প্রণয়তিথি
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৪.
নিজ কামরায় টেবিলের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা দলিলপত্র গুলো চেয়ারে বসে মনযোগী দৃষ্টি মেলে দেখছে কাউন্ট ইয়ান। তার সামনে দাঁড়িয়ে প্রধান সেনাপতি কেভ। ইয়ান হুট করে প্রশ্ন করে বসে,
“ তোমার কি মতামত কেভ? রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধিতে অমত প্রকাশ করা কি আমাকে একজন অযোগ্য শাসক হিসেবে প্রমাণ করে? আমি কি সত্যিই অযোগ্য? “
আকস্মিক প্রশ্নে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে সেনাপতি কেভ। কাউন্ট সাধারণত এধরণের প্রশ্ন কখনো তাকে করে না। তা-ই কি বলা উচিত সে বুঝে উঠতে পারছে না। ইয়ান নিজেই বলতে থাকে,
“ প্রজাদের আকাঙ্ক্ষা তাদের কাউন্ট আরো রাজ্য দখল করে রোমানিয়াকে একটি শক্তিশালী রাজ্যে পরিণত করবে। কিন্তু আমি তাদের সঙ্গে একমত নই। নিজের যতটুকু ভূমি আছে ওতটুকু দক্ষতা এবং ন্যায়ের সঙ্গে শাসন করতে পারলেই আমি সন্তুষ্ট। “
কেভ এবার বলে উঠে,
“ আপনি এই সাম্রাজ্যের কাউন্ট। রাজ্যের মঙ্গল কিসে সেটা আপনি অবশ্যই আমাদের থেকে ভালো বুঝেন। আমার আপনার যোগ্যতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, আশা করছি প্রজাদেরও আপনার প্রতি আস্থা আছে। “
ইয়ান কিছু বলতে নিবে এমন সময়ই ফট করে তার কামরার দরজা খুলে যায়। কক্ষে প্রবেশ করে চিন্তিত আনাস্তাসিয়া। রাজমাতাকে দেখতেই কেভ দ্রুত মাথা নত করে ইয়ানের কাছে প্রস্থানের অনুমতি চায়। তবে তার পূর্বেই আনাস্তাসিয়া বলে উঠে,
“ ক্যামি আর নাওমি প্রাসাদে নেই ইয়ান। “
ইয়ান ভ্রু কুচকে তাকিয়ে বলে,
“ প্রাসাদে নেই মানে? আর ক্যামেলিয়া? ও কখন এলো? “
“ ক্যামি সন্ধ্যার পর পরই প্রাসাদে এসেছিলো। আমার সঙ্গে দেখা করে নাওমির কাছে যায়। কিন্তু এখন দু'জনের একজনও প্রাসাদে নেই। তন্নতন্ন করে পুরো প্রাসাদ খুঁজেছে দাসীরা। প্রহরীরা প্রাসাদের পেছনের দরজা খোলা অবস্থায় পেয়েছে। ঈশ্বর জানে এদের মাথায় কি চলছে! এই রাতে করে দু'জন সকলের চোখে ধূলো ছুড়ে জঙ্গলে গিয়েছে কি করতে, কে জানে! “
প্রধান সেনাপতির কপালেও চিন্তার ভাজ ফুটে উঠে। লুনার জঙ্গল ঘুরে দেখার ইচ্ছে থাকলে নিজে একা যেতো। অহেতুক প্রিন্সেসকেও কেন সঙ্গে করে নিয়ে গেলো? কোনো বিপদ হলে? ক্যামেলিয়া না-হয় নিজের শক্তি ব্যবহার করে আত্মরক্ষা করতে পারবে। কিন্তু প্রিন্সেস নাওমি তো মানুষ! উনার কিছু হয়ে গেলে সেটার জবাবদিহিতা কি করে করবে?
আনাস্তাসিয়া উদ্বেগ নিয়ে ছেলের হাত ধরে বলে,
“ বোনদের খুঁজে আনো ইয়ান। দু'জনকেই সুরক্ষিত অবস্থায় প্রাসাদে ফিরিয়ে আনো। ওদের কিছু হলে ওদের দু'জনের পিতাকে আমি কি জবাব দিবো? ম্যাথউ ইতিমধ্যে বেরিয়ে পড়েছে নাওমিকে খুঁজতে। আর আরোণ ভাই তো এ-ই ব্যাপারে কিছু জানেই না। “
ইয়ান মা'কে আশ্বাস দিয়ে বলে,
“ আমি যাচ্ছি। অযথা চিন্তা করো না। কিচ্ছু হবে না। ভোরের আলো ফোটার আগেই দু'জনকে তুমি প্রাসাদে পাবে। “
বলেই ইয়ান কেভকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। আনাস্তাসিয়া অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো ছেলের যাওয়ার পানে। কি করবে সে? একদিকে ছেলের জন্য দুঃশ্চিন্তা, অপরদিকে মেয়ে দুটোর নিরাপদে ফিরে আসার চিন্তা! এতো চিন্তার ভার আর নিতে পারে না সে। খুব ক্লান্ত লাগে নিজেকে।
__________
ক্যামেলিয়ার সহায়তায় প্রাসাদে সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে তার সঙ্গে বেরিয়ে এসেছে নাওমি। চোখ মুখ উপচে তার খুশির ঝলক দেখা যাচ্ছে। সকলের চোখে ধূলো ছুড়ে সঙ্গে করে একটা ঘোড়াও নিয়ে এসেছে সে। গহীন জঙ্গলের বুকে মুক্ত পাখির মতো ঘোড়ার পিঠে করে ছুটছে সে। তার পাশেই ঘোড়ার গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজের মানব রূপ বদলে ছুটে চলেছে এক নেকড়ে কন্যা।
নাওমি উজ্জ্বল নয়নে দেখে মাথার উপরে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ রাশির মধ্যে দিয়ে উঁকি দেওয়া চাঁদটাকে। প্রাসাদে তার কক্ষের বারান্দা থেকে এই চাঁদকে দেখতে কতটা শান্ত এবং স্থির মনে হতো সবসময়। অথচ এ-ই মুহুর্তে এই চাঁদও যেনো ছুটে চলেছে তার সঙ্গে! রাতের অন্ধকারে কি অপরূপ সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এ-ই গহীন জঙ্গলের অভ্যন্তরে!
হুট করেই গহীন জঙ্গলের একটা নির্দিষ্ট জায়গায় এসে নাওমি ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে স্থির দাঁড় করালো। তার দেখাদেখি নেকড়ে রূপী ক্যামেলিয়াও থেমে গেলো। নাওমি উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে দেখতে থাকলো চোখের সামনে স্পষ্ট দৃশ্যটা। ঘন অন্ধকার জঙ্গলের এ-ই জায়গাটুকু জোনাকি পোকার কৃতিত্বে টিমটিমে আলোয় আলোকিত হয়ে আছে। কি চমৎকার দেখাচ্ছে চারিপাশটা! অপার্থিব এ-ই সৌন্দর্যের সাক্ষী হতে পেরে খুশিতে আত্মহারা নাওমি ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে গেলো। দৌড়ে এগিয়ে গিয়ে সবুজ আলোর উৎস গুলোকে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টায় মত্ত হলো।
ক্যামেলিয়া একটা হিংস্র গর্জন তুলে নিজের নেকড়ে রূপ ছেড়ে মানব রূপে ফেরত এলো। দেখলো নাওমির খুশির ঝলক। নীরবে হাসলো অতঃপর। বাবা যখন প্রথমবার তাকে রাতে জঙ্গলের গহীনে লুকায়িত সৌন্দর্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিল তখন সে-ও এরকমই আনন্দিত হয়েছিলো। অবশ্য সেটা বহু পুরনো ঘটনা। নিজের নেকড়ে সত্তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রশিক্ষণের জন্য ছোটবেলা থেকেই এ-ই জঙ্গলের মাঝে বাবার সঙ্গে বের হওয়া হতো তার। তা-ই জোনাকি পোকার এ-ই দৃশ্য দেখে একপ্রকার অভ্যস্তই সে বলা যায়।
শান্ত স্থির ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা ঘোড়াটাকে হুট করেই বিচলিত দেখা গেলো। কিছু বুঝে উঠার পূর্বেই সে একছুটে দিক বেদিক ভুলে দৌড়ে চলে গেলো। আকস্মিক হ্রেষাধ্বনি শুনে নাওমি এবং ক্যামেলিয়া দু'জনেই চমকে তাকালো। হুট করে ঘোড়ার এরকম আচরণের কারণ প্রথমে দু-জনের একজনও বুঝে উঠতে না পারলেও, যখনই তারা মাটিতে ফণা তুলে বসে থাকা বিষধর সাপটিকে দেখলো তখনই বুঝে গেলো ঘোড়ার ভীত হওয়ার কারণ। নাওমি আতংকিত হয়ে পড়লো। সম্পূর্ণ দুনিয়ায় এ-ই একটি প্রাণীকে সে সবথেকে ভয় পায়। বিচ্ছিরি দেখতে এই প্রাণীর নাম শুনলেও তার গা গুলিয়ে আসে।
ক্যামেলিয়া নাওমির আতংকের ব্যাপারটা জানে বলেই চোখের পলকে সে সাপটাকে দু'হাতের সাহায্যে ধরে টেনে ছিন্ন বিছিন্ন করে দূরে ছুড়ে ফেললো। অতঃপর নাওমির দিকে তাকিয়ে বললো,
“ তুই এখানেই অপেক্ষা কর। ঘোড়া বোধহয় বেশি দূর যায় নি। আমি এক্ষুণি ধরে নিয়ে আসছি। কোথাও যাবি না কিন্তু। আমি এলে একসঙ্গে ফিরবো। “
কথাটুকু শেষ করে ক্যামেলিয়া আর অপেক্ষা করে না। তীব্র গতিতে একছুটে চলে যায় ঘোড়া যেদিকে চলে গিয়েছে সে-ই পথ অনুসরণ করে। নাওমি একা দাঁড়িয়ে রয় আপন জায়গায়। তার চোখের সামনে ভাসছে ক্যামেলিয়ার সাপের দেহকে ছিন্নভিন্ন করার বীভৎস দৃশ্য। মাথাটা কেমন ভনভন করছে এই দৃশ্য দেখার পর থেকেই। পেট গুলিয়ে বমিও পাচ্ছে। সে অন্যদিকে ঘুরে দাঁড়ায়। অপেক্ষা করতে থাকে ক্যামির।
__________
বাতাসের বেগে ছুটে বেশ কিছুদূর যেতেই ঘোড়ার নাগাল পায় ক্যামেলিয়া। সে এক লাফে ঘোড়ার পিঠে বসে সম্পূর্ণ বল প্রয়োগ করে লাগাম টেনে ঘোড়াকে থামায়। বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে হেসে বলে,
“ ভীতু কোথাকার! আমাকে ভয় পাস না কিন্তু সামান্য সাপকে ভয় পাস। ও-ই সাপ কি আমার থেকে বেশি ক্ষমতাধর? “
ঘোড়াকে শান্ত করে ক্যামেলিয়া ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হতে নিলেই হুট করে একটা বিকট শব্দ হয়। ক্যামেলিয়া ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ে। মাটিতে পড়ে ছটফট করতে থাকে। মনুষ্য স্বর ছেড়ে হিংস্র স্বরে ব্যথায় গোঙাতে থাকে। শিয়রে কারো উপস্থিতি টের পেতেই ব্যথাতুর চোখ মেলে তাকায় সে। দেখতে পায় একজন পুরুষকে। তার দিকে রাইফেল তাক করে দাঁড়িয়ে। চোখে মুখে বর্বরতার ছাপ স্পষ্ট। ক্যামেলিয়া বুঝতে পারে রাইফেল থেকে তাক করা গুলিটা বোধহয় রুপার তৈরী ছিলো। এজন্যই তার এতটা যন্ত্রণা হচ্ছে। কিন্তু তাকে ঘায়েল করার পিছনে লোকটার উদ্দেশ্য কি? কি করতে চাইছে ক্যামেলিয়ার সঙ্গে?
ক্যামেলিয়া সর্বোচ্চ চেষ্টা করে নিজের শক্তি ব্যবহার করার। কিন্তু সে সক্ষম হয় না। বুলেটের প্রভাবে বেশ দূর্বল হয়ে পড়েছে। অসহনীয় ব্যথা ইতিমধ্যে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে। উপরে দৃঢ়ভাব বজিয়ে রাখলেও মনে মনে ক্যামেলিয়া আর্তনাদ করে,
“ বাবা! আমি প্রতিরোধ করতে পারছি না। আমি আত্মরক্ষা করতে পারছি না। “
__________
দূর থেকে হুট করে ভেসে আসা বিকট শব্দে নাওমি চমকায়। চমকে আশেপাশে তাকায়। কিসের শব্দ হলো এটা? ক্যামি? ক্যামির কি কোনো বিপদ হয়েছে? প্রশ্নটা মাথায় উঁকি দিতেই নাওমি ভীত হলো। মনে মনে নিজেকে বুঝ দিলো ক্যামির আবার কি হবে? নেকড়ের শক্তি আছে ক্যামির কাছে। সাধারণ মানুষ নয় সে, আলফার কন্যা সে। তার কে কি-ই বা ক্ষতি করবে?
মনে মনে নিজেকে এসব বুঝ দিলেও এ-ই মুহুর্তে নাওমির সত্যিই ভয় করছে। তার ভয়ের মাত্রা বাড়িয়ে দিতেই বোধহয় হুট করে সামনের গাছ থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় একটা চিকন সাপ মাথা বের করে। এইবার আর নাওমি স্থির থাকতে পারে না। সে ভয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উল্টো দিকে ঘুরে দৌড়ানো শুরু করে।
দিক বেদিক হারিয়ে দৌড়াতে ব্যস্ত নাওমি হুট করে ঘোড়ার খুড়ের শব্দ শুনতে পেয়ে থেমে যায়। ভীত দৃষ্টি মেলে সামনে তাকাতেই দেখতে পায় ঘোড়ায় করে কেউ একজন এদিকেই ছুটে আসছে। রাতের বেলা হওয়ায় দূর থেকে মানুষটাকে স্পষ্ট দেখতে পায় না নাওমি৷ কিন্তু ধীরে ধীরে ঘোড়াটা কাছাকাছি আসতেই নাওমি স্পষ্ট দেখতে পেলো মানুষটাকে। পরিচিত মুখ দেখতেই দৌড়ে এগিয়ে গেলো।
নাওমিকে ছুটে আসতে দেখেই ক্লাডিয়াস এক লাফে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামলো। এগিয়ে গিয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে প্রশ্ন করলো,
“ প্রিন্সেস, ঠিক আছেন আপনি? “
নাওমি হাপাতে হাপাতে জবাব দেয়,
“ হ্যাঁ, ঠিক আছি। কিন্তু ক্যামি… একটু আগে বিকট একটা শব্দ হয়েছে। কিসের শব্দ আমার জানা নেই। ক্যামি আমার ঘোড়াকে খুঁজতে গিয়েছিলো, কিন্তু এখনো ফিরে নি। “
ক্লাডিয়াস কিছু বলবে তার পূর্বেই আরো কিছু ঘোড়া এসে উপস্থিত হলো সেখানে। ঘোড়ার পিঠে বসা পুরুষদের দেখেই নাওমি ভয়ে একটা ঢোক গিললো। প্রত্যেকের চেহারায় কি ভয়ংকর রাগের ছাপ! ম্যাথিউ মেয়ের কাছে এসে ধমকে উঠলো,
“ এতটা বেপরোয়া হয়ে গিয়েছো তুমি? প্রাসাদ থেকে পালানোর দুঃসাহস দেখাও। তোমার এই স্পর্ধা রুখতে কি তোমাকে কামরাবন্দী করতে হবে আমার? “
বাবার এরকম রূঢ় কথায় নাওমির চোখ ছলছল করে উঠে। এতো গুলো সৈন্যের সামনে বাবা তাকে এরকম করে বলতে পারলো? অভিমানে নাওমির বুক ভরে উঠে। তখনই আরো দুটো ঘোড়া এসে সেখানে উপস্থিত হয়। কাউন্ট ইয়ানকে দেখতেই সকল সৈন্য মাথা নত করে এক হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে। ইয়ান দ্রুত এসে নাওমিকে আগলে ধরে তার উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করে,
“ ঠিক আছিস তুই? “
নাওমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানায়। ইয়ান ব্যস্ত চোখে চারিপাশে তাকায়৷ কাঙ্ক্ষিত আরেকজনকে অনুপস্থিত দেখতেই সে প্রশ্ন করে,
“ ক্যামি? ক্যামি কোথায়? তোর সঙ্গে ছিলো না? “
নাওমি ইয়ানকে পুরো ঘটনা খুলে বলতেই ইয়ানের কপালে চিন্তার ভাজ পড়ে। সে দ্রুত ম্যাথিউকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“ আপনি সকল সৈন্যসহ নাওমিকে প্রাসাদে নিয়ে যান। আমরা ক্যামির খোঁজ করছি। ওকে নিয়ে ফিরবো। “
ম্যাথিউ উদ্বেগ নিয়ে বলে,
“ প্রিন্সেসকে সৈন্যরা প্রাসাদে পৌঁছে দিবে। আপনাকে ফেলে যাওয়া সম্ভব নয় আমার পক্ষে। আপনার মা আপনার খোঁজ করবে। “
ইয়ান বলে,
“ আমার চিন্তা করবেন না। কিছু হবে না আমার। জোসেফ, কেভ, ক্লাডিয়াস থাকবে আমার সঙ্গে। ওরাই যথেষ্ট হবে ক্যামিকে খোঁজার জন্য। আপনি নাওমিকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত প্রাসাদে ফিরুন। “
ম্যাথিউ দ্বিধায় পড়ে যায়। সে বুঝতে পারছে কেন ইয়ান বাকি সৈন্যদের নিয়ে ফিরে যাওয়ার কথা বলছে। জোসেফের পরিবার এবং প্রধান সেনাপতি কেভ ব্যতীত আর কেউ এখানে ক্যামেলিয়ার নেকড়ে সত্তা সম্পর্কে অবগত নয়। সেজন্যই ইয়ান এই সাবধানতা পথ অবলম্বন করছে। তবে ইয়ানকেও এভাবে ফেলে যেতে মন সায় দিচ্ছে না ম্যাথিউর। ভাইয়ের আমানতের জীবনও তার কাছে নিজের সন্তানের মতোই মূল্যবান। এ কেমন দ্বিধা!
ইয়ান আবারও অনুরোধ করলে ম্যাথিউ অগ্যতা রাজি হয়। মেয়ে এবং বাকি সৈন্যদের নিয়ে ফিরে যায় সে। ইয়ান সহ বাকিরা আবারও ঘোড়ার পিঠে উঠে বসে ক্যামেলিয়ার খোঁজ করতে। স্থির দাঁড়িয়ে রয় কেবল কেভ। যেনো গভীর কোনো কল্পনায় বিভোর সে। ইয়ান ডাকতেই তার সম্বিত ফিরে। দ্রুত ঘোড়ার পিঠে উঠে বসে নেকড়ে পালের আলফার মেয়ের খোঁজের উদ্দেশ্যে।
__________
প্রকৃত যেনো নিষ্প্রাণ আজ। কক্ষ ভর্তি মোমবাতির আলোয় আলোকিত গোটা কামরাটা। যুবরাজ বেহজাদ ডিভান আকৃতির একটা গদির উপর বসে বই পড়তে ব্যস্ত। তার সামনে থাকা টেবিলের উপর বিশাল থালিতে সুসজ্জিত রয়েছে নানান ফলমূল।
আচানক কামরার দরজায় কড়াঘাতের শব্দ হতেই বেহজাদ বইয়ের পৃষ্ঠায় দৃষ্টি স্থির রেখে গম্ভীর স্বরে বলে উঠে,
“ এসো। “
দরজা খুলে যায়। কক্ষে প্রবেশ করে এক মধ্যবয়স্ক নারী। দেহ জুড়ে বিভিন্ন ধরনের অলংকার তার। পরিহিত মখমলের কাপড় এবং বেশভূষা বলে দিচ্ছেন তিনি কোনো রাজ্যের সম্রাজ্ঞী। উনাকে দেখতেই বেহজাদ বই রেখে উঠে দাঁড়ায়। সম্মানের সহিত সালাম দিয়ে বলেন,
“ স্বাগতম বেগমজান। “
বাদশা বেগম আয়েশা একগাল হেসে ছেলের গালে হাত রাখেন। আপ্লুত স্বরে বলে,
“ আজ সভায় তোমার পিতার সঙ্গে তুমি উপস্থিত ছিলে, নিজের চমৎকার বিচক্ষণতা এবং বিবেচনার প্রমাণ দিয়েছো। মন্ত্রীরা সকলে তোমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সাম্রাজ্যের উত্তরসূরী হিসেবে এভাবেই প্রতিটা পদে পদে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে যাবে তুমি। “
বেহজাদ ম্লান স্বরে বলে,
“ ও-ই সিংহাসনের উত্তরসূরী কি আদতেই আমি? “
ছেলের এহেন কথায় আয়েশা ভড়কে যায়। দু'হাতে ছেলের বাহু ধরে আশ্বস্ত করে বলে,
“ বেহজাদ! বাবা আমার! মহান সৃষ্টিকর্তা তোমাকে এ-ই মহান সাম্রাজ্যের উত্তরসূরী হিসেবে নিযুক্ত করেছে। তা-ই তোমার মাথায় থাকা অবান্তর ভাবনা গুলোকে প্রশ্রয় দিও না। বরং প্রস্তুতি নাও, তোমার পিতার পর এই সবটা তোমার হবে। “
বেহজাদ এবার কিছুটা অস্থির স্বরে বলে,
“ অবান্তর ভাবনা বলছেন, বেগমজান? আমার বোন যেখানে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে হাঁটছে, সেখানে আমি নিজের সিংহাসনে বসার প্রস্তুতি নিবো? রাজ্যের উত্তরসূরী হিসেবে বোনের জায়গায় কি এই লক্ষ্য পূরণে আমার যাওয়া উচিত ছিলো না? “
আয়েশা এবার ক্রোধ নিয়ে বলে উঠে,
“ তাহলে কি করতে তুমি? জেনে বুঝে আগুনে ঝাপ দিতে? ভুলে যেও না আমাদের একমাত্র আশার আলো তুমি। তোমার সুরক্ষার থেকে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নয়। রাজকুমারীর জীবনও নয়। “
নিজের কথা শেষ করে আয়েশা কক্ষ থেকে প্রস্থান করতে উদ্ধুদ্ধ হতেই বেহজাদ থমথমে স্বরে শুধায়,
“ মাহশা পরিচয়ে রোমানিয়া রাজ্যে আশ্রয় নেওয়া রাজকুমারী জেইলান যদি আপনার নিজের সন্তান হতো, তবুও কি আপনি একই কথা বলতেন? তখনও কি ওর জীবনের কোনো মূল্য থাকতো না আপনার কাছে? নিজের সন্তানকে হায়েনাদের রাজ্যে পাঠাতে বুক কাঁপতো না আপনার? “
ছেলের এহেন প্রশ্নে বাদশা বেগমের পা জোড়া থেমে যায়। খুঁজে পায় না কোনো উত্তর। খোঁজার প্রয়োজনও বোধ করে না। সে কেবল এইটুকুই জানে যে, নিজের সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য এরকম হাজারটা জেইলানকে তিনি কুরবান করতে রাজি। রাজ্যের ভবিষ্যতের থেকে এক রাজকুমারীর জীবন তাৎপর্যপূর্ণ নয় কখনোই।
চলবে…