প্রণয়তিথি
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৮.
ছুকছুক করে রক্ত পানের শব্দ ভেসে আসছে কামরার ভেতর থেকে। দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা নেকড়ে পালের আলফা আরোণ রদ্রিগেজ স্পষ্ট শুনে সবটা। কিন্তু কিছু করে না সে। কেবল নীরবে দাঁড়িয়ে রয় নিজ জায়গায়। সময় গড়ায়। হুট করে কক্ষের ভেতর হতে মৃদু ফোঁপানোর শব্দ ভেসে আসে। এবার আর আরোণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। ঝড়ের গতিতে কক্ষে প্রবেশ করে।
বিশাল কক্ষের এককোণে মেঝেতে পড়ে আছে একটা আধখাওয়া মানুষের লাশ। পেটের এবং বুকের এদিকটায় বেশিরভাগই মাংস নেই। নাড়িভুঁড়ি কেমন ভয়ংকর অবস্থায় পেট থেকে বেরিয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। সে-ই সঙ্গে প্রায় গোটা কামরাটাই ডুবে আছে তরল রক্তের বন্যায়।
আরোণ লক্ষ্য করে লাশের সামনেই মাথা নত করে বসে আছে ক্যামেলিয়া। পুরো শরীর তার মৃদু কাপছে। বোধহয় ডুকরে কাদছে। আরোণ মেয়ের সামনে এক হাঁটু গেড়ে বসে। কোমল স্বরে ডাকে,
“ ক্যামি? “
ক্যামেলিয়া চোখ তুলে তাকায় বাবার দিকে। আরোণ চমকায়। ক্যামেলিয়ার মুখের বেশিরভাগ অংশ জুড়ে তাজা রক্ত মেখে আছে। চোখ ধাঁধানো সুন্দরী এই রমণী যেনো এই মাত্র রক্তস্নান করেছে। ক্যামেলিয়ার দু চোখ অশ্রুজলে টইটম্বুর। তার দৃষ্টিতে মিশে আছে প্রবল অসহায়ত্ব।
আরোণ দ্রুত মেয়ের মাথা নিজের বুকে চেপে ধরে। আলতো হাতে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
“ নিজেকে দোষারোপ করো না। তোমার সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার আর কোনো পথ ছিলো না। তুমি কোনো পাপ করো নি। “
বাবার শান্তনা বাণী ক্যামেলিয়া কানে তুললো না। সে ডুকরে কেদে উঠে বলে,
“ অবশ্যই পাপ করেছি। কারো জীবনের বিনিময়ে সুস্থতা আমার কাম্য নয়। আমি একটা জলজ্যান্ত মানুষকে খেয়ে ফেলেছি। মানুষখেকো আমি। একটা হিংস্র পশু আমি। “
মেয়ের কথায় আরোণের খারাপ লাগার পরিধি বৃদ্ধি পেলো। তবুও সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
“ তোমার কথায় ও-ই বাচ্চাটাকে ছেড়ে দেই আমি। অনেক খুঁজে এমন একটা মানুষ ধরে এনেছি যে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিলো। তুমি কোনো পাপ করো নি, এই মানুষ নিজে সেচ্ছায় নিজের জীবন দিয়েছে। “
ক্যামেলিয়া কিছু বলে না। কেবল বুক ভাসিয়ে কাদতে থাকে। কোনো শান্তনা বাক্যই তার অপরাধবোধ লাঘব করতে সক্ষম হবে না এ-ই মুহূর্তে। আরোণ মেয়েকে বুকে জড়িয়েই সে-ই লাশটার কাছ থেকে সরিয়ে বারান্দায় নিয়ে আসে। বারান্দায় থাকা আসনে মেয়েকে বসিয়ে নিজে তার সামনে এক হাঁটু গেড়ে বসে। পকেট হাতড়ে একটা রুমাল বের করে ক্যামেলিয়ার দু-হাতে এবং মুখে লেপ্টে থাকা রক্ত মুছে দিতে দিতে প্রশ্ন করে,
“ তোমাকে একটা প্রশ্ন করার ছিলো… তোমাকে গুলি করেছে যে-ই ব্যক্তি, ও-ই অসভ্যের মুখ দেখেছো তুমি? “
বাবার প্রশ্নের পিঠে ক্যামেলিয়া কান্না বিরতি নেয়। ভেজা চোখে বাবার দিকে তাকায়। আরোণ উত্তরের অপেক্ষায়। ক্যামেলিয়ার চোখের সামনে ভেসে উঠে সেদিন রাতে জঙ্গলে দেখা ও-ই ব্যক্তির মুখশ্রী। সঙ্গে সঙ্গে তার মস্তিষ্কে এসে ভীড় করে এক ঝাঁক ভাবনা। ও-ই লোককে খুঁজে পেলে আরোণ তাকে জীবিত ছাড়বে না। কিন্তু ক্যামেলিয়ার ও-ই লোককে যেকোনো মূল্যে জীবিত চাই৷ আরোণের আগে ক্যামেলিয়ার ও-ই লোককে খুঁজে বের করতে হবে। তা-ই সে মাথা নেড়ে মিথ্যা বলে,
“ দেখি নি। “
আরোণ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মেয়েকে আর প্রশ্নের সমাহার নিয়ে জেরা করে না। বরং দাঁড়িয়ে বলে,
“ তুমি এখানেই বসো। আমি কামরা পরিষ্কার করানোর ব্যবস্থা করাচ্ছি। চিন্তা নেই, তোমার কামরাকে আবার আগের মতো পরিষ্কার করে দেওয়া হবে। “
আরোণ চলে যায়। ক্যামেলিয়া কিছু না বলে নীরবে আকাশে চাঁদের পানে তাকায়। হুট করেই সে অস্ফুটে বলে উঠে,
“ দুঃখিত মা। আমি তোমার ভালো মেয়ে হতে পারি নি। আমাকে ক্ষমা করে দিও। “
__________
জোসেফের বাড়ির আঙিনায় দূরত্ব বজায় রেখে পাশাপাশি হাঁটছে দু'জন মানুষ। সন্ধ্যা থেকে তীব্র তুষারপাত হচ্ছে। এ-ই তুষারপাতের মাঝেও ইয়ান বাড়ির ভেতর যেতে রাজি হলো না। বললো বাহির থেকেই কথা বলে চলে যাবে সে, তার আবার বাড়ি ফিরতে হবে। ইয়ানের মুখের উপর তাকে আর জোর করে না জোসেফ কিংবা জোয়ান্দ্রা। মাহশাও আপত্তি না করে ইয়ানের সঙ্গে বেরিয়ে আসে।
ইয়ান ধীর কদমে বরফ কণায় পা মাড়িয়ে প্রশ্ন করে,
“ এখানে কোনো অসুবিধা হচ্ছে তোমার? “
মাহশা দৃষ্টি নত রেখেই উত্তর দেয়,
“ খুব একটা না। “
ইয়ান বলে,
“ শুনেছি তোমার পরিবার নেই। যাদের সঙ্গে থাকতে তাদের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছুক? আমি জাহাজের ব্যবস্থা করে দিবো? “
মাহশা এ-ই পর্যায়ে চোখ তুলে প্রশ্ন করে,
“ তুমি নৌ পথের সৈন্য? “
পাল্টা প্রশ্নে ইয়ান কিছুক্ষণ নীরব রয়। মাহশার কৃষ্ণ চোখের পানে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলে,
“ না। আমি যুদ্ধক্ষেত্রে ময়দানে থেকে লড়াই করি। জলপথে আমার কোনো কাজ নেই। “
মাহশা মাথা নত করে ছোট করে ওহ বলে। ইয়ান লক্ষ্য করে মাহশা অতি সাবধানে নিজের ফিরে যাওয়া সংক্রান্ত প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়েছে। সে তা-ই আর এ ব্যাপারে কিছু না বলে কথা ঘোরাতে প্রশ্ন করে,
“ কেমন লাগছে আমাদের রাজ্য? “
মাহশা মুখ কালো করে বলে,
“ কি জানি! রাজ্যের কিছুই তো দেখি নি। বিগত দিনগুলো এ-ই বাড়ির সীমানার ভেতরেই আবদ্ধ আছি। “
বলতে বলতেই অসাবধানবশত বরফের কারণে পিচ্ছিল ভূমিতে পা রাখার ফলস্বরূপ মাহশার পা পিছলে যায়। ভারসাম্য বিগড়ে পড়ে যেতে নিলেই ইয়ান দ্রুত একহাত বাড়িয়ে তার হাত ধরে ফেলে। বাড়ির ভেতর থেকে জানালা দিয়ে উঁকি মেরে তাদের উপর নজর রাখা জোসেফ এ-ই দৃশ্য দেখেই আঁতকে উঠে। বিড়বিড়িয়ে উঠে,
“ গেলো রে! কাউন্ট গেলো। “
টেবিলে বসে খাবার খেতে ব্যস্ত জোয়ান্দ্রা স্বামীর এরকম আচরণে বিরক্ত হয়। কপট রাগ দেখিয়ে বলে,
“ তুমি এভাবে উনাদের উপর নজর কেন রাখছো? “
জোসেফ নিচুস্বরে বলে,
“ ওসব তুমি বুঝবে না। রাজ্য পাহারা দেওয়ার থেকে কাউন্টের হৃদয় পাহারা দেওয়া বেশি জরুরী। বাপের মতো যদি অন্য রাজ্যের মেয়ের প্রেমে পড়ার মতো অঘটন ঘটিয়ে ফেলে? “
ক্লাডিয়াস খেতে খেতে জবাব দেয়,
“ অহেতুক চিন্তা করছো বাবা। কাউন্ট বোকা নন। উনি কেন ভিন্নধর্মী কারো প্রেমে পড়বেন? “
জোসেফ ছেলের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে বলে,
“ ব্যাটা, এই রাজ্যে এক ভ্যাম্পায়ার এক মানুষের প্রেমে পড়ে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। এই ছেলে সেই প্রণয়েরই ফল। উনি যে ভিন্নধর্মী কারো প্রেমে পড়ে কিছু উৎসর্গ করবেন না, তার কোনো নিশ্চয়তা আছে? “
কথাটুকু শেষ করে জোসেফ বাহিরের দিকে তাকাতেই চমকে গেলো। দ্রুত পায়ে জানালা থেকে সরে এসে দরজার দিকে দৌড়ে এলো। জোসেফের এরকম আচরণে জোয়ান্দ্রা এবং ক্লাডিয়াস চমকালো। তারা একইসঙ্গে প্রশ্ন করে উঠলো,
“ কি হয়েছে? “
জোসেফ সে-ই প্রশ্নের উত্তর দিলো না। বরং দরজা খুলে বাহিরে বেরিয়ে যায় দ্রুত পায়ে। তবে ততক্ষণে যা ঘটার ঘটে গিয়েছে। তার বাড়ির উঠোন জনমানবশূন্য। দূরে টগবগ শব্দ তুলে চলে যাচ্ছে একটা ঘোড়া। যে-ই ঘোড়ার পিঠে বসে দুই ভিন্ন ধর্ম এবং জাতীয়তার মানুষ। জোসেফ সে-ই পানে তাকিয়ে বিড়বিড়িয়ে উঠে,
“ সর্বনাশ! “
__________
প্রকৃতি বড্ড নিষ্প্রাণ। চারিদিকে তীব্র নিস্তব্ধতা। মেঘে ঢাকা পড়ে আছে গোলাকার চাঁদ। রাতের আবছা অন্ধকারের মাঝেই রাজ্যের রাজধানীর বুকে বিচরণ চলছে এক শুভ্র রঙা ঘোড়ার। ঘোড়ার পিঠে বসে আছে দুজন যুবক এবং যুবতী। ইয়ানের অর্ধেক মুখখানা কালো রঙের এক প্যাচানো কাপড় দ্বারা আবৃত। সহজে কারো চোখে না পড়ার জন্য ক্লকের হুডটাও মাথায় টেনে রেখেছে। তার দু'হাতের সুরক্ষিত বেষ্টনীর মাঝে বসে মাহশা। আগ্রহী নয়নে দেখছে রাজ্যের প্রতিটা আনাচকানাচ। যেনো চিনে রাখছে প্রতিটা গলি। ইয়ান নিচুস্বরে প্রশ্ন করে,
“ ঠান্ডা লাগছে তোমার? “
মাহশা পিছু না ফিরেই মাথা নেড়ে না বলে। যদিও তার দেওয়া জবাবটা মিথ্যা। ভয়ংকর ঠান্ডা লাগছে তার৷ রাতের এই সময়টায় তাপমাত্রা খুব কমে যায়। ও-ই মুহূর্তে এন্ড্রুর রাজ্য ঘুরে দেখানোর প্রস্তাব নাকোচ করতে না পেরে সে তার সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে বসে। তাড়াহুড়োয় গায়ে গরম কাপড় জড়ানো হয় নি। মাহশা মিথ্যা বললেও ইয়ান বোধহয় সমস্যাটা ধরতে পারে। তা-ই তো সে ঘোড়া ঘুরিয়ে কাপড়ের বাজারের পথ ধরে। যেতে যেতে পথে মাহশাকে বিভিন্ন জায়গা চিনিয়ে দিতে থাকে। মাহশা বিচক্ষণ। এক দেখায়ই যতটুকু সম্ভব জায়গা গুলো চিনে রাখার প্রতি মনযোগী সে।
সুনশান রাস্তার দু'ধারে অসংখ্য বন্ধ কাপড়ের দোকান। রাস্তার মাঝ ধরে চলা ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা ইয়ান তখন দু পাশের দোকান গুলো পরখ করছে। হুট করে ইয়ান ঘোড়াটা একটা দোকানের নিকট নিয়ে একহাত বাড়িয়ে দোকানের বাহিরের দিকে ঝুলতে থাকা শাল গুলো থেকে একটা লাল রঙের শাল নিয়ে নেয়। চোখের পলকেই পিছন হতে মাহশার গায়ে জড়িয়ে দেয় শালটি। মাহশা চমকে পিছনে ফিরে তাকায়। তার মাথা এবং গলায় প্যাচানো ফিনফিনে ওড়নাটা বাতাসে উড়ছে।
মাহশা লক্ষ্য করে এন্ড্রু ক্লকের ভেতর কোমরের কাছ হতে একটা ছোট থলে বের করে উপর দিয়ে দোকানের ভেতর তা ছুড়ে মারে। থলেটা সে মুদ্রার তা বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হয় না মাহশার। লোকটা অনুমতি ছাড়া নেওয়া শালের মূল্য পরিশোধ করলো। মাহশা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কারো কাছে ঋণগ্রস্ত থাকা তার নীতি বিরুদ্ধ কাজ। নিজ রাজ্যে ফিরে যাওয়ার আগে সে এ-ই অপ্রোয়জনীয় শালের মূল্য অবশ্যই পরিশোধ করে যাবে।
ইয়ান ততক্ষণে ঘোড়া ঘুরিয়ে জঙ্গলের পথ ধরেছে। মাহশার সেদিকে খেয়াল নেই। সে হুট করেই প্রশ্ন করে,
“ শুনেছি এই রাজ্যে নাকি অপ্রাকৃতিক ভ্যাম্পায়ার নামক বস্তুর বসবাস ছিলো। কথাটা কি মনগড়া নাকি সত্যি? “
আচমকা এরকম প্রশ্নে ইয়ান অপ্রস্তুত হলেও তা প্রকাশ করে না। জঙ্গল পথে দৃষ্টি স্থির রেখে জবাব দেয়,
“ শুনেছি তো আমিও। কিন্তু কখনো স্বচক্ষে দেখি নি। তা-ই কোনো মন্তব্য করছি না এই ব্যাপারে। “
“ তোমাদের বিগত কাউন্টও নাকি রক্তচোষা ছিলো। উনার বংশধর এবং বর্তমান কাউন্ট যিনি উনিও কি রক্তচোষা? মানুষের রক্ত চুষে খায়? “
ইয়ানের কানে রক্তচোষা শব্দটা তীক্ষ্ণ লাগে। সে নিজেকে সামলে বলে,
“ আমাদের কাউন্ট রক্তচোষা নন। উনি সাধারণ মানুষ। উনাকে স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হয়েছে অনেকবার। “
মাহশা এবার আগ্রহী স্বরে প্রশ্ন করে,
“ কেমন দেখতে তোমাদের কাউন্ট? “
ইয়ান এ-ই পর্যায়ে নিজের দৃষ্টি তার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে থাকা মাহশার পানে স্থির করে। রাতের আধারেও মাহশার গভীর কালো দৃষ্টি যেনো সে স্পষ্ট দেখতে পায়। ইয়ানের দৃষ্টি শীতল থেকে শীতলতর হয়। শান্ত গলায় বলে,
“ রমণীদের ভাষ্যমতে সুদর্শন তিনি। শত্রুদের ভাষ্যমতে উনি শয়তানের পূজারী। মানুষ ভেদে উনাকে নিয়ে সকলের মতামত ভিন্ন। তোমার সঙ্গে কখনো উনার সাক্ষাৎ হলে তোমারও উনার প্রতি নিজস্ব মতামত তৈরী হতে পারে। যদিও কাউন্টকে কখনো দেখার সুযোগ হবে না বোধহয় তোমার। “
মাহশা আর কিছু বলে না। বাতাসের প্রকোপে তার চোখ আধবোজা হয়ে আসে। বাতাসের সঙ্গে কানে ভেসে আসে এক অতীত বার্তা। সঙ্গে সঙ্গে সে চোখ মেলে তাকায়। লক্ষ্য করে এন্ড্রুকে, যে ইতিমধ্যে মাহশার থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছে। মাহশা স্থবির দৃষ্টি মেলে দেখে এন্ড্রুর উজ্জ্বল সবুজ চোখ জোড়া। এ-ই মুহূর্তে তার কেন জানি এন্ড্রুকে কোনো মানুষ বলে মনে হচ্ছে না। বরং কোনো রূপকথার গল্পের বর্ণনা অনুযায়ী চরিত্র মনে হচ্ছে। মাহশা সঙ্গে সঙ্গে নিজের দৃষ্টি নত করে ফেলে। ঠিক সে-ই মুহূর্তে ঘোড়াটা থেমে যায়। এন্ড্রু অর্থাৎ ইয়ান বলে উঠে,
“ সামনে তাকাও মাহশা। “
এন্ড্রুর কথা অনুযায়ী মাহশা সামনের পানে তাকায়। তাকাতেই সে দেখে এক অপার্থিব দৃশ্য। জঙ্গলের এই শেষ সীমানাটা কোনো এক পাহাড়ের চূড়া। সে-ই চূড়া প্রান্তেই এসে থেমেছে এন্ড্রুর ঘোড়া। সুউচ্চ এই পাহাড় হতে নিচে চমৎকার সমুদ্রের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। মাহশা মুগ্ধ গলায় বলে,
“ কৃষ্ণসাগর! “
ইয়ান মৃদু হেসে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে দাঁড়ায়। হাত বাড়িয়ে মাহশাকেও নামতে সাহায্য করে। শান্ত গলায় বলে,
“ পুরো রাজ্যে এই পাহাড় চূড়া হতে কৃষ্ণসাগরের দৃশ্য আমার সবথেকে প্রিয়। “
মাহশা বিমুগ্ধ দৃষ্টি মেলে পাহাড় প্রান্তে গিয়ে দাঁড়ায়। আকাশের মেঘ ইতিমধ্যে সরে গিয়ে চাঁদ দৃশ্যমান হয়েছে। সে-ই চাঁদের আলোই সমুদ্রের বুকে প্রতিবিম্ব সৃষ্টি করে এক অবর্ণনীয় দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। সমুদ্র তীরের উত্তাল বাতাসে মাহশার মাথার কাপড় হুট করে পড়ে যায়। মুহূর্তেই উবে যায় মাহশার ঠোঁটের কোণে উপস্থিত থাকা মিহি হাসিও। হুট করে তার ভ্রম হয়। পুরো সাগরের রঙ লালে রূপান্তরিত হয়। যেনো এটা কোনো রক্তিম সমুদ্র!
ইয়ান আনমনে পাশ ফিরে তাকাতেই লক্ষ্য করে মাহশার মুখভঙ্গির মধ্যে লক্ষণীয় পরিবর্তন। তার দৃষ্টি সরু হয়ে আসে। নীরবে পর্যবেক্ষণ করে মাহশার চোখে ফুটে উঠা ব্যথাতুর ছাপ। ইয়ান কিছু বলার পূর্বেই মাহশা সমুদ্র থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে বলে,
“ আমাদের এখন ফিরে যাওয়া উচিত। “
ইয়ান আর কথা বাড়ায় না। মাথা নেড়ে ঘোড়ার দিকে এগিয়ে যায়। মাহশাও যায় তার পিছু পিছু। ঠিক সে-ই মুহুর্তেই জঙ্গলে এক গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে একটা ছায়া। যেনো এতক্ষণ ধরে সে ইয়ান এবং মাহশার উপর নজর রাখছিল।
__________
রাত বাড়ার সাথে শীতের প্রকোপও বাড়ছে ক্রমশ। জাহাজের ভেতর বরাদ্দকৃত কামরায় জানালার ধারে বসে আছে বেহজাদ। দৃষ্টি তার অথৈ সমুদ্রের পানে নিবদ্ধ। এই সমুদ্রের বুকেই তাদের বংশের প্রতিশোধের অধ্যায় শুরু হয়েছিলো। বেহজাদ মনে মনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় বোনকে রক্ষার পাশাপাশি এ-ই সমুদ্রের বুকেই সে নিজেদের প্রতিশোধ সম্পন্ন করে তবেই রাজ্যে ফিরবে।
আহ রোমানিয়ান সাম্রাজ্য! প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে এবং ঘুমোতে যাওয়ার আগে নিয়ম করে বেহজাদ ওই সাম্রাজ্য এবং ওই সাম্রাজ্যের রাজ পরিবারের ধ্বংস কামনা করতো এতদিন। এবার অবশেষে তার অপেক্ষার পালা শেষ হতে চলেছে। কি চমৎকার হতে চলেছে ভবিষ্যৎ! রোমানদের ধ্বংস রচিত হবে যুবরাজ বেহজাদ এবং রাজকুমারী জেইলানের হাত ধরে।
হুট করে ছোট্ট কক্ষের দরজায় করাঘাতের শব্দে বেহজাদের ভাবনার ইতি ঘটে। সে দরজার পানে তাকাতেই দেখে একজন ভৃত্য গোত্রের পুরুষ পিতলের থালি হাতে কক্ষে প্রবেশ করছে। কক্ষের মাঝখানে থাকা ছোট্ট টেবিল জাতীয় আসবাবের উপর থালিটা রেখে সে-ই পুরুষ বেরস গলায় বলে উঠে,
“ রাতের খাবার। “
বেহজাদ লক্ষ্য করে থালে কেবল এক বাটি স্যুপ এবং দু টুকরো বনরুটি। গতকালও যেই যুবরাজের আহারের জন্য টেবিলে সাজানো থাকতো হরেক রকমের কাবাব, পোলাও, আজ সে-ই যুবরাজের রাতের খাবারের আয়োজনই কতটা সীমিত! খাবার নিয়ে অবশ্য বেহজাদের খুব একটা মাথাব্যথা নেই। সে বিনা সংকোচে এ-ই সামান্য খাবার খেয়ে নিতে পারবে। তা-ই সে এ-ই ব্যাপারে কিছু না বলে বরং প্রশ্ন করে,
“ আর কতদিন লাগবে রোমানিয়া পৌঁছাতে? “
ভৃত্য এবার কিছুটা রসিকতা করে বলে,
“ সমুদ্র আর ভালো লাগছে না? চিন্তা নেই। অর্ধেক পথ পাড়ি দেওয়া হয়েছে ইতিমধ্যে, আর কিছুটা পথ বাকি। “
বেহজাদ ছোট্ট গোলাকার জানালা দিয়ে আবার সমুদ্র পানে তাকায়। বিড়বিড়িয়ে বলে,
“ আরেকটু অপেক্ষা করো জেইলান। তোমার ভাইজান তোমাকে ঠিকই খুঁজে নিবে। এ-ই যাত্রায় তুমি একা নও। “
চলবে…