ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়তিথি

১০ম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

প্রণয়তিথি

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

১০.

মাননীয় বাদশাহ,

চিঠির শুরুতেই আমার সালাম নিবেন। আমি এ-ই উনত্রিশ বছরের জীবনদশায় কখনো আপনাকে অসম্মান করি নি কিংবা আপনার অবাধ্য হই নি। সর্বদা একটাই চেষ্টা ছিলো আমার। তা হলো আপনার উপযুক্ত সন্তান হওয়া। কিন্তু এ-ই প্রথমবার আপনার কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমি একমত হতে পারছি না। বাবা, ওই রাজ্যে আমাদের হয়ে প্রতিশোধ নিতে যাওয়া মেয়েটা আপনারই সন্তান। মেয়েটা সিংহাসনের উত্তরাধিকার হলেও আপনার সন্তান, না হলেও আপনার সন্তান। প্রতিশোধের খেলায় অন্ধ হয়ে জেইলান আগুনে ঝাপ দিয়েছে। আমার জীবন সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আপনারাও ওকে বাধা দিলেন না। কিন্তু আমার বিবেকের কাছে আমি প্রতিটা মুহূর্তে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছি। বিবেকের দংশনে পুড়ে ছাড়খার হওয়া সম্ভব নয় আমার পক্ষে। তা-ই, আপনার অনুমতি ছাড়াই আমি রোমানিয়ায় যাচ্ছি। চিন্তা করবেন না, আমার কিছু হবে না। ইন্তেকামের শেষ অধ্যায়ের ইতি টেনে জেইলানকে সঙ্গে নিয়েই ফিরবো আমি। ফিরে এসে আপনার অবাধ্য হওয়ার শাস্তি কড়ায় গন্ডায় বুঝে নিতে প্রস্তুত আমি। আমার এবং জেইলানের জন্য দোয়ার দরখাস্ত রইলো। আল্লাহ হাফেজ।

ইতি,

যুবরাজ বেহজাদ

আরবি টানা অক্ষরে লেখা চিঠিটা বাদশাহ কামরান আতাউল্লাহ বিগত তিন দিনে মোট কতবার পড়েছে তার কোনো হিসেব নেই। বারবার উনি চিঠিটা পড়ছে আর সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে আঁতকে উঠছেন। উনার স্ত্রী বাদশাহ বেগম আয়েশা তিনদিন ধরে নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিয়ে উপোষ আছেন। দিনরাত জায়নামাজে বসে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছেন তিনি। নামাজের ফাঁকে ফাঁকে এসে স্বামীকে অনুরোধ করছে যেকোনো মূল্যে উনার ছেলেকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে।

কামরান আতাউল্লাহ স্ত্রীর অনুরোধের পিঠে নীরব ভূমিকা পালন করে চলেছেন। আজও উনার স্ত্রী আসলেন স্বামীর সম্মুখে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে অনুরোধ করতে, তবে কামরান আতাউল্লাহর তরফ থেকে কোনো বিশেষ প্রতিক্রিয়া না দেখে তিনি ক্ষুদ্ধ হোন। রেগে গিয়ে বলেন,

“ আপনি জেনে রাখুন, এক দাসীর সন্তানের জন্য যদি আমার ছেলের সামান্যতম ক্ষতি হয় তবে আমি চুপচাপ বসে থাকবো না। “

এ-ই পর্যায়ে কামরান আতাউল্লাহ আর নীরব থাকতে পারেন না। তিন দিনের জমানো রাগ স্ত্রী'র উপর ঝেড়ে তিনি চেঁচিয়ে উঠেন,

“ মুখ সামলে কথা বলো আয়েশা। যাকে তুমি দাসীর সন্তান বলছো, তার শরীরে আমার এবং এ-ই রাজ বংশেরই রক্ত বইছে। তোমার স্পর্ধা কি করে হয় রাজকুমারীকে অসম্মান করার? ভুলে যেও না তোমাকে বিয়ে না করলে তোমার মর্যাদা এখনো এক হেরেমের দাসী তূল্যই থাকতো। আর কখনো জেইলানকে অসম্মান করার দুঃসাহস দেখানোর ভুল করবে না। “

আয়েশার যেনো পিত্তি জ্বলে উঠলো। ও-ই দাসীর সন্তানের জন্য তাকে অপমান করলো বাদশাহ? এ-ই বংশকে একটা ছেলে সন্তান উপহার দেওয়ার পরও তার মূল্য নেই কোনো? অহংবোধে অন্ধ আয়েশা বলে উঠে,

“ আপনি আমাকে অপমান করলেন? তা-ও ও-ই সামান্য মেয়েটার জন্য? আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করছি যেনো ওই মেয়ে কখনো এই রাজ্যে ফিরে না আসে। যে-ই রক্ত ওর শরীরে বইছে বলে ওকে মর্যাদা দিতে বলছেন সে-ই রক্ত যেনো ওর শেষ পরিচয় না হয়। রোমানরা যেনো ওকে নিজেদের দাসী বানিয়ে রাখে। “

বলেই হনহনিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায় আয়েশা। বাদশাহ কামরান রাগে উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠে,

“ আয়েশা… “

আর কিছু বলতে পারেন না তিনি। বুকের বা পাশ চেপে ধরে বিছানায় ধপ করে বসে পড়েন। আবার বুক ব্যথাটা বেড়ে গিয়েছে উনার। কি একটা মুসিবত! এ-ই পরিস্থিতিতে বাদশাহর অসুস্থ হওয়ার অনুমতি নেই। যতক্ষণ না উনার ছেলে মেয়ে রাজ্যে ফেরত আসছেন ততক্ষণ উনার বহু দায়িত্ব সামলাতে হবে। সেসব দায়িত্ব অবহেলা করার কোনো অবকাশ নেই।

__________

মাহশার আর্তনাদের পিঠে শুকনো পাতা মাড়ানো পদধ্বনির শব্দ এবার তীব্র হলো। যেনো কেউ দৌড়ে এদিকটায় আসছে। মাহশা আরো বেশি আর্তনাদ শুরু করলো। ঠিক সে-ই মুহুর্তে উঁচু গাছের ফাঁক গলে আসা চাঁদের আলোয় একটা যুবককে দেখা গেলো। কোথা থেকে যেনো ছুটে এসে মাহশার সামনে বসে পড়লো। উদ্বেগ নিয়ে মাহশাকে প্রশ্ন করে,

“ কি হয়েছে মাহশা? “

মাহশা চোখ তুলে তাকায়। লক্ষ্য করে তার সামনে বসে থাকা ব্যক্তিটা আর কেউ নয় বরং এন্ড্রু। মনে মনে মাহশা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। এন্ড্রুর সঙ্গে ছলনা করা খুব কঠিন কোনো বিষয় নয় তার জন্য। এন্ড্রু ততক্ষণে ব্যস্ত নয়নে পুরো দৃশ্যটা পরখ করছে। মাহশার পায়ের নিকট পড়ে থাকা খঞ্জর এবং হাতের বাহু গড়িয়ে পড়তে থাকা রক্ত দেখে সে বুঝে যায় কেউ মাহশার উপর হামলা চালিয়েছে। এন্ড্রু রাগী স্বরে প্রশ্ন করে,

“ কোনদিকের পথ ধরে পালিয়েছে? “

মাহশা যন্ত্রণায় কাতর ভঙ্গি ধরে হাত তুলে ভুল দিক নির্দেশনা দেখিয়ে বলে,

“ ওদিকটায়। “

ইয়ান এক পল অপেক্ষা না করে মাহশার দেখানো পথ ধরে ছুটে। সঙ্গে সঙ্গে মাহশার মুখভঙ্গি পরিবর্তন হয়। যন্ত্রণার বদলে ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে রহস্যময়ী হাসি। যেনো এন্ড্রুকে বোকা বানিয়ে সে খুব বড়ো কোনো কাজ করে ফেলেছে। বেশ কিছুক্ষণ সময় পাড় হতেই আবারও কারো পদধ্বনি শোনা যায়। নিশ্চয়ই এন্ড্রু ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসছে। মাহশা মুখে আবারও যন্ত্রণা কাতর ভাব নিয়ে কাতরাতে শুরু করে।

ইয়ান এসে মাহশার সামনে বসে বলে,

“ কাউকে পেলাম না। বোধহয় পালিয়ে গিয়েছে। তুমি আমার সঙ্গে চলো, আগে তোমার হাতের জখম দেখাটা গুরুত্বপূর্ণ। “

মাহশা আপত্তি করে না। যন্ত্রণায় অশ্রু বিসর্জন দিতে দিতে এন্ড্রুর সাহায্যে উঠে দাঁড়ায়। ইয়ান বেশ সতর্কতার সহিত মাহশার এক হাত ধরে তাকে নিয়ে জোসেফের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

মাহশাকে নিয়ে বাসায় পৌঁছেই তাকে নিয়ে তার জন্য বরাদ্দকৃত কক্ষে প্রবেশ করে ইয়ান। মাহশাকে বিছানার এককোণে বসিয়ে দিয়ে নিজের গায়ের ক্লকটা খুলে রেখে সে ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে যায় পাত্র ভর্তি পরিষ্কার উষ্ণ পানি নিয়ে আসতে। মাহশা নিজেও এ-ই সুযোগে মাথার কাপড়টা টেনে বিছানার একপাশে রেখে, মুখ বিকৃত করে ক্ষতর পানে তাকায়। শীতকাল হওয়ায় বোধহয় কাঁটা জায়গাটা অতিরিক্ত জ্বলছে।

মাহশার ভাবনার মাঝেই ইয়ান পানির পাত্র হাতে কক্ষে প্রবেশ করে। পাত্রটা বিছানার একপাশে রেখে কাপড়ের তাকের মতো জায়গা থেকে মাহশার একটা পরিষ্কার ওড়না হাতে নেয়। কোনো কিছু না বলেই সে এগিয়ে এসে মাহশাকে গায়ের ক্লকটা খুলতে সাহায্য করতে লেগে পড়ে। মাহশা প্রথমে অপ্রস্তুত বোধ করলেও পরে আর কিছু বলে না। দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথাটুকু সহ্য করে কালো ক্লকটা খুলতেই ইয়ান দেখলো মাহশার হালকা আকাশি রঙা গাউনটা হাতার এদিক দিয়ে রক্তে মাখামাখি হয়ে আছে। ইয়ান কপাল কুচকে বলে,

“ খুব গভীরভাবে কেটেছে। “

মাহশা কোনো প্রতুত্তর করে না। কেবল এমন একটা ভাব করে যেনো তার খুব কষ্ট হচ্ছে। ইয়ান মাহশাকে বসিয়ে একটা কাঁচি হাতে এগিয়ে আসে। তীব্র ব্যথার মাঝেও মাহশা আঁতকে উঠে প্রশ্ন করে,

“ কি করতে চাইছো? “

ইয়ান সাবলীল গলায় বলে,

“ জামার হাতাটুকু না কাটলে আমি পট্টি করতে পারবো না। “

মাহশা বেশ ইতস্ত বোধ করে। তাদের রাজ্যে রাজ পরিবারের মেয়েদের মাথায় কাপড় ব্যতীত কোনো পর পুরুষের সামনেও যাওয়া নিষিদ্ধ। আর সেখানে কি-না তাকে এখন কাধ হতে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হাত নিয়ে এই পরপুরুষকে দিয়ে নিজের পট্টি করাতে হবে? অসম্ভব। মাহশা বেশ নিচু স্বরে বলে,

“ সাহায্যের প্রয়োজন নেই। আমি নিজেই পারবো। “

ইয়ান বোধহয় ব্যাপারটা ধরতে পারে। সে শান্ত গলায় বলে,

“ পর পুরুষের সংস্পর্শ নিয়ে নিষেধাজ্ঞা আছে তোমাদের ধর্মে? আমার তোমার ধর্ম নিয়ে খুব একটা ধারণা নেই। তবে এতটুকু নিশ্চিত থাকো যে আমি ন্যুনতম সীমালঙ্ঘন করবো না। চাচী মা অসুস্থ, ঘুমোচ্ছে। না-হয় উনাকেই ডেকে দিতাম তোমার সাহায্য করার জন্য। “

মাহশা আর কিছু বলতে পারে না। মুখে অস্বস্তি নিয়ে মাথা নিচু করে ফেলে সে। ইয়ানও আর কিছু না বলে নিজের কাজে লেগে পড়ে। প্রথমত পরিষ্কার ওড়নাটা একটানে ছিড়ে দুই ভাগ করে ফেলে সে। একভাগ ব্যবহার করে পানিতে ভিজিয়ে ক্ষত জায়গাটা পরিষ্কার করার কাজে। অতঃপর জঙ্গল থেকে ফেরার পথে বাড়ির আঙিনার সামনে থেকে ছিড়ে নেওয়া ঔষুধি গুণসম্পন্ন জড়িবুটি পাতা গুলো ক্ষতের উপর প্রলেপের মতো লাগিয়ে দেয়। তার উপর ওড়নার অপর ছেঁড়া অংশ দিয়ে পেঁচিয়ে চমৎকার করে পট্টি করে দেয়।

পুরোটা সময় মাহশা না চাইতেও এন্ড্রুকে লক্ষ্য করতে বাধ্য হয়। পরখ করে এক বোকা যুবককে। কি চমৎকার ভঙ্গিতে ছলনাময়ী জেইলানের হাতে পট্টি করতে ব্যস্ত সে! এমন না যে, জেইলানের ক্ষতে যন্ত্রণা হচ্ছে না। তবে এর থেকেও বড়ো যন্ত্রণা সে বয়ে বেড়াচ্ছে। সে-ই যন্ত্রণার সামনে এই সামান্য শারীরিক যন্ত্রণা কিছুই নয়। বরং নিজের পুরনো সেই ক্ষতের প্রেক্ষিতে সাজানো প্রতিশোধের এই খেলায় মাহশা পুরো রোমানিয়ান রাজ্যের বুকে আগুন জ্বালিয়ে দিতেও পিছুপা হবে না।

পট্টির কাজটুকু শেষ হতেই মাহশা বিছানার একপাশে রাখা পাতলা ওড়নাটা গায়ে পেঁচিয়ে নেয়। আবৃত করে নেয় নিজের বাহু, গলা এবং বুক। ইয়ানও ততক্ষণে পানির পাত্র রেখে হাত ধুয়ে ফিরে। মাহশার সামনে দাঁড়িয়ে এবার স্পষ্ট গলায় প্রশ্ন করে,

“ এবার বলো তুমি জঙ্গলের দিকে কি করছিলে? হাতে আঘাতটাই বা কে করলো? সম্পূর্ণ ঘটনা খুলে সত্যি করে বলো। “

সত্যি করে বলতে বললেই কি বিপরীত পক্ষ সত্য জবাব দেয়? এ-র কোনো নিশ্চয়তা আছে? উঁহু। নেই। মাহশাও সত্যিটা না বলে নিজের মনগড়া কাহিনী বলে,

“ মাতুশা অসুস্থ বলে আমি ভেবেছিলাম কিছু ভেষজ দিয়ে স্যুপ তৈরী করবো। উনার যেহেতু ঠান্ডার সমস্যা হচ্ছে তা-ই সেই অনুযায়ী ভেষজ ঘরে খুঁজে দেখি আমি। না পেয়ে ভাবি যে সামনে জঙ্গলের এদিকটায় আমি কাঙ্ক্ষিত ভেষজ দেখেছিলাম কিছুদিন পূর্বে। তা-ই সেটা সংগ্রহ করতে বেরিয়ে পড়ি। কিন্তু জঙ্গলের সীমানার ভেতর পা আমি লক্ষ্য করি কেউ একজন আড়ালে লুকিয়ে পাশের বাসার দিকে ওঁৎ পেতে আছে। বোধহয় চোর ছিলো। আমি সাহস করে সঙ্গে থাকা খঞ্জর বের করে তাকে ধরাসাই করতে যাবো, এমন মুহূর্তেই সে আমার খঞ্জর ছিনিয়ে নিয়ে পাল্টা আমার উপর আক্রমণ করে। আরো দু তিন ঘাঁ আঘাত করবে, তার পূর্বেই তোমার পায়ের শব্দ ভেসে আসে। সতর্ক হয়ে সে সঙ্গে সঙ্গে খঞ্জরটা ছুড়ে ফেলে পালিয়ে যায়। “

ইয়ান শুনে সবটা। অতঃপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে। আর একটাও বাড়তি প্রশ্ন করে না সে। মাহশা নিজেই এবার প্রশ্ন করে,

“ তুমি হঠাৎ এলে! তোমার চাচা কিংবা ক্লাডিয়াস তো বাসায় নেই। তাহলে? “

ইয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠে,

“ তোমাকে একটা খুশির সংবাদ দিতে এসেছিলাম। আগামীকালই একটা জাহাজ বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে তোমার রাজ্যের পথে রওনা হবে। তোমার তুরস্কে ফেরার বন্দোবস্ত করে এলাম। “

ইয়ানের কথায় মাহশার খুশি হওয়ার কথা ছিলো। তবে সে খুশি হতে পারলো না। তার ভেতরের জেইলান নামক সত্তাটা ফুসে উঠলে। তাকে ফেরত পাঠানোর বন্দোবস্ত করেছে মানে কি? এতো তাড়া তাকে ফেরত পাঠানোর?

মনের ক্ষোভ মনে চেপে গিয়ে মাহশা খুশি হওয়ার অভিনয় করে বলে,

“ যাক, অবশেষে! “

ইয়ান নিজের ক্লকটা গায়ে জড়িয়ে নিতে নিতে বলে,

“ প্রস্তুতি নাও তুমি। নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও। আগামীকাল তোমাকে বন্দরে পৌঁছে দিয়ে আসবে ক্লাডিয়াস। “

মাহশা অন্যমনস্ক হয়ে উত্তর দেয়,

“ গুছানোর মতো কিছু নেই। খালি হাতে এসেছিলাম। ফিরবোও খালি হাতে। “

ইয়ান নীরব রয়। আর একটাও কথা বলে না সে। তার যাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে আপাতত।

__________

কিছুটা ভীত ক্রিনা দুরুদুরু বুক নিয়ে আলফার কক্ষের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। মনে মনে আন্দাজ করতে পারছে সে হুট করে কেনো আলফা তাকে কামরায় ডেকেছে। তবে সে কি বলবে তা-ই এখনো ভেবে পাচ্ছে না। কক্ষের বাহিরেই উপস্থিত ছিল ক্রিয়াস। ক্রিনাকে দেখে দরজা খুলে দিয়ে বলে,

“ ভেতরে যাও। “

ক্রিনা নিঃশব্দে কক্ষে প্রবেশ করে। আলফা আরোণ রদ্রিগেজ তখন নিজ কক্ষে একটা টেবিলের উপর বেশ কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা কাগজে নজর বুলাতে ব্যস্ত ছিল। ক্রিনা এসে সম্মান জানাতেই সে চোখ তুলে সরাসরি প্রশ্ন করে,

“ ক্যামি যদিও প্রকাশ করছে না, তবে আমি নিশ্চিত কিছু একটা হয়েছে। এতো দ্রুত হুট করে জঙ্গলে ফিরে আসার কারণ কি? সিবিউ প্রাসাদে কি ঘটেছে? “

ক্রিনা নিজেকে স্বাভাবিক রেখে জবাব দেয়,

“ কিছু হয় নি আলফা। লুনার মন টিকছিলো না বোধহয় ওখানে। হুট করেই এসে আমাকে জানায় যে উনি নিজ প্রাসাদে ফিরতে চান। “

ক্রিনা ইচ্ছে করেই কেভের সঙ্গে ক্যামেলিয়ার সাক্ষাতের ব্যাপারটা চেপে যায়। যে-ই ব্যাপারে সে নিশ্চিত নয় সে-ই ব্যাপার নিয়ে কথা বলে সে আলফাকে রাগিয়ে দিতে আগ্রহী নয়। আরোণের নিকট ক্রিনার কথা বিশ্বাসযোগ্য ঠেকলো না। সে দু কদম এগিয়ে এসে থমথমে স্বরে বলে,

“ আমার থেকে কিছু আড়াল করবে না ক্রিনা। ফলাফল ভালো হবে না। “

ক্রিনা তবুও জবাব দেয়,

“ সত্যি বলছি আলফা, বিশ্বাস করুন আমাকে। “

আরোণ ইচ্ছে করেই আর জেরা করে না ক্রিনাকে। সে অনুমতি দিতেই ক্রিনা দ্রুত তার কামরা থেকে প্রস্থান করে। ক্রিয়াস প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কামরায় প্রবেশ করে। আরোণ আবারও কাগজগুলো মনযোগ দিয়ে দেখতে থাকে। ক্রিয়াস পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলে,

“ আলফা! আর কত খুঁজবেন আপনি? এ-ই অভিশাপ মুক্ত হওয়ার কোনো পথ থাকলে এতো বছরে আপনি তা নিশ্চয়ই পেয়ে যেতেন। “

আরোণ কিছুটা গম্ভীর স্বরে বলে,

“ অবশ্যই কোনো পথ আছে ক্রিয়াস। কেবল আমি তা খুঁজে পাচ্ছি না। আমাকে আরো খুঁজতে হবে। “

এতদূর বলেই আরোণ ফের প্রশ্ন করে,

“ ক্যামি কি নিজের কামরায়? “

“ জি। উনি রাজধানী থেকে ফেরার পর থেকে এক দন্ডের জন্য নিজ কক্ষ থেকে বের হয় নি। কিছু কি হয়েছে? “

আরোণকেও এ-ই পর্যায়ে কিছুটা চিন্তিত দেখালো। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে,

“ ওকে গিয়ে দেখে আসছি আমি। তুমি কাগজগুলো ভাজ করে সিন্দুকে রেখে দাও। এসে কথা বলবো আমি৷ “

আরোণ বেরিয়ে যায়। অগ্রসর হয় মেয়ের কক্ষের দিকে। দরজার সামনে গিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়ায়। দরজায় আলতো হাতে শব্দ করে ডাকে,

“ ক্যামি? “

বেশ কিছুক্ষণ সময় পেরিয়ে যায়। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ আসে না। আরোণ ধরে নেয় মেয়ের মন হয়তো কোনো কারণে খারাপ। তা-ই সে উত্তরের অপেক্ষা না করে নিজেই দরজা ঠেলে কক্ষে প্রবেশ করে। কিন্তু কক্ষে প্রবেশ করতেই সে বিস্মিত হয়। আরো একবার ডাকে,

“ ক্যামি? “

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন