#প্রিয়_রুহের_মাহরাম 🌿
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
পর্বঃ- ২৭
🌿🌿🌿
পরের দিন সকালে… একটা সুন্দর মিষ্টি সকল।
সকালের আলো ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকছে। জানালা দিয়ে ভেসে আসছে পাখির ডাক আর হালকা বাতাস। ঘুম ভাঙল নাঈমের। নাঈম চোখ মেলেই দেখলো, ঘরের এক কোণে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে আছে কায়রা।
নাঈম সামনে তাকিয়ে দেখলো কায়রা মাথার চুল মুছছে। কায়রার পড়নে আছে গোলাপী রঙের একটা সুন্দর শাড়ি। গলায় সিম্পল ডিজাইন এর একটি লকেট। হাতে দুটো সুন্দর পাথরের কাজ করা বালা। কানে পাথরের ঝুমকা আর নাকে সুন্দর ছোট্ট একটি ডায়মন্ড এর নাকফুল। এটুকুতেই কায়রা কে বেশ সুন্দর লাগছে।
মুখে মৃদু লাজুক হাসি। আলোয় ঝলমল করছে তার চোখদুটো। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের পাশাপাশি স্বামীকে ঘুম ভাঙা চোখে তাকাতে দেখে তার গাল লাল হয়ে উঠল। নাঈম কে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে কায়রা পিছনে ফিরে ওর দিকে তাকালো।
ঃ- আব… আপনি এভাবে তাকিয়ে কি দেখছেন??.. আমাকে কী বেশি অদ্ভুত লাগছে??.. আসলে আমি.. মানে.. ঠিকভাবে সাজ টা পারি না।
বলে উঠলো কায়রা।
ঃ- ঃ- আমি ভেবেছিলাম স্বপ্ন দেখছি, কিন্তু দেখছি বাস্তবটা স্বপ্নের থেকেও সুন্দর।
আর সাজার দরকার নেই। তোমাকে এভাবেই সুন্দর লাগছে।
মৃদু হেসে বলল নাঈম।
কায়রা ওর এই কথায় একটুখানি লাজুক হাসলো। স্বামীর থেকে প্রশংসা শুনে কারই বা ভালো না লাগে।
শাড়ির আঁচল মাথায় টেনে, চুপচাপ আয়নায় তাকিয়ে আঁচলের কোনা টা আঙুলের মাথায় পেঁচিয়ে আবার খুলে ফেলছে।
নাঈম কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল। মনে হলো—এটাই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সকাল।
মৃদু হেসে তাকিয়ে রইল।
কায়রা তাড়াতাড়ি নিচের দিকে চোখ নামিয়ে নিল। হাতের আঙুল নিয়ে খেলতে খেলতে আস্তে করে মৃদু কন্ঠে বলল—
ঃ- এভাবে তাকিয়ে থাকবেন না, কেমন যেন লাগে।
নাঈম হেঁসে বিছানা থেকে উঠে কায়রার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে উঠলো…
ঃ- কেমন লাগে?.. আমাকেও একটু বুঝিয়ে বলো!... তুমি শুধু বলো আমি ঠিক বুঝে নেবো।
ঘরের পরিবেশ ভরে গেল এক অদ্ভুত নীরব ভালোবাসায়। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় দেখা গেল—দু’জনের চোখে চোখ মিলেছে, আর তার মধ্যেই যেন ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি লেখা।
নাঈম কে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে কায়রা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। শাড়ির আঁচলটা কাঁধে টেনে নিয়ে মৃদু কন্ঠে করে বলল—
ঃ- আপনি ফ্রেশ হয়ে নিচে আসুন। আমি গিয়ে নাশতার ব্যবস্থা করি।
নাঈম হেসে বলল—
ঃ- আজকেই প্রথম দিন, এত কষ্ট করতে হবে না।
কায়রা লাজুক হাসি দিয়ে উত্তর দিল—
ঃ- এটাই তো আমার কাজ, আপনার জন্যই করতে চাই।
তারপর কায়রা রুমের দরজা খুলে নিচে চলে এলো। নিচে এসে দেখলো ওরা সবাই ডাইনিং টেবিলে বসে আছে। সবাই মিলে কিছু আলোচনা করছে। ওরা হয়তো ওকে নিয়েই কথা বলছে।
কায়রা চুপচাপ হেটে রান্নাঘরে ঢুকে গেল। দেখলো মা চাচীরা ভোর থেকেই রান্নাঘরে ব্যস্ত। গরম গরম পরোটা, সবজি, ডিম ভাজা, দুধ-চা—সব একসাথে সাজানো হলো। টেবিলে নানারকম মিষ্টি ও ফলও রাখা হলো।
সবাই যেন জামাইকে আপ্যায়ন করতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
শ্বশুরবাড়িতে বরের প্রথম সকালের নাস্তা বলে কথা। যেমন তেমন হলে তো আর চলে না। আর বাঙালি মায়েরা তো জামাই আপ্যায়নে সেরা।
ভোরের আলোয় চৌধুরী বাড়ির ড্রইং রুম ভরে গেছে কোলাহলে। সবার চোখে-মুখে উৎসবের আনন্দ এখনও জাগ্রত। নতুন জামাই ঘুম থেকে উঠতেই চারদিক থেকে এক ধরনের কৌতূহল ভেসে এলো—
“আজ জামাই মশাই প্রথমবার আমাদের সাথে সকালের নাস্তা করবেন।
নাঈম অল্প কিছুক্ষণ পরেই নিচে নেমে এলো।
মেহরাব নাঈম কে টেনে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে দিল।
কায়রা যেই না নাঈমের প্লেট সাজিয়ে দিতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই বোনেরা এসে তাকে আটকালো।
আলিশা চোখ টিপে বলে উঠলো…
ঃ- আহা! দেখ তো, কায়রা দুলাভাইয়ের কত যত্ন করছে। যেন রান্নাঘর থেকেই প্রেমের সুবাস ভেসে আসছে।
নামিরা বলে উঠলো…
ঃ- আমাদের জন্য কি কিছু আছে নাকি শুধু দুলাভাইয়ের জন্যই?...
আলিশা বলে উঠলো…
ঃ- দুলাভাই, সাবধানে খাবেন। এক টুকরোও ফেলে গেলে কিন্তু জরিমানা দিতে হবে।
ওর কথার সাথে তাল মিলিয়ে নামিরা বলে উঠলো…
ঃ- হ্যাঁ হ্যাঁ, জরিমানা মানে গিফট! দুলাভাই আমাদের হেব্বি বড়লোক, খালি খাওয়া চলবে না। মাঝে মাঝে শালিদের কেও একটু খুশি করতে হয়।
সবাই হো-হো করে হেসে উঠল। কায়রা লাজুক চোখে শুধু দৃশ্যটা দেখছিল।
আলিশা পরোটা তুলে দিতে দিতে বলল…
ঃ- দুলাভাই, আজকে যদি বেশি খেয়ে ফেলেন, রাতে আপুর সাথে গল্প করার সময় ঘুম ধরে যাবে।
নামিরা বলে উঠলো…
ঃ- তাহলে তো বিপদ! আপু কিন্তু কম কথা বলে না।
কায়রার বাবা হাসিমুখে বললেন—
ঃ- বাবা, আজ থেকে তুমি আমাদের পরিবারের অংশ। প্রথম সকালের নাশতা খেতে হবে আমাদের সাথেই।
নাঈম বিনয়ের সাথে উত্তর দিলেন—
ঃ- আলহামদুলিল্লাহ, এটা আমার জন্য বড় সৌভাগ্য।
ঃ- হয়েছে….হয়েছে , এখন সবাই খাওয়া শুরু কর। খাবারের সময় এতো কথা বলতে নেই।
বলে উঠলো কায়রার বাবা।
ওনার এই কথা শুনে সবাই চুপচাপ খাওয়া শুরু করলো।
কায়রার মা বারবার জামাইয়ের প্লেটে গরম গরম পরোটা তুলে দিলেন। আর বললেন—
ঃ- বাবা গরম গরম খাও। ঠান্ডা হয়ে গেলে আর ওতোটা মজা নেই। আর তুমি আমার ছেলের মতো। খাও, কোনো সংকোচ করো না।
ঃ- আম্মু… আপনি এতো যত্ন করে বেরে দিচ্ছেন যে, আমি নিজেকে জামাই না ছেলে মনে করছি। মৃদু হেসে বলল নাঈম।
তারপর সবাই নাস্তা খেয়ে উপরে যে যার মত উঠে গেল। নাঈম ও উপরে কায়রার ঘরে চলে গেল। কায়রা নিচে মা চাচীদের কাছে ড্রইং রুমে বসে গল্প করছে। কিয়ারা রান্না ঘরে ফ্রিজের কাছে গেল।
ঃ- কীরে.. তুই এখনো এসব খাওয়া ছাড়তে পারবি না??...
বলে উঠলো কিয়ারার মা। উনার এই কথা শুনে ওখানে থাকা সবাই ওর দিকে তাকালো।
ওনাদের সবাই কে নিজের দিকে এমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে
কিয়ারা তড়িঘড়ি করে হাতটা পিছনে লুকিয়ে ফেলল।
ঃ- এই তোর হাতে কি??... পিছনে কি লুকাচ্ছিস??... দেখি… ?.. এই বলে কিয়ারা ওর দিকে এগিয়ে এলো।
আর তারপর হাত টা টেনে সামনে নিয়ে এলো। কায়রা ওর হাতের দিকে তাকিয়ে হতবাক হয়ে গেল।
ঃ- এসব কি খাচ্ছিস ?.. এই বদঅভ্যাস তুই এখনো ছাড়তে পারলি না?...
ঃ- কী খাচ্ছি?... তোমরা এমন রিএ্যকশন দিচ্ছ যেন আমি গাজা খাচ্ছি। সামান্য টমেটোই তো খাচ্ছি। লাল লাল, পাকা পাকা টসটসে টমেটো!... উমমম কি যে মজা!.. তোমরা খেলে বুঝতে পারতে হুহহ।
এই বলেই কিয়ারা ওর হাতের মুঠোয় থাকা টসটসে লাল টমেটো টায় কামড় বসিয়ে দিল। তারপর চোখ বুজে ভীষণ তৃপ্তি নিয়ে চিবোতে লাগলো। মানে ও এমন ভাবে খাচ্ছে, ওর কাছে ওটা যেন সাক্ষাৎ অমৃত তুল্য।
চাচী (কিরণের মা) হাসতে হাসতে বলে উঠলো…
ঃ- আর কিছু না হোক, এই মেয়েটার টমেটো খাওয়ার লোভটা একদিন নাম করবে!
ছোট চাচী হেসে হেসে বলল..
ঃ- তুমি কি ভুলে গেছো, ছোট বেলায় বাজার থেকে টমেটো আনলেই ওর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠত?.. সব্জি রান্না হবে কি হবে না, আগে খালি লাল টমেটো চাই!
কিরণের মা মৃদু হেসে বলল…
ঃ- হ্যাঁ রে, ছোটবেলায় ওকে এক গ্লাস দুধ দিলে মুখ ভার করত, কিন্তু হাতে এক ঝুড়ি টমেটো দিলে—মনে হতো যেন সোনা পেয়েছে।
ঃ- এমনকি আমাদের আঙিনার গাছ থেকেও না পেলে কচকচে টমেটো তুলে নিয়ে কাঁচা কাঁচা খেয়ে ফেলত। ওর জন্য আমার বাগানের টমেটো একটাও ঘরে আসতে পারতো না। খেতে খেতে মুখ লাল হয়ে যেত, অথচ ওর খাওয়া শেষ হতো না।
বলে উঠলো কিয়ারার মা।
ছোট চাচী মজা করে বলে উঠলো….
ঃ- ওর বিয়ের পর জামাইকে সাবধান করে দিতে হবে—টমেটোর যোগান ঠিক রাখতে হবে, না হলে সংসারে ঝড় উঠবে।
সবাই হো-হো করে হেসে উঠল।
ঃ- আরে ধুর! ঝড় কেন উঠবে? টমেটোই তো ওর প্রাণের খাবার। বরং এটাই তার মিষ্টি অভ্যাস।
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে বলে উঠলো কিরণ।
কিয়ারা লাজুক হেসে বলল…
ঃ- আল্লাহ! এসব পুরোনো গল্প এখনো তুলতে হয়? .. তোমরা এসব কি শুরু করলে?.. সামান্য টমেটোই তো খাচ্ছি।
আর এখন তো আর কেউ তোমার গাছের টমেটো খায় না মা। আমি তো সেই সুদূর গাজীপুরে থাকি। হুহহহ
বলে ভেংচি কেটে ও টমেটো খাওয়ায় মনোযোগ দিল।
ঃ- তাঁতে কী তোর টমেটো খাওয়া বন্ধ হয়েছে?..
সদর দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বলে উঠলো কিয়ান…..
ঃ- মানে?..
বলে উঠলো কিয়ারার মা।
ঃ- মানে এটাই মা যে, তোমার মেয়ে ওখানে গিয়েও টমেটো খাওয়া বাদ দেয়নি। ওখানেও তোমাদের অতি আদরের ছোট রাজকন্যার জন্য টমেটো কিনে আনতে হয় আমাকে।
নাকমুখ কুঁচকে বলে উঠলো কিয়ান।
ওর এই কথা শুনে সবাই মাথায় হাত দিল। সবাই বুঝে গেছে যে, ও আর কখনো এই অভ্যাস টা ছাড়তে পারবে না।
ঃ- এই শোন!.. তোরা বিকেলে রেডি হয়ে থাকিস। আমরা বিকেলে গাজীপুরে ফিরে যাচ্ছি।
কিয়ারা ও কিরণ কে উদ্দেশ্য করে বলল কিয়ান।
ঃ- এতো তাড়াতাড়ি কেন ভাইয়া?.. এখনো তো বিয়ের আমেজই শেষ হলো না। আর আপুও এখানে আছে।
বলে উঠলো কিয়ারা।
ঃ- আমাদের ছুটি শেষ হয়ে গেছে। দ্রুত হসপিটালে জয়েন করতে হবে। আর তোদের কী পড়ালেখা করার ইচ্ছে নেই??...
কায়রা আছে তাই বলে কি তোদের ও থাকতে হবে??...
ওর এই কথা শুনে কিয়ারা ও কিরণ চুপ করে রইলো। কিয়ান উপরে নিজের ঘরে চলে গেল।
কিয়ারা আর কিরণ ও চলে গেল।
ঃ- তুই এখনো এখানে বসে আছিস কেন??.. নিজের ঘরে যা!... গিয়ে দেখ জামাইয়ের কিছু লাগবে কিনা।
বলে উঠলো কায়রার মা।
ঃ- যাচ্ছি.. যাচ্ছি !..
এই বলে কায়রা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
বাড়ির মহিলারা রান্নাঘরে দূপুরের খাবারের আয়োজন করতে গেল।
নতুন জামাই , সেভাবেই তো আদর- আপ্যায়ন করতে হবে।
–শ্বশুরবাড়িতে নাঈমের প্রথম দুপুরের ভোজ–
নতুন জামাই আসার পর চৌধুরী বাড়িতে যেন উৎসবের আমেজ চলছে। সকাল থেকেই রান্নাঘরে ব্যস্ততা—মা, ফুফু, চাচী সবাই মিলে নানা পদ রান্না করছেন। হাঁড়িতে ফুটছে বিরিয়ানি, অন্য পাত্রে কোরমা, রোস্ট, পোলাও ইলিশ ভাজা, চিংড়ি মাছের ঝোল, পাশে ভুনা খিচুড়ি, ভর্তা আর সালাদের রঙিন সাজ। ঘর ভরে আছে গরম মসলার ঘ্রাণে।
নাঈম কে বসানো হলো ডাইনিং টেবিলে।
দুপুরে বিশেষ আয়োজন করে মেয়েজামাই কে সম্মানের সাথে ডাইনিং টেবিলে বসানো হলো। টেবিলে থালা সাজানো। একে একে খাবার আসতে লাগল।
কায়রার মা বলে উঠলো…
ঃ- বাবা, এগুলো সব তোমার জন্যই বানিয়েছি। লজ্জা কোরো না, খেয়ে নাও। তুমি তৃপ্তি করে খাও।
নাঈম বিনয়ী স্বরে বলে উঠলো…
ঃ- আম্মু, এত কিছু কেন? আমি তো একেবারেই অতিথি না, এখন আপনার ঘরেরই একজন।
—শালীদের খুনসুটি—
নাঈম যখন খাবারে হাত দিতে যাচ্ছিল, তখন শালীরা পাশে বসে খুনসুটি শুরু করল।
আলিশা বলে উঠলো…..
ঃ- দুলাভাই, আমাদের আপুর হাতের রান্না পছন্দ হলো তো?
নাঈম মুচকি হেসে বলল…
ঃ- হ্যাঁ, শুধু তোমাদের আপুর হাতের রান্না নয়, তোমাদের আপু তো এখন আমার পুরো জীবন জুড়ে আছে।
সবাই একসাথে “ইশশশ!” বলে হাসিতে ফেটে পড়ল।
কায়রা মাথা নিচু করে শুধু আঁচল দিয়ে মুখ ঢাকল।
আরিফা ঠাট্টা করে বলে উঠল….
ঃ- দেখো দেখো, দুলাভাই তো কবি হয়ে যাচ্ছে।
ওদের হাসি তামাশার মধ্যেই ওদের বাবা চাচারা ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে আসলো।
এতক্ষণ সবাই ওনাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল।
ঃ- আপনাদের এতো দেরি হলো যে?.. জামাই বাবাজি সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছে। এতো করে বললাম “তুমি খেতে শুরু কর ওনারা চলে আসবে” কিন্তু খেলোই না। তাড়াতাড়ি বসুন।
বলে উঠলো কায়রার মা।
তারপর খাওয়া দাওয়া শুরু হলো
একটার পর একটা পদ পরিবেশন হতে লাগল— বিরিয়ানী , গরম ভাত, কোরমা, শুটকি ভর্তা, বেগুন ভাজি, ইলিশ ভাজা, চিংড়ি মাছের মালাই কারি। মুরগির রোস্ট, মাছের ঝোল। নাঈম প্রথমে লাজুক ভঙ্গিতে কম করে নিলেও, শাশুড়ি আর শালীরা বারবার দিতে লাগল।
কায়রার মা মিষ্টি করে হেসে বলে উঠলো…
ঃ- না বাবা, এভাবে তো হবে না। জামাইকে প্রথম দিন খাইয়ে তৃপ্ত না হলে তো মন ভরবে না।
নাঈম মৃদু হেসে বলল…
ঃ- আচ্ছা ঠিক আছে আম্মু, আপনারা যদি খুশি হন তবে আমি আরেকটু খাচ্ছি।
খাবারের শেষে মিষ্টি পরিবেশন করা হলো —
খাওয়া শেষে মিষ্টি আর দই আসলো। আরিয়া মজা করে নাইম কে এগিয়ে দিয়ে বলল—
আরিয়া চোখ টিপে বলল…
ঃ- দুলাভাই, আপুর মতোই মিষ্টি খেতে হবে কিন্তু, নইলে যে সংসার মিষ্টি হবে না।
সবাই আবার হেসে উঠল।
নাঈম শুধু লাজুকভাবে মাথা নিচু করল, আর কায়রা লাজুক হেসে মাথা টা নিচু করে ফেলল।
নাঈম আর কায়রা দু’জনের চোখে চোখ পড়ল—এটা যেন নতুন জীবনের প্রথম দুপুরের সবচেয়ে মধুর স্মৃতি হয়ে রইল।
দুপুরের খাবারের শেষে সবাই রেস্ট করতে নিজেদের রুমে চলে গেল। নবদম্পতিরাও (নাঈম কায়রা) উপরে নিজেদের ঘরে চলে গেল।
কিয়ারা রান্না ঘরের ফ্রিজ থেকে দুটো লাল পাকা টসটসে টমেটো হাতে নিয়ে উপরে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেল। সিঁড়িতে আরিয়া ও আরিফার সাথে দেখা হয়ে গেল। ওরা ওর হাতে টমেটো দেখে হাসিঠাট্টা করতে লাগলো।
ঃ- এই তুই না মাত্রই দুপুরের খাবার খেলি!.. এখন আবার টমেটো নিয়ে আসলি!...
বলে উঠলো আরিফা।
ঃ- এই, তোকে তো টমেটো ওয়ালার কাছে বিয়ে দিতে হবে। সবার আদরের ছোট মেয়ের বিয়ে হবে একজন টমেটো ওয়ালার সাথে !....
এই বলে ওরা কিয়ারা কে নিয়ে হাসতে লাগলো।
ঃ- কার বিয়ে কার সাথে হবে, টমেটো বিক্রেতার সাথে না কোনো রাজার সাথে সেটা তো সময় এলেই দেখা যাবে। হাহ পাগলে কিনা বলে ছাগলে কি না খায়। তোদের মত বেডিরা কী আর কখনো বুদ্ধিমতি হয়?..
এই বলে হাসতে হাসতে কিয়ারা নিজের ঘরে চলে গেল।
—আবারও ফিরে এলো বিদায়ের মূহূর্ত—
দুপুরের খাবারের পর বাড়ির পরিবেশ ধীরে ধীরে নীরব হতে লাগল। সবাই জানে—এবার কায়রা কে বিদায় দিয়ে আবার শ্বশুরবাড়ি পাঠাতে হবে। এই মুহূর্তটা আনন্দের পর সঙ্গে সঙ্গে চোখে জল এনে দিলো সবার।
মায়ের মমতা, কায়রার
মা মেয়ের হাত ধরে বললেন—
কায়রার মা আবেগ ভরা কণ্ঠে বলে উঠলো…
ঃ- মা, ছোট থেকে কত আদরে, যত্নে বড় করেছি। আজ তুমি অন্যের ঘরে গিয়ে সংসার করবে। মনে রেখো, স্বামীকে ভালোবাসবে, তার পরিবারের সবার প্রতি দায়িত্বশীল থাকবে। এটাই তোমার সৌন্দর্য।
মেয়ের চোখে জল জমে উঠল। কায়রা মাথা নিচু করে মায়ের হাতে চুমু খেয়ে বলল—
ঃ- আম্মু, তুমি শুধু আমাকে তোমার দোয়ায় রেখো। আমি যেন তোমাদের মান-সম্মান রাখতে পারি। আমি তোমার সকল উপদেশ সর্বদা মনে রাখবো এবং মেনে চলবো।
বোনেদের খুনসুটি আর কান্না মেশানো হাসি।
বোনেরা চারপাশে দাঁড়িয়ে কান্নার মাঝেই মজা করতে লাগল—
কিয়ারা কান্নার ভেতর হাসি দিয়ে বলল…
ঃ- দুলাভাই, আমাদের আপুকে কিন্তু সবসময় খুশি রাখতে হবে, না হলে আমরা সবাই আপনার খবর করবো।
কিরণ বলে উঠলো…
ঃ- হ্যাঁ হ্যাঁ, আর মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসতে হবে। না হলে আপনাকেও বাড়ি ছাড়া করে দেওয়া হবে।
সবাই হাসল, আবার কান্না লুকোতে চেষ্টা করল।
কায়রার বাবা জামাইয়ের কাঁধে হাত রেখে বললেন—
ঃ- বাবা, ও তো এখন তোমার অমানত। ওকে ভালো রেখো, আল্লাহর হুকুম মানবে দু’জনে, তাহলেই সংসারে শান্তি বজায় থাকবে।
নাঈম বিনয়ী স্বরে বলল…
ঃ- ইনশাআল্লাহ আব্বু, আপনার দোয়া থাকলে আমি কখনো অবহেলা করব না।
বিদায়ের সময় আর কেউ মন খারাপ না করে পারলো না।
গাড়ি এগিয়ে রাখা হলো। কায়রা গাড়িতে উঠতে গিয়ে বারবার ফিরে তাকাচ্ছিল। মা, ফুফু, চাচী—সবার চোখে জল।
চাচী (কিরণের মা) কণ্ঠ ভিজিয়ে বললেন—
ঃ- আল্লাহ তোমাদের সুখী করুক মা। তোমাদের ঘর আল্লাহর রহমতে ভরে থাকুক।
গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। আঙিনা জুড়ে শুধু চোখের জল আর দোয়ার সুর রয়ে গেল।
---চলবে---
ইনশাআল্লাহ