ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান

৭১তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

এক ম্লান রক্তসন্ধ্যার গান

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৭১.

প্রায় ৪০ ঘন্টার অধিক সময় হসপিটালে অতিবাহিত করার পরে বিভিন্ন টেস্টের রিপোর্ট দেখে বহ্নিকে হসপিটাল থেকে রিলিজ করা হয়।

সঙ্গে ঠান্ডার সমস্যার জন্য বেশ কিছু মেডিসিনও গছিয়ে দেওয়া হয়। বহ্নির কাছে মেডিসিন গুলো এক প্রকার আতংকের ন্যায়ই। একে তো সিরাপ জাতীয় ওষুধ গুলো বিদঘুটে তেতো স্বাদের। তার উপর যেই দুটো ট্যাবলেট ধরনের মেডিসিন আছে সেগুলো খেতে বহ্নির খুব অসুবিধা হয়। ওষুধ গিলে খাওয়ার জন্য মুখে পানি নিলেও দেখা যায় পানি তার পেটে চলে যায় তবে ওষুধ মুখে রয়ে যায়। যদিও সেই সমস্যার সমাধান হিসেবে দূর্জয় মেডিসিন ভেঙে অর্ধেক করে দু বারে বহ্নিকে খেতে দেয়। এই সুবাদে কিছুটা সহজে গিলতে পারে বহ্নি।

জ্ঞান ফেরার পর থেকেই বহ্নি যখন হুটহাট ছোট করে দূর্জয়কে বাবা বলে ডাকে প্রতিবারই দূর্জয়ের মুখে নির্মল হাসি ফুটে উঠে। বাণী সেই দৃশ্যটা দেখে। বুকে অদ্ভুৎ প্রশান্তি অনুভব করে। সম্পর্কটা বেশি দিনের না হলেও বহ্নির প্রতি দূর্জয়ের স্নেহটা তার চোখ এড়ায় নি কখনো। সেই থেকে বাণীর মাঝেমধ্যে নিজেকে অপরাধী মনে হতো। একটা মানুষ নিঃস্বার্থ ভাবে এতোটা এফোর্ট দিচ্ছে। অথচ বিনিময়ে বাণী সমান ভালোবাসাটা ফিরিয়ে দিতে পারছে না। কিন্তু বহ্নির এই ছোট সম্বোধনে যেনো দূর্জয়ের প্রাপ্তির খাতা অনেকটাই পূরণ হয়েছে।

__________

হসপিটাল থেকে রিলিজ পেতেই বহ্নিকে নিয়ে শান্তিকুঞ্জে ফিরে আসে দূর্জয় এবং বাণী। দুটো দিন হসপিটালের হাওয়া গায়ে মেখে দুজনের চেহারারই বিধ্বস্ত অবস্থা। তবে মেয়ের সুস্থতা সেই বিধ্বস্ত চেহারায়ও প্রশান্তি ভাব লেপ্টে দিয়েছে যেনো।

শান্তিকুঞ্জে পা রাখতেই দূর্জয় ও বাণী অবাক হয় আঙিনায় বাধা কালো ছাগলটাকে দেখে। সুহালা বেগম তাদের বিস্ময়তা দূর করতে জানায় ছাগলটা তিনি আনিয়েছেন। এতো বড়ো একটা বিপদ থেকে রক্ষা পেলো বাচ্চাটা। সুহালা বেগম নিয়ত করেছিলেন বহ্নির সুস্থতা সরূপ তিনি একটা ছাগল সদকা দিবেন। দূর্জয় এবং বাণী সুহালা বেগমকে বাধা দেন না এই ব্যাপারে। বরং সন্তোষ প্রকাশ করে বহ্নিকে নিয়ে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে।

কিছুটা সুস্থ হলেও বহ্নি এখনো ছোটাছুটি কিংবা খেলাধুলা করার অনুমতি পায় নি। শরীরটা এখনো বেশ দূর্বল। তাপমাত্রাটাও এখানো পুরোপুরি নামে নি। এরকম অবস্থায় দূর্জয় কিংবা বাণী তাকে এক মুহুর্তের জন্যও কোল থেকে নামাচ্ছে না। এই যেমন বাসায় প্রবেশের পরও দূর্জয় তাকে কোলে নিয়ে লিভিং রুমে বসে আছে। অবশ্য বহ্নি আপাতত এর বিরোধিতাও করছে না। বিগত ঘটনা তার মনে গভীর ভাবে দাগ কেটেছে। মনে মনে সে অটল যে আর কখনো ভুলেও সে ওই পুকুরটায় নৌকা ভাসাতে যাবে না। এমনকি ওই পুকুরের ধারেও ঘেঁষবে না সে।

দূর্জয় যখন মেয়ের সঙ্গে টুকটাক আদুরে স্বরে গল্পে মশগুল ঠিক সেই মুহুর্তে সুহালা বেগম রান্নাঘর থেকে একটা বাটিতে করে পেস্ট্রি হাতে এসে বহ্নির সামনে বসেন। বাচ্চাটা হসপিটালে থাকা অবস্থায় সুহালা বেগমকে বলেছিলো তার পেস্ট্রি খেতে ইচ্ছে করছে। নাতনির ইচ্ছাপূরণের ব্যাপারে সচেতন সুহালা বেগম। তাই চার পাঁচটা রেসিপির ভিডিও দেখে নিজ হাতে বাসায় পেস্ট্রি বেক করেছেন। দূর্জয় অবশ্য সেই ব্যাপারে জানে না। তাই আঁতকে উঠে,

“ না মামণি। ওকে এই দোকানের খাবার দিও না। এসব খাবার মোটেও হাইজেনিক না। “

বহ্নি মুহুর্তেই মুখটা কালো করে ফেলে। সুহালা বেগম প্রতুত্তর করে বলেন,

“ আমার হাইজেনিক বাচ্চা, নিজের মা'কে হাইজেন নিয়ে লেকচার দিচ্ছো তুমি? এইটা আমি নিজ হাতে বানিয়েছি আমার নাতনির জন্য। তাই তোমার চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণই নেই। “

দূর্জয় নিশ্চিন্ত মনে বলে,

“ তাহলে সমস্যা নেই। “

বহ্নির চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে। সে দ্রুত দীদার হাতে পেস্ট্রি খেতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বাণী উপরে গিয়েছিলো জামা বদলাতে। জামা বদলে নিচে নামতেই সে দেখে বহ্নিকে কোলে বসিয়ে দূর্জয় এবং সুহালা বেগম তার সঙ্গে আড্ডায় মশগুল। মনের কোণে একরাশ ভালো লাগা নিয়ে বাণী এগিয়ে এসে বলে,

“ মা, আজকে দুপুরের রান্নাটা আমি করি? “

সুহালা বেগম মানা করেন না। তবে বলেন তিনি আর মৌটুসীও তাহলে সাহায্য করবেন। বাণী আপত্তি করেন না।

__________

সম্পূর্ণ দুপুরটা বাণী, সুহালা বেগম এবং মৌটুসী রান্নাঘরে কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন গল্প করে কাটিয়ে দেয়। যদিও গল্প মূলত সুহালা বেগম আর মৌটুসীই করছিলো। বাণী কেবল আগ্রহ নিয়ে শুনছিলো তাদের কথা। আজকাল এই মানুষ গুলোর মাঝে সেই চাপা অস্বস্তিটা কাজ করে না তার। কেমন আপন আপন মনে হয় এদেরকে!

রান্না মিটিয়ে দূর্জয় এবং বহ্নিকে ডাকতে নিজের রুমে আসতেই বাণী একটা সুন্দর দৃশ্য দেখতে পায়। বিছানার মধ্যিখানে গায়ে কম্বল টেনে রাখা বহ্নি নিশ্চিন্তে একটা বালিশ জড়িয়ে ধরে ঘুমোচ্ছে। তার ঠিক পাশেই দূর্জয় ঘুমিয়ে আছে কাথ হয়ে। তবে তার গায়ে কোনো কম্বল নেই।

বাণী ভাবলো যেহেতু এখন ঘুমোচ্ছে তাহলে আরেকটু ঘুমাক ওরা। পরে ঘুম থেকে উঠলে নাহয় লাঞ্চ করে নিবে। এই ভেবে বাণী এগিয়ে যায় কম্বলটা টেনে দূর্জয়ের গায়েও দিয়ে দিতে। জম্পেশ ঠান্ডা পড়েছে। লেপ, কম্বল ছাড়া শরীর বরফ হয়ে যাওয়ার কথা।

দূর্জয়ের ঘুম অত্যন্ত পাতলা। বাণী কম্বলটা টেনে তার গায়ে দিতে নিলেই সে চোখ মেলে ঘাড় ঘুরিয়ে বাণীর দিকে তাকায়। আকস্মিক ঘটনায় বাণী হতভম্ব হয়ে পড়ে। সে কিছুটা দূর্জয়ের উপর ঝুকে ছিলো। দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ব্যস্ত গলায় বলে,

“ রান্না শেষ। খাওয়ার জন্য ডাকতে এসেছিলাম। ঘুমাচ্ছো দেখে কম্বল টেনে দিচ্ছিলাম। “

দূর্জয় আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসে বলে,

“ চোখ লেগে গিয়েছিলো। ঘুমাই নি। “

বাণী চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়। বাণীকে দেখে নিয়ে দূর্জয় প্রশ্ন করে,

“ তুমি খেয়েছো? “

বাণী মাথা নেড়ে জবাব দেয়,

“ না। তুমি যেহেতু উঠেছো, তাহলে একেবারে নিচে গিয়ে খেয়ে আসো। আমি বহ্নির পাশে বসছি। ওকে একা রেখে যাওয়া ঠিক হবে না। “

দূর্জয় আর কিছু না বলে উঠে রুম থেকে চলে যায়। বাণী চুপচাপ বহ্নির মাথার কাছে বসে আলতো হাতে চুলে হাত বুলাতে থাকে। বেশ ক্ষানিকক্ষণ পর দূর্জয় একটা ট্রে হাতে রুমে ফিরে আসে। দূর্জয়কে দেখতেই বাণী নিচু গলায় বলে,

“ তুমি? “

দূর্জয় বাণীর সামনে বসে ট্রে টা রেখে বলে,

“ আজকের লাঞ্চটা দু'জন রুমেই করবো। “

বাণী বিস্মিত গলায় বলে,

“ কেনো? খারাপ দেখায় না? মা একা বসে খাবার খাবে? প্লিজ তুমি নিচে যাও। “

দূর্জয় প্লেটটা হাতে নিয়ে বলে,

“ মোটেও খারাপ দেখায় না। মামণিকে কোম্পানি দেওয়ার জন্য মৌটুসী আছে। আপাতত তুমি আমাকে কোম্পানি দাও। “

বাণীর মনে খচখচানিটা রয়ে যায়। সে তবুও প্রশ্ন করে,

“ তাহলে একটা প্লেট কেনো? “

“ এক প্লেটেই দুজনের জন্য বেড়ে নিয়েছি। তোমার সমস্যা হবে প্লেট শেয়ার করতে? আমার হাতে খেতে খুব বেশি অসুবিধা হবে? “

দূর্জয়ের প্রশ্নের পিঠে বাণী নির্বাক রয়। কিছু বলতে পারে না। কেবল মাথা নেড়ে বুঝায় তার সমস্যা নেই। দূর্জয় নিজ থেকেই এবার ভাত মেখে বাণীর মুখের সামনে এগিয়ে ধরে। বাণী ধীরে সুস্থে লোকমাটা মুখে তুলতেই দূর্জয় আবার আরেক লোকমা মেখে নিজের মুখে দেয়। বাণী একদৃষ্টিতে দূর্জয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। অদ্ভুতুরে কাণ্ডকীর্তি দেখছে নিভৃতে।

তার সামনে বসে থাকা এই পুরুষটা একসঙ্গে প্লেটে সব তরকারি বেড়ে খাওয়া পছন্দ করে না। এই বিষয়টা বিয়ের পর বেশ ক'দিন লক্ষ্য করে বাণী নিজ থেকেই বুঝতে পেরেছে। অথচ এই মুহুর্তে ঠিকই প্লেটটাতে একসঙ্গে সব তরকারি বেড়ে নিয়ে এসেছে বাণীর জন্য। সুহালা বেগমের মুখে বাণী এ-ও শুনেছে খাবার দাবারের ব্যাপারে দূর্জয় খুব হাইজেন মেইনটেইন করে চলে। কারো এঁটো খাওয়া অথবা নিজ হাতে কাউকে খাইয়ে দেওয়া এসব ব্যাপার দেখলেই দূর্জয় আঁতকে উঠতো। অথচ সেই দূর্জয় কি-না এই মুহুর্তে নিজ হাতে বাণীকে খাইয়ে দিচ্ছে আবার সে-ই একই হাতে নিজেও খাচ্ছে।

শেষ কবে এভাবে যত্ন আর স্নেহের সহিত বাণী কারো হাতে খেয়েছিলো তার মনে পড়ছে না। মুখের খাবারটা কোনো মতে গিলে নিয়ে চোখ নামিয়ে নেয় নিজের। না চাইতেও তার কান্না পাচ্ছে। সেই কান্নাটা দমিয়ে রাখাও অসম্ভব ঠেকছে। বেহায়া চোখের জল গুলো গাল গড়িয়ে টুপটুপ করে পড়তে শুরু করে। দূর্জয় তা দেখতেই উদ্বেগ মিশ্রিত গলায় বলে,

“ কি হয়েছে বাণী? “

বাণী কিছু বলতে পারে না। তবে নিজের কান্না লুকানোর চেষ্টাও করে না। উল্টো সামনের দিকে ঝুকে দূর্জয়ের কাধে মাথা ঠেকিয়ে নিঃশব্দে বুকের যন্ত্রণা গুলো অশ্রু রূপে বিসর্জন দিতে থাকে। দূর্জয় এই পর্যায়ে কিছু বলে না। কেবল হাতের প্লেটটা একপাশে সরিয়ে রেখে বাণীর পিঠে আলতো করে এক হাত দিয়ে বুলিয়ে দিতে থাকে। বাণী কান্নার মাঝে মৃদু গলায় বলে,

“ আমার কাছে সব স্বপ্ন মনে হচ্ছে বারবার। “

দূর্জয় ফিসফিসিয়ে বলে,

“ সবটা সত্যি জানা। “

__________

নোংরা ফ্লোরে বসে থাকা আসামীটা আজকাল কেমন যেনো ঘাড়ত্যাড়ামি স্বভাবটা জাহির করে না খুব একটা। চোখে মুখে হিংস্র রূপটার বহিঃপ্রকাশও করে না খুব একটা। বরং অত্যাধিক মাত্রায় শান্ত হয়ে নিজের ভাবনার জগতে ডুবে থাকে। আজ সৈন্যদের এই সেলটায় হিরণের শেষ দিন। আগামীকাল থেকে তার বিচার কার্যক্রম শুরু হবে। সেই সঙ্গে তার অবস্থানটাও পুলিশের অধিনস্থ জেলে স্থানান্তর হবে।

হিরণ ভালো করেই জানে তার হাতে এখনো অনেক সময় আছে। এটা বাংলাদেশ। এখানকার বিচার ব্যবস্থার প্রক্রিয়াটা কচ্ছপের থেকেও ধীর গতিতে এগোয়। প্রত্যেকটা শুনানির তারিখের মাঝে থাকে কয়েক মাসের ব্যবধান। যদিও দেশের বুকের একটা আইনজীবিও হিরণের কেসটা সামলাতে এগিয়ে আসে নি। আসার কথাও নয়। হিরণ একজন প্রকাশ্যে দেশদ্রোহী। তার উপর লাগানো অভিযোগের যুতসই সাক্ষ্য প্রমাণ আছে। তাই নীতি মেনে চলা কিংবা অনৈতিকতার সমর্থক আইনজীবী কেউই তার কেসটার প্রতি আগ্রহ দেখিয়ে নিজেদের চাকরি হুমকিতে ফেলবে না।

চার দেয়ালে বন্দী হিরণের দেহটা আজকাল খুব ক্লান্ত অনুভব করে। কেমন দমবন্ধ অনুভব করে সে। মনে হয় কতদিন বাহিরের জগতটা দেখে না। ছোট একটা ছিদ্রও নেই দেয়ালের ফাঁক ফোকরে। সামান্যতম প্রাকৃতিক আলো দেখে না কতদিন! কেবল তো ক'টা মাসই হলো হিরণ এই বন্দী অবস্থায় আছে। মাত্র এই ক মাসেই যদি তার কাছে এই জীবনটা এতটা তিক্ত মনে হয়, তাহলে না জানি বাণী ওই সাতটা বছর কি রকম অনুভব করতো? এই তিক্ততা, অন্যের আওতায় বশ্যতা থেকে পালানোর জন্যই বুঝি বাণী এতো মরিয়া ছিলো!

একটা প্রবাদ বাক্য শুনেছিলো হিরণ। ‘You never know what someone is going through until you walk in their shoe.’ প্রবাদটা কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারছে হিরণ। যদিও তার তিল পরিমাণ এই উপলব্ধিটাও বাণীর অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া ওই অতল গহব্বরের সম কষ্টের সামনে কিছুই না।

হুট করেই বহ্নির কথা ভাবতে বসে হিরণ। গত বেশ ক'দিন ধরেই মেয়ের জন্য তার বুকটা নীরবে পুড়ছে। কে জানে কেমন আছে মেয়েটা! অবশ্য বাণীর কাছে বহ্নির খারাপ থাকার কথাও নয়! এই কয় মাসে কি বহ্নি আগের তুলনায় আরেকটু বড়ো হয়েছে? কৌতূহল জাগে হিরণের। মেয়েটাকে একবার সামনা-সামনি দেখার ইচ্ছা জাগে খুব। এই বন্দীদশায় মেয়েকে দেখার ইচ্ছাটা পূরণ হওয়া সম্ভব নয় বলেই হিরণ মেয়ের সঙ্গে নিজের মুহুর্তের স্মৃতিচারণ করতে বসে।

বাণী যখন প্রেগন্যান্ট ছিলো তখনকার একদিনের কথা। নতুন কারো আগমনের জন্য একা হাতে প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত হিরণ৷ বাচ্চাটা ছেলে হবে নাকি মেয়ে তা-ও তার জানা ছিলো না। তাই সে ছেলে মেয়ে উভয় বাচ্চার জন্যই কেনাকাটা করেছিলো। বাচ্চাকে ঘিরে তার এতো আগ্রহ দেখে ইবাত একদিন জানতে চেয়েছিলো,

“ স্যার। আপনি বাচ্চার জন্য কোনো নাম ভেবেছেন? “

সেই মুহুর্তে হিরণের মাথায় প্রবেশ করে, আসলেই তো! যার আগমনের জন্য হিরণের এতো অপেক্ষা তার জন্য এখনো কোনো নাম ভাবা হয় নি তার। সেই রাতে হিরণ খুব ভাবে। আর ভেবে ছেলে বাচ্চার জন্য কোনো নাম পায় না বলে কেবল একটা নামই ঠিক করে। বহ্নি। মেয়ে হলে এই নামটাই রাখবে সে। অনেকটা বাণী এবং নিজের নাম মিলিয়েই নামটা ঠিক করে হিরণ। বহ্নি নামটার অর্থ আগুন। হিরণের ভেতর দাউদাউ করা আগুনের একটা ছোট অংশ হবে সে।

__________

দিনটা পবিত্র শুক্রবার। সকাল থেকে বাসায় কিছু পরিচিত মুখের ভীড়। দূর্জয়ের ফুপ্পির পরিবারকে বিশেষ ভাবে দাওয়াত করেছেন সুহালা বেগম। একমাত্র আত্মীয় বলে কথা। যদিও দূর্জয়ের দুটো মামাও আছে। তবে তারা দুজনেই পরিবার সহ ইউরোপের একটা উন্নত মানের দেশে সেটেল্ড। দেশ মুখো হয় না বললেই চলে। তবে সুহালা বেগমের মতো তার দুই ভাইও সচ্ছল মনের বলেই দূর থেকে ভাগ্নে, ভাগ্নের স্ত্রী এবং কন্যার জন্য শুভেচ্ছা জানাতে ভুলে না।

দূর্জয়ের ফুপ্পির তেতো কথা এড়ানোর জন্য সুহালা বেগম সারাদিন বাণীর সঙ্গে সঙ্গে থাকছেন। উক্ত ভদ্র মহিলাকে মোটেও কোনো তিক্ত কথা বলার সুযোগটুকু দিচ্ছেন না। দূর্জয়ের ফুপ্পি তা বুঝতে পারে। আর বুঝে বিরক্ত হন। নতুন নতুন ছেলের বউ নিয়ে এমন আদিখ্যেতা! মনে মনে নিজেকে বলে, দু'দিন যেতেই দেখা যাবে ছেলের বউ আর শাশুড়ীর এই মধুর সম্পর্ক কোথায় যায়!

দূর্জয় আজ আর দশটা দিনের মতো গায়ে শার্ট কিংবা টি শার্ট জড়িয়ে রাখে নি। বরং পবিত্র জুম্মার দিনের সম্মানে গায়ে জড়িয়েছে একটা কালো পাঞ্জাবি। নিজ গরজে আকিকার প্রতিটা বিষয় তদারকি করছে সে। গায়ে আসমানী রঙের শাড়ি জড়ানো বাণী তা দেখে কেবল মুগ্ধ হয়ে।

অবশেষে আসে সেই মুহুর্ত। হুজুর দূর্জয়ের কাছে জানতে চায় মেয়ের নাম কি রাখবে বলে ঠিক করেছে। দূর্জয় আড়চোখে কেবল দূরে দাঁড়ানো বাণীকে একবার দেখে। নামের ব্যাপারে বাণীর সঙ্গে সে কথা বলেছিলো। সবটা মনযোগ দিয়ে শুনে বাণী বলেছিলো নামটা যেনো দূর্জয়ই ঠিক করে। এই অধিকারটা সে দূর্জয়কে দিলো। দূর্জয় সেই মুহুর্তে অবাক হলেও উপলব্ধি করেছিলো বাণী ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, ‘মেয়েটা আমার একার নয় বরং তোমারও। ওর উপর অধিকারের ভাগটা আমি তোমাকে এবং শুধুমাত্র তোমাকেই দিলাম।’

দূর্জয় বাণীর থেকে চোখ সরিয়ে হুজুরের দিকে তাকায়। নরম গলায় বলে,

“ আফরা ইলহাম৷ “

নামটুকু শুনতেই হুজুর সন্তোষমূলক হাসে। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বাণীর কানেও পৌঁছে দূর্জয়ের উচ্চারিত নামটা। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে তার। হুজুর বলে উঠে,

“ আলহামদুলিল্লাহ। আফরা ইলহাম। বেশ অর্থবহ নাম। আফরা অর্থ আরবি চন্দ্র মাসের ১৩ তম রাত। আর ইলহাম অর্থ অন্তর্দৃষ্টি। “

আকিকা সম্পন্ন হতেই দূর্জয় সুযোগ করে এক ফাঁকে বাণীর কাছে একটা ম্যাসেজ পাঠায়।

“ নাম পছন্দ হয়েছে? “

আধঘণ্টার থেকেও বেশি সময় পর ব্যস্ত বাণী ছোট করে রিপ্লাই করে,

“ অনেক। “

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন