#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা২৮
পর্ব ২৮: [ আফটার ইফেক্ট ]
━━━━━━━━━━━━━━━━
শনশন হাওয়া বইছে। নভেম্বরের শীত জেঁকে বসেছে গোটা শরীরজুড়ে। থেকে থেকে শিরদাঁড়া জমে যাচ্ছে। শুষ্ক পাতা থোকায় থোকায় জমা হচ্ছে উঁচু হয়ে থাকা মাটির উপর। নতুন কবর। তার চিহ্ন স্পষ্টত ছড়িয়ে আছে ভূমিতে। হাঁটু জড়িয়ে ধরে সেই ভূমিতে বসেই নিষ্পলক চেয়ে আছে দোহা। বায়ুর ঝাঁপটায় তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। পাতলা শার্টের ভেতর শীত ঢুকে শরীর হিম করে তুলছে। তবুও কোনো পরোয়া নেই। শূণ্য দৃষ্টি পড়লো কবরের এক কোণায় রোপিত ছোট চারাগাছটির দিকে। অনিকের মা, মিসেস রহমান দোহার দুটি হাত আঁকড়ে ধরে কান্নার দমকের মাঝে মাঝে আর্জি জানিয়েছিলেন,
“ আমার ছেলেটা তোমাকে নিজের ভাইয়ের মতন মনে করতো। তোমার দুটো হাতের ছোঁয়া ওর কবরে অন্তত লেগে থাকুক.....”
সেই আর্জি শোনার পর দোহার সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার কথা ছিলো। কিন্তু সে ভাঙেনি। অনিকের জানাযার বিশাল জমায়েতে এমন একটা মানুষের অস্তিত্ব ছিলোনা যার চোখে পানি দেখা যায়নি। তবে পাষাণের মতন শুকনো খটখটে ছিলো দোহার দুই নয়ন। অশ্রু তো দূরে থাক, তাতে টলটলে অবয়বটুকুও দেখা যায়নি। তাকে হয়ত অনেকেই পাথর ভেবেছে, কিংবা মনে করেছে এই মৃত্যুতে তার কিছুই যায় আসেনি। তবে দিনশেষে দোহা জানে সে কি হারিয়েছে।
বন্ধু? উহু....ভাই হারিয়েছে সে।
এখনো অনিকের খিলখিলে হাসির আওয়াজ তার কানে গুঞ্জরিত হয়ে চলেছে। এই বুঝি ছুটে এসে হাসিমুখে জানাবে,
“ আজকে কি হয়েছে জানিস শালা? ”
রেগে গিয়ে হয়ত দোহার পিঠে ঘুষি হাঁকিয়ে বলবে,
“ মান্দারের বাচ্চা, তোকে চুপ থাকতে বলেছিনা? ”
কখনো বা চেঁচিয়ে উঠবে অপরপক্ষের উদ্দেশ্যে,
“ শালা কুকুরের দল, আব্বুকে খুঁজিস আব্বুকে? এইযে তোর আব্বু! কত্ত বড় সাহস তোরা দোহার গায়ে হাত দিস?! ”
ছেলেটা নেই। কেউ আর কোনোদিন দোহার পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে লড়াই করবেনা। ঝগড়া হলে আড়াল থেকে তাকে দেখে রাখবেনা। বন্ধুত্বের দাবি নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াবে না। তার দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমির হাসি হাসবেনা। দোহার কাঁদা উচিত, ভীষণভাবে। কিন্তু সে পারছেনা। ভেতরের কিছু একটা আজীবনের জন্য গুঁড়িয়ে গিয়েছে। অনুভূতির ইন্দ্রিয়টুকু হয়ত।
দোহা কি আসলেই পাথর হয়ে গিয়েছে? নাকি হারাতে হারাতে অভ্যস্থ হয়ে গিয়েছে। পরিবার, মা, বন্ধু... এরপরও হারানোর আর কিছু কি বাকি আছে?
নিজের কাঁধে পরিচিত স্পর্শ অনুভব করলো দোহা। ফিরে তাকানোর প্রয়োজন হলোনা। তার দুপাশে নত হয়ে বসলো জিই - শু আর রাজীব। উভয়ের দৃষ্টি কবরের দিকে। দীর্ঘক্ষণ নীরবতা, শো শো হাওয়ার আর্তনাদ। তারপর মিনমিন কন্ঠে জিই - শু জানালো,
- আমি চায়নায় ফিরে যাচ্ছি।
অন্য সময় হলে সকলে ভীষণ ক্ষেপলেও আজ কিছুই অনুভব করলোনা যেন। দোহা শুধু শুনলো। সে জানে, আজ নয়ত কাল এটাই হওয়ার ছিল। রাজীব একটি বুনোঘাসের পাতা আনমনে ছিঁড়তে ছিঁড়তে জিজ্ঞেস করলো,
- আর আসবি না?
- খুব দরকার না হলে, না।
- আমিও অস্ট্রেলিয়া যাবো। ড্যাড চায় আমি কিছুদিন কাজিনদের সঙ্গে কাটিয়ে আসি। আমাকে বলেনি কিন্তু আমি জানি, ওরা থেরাপিস্ট ঠিক করেছে।
নির্দ্বিধায় বলে গেলো রাজীব। যেন তেমন কোনো ব্যাপার নয় এসব। বন্ধুদের দলটা শেষ হয়ে গিয়েছে আগেই। আর আজ, বিচ্ছিন্নও হয়ে যাচ্ছে। দোহা নিজের হাঁটু আঁকড়ে ধরলো, নিঃশব্দে ভেবে গেলো, রাজীব আর জিই - শুর বাস্তবতা থেকে লোকানোর জায়গাটুকু অন্তত আছে। কিন্তু তার?
দিনশেষে আরো একবার নিজের মাথায় নিজেকেই হাত বুলিয়ে উঠে দাঁড়াতে হবে দোহার।
তাইতো করে আসছে সে আজীবন।
- দোহা?
রাজীবের হাত দোহার কাঁধের উপর ছড়িয়ে পড়লো। জিই - শু তার শরীর ঘেঁষে এলো। যেন উভয়ে তার অনুভূতি টের পাচ্ছে। তাকে খানিকটা ঝাঁকিয়ে ব্যথিত এক কন্ঠে রাজীব বলতে শুরু করলো,
- অনিক সবসময় কি বলতো জানিস?
জবাব না দিলেও কান খাড়া হলো দোহার।
- যে তুই নাকি আমারাকে ভালোবাসিস, সত্যিকারে ভালোবাসিস।
সম্পূর্ণ জমে গেলো দোহা। স্থবির হয়ে চেয়ে রইলো বন্ধুদের মুখের দিকে। ক্ষীণ এক মলিন হাসি লেপ্টে আছে তাদের ঠোঁটে। জিই শু জানালো,
- ও সবসময় নিজেকে দোষারোপ করতো। বলতো যে, যদি ও তোকে মেয়েটার হৃদয় ভাঙতে বাধ্য না করতো, তাহলে আজকে তুই একা থাকতিনা। তোর পাশে তোর হাত ধরে চলার মতন একটা মানুষ থাকতো। তুই ভেঙে পড়লে তোকে আগলে নেয়ার একটা মানুষ থাকতো।
- অনিক ভাবতো, ও তোর থেকে সেই মানুষটাকে কেড়ে নিয়েছে। তুই ওর জন্য একা হয়ে গিয়েছিস, একদম একলা।
টলটলে হয়ে উঠলো দোহার চোখ। যে অনুভূতি গায়েব হয়ে গিয়েছিল ভেবেছিলো সে, তাই অদ্ভুতভাবে ফিরে এলো। বুকের ভেতর ক্রমান্বয়ে মোচড় দিতে থাকলো বেদনারা। রাজীব আর জিই - শু নিজেদের আলিঙ্গনের মাঝে দোহাকে আগলে নিলো। একেকবার ফিসফিস করে বলতে থাকলো,
- আমরা আর থাকবো না রে।
- তুই একলা হয়ে যাবি। মন মানছেনা তোকে ফেলে যেতে।
- কিন্তু যেতে হবে। মন - পরিবারের কাছে আমরা বাঁধা।
- দোহা, তোকে এগিয়ে যেতে হবে। অনিক চেয়েছিল তুই এগিয়ে যা।
- কি...কিন্তু....
রাজীব দুহাতে দোহার মুখ চেপে ধরলো,
- যদি সত্যিই অনিকের কথা সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে ওর পরপারের দুঃখ বাড়াস না। যদি সত্যিই তুই আমারাকে ভালোবেসে থাকিস, তবে এটাই সময় ওকে নতুনভাবে আগলে নেয়ার। এবার, কোনো মিথ্যার অজুহাতে নয়, পবিত্র অনুভূতির মায়ায়।
জিই - শু ঝুঁকে এসে তার দুহাত চেপে বললো,
- আমারা জারাকে হারিয়েছে। আমাদের থেকে তুই ওকে ভালো করে চিনিস। তুই জানিস ওর ভেতর এখন কি চলছে কিংবা ঠিক কিভাবে বেঁচে আছে। দোহা, তোদের একে অপরকে দরকার। এই সময়টায় তোদের উচিত একে অপরের অবলম্বন হওয়া। অনিক আর জারা চলে গিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাদের সবচেয়ে কাছের দুইটা মানুষকে ফেলে রেখে গিয়েছে। তুই আর আমারা। তোরা একে অপরকে যেভাবে বুঝতে পারবি, বিশ্বাস কর আর কেউ সেটা পারবেনা। এখনি সময় তোদের নিজেদের দূরত্ব মিটিয়ে এক হওয়ার, নিজেদের ঢাল হওয়ার। অনিক আর জারাও হয়ত তাতে খুশি হবে। যখন তোরা ওদের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকবি, কষ্ট পাবিনা, তখন হয়ত ওরা সত্যিকারের খুশি হবে রে।
একটি শক্ত ঢোক গলাধঃকরণ করলো দোহা। দুহাত কাঁপতে থাকলো তার। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছে। সত্যিকার অর্থে, সে নিজেও এমনটা বহুবার ভেবেছে। আমারা মেয়েটা সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে গিয়েছে। যে একটামাত্র বন্ধু নামক অবলম্বন ছিলো তার, সে অনিকের সঙ্গে পরপারের দুনিয়ায় চলে গিয়েছে। কেমন আছে আমারা? ঠিক নেই। যেমনটা নেই দোহা।
অনিক আর জারা চলে গিয়েছে। কিন্তু তারা কি প্রকৃতপক্ষে কোনোদিন খুশি হবে তাদের রেখে যাওয়া মানুষগুলোর পরিণতি দেখে?
চিনচিন করে উঠলো বুকটা। অজান্তেই দোহা উঠে দাঁড়ালো। রাজীব এবং জিই - শুর দিকে তাকালো অব্যক্ত এক দৃষ্টিতে। তারপর নয়ন ফেরালো কবরের দিকে। শান্ত অথচ গম্ভীর এক স্বরে বললো,
- জিই - শু, তুই কোনদিন যাবি আমাকে বলিস, তোর সাথে এয়ারপোর্টে যাবো। রাজীব, তুইও। পারলে একটাবার দেখা করিস, এর বেশি কিছু চাইবো না। অনিককে শেষ দেখা দেখতে পারিনি, তোরা অন্তত আমাকে সেই দুঃখে ফেলিস না।
অন্তিম একবার কবরের দিকে তাকিয়ে দোহা উল্টো ঘুরে গেলো। দুহাত মুষ্টিবদ্ধ হলো তার অজানা এক অনুভবে। রাজীব এবং জিই - শু নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলো তার চলার পথে। তারপর উভয়ের বুক চি*রে বেরোলো এক দীর্ঘশ্বাস।
অনিক থাকলে শীতের দিনে শুধু একটা পাতলা শার্ট পরে ঘোরাফেরা করার কারণে দোহাকে একপ্রস্থ বকাঝকা করে নিজের জ্যাকেটটা খুলে গায়ে জড়িয়ে দিতো।
স্মৃতি এবং উপলব্ধি উভয়কে তীব্র বেদনায় পূর্ণ করে তুললো।
━━━━━━━━━━━━
আমিন ভিলা।
দরজার লকে চাবি ঢুকিয়ে মোচড় দিতেই “ক্লিক” শব্দ করে খুলে গেলো দরজা। চাবিটা পুনরায় পকেটে ভরে ভেতরে ঢুকলেন আশফিকা। তার অনুসরণে পুতুলের মতন হেঁটে আসছে আমারা। গোটা বাড়িটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। লাইট জ্বালানো হয়নি। গুমোট অনুভবে নিমজ্জিত সমস্ত স্থান। অবহেলিত বিড়াল দুটো জানালার কাছে একে অপরের গা ঘেঁষে বসে আছে। তারাও যেন টের পেয়েছে বিরহ, মনিবের অনুপস্থিতি। গাছগুলো পানির অভাবে শুকিয়ে উঠছে। জারার ব্যবহারের দুটো বক্সিং গ্লাভস এবং হাতের ব্যান্ড ঠিক একইভাবে এলিয়ে পড়ে আছে সোফার উপর।
আশফিকার বুকটা ভার হয়ে এলো। নিঃশব্দ মাপা মাপা পদক্ষেপে এগোলেন তিনি। আশেপাশে তাকালেন। আস্তে আস্তে লাইট জ্বালালেন। পুনরায় আলো ফুটলো বাড়ির ভেতরে। তাতে আরো করুণ অবস্থা লক্ষ্য করা গেলো চারপাশে। একটা ম্যাট বিছিয়ে রাখা ফ্লোরে। তার পাশে গোটা কতক বইপত্র ছড়ানো। উহু, বই নয়। মোটা অ্যালবাম। আমারা চিনতে পারলো। জারার ছোটবেলার সব ছবি দিয়ে ভরপুর একেকটা অ্যালবাম। একটা খোলা পরে আছে। তাতে সেন্ট পিটার্সবার্গের শাড়ী পরিহিত ছবিগুলো এখনো জ্বলজ্বল করছে। আমারা স্থবির হয়ে গেলো। যে অনুভূতিকে সে দমিয়ে রাখতে চেয়েছে সেই অনুভূতি নতুনভাবে উতলে উঠছে। সে এতদিন অবধি একটা ঘোরের মধ্যে ছিলো। জারা যে নেই, আর কোনোদিন ফিরে আসবেনা ব্যাপারটা তার বিশ্বাসই হয়নি। কিন্তু আজ, প্রতিটা পরিস্থিতি যেন তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে কি হারিয়েছে সে!
আশফিকা পায়ে পায়ে কিচেনে এলেন। সব তৈজসপত্র অব্যবহৃত পরে আছে। রান্না চড়েনি। জীবনযাপনের কোনো ক্রিয়াই এই বাড়িতে সম্পন্ন হয়নি। তিনি একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। অতঃপর খুঁজেপেতে কেবিনেট থেকে চালের পাত্র বের করে ধুয়ে নিয়ে রাইস কুকারে দিয়ে দিলেন। আমারা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে দেখছে আশেপাশে। খানিকটা কাজ গুছিয়ে এসে আশফিকা শান্ত স্বরে বললেন,
- জাইনের রুম কোনদিকে জানো?
আমারা প্রথমটায় হাত তুলে দেখিয়ে দিলো। তারপর নিজেই এগোলো। আশফিকা মেয়েকে অনুসরণ করলেন নীরবে। উভয়ে সিঁড়ি বেয়ে দুইতলায় এলো। জাইনের রুমের দরজাটা চাপানো। তাতে ভেতরটা সম্পূর্ণ অন্ধকার দেখা যাচ্ছে। আমারা এগিয়ে গেলো, আস্তে করে ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। অন্ধকারে সয়ে আসতে তাকে চোখ পিটপিট করতে হলো বেশ কয়েকবার। তারপর চোখের সামনের দৃশ্য লক্ষ্য করে সে জমে গেলো।
রুমের বিছানার বদলে ফ্লোরে এলিয়ে আছেন জাইন। একটা কোলবালিশ মাথার নিচে দেয়া। ঠান্ডা শক্ত মেঝেতেই শুধু একটা পাতলা সিল্কের শার্ট জড়িয়ে শুয়ে আছেন তিনি। বোতামগুলো সব খোলা, উন্মুক্ত বুকে এলোমেলো ছড়ানো কিছু নখরের দাগ। তিনি নিজে করেছেন, সন্দেহ নেই। একপাশে ছড়ানো বেশ কয়েকটা কাঁচের বোতল, সঙ্গে কয়েকটা গ্লাস। কিছু আবার ভেঙেচুরে বেশ বিপদজনকভাবেই ছড়িয়ে আছে তার গায়ের কাছে। তবুও পরোয়া নেই। মৃদু আলোয় দেখা যাচ্ছে জাইনের সুদর্শন মুখ একদম চুপসে এসেছে। চুলে এক বিন্দু আঁচড় পড়েনি। সবসময় ক্লিন শেভড থাকা মুখে জমতে শুরু করেছে থোকা থোকা দাড়ি। চশমাটা ভেঙে দু টুকরো হয়ে পড়ে আছে বিছানার উপর। তাতে কয়েক ফোঁটা, র*ক্তের দাগ। চিৎ হয়ে শুয়ে সিলিংয়ের দিকে মুখ করে চোখ বুঁজে ছিলেন তিনি। আমারা এবং আশফিকা প্রবেশ করতেই চোখ খুলে তাকালেন।
এক মুহুর্ত সবকিছু নীরব। তারপর জাইন নিজেকে টেনে তুললেন,
- ওহ...মিসেস....চৌধুরী.... আ’ম সরি...
কন্ঠটা শোনালো ভীষণ অচেনা। একদম বসে গিয়েছে। আগের প্রফুল্লতার ছিটেফোঁটা অবধি অবশিষ্ট নেই। নেই কোনো অনুভূতি। আশফিকা স্থির তাকিয়ে রইলেন। জাইন হাতড়ে বিছানা থেকে ভাঙা চশমাটাই তুলে নিয়ে চোখে পড়লেন, তারপর ক্ষীণ কিছু শব্দ হিসিয়ে উঠলেন। বোঝা গেলোনা কিছুই।
জাইন নিজেকে শক্ত রেখেছেন। অদ্ভুত হলেও সত্য তাকে কাঁদতে দেখা যায়নি। জারার দাফনের সময় অদূর থেকে আশফিকা তার চোখ বেয়ে দুফোঁটা অশ্রু গড়াতে দেখেছিলেন নিঃশব্দে, ওটুকুই। আদতে হয়ত তাকে ভীষণ শক্ত মানুষ মনে হচ্ছে কিন্তু আশফিকা খুব ভালো করেই জানেন এমন মানুষগুলো ভেতর থেকে কতটা ফাঁপা হয়। নিজের মেয়ে আমারাকেই তো দেখেছেন তিনি!
আমারা এগিয়ে গিয়ে জাইনের কাছে উবু হয়ে বসলো। পাশের বোতলগুলোর একটা তুলে নিয়ে মিনমিন করলো,
- আংকেল, আপনি ড্রিঙ্ক করেছেন?
কোনো জবাব এলোনা। জাইন তাকিয়ে আছেন জানালার দিকে।
- জারা ড্রিঙ্ক পছন্দ করতো না।
বিছানার চাদরে আঁকড়ে বসলো জাইনের হাত। আমারা বোতলটা দূরে ছুঁড়ে ফেললো। ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে দেখলো। অতঃপর হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে ড্রয়ার খুলে ছোট্ট বক্স বের করলো। ভেতর থেকে ব্যান্ডেজ আর অ্যান্টিসেপটিক নিয়ে সে জাইনের কাছে গেলো। কিছু না বলেই তার বাম হাতটা টেনে নিলো। কব্জির উপরে কা*টা শুকনো অবহেলিত ক্ষত ধীরে ধীরে পরিষ্কার করে নিয়ে তাতে ব্যান্ডেজ করে দিতে লাগলো। জাইন নিঃশব্দে মেয়েটার কাজ দেখে গেলেন। আমারা মুখ তুললো। কাঁপা কাঁপা ডান হাত বাড়িয়ে জাইনের ফ্যাকাশে মুখ স্পর্শ করলো, অযত্নের শুষ্ক রেখা টের পেলো। অতঃপর নিজের অশ্রু সংবরণ করে প্রায় ফিসফিস করে বললো,
- আংকেল, একটু কাঁদুন, প্লীজ?
জাইন দাঁতে ঠোঁট কামড়ে ধরলেন, জ্বলজ্বলে নয়নে নিষ্পলক চেয়ে থাকলেন। আমারার গাল বেয়ে নীরব অশ্রু গড়াতে আরম্ভ করলো। ফুঁপিয়ে উঠলো সে। তারপর দুহাতে জাইনের মুখ ধরে আবেদন জানালো,
- কাঁদোনা...অশ্রু ঝরাও, আমি দেখবো তোমায়।
শক্ত শৃঙ্খলটি ভেঙে গেলো হুড়মুড় করে। জাইন বুঝতেও পারলেন না কিভাবে তার নিজের দুগাল বেয়ে উষ্ণ অশ্রু অঝোর ধারায় ঝরতে লাগলো। কেঁপে উঠলো সমস্ত শরীর। দুবাহু বাড়িয়ে তিনি আঁকড়ে ধরলেন আমারাকে, মুখ গুঁজে দিলেন মেয়েটার কাঁধে। অতঃপর.....
নিদারুণ কান্না।
সন্তানহারা এক পিতার হাহাকার।
- কোকো....আমার কোকো!
আশফিকা দুহাতে মুখ চেপে ধরলেন, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেলো সম্পূর্ণ তার। জাইন আমারার মাঝে ভেঙে পড়লেন। ঠিক যেমন একটি ইট সরিয়ে নিলে হুড়মুড় করে দেয়াল গুঁড়িয়ে যায়, তেমন করে।
- আমার একটামাত্র কোকো বার্ড, আমি ওকে ছাড়া বেঁচে থেকে কি করবো? কার জন্য সকালে ঘুম থেকে জেগে উঠবো? কার জন্য রান্না করবো? কাকে হাত তুলে খাইয়ে দেবো? কে আমাকে বলবে....“ পাপা স্টপ ইট! ”
কান্নার দমকে দমকে জাইনের শরীর কেঁপে উঠল। আমারা শুধু তাকে আঁকড়ে ধরে রাখলো। উগড়ে দিতে দিলো নিজেকে।
- পিতার কাঁধে সন্তানের লা*শ, কোকোর লা*শ! কোকোর লা*শ অনেক ভারী! আমি পারছি না, আমি বইতে পারছিনা, আমার কাঁধ ভেঙে আসছে বার্ড....!
সিক্ত অনুভূতিগুলো গিলে নিলো আমারা। ক্রন্দনমিশ্রিত আর্দ্র কন্ঠে ফিসফিস করলো,
- কোকো আছে, তোমার অন্তরে কোকো আছে। তোমার কোকো তোমাকে ভাঙতে চায়নি। তবে কেনো ভাঙছো তুমি? কোকো থাকলে রাগ করতো তোমার উপর। আর কক্ষনো কথা বলতো না।
- কোকো আর কখনোই কথা বলবেনা। কোকো আর পাপা বলে ডাকবেনা। কোকোকে আমি নিজ হাতে ওই শীতল অন্ধকার কবরে শুইয়ে দিয়ে এসেছি। আমার কোকো কষ্ট পাচ্ছে। ভীষণ কষ্ট।
- হ্যাঁ, কষ্ট পাচ্ছে। তোমাকে দেখে কষ্ট পাচ্ছে। যে ওর প্রিয় পাপা এভাবে ভেঙে যাচ্ছে। কোকো ভাঙতে চায়নি, কোকো গড়তে চেয়েছে। কোকো তোমাকে একলা করতে চায়নি, কোকো চায়নি, ও আমাদের সাথেই আছে, কোকো আমাদের অন্তরেই আছে....
ফিসফিস করতে থাকলো আমারা। জাইন তাকে আরো জোরালোভাবে আঁকড়ে ধরলো। ঠিক যেন ডুবন্ত কোনো ব্যক্তি বাঁচার আশায় পানিতে ভাসমান একটিমাত্র খড়কুটো আঁকড়ে ধরেছে।
কিছুক্ষণ পর।
জাইনকে ধরে নিয়ে ডাইন ইন টেবিলে বসালো আশফিকা এবং আমারা। তাকে একপ্রকার জোর করেই গোসল করিয়ে পোশাক বদলে নিয়ে আসা হয়েছে। তিনি ব্যথিত মুখে বসে আছেন। চোখ দুটো ফুলে উঠেছে, বারংবার অজান্তেই অশ্রু গড়াচ্ছে। আমারা পাশে দাঁড়িয়ে টিস্যু দিয়ে বারবার তা মুছে দিচ্ছে। আশফিকা প্লেটে খানিকটা গরম গরম ভাত এবং ডিমভাজা - চিংড়ি ভাজা নিয়ে এলেন। অল্প সময়ে তিনি খুঁজেপেতে এটুকুই করতে পেরেছেন। জাইনের সামনে প্লেট রেখে তিনি বললেন,
- প্লীজ খেয়ে নিন। এভাবে অনিয়ম করলে শরীর খারাপ হবে।
জাইন কোনো প্রতিক্রিয়া করলেন না। তাতে আশফিকা একটি নিঃশ্বাস ফেললেন। হাত ধুয়ে এসে নিজের হাতে প্লেট তুলে নিয়ে ভাত মাখিয়ে জাইনের মুখের সামনে ধরলেন। চোখ পিটপিট করে তাকালেন জাইন, আশফিকা অদ্ভুতুড়ে এক আদুরে কন্ঠে আর্জি জানালেন,
- একটুখানি খান, প্লীজ?
জাইন খেয়ে নিলেন, একদম শিশুদের মতন। আশফিকা আনমনে অতি মৃদু হাসলেন। খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষে তিনি গোটা অগোছালো হয়ে থাকা ঘরটা গুছিয়ে নিলেন। বিড়াল দুটোকে ক্যাটফুড খেতে দিলেন। সোফার উপর বসে জাইন সমস্ত দৃশ্য লক্ষ্য করে গেলেন। তারপর একটা সময় মৃদু কন্ঠে বললেন,
- আপনাদের এতকিছু করতে হবেনা মিসেস চৌধুরী। অনেক ধন্যবাদ, বাট.... আই উইল ম্যানেজ।
- সে কত ম্যানেজ করেছেন এই কদিনে তা তো দেখতেই পাচ্ছি।
আশফিকা বিড়াল দুটোকে আদর করে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। আমারা আশেপাশে নেই, সে জারার রুমে গিয়েছে। জাইন বেশ কয়েক প্রস্থ প্রশ্বাস টেনে শুধালেন,
- আমি আপনার কিংবা আপনার মেয়ের কেউই হই না। তবুও আপনারা কেনো এতো করছেন আমার জন্য?
আশফিকা নিজের পকেট থেকে আমিন ভিলার চাবিটা বের করে দেখালেন। যেটা তিনি কোনো অনুমতি ছাড়াই গতবার সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, এই বাড়িতে তাকে শীঘ্রই আবার আসতে হবে। জারাকে হারিয়ে জাইন ঠিক থাকবেন না, জানতেন আশফিকা। হয়ত তার মনে ভয় হয়েছিলো, মানুষটা মনঃকষ্ট দমাতে উল্টোপাল্টা কিছু না করে বসে! দিনশেষে, তার তো সত্যিই আর কেউ রইলোনা।
নাকি রইলো?
আশফিকা জাইনের নয়নমাঝে চেয়ে সামান্য একটু হাসলেন, নিঃশব্দে। জবাব দিলেন,
- মেইবি.... আই কেয়ার অ্যাবাউট মাই ওউন পিপল টু?
জাইন কোনো জবাব দিতে পারলেন না আর, স্থির তাকিয়ে রইলেন আশফিকার মুখপানে।
—চলবে—