#নূরের_পথে_ফিরে_আসা { ২য় খন্ড }
#পর্ব_৫ ( হায়াতের নিকাহ্ স্পেশাল )
#Writer_Nuraya_Mehnaz
আকাশের উজ্জ্বল নীল রঙটা আজ ধূসর মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। চারদিকে মেঘের ঘনঘটা দেখে মনে হচ্ছে এক পশলা বৃষ্টি নামাতে প্রকৃতি বুঝি খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
আকাশের মেঘলা মেঘের মতোই এক অশান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে চৌধুরী সাহেবের ড্রয়িংরুমে। তিনি রাগে থরথর করে কাঁপছেন। তাঁর সামনে মাথা নিচু করে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে ওমর। বাহ্যিকভাবে তাকে বিনয়ী মনে হলেও তার মনের ভেতর ছিল পাহাড়ের মতো এক অটল সংকল্প। সত্যের পথে অবিচল থাকার সেই অজেয় শক্তি আজ তার মেরুদণ্ডকে এক অভাবনীয় দৃঢ়তা দান করেছে।
চৌধুরী সাহেবের কণ্ঠস্বর রাগে কাঁপছিল। তিনি ওমরের দিকে আঙুল উঁচিয়ে চিৎকার করে উঠলেন,
—"পাগলামির একটা সীমা থাকে ওমর! যে মেয়ে আজ সারা শহরের মানুষের আলোচনার বিষয় যার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে তাকে তুমি আমাদের আভিজাত্যের অংশ করতে চাইছো? যাকে তার জন্মদাতা বাবা ত্যাজ্য করে ঘর থেকে বের করে দিয়েছেন তাকে তুমি এই বাড়ির বউ করে আনবে? আমাদের বংশের সম্মানের কথা কি একবারও তোমার মাথায় এলো না?”
ওমর শান্ত কিন্তু তেজস্বী কন্ঠে উত্তর দিল,
—"বাবা, আমরা তো ভুলের ঊর্ধ্বে নই। ইসলামের সৌন্দর্যই তো হলো ক্ষমা। সৃষ্টিকর্তা যদি বান্দার পাহাড় সমান পাপ এক ফোঁটা তওবার চোখের পানিতে মুছে দিতে পারেন, তবে আমাদের ঘৃণা করার কোনো অধিকার থাকে না। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের জীবন দিয়েছেন তিনি যদি তাঁর বান্দাকে ক্ষমা করতে পারেন তবে আমরা কেন তাকে দূরে ঠেলে দেব? আপনি তার যে অতীত নিয়ে কথা বলছেন সে তো সেই জীবনকে ঘৃণা করে আল্লাহর কাছে তওবা করে ফিরে এসেছে। যে স্রষ্টার কাছে পবিত্র হয়ে গেছে আমরা তুচ্ছ মানুষ হয়ে তাকে বিচার করার কে?”
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
‘পাপ থেকে তওবাকারী ব্যক্তি সেই ব্যক্তির ন্যায়, যার কোনো পাপ নেই।’ > (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৪২৫০)
“দুনিয়ার আভিজাত্য তো দুদিনের মেহমান বাবা। একদিন মাটির নিচে সব ধুলোয় মিশে যাবে। আমি তো আভিজাত্য খুঁজি না, আমি খুঁজি আমার হৃদয়ের সেই পবিত্র অংশকে—যে হাতটি ধরে আমি জান্নাতের দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারব।”
চৌধুরী সাহেব সজোরে টেবিল চাপড়ে বললেন,
—“তবে শুনে রাখো ওমর! যদি ওই মেয়েকেই জেদ করে বিয়ে করো, তবে এই বাড়ির দরজা তোমার জন্য চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। আমার এক আনা সম্পত্তিও তুমি পাবে না। আমি দেখতে চাই—যে আভিজাত্য তুমি আজ পায়ে ঠেলে দিচ্ছ সেই অভাবের সংসারে ওই কলঙ্কিত মেয়েকে নিয়ে তুমি কতটা সুখে থাকতে পারো!”
ওমর এক মুহূর্ত দেরি না করে স্পষ্ট স্বরে উত্তর দিল,
—“বাবা, রিযিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ। আমি আপনার সম্পদের ভাগ চাইনি, চেয়েছিলাম আপনার সমর্থন। কিন্তু এখন যখন পরিস্থিতি এমন যে আমাকে ইসলাম আর বংশমর্যাদার মধ্যে যেকোনো একটাকে বেছে নিতে হবে—তবে আমি আমার আল্লাহকেই বেছে নিলাম। আপনার সম্পত্তি হয়তো আমাকে বিলাসিতা দেবে, কিন্তু আমার আল্লাহ আমাকে শান্তি দেবেন।”
আয়েশা ইনস্টিটিউটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরের ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল হায়াত। তার চোখেমুখে তখন রাজ্যের দুশ্চিন্তা। আমিনা আপুকে লক্ষ্য করে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—“আপু, সব শুনে আমার খুব অপরাধবোধ হচ্ছে। ওমরের মতো একজন ভালো মানুষের সাজানো পরিবার আমার জন্য ভেঙে যাক সেটা আমি কখনো চাই না। আমি বরং ওমরের জীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেই সেটাই হয়তো সবার জন্য ভালো হবে।”
ঠিক তখনই ওমর সেখানে এসে দাঁড়ায়। তার চোখে কোনো ভয় নেই বরং এক অদ্ভুত জ্যোতি।
সে হায়াতের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে বলল,
—“হায়াত, আমি জানি আমার পরিবার আপনাকে মেনে নেয়নি। তারা আপনার অতীত নিয়ে অনেক বাজে মন্তব্য করেছে। কিন্তু আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি যদি আপনি রাজি থাকেন তবে আমি এক বস্ত্রে ওই ঘর ছাড়তে প্রস্তুত। আমি চাই না আপনি একা লড়াই করুন। আমি আপনার জীবনের সেই ঢাল হতে চাই, যা সমাজ আর অপবাদের মাঝে প্রাচীর হয়ে দাঁড়াবে।”
হায়াতের চোখের বাঁধ আজ ভেঙে গেছে, সে অঝোরে কাঁদছে। আজ সে প্রথমবারের মতো জীবনের এক নিগূঢ় সত্য অনুভব করল—নিখাদ ভালোবাসা কোনো নশ্বর শরীর কিংবা বংশের আভিজাত্যে বন্দি থাকে না বরং সেটা থাকে পারস্পরিক বিশ্বাসের গভীরে। সে কান্নায় ভেঙে পড়া অস্ফুট স্বরে বলল,
—“ওমর আপনি কি একবারও ভেবে দেখেছেন আপনি কার জন্য এত বড় ত্যাগ করছেন? আমার মতো একজন তুচ্ছ আর কলঙ্কিত মানুষের জন্য আপনি আপনার সাজানো জীবন বিসর্জন দেবেন?”
ওমর শান্ত স্বরে বলল, “হায়াত নিজেকে আর কলঙ্কিত বলে ছোট করবেন না।। আপনি তো সেই হিরে যা ধুলোয় পড়ে থাকলেও তার মূল্য হারাবে না। আপনার তওবা আপনাকে পবিত্র করেছে। মানুষের বিচার দিয়ে নিজেকে মাপবেন না। মনে রাখবেন—আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন, আর তিনিই আমাদের জন্য যথেষ্ট।”
★
পরদিন আসর নামাজের পর মসজিদের এক নিভৃত জায়গায় অত্যন্ত সাদামাটা আর অনাড়ম্বরভাবে শুরু হলো ওমর ও হায়াতের জীবনের এক নতুন অধ্যায়।
সেখানে আধুনিক সমাজের সেই জাঁকজমকপূর্ণ আলোকসজ্জা নেই, নেই কোনো ব্যান্ড পার্টির উচ্চ শব্দ কিংবা দামি খাবারের ঘ্রাণ। কিন্তু সেখানে যা ছিল তা আজকালের রাজকীয় বিয়েতেও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এক বুক খাঁটি ভালোবাসা আর আল্লাহর প্রতি অগাধ ভরসা নিয়েই তারা তাদের নতুন জীবন শুরে করতে যাচ্ছে। সাক্ষী হিসেবে কেবল উপস্থিত ছিলেন আমিনা আপু আর মসজিদের ইমাম সাহেব।
ইমাম সাহেব খুতবা পড়তে শুরু করলেন-
“আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই জোড়া সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” ( সূরা আর-রূম, ৩০;২১)
তখন হায়াতের দুই চোখ ভিজে উঠল অশ্রুতে। এই অশ্রু প্রাপ্তির, এই অশ্রু কৃতজ্ঞতার। ‘কবুল’ শব্দটি যখন তাদের দুজনের ঠোঁট থেকে উচ্চারিত হলো তখন আসমানের মালিক যেন নিঃশব্দে তাদের এই পবিত্র বন্ধনে রহমতের চাদর জড়িয়ে দিলেন।
নিকাহ শেষে তারা একে অপরের সামনে এসে দাঁড়াল। মাঝখানে এক হাত দূরত্ব, কিন্তু হৃদয়ে এক জান্নাতি বন্ধন। ওমর সারার চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। সেই হাসিতে ছিল আজীবন পাশে থাকার এক নিঃশব্দ অঙ্গীকার। সে ধীরস্বরে বলল,
—“হায়াত, আজ থেকে এই দুনিয়ার কোনো অপবাদ আপনার নয়। আজ থেকে আপনার সব সম্মান আমার। আমাদের হাতে হয়তো আজ অর্থ-সম্পদ নেই, কিন্তু আমাদের হৃদয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি আছে। আমি কথা দিচ্ছি, এই হাত আমি কখনো ছাড়ব না। শুধু এই নশ্বর দুনিয়ায় নয় আমি চাই আমাদের এই সফর যেন জান্নাতের সুশীতল ছায়া পর্যন্ত দীর্ঘ হয়। আমরা কেবল দুনিয়ার সঙ্গী নই, আমরা জান্নাতের চিরস্থায়ী সহযাত্রী।”
হায়াত মাথা নিচু করে ওমরের কথাগুলো শুনছিল। তার মনে হলো এতদিনের সব অপমান সব লাঞ্ছনা যেন এই এক মুহূর্তের শান্তিতে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে। সে মনে মনে রবের কাছে প্রার্থনা করল, ‘হে আল্লাহ, আপনি আমাদের এই বন্ধনকে কবুল করে নিন। আমাদের ঘরকে জান্নাতের এক টুকরো অংশ বানিয়ে দিন।’
যখন তারা মসজিদের বাইরে পা রাখল, তাদের সামনে এক অনিশ্চিত পৃথিবী। ওমরের পকেটে ছিল সামান্য কিছু টাকা আর সারার হাতে তার ব্যক্তিগত ডায়েরি। ওমরের বাবার অঢেল সম্পত্তি আজ তাদের জন্য নিষিদ্ধ। আভিজাত্যের সব দুয়ার আজ বন্ধ। কিন্তু তাতে ওমরের মনে কোনো আক্ষেপ নেই।
সূর্যাস্তের রাঙা আলোয় তাদের দুজনের ছায়া যখন দীর্ঘ হচ্ছিল তখন মনে হচ্ছিল—দুনিয়ার এই ক্ষুদ্র অভাব তাদের কাছে বড় তুচ্ছ। তারা আজ রিক্ত হস্ত হয়েও যেন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দম্পতি কারণ তাদের কাছে আছে হার না মানা ঈমান আর একে অপরের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা। তারা জানে, যে রবের ওপর তারা ভরসা করেছে সেই রব তাদের কখনো পথ হারাবে না।
শহরের এক কোণে ঘিঞ্জি বস্তি এলাকার পাশে ওমর একটি ছোট ঘর ভাড়া করল। স্যাঁতসেঁতে নোনা ধরা দেয়াল, মাথার ওপর তপ্ত টিনের চাল—বিলাসিতার লেশমাত্র নেই সেখানে। কিন্তু সেই জীর্ণ ঘরে ঢুকে হায়াত যখন ওমরের পেছনে জায়নামাজে দাঁড়াল, তখন তার মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি খেলে গেল।
নামাজ শেষে ওমর হায়াতের দিকে ফিরে তাকাল। তার চোখে এক শান্ত সাহসের দীপ্তি। সে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,
—“হায়াত, আজ থেকে আমাদের এক নতুন যুদ্ধের শুরু। সমাজ হয়তো আমাদের দিকে বাঁকা চোখে তাকাবে, দারিদ্র্য বারবার আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নেবে। কিন্তু আমাদের অঙ্গীকার হবে পাহাড়ের মতো অটল। আমরা একে অপরের হাত কখনো ছাড়ব না। আমরা দুনিয়াকে দেখিয়ে দেব—যখন ঘরে ইসলামের বিধান থাকে আর হৃদয়ে আল্লাহর ভয় থাকে, তখন একটি ভাঙা কুঁড়েঘরও জান্নাতের বাগানে পরিণত হতে পারে।”
#চলবে_ইনশাআল্লাহ
( প্রিয় পাঠকবৃন্দ।🌻 আজকের পর্বটি কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাবেন।💜)