ফন্ট সাইজ:
থিম:
স্বরলিপিতে তুমি

৩০তম পর্ব

লেখক: জাবিন ফোরকান

#স্বরলিপিতে_তুমি

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা৩০

পর্ব ৩০: [ বিদায় সূর্যাস্ত ]- ( শেষাংশ )

━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

ভুলে যাওয়া কি এতই সহজ?

যদি সমাপ্তিতে ভুলে যাওয়াই ছিলো তবে সূচনায় কেন এক জনম মনে রাখার ওয়াদা হয়েছিলো?

এর জবাব কে দেবে? পরিস্থিতি? ভাগ্য? নাকি এই পৃথিবী?

আমারা ফ্যালফ্যাল করে দোহার দিকে শুধু তাকিয়েই থাকলো। হাজার চাওয়া সত্ত্বেও মনকে যেনো কিছু অনুভব করাতে পারলোনা। ক্ষমা? হয়ত মনের কোণে একবার ক্ষমার দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছিলো। সেই দুয়ারে আজ দোহা নিজ হাতে তালা দিয়ে দিলো।

এত অনুভূতি, এত স্মৃতি, এত আবেগ, এত ভালোবাসা, এত বন্ধুত্ব, এত টান, এত মায়া শুধু ভুলে যাওয়ার জন্য?

আমারার মাথা ঝুলে পড়লো। কোলের দিকে তাকিয়ে থাকলো সে। ভীষণ হাসি আসছে। অধর তার পরিতাপের এক করুণ নীরব হাসিতে বাঁকলো। কোলের উপর রাখা সার্টিফিকেটের ফাইলটা সে চেপে ধরে অদ্ভুত এক গভীর কন্ঠে বললো,

- ভুলে যেতেই তো বসেছিলাম। তবে আবার কেনো এলে কালবৈশাখীর ঝড় হয়ে? কেনো ঘটালে অনুভূতির বর্ষণ?

দোহা নিশ্চুপ। মেঝের আলপনার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ তার। আমারা সিলিংয়ের দিকে তাকালো। অবাধ্য অশ্রুদের জোর করে ফিরিয়ে দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।

- ঠিকই বলেছ তুমি দোহা। ভুলে যাবো। তোমার মতন এক মরীচিকাকে আমি খুব করে ভুলে যাবো। তখন হাত বাড়িয়েও খুঁজে পাবেনা কিন্তু!

দোহার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। ইচ্ছা হলো দুহাত বাড়িয়ে ভালোবাসাকে জাপটে ধরে নিজের বুকে। আর কক্ষনো না ছাড়ে! কিন্তু.....তার অশুভ ভাগ্যের র*ক্তচক্ষু তাকে আটকে রেখেছে। দোহার দুই হাত কাঁপলো বেশ, দুপাশে ছড়িয়ে রেখে সে নমনীয় কন্ঠে বললো,

- তোমার আর আমার জগৎ অনেক আলাদা, প্রিন্সেস। আমাদের মধ্যকার এই বিভিন্নতা কোনোদিন শেষ হবেনা।

- আমাদের মধ্যকার বিভিন্নতা শেষ হবেনা কারণ তুমি চাওনা দোহা, তুমি চাওনা!

- ঠিক। আমি চাইনা।

আমারার ডাগর ডাগর আঁখিজোড়া প্রশস্ত হলো। দোহা প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে ফেললো, কাঁপুনি যেন না দেখা যায় সেই উদ্দেশ্যে। শূন্য যান্ত্রিক দৃষ্টি মেলালো আমারার নয়নে। অন্তর এবং অধর তার ভিন্ন কথা বলতে শুরু করলো। মিথ্যার প্রলেপে ঢেকে গেলো সত্য। একেকটা বাক্য আমারার ভগ্ন হৃদয়কে উবিয়ে দিলো, গ্রীষ্মের জলের বাষ্পের মতন। যাকে দেখা যায়না, শুধু অনুভব করা যায়।

মন বললো, “ ভালোবাসি....”

উচ্চারিত হলো,

- আমি তোমাকে ভালোবাসি না আমারা।

“ খুব করে ভালোবাসি ”

- তোমার প্রতি হাজার চেয়েও কোনো অনুভূতি আনতে পারিনি।

“ তুমি আমার পৃথিবী ”

- তুমি শুধুই আমার একজন ভালো বন্ধু। এর বেশি কিছুনা।

“ তুমি আমার এক এবং একমাত্র, বিদায় ভালোবাসা ”

- এই একতরফা অনুভূতি কাটিয়ে তুমি এগিয়ে যাও, এই আমার কামনা।

“ মনে রাখবো, তোমায় আমি মনে রাখবো গোটা এক জনম, অতঃপর অন্তহীন পরকালে ”

- ভুলে যাও আমাকে। ভুলে যাও এই আশাহীন ভালোবাসাকে।

নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো আমারা। বুকের ভেতর বয়ে গেলো বিরহের জলোচ্ছ্বাস। শেষ। এই সমাপ্তি। দীর্ঘ একটি প্রশ্বাস টানলো সে। অদ্ভুতুড়ে শুকনো গলায় যেন প্রতিজ্ঞা করলো,

- তবে তাই হোক।

অবশেষে যেন অনুভূতিটুকু নিষ্ক্রিয় হয়েছে। দোহা ব্যাকুল আঁখিতে চেয়ে রইলো নিজের অব্যক্ত ভালোবাসার দিকে। আমারা ব্যাগ কাঁধে টেনে নিয়ে দৃঢ় উচ্চারণ করলো,

- আর কোনোদিন আমাদের দেখা না হোক। তোমার সকল স্মৃতি আমার অন্তর থেকে আজীবনের জন্য মুছে যাক। আমি একটু মুক্ত হয়ে বাঁচি, আমার মতন করে। তোমার ছায়া আমার জীবনে আর না পড়ুক। তোমার অস্তিত্ব আমার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যাক। আক্ষেপ থাকুক তোমার বুকে, আমাকে না পাওয়ার আক্ষেপ।

- অভিশাপ দিচ্ছ?

আমারা মৃদু হেসে মাথা দোলালো,

- তুমি চাও আমি তোমাকে ভুলে যাই, কিন্তু আমি চাই তুমি আমাকে মনে রাখো। ভুলে যাওয়ার অভিশাপে তুমি আমায় জর্জরিত করলে, আমি নাহয় মনে রাখার অভিশাপে তোমায় পোড়ালাম?

দোহা কোনো জবাব দিতে পারলোনা। আমারা পায়ে পায়ে এগোলো, উদ্দেশ্য বেরিয়ে যাওয়া। আর কতক্ষন সে নিজেকে সামলে রাখতে পারবে জানা নেই। দোহা তার অসংলগ্ন এলোমেলো পদক্ষেপ দেখলো। আমারা একেবারে মুখোমুখি থমকে তার জ্বলজ্বলে নয়নে তাকিয়ে জানালো,

- কোনোকিছু চাওয়ার আগে কয়েকশতবার ভাববে। তোমার চাওয়া কখন, কিভাবে পূরণ হয়ে যাবে কোনোদিন টের পাবেনা।

দোহা মন - প্রাণ ভরে প্রেয়সীর গোলগাল ফোলা মুখটি দেখে নিলো। ইচ্ছা হলো কপালে নিজের অধর ছুঁয়ে দিতে, ওই রক্তিম গালে নিজের চিহ্ন ছুঁয়ে দিতে, ওই ঠোঁটে নিজের স্পর্শ বুলিয়ে দিতে। কিন্তু সেই আদর কিংবা স্নেহের অধিকার তার নেই। আমারা তার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝি অন্তিম বারের মতন কিছু একটা খুঁজলো। পেলনা। দোহা সহ্য করতে পারলোনা আর। একটুখানি হার মানলো হৃদয়ের কাছে।

- শেষ একবার জড়িয়ে ধরি?

- না।

দৃপ্ত জবাব প্রিয়তমার। দোহা নিজের দুবাহু তুলতে গিয়েও থেমে গেলো। পরিহাসের হাসি হাসলো সামান্য। আপনমনে ভাবলো, ভালোই হয়েছে। জড়িয়ে ধরলে তার পিঠজুড়ে বিভীষিকার অস্তিত্ব টের পেয়ে যেতো ছোট্ট ভালোবাসা তার। যদি ভালোবাসা জানতো, তবে কি তাকে ফেলে যেতে পারতো আর? দোহা ভাবতে পারলোনা। আমারার অন্তিম বাক্য কানে বাজলো তার,

- তোমায় ভুলে যাওয়ার নাম বিরহ নয়—আত্মতৃপ্তি। আজ আমি সত্যিই তৃপ্ত হলাম।

এটুকুই। নিজের সবটুকু উষ্ণতা মিলিয়ে নিয়ে আমারা সরে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে চারপাশজুড়ে ঠান্ডা হাওয়ায় অস্তিত্ব টের পেলো দোহা। বাক্যটি কানের চারপাশে বারংবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। অন্তর বলে যে কিছুই বাকি নেই তার! তবে বুকের ভেতর কিসের এত ভাংচুর চলছে? কি চুরমার হয়ে যাচ্ছে? কি হারিয়ে যাচ্ছে অনন্তকালের জন্য?

আমারা দোহাকে পাশ কাটিয়ে হলরুমের বাইরের দিকে এগোলো। দোহা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো। তার দৃষ্টি পড়লো জানালায়। বাইরে সূর্য ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছে। গোধূলীর আলোমাখা এক টুকরো আকাশ যেন বাজিয়ে চলেছে বিদায়ের ঘণ্টা। দোহা একটু হাসলো। কেমন হাসি? বলা মুশকিল।

- দ্যা সানসেট ইয বিউটিফুল, ইয ’ নট ইট প্রিন্সেস?

আমারা থমকে গেলো। ফিরে তাকালো। গোধূলীর কমলাভ রশ্মি দোহার অবয়ব সিক্ত করে তুলেছে অব্যক্ত এক মায়ায়। মুগ্ধ নয়নে ছেলেটি তাকিয়ে আছে আকাশপানে। যেখানে অস্তমিত হচ্ছে সূর্য। অন্তিম বারের মতন দেখলো আমারা তাকে।

- হোয়াট?

দোহা মাথা কাত করে তার দিকে চেয়ে মুচকি হাসলো,

- নাথিং। গুডবাই..... ফরএভার।

আমারা একটি ঢোক গিললো। আর কিছুই উচ্চারণ করলোনা। উল্টো ঘুরে হেঁটে বেরিয়ে গেলো। ফোঁটায় ফোঁটায় গড়াতে থাকা অশ্রু কাউকে দেখতে দিলোনা।দোহা তাকিয়ে রইলো। আলুথালু শরীরটা পুতুলের মতন ঠেকলো তার দৃষ্টিতে, অতি প্রিয় পুতুল। হারিয়ে গেলো সেই ভালোবাসার পুতুল, সবটুকু অনুভূতি নিয়ে চলে গেলো। আজীবনের জন্য।

- রিমেম্বার অওর নট টু রিমেম্বার? আই চুয নট টু রিমেম্বার। ভুলে যাও আমায়, আমি নাহয় আবারো নতুন করে খুঁজে নেবো তোমায়।

আসলেই খুঁজে নেবে কি দোহা?

হয়ত হ্যাঁ, কিংবা হয়ত না।

আজ সে আজীবনের জন্য তার ভালোবাসার শৃঙ্খল থেকে আমারাকে মুক্তি দিয়েছে। দোহার জীবনটা এখন ছন্নছাড়া। উদ্দেশ্যহীন এক তরী, যে কোন সীমানায় গিয়ে ভিড়বে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তার এই অনিশ্চিত জীবনে আমারাকে টেনে নেয়া হতো সবথেকে বড় ভুল। ব্যর্থ এক পথযাত্রী সে, এই ব্যর্থতার ভার আমারাকে বইতে দেয়ার মতন লজ্জার আর কিছু কি হয়? আমারাকে লাভ করার কোনো যোগ্যতা তার নেই, আর না আছে পরিস্থিতি। কোথায় থাকবে, কোথায় খাবে, কি করবে, কিভাবে নিজেকে এগিয়ে নেবে, কোনো নিশ্চয়তা যেখানে নেই সেখানে আমারাকে জড়ানোর অর্থ হতো অদৃশ্য শিকলে আজীবনের মতন তাকে বেঁধে ফেলা। আমারা এমন ভঙ্গুর জীবনের যোগ্য নয়। তার সুন্দর জীবনটাকে নিজের মলিনতায় ছেয়ে দেয়ার আগে বরং দোহা মরণ বরণ করবে।

আমারা তার কাছ থেকে শুধু কষ্টই পাবে। রাতের পর রাত চোখ ফুলিয়ে একাকী কেঁদে যাওয়ার মতন নিদারুণ কষ্ট। ভালোবাসার বিনিময়ে কপালে কষ্ট তুলে দেয়া নিষ্ঠুর নয় কি? দোহা জানেনা, আজ সে ভুল করেছে কি ঠিক করেছে। শুধু এটুকু জানে, তার এই ভঙ্গুর সত্তা আমারার যোগ্য নয়। তার নোলকের জীবনে এই কষ্ট নিষিদ্ধ হয়ে যাক, দোহা চলে যাক সবকিছু থেকে দূরে। সে নিজে বিরহ যাতনা সয়ে যাবে, প্রিন্সেস নাহয় তাকে ভুল বুঝেই ভালো থাক।

পায়ে পায়ে সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে বেরিয়ে এলো দোহা। ভাবনার ঘোরে হাঁটতে লাগলো। পিঠটা টনটন করছে ব্যথায়, আরো শত রাত্রি তাকে নির্ঘুম কাটাতে হবে যদি বেঁচে থাকে তো! কোনো লক্ষ্য নেই, গন্তব্য নেই তার যাত্রার। তবুও একটা সময় অজানা টানে দোহা ছুটতে শুরু করলো। কোথায় যাচ্ছে সে? জানেনা। বাড়ি নামক কিছু অবশিষ্ট নেই। নেই বন্ধু, ভালোবাসা, প্রিয়জন, পরিবার। সে শুধু ছুটে যাচ্ছে। এই ছুটে চলাই তার জীবন। আর জীবনের অপর নাম পরাজয়।

দোহার নয়ন ঠিকরে বহুদিন বাদে অশ্রু গড়ালো। শ্রাবণের বর্ষণের মতন। পুরো মুখ ভাসিয়ে ফেললো। শিশুদের মতন ফুলে উঠলো ঠোঁট। কেঁদে ফেললো সে। তবুও ছোটা বন্ধ করলোনা। দৌঁড়ে গেলো, যেদিকে চোখ যায়। অশ্রুর তোড়ে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেলো। দোহা শুধু নিজের মনকে ক্রমাগত জপমালার মতন বলতে থাকলো,

- ইউ ডোন্ট ডিজার্ভ প্রিন্সেস, আই ডোন্ট ডিজার্ভ মাই লাভ, আই.....ডোন্ট....ডিজার্ভ....এনিথিং...!

দোহার অবয়বটা হঠাৎ ওঠা ঝড়ের মতন মিলিয়ে গেলো সুদূরে। পিছনে ফেলে গেলো এক ভাঙনের উপাখ্যান।

━━━━━━━━━━━━━━━

বেশ কয়েক মাস পর।

সাল ২০১৫।

এয়ারপোর্টের পার্কিং এরিয়ায় পৌঁছে থামলো জাইন আমিনের গাড়ি। ভেতর থেকে বেরিয়ে তিনি ডিকি থেকে লাগেজ বের করে নিতে নিতে প্যাসেঞ্জার সিট থেকে নামলেন আশফিকা এবং আমারা। তিনজনের ছোট্ট দলটা পায়ে পায়ে হেঁটে পৌঁছালো টার্মিনালের দিকে।

আশফিকা এবং মীর চৌধুরীর ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আশফিকা নিজের মেয়েকে নিয়ে চলে যাচ্ছেন মালয়েশিয়া। সেখানে নিজের ভাইয়ের সঙ্গে কিছুদিন থাকবেন। আমারাকে নিয়ে কিছু কাজ আছে তার। সব শেষ হলে হয়ত সবকিছু গুছিয়ে আবার নতুন করে জীবনে এগোনোর চেষ্টা করবেন। প্রত্যেকের মাঝে কেমন যেন এক নীরব থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। বিশেষ করে জাইন একদম চুপচাপ। এতক্ষণ যাবৎ ড্রাইভ করে তাদের এয়ারপোর্ট অবধি নিয়ে আসা সত্ত্বেও তিনি একটিও কথা বলেননি। আশফিকা চোখের কোণে মানুষটাকে দেখলেন। জারাকে হারানোর পর চোখের সামনে ভীষণভাবে বদলে গেছেন তিনি। উহু, চেহারায় নয়, আচরণেও নয়। অন্তরের দিক দিয়ে। আজ এই মানুষটাকে সম্পূর্ণরূপে একলা করে দিয়ে চলে গেলে তার আর কোনোপ্রকার অস্তিত্ব থাকবেনা। নিজের এক খোলসমাত্র হয়ে বেঁচে থাকবেন তিনি।

যাত্রীরা আনাগোনা করছে। বেশ ভীড়। সকলে ব্যস্ত আপন আপন জীবনে। জাইন থামলেন। লাগেজ দুটো আশফিকার দিকে ঠেলে দিয়ে এক নজর দেখলেন উভয়কে। অব্যক্ত এক অনুভূতি ফুটলো তার দৃষ্টিমাঝে। যার প্রকাশ তিনি ঘটালেন না। আমারাকে দেখলেন প্রাণভরে, যেন অন্তিম বারের মতন।

- গুডবাই। ভালো থেকো তোমরা বার্ড।

জাইন মৃদু কন্ঠে উচ্চারণ করলেন। তার মুখোমুখি দাঁড়ানো আশফিকার হাত লাগেজের হাতলে চেপে বসলো। ঠিক পাশেই দাঁড়ানো আমারা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো শুধু। জাইনের নয়নজোড়া টলমল করে উঠলো। অশ্রু লোকাতে তিনি হাতঘড়ির দিকে তাকালেন।

- আম... তোমাদের ভেতরে যাওয়া উচিত। ফ্লাইটের সময় প্রায় হয়ে গিয়েছে।

ব্যস্ততম এয়ারপোর্টের সামনে দাঁড়িয়ে তিনটি ভগ্ন সত্তা যেন কিছু একটা খুঁজে ফিরলো নিজেদের মাঝে। আমারা এক নজর আশফিকার দিকে তাকালো, দৃষ্টিজুড়ে নিগূঢ় আশ্বাস দেখতে পেলো। মাথা হেলিয়ে সে এক পা এগোলো, জাইন চশমা ঠিকঠাক করতে করতে মুখ লোকানোর চেষ্টায় আছেন। আমারা হাত বাড়িয়ে তার ডান হাতটা নিজের উভয় হাতের মুঠোয় নিয়ে আবেদন জানালো,

- আমাদের সাথে চলো। নতুন করে একটা জীবন সাজাই।

স্তব্ধ হয়ে গেলেন জাইন। হাত কেঁপে উঠলো তার। ঝট করে ফিরে তাকালেন। আমারা বিস্তৃত এক হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে। জাইন হতবিহ্বল হয়ে আশফিকাকে দেখলেন এবার, অবিশ্বাস নিয়ে। রমণীর মুখে এক স্নিগ্ধ মায়া, ঠোঁটে আবেগের হাসি।

- আমরা নাহয় এই ভাঙাচোরা সত্তাকে গুছিয়ে নিয়ে ছোট্ট একটা নীড় বাঁধবো? আমার আর আমার মেয়ের জীবনের হারিয়ে যাওয়া সুখের টুকরো হবেন জাইন?

সমস্ত শরীর কেঁপে উঠলো। জাইন আর সহ্য করতে পারলেন না, হাঁটু ভেঙে এলো তার। বসে পড়লেন, আশেপাশের যাত্রীদের ভ্রুকুটির কোনো পরোয়াই করলেন না। অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরতে লাগলো তার নয়ন বেয়ে। আমারা সযত্নে তার চশমাটা খুলে নিলো, আশফিকা উবু হয়ে বসে রুমাল দিয়ে সেই অশ্রু মুছিয়ে দিলেন। তার নিজের নয়নও উন্মাদ হয়েছে।

- হবেন কি?

ভাবতে হলোনা একটুও। প্রশ্নের উত্তরস্বরুপ জাইন শিশুদের মতন জোরে জোরে মাথা দোলালেন, সম্মতিসূচক। অশ্রুমাখা হাসির দৃশ্যটি দেখালো বড়ই মায়াবী। প্রথমবারের মতন ভীষণ অধিকার ফলিয়ে সবকিছু উপেক্ষা করেই জাইন আশফিকাকে টেনে নিজের বুকের মাঝে চেপে ধরলেন। ফিসফিস করে উচ্চারণ করলেন,

- আই ওয়ান্ট টু বি দ্যা হাসব্যান্ড ইউ নেভার হ্যাড। আই ওয়ান্ট টু বি দ্যা ফাদার মাই লি' ল বার্ড নিডস! আই ওয়ান্ট টু বি আ পার্ট অব দিস ফ্যামিলি, মে আই?

ভাঙা ভাঙা শোনালো কন্ঠ। আশফিকা জোরালোভাবে জাইনকে পাল্টা আঁকড়ে ধরে মৃদুমন্থর আওয়াজে জবাব দিলেন,

- ইউ মে।

এক সুখকর আলিঙ্গনে যেন খচিত হলো এক নতুন রূপকথাতুল্য আখ্যান। প্রমাণ করলো যেন, ভাগ্য শুধু কেড়ে নিতে না, দিতেও জানে।

বেশ কিছুক্ষণ পর জাইন আমারা এবং আশফিকাকে চেকিংয়ের জন্য পৌঁছে দিলেন। আর ভেতরে যাওয়া সম্ভব না। তাই তিনি উবু হয়ে আমারার সামনে বসলেন। নরম হেসে তার কপালে অধর ছুঁয়ে দিলেন। আমারা তার দুহাত আঁকড়ে ধরলো।

- তুমি কবে আসবে?

- তাড়াতাড়ি, খুব তাড়াতাড়ি। তুমি যাও তোমার মামণির সাথে, আমি জলদিই চলে আসবো।

- মিস করবো।

- আমিও করবো বার্ড, খুব করে মিস করবো। কিন্তু ভাবার কারণ নেই, তুমি ভালো থেকো। নিজের শরীরের যত্ন নিও, মামণির দিকে খেয়াল রেখো আমার লক্ষ্মী সোনা।

আমারা শিশুদের মতন মাথা দোলালো। জাইন হেসে তার গালে আদর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ফিরলেন আশফিকার দিকে। যিনি এতক্ষণ যাবৎ মুগ্ধ নয়নে দেখে যাচ্ছিলেন সবকিছু। জাইন তাকাতেই উভয়ের দৃষ্টি মিলিত হলো। কাউকে কিছু বলতে হলোনা, শুধু লাজরাঙা হাসি।

- আসি তাহলে? আপনিও ভালো থাকবেন। অবশ্যই সময়মতো ঘুমাতে যাবেন। রাত জাগা নিষেধ। কাজ করতে করতে আবার লাঞ্চ - ডিনার ভুলে যাবেন না। ওষুধ নিতে একদম ভুল করা যাবেনা।

- ওরে বাবা। আমি কি এলিমেন্টারি স্কুলের বাচ্চা?

- হুম, একদম তাই। আমি রোজ ভিডিও কল করবো, একটু সেদিক দেখলেই...

- এইযে কান, নাক সব ধরলাম। রমণীকে রাগিয়ে দেয়ার মতন ভুল আর যেই করুক জাইন আমিন করেনা।

- হ্যাঁ, ওই রমণী থেকে একটু দূরে থাকবেন। বিশেষ করে আপনার অফিসে আছেনা একটা? কি যেনো নাম? ললিতা?

- হিহি, ললিতা ঘোষ।

- ওই ললিতা ভণিতা যাই হোক! একদম দূরে! একশো হাত দূরে!

- মডেলের থেকে কি করে....

আশফিকা রেগে যাচ্ছেন দেখে জাইন জিভ কামড়ে মাথা নাড়লেন।

- ওকে ফাইন বস! নাউ গো, নাকি ফ্লাইট মিস করতে চাচ্ছেন?

আমারার দিকে সুপ্ত নয়নে ইশারা করতেই সে যা বুঝার বুঝে গেলো। আশফিকার হাত ধরে টেনে নিলো,

- আসো মামণি জলদি আসো।

- হ্যাঁ, বাবা আসছি আসছি।

আমারাকে অনুসরণ করতে আশফিকা ঘুরলেন। ঠিক তখনি তড়িৎ গতিতে নিজের ডান গালে কোমল এক স্পর্শ পেলেন। জাইনের কোমল অধর অতি সামান্য ছুঁয়ে সরে গেলো। বিস্তর হেসে বান্দা স্তব্ধ আশফিকাকে হাত নেড়ে বিদায় জানালো।

- সি ইউ সুন....মাই মা’মা বার্ড!

টকটকে লাল হয়ে গেলো আশফিকার গাল। তাকাতেই পারলেন না তিনি আর। আপনমনে হেসে দ্রুত মেয়ের পিছনে ছুটলেন। জাইন তাকিয়ে রইলেন ঠোঁটে হাসি মেখে, যতক্ষণ না মা - মেয়ে উভয়ে আড়াল হয়ে যায় দৃষ্টিসীমার। বুক ভরে এক প্রশ্বাস টানলেন তিনি। অদ্ভুত এক পূর্ণতা টের পেলেন অন্তরে।

পরিবার। পরিপূর্ণ।

তিনি যখন উল্টো ঘুরে এয়ারপোর্টের বাইরে বেরোলেন, তখন দুজন ছেলেকে প্রবেশ করতে দেখলেন। আগাগোড়া হুডিতে মোড়ানো। একজনের মুখ দেখে বিদেশী ঠেকলো। অপরজনের চেহারা দেখা যাচ্ছেনা মাস্কে ঢেকে আছে বলে। কাঁধে ঝোলানো গিটারের ব্যাগ। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় উভয়ের টুকরো কথোপকথন কানে এলো তার। ধারণা সঠিক, আরেকটি ছেলে আসলেই বিদেশী, খুব সম্ভবত ব্রিটিশ। হাতের পাসপোর্ট দেখতে দেখতে সে পাশের জনকে জিজ্ঞেস করলো,

- ওহ, ইউ নেভার মেনশনড ইওর ফুল নেইম দোও।

গিটারওয়ালা বান্দা প্রশান্ত কন্ঠে জবাব দিলো,

- দোহা.....শেহবাগ দোহা।

জাইন আর শুনতে পারলেন না। উভয়ে চলে গিয়েছে দূরে। তিনি কেন যেন ফিরে তাকালেন। নামটা আপনমনে উচ্চারণ করলেন।

“ শেহবাগ দোহা.....”

কোথাও শুনেছেন কি? পরিচিত লাগছে, আবার লাগছে না। তবে নামটার মধ্যে অসম্ভব একটা ভার আছে, ভীষণ রকমের ভার।

জাইন আর বেশি ভাবলেন না, উল্টো ঘুরে পাড়ি জমালেন নিজ গন্তব্যে।

ভাগ্য বড়ই বৈচিত্র্যময়। ভাগ্যের চেয়ে বড় খেলোয়াড় দুটো হয়না এই জগতে। একই দিনে, একে অপরের সম্পূর্ণ অজান্তে দুটো নতুন সূচনার জন্ম দিয়েছিলো এই ভাগ্য।

চাইলেও এই ভাগ্যের কবলে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলো কোনোদিন জানতে পারবেনা এই বিচিত্র লীলাখেলা সম্বন্ধে।

✿✿✿━━━━━━━━━━━━━━━━✿✿✿

বর্তমান।

সাল ২০২৫।

এখনো ঠিক গোধূলী লগ্ন। পশ্চিম আকাশে অস্তমিত প্রায় সূর্য। কমলাভ রশ্মিতে স্নিগ্ধ পৃথিবী। লেকটি আজও একইরকম আছে। শুধু নেই রাজহাঁসযুগল। হয়ত সময়ের পরিক্রমায় আয়ু ফুরিয়েছে। ভালোবাসার অন্তর্ধান সইতে না পেরে হয়ত সঙ্গীও প্রাণ বিলিয়েছে দ্রুততম সময়ে। রেখে গিয়েছে রিক্ত এক জগৎকে।

দোহা বসে আছে বেঞ্চিতে। আগের একটা বেঞ্চির জায়গায় বর্তমানে আরো বেশ কয়েকটি নির্মাণ করা হয়েছে। সে বেছে নিয়েছে পুরাতনটিই। যেখানে বসে স্মৃতির সময়গুলো পার হয়েছিলো। কারো কোলে মাথা রেখে সে হারিয়েছিলো নিদ্রার জগতে। সেই সতেরোবর্ষী দোহা আজ প্রায় ত্রিশ ছুঁই ছুঁই। ব্যাপারটা রোমন্থনের অনুভবে ভাসিয়ে নিলো সবকিছু। সঙ্গে ভীষণ এক তোলপাড় এলো ভাবনার জগতে।

মোবাইল ফোনের ভাইব্রেশনের সুরেলা আওয়াজে দোহার দিগন্তপানে অতি মনোযোগী দৃষ্টি ভাঙলো। পকেটে হাত পুরলো সে। স্যামসাং গ্যালাক্সি ফ্লিপ মডেলের ফোনটির ভাঁজ খুলতেই স্ক্রীনের কলার আইডিতে নজরে এলো নামটি।

“ পেইন ইন অ্যাস ”

দোহা ভ্রু কুঁচকে খানিক বিতৃষ্ণা নিয়েই রিসিভ করলো। ভেসে এলো আর্থারের কন্ঠস্বর,

- তোকে কি সত্যি সত্যিই কেউ তুলে নিলো নাকি? সাতটায় কনসার্ট। তুই এখনো কোথায় পড়ে আছিস? আর এইভাবে না বলে কয়ে শুধু একটা স্টিকি নোট কপালে সেটে দিয়ে কেউ উধাও হয়ে যায় সারাটা দিনের জন্য? আর ইউ বিইং সিরিয়াস শেহবাগ?

দোহা চোখ উল্টে একটি নিঃশ্বাস ফেললো।

- এখন আবার ঢং করে নিঃশ্বাস ফেলছিস কেনো? তুই বাসায় ফিরবি নাকি চাস আমি ওখানে যাই? ওয়ান্ট মি টু ট্র্যাক ইউ ডাউন? বিকয আই ক্যান, ট্রাস্ট মি!

- ব্যা ব্যাবাবা ব্যা!

- হাহ? তুই কি এইমাত্র আমাকে ভ্যাংচালি?

- ফোন রাখ। আসছি।

- ইউ....

আর্থারের চেঁচামেচি মাঝপথেই থামিয়ে ফ্লিপ করে ফোন বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালো দোহা। ধীরপায়ে হেঁটে পৌঁছালো ফাঁকা প্রাঙ্গণে। সেন্ট পিটার্সবার্গের কলেজটা মন ভরে দেখলো আরো একবার। অনেক কিছুই বদলে গিয়েছে, আবার অনেক কিছুই বদলায়নি। চেনা পরিচিত করিডোরজুড়ে সে স্মৃতিদের ভাসতে দেখলো।

ঐতো, অনিক, রাজীব, জিই - শুরা দৌঁড়ে যাচ্ছে। একে অপরের গায়ে বোতল থেকে পানি ছুঁড়ে মারছে। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে জারা কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে শুনতে চুইংগাম চিবুচ্ছে। তার পিছনেই জানালার ধারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে অতি মনোযোগ দিয়ে একটি বই পড়ে যাচ্ছে আমারা।

আমারা.....তার কিশোর জীবনের অনুভূতি, প্রথম প্রেম, ভালোবাসা, প্রিন্সেস....

তার নোলক।

দোহা বুকের ভেতর ভাঙা টুকরোর ঝনঝনানি টের পেলো। দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হলোনা আর। রোমন্থন দুহাত ভরে তাকে দিয়েছে যাতনা। তবুও সে বারবার স্মরণ করে যাবে। কারণ এই যাতনা বড়ই মধুর!

সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে বেরিয়ে দোহা খানিকটা হাঁটলো। একটা রিকশা থামিয়ে চড়ে বসলো। আজ কত বছর বাদে রিকশায় চেপেছে? হিসাব নেই।

- মামা, হুডটা নামিয়ে দেবেন।

রিকশাওয়ালা হুড নামাতে নামাতে তাকে একনজর আপাদমস্তক দেখে বললো,

- ভাইজান আফনে এই ঠাডাপড়া গরমের মইদ্যে এমন গেঞ্জি, সানগেলাস, মাকস পইড়া আছেন ক্যান? গরম লাগেনা?

দোহা সামান্য হাসলো।

- আপনি রিকশা চালানো শুরু করুন, তাহলেই বাতাস লাগবে।

রিকশাওয়ালা আর কিছু বললোনা। চেপে বসলো, ধরলো প্যাডেল। রাজধানীর বনানীর ব্যাস্ত সড়কধরে ছুটতে শুরু করলো রিকশা। বাতাস বইছে ভালোই। বোধ হয় শীঘ্রই ঝড় টর আসবে। দোহা প্রাণভরে অনুভব করলো। বাতাসের ঝাঁপটায় তার চুল এলোমেলো হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো মাস্কটা খুলে নিতে, তবে ঝুঁকি নিলো না। কারণ বনানীর মোড়ে মোড়ে বসানো বিলবোর্ডগুলোয় ভাসছে তারই প্রতিচ্ছবি,

দ্যা ডুম—শেহবাগ দোহা “প্রাউড অব বিডি ”।

#স্বরলিপিতে_তুমি

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা৩০

পর্ব ৩০: [ বিদায় সূর্যাস্ত ]- ( শেষাংশ )

━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

ভুলে যাওয়া কি এতই সহজ?

যদি সমাপ্তিতে ভুলে যাওয়াই ছিলো তবে সূচনায় কেন এক জনম মনে রাখার ওয়াদা হয়েছিলো?

এর জবাব কে দেবে? পরিস্থিতি? ভাগ্য? নাকি এই পৃথিবী?

আমারা ফ্যালফ্যাল করে দোহার দিকে শুধু তাকিয়েই থাকলো। হাজার চাওয়া সত্ত্বেও মনকে যেনো কিছু অনুভব করাতে পারলোনা। ক্ষমা? হয়ত মনের কোণে একবার ক্ষমার দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছিলো। সেই দুয়ারে আজ দোহা নিজ হাতে তালা দিয়ে দিলো।

এত অনুভূতি, এত স্মৃতি, এত আবেগ, এত ভালোবাসা, এত বন্ধুত্ব, এত টান, এত মায়া শুধু ভুলে যাওয়ার জন্য?

আমারার মাথা ঝুলে পড়লো। কোলের দিকে তাকিয়ে থাকলো সে। ভীষণ হাসি আসছে। অধর তার পরিতাপের এক করুণ নীরব হাসিতে বাঁকলো। কোলের উপর রাখা সার্টিফিকেটের ফাইলটা সে চেপে ধরে অদ্ভুত এক গভীর কন্ঠে বললো,

- ভুলে যেতেই তো বসেছিলাম। তবে আবার কেনো এলে কালবৈশাখীর ঝড় হয়ে? কেনো ঘটালে অনুভূতির বর্ষণ?

দোহা নিশ্চুপ। মেঝের আলপনার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ তার। আমারা সিলিংয়ের দিকে তাকালো। অবাধ্য অশ্রুদের জোর করে ফিরিয়ে দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।

- ঠিকই বলেছ তুমি দোহা। ভুলে যাবো। তোমার মতন এক মরীচিকাকে আমি খুব করে ভুলে যাবো। তখন হাত বাড়িয়েও খুঁজে পাবেনা কিন্তু!

দোহার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। ইচ্ছা হলো দুহাত বাড়িয়ে ভালোবাসাকে জাপটে ধরে নিজের বুকে। আর কক্ষনো না ছাড়ে! কিন্তু.....তার অশুভ ভাগ্যের র*ক্তচক্ষু তাকে আটকে রেখেছে। দোহার দুই হাত কাঁপলো বেশ, দুপাশে ছড়িয়ে রেখে সে নমনীয় কন্ঠে বললো,

- তোমার আর আমার জগৎ অনেক আলাদা, প্রিন্সেস। আমাদের মধ্যকার এই বিভিন্নতা কোনোদিন শেষ হবেনা।

- আমাদের মধ্যকার বিভিন্নতা শেষ হবেনা কারণ তুমি চাওনা দোহা, তুমি চাওনা!

- ঠিক। আমি চাইনা।

আমারার ডাগর ডাগর আঁখিজোড়া প্রশস্ত হলো। দোহা প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে ফেললো, কাঁপুনি যেন না দেখা যায় সেই উদ্দেশ্যে। শূন্য যান্ত্রিক দৃষ্টি মেলালো আমারার নয়নে। অন্তর এবং অধর তার ভিন্ন কথা বলতে শুরু করলো। মিথ্যার প্রলেপে ঢেকে গেলো সত্য। একেকটা বাক্য আমারার ভগ্ন হৃদয়কে উবিয়ে দিলো, গ্রীষ্মের জলের বাষ্পের মতন। যাকে দেখা যায়না, শুধু অনুভব করা যায়।

মন বললো, “ ভালোবাসি....”

উচ্চারিত হলো,

- আমি তোমাকে ভালোবাসি না আমারা।

“ খুব করে ভালোবাসি ”

- তোমার প্রতি হাজার চেয়েও কোনো অনুভূতি আনতে পারিনি।

“ তুমি আমার পৃথিবী ”

- তুমি শুধুই আমার একজন ভালো বন্ধু। এর বেশি কিছুনা।

“ তুমি আমার এক এবং একমাত্র, বিদায় ভালোবাসা ”

- এই একতরফা অনুভূতি কাটিয়ে তুমি এগিয়ে যাও, এই আমার কামনা।

“ মনে রাখবো, তোমায় আমি মনে রাখবো গোটা এক জনম, অতঃপর অন্তহীন পরকালে ”

- ভুলে যাও আমাকে। ভুলে যাও এই আশাহীন ভালোবাসাকে।

নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো আমারা। বুকের ভেতর বয়ে গেলো বিরহের জলোচ্ছ্বাস। শেষ। এই সমাপ্তি। দীর্ঘ একটি প্রশ্বাস টানলো সে। অদ্ভুতুড়ে শুকনো গলায় যেন প্রতিজ্ঞা করলো,

- তবে তাই হোক।

অবশেষে যেন অনুভূতিটুকু নিষ্ক্রিয় হয়েছে। দোহা ব্যাকুল আঁখিতে চেয়ে রইলো নিজের অব্যক্ত ভালোবাসার দিকে। আমারা ব্যাগ কাঁধে টেনে নিয়ে দৃঢ় উচ্চারণ করলো,

- আর কোনোদিন আমাদের দেখা না হোক। তোমার সকল স্মৃতি আমার অন্তর থেকে আজীবনের জন্য মুছে যাক। আমি একটু মুক্ত হয়ে বাঁচি, আমার মতন করে। তোমার ছায়া আমার জীবনে আর না পড়ুক। তোমার অস্তিত্ব আমার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যাক। আক্ষেপ থাকুক তোমার বুকে, আমাকে না পাওয়ার আক্ষেপ।

- অভিশাপ দিচ্ছ?

আমারা মৃদু হেসে মাথা দোলালো,

- তুমি চাও আমি তোমাকে ভুলে যাই, কিন্তু আমি চাই তুমি আমাকে মনে রাখো। ভুলে যাওয়ার অভিশাপে তুমি আমায় জর্জরিত করলে, আমি নাহয় মনে রাখার অভিশাপে তোমায় পোড়ালাম?

দোহা কোনো জবাব দিতে পারলোনা। আমারা পায়ে পায়ে এগোলো, উদ্দেশ্য বেরিয়ে যাওয়া। আর কতক্ষন সে নিজেকে সামলে রাখতে পারবে জানা নেই। দোহা তার অসংলগ্ন এলোমেলো পদক্ষেপ দেখলো। আমারা একেবারে মুখোমুখি থমকে তার জ্বলজ্বলে নয়নে তাকিয়ে জানালো,

- কোনোকিছু চাওয়ার আগে কয়েকশতবার ভাববে। তোমার চাওয়া কখন, কিভাবে পূরণ হয়ে যাবে কোনোদিন টের পাবেনা।

দোহা মন - প্রাণ ভরে প্রেয়সীর গোলগাল ফোলা মুখটি দেখে নিলো। ইচ্ছা হলো কপালে নিজের অধর ছুঁয়ে দিতে, ওই রক্তিম গালে নিজের চিহ্ন ছুঁয়ে দিতে, ওই ঠোঁটে নিজের স্পর্শ বুলিয়ে দিতে। কিন্তু সেই আদর কিংবা স্নেহের অধিকার তার নেই। আমারা তার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝি অন্তিম বারের মতন কিছু একটা খুঁজলো। পেলনা। দোহা সহ্য করতে পারলোনা আর। একটুখানি হার মানলো হৃদয়ের কাছে।

- শেষ একবার জড়িয়ে ধরি?

- না।

দৃপ্ত জবাব প্রিয়তমার। দোহা নিজের দুবাহু তুলতে গিয়েও থেমে গেলো। পরিহাসের হাসি হাসলো সামান্য। আপনমনে ভাবলো, ভালোই হয়েছে। জড়িয়ে ধরলে তার পিঠজুড়ে বিভীষিকার অস্তিত্ব টের পেয়ে যেতো ছোট্ট ভালোবাসা তার। যদি ভালোবাসা জানতো, তবে কি তাকে ফেলে যেতে পারতো আর? দোহা ভাবতে পারলোনা। আমারার অন্তিম বাক্য কানে বাজলো তার,

- তোমায় ভুলে যাওয়ার নাম বিরহ নয়—আত্মতৃপ্তি। আজ আমি সত্যিই তৃপ্ত হলাম।

এটুকুই। নিজের সবটুকু উষ্ণতা মিলিয়ে নিয়ে আমারা সরে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে চারপাশজুড়ে ঠান্ডা হাওয়ায় অস্তিত্ব টের পেলো দোহা। বাক্যটি কানের চারপাশে বারংবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। অন্তর বলে যে কিছুই বাকি নেই তার! তবে বুকের ভেতর কিসের এত ভাংচুর চলছে? কি চুরমার হয়ে যাচ্ছে? কি হারিয়ে যাচ্ছে অনন্তকালের জন্য?

আমারা দোহাকে পাশ কাটিয়ে হলরুমের বাইরের দিকে এগোলো। দোহা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো। তার দৃষ্টি পড়লো জানালায়। বাইরে সূর্য ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছে। গোধূলীর আলোমাখা এক টুকরো আকাশ যেন বাজিয়ে চলেছে বিদায়ের ঘণ্টা। দোহা একটু হাসলো। কেমন হাসি? বলা মুশকিল।

- দ্যা সানসেট ইয বিউটিফুল, ইয ’ নট ইট প্রিন্সেস?

আমারা থমকে গেলো। ফিরে তাকালো। গোধূলীর কমলাভ রশ্মি দোহার অবয়ব সিক্ত করে তুলেছে অব্যক্ত এক মায়ায়। মুগ্ধ নয়নে ছেলেটি তাকিয়ে আছে আকাশপানে। যেখানে অস্তমিত হচ্ছে সূর্য। অন্তিম বারের মতন দেখলো আমারা তাকে।

- হোয়াট?

দোহা মাথা কাত করে তার দিকে চেয়ে মুচকি হাসলো,

- নাথিং। গুডবাই..... ফরএভার।

আমারা একটি ঢোক গিললো। আর কিছুই উচ্চারণ করলোনা। উল্টো ঘুরে হেঁটে বেরিয়ে গেলো। ফোঁটায় ফোঁটায় গড়াতে থাকা অশ্রু কাউকে দেখতে দিলোনা।দোহা তাকিয়ে রইলো। আলুথালু শরীরটা পুতুলের মতন ঠেকলো তার দৃষ্টিতে, অতি প্রিয় পুতুল। হারিয়ে গেলো সেই ভালোবাসার পুতুল, সবটুকু অনুভূতি নিয়ে চলে গেলো। আজীবনের জন্য।

- রিমেম্বার অওর নট টু রিমেম্বার? আই চুয নট টু রিমেম্বার। ভুলে যাও আমায়, আমি নাহয় আবারো নতুন করে খুঁজে নেবো তোমায়।

আসলেই খুঁজে নেবে কি দোহা?

হয়ত হ্যাঁ, কিংবা হয়ত না।

আজ সে আজীবনের জন্য তার ভালোবাসার শৃঙ্খল থেকে আমারাকে মুক্তি দিয়েছে। দোহার জীবনটা এখন ছন্নছাড়া। উদ্দেশ্যহীন এক তরী, যে কোন সীমানায় গিয়ে ভিড়বে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তার এই অনিশ্চিত জীবনে আমারাকে টেনে নেয়া হতো সবথেকে বড় ভুল। ব্যর্থ এক পথযাত্রী সে, এই ব্যর্থতার ভার আমারাকে বইতে দেয়ার মতন লজ্জার আর কিছু কি হয়? আমারাকে লাভ করার কোনো যোগ্যতা তার নেই, আর না আছে পরিস্থিতি। কোথায় থাকবে, কোথায় খাবে, কি করবে, কিভাবে নিজেকে এগিয়ে নেবে, কোনো নিশ্চয়তা যেখানে নেই সেখানে আমারাকে জড়ানোর অর্থ হতো অদৃশ্য শিকলে আজীবনের মতন তাকে বেঁধে ফেলা। আমারা এমন ভঙ্গুর জীবনের যোগ্য নয়। তার সুন্দর জীবনটাকে নিজের মলিনতায় ছেয়ে দেয়ার আগে বরং দোহা মরণ বরণ করবে।

আমারা তার কাছ থেকে শুধু কষ্টই পাবে। রাতের পর রাত চোখ ফুলিয়ে একাকী কেঁদে যাওয়ার মতন নিদারুণ কষ্ট। ভালোবাসার বিনিময়ে কপালে কষ্ট তুলে দেয়া নিষ্ঠুর নয় কি? দোহা জানেনা, আজ সে ভুল করেছে কি ঠিক করেছে। শুধু এটুকু জানে, তার এই ভঙ্গুর সত্তা আমারার যোগ্য নয়। তার নোলকের জীবনে এই কষ্ট নিষিদ্ধ হয়ে যাক, দোহা চলে যাক সবকিছু থেকে দূরে। সে নিজে বিরহ যাতনা সয়ে যাবে, প্রিন্সেস নাহয় তাকে ভুল বুঝেই ভালো থাক।

পায়ে পায়ে সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে বেরিয়ে এলো দোহা। ভাবনার ঘোরে হাঁটতে লাগলো। পিঠটা টনটন করছে ব্যথায়, আরো শত রাত্রি তাকে নির্ঘুম কাটাতে হবে যদি বেঁচে থাকে তো! কোনো লক্ষ্য নেই, গন্তব্য নেই তার যাত্রার। তবুও একটা সময় অজানা টানে দোহা ছুটতে শুরু করলো। কোথায় যাচ্ছে সে? জানেনা। বাড়ি নামক কিছু অবশিষ্ট নেই। নেই বন্ধু, ভালোবাসা, প্রিয়জন, পরিবার। সে শুধু ছুটে যাচ্ছে। এই ছুটে চলাই তার জীবন। আর জীবনের অপর নাম পরাজয়।

দোহার নয়ন ঠিকরে বহুদিন বাদে অশ্রু গড়ালো। শ্রাবণের বর্ষণের মতন। পুরো মুখ ভাসিয়ে ফেললো। শিশুদের মতন ফুলে উঠলো ঠোঁট। কেঁদে ফেললো সে। তবুও ছোটা বন্ধ করলোনা। দৌঁড়ে গেলো, যেদিকে চোখ যায়। অশ্রুর তোড়ে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেলো। দোহা শুধু নিজের মনকে ক্রমাগত জপমালার মতন বলতে থাকলো,

- ইউ ডোন্ট ডিজার্ভ প্রিন্সেস, আই ডোন্ট ডিজার্ভ মাই লাভ, আই.....ডোন্ট....ডিজার্ভ....এনিথিং...!

দোহার অবয়বটা হঠাৎ ওঠা ঝড়ের মতন মিলিয়ে গেলো সুদূরে। পিছনে ফেলে গেলো এক ভাঙনের উপাখ্যান।

━━━━━━━━━━━━━━━

বেশ কয়েক মাস পর।

সাল ২০১৫।

এয়ারপোর্টের পার্কিং এরিয়ায় পৌঁছে থামলো জাইন আমিনের গাড়ি। ভেতর থেকে বেরিয়ে তিনি ডিকি থেকে লাগেজ বের করে নিতে নিতে প্যাসেঞ্জার সিট থেকে নামলেন আশফিকা এবং আমারা। তিনজনের ছোট্ট দলটা পায়ে পায়ে হেঁটে পৌঁছালো টার্মিনালের দিকে।

আশফিকা এবং মীর চৌধুরীর ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আশফিকা নিজের মেয়েকে নিয়ে চলে যাচ্ছেন মালয়েশিয়া। সেখানে নিজের ভাইয়ের সঙ্গে কিছুদিন থাকবেন। আমারাকে নিয়ে কিছু কাজ আছে তার। সব শেষ হলে হয়ত সবকিছু গুছিয়ে আবার নতুন করে জীবনে এগোনোর চেষ্টা করবেন। প্রত্যেকের মাঝে কেমন যেন এক নীরব থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। বিশেষ করে জাইন একদম চুপচাপ। এতক্ষণ যাবৎ ড্রাইভ করে তাদের এয়ারপোর্ট অবধি নিয়ে আসা সত্ত্বেও তিনি একটিও কথা বলেননি। আশফিকা চোখের কোণে মানুষটাকে দেখলেন। জারাকে হারানোর পর চোখের সামনে ভীষণভাবে বদলে গেছেন তিনি। উহু, চেহারায় নয়, আচরণেও নয়। অন্তরের দিক দিয়ে। আজ এই মানুষটাকে সম্পূর্ণরূপে একলা করে দিয়ে চলে গেলে তার আর কোনোপ্রকার অস্তিত্ব থাকবেনা। নিজের এক খোলসমাত্র হয়ে বেঁচে থাকবেন তিনি।

যাত্রীরা আনাগোনা করছে। বেশ ভীড়। সকলে ব্যস্ত আপন আপন জীবনে। জাইন থামলেন। লাগেজ দুটো আশফিকার দিকে ঠেলে দিয়ে এক নজর দেখলেন উভয়কে। অব্যক্ত এক অনুভূতি ফুটলো তার দৃষ্টিমাঝে। যার প্রকাশ তিনি ঘটালেন না। আমারাকে দেখলেন প্রাণভরে, যেন অন্তিম বারের মতন।

- গুডবাই। ভালো থেকো তোমরা বার্ড।

জাইন মৃদু কন্ঠে উচ্চারণ করলেন। তার মুখোমুখি দাঁড়ানো আশফিকার হাত লাগেজের হাতলে চেপে বসলো। ঠিক পাশেই দাঁড়ানো আমারা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো শুধু। জাইনের নয়নজোড়া টলমল করে উঠলো। অশ্রু লোকাতে তিনি হাতঘড়ির দিকে তাকালেন।

- আম... তোমাদের ভেতরে যাওয়া উচিত। ফ্লাইটের সময় প্রায় হয়ে গিয়েছে।

ব্যস্ততম এয়ারপোর্টের সামনে দাঁড়িয়ে তিনটি ভগ্ন সত্তা যেন কিছু একটা খুঁজে ফিরলো নিজেদের মাঝে। আমারা এক নজর আশফিকার দিকে তাকালো, দৃষ্টিজুড়ে নিগূঢ় আশ্বাস দেখতে পেলো। মাথা হেলিয়ে সে এক পা এগোলো, জাইন চশমা ঠিকঠাক করতে করতে মুখ লোকানোর চেষ্টায় আছেন। আমারা হাত বাড়িয়ে তার ডান হাতটা নিজের উভয় হাতের মুঠোয় নিয়ে আবেদন জানালো,

- আমাদের সাথে চলো। নতুন করে একটা জীবন সাজাই।

স্তব্ধ হয়ে গেলেন জাইন। হাত কেঁপে উঠলো তার। ঝট করে ফিরে তাকালেন। আমারা বিস্তৃত এক হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে। জাইন হতবিহ্বল হয়ে আশফিকাকে দেখলেন এবার, অবিশ্বাস নিয়ে। রমণীর মুখে এক স্নিগ্ধ মায়া, ঠোঁটে আবেগের হাসি।

- আমরা নাহয় এই ভাঙাচোরা সত্তাকে গুছিয়ে নিয়ে ছোট্ট একটা নীড় বাঁধবো? আমার আর আমার মেয়ের জীবনের হারিয়ে যাওয়া সুখের টুকরো হবেন জাইন?

সমস্ত শরীর কেঁপে উঠলো। জাইন আর সহ্য করতে পারলেন না, হাঁটু ভেঙে এলো তার। বসে পড়লেন, আশেপাশের যাত্রীদের ভ্রুকুটির কোনো পরোয়াই করলেন না। অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরতে লাগলো তার নয়ন বেয়ে। আমারা সযত্নে তার চশমাটা খুলে নিলো, আশফিকা উবু হয়ে বসে রুমাল দিয়ে সেই অশ্রু মুছিয়ে দিলেন। তার নিজের নয়নও উন্মাদ হয়েছে।

- হবেন কি?

ভাবতে হলোনা একটুও। প্রশ্নের উত্তরস্বরুপ জাইন শিশুদের মতন জোরে জোরে মাথা দোলালেন, সম্মতিসূচক। অশ্রুমাখা হাসির দৃশ্যটি দেখালো বড়ই মায়াবী। প্রথমবারের মতন ভীষণ অধিকার ফলিয়ে সবকিছু উপেক্ষা করেই জাইন আশফিকাকে টেনে নিজের বুকের মাঝে চেপে ধরলেন। ফিসফিস করে উচ্চারণ করলেন,

- আই ওয়ান্ট টু বি দ্যা হাসব্যান্ড ইউ নেভার হ্যাড। আই ওয়ান্ট টু বি দ্যা ফাদার মাই লি' ল বার্ড নিডস! আই ওয়ান্ট টু বি আ পার্ট অব দিস ফ্যামিলি, মে আই?

ভাঙা ভাঙা শোনালো কন্ঠ। আশফিকা জোরালোভাবে জাইনকে পাল্টা আঁকড়ে ধরে মৃদুমন্থর আওয়াজে জবাব দিলেন,

- ইউ মে।

এক সুখকর আলিঙ্গনে যেন খচিত হলো এক নতুন রূপকথাতুল্য আখ্যান। প্রমাণ করলো যেন, ভাগ্য শুধু কেড়ে নিতে না, দিতেও জানে।

বেশ কিছুক্ষণ পর জাইন আমারা এবং আশফিকাকে চেকিংয়ের জন্য পৌঁছে দিলেন। আর ভেতরে যাওয়া সম্ভব না। তাই তিনি উবু হয়ে আমারার সামনে বসলেন। নরম হেসে তার কপালে অধর ছুঁয়ে দিলেন। আমারা তার দুহাত আঁকড়ে ধরলো।

- তুমি কবে আসবে?

- তাড়াতাড়ি, খুব তাড়াতাড়ি। তুমি যাও তোমার মামণির সাথে, আমি জলদিই চলে আসবো।

- মিস করবো।

- আমিও করবো বার্ড, খুব করে মিস করবো। কিন্তু ভাবার কারণ নেই, তুমি ভালো থেকো। নিজের শরীরের যত্ন নিও, মামণির দিকে খেয়াল রেখো আমার লক্ষ্মী সোনা।

আমারা শিশুদের মতন মাথা দোলালো। জাইন হেসে তার গালে আদর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ফিরলেন আশফিকার দিকে। যিনি এতক্ষণ যাবৎ মুগ্ধ নয়নে দেখে যাচ্ছিলেন সবকিছু। জাইন তাকাতেই উভয়ের দৃষ্টি মিলিত হলো। কাউকে কিছু বলতে হলোনা, শুধু লাজরাঙা হাসি।

- আসি তাহলে? আপনিও ভালো থাকবেন। অবশ্যই সময়মতো ঘুমাতে যাবেন। রাত জাগা নিষেধ। কাজ করতে করতে আবার লাঞ্চ - ডিনার ভুলে যাবেন না। ওষুধ নিতে একদম ভুল করা যাবেনা।

- ওরে বাবা। আমি কি এলিমেন্টারি স্কুলের বাচ্চা?

- হুম, একদম তাই। আমি রোজ ভিডিও কল করবো, একটু সেদিক দেখলেই...

- এইযে কান, নাক সব ধরলাম। রমণীকে রাগিয়ে দেয়ার মতন ভুল আর যেই করুক জাইন আমিন করেনা।

- হ্যাঁ, ওই রমণী থেকে একটু দূরে থাকবেন। বিশেষ করে আপনার অফিসে আছেনা একটা? কি যেনো নাম? ললিতা?

- হিহি, ললিতা ঘোষ।

- ওই ললিতা ভণিতা যাই হোক! একদম দূরে! একশো হাত দূরে!

- মডেলের থেকে কি করে....

আশফিকা রেগে যাচ্ছেন দেখে জাইন জিভ কামড়ে মাথা নাড়লেন।

- ওকে ফাইন বস! নাউ গো, নাকি ফ্লাইট মিস করতে চাচ্ছেন?

আমারার দিকে সুপ্ত নয়নে ইশারা করতেই সে যা বুঝার বুঝে গেলো। আশফিকার হাত ধরে টেনে নিলো,

- আসো মামণি জলদি আসো।

- হ্যাঁ, বাবা আসছি আসছি।

আমারাকে অনুসরণ করতে আশফিকা ঘুরলেন। ঠিক তখনি তড়িৎ গতিতে নিজের ডান গালে কোমল এক স্পর্শ পেলেন। জাইনের কোমল অধর অতি সামান্য ছুঁয়ে সরে গেলো। বিস্তর হেসে বান্দা স্তব্ধ আশফিকাকে হাত নেড়ে বিদায় জানালো।

- সি ইউ সুন....মাই মা’মা বার্ড!

টকটকে লাল হয়ে গেলো আশফিকার গাল। তাকাতেই পারলেন না তিনি আর। আপনমনে হেসে দ্রুত মেয়ের পিছনে ছুটলেন। জাইন তাকিয়ে রইলেন ঠোঁটে হাসি মেখে, যতক্ষণ না মা - মেয়ে উভয়ে আড়াল হয়ে যায় দৃষ্টিসীমার। বুক ভরে এক প্রশ্বাস টানলেন তিনি। অদ্ভুত এক পূর্ণতা টের পেলেন অন্তরে।

পরিবার। পরিপূর্ণ।

তিনি যখন উল্টো ঘুরে এয়ারপোর্টের বাইরে বেরোলেন, তখন দুজন ছেলেকে প্রবেশ করতে দেখলেন। আগাগোড়া হুডিতে মোড়ানো। একজনের মুখ দেখে বিদেশী ঠেকলো। অপরজনের চেহারা দেখা যাচ্ছেনা মাস্কে ঢেকে আছে বলে। কাঁধে ঝোলানো গিটারের ব্যাগ। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় উভয়ের টুকরো কথোপকথন কানে এলো তার। ধারণা সঠিক, আরেকটি ছেলে আসলেই বিদেশী, খুব সম্ভবত ব্রিটিশ। হাতের পাসপোর্ট দেখতে দেখতে সে পাশের জনকে জিজ্ঞেস করলো,

- ওহ, ইউ নেভার মেনশনড ইওর ফুল নেইম দোও।

গিটারওয়ালা বান্দা প্রশান্ত কন্ঠে জবাব দিলো,

- দোহা.....শেহবাগ দোহা।

জাইন আর শুনতে পারলেন না। উভয়ে চলে গিয়েছে দূরে। তিনি কেন যেন ফিরে তাকালেন। নামটা আপনমনে উচ্চারণ করলেন।

“ শেহবাগ দোহা.....”

কোথাও শুনেছেন কি? পরিচিত লাগছে, আবার লাগছে না। তবে নামটার মধ্যে অসম্ভব একটা ভার আছে, ভীষণ রকমের ভার।

জাইন আর বেশি ভাবলেন না, উল্টো ঘুরে পাড়ি জমালেন নিজ গন্তব্যে।

ভাগ্য বড়ই বৈচিত্র্যময়। ভাগ্যের চেয়ে বড় খেলোয়াড় দুটো হয়না এই জগতে। একই দিনে, একে অপরের সম্পূর্ণ অজান্তে দুটো নতুন সূচনার জন্ম দিয়েছিলো এই ভাগ্য।

চাইলেও এই ভাগ্যের কবলে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলো কোনোদিন জানতে পারবেনা এই বিচিত্র লীলাখেলা সম্বন্ধে।

✿✿✿━━━━━━━━━━━━━━━━✿✿✿

বর্তমান।

সাল ২০২৫।

এখনো ঠিক গোধূলী লগ্ন। পশ্চিম আকাশে অস্তমিত প্রায় সূর্য। কমলাভ রশ্মিতে স্নিগ্ধ পৃথিবী। লেকটি আজও একইরকম আছে। শুধু নেই রাজহাঁসযুগল। হয়ত সময়ের পরিক্রমায় আয়ু ফুরিয়েছে। ভালোবাসার অন্তর্ধান সইতে না পেরে হয়ত সঙ্গীও প্রাণ বিলিয়েছে দ্রুততম সময়ে। রেখে গিয়েছে রিক্ত এক জগৎকে।

দোহা বসে আছে বেঞ্চিতে। আগের একটা বেঞ্চির জায়গায় বর্তমানে আরো বেশ কয়েকটি নির্মাণ করা হয়েছে। সে বেছে নিয়েছে পুরাতনটিই। যেখানে বসে স্মৃতির সময়গুলো পার হয়েছিলো। কারো কোলে মাথা রেখে সে হারিয়েছিলো নিদ্রার জগতে। সেই সতেরোবর্ষী দোহা আজ প্রায় ত্রিশ ছুঁই ছুঁই। ব্যাপারটা রোমন্থনের অনুভবে ভাসিয়ে নিলো সবকিছু। সঙ্গে ভীষণ এক তোলপাড় এলো ভাবনার জগতে।

মোবাইল ফোনের ভাইব্রেশনের সুরেলা আওয়াজে দোহার দিগন্তপানে অতি মনোযোগী দৃষ্টি ভাঙলো। পকেটে হাত পুরলো সে। স্যামসাং গ্যালাক্সি ফ্লিপ মডেলের ফোনটির ভাঁজ খুলতেই স্ক্রীনের কলার আইডিতে নজরে এলো নামটি।

“ পেইন ইন অ্যাস ”

দোহা ভ্রু কুঁচকে খানিক বিতৃষ্ণা নিয়েই রিসিভ করলো। ভেসে এলো আর্থারের কন্ঠস্বর,

- তোকে কি সত্যি সত্যিই কেউ তুলে নিলো নাকি? সাতটায় কনসার্ট। তুই এখনো কোথায় পড়ে আছিস? আর এইভাবে না বলে কয়ে শুধু একটা স্টিকি নোট কপালে সেটে দিয়ে কেউ উধাও হয়ে যায় সারাটা দিনের জন্য? আর ইউ বিইং সিরিয়াস শেহবাগ?

দোহা চোখ উল্টে একটি নিঃশ্বাস ফেললো।

- এখন আবার ঢং করে নিঃশ্বাস ফেলছিস কেনো? তুই বাসায় ফিরবি নাকি চাস আমি ওখানে যাই? ওয়ান্ট মি টু ট্র্যাক ইউ ডাউন? বিকয আই ক্যান, ট্রাস্ট মি!

- ব্যা ব্যাবাবা ব্যা!

- হাহ? তুই কি এইমাত্র আমাকে ভ্যাংচালি?

- ফোন রাখ। আসছি।

- ইউ....

আর্থারের চেঁচামেচি মাঝপথেই থামিয়ে ফ্লিপ করে ফোন বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালো দোহা। ধীরপায়ে হেঁটে পৌঁছালো ফাঁকা প্রাঙ্গণে। সেন্ট পিটার্সবার্গের কলেজটা মন ভরে দেখলো আরো একবার। অনেক কিছুই বদলে গিয়েছে, আবার অনেক কিছুই বদলায়নি। চেনা পরিচিত করিডোরজুড়ে সে স্মৃতিদের ভাসতে দেখলো।

ঐতো, অনিক, রাজীব, জিই - শুরা দৌঁড়ে যাচ্ছে। একে অপরের গায়ে বোতল থেকে পানি ছুঁড়ে মারছে। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে জারা কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে শুনতে চুইংগাম চিবুচ্ছে। তার পিছনেই জানালার ধারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে অতি মনোযোগ দিয়ে একটি বই পড়ে যাচ্ছে আমারা।

আমারা.....তার কিশোর জীবনের অনুভূতি, প্রথম প্রেম, ভালোবাসা, প্রিন্সেস....

তার নোলক।

দোহা বুকের ভেতর ভাঙা টুকরোর ঝনঝনানি টের পেলো। দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হলোনা আর। রোমন্থন দুহাত ভরে তাকে দিয়েছে যাতনা। তবুও সে বারবার স্মরণ করে যাবে। কারণ এই যাতনা বড়ই মধুর!

সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে বেরিয়ে দোহা খানিকটা হাঁটলো। একটা রিকশা থামিয়ে চড়ে বসলো। আজ কত বছর বাদে রিকশায় চেপেছে? হিসাব নেই।

- মামা, হুডটা নামিয়ে দেবেন।

রিকশাওয়ালা হুড নামাতে নামাতে তাকে একনজর আপাদমস্তক দেখে বললো,

- ভাইজান আফনে এই ঠাডাপড়া গরমের মইদ্যে এমন গেঞ্জি, সানগেলাস, মাকস পইড়া আছেন ক্যান? গরম লাগেনা?

দোহা সামান্য হাসলো।

- আপনি রিকশা চালানো শুরু করুন, তাহলেই বাতাস লাগবে।

রিকশাওয়ালা আর কিছু বললোনা। চেপে বসলো, ধরলো প্যাডেল। রাজধানীর বনানীর ব্যাস্ত সড়কধরে ছুটতে শুরু করলো রিকশা। বাতাস বইছে ভালোই। বোধ হয় শীঘ্রই ঝড় টর আসবে। দোহা প্রাণভরে অনুভব করলো। বাতাসের ঝাঁপটায় তার চুল এলোমেলো হয়ে গেলো। ইচ্ছা হলো মাস্কটা খুলে নিতে, তবে ঝুঁকি নিলো না। কারণ বনানীর মোড়ে মোড়ে বসানো বিলবোর্ডগুলোয় ভাসছে তারই প্রতিচ্ছবি,

দ্যা ডুম—শেহবাগ দোহা “প্রাউড অব বিডি ”।

—চলবে—

[ Someone lost a lot, and came a long long way-🥀]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন