#প্রিয়_রুহের_মাহরাম 🌿
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
পর্বঃ- ২৬
🌿 🌿 🌿
ঃ- অবশেষে খুঁজে পেলেন ম্যাডাম!.. বুদ্ধি টা দারুন ছিল। কিন্তু আপনি আমার পার্সোনাল ফোন নাম্বার কোথায় থেকে পেলেন??...
বলে উঠলো মাহাদ।
ঃ- আপনি?... মানে আপনি আগে থেকেই জানতেন??... আপনি ইচ্ছে করে আমার সাথে এমন করেছেন। বার বার এই অধিকারের কথা বলছিলেন?...
অস্থির হয়ে বলে উঠলো কিয়ারা।
ঃ- হ্যাঁ এটাই। আপনার মাথায় তো বেশ বুদ্ধি আছে দেখছি। তা এতো বছর পর স্বামীর খোঁজ কেন করছিলেন?.. জানতে পারি কি??... বলে উঠলো মাহাদ।
ঃ- আমি আগে এতো কিছু ভাবিনি, তাই আগে খোঁজার ও কোনো প্রয়োজন মনে করিনি। আমি ওটা একটা দূর্ঘটনা ভেবে ভূলে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু পরে যখন মাথায় এলো যে আমাকে এই ভয়াবহ রকমের দুর্ঘটনা থেকে মুক্তি পেতে হবে। তখন খুঁজতে শুরু করলাম, কিন্তু আপনি কেন খুঁজছিলেন আমাকে???... আর আগে খোঁজ পেয়েও আমার কাছে নিজের এই পরিচয় গোপন করেছেন কেন??... আপনি যদি আগেই বলে দিতেন তাহলে তো আমাকে এতো হয়রানি করতে হতো না।
হালকা রাগ মিশিয়ে বলে উঠলো কিয়ারা।
ঃ- আমার ইচ্ছে হচ্ছিল না তাই এই পরিচয় বলিনি। আমার ইচ্ছে, আমার মর্জি। আর এইমাত্র তুই এটা কি বললি??.... এটা … এই এতো সিরিয়াস ম্যাটার টা তুই শুধুমাত্র একটা দূর্ঘটনা ভেবে ভূলে যেতে চেয়েছিলি??... আর তারপর আবার কী বললি??... এই এতগুলো দিন পর তুই এই ম্যাটার টা থেকে মুক্তি পাওয়ার উদ্দেশ্যে আমায় খুঁজছিলি ??...
প্রচন্ড রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ে কথাগুলো বলে উঠলো মাহাদ।
ঃ- হ্যাঁ ঠিকই তো বলেছি। এমন তো নয় যে আমরা একে অপরকে ভালোবেসে সেই রাতে বিয়ে করেছিলাম। ওটা সম্পূর্ণ একটা দূর্ঘটনা ছিল। না ওর আগে আমরা একে অপরকে চিনতাম, আর না এখন একে অপরকে চিনি। আর এমনটাও নয় যে আমাকে ভবিষ্যতে আর বিয়ে করতে হবে না। আমি নিশ্চয়ই চিরকুমারী থাকবো না। আর আমাকে বিয়ে করতে হলে অবশ্যই আগে এই বিয়ে নামক দূর্ঘটনা টা থেকে মুক্তি পেতে হবে। তাই এতো দিন ধরে আপনাকে খুঁজছিলাম। এখন আপনি ভালোয় ভালোয় কোনো ভালো লইয়ার এর সাথে ডিভোর্স এর ব্যপারে কথা বলুন। পরিবারের সদস্যদের জানাজানি হওয়ার আগেই।
মৃদু কন্ঠে বলে উঠলো কিয়ারা।
ঃ- ওওও বিয়ে করার তোর এতো সখ, যে এই সম্পর্ক থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তুই আমাকে খুঁজছিলি। আর আমাকে বলছিস লইয়ার এর সাথে কথা বলতে??... তোর এতো বড় স্পর্ধা, যে তুই আমার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে “ডিভোর্স” এর কথা বলছিস। তুই আমার থেকে কখনো ছাড়া পাবি না। এমনকি মৃত্যুর পরও না। তাই মুক্তি পাওয়ার কথা ভূলে গিয়ে নিজেকে আমার জন্য তৈরি কর। মুক্তি তুই কখনোই পাবি না।
বাঁকা হেঁসে কথাটা বলে উঠলো মাহাদ।
ঃ- আপনি এমনটা বলতে পারেন না। এমন নয় যে আপনি আমাকে ভালোবাসেন। আর না আমি আপনাকে ভালোবাসি। তাহলে এই সম্পর্কের মানে কি??... যেই সম্পর্কে ভালোবাসা নেই, সেই সম্পর্কে আমরা কেন জড়িয়ে থাকবো???...
প্রচন্ড অস্থির হয়ে বলে উঠলো কিয়ারা।
ঃ- আমি তোকে ভালবাসি না। আর তোর ভালোবাসাও আমার প্রয়োজন নেই। কিন্তু তুই এই সম্পর্ক থেকে কখনো মুক্তি পাবি না। আমি ব্যতিত অন্য কোনো পুরুষ তোর জীবনে আসবে না। আমি আসতে দিবো না কোনদিন না। আর এটা আমার পার্সোনাল ম্যাটার। তাই এভাবে ওপেন প্লেসে দাঁড়িয়ে এই বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাই না আমি।
এই বলে মাহাদ হেঁটে পুলের ওখান থেকে বেরিয়ে গেল।
আর কিয়ারা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কিরণ এগিয়ে গেল ওর কাছে। ও আড়ালে থেকে এতোক্ষণ ওদের সব কথা শুনেছে। ও তো আগেই ধারণা করেছিল যে এমনটাই হবে। কিন্তু তখন কিয়ারা মানতে চায়নি। এখন কী করবে??.. আর কাউকে বলতেও তো পারবে না। তাহলে তো সেখানেও ধরা খাবে।
ঃ- আমি তো তোকে আগেই বলেছিলাম যে, এই লোক তোকে সহজে ছাড়বে না। এখন কী করবি???...
বলে উঠলো কিরণ। ওর কথার কোনো জবাব দিলো না কিয়ারা।
তারপর ওরা হেঁটে স্টেজের দিকে চলে এলো। কিয়ারা আর কিরণ গিয়ে পাশাপাশি দুটো চেয়ার পেতে বসল। কিয়ারা ভাবছে কি করবে। এই লোকটার জন্য ও অস্থির হয়ে ছিল এতদিন। এই লোকটা যে ওকে সামনে পেলেই কারণে অকারণে অপমান করেছে। সেই মানুষটিই কি না ওর স্বামী বের হলো!... এটা ও কীভাবে মেনে নেবে। কীভাবে কি করবে ও ??..
ঃ- ধ্যেত তেরি, খুঁজে পাওয়ার পর ঝামেলা আরও বেড়ে গেল। এর চেয়ে তো আগেই ভালো ছিল। এখন আমি কোনদিকে যাবো ?.. পিছনে পরিবারের লোকজন আর সামনে ঐ লোকটা। আর ওদের মাঝে ফেঁসে গেছি আমি। উফফফ আমি বোধহয় এই প্রেসারেই পাগল হয়ে যাবো।
বলে উঠলো কিয়ারা। ওর কথা শুনে কিরণ বলে উঠলো…
ঃ- আচ্ছা আমি তোর অবস্থাটা বুঝতে পারছি। এখন এসব কিছুক্ষণের জন্য ভূলে যা। আর একটু রিল্যাক্স কর। তারপর ঠান্ডা মাথায় মনোযোগ দিয়ে সবকিছু ভাব। দেখবি তোর জন্য সব সহজ হয়ে যাবে।
ঃ- হ্যাঁ তুই ঠিকই বলেছিস। এমনিতেই তো আমরা আজ বাড়িতে ফিরে যাচ্ছি। তো আমি বাড়িতে গেলে ওখানে একটু নিরিবিলি যে ভাবতে পারবো। এখন চল উপরে গিয়ে সবকিছু গোছগাছ করে নি।
এরপর ওরা দুজন উপরে চলে গেল। ওরা গিয়ে নিজেদের সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছে।
---
রিসেপশনের পর প্রথমবার জামাইকে কনের বাড়ি আনা হয়েছে।
বাড়ির গেটের সামনে আলো ঝলমল করছে। আত্মীয়রা ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে ফুল আর মিষ্টি। গাড়ি এসে থামতেই সবার মুখে একসাথে আনন্দের ধ্বনি—
ঃ- আরে, এসে গেছে আমাদের মেয়ে-জামাই। বলে উঠলো কিয়ারার ছোট চাচী।
গাড়ি থেকে নামল কায়রা, লাজুক ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে। নাঈম তার পাশে দাঁড়িয়ে সবাইকে সালাম দিল।
কিয়ারা রা ওদের আগেই চলে এসেছে। ওরা বোনেরা সবাই আগের গাড়িতে চলে এসেছে। দুলাভাই এর থেকে টাকা তুলতে হবে তো!...
ঃ- আলহামদুলিল্লাহ, আমার মেয়েটা আজ বউ হয়ে ফিরে এল।
কায়রার মা বলে উঠলো।তিনি কন্যাকে জড়িয়ে ধরলেন।
ঃ- আমাদের বড় মেয়ে আল্লাহর হুকুমে আজ থেকে তোমার হাতে। খেয়াল রেখো, মেয়েকে কখনো একা মনে করতে দিও না।
কায়রার বাবা শান্ত কন্ঠে বলে উঠলো।
ঃ- জ্বি, ইনশাআল্লাহ চিরদিন যত্ন নেব।
নাঈম একটুখানি হেঁসে বলে উঠলো।
ঃ- হয়েছে…হয়েছে, এখন ওদের কে ভিতরে ঢুকতে তো দিন। এভাবে বাহিরে দাঁড় করিয়ে রাখবেন নাকি?.. কিরণের মা বলে উঠলো।
ভেতরে ঢুকতেই শুরু হলো হইহুল্লোড়,খুনসুটি।
ওদের কে নিয়ে সোফায় বসানো হয়েছে। আর তারপর কিয়ারা রা সবাই একসাথে এসে ওদের সামনে দাঁড়ালো। তাদের হাতে একের পর এক ট্রে। প্রতিটা ট্রেতে রাখা আছে আলাদা আলাদা রঙের শরবত।
আলিশা অভিজ্ঞ ভঙ্গিতে বলে উঠলো…
ঃ- দুলাভাই…আজকে আপনাকে একটা পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। আমাদের বাড়িতে জামাই হলে, সাত শরবতের পরীক্ষা দিতেই হবে। কে জানে, পরীক্ষায় ফেল করলে হয়তো আপুকেই ফেরত দিয়ে যেতে হবে।
সবাই হেসে উঠল, নাঈম লজ্জা পেয়ে কপাল নিচু করল। কায়রা মুখ নিচু করে বসে আছে, কিন্তু ঠোঁটের কোণে চাপা হাসিটা আর লুকিয়ে রাখা যাচ্ছে না।
প্রথম গ্লাস: নুন-পানির শরবত!..
আলিশা এক গ্লাস সামনে ধরল, পানিটা হালকা মেঘলা, তাতে শুধু নুন মিশানো।
আলিশা দুষ্টু হেসে বলল…
ঃ- এই নুন-পানি দিয়ে শুরু। যেমন লবণ ছাড়া রান্না হয় না, তেমনি কায়দা ছাড়া আপনার জীবনও হবে নিরস।
নাঈম চুপচাপ এক চুমুক খেলো। মুখটা একটু বেঁকিয়ে ফেলতেই সবাই হো-হো করে হেসে উঠল।
দ্বিতীয় গ্লাস: হলুদ পানির শরবত!..
এবার গ্লাসে উজ্জ্বল হলুদ রঙ। নামিরা এগিয়ে এসে গ্লাস টা সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল…
ঃ- হলুদের মতোই আপনাদের সংসার সবসময় উজ্জ্বল আর সুন্দর হোক। তবে সাবধান, হলুদ কিন্তু জামার দাগ সহজে যায় না, আমাদের আপুর মতো—তার ভালোবাসার দাগও আপনার জীবন থেকে যাবে না।
সবাই আবার হেসে উঠল। নাঈম একটুখানি হেসে মাথা নিচু করে এই গ্লাস টা থেকেও এক চুমুক খেল।
তৃতীয় গ্লাস: করলার রসের শরবত!..
এবার সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্ত। করলার রসের গন্ধেই নাঈমের মুখ কুঁচকে গেল।
আরিয়া দুষ্টু হেসে বলল…
ঃ- জীবনে মিষ্টি থাকবে, কিন্তু মাঝে মাঝে তিতা কষ্টও আসবে। ওই কষ্ট করলার মতো হলেও মেনে নিতে হবে। এখন মুখ বাঁকিয়ে খেয়ে ফেলুন।
নাঈম এক ঢোঁকই খেলো, তারপর মুখ কুঁচকে ফেলে পানি খুঁজলো।
সবাই হাসিতে ফেটে পড়ল।
এবার মেহরান দুষ্টু হেসে বলল…
ঃ- দুলাভাই… এই মুখ দেখে মনে হচ্ছে, আমাদের আপুর রাগও আপনি সামলাতে পারবেন!...
চতুর্থ গ্লাস: টক লেবুর শরবত!...
একটা টক লেবুর শরবত এগিয়ে দিল আরিফা। আর তারপর বলল….
ঃ- এবার টক শরবত। সংসার সবসময় মিষ্টি হবে না, মাঝে মাঝে টক মুহূর্ত আসবে। কিন্তু টকের সাথেই তো আসল মজা।
নাঈম হালকা হাসি দিয়ে শরবত টা খেলো, আর কায়রা মুখ নিচু করে হাসি চেপে রাখল।
পঞ্চম গ্লাস: রুহ আফজার শরবত!..
গ্লাসে লাল রঙের মিষ্টি শরবত।
কিরণ মিষ্টি করে হেসে বলে উঠলো…
ঃ- এটা হলো ভালোবাসার শরবত। আল্লাহর রহমতে যেন আপনারা দু’জন একে অপরের জন্য চিরদিন মিষ্টি হয়ে থাকেন।
সবাই একটু হেসে উঠলো। নাঈম একটুখানি হেসে শান্তভাবে গ্লাসটা শেষ করলো।
ষষ্ঠ গ্লাস: দুধের শরবত!...
সাদা ঝকঝকে দুধের শরবত সাজানো হয়েছে। কিয়ারা গ্লাস টা
নাঈমের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল…
ঃ- দুধ যেমন পবিত্র, আপনাদের সংসারও তেমনই হোক—শান্ত, স্নিগ্ধ আর পরিপূর্ণ বারকাতে ভরা।
নাঈম হালকা হেসে শরবত টা খেলো। এবার তার মুখে আর অস্বস্তি নেই, বরং এক ধরনের তৃপ্তি ফুটে উঠল।
সপ্তম গ্লাস: ফল মিশ্রিত শরবত!...
সবশেষে এল এক রঙিন গ্লাস, নানা ফল কুচি কুচি কেটে মেশানো।
মিশাল একটু হেসে বলে উঠলো…
ঃ- এটাই আমাদের শেষ পরীক্ষা, দুলাভাই। সব তিতা-টক শেষে সংসার যেন ফলের মতোই মিষ্টি আর রঙিন হয়। এখন ঝটপট খেয়ে ফেলুন।
নাঈম হাসি দিয়ে শরবত টা খেলে নিল। এবার সবাই হাততালি দিল।
আরিয়া মজা করে চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো…
ঃ- ওহো, দুলাভাই সাত শরবতের পরীক্ষা পাস করেছেন!... এবার আর আপু কে রেখে যেতে হবে না।
সবাই হেসে উঠল, কায়রা হালকা হেসে লাজুক ভঙ্গিতে নাঈমের দিকে তাকাল।
আর শালীরা দুষ্টু হেসে বলল—
ঃ- এবার কিন্তু আপুকে খুশি রাখার আসল পরীক্ষা শুরু হলো!..
সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ল। নাঈম লজ্জা পেয়ে হালকা হেসে শরবত খেল, আর কায়রা মুখ লাল করে মাথা নিচু করে বসে রইল।
ঃ- আরে জামাই, আমাদের মেয়েকে যদি কাঁদাতে চান, তবে আজকেই বলে রাখি—এই বাড়ির দরজা কিন্তু চিরদিনের জন্য বন্ধ থাকবে।
বলে উঠলো নামিরার মা।
ঃ- দেখি দেখি, জামাই কেমন খায়! বেশি খেলেই বুঝব রান্না সামলাতে পারবেন।
বলে উঠলো কায়রার এক খালামনি।
কায়রার বান্ধবীরা পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল—
ঃ- দেখেছিস? লজ্জায় দুলাভাই এর গাল লাল হয়ে গেছে।
অন্যজন মজা করে বলল—
ঃ- হুমমম তা তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু এখনো তো আসল পরীক্ষা বাকি!...
ওরা ঐ বাড়ি থেকে সন্ধ্যার নাস্তা সেরেই বেড়িয়ে পড়েছিল। তারপর এখানে, এই বাড়িতে এসে হাঁসি ঠাট্টা, মজা মাস্তি, হইহুল্লোড় শেষে । নতুন জামাই কে রাতের খাবার খেতে বসানো হয়েছে।
খাওয়া-দাওয়ার আয়োজনে ভরপুর। কায়সার বাড়ির লোকেরা কোনো কমতি রাখেননি। বিরিয়ানি, রোস্ট, জর্দা, কাবাব, মিষ্টি কেক, ফলমূল—সবকিছু প্লেটভর্তি করে সুন্দর করে সাজানো।
সবার যত্ন আর মজার টিপ্পনিতে নাঈম খানিকটা অস্বস্তি পেলেও মুখের হাসি বজায় রাখল।
ঃ- খাও বাবা, বাড়তি কিছু চাইতে লজ্জা করবে না। তুমি এখন এই ঘরেরই একজন। তাই কোনো সংকোচ করবে না।
বলে উঠলো কায়রার মা।
নবদম্পতি একে অপরের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ হেসে নিল।
কায়রার মনে হলো—এই বাড়ি তার চেনা, কিন্তু আজ সে এসেছে অন্য পরিচয়ে।
অন্যদিকে নাঈমের মনে হলো—সে বাইরের কেউ নয়, আজ থেকে এই ঘর তাঁরও আপন।
খাওয়া দাওয়া, আমদ ফুর্তির শেষে আত্মীয়রা চলে যাওয়ার সময় নবদম্পতি কে দোয়া করে বলল—
ঃ- “আল্লাহ তোমাদের দু’জনকে সুখী রাখুক, একে অপরের জন্য রহমত বানাক। সংসারে যেন সবসময় শান্তি ও ভালোবাসা থাকে।”
মুহূর্তটা হয়ে উঠল অমূল্য, আবেগে-ভালোবাসায়-মজায় ভরা।
এ যেন নিঃশব্দে সবাই মিলে বলছে—
“আমাদের মেয়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা তোমাকেও আপন করে নিলাম।”।
সারা সন্ধ্যে আনুষ্ঠানিকতা, হাসি-ঠাট্টা আর খাওয়া-দাওয়ার পর ধীরে ধীরে চারপাশে নেমে এলো রাতের নীরবতা। সবাই একে একে ক্লান্ত হয়ে যার যার ঘরে চলে গেল। কায়রা নাঈম কে নিয়ে নিজের পরিচিত সেই ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলো নিঃশব্দে। তার বুকের ভেতরে ধুকপুক ধুকপুক করছে, মনে মনে ভাবছে ওরা এটা কি করেছে। ঐ পাজির দল রুমটাকে পুরো ফুলের বাগান বানিয়ে ফেলেছে।
ঘরটা সাজানো হয়েছে সাদা চাদর, গোলাপের পাপড়ি আর হালকা সুগন্ধি দিয়ে। মোমবাতির মৃদু আলোয় পরিবেশটা হয়ে উঠেছে আরও স্বপ্নময়।
দরজা হালকা করে ঠেলে কায়রার পিছনে পিছনে ভেতরে ঢুকল নাঈম। চুপচাপ এগিয়ে গিয়ে কায়রার পাশে দাঁড়ালো। দু’জনেই মুখ নিচু করে, কারও দিকে কারও চোখ উঠছে না। বাইরের হৈচৈয়ের পর এই নীরবতা যেন আরও ভারী লাগছে।
নাঈম আস্তে করে বলল….
ঃ- শালীরা দেখছি বেশ এগিয়ে দিল।
কায়রা ফিসফিস করে উত্তর দিল…
ঃ- আসলে … ইয়ে মানে ওই… আমি এসবের কিছুই জানতাম না। মানে… ওরা যে এসব করবে ওই আর কি… ।
কোনো বাড়তি কথা নেই, কিন্তু এই সামান্য সম্ভাষণেই বুক কেঁপে উঠল দু’জনের।
নাঈম সাহস সঞ্চয় করে হাত বাড়াল, ধীরে ধীরে কায়রার মাথায় হাত রাখল এবং নবীজীর সুন্নত অনুযায়ী দোয়া করল—
“আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খাইরাহা, ওয়া খাইরা মা জাবালতাহা ‘আলাইহি, ওয়া আউযু বিকা মিন শাররিহা, ওয়া শাররি মা জাবালতাহা ‘আলাইহি।”
(অর্থ: হে আল্লাহ, আমি তার ভেতরের কল্যাণ প্রার্থনা করছি এবং যে স্বভাব নিয়ে তুমি তাকে সৃষ্টি করেছ তার কল্যাণও প্রার্থনা করছি। আর আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই তার ভেতরের অকল্যাণ থেকে এবং যে স্বভাব নিয়ে তুমি তাকে সৃষ্টি করেছ তার অকল্যাণ থেকেও।)
কায়রা চোখ বুজে চুপচাপ শুনল। তার চোখের কোণে জল টলমল করে উঠল, মনে হলো বুকের ভেতরে যেন শান্তি নেমে এসেছে।
নাঈম আস্তে করে বলল—
ঃ- তুমি আমার অর্ধাংশ। আমি সবসময় চেষ্টা করবো তোমাকে হাসিখুশি রাখার। তুমি আমার জন্য দোয়া করবে তো?..
কায়রা কাঁপা কণ্ঠে উত্তর দিল—
ঃ- ইনশাআল্লাহ, আমি সবসময় আপনার পাশে থাকব। আপনাকে কখনো ছেড়ে যাবো না। সব সময়, সব পরিস্থিতিতে আমাকে আপনার পাশে পাবেন।
এতদিনের চেনা লাজুক মেয়েটি আজ প্রথম নিজে থেকে এতো সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলল। আজ নিজের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেছে ওরা।
দু’জনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। বাইরের রাতের নিরবতা, দূরে পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ ভেসে আসছে। মনে হলো প্রকৃতিও চাইছে যে আজ ওরা দুজন থেকে সম্পূর্ণ মিলেমিশে একাকার হয়ে যাক।
নাঈম পকেট থেকে ছোট্ট একটা আংটি বের করল, আস্তে করে কায়রার হাতে পরিয়ে দিল। আর তারপর বলল…
ঃ- এটা কোনো বড় জিনিস নয়, শুধু একটা প্রতিশ্রুতি—আমি তোমাকে সারাজীবন সম্মান করব। আমি কি এবার অনুমতি পেতে পারি..…
কায়রা লাজুক ভঙ্গিতে চোখ নামিয়ে নিল। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল। যার মানে নাঈম হ্যাঁ ধরে নিল। তারপর তাঁরা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। হারিয়ে গেল ভালোবাসার অতল গহ্বরে।
---
একটা মিষ্টি আর সুন্দর স্বপ্নময় রাতের সমাপ্তির পর…
অদূরে অবস্থিত একটি মসজিদ থেকে মাইকে ফজরের আযানের ধ্বনি ভেসে এলো।
কিছুক্ষণ পর দু’জনে গোসল সেরে ফ্রেশ হয়ে ফজরের নামাজ আদায় করতে দাঁড়িয়ে পড়ল। কায়রা পিছনে ও নাঈম সামনে দাঁড়িয়ে গেল। নামাজ শেষে দুজনে মোনাজাতে একসাথে দোয়া করল—
“হে আল্লাহ, আমাদের সংসারকে ভালোবাসা, রহমত ও শান্তিতে ভরে দাও।”
তারপর ধীরে ধীরে পর্দা নামল ঘুমের ইচ্ছায়। ভয়ের জায়গা নিল বিশ্বাস, আর লজ্জার জায়গা নিল অটুট বন্ধনের শুরু।
---চলবে---
ইনশাআল্লাহ