ফন্ট সাইজ:
থিম:
নূরের পথে ফিরে আসো (২য় খন্ড)

৩য় পর্ব

লেখক: নূরায়া মেহনাজ

#নূরের_পথে_ফিরে_আসা { ২য় খন্ড }

#_Writer_Nuraya_Mehnaz

#পর্ব_৩

[ আজকের পর্বটা মেয়েরা অবশ্যই পড়বেন অনুরোধ রইল। আপনাদের অনেক কিছু শেখার আছে এখানে।🤍 ]

~ বর্তমান ~

ভার্সিটির সেমিনারের হলরুমে ঢোকার আগেই করিডোরের সামনে তাকে থামিয়ে দিল রোহান। এই সেই ছেলে, যে হায়াতের জীবনকে নরক বানিয়েছিল, যার হাত ধরে হায়াত একদিন ভুল পথে পা বাড়িয়েছিল। রোহানের ঠোঁটে সেই চিরচেনা বিদ্রূপের হাসি।”

“বাহ! হায়াত, তোমার এই নতুন গেটআপ তো দারুণ! কিন্তু সেই ‘পুরনো হায়াত’কে কি এই কালো কাপড়ে ঢাকা যায়?”

রোহান তার ফোনটা হায়াতের চোখের সামনে ঘোরালো।

“মনে আছে এই ভিডিওগুলোর কথা? আজ তোমার বক্তৃতার সময় যদি এগুলো বড় স্ক্রিনে প্লে হয়ে যায়, তবে তোমার এই ‘নূরের উত্তরাধিকার’ কোথায় গিয়ে লুকাবে?”

হায়াতের সারা শরীর ভয়ে হিম হয়ে এল। তার অতীত তাকে যেন অক্টোপাসের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে তার হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হলো আয়েশা আপুর সেই তেজস্বী কণ্ঠ— “হায়াত, বাঘিনী যেমন তার শিকারকে ভয় পায় না, মুমিনও তেমন তার অতীতকে ভয় পায় না। অতীত যদি হয় অন্ধকার, তবে তওবা হলো সেই ভোরের সূর্য যা সব অন্ধকারকে মুছে দেয় ।”

হায়াত গভীর এক শ্বাস নিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল, “রোহান, তুমি হয়তো মানুষের সামনে আমাকে লজ্জিত করতে পারবে, কিন্তু আল্লাহর সামনে আমার তওবা কবুল হয়ে গেছে এটা আমার বিশ্বাস। আমি এখন আর সেই অসহায় মেয়েটি নেই। আল্লাহ বলেছেন—

‘আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি কতই না চমৎকার কর্মবিধায়ক!’

(সূরা আলে ইমরান, ৩:১৭৩)

তুমি যা করতে চাও করো, আমি আমার মালিকের ওপর ভরসা করলাম।”

———————

হলরুমে পিনপতন নীরবতা। স্টেজে দাঁড়িয়ে হায়াত। সামনের সারিতে উপবিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নামী-দামী অধ্যাপক এবং শত শত শিক্ষার্থী। রোহান পেছনের সারিতে বসে তার ল্যাপটপ নিয়ে তৈরি। সে পরিকল্পনা করেছে, হায়াত যখন তার বক্তৃতা শুরু করবে, তখনই প্রজেক্টরের মাধ্যমে হায়াতের সেই বিতর্কিত ভিডিওগুলো চালিয়ে দেবে।

​হায়াত মাইক হাতে নিল। তার হাত একটুও কাঁপছে না, কোনো ভয়ও কাজ করছে না। সে শুরু করল—

“আসসালামু আলাইকুম। সম্মানিত উপস্থিতি, আজ আমরা নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কথা বলতে এসেছি। কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতায়ন কী? নিজের শরীরকে প্রদর্শন করা, নাকি নিজের আত্মাকে পবিত্র রাখা?”

ঠিক সেই মুহূর্তে রোহান তার ল্যাপটপের এন্টার বাটন চাপল। স্ক্রিনে একটা আলো জ্বলে উঠল। হায়াত চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলল— “ইয়া হাইয়্যু ইয়া কাইয়্যুম, বিরাহমাতিকা আস্তাগীছ।”

হঠাৎ হলরুমের ইলেকট্রিক লাইনে এক বিকট শব্দ হলো। পুরো হলের বিদ্যুৎ চলে গেল, কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, কেবল মাইক আর হায়াতের মাথার ওপরের একটি স্পটলাইট জ্বলছে। রোহানের ল্যাপটপটি এক অদ্ভুত শর্ট সার্কিটে অকেজো হয়ে গেছে।

​রোহান হতভম্ব হয়ে গেল। সে হন্যে হয়ে চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছুই কাজ করছে না। অন্যদিকে, অন্ধকারের মাঝে কেবল আলোকিত হায়াতকে এক জান্নাতি জ্যোতির্ময়ীর মতো দেখাচ্ছিল।

হায়াত তার বক্তৃতা চালিয়ে গেল, “নারীর মর্যাদা তার পোশাকে নয়, তার হৃদয়ের পবিত্রতায়। যারা মনে করে অন্ধকার দিয়ে আলো নেভানো যায়, তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে। আল্লাহ বলেন—

​‘তারা তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূরকে পূর্ণতা দান করবেনই, যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।’

(সূরা আস-সাফ, ৬১:০৮)”

“বোনরা আমার, আজ আমরা স্বাধীনতার নামে এমন এক শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়েছি যা আমাদের অজান্তেই তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। আমরা মনে করি দেহ প্রদর্শন কিংবা পুরুষের সমকক্ষ হতে গিয়ে পর্দা বিসর্জন দেওয়াই প্রগতি। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা আমাদের জন্য যে মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন, তার চেয়ে উত্তম আর কী হতে পারে?

​আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—

​‘হে বনী আদম! আমি তোমাদের জন্য পোশাক অবতীর্ণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জা-স্থান আবৃত করে এবং যা সৌন্দর্যস্বরূপ। আর তাকওয়ার (খোদাভীতি) পোশাকই হচ্ছে সর্বোত্তম।’ > (সূরা আল-আ’রাফ, ৭:২৬)

হায়াত একটু থেমে গ্যালারির দিকে তাকিয়ে গভীর মমতায় বলল,

“লক্ষ্য করুন, আল্লাহ পোশাককে শুধু লজ্জাস্থান ঢাকার মাধ্যম বলেননি, একে বলেছেন সৌন্দর্য। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের চেয়েও বড় সৌন্দর্য হলো আপনার ‘তাকওয়া’ বা হৃদয়ের পবিত্রতা। আজ আমরা বাইরের মেকআপ আর ব্র্যান্ডেড পোশাকে নিজেদের সাজাতে যতটা ব্যস্ত, আমাদের কলব বা অন্তরকে আল্লাহর নূরে সাজাতে কি ততটা সচেষ্ট?

যারা আধুনিকতার দোহাই দিয়ে পর্দার বিধানকে অবজ্ঞা করেন, তারা আসলে নিজেদের অজান্তেই নিজেদের মূল্য কমিয়ে দিচ্ছেন। ইসলাম নারীকে পণ্য হিসেবে নয়, বরং অমূল্য রত্ন হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। এই পর্দার বিধান কোনো দমবন্ধ করা বিষয় নয়, বরং এটি আপনার নিরাপত্তার ঢাল। আল্লাহ বলেন—

​‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও মুমিনদের নারীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের ওপর টেনে নেয়। এতে তাদের চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদের উত্ত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ > (সূরা আল-আহজাব, ৩৩:৫৯)

হায়াত কণ্ঠস্বর কিছুটা ভারী করে বলতে লাগল, “আমাদের অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, ‘আল্লাহ তো মনে থাকেন, নামাজ বা পর্দার কী দরকার?’

তাদের জন্য আল্লাহর উত্তরটি খুব স্পষ্ট। তিনি শুধু বিশ্বাসের কথা বলেননি, তিনি আমলের কথা বলেছেন। দুনিয়ার এই চাকচিক্য আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছে, কিন্তু মনে রাখবেন—

​‘আর পার্থিব জীবন খেল-তামাশা ব্যতীত কিছুই নয় এবং পরকালের আবাসই মুত্তাকীদের জন্য উত্তম। তোমরা কি অনুধাবন করবে না?’ > (সূরা আল আন-আম, ৬:৩২)

বোনরা আমার, আমাদের এই সংক্ষিপ্ত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দিতে হবে। আমরা কিসের পেছনে ছুটছি? এমন এক সাফল্যের পেছনে যা মৃত্যুর পর আমাদের সাথে যাবে না? আজ আমাদের কপালে সিজদার চিহ্ন নেই, কিন্তু হাতে দামী ফোন আছে। আমাদের মুখে আল্লাহর জিকির নেই, কিন্তু ঠোঁটে দামী লিপস্টিক আছে। অথচ প্রশান্তি তো কেবল আল্লাহর কাছেই। কুরআন বলছে—

​‘জেনে রেখো, কেবল আল্লাহর জিকিরেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’ > (সূরা আর-রাদ, ১৩:২৮)

শেষে হায়াত আর্দ্র চোখে সবার উদ্দেশ্যে এক কাতর আহ্বান জানাল, “যারা আজ মনে করছেন আমি অনেক পাপ করে ফেলেছি, আমার ফেরার পথ নেই—তাদের জন্য আমাদের রব তো দয়া নিয়ে অপেক্ষা করছেন। তিনি ডাকছেন—

​‘বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ (পাপ করেছ), তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ > (সূরা আজ-জুমার, ৩৯:৫৩)

​তাই আসুন, এই কৃত্রিম আলো বিসর্জন দিয়ে নূরের পথে ফিরে আসি। তওবার এক ফোঁটা পানি আপনার মরুভূমির মতো জীবনকে আবার সজীব করে দিতে পারে। মনে রাখবেন, অন্ধকারের শক্তি যতই হোক, সত্যের এক চিলতে নূরের কাছে তা পরাজিত হতে বাধ্য।”

​হায়াতের বক্তব্য শেষ হলো। পুরো হলরুম তখনো স্তব্ধ। অনেক মেয়ে যারা আধুনিকতার নামে বিভ্রান্ত ছিল, তাদের গাল বেয়ে তখন তওবার অশ্রু ঝরছে।

সেমিনার শেষে আমিনা আপু স্টেজের পেছনে হায়াতকে জড়িয়ে ধরলেন। আমিনা আপুর চোখে আজ তৃপ্তির অশ্রু। তিনি বললেন,

“হায়াত, আজ তুমি প্রমাণ করে দিলে যে পর্দা কেবল একটি কাপড় নয়, এটি একটি জীবন্ত মুজিজা। আয়েশা আপু আজ বেঁচে থাকলে তোমার জন্য সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন।”

#চলবে_ইনশাআল্লাহ

⚠️ বি:দ্র: আজকের পর্বটি ছোট করে দিয়েছি। ব্যস্তটার মাঝে এতটুকুই দিতে পেরেছি আপনাদের। কাল বড় করে একটি পর্ব দিব ইনশাআল্লাহ। ভালোবাসা অবিরাম। 🤍🌻

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন