ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান

৬৯তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৬৯.

প্রায় ৩০০ কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম হতে ঢাকায় আসার সফরটা অনেকটা স্মৃতিময়ই মনে হলো দূর্জয়ের কাছে। পরিবারের সর্বোচ্চ প্রাইভেসিটা মেইনটেইন করতে আলাদা করে আর ড্রাইভার ঠিক করে নি সে। বরং নিজেই ড্রাইভ করে স্ত্রী সন্তানকে পাশে নিয়ে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে। পথিমধ্যে যদিও বার তিনেক গাড়ি থামিয়ে বিশ্রাম নিয়েছে। তবে তার দরুন পাঁচ ঘন্টার যাত্রাটা প্রায় সাত ঘন্টা স্থায়ী হলো। দূর্জয় অবশ্য ভয় পাচ্ছিলো বাণী এবং বিশেষ করে বহ্নিকে নিয়ে। এতটা দীর্ঘ জার্নির ধকল সইতে পারবে নাকি সেই চিন্তায় বুদ ছিলো। তবে বাচ্চাটা প্রথম অর্ধেকটা পথ নিভৃতে ঘুমিয়ে এবং বাকি অর্ধেকটা পথ প্রফুল্ল মনে আর অবাক চোখে প্রকৃতি দেখতে দেখতেই এসেছে। শীতকাল হওয়ায় জার্নিটা তেমন একটা গায়েও লাগে নি তার।

দূর্জয়ের প্রিয় কালো জিপটা যখন শান্তিকুঞ্জ নামক বাড়ির দ্বারে এসে থামলো, ঘড়ির কাটা তখন কেবল দুপুর দুটোর কাটা পেরিয়েছে। উত্তাপহীন মধ্যাহ্নে পুত্র, পুত্রবধূ এবং নাতনির আগমন টের পেতেই সুহালা বেগম রান্নাঘর ছেড়ে এক ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। উনার পিছুপিছু বাড়ির কাজে সাহায্যের জন্য নিযুক্ত সতেরো বছরের মৌটুসীও ছুটে যায়। সুহালা বেগম শান্তিকুঞ্জের আঙিনায় আগ্রহী চোখ মেলে তাকাতেই দেখেন কালো গাড়িটার সামনের ডান পাশের দরজাটা খুলে নেমে আসছে শার্ট, প্যান্ট পরিহিত তার ছেলে। দূর্জয় গাড়ি থেকে নেমেই আধা পাক ঘুরে বাম পাশের দরজাটা খুলে হাত বাড়িয়ে দিতেই তার হাতে হাত রেখে গাড়ি ছেড়ে নামে বাণী। গায়ে তার শাশুড়ি মায়ের পছন্দ করে কিনে দেওয়া কালো মনিপুরী শাড়িটা। দূর্জয় এবার পিছিয়ে গিয়ে পিছনের দরজাটা খুলে বহ্নিকে গাড়ি থেকে নামায়। সুহালা বেগম আবেগময় দৃষ্টি মেলে দেখে দৃশ্যটা। কি মনোরম দৃশ্য!

বহ্নি দূর হতে সুহালা বেগমকে দেখতেই দৌড়ে এগিয়ে আসে দীদা বলে। দৌড়ে এসে সুহালা বেগমের কোমর জড়িয়ে ধরে বলে,

“ ইউ আর লুকিং প্রিটি দীদা। “

ছোট্ট বাচ্চাটার মুখে এরকম প্রশংসা বাক্য শুনে সুহালা বেগম লজ্জা পেয়ে বলে,

“ দীদা যতই চেষ্টা করুক, প্রিন্সেসের থেকে বেশি প্রিটি হতে পারবে না। “

দূর্জয় এবং বাণী বহ্নির মতো তাড়াহুড়ো করলো না। তারা ধীরে সুস্থে এগিয়ে আসে। বাণী শাড়ির আঁচলটা কাধে টেনে নিয়ে নমনীয় স্বরে বলে,

“ আসসালামু আলাইকুম আন্টি। কেমন আছেন আপনি? “

সুহালা বেগম পুত্রবধূকে জড়িয়ে ধরে হাসি হাসি মুখ করে বলে,

“ বহ্নিও দীদা ডাক শিখে গেলো আর তুমি এখনো আন্টি ডাকেই আটকে আছো। আন্টিতে আটকে থাকলে কিন্তু বাড়ির ভেতর নো এন্ট্রি জারি হবে। দ্রুত আম্মু, মা কিংবা দূর্জয়ের মতো মামণি ডাকে মুভ ইন করো। “

বাণী লজ্জা পেয়ে বলে,

“ আচ্ছা মা। “

দূর্জয় বলে,

“ এখানে আমিও দাঁড়িয়ে আছি। আমার দিকেও একটু মনযোগ দাও কেউ। নাকি আমাকে ভুলে গিয়েছো তুমি? “

সুহালা বেগম এবার ছেলেকে সবটুকু মনযোগ দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলে,

“ ওয়েলকাম হোম বাবা। “

সুহালা বেগম আগ্রহী গলায় মৌটুসী এবং বাড়ির দাঁড়োয়ান নোমান ভাইকে ডেকে নিজের পুত্রবধূ এবং নাতনির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। নতুন মুখ দুটোকে ঘিরে তাদেরও যে প্রবল আগ্রহ!

__________

শান্তিকুঞ্জে বাণী এবং বহ্নির পদচারণ হলো দূর্জয়ের হাত ধরে। সুহালা বেগম মৌটুসীকে নিয়ে রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, আর দূর্জয় স্ত্রী কন্যাকে পুরোটা ঘর ঘুরিয়ে দেখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বাড়িটা মূলত দূর্জয়ের দাদার আমলে তৈরী বলেই বাড়ির অবকাঠামো গঠন আজকালকার বাড়িগুলোর সঙ্গে মিলে না। তবে নিয়মিত মেরামতের ফলে বাড়িটা এখনো নতুনের ন্যায় চকচকে। এর একছত্র ক্রেডিট সুহালা বেগম প্রাপ্য। তিনি যদি জনমানবশূন্য বাড়িটায় কোনো অভিযোগহীন থেকে অতি ভালোবাসা দিয়ে এই বাড়িটার যত্ন না নিতো তবে বাড়িটার অবস্থা আজ পরিত্যক্তের ন্যায় হতো।

বাড়ির নিচতলাটা বিশাল লিভিং রুম, ডায়নিং এরিয়া, একটা বেডরুম যেখানে মৌটুসী থাকে এবং রান্নাঘর মিলিয়ে সুসজ্জিত। পুরনো দিনের ডিজাইনে করায় রান্নাঘরটার সঙ্গে লাগোয়া একটা লম্বা বারান্দা আছে। সেই বারান্দার দরজা হয়ে বাড়ির পিছন দিকটায় যাওয়া যায়। বাড়ির পিছন দিকটাও বিশাল জায়গা জুড়ে। সেখানে রয়েছে একটা খোলা কলপাড় যেটা আপাতত কেউই ব্যবহার করে না। তাছাড়াও রয়েছে চতুর্ভুজাকৃতির একটা মোটামুটি সাইজের পুকুর। সেই পুকুরের চারিদিক ঘিরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল নারিকেল গাছের সারি।

বাড়ির ভেতরের সিড়ি বেয়ে দোতলায় যেতেই সরু করিডোর ঘেঁষে দেখা যায় চারটা বেডরুম। দূর্জয় একে একে বেডরুম গুলো কার কোনটা বলতে থাকে। বাম দিক থেকে শুরু করে প্রথম রুমটা দূর্জয়ের মরহুম দাদা দাদুর। দ্বিতীয় রুমটা হলো দূর্জয়ের ফুপ্পির। তৃতীয় রুমটা এককালে দূর্জয়ের মামণি বাবার রুম থাকলেও বর্তমানে সেখানে কেবল দূর্জয়ের মামণি একাই থাকে। চতুর্থ এবং শেষ রুমটা হলো দূর্জয়ের।

রুমের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই দূর্জয় দ্রুত এগিয়ে গিয়ে সবার আগে বারান্দার দরজার সামনে ঝুলন্ত পর্দা গুলো টেনে সরিয়ে দিয়ে সম্পূর্ণ দরজাটা খুলে দেয়। মুহূর্তেই আলো এবং দখিনা মৃদু বাতাসে রুমটা কানায় কানায় হয়ে যায়। দূর্জয় ঘাড় ঘুরিয়ে বাণী এবং বহ্নির দিকে তাকায়। যারা আগ্রহ ভরা নয়নে রুমের দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে। নিজের ব্যক্তিগত রুমটায় স্ত্রী আর কন্যার বরণের কাজটুকু কিভাবে সম্পন্ন করলে তা বিশেষ হিসেবে আখ্যা পাবে তা জানা নেই দূর্জয়ের। তার মন চাইলো জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই মানুষ দুটোর জন্য মখমলের কার্পেটের বদলে নিজের বুকটা বিছিয়ে দিতে। মানুষ দুটো নগ্ন পায়ে সেখানটায় হেঁটে বেড়াক। স্বাধীন এবং মুক্ত পতাকার ন্যায় মাথা তুলে, নিঃসংকোচে।

মনের ভাবনা গুলো দূর্জয়ের মনেই চাপা রয়ে যায়। বাণী নিজেই অধিকারটুকু বুঝে নিয়ে বিনা অনুমতিতে মেয়ের হাত ধরে রুমে পা রাখে। চারিদিকটা চোখ বুলিয়ে দেখতে থাকে। বহ্নি বাণীর হাত ছেড়ে এক দৌড়ে বারান্দায় চলে যায়। তার চোখে মুখে খুশি চিকচিক করছে। সে বারান্দার কিনারা ঘেঁষে দাঁড়াতে নিলেই দূর্জয় সতর্ক করে ডাকে,

“ কিনারে যাবেন না কিডডো। বাচ্চাদের জন্য সেফ না। “

বহ্নি সাময়িকের জন্য দমলেও এই স্নিগ্ধ সুন্দর বারান্দাটাকে ঘিরে তার প্রবল আগ্রহ রয়ে যায়। আচমকা উন্মুক্ত দরজায় নকের শব্দ শুনতেই তিন জোড়া চোখ ফিরে তাকায়। বাড়ির দাঁড়োয়ান নোমাম ভাই দূর্জয়দের লাগেজ দুটো হাতে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। হাসি মুখে বলে,

“ রুমের সামনে রেখে দিয়ে যাবো আব্বা? “

দূর্জয় এগিয়ে গিয়ে ব্যস্ত স্বরে বলে,

“ আরেহ নোমান ভাই। আপনি লাগেজ আনতে গেলেন কেনো? আমি-ই নিয়ে আসতাম তো! এই ভারী ব্যাগ দুটো বয়ে দো তলায় নিয়ে এসেছেন। আপনার হাঁটুর ব্যথাটা নিয়ে বিন্দু মাত্র চিন্তা নেই দেখছি। “

বয়স্ক লোকটা ফোকলা হেসে বলে,

“ বাড়িতে নতুন সদস্য এসেছে। এসব হাঁটুর ব্যথা নিজ থেকেই সেড়ে যাবে এখন। “

বহ্নি এগিয়ে এসে দূর্জয়ের হাত ধরে প্রশ্ন করে,

“ আমি দীদার কাছে যাই মেজর? “

নোমান ভাই বলে,

“ আসো আসো দাদুভাই। আমিও নিচে যাবো। তোমাকে রান্নাঘরে দীদার কাছে নিয়ে যাবো, চলো। “

বহ্নি উৎফুল্ল হয়ে লোকটার হাত ধরে বলে,

“ লেট'স গো নোমান ভাই। “

বহ্নির সম্বোধনে বাণী বেশ লজ্জায় পড়ে যায়। আর দূর্জয় মুখ টিপে হাসতে থাকে। বহ্নি নোমান ভাইয়ের সঙ্গে নিচে চলে যেতেই বাণী অবাক গলায় প্রশ্ন করে,

“ তুমি ওই আংকেলকে ভাই বলে কেনো ডাকছিলে? “

দূর্জয় এবার সামান্য হেসে বলে,

“ আসলে উনি অনেক আগে থেকে আমাদের বাসায় আছেন। বলতে গেলে খুবই বিশ্বস্ত। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি উনাকে। তো মামণি আর বাবা সবসময় উনাকে নোমান ভাই ডাকতো। তো আমিও উনাদের অনুসরণ করে উনাকে নোমান ভাই বলেই ডাকতাম। অবুঝ ছিলাম তখন। বড় হয়ে বুঝতে শেখার পরও অভ্যাসটা বদলাতে পারি নি। তাই নোমান ভাই বলি। “

বাণী প্রথমে অবাক হলেও পরমুহূর্তে হেসে অবচেতন মনে বলে উঠে,

“ বাপেরও নোমান ভাই, মেয়েরও নোমান ভাই। “

কথাটুকু উচ্চারণ করেই বাণীর হুশ ফিরে। এক মুহুর্ত দূর্জয়কে দেখে নিয়ে চরম অস্বস্তি নিয়ে বারান্দায় চলে যায়। বেলাগাম মুখটা অসময়ে কি অদ্ভুৎ কথা বলে বসলো। দূর্জয়ের বারান্দাটা থেকে বাড়ির পিছন দিকের দৃশ্যটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো। রেলিঙ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বাণীর চোখ তখন পুকুরের সবুজ রঙা স্থির জলের দিকে নিবদ্ধ। বাণীর ধ্যানের মাঝেই তার বা পাশটায় এসে কেউ জায়গা দখল করে রেলিঙ ঘেঁষে দাঁড়ায়। নিবিড় দৃষ্টি শান্ত পুকুরে স্থির করে বেশ অনেকটা সময় নিয়ে বলে উঠে,

“ বহ্নিকে আমি যতই ভালোবাসি না কেন, ওর শরীরে আমার রক্ত নেই এই সত্যটা তুমি কখনো ভুলতে পারবে না। তাই না? “

দূর্জয়ের সেই প্রশ্নের কোনো প্রতুত্তর করে না বাণী। দূর্জয় উত্তরের অপেক্ষাও করে না। সে জানে এই সত্যটা বাণী কখনোই ভুলতে পারবে না। ভুলে যাওয়া সম্ভবও নয়। দূর্জয়ের আকাশ সমান ভালোবাসা এবং যত্নের সামনে সেই সত্যটার উচ্চতা সবসময় বেশি-ই রবে। দূর্জয়ের গোপন মনের কোণে আচমকা আফসোস জেগে উঠে। বহ্নি দূর্জয়ের সন্তান হলে কি খুব বেশি কোনো ক্ষতি হয়ে যেতো? হিরণ নামক অমানুষটার অস্তিত্ব বাণীর জীবনে না থাকলে কি খুব বেশি কোনো ক্ষতি হয়ে যেতো? বাণীর জীবনে সেই ভয়ংকর সাতটা বছর না আসলে কি খুব বড়ো কোনো ক্ষতি হয়ে যেতো? দূর্জয় গোপনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সৃষ্টিকর্তার দেওয়া কোনো বিশেষ ক্ষমতা থাকলে সে সবার আগে এক এক করে নিজের স্ত্রীর জীবনের সব খারাপ অধ্যায় গুলো মুছে দিতো। যেই অধ্যায় গুলো প্রতিনিয়ত বাণীকে তাড়া করে বেড়ায়। তার স্বাভাবিক জীবনের পথে বারবার বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। তার দু চোখের ঘুমটুকু পর্যন্ত কেড়ে নিয়েছে। সেই অধ্যায় গুলোর অস্তিত্ব দূর্জয় নিজ হাতে ম্লান করে দিতো।

__________

দুপুরের খাওয়া দাওয়ার অধ্যায় সেড়েই দূর্জয় সময় অপচয় না করে বিকেল হতেই চলে যায় এলাকার পরিচিত মসজিদটায়। আসরের নামাজ সেড়ে ইমান সাহেবের সঙ্গে একান্তে কথা বলতে বসে সে। সার সংক্ষেপে বেশ অনেকটাই ইমান সাহেবকে বুঝিয়ে সে জানতে চায়,

“ হুজুর, আমি জানতে চাচ্ছিলাম যে আমার মেয়ের কি আকিকা দিয়ে তার নামের সঙ্গে আমার পদবী জুড়ে দেওয়া সম্ভব? “

বয়স্ক নূরানী চেহারার লোকটা আঁতকে উঠে বলেন,

“ আস্তাগফিরুল্লাহ। তা কখনোই সম্ভব না। নিজের ঐরশজাত সন্তান ব্যতীত অন্যের সন্তানের নামের শেষে নিজের পদবী বসানো আমাদের ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মারাত্মক গুনাহর কাজ। এই কাজ ভুলেও করো না। “

দূর্জয় এই ব্যাপারে অবগত ছিলো না। সে দ্বিধা মিশ্রিত স্বরে বলে,

“ তাহলে কি ওর বায়োলজিকাল ফাদারের পদবী ব্যবহার করতে হবে ওকে? “

হুজুর মাথা নেড়ে বলে,

“ মূলত আসল পিতা যদি মৃত, তালাক প্রাপ্ত কিংবা সন্তানের দায়িত্ব পালন অথবা দেখাশোনা না-ও করে তবুও সন্তানের নামের শেষে সেই পিতার পদবী বসানোর কথা বলা হয়েছে আমাদের ধর্মে। কেবল একটি ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম সম্ভব। তা হলো শিশুটি যদি আল্লাহ মাফ করুক ব্যভিচারের ফলে জন্ম নেয়। সেই ক্ষেত্রে কেবল পিতার পদবী ব্যবহার করা জায়েজ নয়। এমন অবস্থায় শিশুটির নামের সঙ্গে মায়ের পদবী কিংবা অর্থবহ যেকোনো আরবী নাম রাখা যায়। “

দূর্জয়কে ক্ষানিকটা চিন্তিত দেখায়। অর্থাৎ বহ্নি হিরণ কিংবা দূর্জয় কারো পদবী-ই ব্যবহার করতে পারবে না। বাকি যে দুটো অপশন হাতে রইলো তা নিয়ে বাণীর সঙ্গে কথা বলতে হবে। এই ব্যাপারে বাণীর ডিসিশন নেওয়ার অধিকার সবচেয়ে বেশি বলে মনে করে সে।

দূর্জয়কে চিন্তিত দেখে হুজুর এবার বলে উঠেন,

“ কিছু বিধি নিষেধ তো থাকবেই। এতটাও জটিল নয় বিষয়টা। যদিও আজকাল কেউই এসব বিধি নিষেধের ধার ধারে না। তবে আমি বলবো সন্তান এবং নিজেদের মঙ্গলের জন্য বিষয়টা আমলে নেওয়া উত্তম হবে। “

দূর্জয় এবার স্বাভাবিক গলায় বলে,

“ তা নয় হুজুর। জায়েজ নয় এরকম কিছুই আমরা করবো না অবশ্যই। তবে আপনার উল্লেখ করা শেষের পরামর্শটা নিয়ে আমার ওয়াইফের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন মনে করছি। আমি ওর সঙ্গে কথা বলে আপনাকে জানাবো। “

হুজুরের থেকে বিদায় নিয়ে দূর্জয় উঠতে নিলেই হুজুর আচমকা প্রশ্ন করে বসে,

“ মেয়ের নামটা যেনো কি বলেছিলে তুমি? “

“ বহ্নি। “

হুজুর কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন,

“ এই নামটা আকিকা না দেওয়াই উত্তম। নামের অর্থ ভালো না। বহ্নি নামের অর্থ আগুন অথবা হুতাশন। মেয়ের জন্য ভালো অর্থবহ আরবী নাম খুঁজো। মনে রাখবে নামের অর্থ কিন্তু একটা মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলে বেশ। “

__________

শরীরটা ম্যাড়ম্যাড়ে লাগায় এই শীতের বিকেলে বাণী গোসল করতে ঢুকেছে। গরম পানির ছোঁয়ায় যখন একটা কুইক শাওয়ার নিতে ব্যস্ত সে, ঠিক সেই মুহুর্তে আচমকা তার বুক কেমন কামড়ে উঠে। গোসল ছেড়ে মিনিট দুয়েক বাণী স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। আচমকা এরকম অনুভব করার কারণটা সে বুঝতে পারলো না। কোনো মতে নিজেকে ধাতস্থ করে দ্রুত গোসলটা সেড়ে ফেলে সে। বাসায় পরিধেয় যোগ্য একটা আরামদায়ক সিল্ক বাটিকের শাড়ি কোনোমতে গায়ে পেঁচিয়ে সে টাওয়াল হাতে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে।

রুমে পা রাখতেই তার চোখ গিয়ে পড়ে খালি বিছানাটার দিকে। বাণীর ভ্রু জোড়া কুচকে আসে। সে সঙ্গে সঙ্গে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকেই বারান্দা সহ সম্পূর্ণ রুমে চোখ বুলায়। বহ্নি কোথায়? গোসলে যাওয়ার আগেই তো মেয়েটাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে বাথরুমে গেলো সে। সুহালা বেগমের কাছে গেলো নাকি? প্রশ্নটা মনে উঁকি দিতেই বাণী টাওয়ালটা রেখে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে নেয়। দরজার কাছেই দূর্জয়ের মুখোমুখি হয় সে। দূর্জয়কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আগ্রহী গলায় জানতে চায়,

“ বহ্নিকে নিচে দেখেছো? “

দূর্জয় অবাক হয়।

“ না তো। কোথায় ও? “

“ গোসলে যাওয়ার আগে তো রুমে ঘুম পাড়িয়ে গেলাম। গোসল থেকে বের হয়ে দেখি রুমে নেই। ঘুমের ভং ধরে আমাকে ফাঁকি দিয়েছে এই মেয়ে। “

দূর্জয় বলে,

“ আমি এদিকটা চেক করছি। তুমি একটু নিচে গিয়ে দেখো, মামণি কিংবা মৌটুসীর কাছে গেলো নাকি। “

বাণী মাথা নেড়ে নিচে চলে যায়। দূর্জয় এক এক করে সম্পূর্ণ দোতলাটা খুঁজে। বহ্নিকে না পেয়ে সে পা বাড়ায় ছাদের দিকে। ছাদের সঙ্গে লাগোয়া পরিপাটি চিলেকোঠা ঘরটার ভেতরও খুঁজে সে, যেটা কি-না একটা সময় দীপ্তর বেডরুম ছিলো। কিন্তু সেখানেও বহ্নিকে না পেয়ে সে নিচে নেমে আসে। সিঁড়ি দিয়ে নামতেই লিভিং রুমের সামনে বাণীর আতংকিত মুখ দেখেই তার বুক মুচড়ে উঠে। বাণী দূর্জয়কে দেখতেই ভীত অশ্রু মিশ্রিত স্বরে বলে,

“ আমার মেয়েকে পাওয়া যাচ্ছে না দূর্জয়। আমার মেয়ে কোথায়? “

দূর্জয় বিস্মিত চোখে সুহালা বেগমের দিকে তাকাতেই সুহালা বেগম বলে উঠে,

“ আমি তো এতক্ষণ ধরে বাড়ির সামনেই ছিলাম। উঠোনের গাছে পানি দিচ্ছিলাম। বহ্নিকে তো বাসা থেকে বের হতে দেখি নি। আই এম শিওর বাসার ভেতরেই কোথাও আছে। “

মৌটুসী বলে উঠে,

“ আমি তো নিচ তলা পুরাডা খুঁজলাম। কোনোহানে নাই। পনেরো বিশ মিনিট আগেই তো আমার কাছে আইছিলো। কিছুক্ষণের মধ্যে কই হারায় গেলো? “

‘বহ্নিকে পাওয়া যাচ্ছে না’ ছোট বাক্যটিতেই দূর্জয়ের শরীর ঝিমঝিম করছে। তবুও সে নিজেকে শক্ত রেখে মৌটুসীর কাছে জানতে চায়,

“ তোমার কাছে এসে কি বলেছিলো? “

“ বেশি কিছু না ভাইজান। একটা কাগজ দিয়া বলসিল ওরে নৌকা বানায় দিতাম। আমি নৌকা বানায় দিতেই ওয় ওইডা নিয়া গেসে গা। “

দূর্জয় কেবল পাঁচ সেকেন্ড সময় নিলো পুরো ঘটনাটা মেলাতে। আর বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে সে ছুটে গেলো রান্নাঘরের দিকে। বাণী, সুহালা বেগম আর মৌটুসী প্রথমে হতবাক হলেও পরমুহূর্তে তারাও দূর্জয়ের পিছু পিছু দৌড়ে যায়। দূর্জয় ততক্ষণে রান্নাঘরের বারান্দা পেরিয়ে পিছনের উঠোনে পৌঁছে গিয়েছে। চোখের পলকে কি হলো বুঝা গেলো না। তবে বারান্দা পেরিয়ে উঠোনে পা রাখতেই বাণী কেবল দেখলো দূর্জয় পায়ের জুতো ছেড়ে এক লাফে পুকুর পাড়ের সিঁড়ি ভেঙে সবুজ রঙা শ্যাওলা পড়া পুকুরটায় ঝাপ দিলো। ভয়ংকর ঘটনাটা আঁচ করতেই স্তব্ধ বাণী চিৎকার করে উঠে,

“ আমার মেয়ে! আল্লাহ! বহ্নি! আমার মেয়ে! ইয়া আল্লাহ! “

চিৎকার করে বাণী হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। ছুটে সামনে পুকুরে গিয়ে ঝাপিয়ে পড়তে চায়। বিস্মিত সুহালা বেগম ও মৌটুসী তাকে জাপ্টে ধরে আটকায়। বাণী ছোটার জন্য ছটফট করছে। ধস্তাধস্তিতে তার শাড়ির আঁচল কাধ থেকে কিছুটা নিচে সরে আসে। সেদিকে তার বিন্দুমাত্র ধ্যান নেই। তার উদ্ভ্রান্ত মস্তিষ্কের সম্পূর্ণ ধ্যান সেই শ্যাওলা পড়া পুকুরটার দিকে। যেই পুকুরটা তার সম্পূর্ণ পৃথিবীটা গ্রাস করে নিতে ব্যকুল।

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন