ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়তিথি

৩য় পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

প্রণয়তিথি

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৩.

সমুদ্র বন্দরে জাহাজ পরিদর্শনে এসেছে ম্যাথিউ। সঙ্গে রয়েছে বেশ কিছু সৈন্যও। এতো সব সৈন্যের ভীড়ে ছদ্মবেশে রয়েছে কাউন্ট ইয়ান আলবার্টও। মূলত পরিচয় গোপনীয়তার ব্যাপারটা মেনে চলতেই এই ব্যবস্থা। তবুও তার পরিচয় গোপন রাখা বেশ কষ্টকর এক ব্যাপার। রাজ্যের প্রজাদের মুখে প্রচলিত আছে যে তাদের কাউন্ট সবুজ নেত্রের অধিকারী। তা-ই ছদ্মবেশে থাকলেও ইয়ানকে সর্বদা ক্লকের হুড মাথায় টেনে দৃষ্টি নত করে চলতে হয়।

শীত গিয়ে বসন্তে আসলেই ইয়ানের সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। শীত তো প্রায় শেষের দিকে। তা-ই সফরের প্রস্তুতি হিসেবে অভিযান জাহাজগুলোর প্রস্তুতি কতদূর তা-ই দেখতে এসেছে আজ সে। ম্যাথিউ যখন প্রত্যেক জাহাজ পরিদর্শন করে নাবিকদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলাপ সাড়তে ব্যস্ত ঠিক সে-ই মুহুর্তে একজন সৈন্য কোথা থেকে দৌড়ে এলো। ম্যাথিউর কানের কাছে মুখ নিয়ে নিচু স্বরে ফিসফিসিয়ে কিছু একটা বলে। সঙ্গে সঙ্গে ম্যাথিউর ভ্রু কুচকে আসে। দূর হতে ইয়ান লক্ষ্য করে ব্যাপারটা। সৈন্যের কথা শেষ হতেই ম্যাথিউ আড়চোখে ইয়ানের দিকে তাকায়। অতি সতর্কতার সহিত তাকে ইশারা করে পিছু পিছু আসতে। জরুরী ইশারাটুকু বুঝিয়ে ম্যাথিউ জাহাজ থেকে নেমে পড়ে। ইয়ানও তাকে অনুসরণ করে পিছু পিছু যায়।

বন্দরের এক প্রান্তে থাকা একটা বিশাল জাহাজের বুকে কিনার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে নাওমি। বুক ভরে নিচ্ছে সমুদ্রের মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস। তার থেকে ক্ষানিকটা দূরেই দাঁড়িয়ে জাহাজের নাবিক এবং ক্লাডিয়াস। নাওমি হুট করেই বিষন্ন হয়ে পড়ে। এ-ই মহান সাম্রাজ্যের প্রিন্সেস হওয়া সত্ত্বেও তার গন্ডি কতটা সীমিত! এ-ই সমুদ্রের তীরে স্থির জাহাজের বুক পর্যন্তই তার সীমানা। এই বিশাল সমুদ্রের বুকে বোধহয় কখনো তার বিচরণ করা হয়ে উঠবে না।

ক্লাডিয়াস দূর হতে লক্ষ্য করে নাওমির বিষন্ন চোখজোড়া। প্রিন্সেসকে সে এ-ই প্রথম লক্ষ্য করছে এমনটা না। এর আগেও বেশ কয়েকবার দেখার সৌভাগ্য হয়েছে তার। সে-ই দেখা থেকেই তার ধারণা হয়েছে, প্রিন্সেস অনেকটা ঝড় প্রকৃতির রমণী। অস্থির, চঞ্চল, বেগবান। তবে এতো সব কিছুর ভীড়েও কিসের কমতি এ-ই প্রিন্সেসের? কি হতে পারে তার বিষন্নতার কারণ?

ক্লাডিয়াসের ভাবনার মাঝেই গটগট পায়ে জাহাজে এসে উপস্থিত হয় ম্যাথিউ। তার সঙ্গে রয়েছে ইয়ান। দু'জনকে লক্ষ্য করতেই ক্লাডিয়াস এবং নাবিক মাথা নত করে সম্মান প্রদর্শন করে। ম্যাথিউ অবশ্য তাদের দিকে তাকালো না। সরাসরি মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“ কার অনুমতি নিয়ে প্রাসাদ থেকে বের হয়েছো তুমি? “

নাওমি ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে জবাব দেয়,

“ কারো অনুমতির প্রয়োজন দেখি নি। সমুদ্র দেখতে ইচ্ছে করছিলেন আমার। তা-ই চলে এসেছি। “

ম্যাথিউ কিছুটা শাসনের সুরে বলে,

“ ইচ্ছে করলেই সে-ই ইচ্ছে অনুযায়ী কাজ করার অনুমতি তোমার নেই নাওমি। তোমাকে একটা শৃঙ্খলাতার মধ্যে দিয়ে নিয়ম নীতি মেনে চলতে হবে। তুমি সে-ই নিয়ম নীতিকে অবজ্ঞা করার ইখতিয়ার রাখো না। “

বাবার এরকম শাসনে নাওমির মন আরো খারাপ হয়ে যায়। সে তাকায় ভাইয়ের দিকে। কিন্তু ইয়ানের চোখ মুখও কঠিন রূপ ধারণ করে আছে। অর্থাৎ সে-ও ম্যাথিউর শাসনের সঙ্গে একমত পোষণ করছে। নাওমি আশাহত হয়। কেউ নেই তাকে বুঝার মতো। ম্যাথিউ চোয়াল শক্ত করে ক্লাডিয়াসকে আদেশ দেয় নাওমিকে প্রাসাদে পৌঁছে দিতে সুরক্ষিত ভাবে। নাওমি প্রতিবাদ করে না। কেবল ডানা কাটা পাখির মতো পরাজিত ভঙ্গিতে হেঁটে প্রস্থান করে। তার পিছু পিছু যায় ক্লাডিয়াস।

__________

দুপুরের খাবারের জন্য রান্না করতে ব্যস্ত জোয়ান্দ্রা। তার পাশেই রান্নাঘরের এককোণে দাঁড়িয়ে আছে মাহশা। মেয়েটাকে আসার পর থেকেই লক্ষ্য করছে জোয়ান্দ্রা। খুবই চুপচাপ এবং ঠান্ডা স্বভাবের। প্রয়োজনের অধিক একটা কথাও বলে না। আর সর্বক্ষণ দৃষ্টি নত করে অন্য জগতে ডুবে থাকে। জোয়ান্দ্রা ধরে নেয় মেয়েটার বোধহয় তার পরিবারের কথা ভেবে মন খারাপ। রান্নার ফাঁকে নীরবতা ভেঙে জোয়ান্দ্রা প্রশ্ন করে,

“ তোমার পরিবার জানে তোমাকে অপহরণ করা হয়েছে? “

মাহশা চোখ তুলে তাকায়। সাজিয়ে রাখা মিথ্যার ঝুলি থেকে একটা মিথ্যা বের করে বলে,

“ আমার পরিবার নেই। এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের কৃতদাসী ছিলাম আমি। গ্রামে বার্বারদের হামলার কথা উনারা জানেন। সে-ই থেকে হয়তো ধারণা করে নিয়েছে আমাকেও অপহরণ করা হয়েছে। তবে আমার অনুপস্থিতিতে উনাদের বিচলিত হওয়ার কথা নয়। “

জোয়ান্দ্রার মন খারাপ হয়। সে চুলার আঁচ কিছুটা কমিয়ে দিয়ে একটা চেয়ার টেনে খাবার টেবিলে বসে। মাহশাকেও ইশারা করে বসতে। মাহশা বসতেই জোয়ান্দ্রা আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করে,

“ কত বছর বয়স থেকে কৃতদাসী হয়ে থাকছো তুমি? “

“ খুব ছোটবেলা থেকেই। বয়স খেয়াল নেই। আমার বয়স বোধহয় নয় দশ ছিলো তখন। “

“ তুমি এতো ভালো রোমানিয়ান ভাষা আয়ত্ত্ব করলে কি করে? “

“ আমি যাদের বাসায় দাসী ছিলাম উনাদের একটা মেয়ে ছিলো। অনেকটা আমার বয়সী হওয়ায় উনার সঙ্গে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। উনি অনেক ভাষা জানতেন। উনার সঙ্গে থাকতে থাকতে আমিও এক দুটো ভাষা রপ্ত করতে পেরেছি। “

জোয়ান্দ্রা কিছুক্ষণ নীরবে পরখ করে মাহশাকে। মেয়েটার রূপ অনেকটা চোখ ধাঁধানো। এই রূপে কোথাও কোমলতা কিংবা নমনীয়তা নেই। বরং একটা তীক্ষ্ণ ভাব পুরো মুখশ্রী জুড়ে। চোখ গুলোও বেশ ডাগর ডাগর দেখতে। গায়ের রঙটা রোমানিয়ান মানুষদের গায়ের রঙের তুলনায় এতটা উজ্জ্বল না হলেও অনেকটা চন্দনের মতো দেখতে। জোয়ান্দ্রার বোধহয় কিছুটা মায়া হলো। সে মাহশাকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“ তুমি খুব সাহসী! জীবন বাঁচানোর জন্য সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়া কোনো সহজ সিদ্ধান্ত নয়। তুমি চিন্তা করো না, জোসেফ রাজ পরিবারের জন্য কাজ করে। সে-ই সূত্রপাতে বন্দরে ওর জানাশোনা আছে ভালো। আমি ওকে বলবো তোমাকে তোমার রাজ্যে ফেরত পাঠানোর জন্য সব ব্যবস্থা করতে। যতদিন না তুমি তোমার রাজ্যে ফিরে যাচ্ছো ততদিন তুমি নিশ্চিন্তে আমার বাসায় থাকতে পারো। এ-ই একা বাসায় তোমার সঙ্গ পেলে আমি বেশ খুশিই হবো। “

জোসেফ রাজ পরিবারের জন্য কাজ করে শুনতেই মাহশার চোখ চিকচিক করে উঠে। চমৎকার এবং মোক্ষম একটা সুযোগ পেয়েছে সে। তাকে যে করেই হোক এই জোসেফের সূত্র ধরে রাজ পরিবারের অন্তরীক্ষে প্রবেশ করতে হবে। তার আগে তাকে জানতে হবে রাজ পরিবার সম্পর্কে। সে-ই অনুসারে তাকে নতুন ছক কষতে হবে।

__________

ঘন জঙ্গলের গহিনে উঁচু উঁচু গাছ পালার ফাঁক ফোকড় দিয়ে দেখা যাচ্ছে খোলা আসমান। সে-ই আসমানের বুকে উড়ে যাচ্ছে এক ঝাক পাখি। বলিষ্ঠ দেহের তীক্ষ্ণ নয়নের যুবরাজ আকাশ পানে তাকিয়ে দেখে সে-ই পাখিদের উড়ে যাওয়া। হুট করে কাছে কোথাও শুকনো পাতা মাড়ানোর শব্দ ভেসে আসতেই যুবরাজ আকাশ পান হতে মনযোগ সরায়। তাকায় নিজের সামনে পূর্ব দিকের পথে। সঙ্গে থাকা সৈন্যদের হাতের ইশারায় তার পিছু আসতে নিষেধ করে সে এগিয়ে যায় শব্দ ভেসে আসা পথ অনুসরণ করে।

সবুজ তৃণর বুকে বিচরণ করছে একটি শাবক হরিণ। দূর হতে নিঃশব্দে সে-ই শাবক হরিণকে অনুসরণ করে যাচ্ছে যুবরাজ বেহজাদ। যদিও হরিণটা এখন স্থির এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, তবুও সে নিজের হাতের তীর এবং ধনুক ব্যবহার করতে আগ্রহ পোষণ করছে না। স্থির শিকারকে ঘায়েল করতে খুব একটা কাঠখড় পোহাতে হয় না। কিন্তু বেহজাদের স্বভাব কাঠখড় পুহিয়ে কাঙ্ক্ষিত জিনিস অর্জন করা। তা-ই সে অপেক্ষা করে হরিণের ছুটে পালানোর চেষ্টা করার।

বেহজাদের অপেক্ষা বেশি দীর্ঘ হয় না। হুট করেই শাবকটা তাকে লক্ষ্য করেই ছুটে পালানোর চেষ্টা করে। সঙ্গে সঙ্গে বেহজাদ দক্ষ ভঙ্গিতে এবং তীব্র গতিতে ধনুক তাক করে ছুড়ে। ঘাতপ্রাপ্ত হরিণটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। শিকারকে ঘায়েল করার খুশি যদিও বেহজাদের চেহারায় দেখা যায় না। উল্টো সে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ফের আকাশের দিকে তাকায়। মনে পড়ে যায় কারো কথা।

পুরনো স্মৃতিতে ডুব দেওয়া বেহজাদের ধ্যান ভাঙে এক সৈনিকের ডাকে,

“ যুবরাজ, আপনি যাকে স্মরণ করেছিলেন সে এসেছে। “

বেহজাদ পিছনে ফিরে তাকায়। দেখে সৈন্যের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা এক মধ্য বয়স্ক পুরুষকে। উঁচু লম্বা দেহের পুরুষের চোখে মুখে নিজ কাজে অভিজ্ঞ হওয়ার ছাপ লক্ষণীয়। যুবরাজ সৈন্যকে প্রস্থানের ইশারা দিতেই সৈন্য সেখান থেকে চলে যায়। বেহজাদ এবার সে-ই পুরুষকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“ দীর্ঘদিন পর দেখা হলো আব্দুল। শুনেছিলাম হুট করেই তুমি আবার নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলে। যাক, অবশেষে ফিরলে! “

দাড়ি গোফ ওয়ালা আব্দুল গম্ভীর স্বরে জবাব দেয়,

“ নিরুদ্দেশ বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোতেই আমি সুখ খুঁজে পাই যুবরাজ। লোক সমাজ আমায় টানে না। নিঃসঙ্গতা এবং নীরবতায় একমাত্র আমি নিজেকে খুঁজে পাই। “

অনেকটা বৈরাগী স্বভাবের এই পুরুষের এসব আধ্যাত্মিক কথা খুব কম মানুষই বুঝতে পারে। বেহজাদ অযথা এসব কথায় সময় অপচয় করে না। সোজা আসে কাজের কথায়,

“ ছোটবেলায় এই জঙ্গলেই একবার আমায় মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার করেছিলে তুমি। মনে আছে? “

“ সে-ই ঘটনা ভুলি কি করে? সেদিন কতটা ভীত ছিলেন আপনি! যদিও এখন নির্ভীক এবং সাহসী যুবরাজে পরিণত হয়েছেন। “

“ সাহস বোধহয় হয়েছি, তবে একদম ভয় পাই না এই ধারণাটা ভুল। আমি ভয় পাই আব্দুল। এই ভয় আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। “

শেষের বাক্যটা বলার সময় বেহজাদের কণ্ঠস্বর কোমল হয়ে আসে। আব্দুলকে এবার মৃদু চিন্তিত দেখালো। সে প্রশ্ন করে,

“ কি হয়েছে যুবরাজ? “

বেহজাদ এবার বলতে শুরু করে,

“ তোমাকে আমি ভরসা করি এটা আলাদা করে বলার কিছু নেই। ভরসা করি বলেই তোমাকে স্মরণ করেছি। তোমাকে একটা দায়িত্ব দিবো আব্দুল। সে-ই দায়িত্ব যেকোনো মূল্যে তোমাকে পাল করতে হবে। আর পুরো ব্যাপারটা শুধু তোমার এবং আমার মধ্যে গোপন থাকবে। তৃতীয় কোনো ব্যক্তি যেনো টের না পায়। বাদশাহও না। তুমি কি রাজি? “

আব্দুল প্রশ্ন করে,

“ দায়িত্বটা কি যুবরাজ? “

__________

নিগূঢ় নিস্তব্ধ প্রকৃতির বুকে আঁধার যেনো তাড়াতাড়িই নেমে এলো। শীতকাল হওয়ায় দিনের আলো খুব তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায় ইদানীং। সারাদিনের সকল দায়িত্বের ভার থেকে বিরতি নিতে গোধূলি লগ্নের এ প্রহরে আনাস্তাসিয়া নিজ কামরা ছেড়ে বারান্দায় এসে রেলিঙ ঘেঁষে দাঁড়ায়। গায়ে ভারী ক্লক জড়ানো থাকলেও শীত মানতে চাইছে না তা।

প্রাসাদের উঁচু এ-ই বারান্দা থেকে আনাস্তাসিয়া একবার পুরো প্রাসাদের আঙিনায় নজর বুলিয়ে নেয়। আঙিনা জুড়ে আগুনের মশাল হাতে টহল দিচ্ছে প্রহরীরা। এতো সুরক্ষা বেষ্টনীতে থাকা সত্ত্বেও আনাস্তাসিয়ার মন বিচলিত খুব। এর পিছনে অবশ্য কারণও আছে।

তার জন্মস্থান গ্রীক। যে-ই রাজ্যে বড়ো হয়েছে সে। রিকার্ডো সাম্রাজ্যের হাল ধরে গ্রীকের সঙ্গে রোমানিয়ার কুটনৈতিক সম্পর্কে যে উন্নতি এনেছিলো, রিকার্ডোর মৃত্যুর পর সে-ই সম্পর্কে হুট করেই ফাটল ধরেছে। সময়ের সঙ্গে সেই ফাটল এখন সাপে নেউলে সম্পর্কে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজ মাতৃভূমির সঙ্গে এই রাজ্যের সম্পর্ক নিয়ে বেশ চিন্তিত আনাস্তাসিয়া। সে যতই চেষ্টা করুক না কেন পরিস্থিতি দিন দিন অবনতির সকল মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। গ্রীক সম্রাটের মনে যে রোমানিয়া দখলের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা রয়েছে তা কারো অজানা নয়। কিন্তু সে-ই দখল করার মাধ্যম হচ্ছে ইয়ানের পতন অথবা মৃত্যু।

কাউন্ট ইয়ানের পতন ঘটানো এতটা সহজ নয়। বিগত বছর গুলোয় আনাস্তাসিয়া নিজ শ্রমে প্রজাদের বিশ্বাস অর্জন করেছে। সম্পূর্ণ সাম্রাজ্যে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না যে ইয়ানের শাসন ব্যবস্থায় যুক্তিগত প্রশ্ন তুলতে পারবে। তাছাড়া গ্রীকদের সামরিক শক্তিও এতটা শক্তিশালী নয় যে যুদ্ধ ঘোষণা করে ইয়ানকে ক্ষমতাচ্যুত করার দুঃসাহস দেখাতে পারবে। সুতরাং তাদের হাতে রোমানিয়া দখলের এখন একটাই উপায়। তা হলো ইয়ানের মৃত্যু।

নিজ সন্তানের মৃত্যু সম্ভাবনা আনাস্তাসিয়ার মাতৃসত্তা নাড়িয়ে দেয়। সে নিজের তরফ থেকে ইয়ানের সুরক্ষার ব্যাপারে সবসময় সচেতন থাকছে। কিন্তু শত্রুর ঘাত কোনদিক থেকে আসে তা বুঝা মুশকিল। ঈশ্বর জানে কোন ষড়যন্ত্রের ফন্দি আঁটছে তারা! আনাস্তাসিয়া চোখ বুজে নেয়। মুক্ত বাতাসে দুঃশ্চিন্তা গুলোকে মিলিয়ে দিয়ে বিড়বিড়িয়ে উঠে,

“ আমি কি করবো রিক? বাবা হিসেবে তুমি তোমার সন্তানকে অভিশপ্ত হওয়ার থেকে বাঁচিয়ে গিয়েছো। কিন্তু মা হিসেবে আমি কি করতে পারি ওকে মৃত্যু ফাঁদ থেকে বাঁচানোর জন্য? “

__________

নিজ কক্ষে আয়নার সামনে বসে নিজের সোনালী চুলগুলোকে চিরুনীর আঁচড়ে আঁচড়াতে ব্যস্ত নাওমি। তার হাত আপনাআপনি চলতে থাকলেও তার মস্তিষ্ক ডুবে কল্পনার ভুবনে। যেখানে সে মুক্ত পাখির ন্যায় ঘোড়ার পিঠে করে জঙ্গলে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তাকে বাধা দেওয়ার মতো কেউ নেই। তবে তার সে-ই স্বাধীনতা উপভোগ করার মতো একজন সঙ্গী আছে। আবছা যার মুখচ্ছবি। তবে দৈহিক গঠন বেশ আকর্ষণীয় এবং সুপুরুষ প্রকৃতির। কল্পনার ভুবনের সে-ই পুরুষ তাকে পিছন থেকে চিৎকার করে বলছে,

“ আমার গোটা সাম্রাজ্যটায় তোমার জন্য কোনো সীমানা টানা হয় নি নাওমি। জঙ্গল, সমুদ্র দূর দূরান্ত পর্যন্ত যা দেখছো সবটা তোমার। তোমাকে কেউ বাধা দিবে না। তুমি নির্ভয়ে এই স্বাধীনতা উপভোগ করো। পথে আসা সকল বাধাকে কাঁটার মতো উগড়ে ফেলার জন্য আমি আছি। “

নাওমির খুব ইচ্ছে হয় এ-ই স্বপ্ন পুরুষের মুখ দেখার। কিন্তু তার সৌভাগ্য হয় না। কল্পনার জগতে সে-ই পুরুষ তার কাছে ধরা দেয় না। উল্টো হুট করে দরজা খোলার শব্দে তার কল্পনার জগৎটাই হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। হুশ ফিরতেই নাওমি ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকায়। সঙ্গে সঙ্গে তার মুখে হাসি ফুটে উঠে। উচ্ছ্বসিত স্বরে বলে,

“ ক্যামি! কখন এসেছো তুমি? “

রিনরিনে ভঙ্গিতে বারান্দার দিকে যেতে যেতে ক্যামেলিয়া জবাব দেয়,

“ সবে এলাম। বাবা, ক্রিয়াস আমাকে না জানিয়ে হুট করে কোথাও গিয়েছে। প্রাসাদে নেকড়ে পালদের সঙ্গে একা মন টিকছিল না। তাই এখানে চলে এলাম। অ্যানার সঙ্গে দেখা করে তোর কাছে এলাম। “

বলতে বলতে ক্যামেলিয়া বারান্দায় চলে যায়। চোখের পলকেই এক লাফে রেলিঙে উঠে পা ঝুলিয়ে বসে পড়ে। তার পিছু পিছু আসা নাওমি বেশ মুগ্ধ হয় এই দৃশ্য দেখে। ক্ষানিকটা আফসোসের সুরে বলে,

“ তুমি কি সৌভাগ্যবতী! আলফা কোনো কিছু নিয়ে তোমাকে নিষেধাজ্ঞা দেয় না। তোমার চালচলন, জীবন সবকিছুই প্রকৃত প্রিন্সেসদের মতো। আর আমাকে দেখো, সারাক্ষণ সবাই পায়ে শিকল পরিয়ে প্রাসাদে বেধে রাখতে চায়। প্রিন্সেস কম নিজেকে কয়েদি বেশি মনে হয় আমার। “

নাওমির বারান্দার রেলিঙে বসে ক্যামেলিয়া দূরদর্শী দৃষ্টি মেলে কাউন্টের কক্ষের বিশাল বারান্দার দিকে তাকিয়ে ছিলো। যেখানটায় ইয়ানের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলাপে মশগুল প্রধান সেনাপতি কেভ। দু'জনেরই হাতে তরল পানীয়র গ্লাস। সে-ই গ্লাসে থাকা লাল রঙের বস্তুটা যে মদ্য তা বুঝতে অসুবিধা হয় না ক্যামেলিয়ার। সে লক্ষ্য করে কেভের কথার মাঝে মাঝে মদ্যপান করা। কিন্তু নাওমির কথা শুনতেই সে ঘাড় ঘুরিয়ে ফিরে তাকায়। ভ্রু কুচকে বলে,

“ তোর ভালোর জন্যই তোকে প্রাসাদের গন্ডির ভেতর থাকতে বলা হয়। দিনদিন যে মাত্রায় সুন্দরী হচ্ছিস, রাজ্যের পুরুষদের তো মাথা ঘুরিয়ে দিবি। সব পুরুষরা তোকে দেখে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেলে রাজ্যের বিশেষ ক্ষতি হয়ে যাবে। “

নাওমি বিরক্তি নিয়ে বলে,

“ উফ ক্যামি! মজা করছি না আমি। কতই না ভালো হতো যদি আমিও তোমার মতো নেকড়ে হতাম। কেউ আমাকে বাধা দেওয়ার সাহস করতো না। রাত্রি বেলায়ও আমি জঙ্গলের গহীনে জোনাকির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারতাম। “

ক্যামেলিয়া কিছু না বলে আবার তাকায় দক্ষিণ দিকের উঁচু বারান্দাটার দিকে। হুট করেই কেভের দৃষ্টিও তার দিকে স্থির হয়। ক্যামেলিয়ার ঠোঁটের কোণে অস্পষ্ট হাসি ফুটে উঠে। সে কেভের চোখে চোখ রেখেই নাওমিকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“ জোনাকি দেখতে চাস তো তুই? “

নাওমি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়,

“ হ্যাঁ। “

ক্যামেলিয়া বলে,

“ কক্ষে গিয়ে তৈরী হয়ে নে। নিশী অভিযানে বের হবো আমরা দু'জন। কেউ যেনো না জানে। “

নাওমি প্রথমে বিশ্বাস করতে পারলো না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। অতঃপর হুট করেই উল্লাসে চিৎকার করে দৌড়ে নিজের কক্ষে চলে যায়। ক্যামেলিয়া তখনও কেভকে দেখছে। ইয়ান ইতিমধ্যে বারান্দা থেকে প্রস্থান করেছে। কেভ ধীরে ধীরে বারান্দার এককোণে এগিয়ে এসে দাঁড়ায়। ক্যামেলিয়াকে লক্ষ্য করেই এক চুমুকে বাকিটুকু পানীয় শেষ করে চরম অস্বস্তিতে সেখান থেকে প্রস্থান করে। দূর হতে সে-ই দৃশ্য দেখে ক্যামেলিয়া রহস্যময় ভঙ্গিতে হেসে উঠে।

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন