প্রণয়তিথি
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৬.
নিজের রাজকীয় বিছানায় গা এলিয়ে আধশোয়া অবস্থায় বসে আছেন বাদশাহ কামরান আতাউল্লাহ। উনার পাশেই বসে উনার দেখভাল করতে ব্যস্ত বাদশাহ বেগম আয়েশা। আজ সভার পর থেকেই বাদশাহ বুকে সূক্ষ্ণ ব্যথা অনুভব করছে আবারও। অদ্ভুৎ চিনচিনে সে-ই ব্যথা। প্রকাশ না করলেও ভেতরে ভেতরে ব্যথাটা ক্রমশ অসহনীয় পর্যায়ে গিয়ে ঠেকছে। উনার স্ত্রী বোধহয় কিছুটা আন্দাজ করতে পারছেন উনার শারীরিক পরিস্থিতি। তা-ই তো বারবার সতর্ক দৃষ্টি মেলে স্বামীর মুখভঙ্গি লক্ষ্য করছেন তিনি।
হুট করে কামরার দরজায় করাঘাতের শব্দ হতেই বাদশাহ নড়ে-চড়ে বসেন। গম্ভীর স্বরে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেন দ্বাররক্ষীকে। দ্বাররক্ষক মাথা নত করে কামরায় প্রবেশ করেই বলে উঠে,
“ আসসালামু আলাইকুম বাদশাহ। যুবরাজ এসেছেন। আপনার দিদারের অপেক্ষা করছেন। “
এই মুহূর্তে পুত্রের সঙ্গে দেখা করা কিংবা কথা বলার পরিস্থিতিতে নেই বাদশাহ। তা-ই তিনি সাফ নিষেধ করে দেন। যুবরাজকে জানাতে বলে, যে তিনি কাল দেখা করবেন। দ্বাররক্ষক আদেশ মেনে বেরিয়ে যেতে নিলেই একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে। যুবরাজ বেহজাদ কারো তোয়াক্কা না করে বিনা অনুমতিতে কক্ষে প্রবেশ করে।
ছেলের এরকম কান্ড দেখে বাদশাহ বেগম হতভম্ব হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। বাদশাহ কামরান আতাউল্লাহও ছেলের কর্মে ক্ষিপ্ত হয়ে বলে উঠেন,
“ এ কেমন দুঃসাহস! “
বেহজাদ মাথা নত করে সালাম পেশ করে বলে,
“ স্পর্ধা মার্জনা করবেন বাবা। কিন্তু এ-ই মুহূর্তে আপনার সঙ্গে কথা বলাটা জরুরী বলে মনে করছি। কাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। “
বাদশাহ চোখের ইশারায় দ্বাররক্ষকে প্রস্থানের আদেশ দিলো। প্রহরী চলে যেতেই কামরান আতাউল্লাহ ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে বিছানার মাঝ প্রান্তটায় বসেন। কিছুটা দম নিয়ে তিনি ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠেন,
“ কি সে-ই গুরুত্বপূর্ণ কথা? “
আয়েশা বারবার চোখের ইশারায় ছেলেকে দমানোর চেষ্টা করছেন। তিনি চাচ্ছেন না এ-ই মুহুর্তে বেহজাদ কিছু বলে বাদশাহকে রাগিয়ে দিক। সেটা মোটেও সুখকর হবে না কারো জন্য। বেহজাদ মা'য়ের চোখ রাঙানির তোয়াক্কা করলো না। নির্বিঘ্ন, থমথমে স্বরে বলে,
“ গ্রীকে গুপ্তচর পাঠানোর ফলাফল আজ সভায় আমরা সবাই দেখেছি। আমি চাই না রোমানিয়া সাম্রাজ্যের রাজদূতও দু'দিন পর এরকমই এক বার্তা নিয়ে আমাদের প্রাসাদে পা রাখুক। জেইলানের জীবন হুমকিতে বাবা। “
আয়েশা ছেলের অতি দুঃশ্চিন্তায় বিরক্ত হলেন। কামরান আতাউল্লাহ কিছুটা নমনীয় স্বরে বলে,
“ এ-ই ব্যাপারে আমাদের ইতিমধ্যে কথা হয়েছে বেহজাদ। “
বেহজাদ কারো কথা শুনলো না। দৃঢ় গলায় বলে,
“ আমি কিছু শুনতে রাজি নই। এক্ষুণি সৈন্য পাঠান। জেইলানকে নিরাপদে রাজ্যে ফিরিয়ে আনার আদেশ দিন। কেউ এখনো জানে না ও রাজ্যে নেই। ওকে চুপচাপ ফিরিয়ে আনলে কারো জানার সুযোগ নেই। “
আয়েশা এবার ছেলেকে দমাতে ফুঁসে উঠলেন,
“ বাদশাহর মুখের উপর কথা বলবে না বেহজাদ। এখন তোমার এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নয়। নিজেকে বাদশাহ কামরান আতাউল্লাহর যোগ্য পুত্র হিসেবে প্রমাণ করতে মেহনত করো। ভুলে যেও না এ-ই সাম্রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব তুমি করছো। এ-ই মহান সাম্রাজ্যের একমাত্র ভবিষ্যৎ এখন তুমি। “
বেহজাদ এক পলকের জন্য নিজের মা'য়ের চোখের পানে তাকায়। অদ্ভুৎ মলিন ভঙ্গিতে হেসে সে বলে উঠে,
“ জেইলানের মা নামক কেউ পৃথিবীতে নেই সেটা আমার অজানা ছিল না কখনো। কিন্তু এতদিন আমি অন্তত এটা ভেবে নিশ্চিত ছিলাম যে, ওর একটা বাবা আছে। কিন্তু আমি বোধহয় খুব সম্ভবত ভুল ছিলাম। অসুবিধা নেই, এখনো ও একা হয়ে যায় নি। আমার বোনের জন্য আমি এখনো বেঁচে আছি। আগে একজন ভাইয়ের দায়িত্ব বহন করি, তারপর না-হয় এই সাম্রাজ্যের দায়িত্ব বইবো। “
প্রথম বাক্যটা বেহজাদ নিজের মা'য়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেও শেষের কথাগুলো সে বাদশাহ কামরান আতাউল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বলে। নিজের কথাটুকু শেষ করেই সে দৃষ্টি নত করে সালাম দিয়ে কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যায়। আয়েশা হনহনিয়ে ছেলের পিছু যেতে নিলেই লক্ষ্য করে বাদশাহকে। বুকে হাত রেখে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে কেমন বিছানায় হেলে পড়ছেন মহান সম্রাট।
আয়েশা ছুটে আসে স্বামীর কাছে। মাথার কাছটায় বসে চিন্তিত গলায় প্রশ্ন করে,
“ বেশি খারাপ লাগছে আপনার? আমি চিকিৎসক ডাকবো? “
কামরান আতাউল্লাহ কোনমতে মাথা নেড়ে না বলে। আয়েশা উদ্বেগ মিশ্রিত ভঙ্গিতে কিছু বলতে নিবে তার পূর্বেই কামরান আতাউল্লাহ ইশারা করেন উনাকে একা ছেড়ে দিতে। আয়েশা স্বামীর আদেশ মানতে বাধ্য। সে একপ্রকার অস্থিরতা নিয়েই কামরা ছেড়ে বেরিয়ে যায়। তবে দরজার ওপারে গিয়েই দাঁড়িয়ে রয়।
একাকী কক্ষে বিছানায় শুয়ে শূন্যের দিকে তাকিয়ে রয় কামরান। ছেলের বলে যাওয়া কথাগুলো উনার কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বারবার। কেউ না বুঝুক, কিন্তু পরম করুণাময় তো জানেন যে কামরান নিজের সকল সন্তানকেই ভালোবাসেন। তিনি জানেন উনার সম্মতি না পেলেও জেইলান যেকোনো মূল্যে ওই অভিশপ্ত সাম্রাজ্যে যেতোই। রাজকুমারী জেইলানের ভেতর জ্বলতে থাকা প্রতিশোধের আগুন কি এতো সহজে নিভবে? আর বেহজাদ! জেইলানের সঙ্গে কি করে বেহজাদকে যাওয়ার অনুমতি দিতো কামরান? বেহজাদ এ-ই সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ! আল্লাহ না করুক, বেহজাদের কিছু হয়ে গেলে সাম্রাজ্য ধ্বসে পড়বে। রাজ পরিবারের নীতি অনুযায়ী এই সাম্রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব কেবল বংশের বয়োজ্যেষ্ঠ যুবরাজই পাবে। বর্তমানে কামরানের পর বয়োজ্যেষ্ঠ এবং একমাত্র যুবরাজ বেহজাদ। রাজ্যের আশার প্রদীপকে হায়েনাদের গুহায় কি করে পাঠাতেন বাদশাহ কামরান আতাউল্লাহ?
__________
বাসকোভ প্রাসাদ তখন নিশী রাতের অন্তরালে তলিয়ে। তবে প্রাসাদে উপস্থিত নিশাচর নেকড়েদের চোখ সজাগ। প্রত্যেকেই উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছে আলফা কন্যা লুনার জ্ঞান ফেরার। কেবল নেকড়ে নয়, সেখানটায় উপস্থিত আছে একজন মানুষও। মানুষটি আর কেউ নয় বরং রাজমাতা আনাস্তাসিয়া। ক্যামেলিয়ার খোঁজ পাওয়া গিয়েছে এ-ই খবরটা পেতেই তিনি ছুটে এ-ই প্রাসাদে আসেন। যদিও ইয়ান, ম্যাথিউ, জোসেফ, ক্লাডিয়াসও উপস্থিত ছিল সন্ধ্যা পর্যন্ত। কিন্তু আনাস্তাসিয়া সকলকে ফিরে যাওয়ার আদেশ দেয়। প্রাসাদে কতো দায়িত্ব! ইয়ানের জন্য প্রাসাদে থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ বেশি। কাউন্ট ইয়ান যাওয়ার আগে জানিয়ে গিয়েছে আগামীকাল সে আবারও আসবে বোনকে দেখতে।
সারাদিন পেরিয়ে গিয়েছে। ক্যামেলিয়া এখনো অচেতন অবস্থায় ঘুমে মগ্ন। একাকী কক্ষে আরোণ মেয়ের শিয়রে বসে অপলক তাকিয়ে থাকে। বুকের ভয় এবং যন্ত্রণা এখনো কমে নি তার। প্রতিটা মুহূর্তে হৃদয় মুষড়ে উঠছে। চিকিৎসক জানিয়েছে ক্যামেলিয়ার সুস্থ হতে বেশ সময় লাগবে। রুপার প্রভাব যেমন তার নেকড়ে সত্তাকে সম্পূর্ণ দূর্বল করে দিয়েছে তেমনই বুলেটের প্রভাব তার মনুষ্য সত্তাকে ভঙ্গুর করে দিয়েছে।
আরোণ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে। ক্যামেলিয়ার এই দুটো সত্তা একসঙ্গে বয়ে চলা যে কতটুকু কঠিন তা সে কখনো কাউকে বলে নি। পুরোপুরি নেকড়ে কিংবা মানুষ দুটোর একটাও না হওয়ার কারণে ক্যামেলিয়া তূলনামূলক বাকি সকল নেকড়ের তুলনায় দূর্বল। যদিও সকলে আরোণের মেয়ে হওয়ার দরুণ লুনাকে প্রবল শক্তির অধিকারী ভাবে, কিন্তু বাস্তবিক অর্থে ক্যামেলিয়ার শক্তি খুবই সীমিত। এ-ই সীমিত শক্তি এবং নাজুক সত্তা নিয়ে তার টিকে থাকা খুবই কঠিন।
এতো গুলো বছর ধরে কম চেষ্টা তো করে নি আরোণ! কতো খুঁজেছে! কিন্তু কোনো উপায় খুঁজে পায় নি সে। ক্যামেলিয়ার মনুষ্য সত্তাকে পূর্ণতা দেওয়ার একটা কোনো উপায় পাওয়া গেলে আরোণ এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতো না। নিজের মেয়েকে নেকড়েদের এই অভিশপ্ত সত্তা থেকে মুক্তি দিয়ে দিতো সে। ক্যামেলিয়াও নিজের মা'য়ের মতো মানুষ হতো তখন! একটা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারতো। এ-ই ঘন অরণ্য ছেড়ে লোকালয়ে থাকতে পারতো।
আরোণের গভীর ভাবনার মাঝেই কামরার দরজা খাট করে শব্দ করে খুলে যায়। কামরায় প্রবেশ করে আনাস্তাসিয়া। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ক্যামেলিয়ার মাথার কাছটায় বসে। নিজের বোনের মতো দেখতে অবিকল মুখশ্রী পানে তাকিয়ে রয় কতক্ষণ। অতঃপর সময় নিয়ে ভাগ্নির কপালে চুমু খায়।
আরোণ নীরবে উঠে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। দরজার ওপারেই পালের অনেকেই দাঁড়িয়ে ছিলো। আলফাকে দেখতেই তাদের উদগ্রীব দেখালো। ক্যামেলিয়ার এখনো জ্ঞান ফিরে নি জানিয়েই আরোণ সেখান থেকে প্রস্থান করে। প্রাসাদের এক কোণে থাকা একটা বারান্দায় এসে রেলিং ধরে দাঁড়ায়। দু চোখ বুজে মাথা নত করে স্থির দাঁড়িয়ে রয় সে।
হুট করে কারো উপস্থিতি টের পেতেই আরোণ পাশ ফিরে তাকায়। লক্ষ্য করে ক্রিয়াসকে। তার দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে আছে। আরোণের সে-ই করুণতা পছন্দ হয় না। সে থমথমে স্বরে বলে,
“ আমার মেয়ে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে, ক্রিয়াস। কিন্তু ওকে গুলি করা মানুষটা বাহিরে আজাদ ঘুরে বেড়াচ্ছে। ও-ই আজাদ ব্যক্তির স্বাধীনতা প্রতিটা মুহূর্তে আমাকে পীড়া দিচ্ছে। আমি জানি, আমার মেয়ে কখনো নিজ থেকে কারো উপর আক্রমণ করতে যাবে না, যে কেউ আত্মরক্ষার জন্য ওকে গুলি করবে। তা-ই যে-ই ওকে আঘাত করেছে তার প্রাণ না নেওয়া পর্যন্ত আমার শান্তি হবে না। “
ক্রিয়াস আরোণের খুব পুরনো সহচর। ইশারা বুঝতে তা-ই তার অসুবিধা হলো না। সে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠে,
“ আপনি চিন্তা করবেন না আলফা। ও-ই অসভ্যকে খুঁজে বের করবো। ওর রক্ত মাংস দিয়ে এই বাসকোভ প্রাসাদে ভোজের আয়োজন করা হবে। “
আরোণ আর কিছু বলে না। আবারও আগের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়। এর শেষটা ও দেখে ছাড়বে।
__________
রাত্রির তখন দ্বি প্রহর। শুনসান নীরবতা বিরাজ করা কক্ষে তাড়াহুড়োর সহিত গোছগাছ করতে ব্যস্ত এক পুরুষ। জরুরী কিছু মানচিত্রের কাগজ, খঞ্জর, খাওয়ার বিশুদ্ধ পানি এবং স্বর্ণ মুদ্রা দিয়ে একটা পুটলি বেধে কাধে ঝুলিয়ে নেয় যুবরাজ বেহজাদ। অতঃপর লম্বা একটা ক্লক গায়ে জড়িয়ে নেয় সে। হাতে খাপ সহ তলোয়ার থাকলেও বাড়তি প্রয়োজন হিসেবে পিঠে তীর এবং ধনুকও ঝুলিয়ে নেয় সে। সম্পূর্ণ তৈরী হতেই আয়নায় নিজেকে একদফা দেখে।
একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে এবং বুকভর্তি সাহস নিয়ে সে কক্ষের সঙ্গে লাগোয়া ঝুলন্ত বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। বারান্দার রেলিঙের সঙ্গে পূর্ব প্রস্তুতি সরূপ একটা মোটা দড়ি বেঁধে রাখা আছে। এখন কেবল অপেক্ষা সঠিক সময়ের।
অবশেষে সঠিক সময় আসে। প্রাসাদ প্রাঙ্গণের উত্তর দিক থেকে ভেসে আসে শোরগোলের শব্দ। মুহুর্তেই সকল সৈন্য ছুটে যায় সে-ই পানে। বারান্দা হতে নিচে উঁকি দিতেই দেখা যায়, জায়গাটা এখন কঠোর নিরাপত্তা এবং প্রহরী মুক্ত। বেহজাদ এবার দড়িটা দু-হাতে ধরে বাঁধনের দৃঢ়তা পরীক্ষা করে নেয়। একবার নিশ্চিত হতেই সে একহাতে শক্ত করে দড়ি ধরে আরেক হাতের সাহায্যে রেলিং টপকে ওপারে গিয়ে দাঁড়ায়। শেষবারের মতো ফিরে তাকায় নিজের কামরার দিকে। বেহজাদ স্পষ্ট দেখে বিছানার উপর রাখা চিঠিটা। অতঃপর মনে মনে বিসমিল্লাহ বলে দড়ির সাহায্যে খুব দ্রুতই সে নিচে পৌঁছে যায়।
পা জোড়া ভূমি স্পর্শ করতেই যুবরাজ বেহজাদ বিন্দুমাত্র সময় অপচয় করে না। দ্রুত চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টি বুলাতে বুলাতে পৌঁছে যায় প্রাসাদের পিছনের দিকে প্রাচীর প্রান্তে। হুট করে কারো পদধ্বনির শব্দ শুনতেই বেহজাদ ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। লক্ষ্য করে একজন প্রহরী এদিকটায় টহল দিচ্ছে। বেহজাদ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে। প্রহরী চলে যেতেই সে সাবধানতার সহিত আড়াল হতে বেরিয়ে আসে।
এবার বেশ দক্ষতার সহিত বেহজাদ প্রাচীর বেয়ে উঠে টপকে অপরপ্রান্তে চলে যায়। বেরিয়ে আসে প্রাসাদের সীমানা থেকে। এক দৌড়ে চলে যায় প্রাসাদ থেকে অনেকটা দূরে। দূর হতে একজনকে দেখতেই সে তার নিকট এগিয়ে যায়। অপেক্ষমান যুবক বেহজাদকে দেখতেই দৃষ্টি নত করে সালাম দেয়। বেহজাদ নিচু স্বরে সালামের জবাব দিয়ে প্রশ্ন করে,
“ সব প্রস্তুত আছে? “
যুবক আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জবাব দেয়,
“ জি যুবরাজ, আপনার বেশভূষা দেখে কেউ-ই আন্দাজ করতে পারবে না যে আপনিই যুবরাজ বেহজাদ। নিশ্চিন্তে এ-ই ঘোড়া নিয়ে বন্দরে পৌঁছে যান আপনি। ওখানে লুতফি নামক একজন আপনার অপেক্ষায় আছে। উনিই আপনাকে জাহাজে করে রোমানিয়ায় পৌঁছে দিবে। কেউ-ই টের পাবে না। “
বেহজাদ মৃদু হেসে যুবকের কাধে হাত ধরে বলে,
“ অসংখ্য ধন্যবাদ তোমাকে। “
যুবক সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয়,
“ লজ্জা দিবেন না যুবরাজ। আপনার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত। এ-ই সামান্য সাহায্য করতে পেরে আমি ধন্য। “
বেহজাদ তার জন্য নিয়ে আসা ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসে। শেষবারের মতো দূর হতে নিজের প্রাসাদকে এক ঝলক দেখে নিয়ে সে ঘোড়ার লাগামটা বুঝে নেয়। চার পায়া প্রাণীটা বাতাসের বেগে ছুটতে শুরু করে। ছোটবেলা থেকে শৃঙ্খলাতায় বেড়ে উঠা যুবরাজ এ-ই প্রথম সকল নিয়ম নীতির শিকল ভেঙে নিজের সিদ্ধান্তে কিছু করতে চলেছে। মনে মনে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ সে, যে ও-ই হায়েনাদের ভীড় হতে আদরের বোন জেইলানকে নিয়েই রাজ্যে ফিরবে সে। যাত্রাটা সহজ হবে না তা বেহজাদের অজানা নয়। তবে সে সকল কিছুর জন্য প্রস্তুত। প্রতিশোধ, দায়িত্ব এবং বোঝাপড়ার এই যাত্রায় সে মোটেও হেরে ফিরবে না।
চলবে…