ফন্ট সাইজ:
থিম:
নূরের পথে ফিরে আসো (২য় খন্ড)

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: নূরায়া মেহনাজ

#নূরের_পথে_ফিরে_আসা { ২য় খন্ড }

#পর্ব_৬

#Writer_Nuraya_Mehnaz

—“আজ আমি একা নই। আমার পাশে এমন একজন মানুষ আছে, যে আমার ক্ষতগুলোকে ঘৃণা করেনি বরং ভালোবেসে সারিয়ে দিয়েছে। আমরা ঘর হারিয়েছি ঠিকই কিন্তু আরশের অধিপতির ছায়া খুঁজে পেয়েছি।”

শহরের এক কোণে ছোট্ট একটা ভাড়া ঘর। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে,কিন্তু টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ আজ মোটেও ভালো লাগছে না; বরং মনকে অস্থির করে তুলছে এক অজানা আশঙ্কায়।

যে ওমর সারাজীবন বিলাসিতার মাঝে বড় হয়েছে, সে আজ এই সামান্য ঘরে মেঝের মাদুরেই দিব্যি বসে আছে। তার চোখেমুখে কোনো আফসোস নেই, আছে এক পরম তৃপ্তি—যা সাধারণ কোনো সুখের চেয়েও অনেক বড়।

সকালে ওমর অফিসে গিয়ে দেখল চারপাশের পরিবেশটা একদম থমথমে হয়ে আছে । অফিসের ব্রেক টাইমে ওমরের কলিগরা নিজেদের মধ্যে কানাঘুষা করছে।

রোহানের প্রতিহিংসা এতই নিচে নেমেছে যে,সে শুধু হায়াতের পরিবারকে হেনস্তা করেও ক্ষান্ত হয়নি; ওমরের অফিসের ইমেইলে হায়াতের সেই বিতর্কিত ভিডিওর স্ক্রিনশটগুলোও পাঠিয়ে দিয়েছে।

ওমরের এক সিনিয়র কলিগ ব্যঙ্গ করে বললেন,

“কি হে ওমর! তোমার রুচি তো চমৎকার! দুনিয়ায় কি আর কোনো ভালো মেয়ে ছিল না যে একটা আস্ত ‘স্ক্যান্ডাল’কে তুলে আনতে হলো? ইঞ্জিনিয়ারিং বুদ্ধিতে কি জং ধরেছে?”

ওমরের চোয়াল শক্ত হয়ে এল,কিন্তু সে রাগকে সংবরণ করল। সে শান্তভাবে হাতের ফাইলটা ডেস্কে রেখে বলল,

“স্যার, আমার স্ত্রী নিজের ভুল বুঝতে পেরে তওবা করেছেন। আর যে মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সৃষ্টি করেছেন, তিনি যদি তাঁর বান্দার অতীত মাফ করতে পারেন তবে আমি তাঁর সৃষ্টি হয়ে ঘৃণা করার স্পর্ধা রাখি না। আমার স্ত্রীর সম্মান রক্ষা করা আমার ঈমানি দায়িত্ব।”

ওমরের এমন কথায় সবাই চুপ হয়ে গেল।

সেদিন বিকেলেই ওমরের হাতে টার্মিনেশন লেটার ধরিয়ে দেওয়া হলো। কারণ হিসেবে বলা হলো— ‘কোম্পানির ইমেজের স্বার্থে’। ওমর হাসল, কেবল সে মনে মনে পাঠ করল,

“আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট।”

(সূরা আত-তালাক, ৬৫:৩)

ওমর যখন ঘরে ফিরল, হায়াত তখন বুঝতে পারল কিছু একটা ঘটেছে। ওমরের শুকনো মুখ দেখে সে বিচলিত হয়ে পড়ল। ওমর তাকে সব জানাল। হায়াত কেঁদে ফেলল।

“ওমর, আমার কলঙ্কিত অতীত আপনাকে আজ কর্মহীন করে দিল। আমিই আপনার ধ্বংসের কারণ হচ্ছি।”

ওমর হায়াতের মাথায় হাত রেখে বলল,

“বিবিজান, খবরদার! ওসব কথা মুখেও আনবেন না। এই চাকরি গেছে কারণ আল্লাহ আমাদের এর চেয়ে উত্তম কিছু দেবেন। আমরা এখন ডাল-ভাত খাব, কিন্তু হালাল আর সম্মানের সাথে খাব। মনে রেখবেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং সাহাবীরা দিনের পর দিন না খেয়ে কাটিয়েছেন দ্বীনের জন্য। আমরা কি সামান্য একটু পরীক্ষা দিতে পারব না?”

হায়াত ওমরের এই বিশালত্ব দেখে অবাক হয়ে চাইল। সে চোখের পানি টুকু মুছে বলল,

“তবে আজ থেকে আমরা একসাথে সংগ্রাম করব। আমি ঘরোয়াভাবে মেয়েদের কুরআন শেখানো শুরু করব। আমাদের ঘর হবে দ্বীনের দাওয়াতের কেন্দ্র।”

রোহান যখন দেখল ওমরকে চাকরিচ্যুত করেও তাদের আলাদা করা যাচ্ছে না, তখন সে আরও মরিয়া হয়ে উঠল। সে হায়াতের বাবার পারসোনাল উকিলকে ঘুষ দিয়ে তার কাছে গিয়ে মিথ্যা তথ্য দিতে বলল যে, হায়াত আর ওমর মিলে তাঁর সম্পত্তি দখলের জন্য আইনি নোটিশ করছে।

হায়াতের বাবা রাগে অন্ধ হয়ে ওমরের সেই বস্তির বাসায় এসে হাজির হলেন। তিনি এসে হায়াতকে যাচ্ছেতাই ভাবে অপমান করতে লাগলেন।

“তুই তো নষ্ট ছিলিই, এখন এই ভিখারি ছেলেটাকে জুটিয়ে আমার সম্পত্তিতে ভাগ বসাতে চাস?”

ওমর তখন শান্তভাবে দাঁড়িয়ে বলল,

“আব্বাজান, আপনার একটি পয়সাও আমাদের লাগবে না। আমরা শুধু আপনার দোয়া চেয়েছিলাম। আপনি যদি আমাদের ত্যাজ্য করেন তাতেও আমাদের দুঃখ নেই। কিন্তু হায়াত কে অপমান করবেন না ও এখন আমার আমানত।”

হায়াতের বাবা আশরাফুল সাহেব রাগান্বিত হয়ে বললেন,

“আমানত মাই ফুট! দেখবো কতদিন তোমাদের এই ফেলনা সাজানো সংসার টিকে থাকে।” বলেই তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন।

হায়াত তখন মুখে হাত চেপে কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে। ওমার তার কাছে গিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,

“কাঁদবেন না বিবিজান! একদিন সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। শুধু আপনাকে একটু ধৈর্য্য ধরতে হবে। পারবেন না?”

“জ্বি ইনশাআল্লাহ।”

সেদিন রাতে ঘরে মোমবাতি জ্বলছিল, কারণ বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার মতো টাকা তাদের কাছে ছিল না। হায়াত আর ওমর একসাথে নামাজ আদায় করার পর, বসে সূরা আর-রাহমান তিলাওয়াত করছিল। তিলাওয়াত শেষে হায়াত মনে মনে ভাবল,

“আজ আমাদের ঘরে আলো নেই, পেটে অন্ন নেই কিন্তু হৃদয়ে এমন এক নূরের উপস্থিতি অনুভব করছি যা সাত মহলের প্রাসাদেও নেই। সমাজ আমাদের একঘরে করেছে কিন্তু আল্লাহ আমাদের তাঁর রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দিয়েছেন। আমরা প্রমাণ করব—আল্লাহর ওপর ভরসা আর সঠিক পথে চলার সাহস থাকলে সাধারণ নুন-ভাতেও সুখ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।”

​ওমর হায়াত কে বলল,

“বিবিজান, কাল থেকেই আমরা ‘নূরের উত্তরাধিকার’ নামে একটা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম শুরু করব। যারা জীবনের সঠিক পথ হারিয়ে ফেলেছে কিংবা হতাশায় ভুগছে আমরা তাদের আলোর পথ দেখাব। আমাদের মূল কাজ হবে মানুষকে সঠিক ও সুন্দর জীবনের দিকে ডাকা।”

————————

টিনের চালে তখন দুপুরের তপ্ত রোদ এসে পড়ছে। ঘরের ভেতরটা যেন আগুনের চুল্লির মতো গরম হয়ে আছে। ওমরের পকেটে এখন একটি টাকাও অবশিষ্ট নেই। গতকাল রাতে তারা শুধু পানি খেয়ে ঘুমিয়েছিল, আজ দুপুরেরও একই অবস্থা। হায়াত রান্নাঘরে গিয়ে হাঁড়িগুলো নেড়ে দেখল—এক মুঠো চালও কোথাও নেই।

কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো হায়াতের মনে আজ কোনো আক্ষেপ নেই। সে বারবার আয়েশা আপুর সেই কথাটাই ভাবছিল—'আল্লাহ যাকে পছন্দ করেন, তাকে অভাব আর ক্ষুধা দিয়ে পরীক্ষা করেন যেন সে আরও শুদ্ধ ও পবিত্র হতে পারে। ক্ষুধা কেবল পেটের জ্বালা নয় বরং এক মহিমান্বিত শুদ্ধি।

ওমর পাশের ঘরে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল। ক্ষুধার যন্ত্রণায় তার পেট মোচড় দিয়ে উঠছে, কিন্তু সে হায়াত কে বুঝতে দিতে চাইছে না।

হায়াত এক গ্লাস পানি নিয়ে ওমরের সামনে এসে দাঁড়াল। তখন ওমরের শুকনো মুখ আর ক্লান্ত চোখ দুটো দেখে হায়াতের বুকটা হু হু করে উঠল।

হায়াত মৃদুস্বরে বলল,

“ওমর , একটু পানি খান। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন, তিনি নিশ্চয়ই আমাদের রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন। ইনশাআল্লাহ।”

ওমর গ্লাসটা হাতে নিয়ে হায়াতের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে অপরাধবোধের সুর—

“বিবিজান, আপনি বিলাসিতায় বড় হওয়া মেয়ে। আজ আমার কারণে আপনাকে দুদিন ধরে না খেয়ে থাকতে হচ্ছে। আমার বাবা-মা তখন ঠিকই বলেছিলেন, আপনাকে আগলে রাখার ক্ষমতা আমার নেই। আমি শুধু আপনাকে কষ্টই দিচ্ছি।”

হায়াত ওমরের হাতটা শক্ত করে ধরল। সে বলল,

“ওমর, একদম এমন কথা বলবেন না! আপনি আমাকে কষ্ট দিচ্ছেন না, বরং আপনি আমাকে সত্যিকারের সুখ কি সেটা শিখিয়েছেন। ওই বড় অট্টালিকায় থেকে যদি আমার রুহ মরে যেত, তবে সেই বিলাসের কী দাম ছিল?”

আল্লাহ তায়ালা তো বলেছেন—

​‘অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি এবং ফল-ফসলের স্বল্পতা দিয়ে; আর আপনি সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদের।’ (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৫)”

ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় কড়া নাড়ল কেউ। ওমর দরজা খুলে দেখল পাশের বস্তির এক বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর হাতে একটা মাটির থালা, তাতে সামান্য কিছু খিচুড়ি।

​

#চলবে_ইনশাআল্লাহ।

[ প্রিয় পাঠকবৃন্দ। রেগুলার গল্পটা দিতে পারছি না তার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।🙃 গল্পটা পড়ে কিন্তু অনেক কিছু শেখার আছে আপনাদের। যেটা আপনারা আপনাদের জীবনে কাজে লাগাতে পারবেন ইনশাআল্লাহ। সবাই গল্পটি পড়বেন আশা করছি। দোয়া করবেন আমার জন্য।🌻]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন