#নূরের_পথে_ফিরে_আসা
#পর্ব_৭
#Writer_Nuraya_Mehnaz
“বাবা আজ আমার নাতনির আকিকা ছিল। খুব সাধারণ ভাবেই আয়োজন করেছি আমরা। মনে হলো তোমরা নতুন ভাড়াটিয়া তাই একটু নিয়ে এলাম। কিছু মনে করো না বাবা গরিবের খাবার তো!”
“না খালা এসব কি বলছেন আপনি? খাবার তো খাবারই হয় সেটা আবার বড়ো ছোটো হয় নাকি? আল্লাহর দেওয়া রিজিক সবার কাছেই সমান। আপনি যে আমাদের কথা ভেবে এই খাবার টুকু নিয়ে এসেছেন আমরা খুব খুশি হয়েছি।”
বৃদ্ধাটি ওমরের কথায় খুশি হয়ে তার মাথায় হাত রাখলেন।
ওমরের চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। হায়াত পেছন থেকে সবকিছু দেখছিল। তাদের কাছে সামান্য ঐ খিচুড়ি টুকু আজ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নেয়ামত মনে হলো। তারা দুজনে একসাথে বসে সেই খাবার টুকু খেল। ওমর খাওয়ার পর আলহামদুলিল্লাহ বলে মাথা নিচু করল৷
হায়াত তখন ওমর কে বলল,
“ওমর, আজ বুঝলাম রিযিক কেবল টাকা দিয়ে আসে না রিযিক আসে আল্লাহর হুকুমে। যে আল্লাহ মারিয়াম (আ.)-কে মেহরাবের ভেতর ফল পাঠাতে পারেন, তিনি এই বস্তির জরাজীর্ণ ঘরেও পাঠাতে পারেন।”
রোহান যখন দেখল অভাবের মাধ্যমেও হায়াত -ওমরকে দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না তখন সে তার শেষ চালটি চালল। সে একজন দুর্নীতিবাজ পুলিশ অফিসারের মাধ্যমে ওমরের নামে সাইবার ক্রাইম এবং চুরির মিথ্যা মামলা ঠুকে দিল। তার দাবি—ওমর তার অফিস থেকে একটি সিক্রেট ফাইল চুরি করেছে।
বিকেলের দিকে পুলিশের গাড়ি এসে থামল ওমরের সেই ছোট্ট ঘরটির সামনে। হঠাৎ পুলিশের গাড়ি দেখে বস্তির মানুষগুলো সেখানে ভিড় জমালো। পুলিশ অফিসার কর্কশ কন্ঠে বললেন,
“এখানে ওমর কে? তার নামে এরেস্ট ওয়ারেন্ট আছে।”
পুলিশের কথা শুনে হায়াত আঁতকে উঠল। সে পেছন থেকে ওমরের জামা টেনে ধরল।
“ওমর ওরা আপনাকে নিয়ে যাবে কেনো? আপনি তো অন্যায় কিছু করেননি!”
ওমর শান্ত ভঙ্গিতে হায়াতের মাথায় হাত রাখল।
“ আমার প্রিয় বিবিজান ঘাবড়াবেন না। ইউসুফ (আ.)-কেও তো মিথ্যা অভিযোগে জেলে যেতে হয়েছিল। এটা আমাদের দাওয়াতের একটা অংশ। আপনি আমিনা আপুর কাছে যান, আর দোয়া করুন আমার জন্য।”
পুলিশ ওমরকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে নিয়ে গেল। হায়াত মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগল। বস্তির মানুষগুলো তখন টিটকারি করে বলতে লাগল
“দেখলি? পর্দা করা বউ ঘরে এনে চোর এখন জেলে গেল!”
ওমরকে যখন হাজতে রাখা হলো সেখানে আরও অনেক দাগী আসামি ছিল। কিন্তু ওমরের মুখে কোনো ভয়ের চিহ্ন নেই। সে এক কোণে বসে নিচু স্বরে তিলাওয়াত করতে লাগল,
‘আর নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি।’ (সূরা আল-ইনশিরাহ, ৯৪:৫)
হাজতের অন্য কয়েদিরা অবাক হয়ে তার দিকে চেয়ে রইল। কেউ একজন প্রশ্ন করল,
“ভাই বিপদে পড়েও আপনি হাসছেন কীভাবে?”
ওমর হাসল।
“বিপদ যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে তখন তা আমাদের কাছে বিপদ মনে হয় না সেটা হলো ভালোবাসার স্মারক।”
পুলিশের গাড়ি যখন ধুলো উড়িয়ে ওমর কে নিয়ে বস্তির গলি ছেড়ে চলে গেল। হায়াতের তখন মনে হলো তার শরীরের ভেতর থেকে কেউ কলিজাটা উপড়ে নিয়ে যাচ্ছে। চারপাশের মানুষের নানাধরণের কটু কথাগুলো তার কানে বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধছিল। কিন্তু সে আর আগের মতো নেই যে কোনো বিপদে সহজে ভেঙে পড়বে৷ তার পায়ের নিচের মাটি আজ শক্ত। কারণ সে আরশের মালিকের ওপর ভরসা রেখেছে।
হায়াত টিনের ঘরের বারান্দায় বসে রইল অনেকক্ষণ। ঘরটা আজ বড্ড ফাঁকা চারদিকের শূন্যতা যেন হায়াত কে গিলে খেতে চাইছে। এক কোণে ওমরের জায়নামাজটা পড়ে আছে। হায়াত জায়নামাজটি দুই হাতে বুকে জড়িয়ে ধরল। কান্নায় তার বুক ফেটে যাচ্ছে কিন্তু সে কোনোমতে নিজেকে সামলাল। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
‘হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি'মাল ওয়াকিল—আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, আর তিনিই সেরা কর্মবিধায়ক।’
—---------------------------
পরদিন ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই হায়াত এক বুক আশা নিয়ে আয়েশা ইনস্টিটিউটে গিয়ে হাজির হলো। হায়াতের কাছে সব কথা শুনে আমিনা আপু কিছুক্ষণের জন্য একদম স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তার চোখেমুখেও চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল কিন্তু তিনি হায়াত কে ভেঙে পড়তে দিলেন না।
আমিনা আপু গভীর মমতায় হায়াতের হাত দুটো চেপে ধরলেন। সান্ত্বনার সুরে তিনি বললেন,
“হায়াত ভেঙে পোড়ো না। মনে রেখো, এই লড়াইটা শুধু ওমরের একার না। এটা হলো হকের (সত্যের) সাথে বাতিলের (অসত্যের) চিরকালীন যুদ্ধ। রোহান হয়তো ভাবছে জেল-জুলুম আর পুলিশ দিয়ে সে তোমাদের চলার পথ আটকে দেবে। কিন্তু সে জানে না যে ইতিহাস কী বলে! ইউসুফ (আ.)-কেও অন্যায়ভাবে বন্দি করা হয়েছিল কিন্তু সেই জেলখানাই ছিল তাঁর জন্য নবুওয়াতের পাঠশালা। সেখান থেকেই তাঁর সাফল্যের বড় ধাপ শুরু হয়েছিল।”
ঘটনার গুরুত্ব বুঝে আমিনা আপু আর দেরি করলেন না। তিনি তৎক্ষণাৎ পরিচিত একজন দক্ষ এডভোকেটের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। এডভোকেট আনিস সাহেব যখন মামলার ফাইলটি উল্টেপাল্টে দেখছিলেন তখন তার কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফুটে উঠল।
তিনি গম্ভীর মুখে সারার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“হায়াত কাজটা মোটেও সহজ হবে না। মামলাটা খুব নিখুঁতভাবে সাজানো হয়েছে। আইটি বিভাগ দাবি করছে যে ওমরের ল্যাপটপ থেকে কিছু আপত্তিকর ও সাজানো তথ্য তারা পেয়েছে। আসলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নানা মারপ্যাঁচে ফেলে তাকে খুব বাজেভাবে ফাঁসানো হয়েছে। এর পেছনে নিশ্চয়ই বিশাল কোনো ষড়যন্ত্র কাজ করছে। যারা চায় না ওমর বাইরে থাকুক।”
হায়াতের আর বুঝতে বাকি রইল না যে এই সবকিছুর মূলে কে। সে নিশ্চিত ছিল একমাত্র রোহান ছাড়া এর পেছনে কেউ নেই। রোহান কেবল আমার জীবন ও ওমরের ক্যারিয়ার ধ্বংস করেই শান্ত হয়নি। সে এখন তাকে সবদিক থেকে পুরোপুরি মিটিয়ে দিতে চাইছে।
হায়াত চোখের জল মুছে দৃঢ় কণ্ঠে আইনজীবীকে বলল,
“স্যার আমার স্বামী একদম নির্দোষ। তিনি শুধু আমার সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে আজ এই বিপদে পড়েছেন। আপনি যেভাবে পারেন যেকোনো মূল্যে তার জামিনের ব্যবস্থা করুন। আমরা সত্যের পথে আছি, ইনশাআল্লাহ জয় আমাদেরই হবে।”
এডভোকেট ফি এবং জামিনের জন্য যে পরিমাণ টাকার প্রয়োজন তা ছিল হায়াতের সাধ্যের বাইরে। এতো বিশাল অঙ্কের টাকা জোগাড় করার আর কোনো পথ না পেয়ে হায়াত নিরুপায় হয়ে পড়ল। শেষ পর্যন্ত সে বুক ভরা কষ্ট আর দ্বিধা নিয়ে তার বাবার বাড়ির দিকেই রওনা হলো।
একসময় যে বাড়ি থেকে তাকে শূন্য হাতে বের করে দেওয়া হয়েছিল অভিমানে যে পথে আর কখনও পা বাড়াবে না ভেবেছিল আজ জীবনের তাগিদে তাকে আবার সেখানেই ফিরে যেতে হচ্ছে। তবে আজ সে নিজের কোনো সুখের জন্য যাচ্ছে না, যাচ্ছে তার বিপদে পড়া জীবনের শ্রেষ্ঠ সঙ্গী, তার অর্ধাঙ্গর জন্য। স্বামীর সম্মান আর মুক্তি আজ তার কাছে নিজের সব অভিমানের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই হায়াত দেখল তার বাবা চৌধুরী সাহেব খবরের কাগজ পড়ছেন। হায়াত কে দেখে তাঁর চোখে ঘৃণা ফুটে উঠল।
তিনি কাগজটা সরিয়ে কড়া গলায় বললেন,
“আবার কেন এসেছিস? পুলিশ যখন তোর স্বামীকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল এলাকার লোকজন তখনই আমাকে ফোন করে সব জানিয়েছে। আমার মান-সম্মান সব ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে এখন আবার কোন মুখে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিস? এবার কী নিতে এসেছিস আমার কাছে?”
বাবার এমন ধরণের কথা শুনে হায়াত নিজেকে আর সামলাতে পারল না। সে দুহাতে বাবার পা জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল। আজ হায়াত বড় অসহায়।
সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল,
“বাবা খোদার কসম ওমর একদম নির্দোষ। ও শুধু আপনার পথভ্রষ্ট মেয়েটাকে অন্ধকার থেকে টেনে এনে আলোর পথ দেখিয়েছে বলেই আজ ওকে এই সাজা ভোগ করতে হচ্ছে। আপনি তো ভালো করেই জানেন রোহান কতটা নিচ আর ভয়ংকর হতে পারে! শুধু প্রতিহিংসা মেটাতে ও মিথ্যে মামলায় ওমরকে জেলে পাঠিয়েছে। আপনি কি আপনার জামাতাকে একটু সাহায্য করবেন না বাবা?”
চৌধুরী সাহেব পা সরিয়ে নিলেন৷
"আমার কোনো জামাতা নেই। যে ছেলে আমাকে অপমান করেছে, সে জেলেই পচুক। আর তুই যদি এখনই এই ব্যাকডেটেড পর্দা খুলে আমার কথা মতো না চলিস তবে এই বাড়ির দরজাও তোর জন্য বরাবরের মতো বন্ধ।”
বাবার মুখে এমন নিষ্ঠুর কথা শুনে হায়াত হাত দিয়ে চোখ মুছে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। যে চোখ দিয়ে এত সময় অশ্রু গড়িয়ে পড়েছিল সেই চোখে এখন প্রবল তেজ ও আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠল।
সে সরাসরি বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“বাবা আজ আপনি ওমরের বিপদে ওর পাশে দাঁড়ালেন না। কারণ আপনার কাছে আপনার তথাকথিত আভিজাত্য আর অহংকারই বড়। আপনি সম্মানের কাঙাল কিন্তু সত্যিকারের সম্মান যে কার হাতে তা আপনি জানেন না। মনে রাখবেন, যে আল্লাহ ওমরকে এই কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছেন তিনিই তাকে সসম্মানের সাথে উদ্ধার করবেন। আজ থেকে আপনার সম্পত্তির এক পয়সার ওপরও আমার কোনো লোভ নেই। তবে শুনে রাখুন আজ এই মুহূর্ত থেকে আপনার সাথে আমার সব রক্তের বন্ধন আমি ছিন্ন করে গেলাম।”
আর এক মুহূর্ত হায়াত সেখানে না দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।
#চলবে_ইনশাআল্লাহ