ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়তিথি

৫ম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

প্রণয়তিথি

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৫.

ভোরের প্রথম প্রহর তখন। রাজপ্রাসাদে পা রাখতেই আরোণ খোঁজ করলো নিজের মেয়ের। শেষ রাতে ক্রিয়াসের সঙ্গে নিজ প্রাসাদে ফিরেই সে খবর পায় ক্যামেলিয়া রাজধানীতে এসেছে। তা-ই মেয়ে সহি সালামতে পৌঁছেছে কি-না সেটা নিশ্চিত হতেই এসেছে সে। তবে প্রাসাদে পা রাখতেই তার মনে হলো কিছু একটা ঠিক নেই। নিজের মনের ডাককে পাত্তা না দিয়ে আরোণ হলরুমে উপস্থিত এক দাসীকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো,

“ ক্যামেলিয়া কোথায়? কক্ষে ঘুমোচ্ছে? রাতে বেশি দেরি করে এসেছিল ও? “

দাসী কিছু বলতে নিবে তার আগেই সিঁড়ির কাছ থেকে ভেসে আসে আনাস্তাসিয়ার স্বর,

“ আরোণ ভাই। “

আরোণ তাকাতেই লক্ষ্য করে নির্ঘুম চোখে দাঁড়িয়ে থাকা আনাস্তাসিয়াকে। সে চমকায়। আনাস্তাসিয়ার চিন্তিত এবং বিধ্বস্ত মুখশ্রী বলে দিচ্ছে কিছু একটা ঠিক নেই। আরোণ কিছু বলবে তার পূর্বেই আনাস্তাসিয়া বলে উঠে,

“ উপরে আসুন আপনি। কক্ষে গিয়ে একান্তে কথা বলছি। “

আরোণ বাড়তি কোনো প্রশ্ন করে না। দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উঠে আনাস্তাসিয়ার সঙ্গে একটা কক্ষে প্রবেশ করে। কক্ষে পা রাখতেই সে আরেক দফা চমকায়। কক্ষের এককোণে একটা টেবিলের সামনে বিচলিত ম্যাথিউ দাঁড়িয়ে। পাশেই এক ডিভানে স্যাফিরা বসে। তার কপালেও চিন্তার ভাজ। আরোণ এবার জিজ্ঞেস করে বসে,

“ কি হয়েছে? “

আনাস্তাসিয়া ভয়ে কিছু বলে উঠতে পারে না। তা-ই দুঃসংবাদটা ম্যাথিউই দেয়,

“ ক্যামেলিয়া এবং নাওমি গতরাতে প্রাসাদে কাউকে কিছু না জানিয়ে জঙ্গলে যায়। আমরা এ-ই ব্যাপারে জানতেই সঙ্গে সঙ্গে ওদের পিছু যাই। নাওমিকে উদ্ধার সম্ভব হলেও, ক্যামেলিয়াকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় নি। “

আরোণ শুনলো সবটা। অদ্ভুৎ ভাবে শান্ত রইলো সে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো ম্যাথিউর দিকে। আনাস্তাসিয়া ভীত স্বরে ডাকে,

“ ভাই? “

আরোণ অদ্ভুৎ ভাবে তাকায় আনাস্তাসিয়ার দিকে। বিস্মিত স্বরে প্রশ্ন করে,

“ পাওয়া যায় নি মানে? মেয়ে কোথায় আমার? ক্যামি কোথায়? “

সারারাত ধরে ক্যামেলিয়ার চিন্তায় আনাস্তাসিয়া এভাবেই ভেঙে পড়েছিলো। তবুও উপরে উপরে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছিলো। কিন্তু এ-ই পর্যায়ে সে আর কান্না চেপে রাখতে পারে না। তার দু চোখ ছাপিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। কাপা স্বরে বলে,

“ ক্যামিকে পাওয়া যাবে। ইয়ান খুঁজছে ওকে। ওয়াদা করেছে বোনকে নিয়েই ফিরবে ও। “

আরোণ হুট করেই রাগে ফুসে উঠে। বাজখাঁই স্বরে চেঁচিয়ে উঠে,

“ আমার মেয়েকে সারারাত ধরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, আর এই খবর আমাকে এখন জানানো হচ্ছে? “

ম্যাথিউ আরোণকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে বলে,

“ সবাই মিলে খুঁজছে ওকে, তুমি চিন্তা করো না। “

আরোণ আবারও একই স্বরে বলে উঠে,

“ চিন্তা করবো না? ক্যামির জায়গায় নাওমি হলেও কি তুমি একই কথা বলতে? থাকতে পারতে শান্ত? ভুল আমারই। আমার ক্যামিকে নিজের চোখের আড়াল হতে দেওয়া উচিত হয় নি। আমার মেয়ে যে সবার আওতায় সুরক্ষিত না এইটা আমার আগেই বোঝা উচিত ছিলো। “

আরোণের কথায় খোঁচার ছাপ স্পষ্ট। আনাস্তাসিয়া ছলছল নয়নে তাকিয়ে বলে,

“ ক্যামি আমারও কিছু হয়, ভাই। আমারও ওর সাথে সম্পর্ক আছে। আমার বোনের মেয়ে ও। “

আরোণ আনাস্তাসিয়ার কথাগুলো উপেক্ষা করে ত্রস্ত পায়ে কামরা ছেড়ে বেরিয়ে যায়। তার কাছে এ-ই মুহুর্তে নিজের মেয়েকে খুঁজে বের করা বেশি জরুরী। সবার জীবনে কেউ না কেউ আছে। কিন্তু তার জীবনে তো তার মেয়ে বাদে কেউ নেই। তার নিজস্ব অস্তিত্বই এখনো বহাল আছে শুধুমাত্র ক্যামেলিয়ার কারণে।

আনাস্তাসিয়া নিজ জায়গায় দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। হাঁটু গেড়ে বসে পড়তে নিলেই ম্যাথিউ এসে সামলায় তাকে। উদগ্রীব স্বরে বলে,

“ নিজেকে সামলাও। কিছু হবে না। ক্যামেলিয়াকে পাওয়া যাবে। “

আনাস্তাসিয়া অশ্রুসিক্ত স্বরে বলে,

“ আমি আর পারছি না। রাজ্য, ইয়ান, ক্যামি এতো দুঃশ্চিন্তার ভার আমি আর নিতে পারছি না। এসবের কি কোনো ইতি নেই? “

ম্যাথিউ কোনো উত্তর দিতে পারে না। তার মায়া হয় কেবল। সে-তো এতো বছর ধরে দেখে আসছে এ-ই নারীকে। কিভাবে সবার ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে! একটা মানুষ আর কতটা সহ্য করতে পারে? এ-ই নারী কেনো জীবনের দুটো দিন একটু শান্তিতে কাটাতে পারে না?

দূরে ডিভানের উপর বসে থাকা স্যাফিরা লক্ষ্য করে এ-ই দৃশ্য। দেখে নিজের স্বামীর দৃষ্টি। যে-ই দৃষ্টিতে মিশে আছে স্যাফিরার কাঙ্ক্ষিত অনুভূতি। যে-ই অনুভূতি সে সবসময় ম্যাথিউর চোখে খুঁজে এসেছে। কিন্তু স্যাফিরা ভালো করেই জানে যে ম্যাথউ তাকে স্ত্রী এবং নিজের সন্তানের মা হিসেবে ভালো বাসলেও কখনো নিজের মনের একান্ত স্থানে জায়গা দিতে পারবে না। দিবে কিভাবে? সেখানে তো আগে থেকেই অন্যকারো দখল। স্যাফিরা দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কিছু জিনিস দেখেও না দেখার ভান করাতেই সকলের মঙ্গল বলে সে মনে করে।

__________

অদ্ভুৎ এক রাজ্য এই রোমানিয়া! পুরো রাজ্যে বোধহয় একজন মুসলিম ব্যক্তিও নেই। অন্তত গত দু'দিনে মাহশার তো এমনটাই ধারণা হয়েছে। কোথাও কোনো মসজিদ নেই, যেখান থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসবে। অথচ রাজ্যের আনাচে কানাচে গির্জার ছড়াছড়ি। অভ্যাসবশত শেষ রাতের দিকে ঘুম থেকে উঠেই মাহশা দ্রুত জানালা দিয়ে বাহিরে উঁকি দেয়। পূর্ব আকাশে লম্বা আকৃতির আলোর রেখার আভাস দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয়ে গিয়েছে।

এ-ই হাড়কাঁপানো শীতে মাহশা গিয়ে ঠান্ডা পানি দিয়ে ওযু করে নেয়। ওযু করে পুরো বাসায় একবার চোখ বুলায়। বাড়ির কর্তা জোসেফ কিংবা তার ছেলে ক্লাডিয়াস কেউ-ই গতরাতে বাসায় ফিরে নি। জোয়ান্দ্রাও গভীর ঘুমে মগ্ন। মাহশা কামরায় ফিরে একটা পরিষ্কার ধোয়া শাল মাটিতে জায়নামাজের মতো করে বিছিয়ে নেয়। অপর আরেকটি শাল দিয়ে মাথা, বুক, গলা আবৃত করে নিয়ে সে নামাজের উদ্দেশ্যে দাঁড়ায়।

নামাজ আদায় করা শেষ হতেই সে কতক্ষণ নীরবে বসে রয়। চোখের সামনে ভেসে উঠে কিছু অস্পষ্ট দৃশ্য। মুহুর্তেই তার চোখের কোণ ভিজে উঠে। মনের সংকল্প দৃঢ় হয়। প্রাণ গেলে যাক, কিন্তু নিজের উদ্দেশ্য পরিপূর্ণ না করে সে কিছুতেই দম নিবে না। তাকে দ্রুতই তার রাজ্যে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। তার পূর্বেই মাহশার যেকোনো মাধ্যমে রাজ প্রাসাদে পৌঁছাতে হবে। এখন কেবল একটা মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষা! একবার রাজপ্রাসাদে পৌঁছে গেলে এ-ই খেলার শেষ চাল সে চালবে। যে-ই চালের মধ্যে দিয়ে তার রাজ্য শত্রু মুক্ত হবে।

__________

তুষারে আচ্ছাদিত সবুজ অরণ্যের বুকে নিরলস ভঙ্গিতে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছে চারটি ঘোড়া। ঘোড়ার পিঠে থাকা পুরুষেরা গলা ফাটিয়ে ডেকে চলেছে একটাই নাম।

“ ক্যামেলিয়া, ক্যামেলিয়া। “

সকলে মিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এতো খোঁজার পরও নিখোঁজ ক্যামেলিয়ার কোনো হদিসই মিলে নি এখনো। প্রধান সেনাপতি কেভ হুট করেই ঝোপঝাড়ে ঘেরা একটা জায়গার ধারে এসে থেমে যায়। ঘোড়া থেকে নেমে চারিপাশটায় নজর বুলায়। খাপ থেকে তলোয়ারটা বের করে ঝোপঝাড়ের আগাছা গুলো কেটে কেটে খুঁজতে থাকে নেকড়ে পালের লুনাকে। কিন্তু ক্যামেলিয়াকে না পেয়ে হতাশ হয় সে।

আচমকা পায়ে জুতার তলে কিছু একটা অনুভব করতেই সে চমকায়। দ্রুত দু কদম পিছিয়ে যায় সে। এক হাঁটু গেড়ে বসে উপড়ে ফেলা তৃণ গুলোর মধ্যে হাতড়াতেই সে একটা মেয়েলী কেশের কাঁটা খুঁজে পায়। প্রজাপতির নকশা খোদাই করা টকটকে লাল রঙের এই কাঁটাটি কেভ আগেও কোথাও দেখেছে। কিছুক্ষণ মনে করার চেষ্টা করতেই তার খেয়াল হয় এটা ক্যামেলিয়ার। বেশ অনেকবারই ক্যামেলিয়ার চুলের বাঁধনে এই অলংকারটি দেখেছিল সে। তারমানে ক্যামেলিয়া কাছেই কোথাও আছে?

চুলের কাঁটাটি হাতে নিয়েই কেভ উঠে দাঁড়ায়। ব্যস্ত নয়নে আশেপাশে তাকিয়ে ডেকে উঠে,

“ লুনা? আমার ডাক শুনতে পাচ্ছেন? শুনতে পেলে সাড়া দিন। “

ক্যামেলিয়ার কোনো সাড়া আসে না। সত্য বলতে গতরাত থেকে কেভ তেমন একটা দুঃশ্চিন্তা করছিলো না লুনাকে নিয়ে। তার মনে এক প্রকার বিশ্বাস কাজ করছিলো যে পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন ক্যামেলিয়া নিজের আত্মরক্ষা করতে পারবে। কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে এসে তার ভয় হচ্ছে। মনে হচ্ছে কিছু একটা ঠিক নেই। ঐ নাকউঁচু অদ্ভুৎ প্রকৃতির নেকড়ে কন্যা এই মুহূর্তে কোথায় আছে কে জানে!

__________

জ্বরে উত্তপ্ত শরীর নিয়ে নিজ বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছে প্রিন্সেস নাওমি। তার মাথার কাছে বসে মাথায় জলপট্টি দিতে ব্যস্ত স্যাফিরা। বিছানার ধারেই দাঁড়িয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে ব্যস্ত আনাস্তাসিয়া। এতো বিপদের মাঝে নাওমিকে নিয়েও চিন্তিত সকলে। মেয়েটা যতই উড়নচণ্ডী হোক না কেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বড্ড নাজুক কিসিমেরও বলা যায়। এ-ই যেমন গতরাতে পাওয়া ভয় এবং দুঃশ্চিন্তায় জ্বর বাধিয়ে বসে আছে।

চিকিৎসক জ্বরের জন্য ভেষজ ওষুধ প্রস্তুত করতে গেলেই আনাস্তাসিয়া এসে নাওমির শিয়রে বসে। স্নেহের সহিত নাওমির হাত ছুঁয়ে নরম স্বরে বলে,

“ ইশ! গা পুড়ে যাচ্ছে মনে হচ্ছে। “

স্যাফিরা তখন মেয়ের অবস্থা দেখে ভেঙে পড়েছে। সে ভাঙা গলায় বলতে থাকে,

“ বারবার নিষেধ করি অনুমতি ছাড়া প্রাসাদের বাহিরে যেতে। শুনলো না আমার কথা। একটা মেয়েকে এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, আর আরেকটা মেয়ে বিছানায় পড়ে গিয়েছে। বিপদ যেনো পিছুই ছাড়তে চাইছে না আমাদের। “

স্যাফিরার কথার পিঠে আনাস্তাসিয়া কিছু বলতে চেয়েও বললো না। নীরব রইলো। নিজের আয়ুকে তিন ভাগ করা গেলে, সে সেটা ভাগ করে ছেলে আর দুটো মেয়ের নামে দলিল করে দিতো। এ-ই জীবনটা টানতে টানতে সে এভাবেও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। শরীর, মন দুটোই বিশ্রাম চায়। এ-ই বিশ্রাম বোধহয় একমাত্র ওপারে গেলেই মিলবে।

নাওমি জ্বরের ঘোরে তখন জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন। এক অন্য জগতে চলছে তার বিচরণ। অদ্ভুৎ সে জগৎ! এক সবুজ পর্বতের চূড়ায় দু-হাত মেলে দাঁড়িয়ে আছে সে। বদ্ধ তার চোখের পাতা। শত সহস্র প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে চারিদিকে। তবে ভুল করেও নাওমির গায়ে লাগছে না তারা। হুট করে কোথা থেকে এসে এক জোড়া পুরুষালি হাত পিছন হতে তার কোমর পেঁচিয়ে ধরে। নাওমি পুলকিত হয়। নিজের সমস্ত ভার ছেড়ে দেয় সে-ই অদৃশ্য পুরুষের সুঠাম বুকে। কানের কাছে একটা ভারী স্বর বলে উঠে,

“ প্রজাপতি ছুঁয়ে দেখতে চাও? “

নাওমি চোখ বুজে রেখেই হ্যাঁ বোধক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে। পুরুষটা নিজের এক হাত শূন্যে তুলে অপেক্ষা করে। মুহূর্তেই একটা হলুদ রঙের প্রজাপতি এসে তার আঙুলের ডগায় বসে। সে-ই প্রজাপতিকে অতি সাবধানে এনে স্বপ্ন পুরুষ নাওমির উন্মুক্ত কাধে বসিয়ে দেয়। নাওমি এবার চোখ মেলে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। নিজের কাধে বসে থাকা প্রজাপতিকে দেখে। চোখে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো খুশি জ্বলজ্বল করতে থাকে তার। কিন্তু যে-ই না সে স্বপ্ন পুরুষকে দেখার উদ্দেশ্যে পিছনে ফিরে তখনই দেখে তার পিছনে কেউ নেই। নাওমি অবাক হয়। এইমাত্রই তো সে ওই মানুষটার কণ্ঠ শুনলো, তার ছোঁয়া অনুভব করলো। তাহলে চোখের পলকে কোথায় হারিয়ে গেলো ও-ই পুরুষ?

নাওমি চারিপাশে চোখ বুলায়। কোথাও কেউ নেই। সে বিচলিত স্বরে ডাকে,

“ কোথায় তুমি? সামনে এসো। ফাঁকি দিও না আমাকে। “

কেউ সামনে আসে না। বরং ধীরে ধীরে সব রঙ কেমন হারিয়ে যেতে থাকে। প্রজাপতি গুলো হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। প্রকৃতি থেকে বসন্ত হারিয়ে গিয়ে রুক্ষতা দেখা দেয়। পায়ের নিচের সবুজ ঘাসগুলোও নিজেদের রঙ হারাতে থাকে। এসব দেখে নাওমি অজান্তেই পিছিয়ে যেতে যেতে হুট করে পাহাড়ের কিনারায় চলে আসে। ফসকে যায় তার পা।

অতঃপর… অতঃপর সব অন্ধকার। আর কিছু দেখতে পেলো না নাওমি। কেবল ঘুমের ঘোরে বিড়বিড়িয়ে উঠে,

“ কোথায় তুমি? “

আনাস্তাসিয়া এবং স্যাফিরা স্পষ্ট শুনতে পায় নাওমির আওড়ানো বুলি। প্রথমে অবাক হলেও তারা ধরে নেয় নাওমি বোধহয় ক্যামিকে উদ্দেশ্য করে এ-ই প্রশ্ন করছে। স্যাফিরা কেবল মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,

“ ক্যামি এসে পড়বে, মা। “

__________

হুট করে বাদশাহর জরুরী তলবে যুবরাজ বেহজাদ তৈরী হয়ে সভায় উপস্থিত হয়েছে। সূক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে সে চারিদিকে তাকাচ্ছে। সভায় সে ব্যতীত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উজির এবং মন্ত্রীও উপস্থিত আছে। বেহজাদ আড়চোখে পিতা মহোদয়ের দিকে তাকায়। বাদশাহ কামরান আতাউল্লাহর কপালে মৃদু চিন্তার ভাজ। সভায় পিনপতন নীরবতা। সকলে আগ্রহী দৃষ্টি মেলে দেখছে বাদশাহকে।

এমন সময়ই সভায় উপস্থিত হয় এক ভীনদেশী বেশভূষার লোক। পরিচয় তার গ্রীক রাজ্যের দূত। তার সঙ্গে রয়েছে দু'জন সৈন্য। যারা মিলে একটি বিশাল আকৃতির মুখবন্ধ মাটির পাত্র সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। বাদশাহকে মাথা নত করে সম্মান প্রদর্শন করেই দূত কুটিল হেসে গ্রীক ভাষায় বলে,

“ আমাদের মহান গ্রীক সাম্রাজ্যের কাউন্ট আপনার জন্য একটা বিশেষ উপহার পাঠিয়েছেন, বাদশাহ। অনুমতি পেলে আমি তা পেশ করতাম। “

বাদশাহ কামরান আতাউল্লাহ ভ্রু কুচকে লক্ষ্য করে দূতের ঠোঁটের কোণে সেই হাসি। পাশ থেকে একজন উজির দূতের বলা কথা অনুবাদ করে দিতেই কামরান আতাউল্লাহ অনুমতি দেন। দূত এবার নিজের সঙ্গে আনা সৈন্য দু'জনকে চোখের ইশারায় কিছু একটা আদেশ করে। সঙ্গে সঙ্গে একজন সৈন্য বদ্ধ পাত্রের মুখ খুলে এবং অপরজন পাত্রের ভেতর থেকে বের করে তুলে ধরে একজন মানুষের কাটা মাথা।

মুহুর্তেই সভার সকলে বিস্ফোরিত দৃষ্টি মেলে সে-ই বীভৎসকর দৃশ্যটা দেখে। বাদশাহ কামরান আতাউল্লাহ প্রথমে হতভম্ব হলেও, পরমুহূর্তে তিনি চেঁচিয়ে উঠে,

“ এ কেমন দুঃসাহস! “

যুবরাজ বেহজাদও রাগে নিজের খাপের তলোয়ার শক্ত করে ধরে। যেনো এ-ই মুহূর্তেই সে এই অসভ্যের বুকে তলোয়ার চালাতে প্রস্তুত। গ্রীক দূত হেসে বলে,

“ দেখুন তো, এই কাটা মাথাটি কার চিনেন কি-না! আপনাদের পাঠানো গুপ্তচর কেমাল। যে কি-না বিনা অনুমতিতে লুকিয়ে আমাদের রাজ্যে প্রবেশ করেছিলো। আমাদের কাউন্ট লুকোচুরি খেলা পছন্দ করে না। তা-ই সতর্ক বার্তা হিসেবে গুপ্তচরের মাথাটা আপনার নিকট পেশ করার দায়িত্ব দেন আমাকে। “

কামরান আতাউল্লাহ ক্রোধের বর্শবর্তী হয়ে নিজের খাপের তলোয়ার বের করে তেড়ে যায় সে-ই রাজ্য দূতের নিকট। ধারযুক্ত তলোয়ার দূতের গলার কাছে ধরতেই সে-ই গ্রীক দূত হেসে বলে উঠে,

“ বেয়াদবি ক্ষমা করবেন, বাদশাহ! আপনি চাইলে এ-ই মুহূর্তে আমার প্রাণ নিতে পারেন। কিন্তু তাতে আপনার লাভটা কোথায় সেটাও একবার ভেবে দেখুন। কাউন্ট তার ব্যক্তিগত দূতের প্রাণ নেওয়াটাকে সরাসরি আপনার তরফ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা হিসেবে ধরে নিবে। রাজ্যর এই ক্রান্তিলগ্নে আপনি কি যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী? “

প্রধান উজির সালেহও সুর মিলিয়ে বলে উঠে,

“ বাদশাহ। এমনটা করবেন না। ছেড়ে দিন উনাকে। “

কামরান আতাউল্লাহ রাগে, ক্রোধে কিছুক্ষণ অগ্নিদৃষ্টি মেলে দেখে সে-ই রাজদূতকে। অতঃপর বাধ্য হয়ে ছেড়ে দেয় তাকে। সরে আসে পিছনে। চোখ বুজে বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস ফেলে তিনি নিজের রাগ দমনের চেষ্টা চালায়। যুবরাজ বেহজাদ এগিয়ে যায় পিতাকে সামলাতে। বিগত দিনগুলোয় পিতার শারীরিক অবস্থার নড়বড়ে স্থিতি সম্পর্কে সে অবগত। তা-ই সহজেই চিন্তিত হয়ে পড়ে সে। সুযোগে গ্রীক দূত প্রধান উজির সালেহর সঙ্গে রহস্যময় দৃষ্টি বিনিময় করে। ঠোঁটের কোণে লেপ্টে তার কুটিল হাসি।

__________

পুরো জঙ্গল তন্নতন্ন করে খোঁজা শেষ ইতিমধ্যে। আরোণ উদ্ভ্রান্তের ন্যায় একটা গাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে আছে। দৃষ্টি তার শূন্য আকাশের পানে নিবদ্ধ। গোধূলি লগ্ন এখন। তাপমাত্রা কমে গিয়েছে বেশ। আকাশ হতে ধীরে ধীরে তুষারপাত হতে শুরু করেছে। আরোণের বাদামী চুলগুলো এলোমেলো, অগোছালো। মুখের অবস্থাও বিধ্বস্ত। ভেতরটা শূন্যতায় খাঁ খাঁ করছে। অপরাধবোধে নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে করছে। একটাই তো দায়িত্ব ছিলো তার। নিজের মেয়েকে সকল প্রকার বিপদ থেকে রক্ষা করা। এ-ই সামান্য দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলো সে!

আরোণের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে কাউন্ট ইয়ান। বোনের দুঃশ্চিন্তায় সে-ও নাওয়া খাওয়া দাওয়া ভুলে গতরাত থেকে জঙ্গলে পড়ে আছে। কিন্তু ফলাফল শূন্য। কে জানে কোথায় আছে তার বোন! ঈশ্বর রক্ষা করুক!

ইয়ান এবং আরোণকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিলো ম্যাথিউ, জোসেফ, ক্লাডিয়াস এবং নেকড়ে পালের সকলে। কাউন্ট ইয়ানের আদেশে আজ সকালেই জোসেফ বাসকোভ প্রাসাদে গিয়ে ক্রিয়াস সহ নেকড়ে পালের সকলকে ক্যামেলিয়ার নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারটা জানায়, যেনো তাদের সহয়তায় ক্যামেলিয়াকে সহজে খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু সকলের চেষ্টা বিফল হয়েছে। ক্যামেলিয়াকে কোথাও খুঁজে পায় নি তারা।

হুট করে ইয়ান লক্ষ্য করে চারিপাশে সকলে উপস্থিত থাকলেও প্রধান সেনাপতি কেভ কোথাও নেই। আজ সকাল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সকলে ক্যামেলিয়ার খোঁজ করা শুরু করার পর থেকেই আর কেভ ফিরে আসে নি। কোথায় গিয়েছে কে জানে! ইয়ানের ভাবনার মাঝেই ঘোড়ার দৌড়ানোর শব্দ শোনা যায়। সকলেই নড়েচড়ে উঠে। উদগ্রীব নয়নে পিছনে ফিরে তাকায়। কুয়াশায় আচ্ছন্ন প্রকৃতি চিরে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠে একটা দৃশ্য। সাদা রঙের একটা ঘোড়ার পিঠে বসে প্রধান সেনাপতি কেভ। তার বুকে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে নেকড়ে পালের লুনা ক্যামেলিয়া। গায়ে জড়ানো সেনাপতির কালো রঙা ক্লক।

দূর হতে ক্যামেলিয়ার অবয়ব দেখতেই আরোণ ঝড়ের গতিতে এগিয়ে যায়। ঘোড়া সম্পূর্ণ থামার অপেক্ষাও করে না। তার আগেই একটানে মেয়েকে নিজের পাজাকোলে তুলে নেয়। বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে বিড়বিড়িয়ে উঠে,

“ ক্যামি! বাবার জান। ঠিক আছো তুমি? “

বলতে বলতেই আরোণ লক্ষ্য করে ক্যামেলিয়ার রক্তে ভেজা গাউনের একাংশ। স্তব্ধ হয়ে যায় সে। চোখের সামনে ভেসে উঠে বহু বছর পূর্বের এরকমই একটা দৃশ্য। নিষ্প্রাণ স্বরে কেভকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করে,

“ কি হয়েছে ওর? “

কেভ ঘোড়া ছেড়ে নামে। ক্লান্ত স্বরে বলে,

“ ট্রান্সিলভেনিয়ার সীমানা পাড়ে পরিত্যক্ত এক খালের সঙ্গে থাকা ফাঁদে খুঁজে পেয়েছি উনাকে। হাত থেকে রক্ত ঝড়ছিল, চেতনাশূন্যও ছিলো। রক্তপাত বন্ধ করার জন্য হাতে ভেষজপাতা দিয়ে প্রাথমিক পট্টি করে দিয়েছি, কিন্তু উনার অবস্থা ভালো মনে হচ্ছে না আমার। “

আরোণ আর এক দন্ড অপেক্ষা করলো না। চোখের পলকে সে নিজের মেয়েকে নিয়ে নিজ প্রাসাদের উদ্দেশ্যে প্রস্থান করলো। তার পিছু পিছু একে একে সকলে প্রস্থান করলো। কাউন্ট ইয়ানও যাওয়ার পূর্বে কেভের কাধে হাত রেখে ধন্যবাদ জানায়। সেই সঙ্গে আদেশ করে, ক্যামেলিয়াকে পাওয়া গিয়েছে এই খবরটা যেনো প্রাসাদে রাজমাতার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। কাউন্টও প্রস্থান করতেই কেভ একা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রয়। তার শার্ট এবং দু'হাতে শুকিয়ে আছে রক্তের ছাপ। সে-ই রক্তের দিকে কিছুক্ষণ শূন্য দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে কেভ। এটা কিসের রক্ত? মানুষ নাকি নেকড়ের?

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন