এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৭০.
বাণীর উন্মাদের ন্যায় কান্না বাতাসটা ভারী করে তুলেছে। অবাধ্য মনটা বারবার নিজেকে দোষারোপ করছে। দোষটা বাণীরই। মেয়েকে এক মুহুর্তের জন্য চোখের আড়াল করা তার উচিত হয়। যতবার, যতবারই মেয়েটাকে একা রেখে সে কিছু একটা করতে যায় ততবারই তার মেয়ের উপর নতুন একটা বিপদ এসে হাজির হয়। কখনো বিছানা থেকে পড়ে যাওয়া, কখনো হাত কেটে ফেলা, কখনো…
সময় গড়াতেই পুকুরের ঠিক মাঝখানটা হতে ধীরে ধীরে পাড়ে এগিয়ে আসতে দেখা যায় দূর্জয়কে। শীতের কাল হওয়ায় বেশ অনেকদিন ধরে পুকুরের পানি পরিষ্কার করানো হয় নি। নোংরা পানিতে ডুব দেওয়ার ফলে পুরো শরীরটা ভিজে জবজবে অবস্থা। তার দু'হাতের উপর বরফ ঠান্ডা পানিতে সিক্ত নিথর ছোট্ট দেহটা দেখা যাচ্ছে। হাস্যজ্বল মুখটা কেমন ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। বাণীর যেনো নিঃশ্বাস আটকে এলো। ফুলের মতো মেয়ের এই রূপ দেখে সে স্থির থাকতে পারলো না। চেতনা হারিয়ে সুহালার গায়ে হেলে পড়লো।
সবটা দুমড়ে মুচড়ে আসা দূর্জয় বহ্নিকে সহ পাড়ে এসে সিড়ি বেয়ে উঠার সময় এই দৃশ্যটা দেখতেই তার সচল মস্তিষ্কটা কেমন চুপসে যায়। ভেতরটা মনে হচ্ছে এই মুহুর্তে ভেঙে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাবে। সে কেবল দূর হতেই চেঁচিয়ে বলে,
“ মামণি, বাণীকে সামলাও প্লিজ। “
সুহালা বেগম যেনো নদীর দু কূলের মাঝে আটকা পড়লো। ছোট্ট বাচ্চাটাকে দেখতেই অশ্রু এসে জমেছে তার দুই চোখের কার্নিশে। মন চাচ্ছে ছুটে বাচ্চাটার কাছে যেতে। কিন্তু পুত্রবধূকে আগলে ধরে মাটিতে বসে পড়ে তিনি আর সামনে আগান না।
নিথর দেহটাকে মাটিতে সোজা করে শুইয়ে দূর্জয় সবার আগে দুই আঙুল নাকের কাছে নিয়ে শ্বাস প্রশ্বাস চলাচল করছে কি-না তা পরীক্ষা করে। ক্ষীণ নিঃশ্বাসের গতি টের পেতেই দূর্জয় সবার আগে আঙুল দিয়ে মুখের ভেতর থাকা কাদা মাটি বা অপদ্রব্য যতটা সম্ভব বের করে আনার চেষ্টা করে। পরপর দু'হাতের সাহায্যে বুকের বা পাশে চাপ দিতে থাকে যেনো ফুসফুসটা সক্রিয় চলে। চাপ দেওয়ার মাঝেই দূর্জয় বারবার নাড়ির গতিবিধি মেপে দেখতে থাকে। হাত মস্তিষ্ক আপন গতিতে মেয়েকে বাঁচানোর সবটুকু চেষ্টা করলেও দূর্জয়ের ভেতরটা ধ্বসে পড়ছে বারবার। আল্লাহ এই পরীক্ষা কেনো নিচ্ছে তার প্রশ্নটা লাগাতার মাথায় উঁকি দিচ্ছে তার।
প্রাথমিক চিকিৎসার ধাপটুকু দ্রুত গতিতে সম্পন্ন করেই দূর্জয় গলা হাকিয়ে মৌটুসীকে ডাকে। ভীত মৌটুসী ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে আসতেই দূর্জয় বহ্নিকে তুলে মৌটুসীর কোলে দিয়ে বলে,
“ ওকে নিয়ে তাড়াতাড়ি আমার গাড়ির কাছে যাও। আমি আসছি। সাবধানে ধরো ওকে। “
ব্যস্ত গলার আদেশটুকু মাথায় নিয়ে মৌটুসী বহ্নিকে কোলে নিয়ে দ্রুত ঘরের ভেতর দিকে চলে যায়। ভেতর থেকে ভেঙে চূড়ে আসা দূর্জয় নিজেকে যথেষ্ট শান্ত রেখে দ্রুত এগিয়ে যায় স্ত্রীর দিকে। সুহালা বেগমের আলিঙ্গন থেকে বাণীকে নিজের আওতায় বুঝে নিয়ে পাজাকোলে তুলে সে-ও বাড়ির ভেতর দিকে ছুটে।
লিভিং রুমের বিশাল সোফাটায় এনে বাণীর নেতানো দেহটা রেখে সুহালা বেগমকে বলে উঠে,
“ আমি বহ্নিকে নিয়ে হসপিটাল যাচ্ছি। মৌটুসী সাথে যাবে। যাওয়ার সময় নোমান ভাইকে বলে দিচ্ছি ফার্মেসি থেকে ডাক্তার ডেকে দিবে। ততক্ষণে ওর জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করো। “
সুহালা বেগম ব্যস্ত গলায় বলে,
“ আমি আছি। চিন্তা নেই। তুমি যাও। “
বেরিয়ে যেতে নিয়েও দূর্জয় আরেকবার ধরা গলায় বলে,
“ ওকে একটু দেখে রেখো মামণি। “
__________
গাড়ির স্পিডটা সর্বোচ্চ গতিতে তুলে সুকৌশলে গাড়ি চালাচ্ছে দূর্জয়। রাস্তার পাশাপাশি বারবার পিছনের পেসেঞ্জার সিটে মৌটুসীর কোলে শুয়ে থাকা বহ্নিকেও লক্ষ্য করছে সে। মৌটুসী বারবার বহ্নির দু হাত মুঠোয় নিয়ে মালিশ করে যথাসম্ভব নিম্ন তাপমাত্রাটা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত হসপিটালের পথে গাড়ি ড্রাইভ করতে মনযোগী দূর্জয় আচমকা লক্ষ্য করে স্টিয়ারিঙে থাকা তার হাতদুটো ক্রমাগত মৃদু কাপছে। দূর্জয় ব্যাপারটা লক্ষ্য করেও সেদিকে আর পাত্তা দেয় না। তার দূর্বল হয়ে পড়ার অনুমতি নেই।
সবথেকে কাছের হসপিটালে পৌঁছাতেই বহ্নিকে নিয়ে সোজা হসপিটালের ভেতর ছুটে দূর্জয়। ইমারজেন্সি ইউনিটে পৌঁছে কোনোমতে একটা খালি বেডে ছোট্ট দেহটাকে রেখে অন ডিউটিতে থাকা ডাক্তারকে বলে সম্পূর্ণ ঘটনা। মহিলা ডাক্তারটা ঘটনার সার সংক্ষেপ শুনেই দ্রুত দু'জন নার্সকে নিয়ে রোগীর জীবন বাঁচানোর চেষ্টায় লেগে পড়ে। দূর্জয় কেমন ফ্যালফ্যাল করে সম্পূর্ণ দৃশ্যটার সাক্ষী হচ্ছিলো। মহিলা ডাক্তারটা হাতে একটা কাচি নিতেই সে ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজেকে থামায়। ডাক্তারটা কাচি কেনো নিলো তা তার মস্তিষ্ক এই মুহুর্তে ঠাহর করতে পারছে না। ওই নিষ্পাপ বাচ্চাটার শরীরে কাঁটা ছেড়া করবে নাকি? পানিতে ডুবলে কি কাঁটা ছেড়ার প্রয়োজন পড়ে?
প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে ব্যস্ত দূর্জয় নিজের উত্তর খুঁজে পায় যখন দেখে ডাক্তার কাচির সাহায্যে এক এক করে বাণীর গায়ের সুয়েটার আর ফ্রকটা কাঁটছে। দূর্জয় মাথা নিচু করে অন্যদিকে ফিরে তাকায়। ঠিক সেই মুহুর্তে একজন নার্স একটা বোর্ডে কিছু কাগজ এবং একটা কলম হাতে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করে,
“ আপনি রোগীর কি হোন? “
দূর্জয় একটা ঢোক গিলে কেবল উচ্চারণ করে,
“ বাবা। “
“ রোগীর নাম আর বয়স? “
“ বহ্নি। বয়স পাঁচ। “
“ কোনো মেডিক্যাল হিস্ট্রি আছে রোগীর? বা কোনো মেডিসিনে এলার্জি জনিত সমস্যা? “
দূর্জয় নিষ্পলক কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে জবাব দেয়,
“ আমি জানি না। “
নার্সটা এবার ভ্রু কুচকে বলে উঠে,
“ মানে? “
“ আমার ওর মেডিক্যাল হিস্ট্রি জানা নেই। “
নার্সকে এবার ক্ষানিকটা বিরক্ত দেখায়। তিনি প্রশ্ন করেন,
“ বাচ্চার মা কোথায়? “
“ ও বাসায়। মেয়েকে এই অবস্থায় দেখে সেন্সলেস হয়ে গিয়েছে। “
নার্স এবার অধৈর্য্য হয়ে ডক্টরের কাছে চলে যায়। পিছন থেকে দূর্জয়ের কানে ভেসে আসে নার্সের বিরক্তিমাখা গলায় বলা কথাগুলো,
“ ম্যাম। ওই সাথে আসা লোকটা নাকি বাচ্চার বাবা। কিন্তু বাচ্চার মেডিক্যাল হিস্ট্রি বা এলার্জি আছে কি-না এসব কিছুই জানে না। “
“ বাচ্চার মা'কে জিজ্ঞেস করতে বলো তাহলে। “
“ ম্যাম বলেছি। মা নাকি বেহুশ হয়ে ঘরে পড়ে আছে। এখন কি করবেন ম্যাম? কোনো মেডিসিনে বাচ্চার রিয়েকশন হলে? বাচ্চার কিছু একটা হলে তো দোষ আমাদের ঘাড়ে চাপবে। অথচ এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন বাপ মা'র কোনো দোষ হবে না। “
ডাক্তারকে এবার বিরক্তি মিশ্রিত গলায় বলতে শোনা গেলো,
“ বুঝো না কেমন দায়িত্ব জ্ঞান ওয়ালা বাপ মা? সচেতন হলে কি বাচ্চা পুকুরে ডুবে নাকি? আল্লাহ যে এসব অযোগ্যদের কেনো বাচ্চা দেয়! কত মানুষ বাচ্চা চেয়েও পায় না… “
বাকি কথাটা আর শুনতে পারে না দূর্জয়। সে নিশ্চল পায়ে ইমারজেন্সি ইউনিট থেকে বেরিয়ে এসে একপাশে দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়ায় কোনো মতে। গায়ের ভেজা শার্ট, প্যান্ট গুলো ইতিমধ্যে শুকাতে শুরু করে দিয়েছে। তবে পুকুরের পানিটা নোংরা থাকায় তার গায়ের পোশাকও এখন নোংরা দেখাচ্ছে।
দূর্জয়ের মাথাটা এখনো নত। বুকের ভেতর অদ্ভুৎ অসহনীয় ব্যথা অনুভব করছে সে। মনের সুপ্ত জায়গাটা দোয়া করে চলেছে যেনো নিষ্পাপ বাচ্চাটার কিছু না হয়। মস্তিষ্ক বলে চলেছে বহ্নির কিছু হলে বাণীর সামনে কখনো সে মুখ তুলে তাকাতে পারবে না। হাজারটা চিন্তা মাথায় নিয়ে পকেটে হাত দিতেই সে দেখে পকেটে ফোনটা নেই। ফোন কোথায় তার? খুব সম্ভবত পুকুরে পড়ে গিয়েছে। দূর্জয় দূর্বল পায়ে হেঁটে এককোণে গিয়ে একটা লোককে দেখে বলে উঠে,
“ এক্সকিউজ মি ভাইয়। একটা কল করা যাবে? আমার ফোনটা পাচ্ছি না। হয়তো পানিতে পড়ে গিয়েছে। কলটা ইম্পোরট্যান্ট। “
ভদ্রলোক সূক্ষ্ণ চোখে দূর্জয়কে পরখ করে ফোনটা এগিয়ে দিতেই দূর্জয় সুহালা বেগমের নাম্বারে কল করে। কিছুক্ষণের মধ্যে কলটা রিসিভ হতেই দূর্জয় শান্ত গলায় বলে,
“ আমি দূর্জয়। “
সুহালা বেগম চিন্তিত গলায় বলে,
“ আমি তোমার নাম্বারে কল করছিলাম। ফোন বন্ধ বলছে। বহ্নি কোথায়? কি অবস্থা ওর? “
“ ইমারজেন্সি ইউনিটে আছে। ডাক্তাররা দেখছে। বাণীর কি অবস্থা? “
“ জ্ঞান ফিরেছে তুমি বের হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই। ডাক্তার এসেছিলো। কিন্তু ও দেখাতে রাজি না। হসপিটাল যেতে চাইছে। সামলানো মুশকিল। “
দূর্জয় একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হসপিটালের নামটা সুহালা বেগমকে জানিয়ে বলে,
“ ওকে নিয়ে আসো। দূরে থেকে আরো বেশি তড়পাচ্ছে। বহ্নির কাছে থাকার অধিকার আছে ওর। “
__________
পঁচিশ মিনিটের মাথায় এলোমেলো অবস্থায় দৌড়াতে দৌড়াতে হসপিটালে এসে পৌঁছায় বাণী। সঙ্গে সুহালা বেগমও রয়েছেন। তবে তিনি বাণীর পায়ের গতির সঙ্গে সামঞ্জস্যতা বজায় চলতে হিমশিম খাচ্ছেন। ইমারজেন্সি ইউনিটের সামনে এসে দরজার একপাশে দূর্জয়কে দেখতেই বাণী দৌড়ে যায়। দূর্জয়ের বুকের কাছে ভাজ করা হাত দুটো ধরে ব্যস্ত, ক্লান্ত স্বরে প্রশ্ন করে,
“ আমার মেয়ে কোথায়? কেমন আছে? ঠিক হয়ে গিয়েছে না? “
দূর্জয়ের ভেতরের শেষ শক্তিটুকুও এই পর্যায়ে নিঃশেষ হয়ে গেলো। সে কোনো জবাব দিতে পারে না। কেবল নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে টলমল চোখে তাকিয়ে থাকা বাণীকে দেখে। বাণী আবারও হাত ঝাকিয়ে ব্যকুল গলায় জানতে চায়,
“ এই। বলো না প্লিজ। আমার মেয়ে কেমন আছে? “
দূর্জয়ের থেকে কাঙ্ক্ষিত কোনো জবাব না পেয়ে বাণী এবার ইমারজেন্সি ইউনিটের দরজার দিকে ছুটতে নেয়। দূর্জয় দ্রুত সামনে এসে বাণীকে বাধা দিয়ে আগলে ধরে। বাণী শান্ত হয় না। বরং উল্টো কান্নায় ভেঙে পড়ে। তার কান্নার শব্দে ভেতর থেকে সেই নার্সটা বেরিয়ে আসে। রাগ মিশিয়ে বলে,
“ ইমারজেন্সি ইউনিটের বাহিরে এসব চেঁচামেচির মানে কি? ম্যানারস নাই আপনাদের কোনো? বাচ্চাকাচ্চার খেয়াল রাখতে পারেন না, তাহলে বাচ্চা নেন কেনো? নাটক করতে উঠে আসে যত্তসব। “
দূর্জয় বাণীকে টেনে সেখান থেকে দূরে নিয়ে গেলেও সুহালা বেগম চুপ থাকতে পারে না। হসপিটাল স্টাফদের এতো বিশ্রী আচরণ কেন হবে? তিনি প্রতিবাদের গলায় বলে,
“ আপনি উঁচু স্বরে কথা বলছেন কেনো? আপনার ম্যানারস কোথায়? আর কার ব্যাপারে আজেবাজে কমেন্টস করছেন ধারণা আছে? “
__________
হসপিটালের সবথেকে নীরব একটা জায়গায় নিয়ে বাণীকে জোর করে একটা বেঞ্চিতে বসিয়ে তার সামনে হাঁটু ভাজ করে বসে দূর্জয়। বুকের ভেতরের উথাল-পাতাল কান্নাটুকু গিলে নিয়ে স্ত্রীর দু-হাত জোড়া ধরে মানা নত করে বলে,
“ আ'ম সরি। মাফ করো আমাকে। আমি দায়িত্ব নিয়েছি, কিন্তু ঠিকঠাক পালন করতে পারি নি। সরি বাণী। মাফ করে দাও। “
বাণী বোবা দৃষ্টি মেলে দেখতে থাকে শ্যাম বর্ণের পুরুষকে। মেজর শাহরিয়ার দূর্জয় কারো সামনে মাথা নত করে মাফ চাইছে। দৃশ্যটা খুব কম মানুষের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য ঠেকবে। বাণীর মেয়ের চিন্তায় দমবন্ধ হয়ে আসে। কোনো মতে বলে,
“ তুমি অন্তত ওকে সময়মতো উদ্ধার করেছো। আমি ওর খেয়াল রাখতে পারি নি। অযোগ্য মা একটা আমি। “
দূর্জয় জবাব দিতে পারে না। নিষ্পাপ বাচ্চাটার মুখ বারবার চোখের সামনে ভাসছে ওর। আচমকা সে নিজের দূর্বোধ্য দেয়াল ভেঙে, ‘ছেলেদের কাঁদার নিয়ম নেই’ উক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাণীর হাঁটুতে মাথা রেখে নিঃশব্দে কান্নায় ভেঙে পড়ে। এটা তো তার স্বপ্ন ছিলো না। তার স্বপ্নের অংশ হিসেবে তো বাণী আর বহ্নি দুটো মানুষই ছিলো। যেকোনো একজনকে ছাড়া তো তার সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্নটা অপূর্ণই রয়ে যাবে।
বাণী সবটা দেখে। অত:পর মৃদু গলায় বলে,
“ আমার অস্তিত্ব এখনো শুধু আমার মেয়ের জন্যই আছে। ওর কিছু হলে আমি মরে যাবো। বহ্নি একমাত্র আমার বেঁচে থাকার কারণ। “
__________
বিকেল গড়িয়ে গভীর রাত তখন। হসপিটালের ভীড় অনেকটাই কমে এসেছে। বহ্নিকে আপাতত সিসিইউ ইউনিটে শিফট করা হয়েছে। সিসিইউ ইউনিটের বাহিরে জ্যান্ত লাশের ন্যায় একটা বেঞ্চিতে বসে আছে বাণী। তার পাশেই দেয়ালে হেলান দিয়ে নির্বাক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে দূর্জয়। সুহালা বেগম এই মুহুর্তে হসপিটালে নেই। রাত গভীর হচ্ছিলো দেখে মৌটুসীকে সহ উনাকে জোর করে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন দূর্জয়। এতো মানুষ এক সঙ্গে হসপিটালে ভীড় করলে কোনো লাভ নেই। উল্টো রোগীদের অসুবিধা হয়।
ঘন্টা দুই এক আগে ডাক্তার বেরিয়ে বলে গিয়েছেন এই মুহুর্তে পরিস্থিতি আশংকা মুক্ত। সম্ভবত বেশিক্ষণ পানির ভেতর ছিলো না বলে এবং সঠিক পদ্ধতিতে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিলো বলেই এতো বড় একটা বিপদ এড়ানো গিয়েছে। তবে ঠান্ডা পানির ভেতর থাকার কারণে এবং হসপিটালে পৌঁছানোর সময়টা ভেজা কাপড়ে থাকার ফলে ঠান্ডা জনিত সমস্যার আশংকা করছে ডাক্তার। তা-ও চিকিৎসার মাধ্যমে ঠিক করা সম্ভব। বাণী তখন বহ্নির সঙ্গে দেখা করতে চাইলে ডাক্তার কেবল বলে জ্ঞান নেই। জ্ঞান ফিরলে পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেখা করার সুযোগ পাবে।
মেয়ের জীবন হুমকিতে নেই শুনেও বাণী ধাতস্থ হয় নি। যতক্ষণ না নিজ চোখে মেয়েকে দেখবে ততক্ষণ তার মন শান্ত হবে না। বেশ অনেকটা সময় পরে সিসিইউ ইউনিট থেকে একজন নার্স বেরিয়ে বলে উঠে,
“ বহ্নির গার্ডিয়ান কে? “
বাণী দ্রুত উঠে এগিয়ে যেতে নিলেই তার শরীর টলে উঠে। দূর্জয় এগিয়ে গিয়ে আগলে ধরে তাকে। অতিরিক্ত চিন্তা এবং রাতে না খেয়ে থাকার ফলে প্রেশার ফল করেছে সম্ভবত। তবে বাণী সেসবের তোয়াক্কা না করে বলে,
“ আমরা ওর প্যারেন্টস। “
নার্স বলে,
“ বাচ্চার জ্ঞান ফিরেছে। ডাক্তার চেক করেছেন। সব ঠিকঠাক আছে। মা'কে খুঁজছে। ভেতরে আসুন আপনি। “
বাণী অপেক্ষা না করে দ্রুত নার্সের সঙ্গে ভেতরে চলে যায়। বাহিরে দূর্জয় কেবল একা রয়ে যায়। এই পর্যায়ে সে ধপ করে বেঞ্চিটায় বসে পড়ে। তার কানে বাজছে বাণীর বলা “আমরা ওর প্যারেন্টস” কথাটা। বহ্নির জ্ঞান ফিরেছে শুনে যেনো বুকের উপর থেকে খুব ভারী কিছু একটা সড়ে গেলো। মনে মনে তিন দফা উচ্চারণ করলো,
“ আলহামদুলিল্লাহ,
আলহামদুলিল্লাহ,
আলহামদুলিল্লাহ। “
প্রায় আধা ঘণ্টা পর একই নার্স আবার বেরিয়ে এসে দূর্জয়কে দেখে বলে,
“ আপনার ওয়াইফ আপনাকে ডেকে দিতে বলেছে। রোগী নাকি আপনাকে খুঁজছে। ভেতরে চলুন। “
দূর্জয় দ্বিধা অনুভব করে পা বাড়াতে। কেন যেনো মনে হচ্ছে বাচ্চাটার চোখে চোখ রাখতে পারবে না সে। দূর্জয়ের দ্বিধাদ্বন্দের মাঝেই নার্সটা তাকে একবার পরখ করে বলে,
“ আপনার জামা কাপড়ের এই বিশ্রী অবস্থা কেনো? এভাবে তো ভিতরে যাওয়া যাবে না। অন্য পেশেন্টদের ইনফেকশনের ভয় আছে। আপনি আমার সাথে চলুন। এপ্রোণ আর মাথায় সার্জিক্যাল ক্যাপ পড়তে হবে আপনার। “
__________
সিসিইউ ইউনিটের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করেছে দূর্জয়। গায়ে তার সবুজ রঙের সার্জিকাল এপ্রোণ। পায়ের জুতো জোড়া প্লাস্টিক ব্যাগের আড়ালে ঢাকা। মাথার চুলগুলোও সবুজ সার্জিক্যাল ক্যাপ দ্বারা আবৃত। হাতের বামদিকের প্রথম বেডটার কাছে এগিয়ে গিয়ে সে ধীর ভঙ্গিতে পর্দা সরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। সঙ্গে সঙ্গে তার দৃষ্টি স্থির হয় নিষ্পাপ এবং শুষ্ক মুখের বাচ্চাটার দিকে। বহ্নি দূর্বল চোখ মেলে দূর্জয়কেই দেখছিলো। নিজের আবেগ লুকাতে ব্যস্ত দূর্জয় ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে বাণীর পিছনে দাঁড়ায়। বাণী বিছানার পাশে একটা টুলে বসে ছিলো। দূর্জয়কে দেখতেই সে ফোলা চোখগুলো মুছে হাসার চেষ্টা করে।
বহ্নি নীরবে কিছুক্ষণ ডাক্তারদের মতো পোশাক পড়া দূর্জয়কে দেখে দূর্বল গলায় বলে,
“ তুমি ডাক্তার সেজেছো কেনো, বাবা? “
আচমকা সম্বোধনে দূর্জয় চমকায়। চমকায় বাণীও। অস্ফুটে প্রশ্ন করে,
“ কি বললে? “
বহ্নি ফের ছোট করে শুকনো মুখে বলে,
“ বাবা। “
ছোট্ট সম্বোধনটা দূর্জয়কে উথাল অনুভূতির জোয়ারে ভাসিয়ে নেয়। কান্না না করলেও চোখ জোড়া ছলছল করে উঠে তার। রুদ্ধস্বরে প্রশ্ন করে,
“ মন থেকে বলছেন? “
বহ্নি এতক্ষণ মাম্মার কাছে শুনেছে মেজর কিভাবে তাকে সুপারম্যানের মতো বাঁচিয়ে হসপিটালে নিয়ে আসে। তার বলতে ইচ্ছে করে যে একমাত্র পাপা, বাবা কিংবা আব্বুরাই তো সুপারম্যানের মতো বেবিদের প্রোটেক্ট করে। বহ্নির তো অলরেডি পাপা আছে। মেজর তো তা-ই পাপা হতে পারবে না। কিন্তু বাবা তো হতে পারবে। মনে এতো লম্বা উত্তর আসলেও তা বলার শক্তি খুঁজে পায় না বহ্নি। তাই কেবল মাথা নেড়ে বুঝায় সে মন থেকেই বলছে। দূর্জয় আচমকা বাচ্চাদের মতো হেসে উঠে। এগিয়ে গিয়ে বহ্নিকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করলেও সে আগায় না। যদি ব্যথা পায় এই ভয়ে। তবে তার সামনে বসে থাকা বাণীকে সে পেছন থেকে গলা পেচিয়ে জড়িয়ে ধরে। মেয়ের ভাগের চুমুটা মায়ের মাথায় খেয়ে ফের বাচ্চাদের মতো হাসতে থাকে। বাণী অশ্রু জমা চোখে দূর্জয়ের সেই হাসি থেকে। খুব সুপ্ত ভঙ্গিতে তার মনের গহীনে বেজে উঠা আনন্দের শব্দে মৃদু কেঁপে উঠে সে।
চলবে…