প্রণয়তিথি
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৯.
মাহশাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে প্রাসাদে ফিরে আসতে ইয়ানের বেশ লম্বা সময় লেগে যায়। গভীর রাত তখন। প্রাসাদের সকলেই তখন ঘুম। নিজের কক্ষে ফেরার পূর্বে ইয়ান নিজের মায়ের কক্ষে উঁকি দেয়। আনাস্তাসিয়াও ঘুমে বিভোর। গতরাতে ক্যামেলিয়ার শিয়রে সারারাত জাগ্রত থাকায়, আজ জলদি ঘুমিয়ে পড়েছে সে।
ইয়ান মা'কে ঘুমন্ত দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। সাধারণত সে যতক্ষণ না প্রাসাদে ফিরে আনাস্তাসিয়া দু চোখের পাতা এক করে না। মা'য়ের এই অভ্যাসটা ইয়ানের পছন্দ নয়। তবে সে ভালো করেই জানে মানা করে কোনো লাভ নেই। কারণ মা'য়ের মন এতো সব কিছু বুঝে না, বুঝতে চায় না।
নিজের কক্ষে ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ইয়ান গায়ের ক্লক খুলছিলো। হুট করেই কামরার দরজায় করাঘাতের শব্দ হয়। ইয়ান অবাক হয়। এতো রাতে কে জেগে? সে গলা উঁচিয়ে অনুমতি দিতেই বিশাল দরজার দু পাশ খুলে যায়। কামরায় প্রবেশ করে প্রফুল্ল নাওমি। তার পিছন পিছন প্রবেশ করে দু'জন দাসী। নাওমি তাদের ইশারা করতেই তারা নিজেদের হাতে থাকা খাবারের থালা নিয়ে বারান্দায় চলে যায়। ইয়ান ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে,
“ জেগে আছিস এখনো? “
নাওমি হেসে বলে,
“ হ্যাঁ, জেগেও আছি আর ক্ষুধার্তও। আজকে তোমার সঙ্গে খাবো দেখে এখনো কিছু খাই নি। তাড়াতাড়ি চলো, পেটে ইদুর দৌড়াচ্ছে আমার। “
নাওমির কথার মাঝেই বারান্দা থেকে দাসী দু'জন এসে বলে,
“ প্রিন্সেস, টেবিলে খাবার সাজিয়ে রেখে এসেছি আমরা। লণ্ঠনে আগুনও ধরিয়ে দিয়ে এসেছি। আর কোনো হুকুম? “
নাওমি মাথা নেড়ে বলে,
“ উহু। তোমরা যেতে পারো। “
দাসীরা বেরিয়ে যেতেই নাওমি গিয়ে ভাইয়ের হাত ধরে টেনে বারান্দায় নিয়ে যায়। দু'জন পাশাপাশি ডিভানে বসে৷ ইয়ান লক্ষ্য করে সামনে টেবিলে সাজানো তার প্রিয় সব খাবার। নাওমি হেসে বলে,
“ আমাকে ধন্যবাদ বলতে হবে না। মাঝেমধ্যে ভাইয়ের জন্য আয়োজন করা আমার কর্তব্য। তোমার পছন্দ হয়েছে? “
ইয়ান সরু চোখে নাওমির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
“ আগে বল তোর কি চাই? “
নাওমি দাঁত দিয়ে জিভ কাটে। তার ভাই খুব চালাক। এক মুহূর্তে ধরে ফেললো যে নাওমি কোনো আবদার নিয়ে এসেছে। তাই নাওমি আর কথা না ঘুরিয়ে বলে,
“ জঙ্গলের সে-ই ঘটনার সূত্র ধরে মা আর বাবা আমার স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে। বলে কি-না, আমার প্রাসাদের বাহিরে যাওয়া নিষেধ। তুমি বলো ভাই, চার দেয়ালের ভেতর বন্দী থাকা কি আমার সঙ্গে যায়? “
ইয়ান বুঝতে পারে নাওমির মূল সমস্যা কি। সে ডিভানে পিঠ এলিয়ে দিয়ে বলে,
“ এখন আমি কি করতে পারি? “
নাওমি নিজের সুমিষ্ট কণ্ঠে সবটুকু মধু এবং নম্রতা ঢেলে দিয়ে বলে,
“ তুমি তো আমার সেরা ভাই। সকল কাউন্টদের মাঝে শ্রেষ্ঠ কাউন্ট। তোমার এক হুকুমই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য সবাই। তুমি মা এবং বাবার সঙ্গে কথা বলো। তোমার মুখের উপর কেউ কথা বলতে পারবে না। “
ইয়ান নাওমির আশায় পানি ঢেলে দিয়ে বলে,
“ অসম্ভব। মা বাবা হিসেবে উনারা তোর ভালোর জন্য কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সেটার মাঝে হস্তক্ষেপ করার ইখতিয়ার রাখি না আমি। আর তাছাড়া উনাদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমিও একমত। শুধু প্রাসাদ থেকে নয়, তোর জন্য তো কামরা থেকেও বের হওয়া নিষিদ্ধ করা উচিত। তুফানের মতো চলাফেরা করিস, আর সঙ্গে করে বিপদ নিয়ে ঘুরিস শুধু। “
নাওমি মুখ কালো করে ফেলে। ভাই যে এরকম কোনো উত্তর দিবে তা সে আগেই আন্দাজ করেছিলো। তা-ই এবার বাধ্য হয়ে সে নিজের অন্য হাতিয়ার বের করে। এগিয়ে গিয়ে সাজানো খাবার থেকে একটা মিষ্টি তুলে নিজের মুখে দিয়ে সে হেসে বলে,
“ আজ ফিরতে এতো দেরি হলো তোমার। কোথায় ছিলে? জোসেফের বাড়ি গিয়েছিলে বুঝি? “
নাওমির কথায় ইয়ান চমকায়। তবুও নিজের বিস্ময়তা আড়াল করে জবাব দেয়,
“ হ্যাঁ। কিছু কাজ ছিলো। তাই গিয়েছিলাম। “
নাওমি বলে,
“ কাজটা কি ও-ই মেয়ের সঙ্গে দেখা করা ছিলো? কি যেনো নাম? মাশা… মশা… ওহ হ্যাঁ মাহশা! “
ইয়ান এবার বিস্ময়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। নাওমি মাহশার কথা জানলো কি করে? তার পিছনে কি গুপ্তচর লাগিয়েছে? উঁহু। অসম্ভব। তার বোন এই দুঃসাহস কখনোই করবে না। তাহলে? কেউ কি তাহলে তার গোপন কথা নাওমিকে জানিয়েছে? কে দেখিয়েছে এ-ই দুঃসাহস? জোসেফ? কেভ? ক্লাডিয়াস? হুট করেই ইয়ানের মাথায় অন্য আরেকটা নাম উঁকি দেয়। ক্যামেলিয়া!
ইয়ান সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করে,
“ ক্যামি জানিয়েছে তোকে এসব? “
নাওমি মুখ লটকে বলে,
“ হ্যাঁ। তুমি আমাকে বোন না মানলেও অন্তত ক্যামি আমাকে নিজের বোন মানে। আমার জানা ছিলো না, তুমি আমাকে এতটা অবিশ্বাস করো। “
ইয়ান বলে,
“ কে বলেছে তোকে বোন মানি না? “
“ বাবা আর কাউন্ট আপন ভাই ছিলেন না। ধরতে গেলে এই রাজবংশের সাথে আমাদের কোনো সূত্রই নেই। তা-ই মনে হয় তুমি আমার থেকে বেশি ক্যামিকে বিশ্বাস করো। ওর সাথে তোমার যোগসূত্র আছে। আমার সঙ্গে নেই। “
কথাটা অনেকটা অভিমানী সুরে বলে নাওমি। ইয়ান অবাক হয়। নাওমি নিজ মনে এমন ধারণা সৃষ্টি করে বসে আছে? নিজ অজান্তে বোনের কষ্ট পাওয়ার কারণ হয়ে ইয়ান দুঃখ অনুভব করে। শান্ত গলায় বলে,
“ তুই ভুল বুঝছিস নাওমি। আমার কাছে ক্যামি এবং তোর গুরুত্ব সমান। ঈশ্বর সাক্ষী, আমি কখনো তোদের দু'জনের মধ্যে বিভেদ করি নি। “
নাওমি সঙ্গে সঙ্গে দাঁত বের করে হেসে বলে,
“ ইশ! আমি মজা করছিলাম। আমি তো জানি আমার ভাই আমাকে কতটা ভালোবাসে। তুমি চিন্তা করো না আমি মাহশার কথা কাউকে বলবো না। আমার উপর বিশ্বাস রাখতে পারো। “
ইয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতেই এবার নাওমি রয়েসয়ে বলে উঠে,
“ কিন্তু মাহশার ব্যাপারটা গোপন রাখার প্রেক্ষিতে আমার একটা শর্ত মানতে হবে তোমার। “
ইয়ান ঘাড় ঘুরিয়ে ভ্রু কুচকে তাকায়,
“ কি শর্ত? “
নাওমি হাসি হাসি মুখ করে বলে,
“ তুমি মা এবং বাবার সঙ্গে দেখা করে আমার উপর আরোপ করা এই শাস্তিদন্ড তুলে নাও। তাহলে তোমার এই গোপন খবরটা আমি সুরক্ষিত রাখবো। না-হয় ভেবে দেখো, রাজমাতা এ-ই ব্যাপারটা জানলে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে? “
ইয়ান স্পষ্ট বুঝতে পারে বোনের ছুড়ে দেওয়া নীরব হুমকি। সে নীরবে বসে রয়। কয়েক পল পেরিয়ে যেতেই বলে উঠে,
“ তোর স্বাধীনতা হরণ করা হবে না। আমি কথা বলবো এ-ই ব্যাপারে আগামীকাল। কিন্তু মাহশার কথা যেনো কেউ না জানে। “
মাহশা খুশি হয়ে ভাইকে জড়িয়ে ধরে উৎফুল্ল গলায় ধন্যবাদ জানায়। ইয়ান বেশ ক্লান্ত অনুভব করছে। সে বোনের মাথায় কিছুটা হাত বুলিয়ে দিয়ে ডিভানে আবার গা এলিয়ে দেয়। নাওমি সোজা হয়ে বসে এক মুহূর্ত দেখে ভাইকে। সে জানে ভাই পরীক্ষাবিহীন কখনো টেবিলে সাজানো খাবার মুখে তুলবে না। তা-ই নাওমি কোনো দাসীকে না ডেকে বরং নিজেই এক এক করে সব খাবার কিছুটা মুখে দিয়ে খেতে শুরু করে। ইয়ান লক্ষ্য করে তা। ব্যস্ত হয়ে বলে,
“ কি করছিস? “
নাওমি উত্তর না দিয়ে বরং আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করে,
“ মেয়েটা দেখতে কেমন ভাই? খুব সুন্দর? তোমার পছন্দ হয়েছে? “
মাহশা সুন্দর কি-না প্রশ্নের পিঠে ইয়ানের দৃষ্টিপটে ভেসে ওঠে একটা সুশ্রী মুখ। চন্দনের মতো উজ্জ্বল রঙা মুখখানা, তীক্ষ্ণ মুখ গঠন, শীতল এবং গভীর দৃষ্টি, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব। এতদূর ভাবতেই ইয়ান বাস্তবতায় ফিরে আসে। অনিচ্ছুক ভান দেখিয়ে বলে,
“ মেয়েটা মুসলিম। অহেতুক প্রশ্ন করে বিভ্রান্তিতে ফেলিস না আমাকে। শীঘ্রই ওকে ওর রাজ্যে ফেরত পাঠাবো আমি। “
__________
ক্যামেলিয়ার শারীরিক স্থিতি গত দু'দিনে ধীরে ধীরে পূর্বের অবস্থায় ফিরে এসেছে। তবে এখনো সে অনেকটা নজরবন্দি অবস্থায় আছে। সারাক্ষণ তার আশেপাশে কেউ না কেউ প্রহরীর ন্যায় ঘুরঘুর করছে। ক্যামেলিয়া ভালো করেই জানে এসব তার পিতার আদেশেই হচ্ছে। তবে ব্যাপারটা তার কাছে বেশ বিরক্তিকর ঠেকে। দু'দিনেই হাপিয়ে উঠেছে সে।
অবশেষে জঙ্গলের ভেতর এই নেকড়ে ভর্তি প্রাসাদে আর মন না টেকায় সে বাধ্য হয়ে নিজের বাবার কাছে আবদার করে যে সে দুটো দিনের জন্য রাজধানী হতে ঘুরে আসতে চায়। আরোণ মেয়েকে কোথাও যেতে দিতে নারাজ। ক্যামেলিয়া বেশ আকুতি করে বলে যে সে নিজের সঙ্গে করে খেয়াল রাখার জন্য ক্রিনাকে নিয়ে যাবে। আরোণ তবুও রাজি হচ্ছিলো না। তবে একটা পর্যায়ে মেয়ের জেদের সামনে বাধ্য হয়ে হার মানতে হয় তাকে।
ক্যামেলিয়াকে অনুমতি দেয় রাজধানী যাওয়ার। তবে সঙ্গে করে শর্ত জুড়ে দেয় যে এক মুহূর্তের জন্যও যেনো ক্রিনার নজরের বাহিরে না যায় সে। বাবার শর্ত মেনে নিয়ে ক্যামেলিয়া খুশিমনে ক্রিনাকে সঙ্গে নিয়ে সিবিউ প্রাসাদে উপস্থিত হয়। সকলের সঙ্গে দেখা করে যখন সে কাউন্ট ইয়ানের সঙ্গে দেখা করতে রাজসভার দিকে যেতে নেয়, তখনই পথিমধ্যে সাক্ষাৎ হয় তার প্রধান সেনাপতি কেভের সঙ্গে।
না চাইতেও ক্যামেলিয়াকে দেখে কেভের কদম থামাতে হয়। সুস্থ সবল ক্যামেলিয়াকে দেখে তার অন্তরের ঘৃণার পারদ যেনো আরো কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তবুও সে বাধ্য গলায় বলে,
“ স্বাগতম লুনা। “
ক্যামেলিয়ার ঠোঁটের কোণে মিহি হাসি। সে তার পিছনে উপস্থিত ক্রিনাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“ তুমি কক্ষে ফিরে আমার অপেক্ষা করো ক্রিনা। “
ক্যামেলিয়ার কথাটা যেনো ক্রিনার বিশেষ পছন্দ হলো না। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে দেখলো কেভকে। ক্রিনার ধারণা মতে তাদের লুনা ক্যামেলিয়া বোধহয় এই সেনাপতির প্রতি আগ্রহী। তার এই ধারণা যদি সত্যি হয় তাহলে ব্যাপারটা কি ভয়ংকর হবে ভাবতেই তার মেজাজ গরম হয়। তবুও সে কোনো প্রতিবাদ না করে ক্যামেলিয়ার আদেশ পালন করে।
ক্রিনা প্রস্থান করতেই ক্যামেলিয়া কেভকে পরখ করে। কেভের সে-ই দৃষ্টি সহ্য হয় না। সে-ও প্রস্থানের উদ্দেশ্যে পা বাড়াতে নিলেই ক্যামেলিয়া এক হাত তুলে তার পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে রয়। কেভ সঙ্গে সঙ্গে আশেপাশে তাকায়। ভাগ্যিস আপাতত কেউ এদিকটায় নেই৷ প্রধান সেনাপতি কেভ এ-ই পর্যায়ে ক্যামেলিয়ার চোখে চোখ রেখে বলে উঠে,
“ পথ কেনো রোধ করছেন? “
ক্যামেলিয়া আবেদনময়ী ভঙ্গিতে এক হাত কেভের বুকের বা পাশটায় রেখে নিচু স্বরে বলে,
“ শুনেছি ওদিন আমাকে উদ্ধারকারী ব্যক্তিটি তুমি ছিলে। আমার জীবন বাঁচিয়েছো। আমার তরফ থেকে একটা ধন্যবাদ প্রাপ্য নিয়ে। “
অন্য সময় হলে বোধহয় ক্যামেলিয়ার এই বিনা অনুমতিতে করা স্পর্শকে কেভ না চাইতেও প্রশ্রয় দিতো। কিন্তু বর্তমানে এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে তার নিকট এই স্পর্শ বিষ তূল্য মনে হচ্ছে। সে এক ঝটকায় ক্যামেলিয়ার হাত সরিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে,
“ আপনার মতো একটা নোংরা নেকড়ের জীবন বাঁচানোর আফসোসে ইতিমধ্যে পুড়ছি আমি। তাই আমার থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকুন। আর আপনার এ-ই হুটহাট অনুমতিবিহীন কাছে আসার অভ্যাসটা আমার দৃষ্টিতে আপনাকে বেলাজ হিসেবে চিহ্নিত করে। নেকড়েদের রাজ্যে আপনি আলফার মেয়ে হতে পারেন, তবে লোকসমাজে আপনার মূল্য শুধুমাত্র একটা পশুর সমান। এখন থেকে অনাধিকার চর্চা করার পূর্বে এ-ই কথাগুলো মাথায় রাখবেন। “
নিজের কথা শেষ হতেই কেভ ক্যামেলিয়ার পাশ কেটে গটগট পায়ে সেখান থেকে প্রস্থান করে। ক্যামেলিয়া স্তব্ধ মূর্তির ন্যায় আপন জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়। কেভের বলে যাওয়া প্রত্যেকটা শব্দ তার মস্তিষ্কে সুঁইয়ের মতো বিধেছে। নিজেকে হুট করেই কোনো নর্দমার কীট তূল্য মনে হলো তার। অপমানে থমথমে মুখ নিয়ে ক্যামেলিয়া ঘুরে তাকায়। দ্রুত কদমে হেঁটে প্রাসাদের দো তলায় তার জন্য বরাদ্দকৃত কামরায় ফিরে আসে। সঙ্গে সঙ্গেই দেখতে পায় কামরায় উপস্থিত ক্রিনাকে। ক্যামেলিয়া আর এক মুহূর্ত অপচয় না করে বলে,
“ আমি এ-ই মুহূর্তে আমার প্রাসাদে ফিরে যেতে চাই ক্রিনা। “
হুট করে ক্যামেলিয়ার এহেন কথায় ক্রিনা চমকায়। আগ্রহী গলায় প্রশ্ন করতে নেয়,
‘’ কি হয়ে… “
পুরো প্রশ্নটা শেষ করার পূর্বেই ক্যামেলিয়া একপ্রকার হিংস্র স্বরে গর্জন তুলে বলে উঠে,
“ আমি এ-ই মুহূর্তে বাসকোভ প্রাসাদে ফিরবো। আমার সঙ্গে যাবে কি-না সেটা তোমার ইচ্ছা। তুমি না গেলে আমি একাই ফিরে যাবো। “
ক্রিনার আর কিচ্ছু প্রশ্ন করার সাহস হয় না। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে কিছু একটা হয়েছে। তবে কি হয়েছে সেটা আপাতত তার না জানলেও চলবে।
__________
সন্ধ্যা গড়িয়ে কেবল রাত নেমেছে তখন। মাহশা অতি সাবধানে ঘর ছেড়ে উঠোনে বেরিয়ে এলো। তার চোখে মুখে সতর্কতার ছাপ। জোয়ান্দ্রা গত রাত থেকে বেশ অসুস্থ। অসুস্থতার ভারে আজ সে আগেভাগে খেয়ে বিছানায় ঘুমোতে চলে গিয়েছে। জোসেফ এবং ক্লাডিয়াসেরও বাড়িতে ফিরতে বেশ দেরি হবে। এই মোক্ষম সুযোগটাকে মাহশা কোনমতেই হাতছাড়া করতে চায় না।
আঙিনার এককোণে থাকা ঘোড়ার পালের সামনে ঘুরে দেখে মাহশা। সঙ্গে সঙ্গেই সে হতাশ হয়। একটাও ঘোড়া উপস্থিত নেই সেখানে। রাজ প্রাসাদে যাওয়ার রাস্তাটা সেদিন এন্ড্রু চিনিয়ে দিয়েছিলো তাকে। কিন্তু এখন পায়ে হেঁটে তো এতো কম সময়ে তার প্রাসাদে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। চিন্তিত মাহশা বাড়ির আঙিনা সীমা পেরিয়ে বের হয়। জোসেফের এ-ই বাড়ি থেকে কিছুটা পথ হাঁটলেই আশেপাশে আরো বেশ বাড়িঘর আছে। বেশ কিছু বাড়িতেই ঘোড়া আছে বলে মাহশা জানে। এখন কি করা যায়? কারো বাসা থেকে কি ঘোড়া চুরি করবে সে?
নিজের প্রতিই হঠাৎ বিরক্ত হয় মাহশা। চুরি করার মতো একটা কাজ কখনোই তার উপর শোভা পায় না। পরমুহূর্তেই মাহশার মনে পড়ে সে এ-ই রাজ্যে যে-ই উদ্দেশ্যে এসেছে সেটার সামনে সামান্য চুরি কোনো বড়ো ব্যাপার না। ব্যাপারটা মনে পড়তেই মাহশা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মাথার কাপড়টা টেনে ভালো করে মুখ ঢেকে নিয়ে সে এগিয়ে যেতে নিলেই হুট করে সে চমকে পিছনে ফিরে তাকায়। ঘন, গভীর জঙ্গলের এই আড়াল থেকে কেউ তাকে অনুসরণ করছিলো বলে মনে হলো তার।
নিজের মনের চিন্তাকে সম্পূর্ণ পাশ কেটে যেতে পারে না মাহশা। সে নিশ্চিত হতে জঙ্গল পথে পা বাড়ায়। ধীরে ধীরে জঙ্গলের গহীন আঁধারে সে মিলিয়ে যেতেই জোসেফের বাড়ি প্রাঙ্গণে এসে উপস্থিত হয় এক ঘোড়া। সে-ই ঘোড়ার পিঠ হতে নেমে আসে এক সাধারণ পোশাক পরিহিত যুবক। দূর হতেই বাড়ির দরজা খোলা দেখে তার কপালে ভাজ পড়ে।
জঙ্গলে পা রাখতেই মাহশা লক্ষ্য করে যে তার ধারণা ভুল ছিলো না। একটা ছায়া এতক্ষণ ধরে তাকে অনুসরণ করছিলো। মাহশা জঙ্গলে পা রাখতেই ছায়াটা উল্টো পথে জঙ্গলের ভেতর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। মাহশা মনে সাহস রেখে তীক্ষ্ণ স্বরে প্রশ্ন ছুড়ে,
“ কে? কে ওখানে? দাঁড়াও বলছি। “
সঙ্গে সঙ্গে ছায়াটি দাঁড়িয়ে পড়ে। মাহশা দ্রুত কদমে এগিয়ে যায়। ক্লকের ভেতর কোমরের কাছে রাখা ছুরিটা দৃঢ় হাতে ধরে সে বলে উঠে,
“ কে তুমি? “
ছায়াটি এবার ধীরে ধীরে মাহশার দিকে ফিরে তাকায়। ভীন রাজ্যের মাটিতে পরিচিত মুখের দেখা পেতেই মাহশা চমকায়। ছায়া মানব সঙ্গে সঙ্গে এক হাঁটু গেড়ে তার সামনে বসে। মাথা নত করে বুকে হাত রেখে সম্মান প্রদর্শন করে বলে,
“ সালাম নিবেন রাজকুমারী জেইলান। “
মাহশা কিছু বলতে নিবে সে-ই মুহূর্তেই হুট করে পিছন হতে শুকনো পাতা মাড়ানোর শব্দ ভেসে আসে। মাহশা চমকায়। কিছু না ভেবেই সে কোমরবন্ধন থেকে খঞ্জরটা বের করে নিজের হাতের বাহুতে চালায়। মুহুর্তেই কাপড় এবং কাপড়ের ভেতর থাকা ত্বক কেটে রক্ত বেরিয়ে আসে। মাহশা দ্রুত খঞ্জরটা হাত থেকে ফেলে দিয়ে সামনে থাকা ছায়া মানবকে আদেশ করে এই মুহূর্তে এখান থেকে প্রস্থান করতে। রাজকুমারীর আদেশ যথাযথ পালন করতেই ছায়া মানবটা চোখের পলকেই সামনে থেকে প্রস্থান করলো। মাহশা চোখ মুখ কুচকে, ব্যথার ছাপ ফুটিয়ে হাতের ক্ষত জায়গাটা চেপে ধরে সঙ্গে সঙ্গে মাটির উপর বসে পড়ে আর্তনাদ করে উঠে।
চলবে…