনন্দের পাওয়া ছিলো। এরপর একটা দিন, গ্রীষ্মের কালবৈশাখী ঝড়ের তোপে যেন সবটা বদলে গেলো!
চোখ তুলে অনিকের নয়নে নয়ন মেলালো জারা।
- যে আমি কোনোদিন মেয়েলী পোশাকের ধার ধারিনি সেই আমিই কেমন শাড়ী, চুরি, কামিজ পছন্দ করতে শুরু করলাম। যে হৃদয় সমাজের আঘাতে আঘাতে শীতল হয়ে গিয়েছিল, সেই হৃদয়ে কেমন অচেনা স্পন্দন হতে শুরু করলো। আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, আমার সবকিছু একই আছে শুধু ভেতরের অস্তিত্বটা বদলে গিয়েছে। সে আর আগের জারা নেই। সে অনুভব করতে পারে, হাসতে পারে, কষ্ট পেতে পারে এবং......
বলতে পারলোনা জারা। অনিকের দুহাত শক্তভাবে চেপে বসলো তার দুহাতের উপর। মুঠো পাকিয়ে চেপে ধরলো জোরালো আবেদনে। আর্দ্র অনুভূতি উপচে পড়লো ছেলেটার মায়াবী মুখে। সিক্ত কন্ঠে সে উচ্চারণ করলো,
- শ্যামলতা.....
কিছু একটা দুমড়ে মুচড়ে গেলো জারার মাঝে। আজীবনের জন্য। উপলব্ধি করার আগেই সে পাল্টা আঁকড়ে ধরলো অনিকের দুহাত। আকুল জানালো,
- জারার মনের দুয়ার একবারই খুলবে।
- যথেষ্ট।
জারার একটি হাত তুলে অতি আলতোভাবে সেই হাতের পিঠে অধর ছুঁইয়ে দিলো অনিক। শিউরে উঠলো জারা খানিকটা।
- তুমি অসুন্দর নও শ্যামলতা। অসুন্দর তারা যাদের চোখ তোমার অস্তিত্বের সৌন্দর্য্য খুঁজে পেতে স্বার্থক হয়নি। সমাজ? সে তো এক ধূসর মরীচিকা। সমাজ তোমাকে আগলে নেয়না, উঠে দাঁড়াতে শেখায়না, কষ্টে শান্তনা দেয়না। তার একটাই কাজ, বিচার করা। সৌন্দর্যের মোহে এই পৃথিবী অন্ধ। আমিও ছিলাম, যতদিন না আমার জীবনে তুমি এলে শ্যামলতা।
জারার আঁখিজোড়া ভরে উঠলো, ঝাপসা দেখলো সে দৃষ্টিতে। মনের প্রশ্নটা সে জোরেই জিজ্ঞেস করে বসলো।
- আমি ভুল করছি কি?
- উহুম। একটুও না। যদি তুমি ভুল হও, তাহলে অনিক রহমান নিঃশেষ হয়ে যাক।
ঝুঁকে এলো অনিক সামান্য, অত্যন্ত ক্ষীণ কন্ঠে কাঁপা কাঁপা আর্জি জানালো,
- তোমার শ্যামল বর্ণ আজীবন আমার অন্তরকে নিজের করে রাখুক। মাই শ্যামলতা.....উইল ইউ.....
অতি অপেক্ষার অবসান। একটিমাত্র শব্দ এবং আলিঙ্গন। তারপরই, এক নব্য সূচনা।
কিন্তু ভাগ্য যেন কুটিল হাসলো। শব্দগুচ্ছ উচ্চারণ হতে দিলোনা। অধরা রইলো অনুভূতি, চাপা থাকলো স্বপ্ন।
অনিক জমে গেলো, জারা বুঝতে পারলোনা কি হচ্ছে। কেনই বা অনিক থেমে গিয়েছে হঠাৎ করেই। সে চোখের কোণে তীব্র কমলাভ রোশনাই দেখলো। তারপরই প্রচন্ড এক উত্তাপ। তবে সেই উত্তাপের অর্ধেক লোপ পেলো। চোখের পলকে অনিকের শরীর ঝাঁপিয়ে পড়লো তার এবং বিপর্যয়ের মাঝে।
অনিক তাকে আলিঙ্গন করলো ঠিকই। তবে সূচনাতে নয়, সমাপ্তিতে।
তীব্র উষ্ণতার এক ভয়াবহ আলিঙ্গন। বি*স্ফো*রণের শব্দ যা শ্রবণ শক্তি নষ্ট করে দেয়। নরকের অনুভব। হাহাকার, আর্তনাদ। অসহায় ক্রংক্রিটের পতন। পো*ড়া চা*মড়ার গন্ধ। তারপর সবকিছু কালো, ঘুটঘুটে অন্ধকার। ক*বরের মতন আঁধার।
কানে শো শো গুঞ্জরণ। শরীরজুড়ে সুরক্ষিত বাহুর অসহায় আলিঙ্গন। ফিসফিস একটি ধ্বনি,
- এবারের মতন বিদায় শ্যামলতা।
উত্তরও এলো পাল্টা,
- ওপারে অপেক্ষায় থাকবো পুনর্মিলনের।
━━━━━━━━━━━━━
সাইরেনের শব্দ। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে। তীব্র আওয়াজ এবং ঘণ্টা বাজিয়ে মিনিটে মিনিটে আরো গাড়ি এসে পৌঁছাচ্ছে। মানুষের উপচে পড়া ভিড় ঠেলেঠুলে কাজ করতেও বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের। আগুনের প্রচন্ড তাপ এবং ঘন কালো ধোঁয়ার কারণে জ্বলতে থাকা স্কাইহাই ক্যাফের আশেপাশেও যাওয়া যাচ্ছেনা। তবুও নিজেদের জীবন বিপন্ন করে উদ্ধারকার্যে ঝাঁপিয়ে পড়ছে অনেকে। পানির তোড়ে রাস্তা ভেসে যাচ্ছে, যেন ছোট্ট একটি নদী সৃষ্টি হয়েছে। চিৎকার, চেঁচামেচি - আহাজারিতে চারপাশ গুঞ্জরিত। মাতমধ্বনি আকাশের সীমানা ছাড়িয়েছে। বায়ুজুড়ে পো*ড়া মাংসের গন্ধ!
আমারা অদূরে রাস্তার পাশে বসে আছে। প্রচন্ড ভীড়ভাট্টায় নড়াচড়াও অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। হতবাক দৃষ্টি তার তখনো পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে দৃশ্য। চোখের সামনে কয়েকটা সেকেন্ডের ব্যবধানে.... সব শেষ! জারা? অনিক? কি অবস্থা ওদের? এই পর্যন্ত একজনেরও কোনো খবর পাওয়া যায়নি। এতটা তীব্র উত্তাপ ভেদ করে কেউই কাছাকাছি যেতে পারছেনা। আমারার সমস্ত শরীর ক্ষণে ক্ষণে কাঁপছে। দোহার আলিঙ্গনের মাঝে সে অপ্রকৃতস্থ হয়ে বসে আছে। ছেলেটা প্রচন্ড উদ্বিগ্ন। তাপ এবং ধোঁয়ায় মুখে কালশিটে পড়ে গিয়েছে উভয়ের।
- জারা....অনিক... জারা... আমার জারা...
জপে যাচ্ছে আমারা একমনে। যেন সে এই বাস্তব দুনিয়ার মাঝে নেই। দোহা তাকে আরো তীব্রভাবে নিজের বুকে জাপটে ধরলো। কাকে কি শান্তনা দেবে সে? তার নিজের ভেতরটাও যে ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে! অনিক! তার ভাইয়ের মতন প্রাণের বন্ধু! নিশ্চয়ই ঠিক থাকবে তাইনা? ঠিক থাকতেই হবে ওদের। এত নিষ্ঠুর হতে পারেনা ভাগ্য। দোহা আরো একবার নতুন করে কাউকে হারাতে পারেনা। কিছুতেই না!
- দোহা!
মানুষের প্রচন্ড কোলাহলের মাঝেও আর্তচিৎকারটি কানে গেলো দোহার। ফিরে তাকাতেই প্রচন্ড ভীড় এড়িয়ে সে একযোগে ছুটে আসতে দেখলো রাজীব এবং জিই - শুকে। এতক্ষণ যাবৎ যে অনুভূতি জোরপূর্বক আটকে রেখেছিল, তা যেন দুমড়ে মুচড়ে গেলো। রাজীব আর জিই - শু উভয়ের চোখেই পানি। তারা এসেই ঝাঁপিয়ে পড়লো দোহার মাঝে।
- অনিক! অনিক কোথায়?
- প্লীজ বল ও ঠিক আছে! কোথায় শালাটা?
দোহা কোনো জবাব দিতে পারলোনা। শুধু তিরতির করে কাঁপলো তার ঠোঁটজোড়া। আমারা নিজের বাহুতে খানিক ঢিল পেতেই লাফিয়ে উঠলো। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে গেলো, দাউদাউ প্রজ্জ্বলিত আগুনের কুন্ডের দিকে! প্রচন্ড ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে পিছন থেকে তাকে জাপটে ধরলো দোহা,
- আমারা!
- ছাড়ো! আমাকে ছেড়ে দাও!
ভীষণ শক্তিতে প্রাণপণে আমারা হাত - পা ছুড়তে থাকলো। দোহা দুহাতে তীব্রভাবে জড়িয়ে ধরলো তাকে। লাভ হলোনা, আমারার ছটফটানি জোরালো হলো।
- জারা! আমার জারা! ওকে বাঁচাতে হবে... জারা আমাকে রেখে যেতে পারেনা... ছাড়ো আমাকে, আমি যাবো!
- ওটা আগুন ড্যাম ইট!
চেঁচিয়ে উঠলো দোহা, সঙ্গে সঙ্গে আমারা তাকে থাপ্পড় দিয়ে বসলো। একটি, দুটো....অশ্রু ঠিকড়ে গড়ালো তার নয়ন বেয়ে। গর্জন তুলে উঠলো,
- আমি ওখানে ছিলাম! ওখানে আমার থাকার কথা ছিলো! আমি থাকতাম....আমি থাকতাম ওখানে...
- প্রিন্সেস!
পরোয়া করলোনা দোহা। আমারাকে বুকের মাঝে জাপটে ধরে টেনে হিঁচড়ে সরিয়ে আনলো দোহা। ক্রমশ তার বুকে ঘু*ষি বসাতে থাকলো আমারা, ছাড়া পাওয়ার আশায়। কোনো লাভ হলোনা। আশেপাশের অনেকে ফিরে ফিরে তাদের ধস্তাধস্তি দেখছে, লক্ষ্য করছে আহাজারি। দোহা আমারাকে নিয়ে ধপাস করে এক কোণায় বসে পড়লো, জ্যাকেট খুলে নিয়ে তার অঙ্গে জড়িয়ে জোরালোভাবে আঁকড়ে ধরে রাখলো নিজের মাঝে। আমারা শেষমেষ হার মানতে বাধ্য হলো, তার বুকের মাঝে মুখ গুঁজে তীব্র কান্নায় ভেঙে পড়লো।
- জারা....অনিক... আমি ওদের সাথে ছিলাম, ওদের সাথেই ছিলাম আমি! আমি কেনো বাইরে চলে এলাম? ওরা কেনো....
ফোঁপাতে থাকলো আমারা। দোহা কিছুই উচ্চারণ করতে পারলোনা। আমারার চুলের মাঝে মুখ ডুবিয়ে দিলো নিজের। থরথর করে কাঁপতে থাকলো তার শরীর, তীব্র আবেগ আর দুশ্চিন্তার তাড়নায়।
- ওরা ঠিক আছে প্রিন্সেস, ওদের ঠিক থাকতেই হবে। একটু....আর একটু সহ্য করো...
এ যাতনা কি সহ্য করা যায়? যায়না, দোহা নিজেও খুব ভালো করেই জানে।
আশেপাশের হট্টগোল আরো বেশি বেড়ে গেলো। একদিকে দুটো অ্যাম্বুলেন্স এসে থেমেছে। প্যারামেডিক্সরা হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে আসছে একে একে। স্ট্রেচার তৈরী। আমারাকে ধরে রেখে ঝাপসা দৃষ্টিতে দোহা লক্ষ্য করলো ফায়ারপ্রুফ বস্ত্রে মুড়িয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বেশ কয়েকজনকে বাইরে নিয়ে আসছে। কেউ বা ছটফট করছে, কারো কিছুই দেখা যাচ্ছেনা। দোহার বুকটা ধ্বক করে উঠলো। আমারাকে আরো শক্তভাবে নিজের বুকে চেপে সে রাজীব - জিই শুর দিকে ইশারা করলো। রাজীব সামান্য একটু মাথা হেলিয়ে এক দৌঁড়ে ভীড়ের মাঝে ঢুকে গেলো। তার মতন অপেক্ষারত অনেক স্বজনও দৌঁড়ে গেলো, নিজেদের পরিবারের মানুষটিকে খুঁজে পাওয়ার আশায়।
- হুশ....হুশ প্রিন্সেস... আই অ্যাম হেয়ার, আই অ্যাম হেয়ার।
দোহা মুখ নামিয়ে আমারার কানে ফিসফিস করতে থাকলো, কোনোভাবে যদি একটুখানি সামাল দেয়া যায়! জিই - শু তার পাশে কাঁধ খামচে বসে রইলো। রুদ্ধশ্বাস কত মিনিট অতিক্রান্ত হলো কেউ বুঝতে পারলোনা। রাজীবের ভগ্ন অবয়বকে ফিরে আসতে দেখেই উভয় ছেলে সতর্ক হয়ে গেলো।
রাজীবকে দেখাচ্ছে যেন সে ভূত দেখেছে এমন! মুখটা চুপসে গিয়েছে, দুহাত কাঁপছে প্রচন্ডভাবে। গোটা শরীর অদ্ভুত এক ঝাঁকুনি দিচ্ছে, এই বুঝি অজ্ঞান হয়ে যায়। হাঁটু ভেঙে এলো ছেলেটার, তারপর ধপাস করে সে মাটিতে বসে পড়লো!
- অ.....অনিক.....!
প্রচন্ড কান্নায় ভেঙে পড়লো রাজীব। দুহাতে মুখ চেপে ধরে পাগলের মতন ফোঁপাতে লাগলো। দোহার সামনে দুনিয়াটা যেন কেঁপে উঠলো। স্তব্ধ তাকিয়ে রইলো সে। তার আলিঙ্গনে আমারাও ফোলা চোখে ফিরে তাকালো। জিই - শু দৌঁড়ে গেলো, রাজীবকে আঁকড়ে ধরে ভাঙা আওয়াজে জিজ্ঞেস করলো,
- রাজীব, রাজীব! শান্ত হ...কি বলছিস তুই?
- পু*ড়ে গিয়েছে! কয়লা হয়ে গিয়েছে পুরো!
ভীষণ রাগ হলো দোহার, আমারাকে ছেড়ে হামাগুড়ি দিয়ে সে পৌঁছালো রাজীবের কাছে। এখনো বিশ্বাস করতে নারাজ সে। ধমকে উঠলো কঠোর কন্ঠে তাই,
- কি বলছিস? তুই তাহলে বুঝলি কিভাবে ওটা অনিক?
- আই সও হিম! টুডে! দোহা....নীল রঙের হুডি, ব্রিগেট ওয়াচ আর....
- আর?
- তুই গত বার্থডেতে যে সিলভার চেইন দিয়েছিলি সেটা....
সহ্য করা গেলনা। লাফিয়ে উঠলো দোহা। এক ছুটে হারিয়ে গেলো ভীড়ের ওপাশে। বাকিরাও আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলোনা। ঠেলেঠুলে এগিয়ে গেলো। ফায়ার সার্ভিসের কর্মী আর পুলিশদের বাঁধাও কাউকেই দমিয়ে রাখতে পারছেনা যেন। বাঁশি আর সাইরেনে পূর্ণ চারদিক। দোহা অ্যাম্বুলেন্সের কাছাকাছি রাস্তায় এসে থামলো, সার দিয়ে কয়েকটি নিথর শরীর রাখা হয়েছে। স্ট্রেচারে করে একে একে তোলা হচ্ছে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে। দোহার নজর আটকে গেলো একটি প্লাস্টিকের প্যাকেটসদৃশ বস্ত্রে মোড়ানো শরীরের উপর। উহু, শরীর না বলে বীভৎস বস্তু বলাই শ্রেয়। পুড়ে কা*লো হয়ে গিয়েছে, চা*মড়া বোঝাই যাচ্ছেনা প্রায়। কব্জিতে ভাঙাচোরা কাঁচের ব্রিগেট ঘড়ি, অনিকের পছন্দের ব্র্যান্ড। গলায় সিলভার চেইনটা দেখাচ্ছে মলিন। নীল হুডির অধিকাংশের কোনো অস্তিত্বই নেই। কোমরের দিকটায় খানিকটা রয়ে গিয়েছে অক্ষত,তাতে নীল রংটা দেখা যাচ্ছে। এটুকুই।
দোহা না কিছু ভাবতে পারলো, না কিছু বুঝতে পারলো। তার মন - মস্তিষ্ক জমে গিয়েছে। ধপাস করে বসে পড়লো সে পাশেই, আশেপাশের কয়েকজন তাকে ঠেলতে চাইলেও কোনো লাভ হলোনা। ভূকম্পনের মতন কাঁপা হাতেই সে নিথর পু*ড়ে কয়লা হয়ে যাওয়াপ্রায় শরীরটার হাত চেপে ধরলো, গ*লিত চা*মড়া লেপ্টে গেলো হাতে, তীব্র পোড়া গন্ধে শরীর গুলিয়ে উঠল, পরোয়াই করলোনা। অনুভব করলো, জোরালোভাবে। একটুখানি স্পন্দন? সামান্য একটু? অল্প একটু? খোদা..... একটামাত্র প্রাণের স্পন্দন?
নাহ, কিছুই নেই। এই বিকৃ*ত স্থবির নামমাত্র শরীরে স্পন্দন থাকা অসম্ভব।
অনিক নেই।
অনিক আর এই দুনিয়ায় নেই।
- কথা বলবিনা অনিক?
নিষ্ফল আবেদন দোহার। খটখটে শুকনো আঁখিজোড়া, তবে তাতে ভাসমান অব্যক্ত পাহাড়সম আর্তনাদ।
- রাগ করেছিস তোর সঙ্গে দেখা করিনি বলে? এই দেখ, একটাবার চেয়ে দেখ আমি এসেছি। তোর দোহা এসেছে। কথা বল, জড়িয়ে ধর, থাপ্পড় মার! কিছু একটা কর!
শেষ মুহূর্তে চেঁচিয়ে উঠলো দোহা। তার পিছনে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে আমারা, রাজীব এবং জিই - শু। দুজন ছেলেই হাঁটুমুড়ে বসে পড়লো দোহার দুপাশে। বন্ধুর বী*ভৎস দেহের পরোয়া না করেই একেকজন আছড়ে পড়ল তার বুকে, উদরে। মাতম উঠলো, ঝাঁকাতে থাকলো প্রাণপণে। যেন তাতেই প্রাণের সঞ্চার হবে এই নিথর শরীরে। দোহা হাতটা নিজের গালে চেপে ধরলো, প্রচন্ড এক কষ্ট নিয়ে কর্কশ ভাঙা কন্ঠে চিৎকার ছুঁড়লো,
- অনিক, প্লীজ! ভিক্ষা দে, একটুখানি ভিক্ষা দে ভাই আমার! আমাকে মা*রবি না? গা*লি দিবিনা? দে না প্লীজ, খুব করে শুনতে ইচ্ছা হচ্ছে রে ভাই....চোখ মেল ভাই, চোখ মেল.......
আমারা পিছন থেকে দোহাকে জড়িয়ে ধরে তার কাঁধে মাথা গুঁজে কাঁদতে থাকলো। কিন্তু দোহা কাঁদলোনা, একটুও কাঁদলোনা।
- তোকে ছাড়া আমরা কি করবো রে বন্ধু?
- দোস্ত, দেখনা, এই! দেখ আজকের দিনটা কত সুন্দর!
- ক্যানাডা যাবিনা তুই? তোর ফ্লাইট মিস হয়ে যাবে তো! উঠবি না দোস্ত?
- আংকেল আসছে, আন্টিও আসছে, চোখ খুলে উঠে হাস, তুই মজা করছিস না? মজা করছিস আমাদের সঙ্গে?
- অনিক!
রাজীব এবং জিই - শুর ক্রমান্বয় আর্তনাদ ছাপিয়ে গেলো সবকিছুকে। দোহার আলিঙ্গনে তারা বিলীন ঘটালো নিজেদের। একটিমাত্র পাথরমানব যেন দোহা, যাকে ঘিরে সকলের একটুখানি আশ্রয় খোঁজা। আশেপাশের কর্মীরা তাদের মাতমে কিছুটা সময় দিলেও আর সম্ভব নয়, শরীরটাকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলো। একজন দোহার কাঁধ চেপে জানালো,
- প্লীজ, সিটি হাসপাতালে যোগাযোগ করো। ডি এন এ টেস্ট করে তারপরই....হস্তান্তর করা হবে।
দোহা কোনো জবাব দিতে পারলোনা। অস্বচ্ছ দৃষ্টিতে একদৃষ্টে চেয়ে থাকলো।
প প প— বাজছে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন।
━━━━━━━━━━━━━
“ রাজধানীর স্কাইহাই ক্যাফেতে সিলিন্ডার বি*স্ফো*রণে ভয়াবহ অগ্নিদূর্ঘটনা। ফায়ার সার্ভিসের ২৪ টি ইউনিট কাজ করছে মোকাবেলায়। এই পর্যন্ত সাতটি মৃ*তদেহ এবং এগারোজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে......”
হাসপাতাল ভীষণ ব্যস্ত। ডাক্তার - নার্স সকলে ছোটাছুটি করছেন। একের পর এক রোগী আসছে, বার্ন ইউনিটে ট্রান্সফার করা হচ্ছে তাদের। এর মাঝেই দেয়ালে লাগানো টিভির খবর প্রতিধ্বনিত হয়ে যাচ্ছে গুঞ্জনের মতন।
ওয়েটিং রুমের দেয়াল ঘেঁষে বসে আছে আমারা। তার ঠিক পাশেই আশফিকা। মেয়ের কাঁধে জড়িয়ে রেখেছেন নিজের বাহু ,ভরসার উদ্দেশ্যে। একদম পাথরের মতন থমথমে আমারার মুখ। কালিঝুলি লেপ্টে আছে, চোখজোড়া ফুলে উঠেছে। পরোয়া নেই। বিধ্বস্ত সৈনিকের মতন বসে আছে সে।
বিপরীত প্রান্তের বেঞ্চে বসে আছেন জাইন। ভগ্নপ্রায় অবয়ব, অনুভূতিহীন চেহারা। রোবট যেন। জাগতিক কোনো কার্যক্রমে তার আর কিছুই যায় আসেনা। এমনি এক কঠোর অনুভব খচিত চিত্তে। কি ভাবছেন তিনি? কারো পক্ষে আন্দাজ করাও সম্ভব নয়।
কত ঘন্টা পেরিয়েছে? জানা নেই। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমেছে। নিদারুণ হাহাকার বাতাসে। ওষুধ আর পোড়ার মিশ্র গন্ধ। সঙ্গে এক অদ্ভুতুড়ে নিস্তব্ধতা। মৃ*ত্যুর নীরবতা।
- মিস্টার আমিন....
সম্বোধনটি কানে যেতেই পুতুলের মতন মুখ তুলে তাকালেন জাইন। একজন ডাক্তার দাঁড়িয়ে আছেন। জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে তিনি বললেন,
- দ্যা পেশেন্ট ওয়ান্টস টু.... মিট ইউ অল।
বাক্যটির ভিন্ন কোনো অর্থ নেই, সবটাই স্পষ্ট। যন্ত্রের মতন উঠে দাঁড়ালেন জাইন, পায়ে পায়ে উঠলো আমারাও। আশফিকার বিচলিত পদক্ষেপের অনুসরণে সকলে প্রবেশ করলো কেবিনের ভেতরে। ইমার্জেন্সী পেশেন্টের রুমে প্রবেশের অনুমতি নেই, কিন্তু যখন দেয়া হয়েছে তার অর্থ....
ভাবতে পারলোনা কেউ।
বিপবিপ শব্দে চলছে মনিটর, সঙ্গে অক্সিজেন মাস্কের মৃদু চাপা গুঞ্জন। বিছানায় শুয়ে আছে জারা। শরীরে এবং মুখের অর্ধেক অংশে ব্যান্ডেজ জড়ানো। চোখজোড়া খোলা, ফ্যাকাশে নয়নে তাকিয়ে আছে সিলিংয়ের দিকে। শ্বাসনালীর পঁচাশি শতাংশ পু*ড়ে গিয়েছে তার, আর কিছুই বলার অপেক্ষা রাখেনা। আমারা বেডের হাতল চেপে ধরে দাঁড়ালো আশফিকার সঙ্গে। জাইন ধীরপায়ে হেঁটে পৌঁছালেন মেয়ের কাছে। একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারলেন না। শুধু তাকিয়ে রইলেন। জারা চোখ উল্টে তাকালো তার দিকে। অক্সিজেন মাস্কের ভেতরে সে বুঝি মৃদু একটু হাসলো।জাইন নিজের কাঁপা দুহাত তুলে অত্যন্ত আলতোভাবে ছুঁয়ে দিলেন জারার মুখ। মেয়ে তার চোখ বুঁজে প্রাণভরে অনুভব করলো সেই স্পর্শ।
- কোকো....স্টে উইথ মি...প্লীজ?
ফিসফিস কন্ঠস্বর, ভেজা অনুনয়। আর কিছুই করতে পারলেন না জাইন, বলতেও পারলেন না। জারা চোখ খুললো, যেন নয়ন দিয়েই প্রকাশ ঘটালো সকল অব্যক্ত অনুভূতির। তারপর অজান্তে নিজের বাম হাতটি সামান্য একটু তুললো। ইশারা বুঝে আমারা ছুটে এলো, সযত্নে আগলে নিলো বান্ধবীর হাত, বুকের মাঝে। জারা চোখ ঘুরিয়ে তাকালো, তাতে এক প্রশ্ন দেখতে পেলো সে।
“ অনিক বেঁচে আছে? ”
চুরমার হয়ে গেলো আমারা। মাথা নাড়লো তীব্রভাবে। জারা একপলক দেখলো, তারপর জোরালো এক প্রশ্বাস টানলো। মনিটরের বিপবিপ ধ্বনি বেড়ে গেলো সহসাই। আতঙ্কের স্রোত খেলে গেলো সকলের অন্তরে। আমারা নিজের হাতে জারার ব্যান্ডেজ জড়ানো হাতটি চেপে বসতে অনুভব করলো। অক্সিজেন মাস্কের ভেতর থেকে ম্রিয়মাণ একটি কন্ঠ ভেসে এলো, ঝুঁকলো আমারা শুনতে,
- পা....পাপা.... পাপাকে....দেখে রাখিস....আমার পাপা খুব একলা....
টপটপ করে গড়াতে থাকলো আমারার অশ্রু। কেউই তাদের অন্তিম মুহূর্তে বাঁধা দিচ্ছেনা। জারা আরো একবার প্রগাঢ় প্রশ্বাস টানলো, সামান্য হাসলো বোধ হয়। তাকিয়ে রইলো অদূরপানে, দৃষ্টি তার ক্রমশই অস্বচ্ছ হয়ে আসছে,
- লাভ ইউ....মধু! পাপা....শান্তি... আমি শান্তি... অপেক্ষা... অনিক অপেক্ষা... ওপারে....শান্তি.....
“ শান্তি ” এবং “ অপেক্ষা ”— অন্তিম দুটি শব্দ। তারপরই মিইয়ে এলো সবকিছু। মনিটরের সবুজ দাগটি সরলরেখায় পরিণত হলো। বুঁজে এলো চোখের পাতা। ঠোঁটে লেগে রইলো সূক্ষ্ম এক হাসির ধারা।
- ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন....
নার্সের মধ্যে কেউ বোধ হয় বিড়বিড় করলো। কে জানে! আমারা জানেনা তো! সে তাকিয়ে আছে বন্ধুর খোলসের আড়ালে থাকা তার বোনটির দিকে।
চলে গিয়েছে জারা আমিন।
কারো বা মেয়ে, কারো বা বন্ধু, কারো বা না হওয়া প্রেম।
কিন্তু দিনশেষে সে সবারই....একমাত্র অবলম্বন।
তার প্রেম হয়ত তার মতই চলে গিয়ে বেঁচে গিয়েছে। অপেক্ষা করছে পরপারে তার হাতটি ধরে পথচলার।
কিন্তু যারা এই পৃথিবীর বুকে রয়ে গেলো তারা?
কিভাবে বাঁচবে তারা নিজেদের অবলম্বন ছাড়া?
শব্দরা নির্বাক।
—চলবে—
[ 🙂দেন আমাকে গা*লি দেন, আজকে আমি সব শুনবো...]