ফন্ট সাইজ:
থিম:
নূরের পথে ফিরে আসো (২য় খন্ড)

৪র্থ পর্ব

লেখক: নূরায়া মেহনাজ

#নূরের_পথে_ফিরে_আসা { ২য় খন্ড }

#Writer_Nuraya_Mehnaz

#পর্ব_৪

"হায়াত, আমি কি তোকে এজন্যই মানুষ করেছিলাম? আজ সমাজে আমার মাথাটা তোর জন্য কত নিচু হয়েছে, তা কি তুই জানিস?”

হায়াত যখন বাড়ি ফিরল। তখন ড্রয়িংরুমে বাবা খুব অশান্ত হয়ে রীতিমতো পায়চারি করছেন, যেন নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন৷ তাঁর সামনে টেবিলের ওপর কিছু খাম খোলা পড়ে আছে। যেখানে হায়াতের নানাধরণের ছবি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে৷

হায়াত বুঝল, রোহান তার পরাজয় সহজে মেনে নেওয়ার পাত্র নয়। যে সাপ কামড় দিতে পারে না, সে তার বিষাক্ত নিশ্বাস দিয়ে পরিবেশ কলুষিত করতে চায়।

রোহান কেবল হায়াতের ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়েই ক্ষান্ত হয়নি, সে সেই ছবিগুলোর প্রিন্টআউট সরাসরি বাবার অফিসে এবং আত্মীয়-স্বজনের বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছে।

হায়াত কাছে যেতেই তার বাবা মাথা তুললেন। তাঁর চোখ দুটো টকটকে লাল। তিনি তখন রাগান্বিত হয়ে কথাটি হায়াতকে বলেন৷

হায়াত বাবার পায়ে হাত দিয়ে বলতে চাইল, "বাবা, ওগুলো আমার অতীত। আমি তওবা করেছি। আমি কখনো এমন ভুল কাজ আর করবো না।”

বাবা ঝটকা দিয়ে আমার হাত সরিয়ে দিলেন। "তওবা! এই বোরখা পরে কি তোর নোংরা অতীত মুছে যাবে? কাল তোর বিয়ের কথা ছিল পাশের মহল্লার এক সনামধন্য পরিবারের ছেলেটির সাথে। তারা ফোন করে বিয়ে ভেঙে দিয়েছে। এখন কে তোকে গ্রহণ করবে? বল, কে গ্রহণ করবে ?”

মা এক কোণায় দাঁড়িয়ে আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদছিলেন। তিনি না পারছিলেন মেয়ের পক্ষ নিতে, না পারছিলেন স্বামীর রাগ কমাতে। তিনি শুধু অস্ফুট স্বরে বললেন,

"হায়াত, তুই কীভাবে এমন একটা কাজ করতে পারলি? তোর এই পর্দার কারণে লোকে আরও বেশি সন্দেহ করছে।”

হায়াত অনুভব করল, তার পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে। আপনজন যখন আস্থাহীনতায় ভোগে, তখন পৃথিবীটা সবচেয়ে বেশি সংকীর্ণ মনে হয়। কিন্তু তার মনে তখন আয়েশা আপুর শেখানো সেই আয়াতটি প্রতিধ্বনিত হলো,

“হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।”

(সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৩)

বাবা হঠাৎ রুম থেকে আমার ব্যাগ নিয়ে এসে মেঝেতে ছুড়ে মারলেন৷

“ এই বাসায় তুই তখনি থাকতে পারবি যখন তুই এই লোক দেখানো পর্দা ছাড়তে পারবি। আর স্বাভাবিক জীবনযাপন করবি৷ নয়তো তোর জন্য এই বাড়ির দরজা চিরতরে বন্ধ।”

আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। একদিকে আমার জন্মদাতা পিতা, অন্যদিকে আমার রবের সন্তুষ্টি। আমি এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে রইলাম । তারপর ব্যাগটা হাতে তুলে নিলাম। আমি কণ্ঠে এক অপার্থিব দৃঢ়তা নিয়ে বললাম,

"বাবা, আমি আমার মালিককে ছাড়তে পারব না। যে অন্ধকার থেকে তিনি আমাকে আলোর পথে এনেছেন, আমি আবার সেই অন্ধকারে ফিরে যেতে পারব না। আল্লাহ যদি আমার সাথে থাকেন, তবে রাস্তার ফুটপাতও আমার জন্য জান্নাত।”

আমি দরজার দিকে পা বাড়ালাম৷ জানিনা মহান আল্লাহ তায়ালা এরপরে আমার নসীবে কি রেখেছেন৷

———————————

হাতে ব্যাগ নিয়ে হৃদয়ে এক বুক কষ্ট বহন করে আমি নেমে এলাম রাস্তায় । নিঝুম রাতে, দূর থেকে শোনা যাচ্ছে কুকুরের ডাক। শহরের স্ট্রিট লাইটের নিচে একাকী একটি মেয়ে বসে আছে৷ সে জানে, এই ঘর ছাড়া তার গৃহহীনতা নয়, বরং আল্লাহর পথে হিজরত।

​আমি কাঁদতে কাঁদতে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম,

"হে আল্লাহ! আমি তোমার জন্য ঘর ছাড়লাম। তুমি আমাকে তোমার রহমতের ঘরে ঠাঁই দিও। আমি একা নই, তুমি তো আছো!”

আমি হাঁটতে হাঁটতে আয়েশা ইনিস্টিউটের দিকে গেলাম। আমি জানি সেখানে গেলে হয়তো মাথা গোজার ঠায় আমার হয়ে যাবে। আমিনা আপু আমাকে ফেরাবে না।

আয়েশা ইনিস্টিউটের সামনে গিয়ে আমি গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমিনা আপুর ঘরে গেলাম। তিনি খাটে বসে তসবিহ হাতে নিয়ে দোয়া পড়ছেন। তিনি দরজার সামনে আমাকে দেখে ইশারায় কাছে ডাকলেন। আমি নিস্তেজ পায়ে হেঁটে গেলাম তার কাছে৷ আমি তাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললাম,

“ বাড়ি থেকে বাবা আমাকে বের করে দিয়েছে। রোহান…রোহান আমার ছবি প্রিন্টআউট করে সবার কাছে পৌঁছে দিয়েছে।”

আমিনা আপু আমার চোখ মুছিয়ে দিয়ে বললেন,

“এভাবে ধৈর্য্য হারালে হবে না হায়াত। তোমাকে শক্ত থাকতে হবে। দেখবে মহান রাব্বুল আলামীন তোমার সহায় হবেন৷ বিশ্বাস রাখো তার ওপর।”

আমিনা আপু আমাকে একটি কক্ষ দেখিয়ে দিলেন, যেখানে আজ থেকে আমার নতুন জীবন শুরু হবে।

★

রাত তখন শেষ প্রহরে এসে ঠেকেছে, আমিনা আপুর দেখিয়ে দেয়া সেই ছোট্ট কক্ষটিতে আমি নামাজ পড়ছি। ঘর ছাড়ার বেদনা আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে শেষ করে দিচ্ছে। তবুও নামাজের মধ্যে আমি এক অদ্ভুত শান্তি খুঁজে পাচ্ছি। আমার দু'চোখের তপ্ত অশ্রুতে জায়নামাজ ভিজে যাচ্ছে।

“হে আল্লাহ! তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই। তুমি আমার একাকীত্বকে তোমার নূর দিয়ে পূর্ণ করে দাও।”

ফজরের নামাজের পর আমিনা হায়াতকে নিয়ে বারান্দায় বসলেন। ভোরের স্নিগ্ধ আলো হায়াতের ফ্যাকাসে মুখে এসে পড়েছে। আমিনা বললেন,

“হায়াত, তুমি যে ত্যাগ স্বীকার করলে তার প্রতিদান স্বয়ং আল্লাহ দেবেন। যারা আল্লাহর জন্য কিছু ছাড়ে, আল্লাহ তাদের এমন কিছু দান করেন যা তারা কখনো কল্পনাও করেনি।”

আমিনা আপুর কথায় আমি মৃদু হাসলাম, তবে সেই হাসিতে ছিল এক পাহাড় সমান বিষাদ।

“কলঙ্কিত অতীতের এক মেয়েকে কে-ই বা সম্মান দেবে? সমাজ তো শুধু আমার দাগগুলোই দেখবে।”

কয়েকদিন পর, ইনস্টিটিউটের একটি সমাজসেবা মূলক প্রজেক্টে কাজ করতে এলো ওমর। লম্বা, সুশ্রী এবং চোখে এক গভীর বুদ্ধিমত্তার ছাপ। ওমর একজন ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু তার হৃদয়ের সবটুকু জুড়ে আছে দ্বীনের দাওয়াত। আয়েশা ইনস্টিটিউটের যাবতীয় টেকনিক্যাল কাজ সে স্বেচ্ছায় করে দেয়।

​ওমর যখন হায়াতের কার্যক্রম এবং তার বিনয় দেখল, সে অবাক হয়ে ভাবল,

“আজকের যুগেও কি এমন মলায়েম স্বভাবের মেয়ে হয়?”

ওমরের ভেতরটা এক অজানা শ্রদ্ধায় ভরে উঠল। কিন্তু সে জানত না হায়াতের পেছনের সেই ঝোড়ো অতীতের কথা।

ইনস্টিটিউটের লাইব্রেরিতে একদিন হায়াত আমিনা আপুর সাথে কথা বলছিল। হায়াত কাঁদছিল এবং তার সেই ভয়াবহ অতীত ও রোহানের দেওয়া অপমানের কথাগুলো বলছিল।

“আপু, এই কলঙ্ক নিয়ে আমি সারা জীবন কীভাবে চলব? মানুষ যখন জানবে আমি এক সময় কেমন ছিলাম, তারা কি আমাকে ঘৃণা করবে না?”

​দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ওমর সব শুনে ফেলল। তার বুকটা ধক করে উঠল। কিন্তু অবাক বিষয় হলো, হায়াতের অতীত শুনে ওমরের মনে ঘৃণা নয়, বরং এক তীব্র মায়া আর শ্রদ্ধার উদয় হলো। সে ভাবল,

“যে মেয়েটি অন্ধকার থেকে উঠে এসে নিজেকে এভাবে বদলে নিয়েছে, সে তো সাধারণ কেউ নয়। সে তো এক জীবন্ত মুজিজা!”

​ওমর জানত, সত্যিকারের ঈমানদারের কাছে মানুষের অতীত বড় নয়, বরং বর্তমানের ‘তাকওয়া’ বা আল্লাহভীতিই আসল। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবনেও আমরা দেখেছি তিনি কীভাবে অন্ধকার থেকে ফিরে আসা মানুষদের শ্রেষ্ঠ মর্যাদা দিয়েছিলেন।

সেদিন সন্ধ্যায় ওমর আমিনা আপুর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে এক দৃঢ় সংকল্প।

“আপু, আমি হায়াতকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে চাই।”

​আমিনা অবাক হয়ে চাইলেন।

“ওমর, তুমি কি সব শুনেছো? ওর অতীত সম্পর্কে তুমি জানো তো?”

​ওমর শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল, “হ্যাঁ আপু, আমি সব জানি। আর জেনেই বলছি, আমি হায়াতকে বিয়ে করতে চাই। যে মেয়েটি আল্লাহর জন্য নিজের ঘর ছেড়েছে, তার হাত ধরা আমার জন্য সৌভাগ্যের বিষয়। আমার ওর অতীত নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা নেই । আল্লাহ তো বলেছেন—

​‘সৎকর্মশীল নারীগণ সৎকর্মশীল পুরুষদের জন্য।’

(সূরা আন-নূর, ২৪:২৬)

হায়াত আজ নিজেকে তওবার মাধ্যমে পবিত্র করেছে। তার অতীতের ভুলগুলো এখন আল্লাহর রহমতে সিক্ত।”

#চলবে_ইনশাআল্লাহ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন