#স্বরলিপিতে_তুমি
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৩১
পর্ব ৩১: [ ভক্ত ]
━━━━━━━━━
হোটেল সোনারগাঁও এর সামনে আজ প্রচন্ড ভীড়। অগুণতি গাড়ির আনাগোনা। গার্ড এবং বিশেষভাবে নিযুক্ত নিরাপত্তা বাহিনী সামাল দিতে একপ্রকার হিমশিমই খাচ্ছে। হলজুড়ে ব্যস্ততা। সাংবাদিক এবং ফ্যানদের উপস্থিতিতে গোটা পুরী গমগম করছে। এক অপেক্ষার প্রহর গোণা। স্বপ্নটাকে চোখের সামনে দেখার। শেহবাগ দোহাকে দেখার।
কাটায় কাটায় ঠিক আটটা বাজে গোটা হলজুড়ে ভীষণ এক উন্মাদনা ছড়িয়ে গেলো। প্রবেশমুখ বেয়ে কাঙ্ক্ষিত সত্তাটি ভেতরে ঢুকতেই অসংখ্য ক্যামেরার ফ্ল্যাশে ধাঁধিয়ে গেলো চোখ, উত্তেজনার চিৎকারে বন্ধ হয়ে এলো কান। তবে পুরুষটির মাঝে দ্বিধা নেই। সে এসবে অভ্যস্থ। দোহা ভেতরে ঢুকলো হাসিমুখেই। পরনে “লুই ভুটোন ” এর ফুলহাতা টি শার্ট এবং প্যান্ট। পায়ের অ্যাডিডাসের কেডসজোড়া ধবধবে সাদা। জ্যাকেটটা খুলে সে আর্থারের হাতে দিয়েছে, চোখে রেখেছে সানগ্লাস। ক্যামেরার ফ্ল্যাশে মাঝে মাঝে চোখে অস্বস্তি হয় বৈকি।
- দ্যা ডুম!! শেহবাগ দোহা! শেহবাগ দোহা!
ফ্যানদের সম্মিলিত কন্ঠস্বর জপমালার মতন উচ্চারণ করতে থাকলো। গোটা হলে প্রতিধ্বনিত হয়ে তা অসাধারণ এক দৃশ্যের উৎপত্তি ঘটালো। দোহার কাছে সাংবাদিকরা ঘিরে এসে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করার চেষ্টা করলেও আশেপাশের বডিগার্ডরা তাকে সুরক্ষিত বলয়ের মধ্যে রাখলো, কাছে ঘেঁষাটা অতীব কঠিন। ভীষণ রকমের পাগলামী এবং উত্তেজনার সাগর পাড়ি দিয়ে দোহাকে ডায়াসের উপর নিয়ে গিয়ে নির্ধারিত টেবিলের উপর বসতে সাহায্য করলো তার ম্যানেজার আর্থার। ক্যামেরার ফ্ল্যাশের কোনো শেষ নেই। মুহুর্মুহু চলছে তো চলছেই। আলোর রোশনাইয়ে ভাসিয়ে দিচ্ছে জগৎ। আর্থার ঝুঁকে এসে যেন এই চেঁচামেচির মাঝেও শুনতে পায় তাই দোহার কানে ফিসফিস করলো,
- ইউ রেডি?
দোহা সানগ্লাসটা খুলে নিয়ে চুলে আঙুল বুলিয়ে সম্মতিসূচক মাথা দোলালো। আর্থার পাল্টা মাথা দুলিয়ে প্রস্তুত থাকা মাইক্রোফোন হাতে তুলে নিলো।
- ইফ আই মে হ্যাভ অল ইওর অ্যাটেনশন প্লীজ....
তার কন্ঠ জোরালোভাবে ধ্বনিত হতেই গোটা হল নিস্তব্ধপুরীতে পরিণত হলো। সন্তুষ্ট হয়ে মাইক্রোফোন দোহার হাতে তুলে দিলো আর্থার। দোহা এক নজর উপস্থিত প্রত্যেকের উপর চেয়ে ঠোঁটে বিস্তর হাসি ফুটিয়ে মাইক্রোফোনে সহজাত কন্ঠে বললো,
- হ্যালো গাইয।
- দ্যা ডুম!!!
ভীষণ এক উল্লাসের ধ্বনিতে চারপাশ ফেটে ধরে। দোহা মৃদু হাসলো, তার হাসির আওয়াজ স্পিকারে শোনা যেতেই উল্লাস দ্বিগুণ হলো।
- আমি প্রথমেই সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই আমাকে ভালোবেসে এখানে উপস্থিত হওয়ার জন্য। আশা রাখছি আমার হৃদয়ের কাছের এই মানুষগুলোর সঙ্গে একটা দারুণ সময় পার হবে।
- ইয়েস! উই লাভ ইউ শেহবাগ!
কেউ একজন ভীরের মধ্যে থেকে ভীষণ জোরে চেঁচিয়ে উঠতেই বাকিরা তার সঙ্গে গলা মেলালো। দোহা নিজের জায়গায় বসে পড়লো। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করার সুযোগ না পেয়ে আরেক দফায় হাপিত্যেশ করে রইলো।
আজ দোহার ফ্যানমিট প্রোগ্রাম। আগামীকাল সন্ধ্যায় তার শেষ কনসার্ট। এরপর আবার সুদূর ইংল্যান্ডে পাড়ি জমাবে সে ওই রাতেই। এমন টাইট স্কেজিউলে সে অভ্যস্থ। তবে এবার কেনো যেন দেশের মায়া তার অন্তরকে ভেতরে ভেতরে ভীষণ পোড়াচ্ছে। যদিও মুখ দেখলে কেউই কোনোদিন বুঝতে পারেনা তার অভ্যন্তরে কি হচ্ছে। ছোট থেকেই অনুভূতি লুকিয়ে রাখার ক্ষমতা তার অত্যধিক!
একে একে নির্বাচিত ফ্যানরা ডায়াসে উঠে এসে দোহার সঙ্গে হ্যান্ডশেক ও পাঁচ মিনিট করে কথা বলার সুযোগ পেলো। দোহা তাদের অ্যালবামে সাইন করে দিলো। কেউ কেউ বা তাকে কিছু উপহার দিলো, যেগুলো সাদরে গ্রহণ করে নিলো সে। চারপাশে খুশির আমেজ, উৎসবের ন্যায় অনুভূতি ভর করেছে। স্বপ্নটাকে কাছ থেকে ছুঁয়ে দেখার তীব্র খুশির ঝিলিক তারুণ্যের চোখেমুখে। আর যারা উপস্থিত হতে পারেনি, ফোনের পর্দায় লাইভ দেখে তারা নিজেদের অন্তরকে শান্তনা দিলো, কিংবা দুঃখে মুষড়ে গেলো বেশ করে।
দোহার হিসাব নেই সে ঠিক কতজনের সঙ্গে কথা বলেছে কিংবা কতজনকে অটোগ্রাফ দিয়েছে। বছর পনেরোর একটা ছেলে তাকে নিজের আইডল মনে করে এবং এক সময় তার মতন হতে চায় বলে দোহার শুভকামনা নিয়ে উঠে যেতেই এক মেয়ে উঠে এলো ডায়াসে। দোহার নয়ন আপনা থেকেই আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলো তাকে। কারণ মেয়েটির পরিধানে রয়েছে একটি গোলাপী বর্ণের ঝকঝকে সিল্কের শাড়ী। ছোটখাটো অথচ লাস্যময়ী দৈহিক গঠনের কারণে তাকে অন্যরকম সুন্দর দেখাচ্ছে। চোখে পড়ার মতন।
মেয়েটির মুখজুড়ে বেশ উত্তেজনা, চোখজুড়ে গভীর ঝিলিক। পিঠ সমান মসৃণ চুলগুলো বিনুনী পাকানো। দোহা চেয়ে রইলো। মেয়েটি এগিয়ে এলো, তবে পা ফেললো বেশ মেপে মেপে, অসংলগ্ন ভঙ্গিতে। বোঝা গেলো শাড়ী পরে চলাচলের অভ্যাস তার নেই বললেই চলে। তবুও জোর করে পড়েছে। কেনো? নিজেকে সুন্দর দেখানোর জন্য? নাকি দিনটাকে স্পেশাল করার জন্য?
মেয়েটি কোনমতে পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়েও পৌঁছে অবশেষে দোহার সামনের চেয়ারে বসে পড়লো। গোলাপী লিপস্টিক দেয়া ঠোঁটে লাজুক হাসলো। দোহা বুঝলো, মেয়েটি নার্ভাস। টেবিলের উপর দুহাত তার কিঞ্চিৎ কাঁপছে। দূর্বল হাসার চেষ্টাও চোখে পড়ছে বেশ। দোহা ঝুঁকে এলো, সামান্য হেসে বললো,
- লুকিং প্রিটি , আরেন্ট ইউ?
মেয়েটা স্থির চেয়ে রইলো, তার দুই গালজুড়ে টকটকে অনুভব ছড়িয়ে পড়লো এক মুহূর্তে। কাঁপা দুহাতে খপ করে আঁকড়ে ধরলো দোহার একটি হাত। ভাঙা ভাঙা আওয়াজে জানালো,
- আমি তোমার অনেক অনেক অনেক বড় ফ্যান দোহা! সবার থেকে বড় ট্রাস্ট মি! আমার কাছে তোমার সব সব অ্যালবাম আছে, সাইরেনস প্লেয়ারের প্রত্যেকটা গান একদম মুখস্থ - কণ্ঠস্থ - ঠোটস্থ! আমি অনেকগুলো কনসার্টে গিয়েছি! সবসময় আমি তোমার কনসার্টের ফ্রন্টলাইনে থাকি কিন্তু! ঐযে মনে আছে গতবার ব্রাজিলে? নিকোলাসের জন্মদিনের দিন কনসার্ট ছিল, তোমরা সবাই ওকে হ্যাপি বার্থডে গাইয়ে শুনিয়েছিলে স্টেজে? আমি ওখানে ছিলাম! চিৎকার করেছিলাম, তুমি ফিরেও চেয়েছিলে কিন্তু দেখতে পাওনি ভীড়ে!
মেয়েটার হড়বড় করে বলে যাওয়া কথা শুনতে শুনতে দোহার ঠোঁটজুড়ে অমায়িক এক স্মিত হাসি ফুটে উঠলো। কমবয়সী মেয়েটা, তা তার মুখ দেখেই বোঝা সম্ভব। আর যেভাবে কথাগুলো বলছে, তাতে স্পষ্টত সে সাইরেনস প্লেয়ার ব্যান্ডে আসক্ত, কিংবা সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে শেহবাগ দোহায় আসক্ত! দোহা শুনে যাচ্ছে আর সে বলেই যাচ্ছে।
- আমার কাছে তোমার সব ফিচার্ড ছবির কালেকশন আছে। শুধুমাত্র সাইরেনস প্লেয়ারের মার্চ আর প্রোডাক্টের জন্য আলাদা রুম করে দিয়েছে আমার পাপ্পা! এই দেখো, আজকে আমি জীবনে প্রথম শাড়ী পড়েছি! তুমি ইন্টারভিউতে বলেছিলে না তোমার পছন্দের মেয়েলী পোশাক শাড়ী? উফ! আমার স্বপ্ন পূরণ হয়ে গেলো আজ! অবশেষে! আমার নাম নাফিসা! ক্যান ইউ, প্লীজ সে মাই নেইম?
দোহা মেয়েটার উত্তেজনায় বেশ বিনোদন পেলো। মাথা দুলিয়ে উৎফুল্ল কন্ঠে বললো,
- নাফিসা, ভালো আছো?
- আহহ!
বুক চেপে ধরে চেয়ার থেকে উল্টে পড়তে নিলো নাফিসা। পাশ থেকে দুইজন গার্ড ছুটে এলো, ঝট করে উঠে দাঁড়ালো দোহাও। ভীষণ এক গুঞ্জণ খেলে গেলো চারদিকে।
- মাই গড! তুমি ঠিক আছো?
দোহার উদ্বিগ্ন কণ্ঠের বিপরীতে নাফিসার খিলখিলে হাসির শব্দ ভেসে এলো। তারপরই চোখ মেলে মেয়েটা ঠিকঠাক হয়ে বসে তাকে ধরতে আসা দ্বিধাগ্রস্ত বডিগার্ডদের দিকে তাকিয়ে বিনয় প্রকাশ করে দোহার দিকে ফিরলো।
- একটুও ঠিক নেই আমি, তুমি আমায় হার্টঅ্যাটাক দিয়েছ মিস্টার শেহবাগ!
তার জবাব শুনে আশেপাশের সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। দোহা প্রথমটায় শূন্য চেয়ে থাকলো, পরক্ষণে মাথা নেড়ে হেসে আবার টেবিলে বসে পড়লো।
- নাফিসা বেশ দুষ্টু, তাইনা?
খিলখিল করে হাসলো নাফিসা। হাতের অ্যালবামগুলো দোহার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে জানালো,
- তোমার জন্য আমি সবকিছু হতে রাজী আমার স্বপ্নের রাজকুমার।
মাথা ঝাঁকিয়ে দোহা মার্কার হাতে তুলে একে একে অ্যালবামগুলোয় সাইন করতে আরম্ভ করলো। ব্যক্ত করলো,
- তোমার এই ডেডিকেশনে আমি আপ্লুত ডিয়ার নাফিসা।
দোহার কথার জবাব এলো বেশ অপ্রত্যাশিতভাবেই।
- আই লাভ ইউ।
অ্যালবামে সাইন করতে করতে দোহা কথাটি শুনে এক চিলতে হাসলো, বেশ সাধারণভাবেই।
- থ্যাংক ইউ।
- অসভ্য।
থমকে গেলো দোহা। মুখ তুলে নাফিসার দিকে তাকালো যে এই মুহূর্তে ঠোঁট ফুলিয়ে বসে আছে, যেন ভীষণ রাগ করেছে তার উপর। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো দোহা। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ এবং গুঞ্জন চেপে এলো কানে যখন মেয়েটি জানালো,
- মানুষ কাউকে আই লাভ ইউ বললে আই লাভ ইউ টু বলতে হয়।
দোহা সামান্য কেশে উঠলো, পাশ থেকে উঁকি দিয়ে আর্থার জিজ্ঞেস করলো,
- হেই, ইউ ফাইন?
- এভরিথিং ফাইন।
- নট ফাইন! হি ইয নট সেইং হি লাভ্স মি ব্যাক!
নাফিসার অভিমানী কন্ঠে দোহা এবার কাশতে কাশতে হেসে উঠলো। আর্থার হাসি চেপে সরে গেলো। এমন ভক্ত কম নয় দোহার। দুহাত চেপে ক্ষীণ শব্দে দুটো তালি বাজিয়ে দোহা নাফিসার অভিমানী মুখের দিকে তাকালো। মেয়েটি মুখ ফুলিয়ে বললো,
- তুমি জানো আজকের এই মুহূর্তটার জন্য আমি কত কত অপেক্ষা করেছি? আর তুমি এইভাবে হাসছো? আমি প্রতিটা দিন তোমার পোস্টারের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে প্র্যাকটিস করেছি। আর তুমি আমাকে পাত্তাই দিচ্ছনা।
- হাহা, নাফিসা তুমি আসলেই ভীষণ দুষ্টু একটা মেয়ে।
দোহা অ্যালবাম সাইন করে ফিরিয়ে দিয়ে খানিকটা ঝুঁকে এসে চাপা গলায় বললো,
- তোমাকে একটা কথা বলি? শুনবে তো?
নাফিসা সাগ্রহে ঝুঁকে এলো, মাথা দুলিয়ে আগ্রহী চেয়ে থাকলো। দোহা সামান্য হাসিমাখা ঠোঁটে মাথা হেলিয়ে জানালো,
- কখনো কাউকে এত সহজে আই লাভ ইউ বলোনা কেমন?
- কেনো?
নাফিসার মুখ থেকে শিশুসুলভ উত্তেজনাটুকু হঠাৎ করেই মিইয়ে গেলো। গভীর এক দৃষ্টিতে সে তাকালো দোহার নয়নমাঝে।
- ভালোবাসা কোনো ছেলেখেলা নয়। ভালোবাসা অত্যন্ত পবিত্র আর সুন্দর একটি অনুভূতি। আর এই অনুভূতির প্রকাশ হওয়া উচিত সর্বোত্তম উপায়ে।
- আমি তোমাকে ভালোবাসি, এতে কোনো মিথ্যা নেই বুঝেছ?
- আমি জানি।
দোহা নমনীয় করলো কন্ঠ, খানিকটা আদুরে। নাফিসাকে তার লাগছে অবুঝ এক শিশুর মতন।
- তুমি আমাকে ভালোবাসো, একজন গায়ক হিসেবে, একজন আইডল হিসেবে। ট্রাস্ট মি, একদিন তোমার জীবনে এমন কেউ আসবে যাকে তুমি ভিন্নভাবে ভালোবাসবে।
- ভিন্নভাবে আবার কিভাবে ভালোবাসে?
- সেটা তুমি নিজেই বুঝে যাবে। সময় নাও। তোমার গোটা জীবনটা তো পরে আছে। যখন সেই ভিন্ন ভালোবাসাটা খুঁজে পাবে, তখন নাহয় তাকে এইভাবে আবেগ নিয়ে তোমার মনের কথা জানিও। সে খুব খুশি হবে, তোমাকে গ্রহণ করে নেবে।
নাফিসা একদৃষ্টে দোহার দিকে তাকিয়ে থাকলো। ওই সুদর্শন মুখ এবং তাতে খচিত অব্যক্ত অনুভবটুকু থেকে সে দৃষ্টি ফেরাতে পারলোনা। আনমনে প্রশ্ন করে বসলো,
- তুমি কিভাবে জানলে? তুমি কি কাউকে ভালোবাসো?
নাফিসার অবুঝ প্রশ্নে দোহা থমকে গেলো। তার অধর থেকে ভদ্রতার হাসিখানি মুহুর্তের জন্য উবে গেলো। দৃষ্টিতে ভর করলো নিদারুণ এক শূন্যতা, বুকজুড়ে চেপে এলো গভীর আবেগ। দোহা উত্তর দেয়ার আগেই অবশ্য নাফিসা উত্তেজিত কন্ঠে বললো,
- আমাকে রাইট? ওহ মাই গড! ইয়েস ইয়েস! মি টু!
- আই অ্যাম সরি, হোয়াট?
বোকার মতন চেয়ে থেকে পরক্ষণেই আবার হেসে উঠলো দোহা। পাগল ভক্তের সংখ্যা নেহায়েত কম নয় তার, কিন্তু এই নাফিসার মতন পাবলিকের মোকাবেলা সে বেশ কমই করেছে। নাফিসা দোহার বাহুতে আঙুল চেপে গুতো দিয়ে বললো,
- আগে বললেই হতো! এইভাবে ভয় লাগানোর দরকার ছিলো? আমি কি ভেবেছিলাম জানো? তোমার গানের ওই নোলক....সেই তোমার ভালোবাসা! সে যাক গে, আমার তাতে কিছুই যায় আসেনা। তোমার অন্তরে আমার জায়গাটুকু পার্মানেন্ট থাকলেই হলো। খবরদার অন্যকারো কথা চিন্তাও করবেনা, হুম!
দোহা নিজের জায়গায় একদম জমে গেলো। স্থির তাকিয়ে থাকলো নাফিসার দিকে। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ অনুভূতি হলো। কিন্তু তার মানসিক দ্বন্দ্বের প্রতি কোনো খেয়াল নেই নাফিসার। সে বললো,
- তোমার জন্য আমি একটা স্পেশাল গিফট এনেছি। দাঁড়াও, এক মিনিট।
নাফিসা উঠে দাঁড়িয়ে ডায়াস থেকে ঝুঁকে একটা বিশাল ব্যাগ টেনে আনলো, দেখেই বোঝা যাচ্ছে গিটার। ব্যাগটা খুলতেই উপস্থিত সকলের চক্ষু ছানাবড়া অবস্থা। তকতকে কালো গিটারের শরীরজুড়ে স্বর্ণালী কারুকার্য। তাতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে একটি লিখা,
“ দ্যা ডুম ”
- এটা স্বর্ণের কাজ। আমার পাপ্পা স্পেশালি জাপান থেকে অর্ডার করে বানিয়ে দিয়েছেন আমাকে। সুন্দর না? তোমার সঙ্গে দারুণ মানাবে!
- আহ ম্যাম....
দোহা কিছু বলার আগেই আর্থারের ইশারায় দুজন বডিগার্ড এগিয়ে এলো। গিটারটি পুনরায় ব্যাগে ভরে ফেললো।
- একি একি, আপনারা কি করছেন এইসব? এটা আমি দোহার জন্য....
- আহ নাফিসা।
দোহা অবশেষে নিজের মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। পরিমিত হাসি ধরে রেখে জানালো,
- তোমার উপহার আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। তবে উপহার হিসাবে জিনিসটা, একটু বেশীই মূল্যবান। তাই আমি এটি রাখতে পারছিনা কিন্তু আমার তোমাকে খুব ভালো লেগেছে। আশা করছি ভবিষ্যতে আবারো আমাদের দেখা হবে। বিদায় প্রিটি গার্ল, ভালো থেকো। আমি তোমায় মনে রাখবো।
নাফিসা আর পাল্টা কিছু বলার সুযোগ পেলনা। কারণ তার পরেও আরো কিছু ফ্যান অপেক্ষা করছে দোহার সঙ্গে দেখা করার জন্য। বডিগার্ড দুইজন তাকে ডায়াস থেকে নামতে সাহায্য করলো, গিটারটা ফেরত দিয়ে দিলো। নাফিসা একপাশে দাঁড়িয়ে নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো দোহার দিকে, যে বর্তমানে অন্য একজন ফ্যানের সঙ্গে কথা বলতে ব্যস্ত। আপনমনে বিড়বিড় করলো,
- আমি তো তোমাকেই ভিন্নভাবে ভালোবাসি। তুমি কি বুঝতে পারলে না?
。
。
。
চৌধুরী কোম্পানির ভবন থেকে পায়ে পায়ে বেরিয়ে এলেন মীর চৌধুরী। মেজাজ তার খিঁচড়ে আছে। আবারো শেয়ারমার্কেটের পতন। ইতোমধ্যেই কোম্পানি তার দেউলিয়ার দ্বারপ্রান্তে। যে শেষ চেষ্টাটুকু করছেন চৌধুরী পরিবারের মান মর্যাদা টিকিয়ে রাখতে, তাও বিফলে গিয়েছে। সকল টেন্ডার হাতছাড়া হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলোর কারণে। আর এখন,রিক্ত - শূন্য তিনি। অবশ্য, মর্যাদা রক্ষার মতন পরিবার বলতে তার কিছুই নেই। চৌধুরী বাংলোজুড়ে আছে শুধু একাকীত্ব, শীতলতা, নির্জনতা এবং.......আক্ষেপ। হারানোর আক্ষেপ। যা কোনো অবস্থাতেই পূরণীয় নয়। ধীরে ধীরে শেষ বয়সের দিকে ধাবিত হওয়া মীর বুঝতে পারছেন, তার অন্তিম গন্তব্য হতে চলেছে বৃদ্ধাশ্রম।
- এক্সকিউজ মি মিস্টার চৌধুরী?
গভীর কণ্ঠটি কানে যেতেই সড়কের ধারে নিজের গাড়ীর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মীর মাথা কাত করে ঘুরে তাকালেন। দেখতে পেলেন লম্বাটে সুদীর্ঘ এক অবয়বকে। আগাগোড়া কালো পোশাকে মোড়ানো। হুডি, মাস্ক এবং ক্যাপ পরনে। চোখজোড়া জ্বলজ্বল করছে ছায়ার মাঝে। মীর ভ্রু কুঁচকে তাকালেন,
- ইয়েস?
- আমি আপনার সঙ্গে দুই মিনিট কথা বলতে পারি?
- কি কথা?
সন্দিগ্ধ মীর গাড়ীর দরজা চেপে ধরলেন। আগন্তুক দুই পা এগিয়ে মুখোমুখি দাঁড়ালো তার।
- আমারা মীর চৌধুরী.... কোথায় তাকে পাওয়া যাবে বলতে পারেন?
স্তব্ধ হয়ে গেলেন মীর। অদ্ভুত এক আক্রোশ এবং বেদনা ফুটে উঠলো বয়সের ভারে কুঁচকে আসতে থাকা মুখজুড়ে। আগন্তুক তীক্ষ্ণ নজরে তাকে দেখছে।
- আপনাকে বলবো কেনো? আপনি কে? আমারাকে খুঁজছেন কেনো?
- প্রশ্নের জবাব দিন দয়া করে। পাল্টা প্রশ্ন করবেন না।
কণ্ঠের মাঝে কিছু একটা আছে। ঠিক হুমকি নয়। অদ্ভুত দৃঢ়তা। মীর চৌধুরী দ্বিধান্বিত হয়ে গেলেন। আতঙ্কও টের পেলেন।
- আমার কথার সঠিক জবাব দিলে আপনার লাভ কিছুই হবেনা। কিন্তু জবাব না দিলে ক্ষতি অনেক কিছুই হতে পারে।
মীর একটি ঢোক গিললেন। অনুভব করলেন শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যাওয়া শীতল স্রোতের অস্তিত্ব। অবশেষে হাল ছেড়ে জবাব দিলেন,
- ফাইন! আমি জানিনা আমারা কোথায় থাকে ওকে? দশ বছর আগে ওর মায়ের সঙ্গে আমার ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে। এরপর তারা বিদেশে চলে গিয়েছে, এটুকুই জানি আমি।
- কোন দেশ?
- জানিনা। ওদের সঙ্গে আমার আর কখনো যোগাযোগ হয়নি।
আগন্তুক এরপরও কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ নজরে চেয়ে রইলো। যেন পরখ করলো মীর মিথ্যা বলার চেষ্টা করছেন কিনা। মীর তাতে আহাজারি করে উঠলেন,
- আমি সত্যি বলছি, আমি ওদের ব্যাপারে কিছুই জানিনা!
আগন্তুক কিছুই আর বললোনা। উল্টো ঘুরে গেলো। ঠিক যেমনভাবে হঠাৎ উদয় হয়েছিলো, তেমনি হঠাৎ করেই দ্রুত হেঁটে তার দৃষ্টিসীমার আড়াল হয়ে গেলো রাতের আঁধারের মাঝে। মীর ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকলেন, অনুভব করলেন বিনা কারণেই তার হৃদস্পন্দন বেড়ে গিয়েছে। দুটি প্রশ্ন তার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকলো।
কে এই আগন্তুক? সে কেনো আমারার খোঁজ করছিলো?
—চলবে—