#নূরের_পথে_ফিরে_আসা
#নূরায়া_মেহনাজ
#পর্ব_৭
আয়েশা রাতে নামাজে বসে সিজদায় মাথা রাখল। চোখে মুখে তার কৃতজ্ঞতার হাসি।
-" হে আল্লাহ! " তুমি আমাকে সঠিক পথ দেখিয়েছো, তুমি আমাকে দিয়ে তোমার পথের দাওয়াত শুরু করিয়েছো। আমি চাই এই আলো কখনো নিভে না যাক। "
আয়েশার তখন মনে পড়ল কুরআনের একটি আয়াত যেখানে লেখা ছিল -
" আর যে একজন মানুষকে জীবিত করে ( অর্থাৎ সৎ পথে ফেরায়) সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই জীবিত করল।" ( সূরা মায়িদা ৫:৩২)
আয়েশা বুঝতে পারল, এটাই তার জীবনের আসল উদ্দেশ্য।
আয়েশা ইসলামের পথে সবাইকে দাওয়াত দিতে শুরু করেছে। কিন্তু সমাজের কিছু মানুষ তার এই পরিবর্তন সহ্য করতে পারছে না। অভিযোগ, উপহাস আরো নানা বাঁধা আসবে সামনে - যেখানে আয়েশা তার ঈমানের সত্যিকারের পরীক্ষা দিবে। আয়েশার জীবনে এখন এক নতুন কঠিন অধ্যায় শুরু হয়েছে। তার দাওয়াতের আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে ঠিকই, কিন্তু ইসলামের পথে হাঁটা মানেই কাঁটার পথেও পা রাখা। যেখানে সবাই আয়েশাকে একদিন ফ্যাশন কুইন ও স্টাইল আইকন বলে চিনত আজ সেই সমাজই তার হিজাব পড়া, কুরআনের কথা এবং আল্লাহর পথে তার দাওয়াত নিয়ে ঠাট্টা - বিদ্রূপ করতে শুরু করেছে।
সেদিস ক্লাস শেষে আয়েশা শালীন হিজাব পরিধান করে বের হচ্ছে। পাশ থেকে দু'জন সিনিয়র কিছু মেয়ের হাসির শব্দ ভেসে এলো। একজন বিদ্রূপ করে বলল,
-'মাদাম মাওলানা' আসছে! "
অন্যজন বলল,
-" আগে ছিল পার্টির রাণী এখন হয়েছে তসবিহর দাসী! "
আয়েশা কথাগুলো শুনে সেখানেই দাঁড়িয়ে গেল। তার বুকের ভেতর কষ্টে জর্জরিত হয়ে গেল। কিন্তু মুখে কোনো রাগ বা প্রতিবাদের ছাপ ফুটল না। সে শুধু মনে মনে পড়ল -
وَعِبَادُ الرَّحْمَـٰنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
উচ্চারণ : “ওয়া ইবাদুর রাহমানিল্লাজিনা ইয়ামশূনা আলাল আরদ্বি হাওনান; ওয়া ইযা খাত্বাবাহুমুল জাহিলূনা কালূ সালামা।”( সূরা আল-ফুরকান, আয়াত ৬৩)
অর্থ : আর রাহমানের বান্দারা তারা যারা বিনয় সহকারে দুনিয়ায় চলাফেরা করে ; মূর্খরা যখন তাদের সম্বোধন করে তারা বলে - সালাম।" ( সূরা আল-ফুরকান, আয়াত ৬৩)
আয়েশার ঠোঁট মৃদু নড়ে উঠলো,
- “আসসালামু আলাইকুম”।
আয়েশার বলা কথাটি শুনে মেয়েগুলো চুপ হয়ে গেল। আয়েশা বুঝে গেল, নীরবতা এবং বিনয়ই তার এখন সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
রীমার মৃত্যুর পর এবং আয়েশার এমন পরিবর্তন দেখে সাবা কিছুটা বদলে যেতে শুরু করলেও সাবার বন্ধু রিশা আয়েশার এই পরিবর্তন মেনে নিতে পারল না। একদিন রিশা আয়েশাকে সরাসরি বলল,
-" তুই এখন এমন ধর্মধর্ম ভাব নিচ্ছিস কেন? জীবনটা তো উপভোগ করার জন্য, কষ্ট করার জন্য না।"
আয়েশা হেসে বলল,
-" জীবনকে উপভোগ তো আমিও করতাম রিশা। কিন্তু সেটা ছিল অস্থায়ী, মায়াবী। ইসলামের পথে এসে আমি যে প্রশান্তি পেয়েছি, সেটা দুনিয়ার কোনোকিছুই দিতে পারবে না। যেমন ধর তোদের ওই মিউজিক, পার্টি ইত্যাদি। আমি এখন সত্যিকার অর্থে একজন সুখী মানুষ।"
রিশা বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে বলল,
-" তুই না এখন অনেক বোরিং হয়ে গেছিস।"
আয়েশা মৃদুস্বরে উত্তর দিল,
-" হয়তো বোরিংনেস আমার মধ্যে নয়, তোর মধ্যে। আমার কাছে এখন প্রতি ওয়াক্ত সময়মতো নামাজ আদায় করা একেকটা আনন্দ, একেকটা উৎসব।"
তাদের বন্ধুত্বের সরল পথটি আজ বিভক্ত হয়ে গেল।
কিছুদিন পর আয়েশার “নূরের ছায়া” সংগঠনের খবর স্থানীয় একটি ম্যাগাজিনে ছাপা হলো। শিরনামটি ছিল উপহাসমূলক —
-" সাবেক ফ্যাশন কুইন এখন ধর্মের প্রচারক। একটা কি তাহলে কি তাহলে নতুন নাটকের প্রস্তুতি?"
অনেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট নিয়ে হাসাহাসি করল। কেউ বলছে, " নাটক করছে।" আবার কেউ বলছে, " শো-অফ!"
আয়েশা এসব দেখার পরেও নীরব হয়ে আছে। কারণ ইসলামের পথে সবাইকে আহ্বান করতে গেলে তাকে অনেক ধৈর্য্য ধরতে হবে। আয়েশা মনে মনে পড়ল -
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
উচ্চারণ : “ইন্নাল্লাজিনা কালূ রাব্বুনাল্লাহু সুম্মাস্তা-কামূ, ফালা খাওফুন আলাইহিম, ওয়ালা হুম ইয়াহ্জনূন।”( সূরা ফুসসিলাত, আয়াত :৩০)
অর্থ : "নিশ্চয়ই যারা বলে, আমাদের প্রভু আল্লাহ। " যারা আন্তরিকভাবে আল্লাহকে নিজেদের পালনকর্তা ও সৃষ্টিকর্তা হিসেবে স্বীকার করে,এবং সেই বিশ্বাসের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং সকল প্রকার বিচ্যুতি থেকে নিজেদের রক্ষা করে। "
আয়েশা চোখ বন্ধ করে মনে মনে দোয়া করল,
-" হে আল্লাহ! " আমাকে দৃঢ় রাখো। মানুষের কটূকথা যেন আমার ঈমান নড়াতে না পারে।"
একদিন আয়েশার মেসেঞ্জারে এক অচেনা মেয়ের মেসেজ এল।
-" আপু আমি আপনার একটা পোস্ট দেখে নামাজ শুরু করেছি। আপনি আমাকে সঠিক পথের নিদর্শন দিয়েছেন। আল্লাহ আপনাকে রহমত দান করুন। "
এই একটি মেসেজ পড়ে আয়েশার চোখে পানি চলে আসল এবং মনে মনে বলল, “আলহামদুলিল্লাহ”।
-" আল্লাহর জন্য করা কোনো কাজই বৃথা যায় না।"
“ তুমি যা কিছু আল্লাহর পথে ব্যয় করবে, আল্লাহ তা পূর্ণরূপে তোমাকে ফিরিয়ে দিবেন।” ( সূরা আল-বাকারা, ২:২৭২)
আয়েশা মুচকি হেসে মনে মনে বলল, "যতই সমাজের মানুষ হাসিঠাট্টা করুক। যদি একজন মানুষও ইসলামের পথে ফেরে তাহলে আমার জীবন সার্থক।
সেই রাতে আয়েশা একা ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। আকাশে তখন পূর্ণিমার চাঁদ, চারিপাশে হালকা বাতাস বইছে। আয়েশা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
-" হে আল্লাহ! সমাজে সবার কটূকথা শুনে মন ভার হয়, কিন্তু আমি জানি তুমি আমার সাথে আছো। তুমি তো জানো আমি কেন বদলেছি, কার জন্য বদলেছি।
#চলবে_ইনশাআল্লাহ