ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়তিথি

১১তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

প্রণয়তিথি

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

১১.

গহীন অরণ্যের বুকে দৌড়ে চলছে এক হিংস্র নেকড়ে। দিকবিদিকশুন্য দৌড়ে চলা এ-ই নেকড়ে হুট করে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় এসে থেমে গেলো। তার গন্তব্যে পৌঁছে গিয়েছে সে। আকাশ পানে মাথা উঁচু করে ভয়ংকর এক গর্জন তুলে মুহূর্তেই সে নিজের মানবী রূপ ধারণ করলো। এটা ঠিক সে-ই জায়গা, যেখানে দিন কয়েক আগে ক্যামেলিয়া গুলিবিদ্ধ হয়েছিল।

ক্যামেলিয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে চারিপাশটা পরখ করে। তাকে গুলি করা ও-ই লোকটা… লোকটাকে এখন কোথায় খুঁজবে সে? ক্যামেলিয়ার কি এই জায়গাটাতেই অপেক্ষা করা উচিত হবে? যদি ওদিনকার মতো লোকটার দেখা পাওয়া যায়?

ক্যামেলিয়া কিছু পল একটা গাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে লোকটার অপেক্ষা করে। হুট করেই সে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। দৃষ্টি গিয়ে নিবদ্ধ হয় আকাশ পানে মলিন সুন্দর চাঁদটার দিকে। ক্যামেলিয়া চাঁদের প্রতি স্থির ধ্যানে যেনো হারিয়ে যায়। অনুভব করে তার নেকড়ে সত্তার চাঁদের প্রতি প্রবল টান। এই টানটা একটা সাধারণ মানুষ কখনোই অনুভব করতে পারবে না।

চাঁদ দেখতে দেখতে ক্যামেলিয়ার মনে পড়ে যায় কেভের বলা কথাগুলো। কেভ তার জীবন বাঁচিয়ে আফসোসে পুড়ছে বলেছিলো। কিন্তু সে-ই আফসোসের কারণটা কি? শুধুমাত্র ক্যামেলিয়ার একটা নেকড়ে মানবী হওয়া? কিন্তু এতে ক্যামেলিয়ার কি দোষ? তার বাবা একজন নেকড়ে মানব। আরোণের সন্তান হিসেবে ক্যামেলিয়ার ভেতর নেকড়ে সত্তা থাকাটা কি খুব অস্বাভাবিক কিছু?

ক্যামেলিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সে সবসময় ভাবতো ইয়ানের ওই প্রধান সেনাপতি বোধহয় তাকে ভয় পায়। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও কখনো ক্যামেলিয়া আন্দাজ করতে পারে নি যে ও-ই সেনাপতি তাকে ভয় নয় বরং ঘৃণা করে। শুধু কি ঘৃণায় সীমাবদ্ধ এ-ই অনুভূতি? কেভের দৃষ্টিতে ক্যামেলিয়ার জন্য উপযুক্ত শব্দ সমূহ হলো, নোংরা, বেলাজ, পশু।

এই তিনটা শব্দের ভীড়ে বেলাজ শব্দটা যেনো ক্যামেলিয়ার গলায় কাঁটার মতো বিধে আছে। তার হুটহাট ঠাট্টার ছলে কিছুটা কাছাকাছি যাওয়া কারো কাছে বিরক্তিকর ঠেকতে পারে, এটা তার কখনো খেয়ালই হয় নি। ক্যামেলিয়ার কি দোষ? মানুষের সান্নিধ্য তার খুব পছন্দ। বিশেষ করে ও-ই প্রধান সেনাপতির সান্নিধ্য বোধহয় একটু বেশিই পছন্দ।

ক্যামেলিয়ার ভাবনার মাঝেই হুট করে একটা গমগমে স্বর শোনা গেলো,

“ বেঁচে যাবে জানতাম। ফিরে আসবে এটাও জানতাম। তবে এতো দ্রুত ফিরবে সে-ই আন্দাজ করি নি। “

ক্যামেলিয়া চমকে পাশ ফিরে তাকায়। লক্ষ্য করে লম্বা ক্লক গায়ে জড়ানো এক পুরুষকে। একহাতে আগুনের লণ্ঠন ধরে সামান্য ঝুঁকে কিছু পাতা লতা ছিঁড়ছেন। ক্যামেলিয়া সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক ভঙ্গিতে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। শান্ত গলায় প্রশ্ন করে,

“ কে আপনি? “

লোকটা পিছু না ফিরেই জবাব দেয়,

“ হাতের জখম সেড়ে উঠতেই বুঝি আমাকে ভুলে গেলে? “

ক্যামেলিয়া নির্বিঘ্নে জবাব দেয়,

“ আপনি আমাকে সেদিন গুলি করেছেন। চিনতে মোটেও ভুল করি নি। তবে আপনার পরিচয় জানতে চাইছি আমি। নেকড়ে মানবদের অস্তিত্ব সম্পর্কে কি করে জানেন? কি করে জানেন যে রুপার বুলেট আমাকে ঘায়েল করতে সক্ষম? “

লোকটা বোধহয় মৃদু হাসলো। সে জবাব দেয়,

“ জানি তো অনেক কিছুই। তোমার সম্পর্কে, তোমার বাবার সম্পর্কে, তোমার বাবার অভিশপ্ত নেকড়ে মানব হওয়ার জীবনচক্র সম্পর্কে। সবকিছু জেনেই আমার জন্ম। “

ক্যামেলিয়া যেনো কোনো গোলকধাঁধায় বাধা পড়লো। লোকটার কথা তার নিকট অস্পষ্ট ধোঁয়াশার ন্যায় ঠেকলো। সে হিংস্র স্বরে বলে উঠে,

“ ক্ষতি সাধন করতে চাও নেকড়েদের? তা-ই বুঝি আমাদের আদিঅন্ত জেনেছো? উদ্দেশ্য কি তোমার? “

লোকটা কিছু বললো না। তার আগেই এক পাল জন্তুর দৌড়ে আসার শব্দ শোনা গেলো। ক্যামেলিয়া চমকে পিছনে ফিরে তাকালো। সহসা ঝড়ের বেগে তার সামনে এসে উপস্থিত হলো নেকড়ে রূপী আলফা। সঙ্গে রয়েছে গোটা পালের অর্ধেকটা। আরোণ মুহূর্তেই নিজের মানব রূপ ধারণ করলো। মেয়ের বাহু টেনে ধরে প্রশ্ন করে,

“ না জানিয়ে জঙ্গলে এসেছো কেনো? “

ক্যামেলিয়া বলে উঠে,

“ আমিতো… “

বলতে বলতে সে পিছনে লোকটাকে দেখার জন্য ফিরে তাকায়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সে দেখতে পায় তার পিছনে কেউ নেই। ক্যামেলিয়া চমকায়। তার কথা অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। সে ব্যস্ত পায়ে আশেপাশে লোকটাকে খুঁজে দেখে। এইমাত্র তো লোকটা এখানেই ছিলো! হুট করে চোখের পলকে কোথায় চলে গেলো?

ক্যামেলিয়ার এই অশান্ত রূপ পরখ করে আরোণ। পালের বাকিরাও লক্ষ্য করে তাদের লুনার অদ্ভুৎ আচরণ। আরোণ এবার এগিয়ে গিয়ে মেয়েকে ধরে স্থির ভঙ্গিতে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করে,

“ কি হয়েছে ক্যামি? এইখানে কেনো এসেছো তুমি? কি খুঁজছো তুমি? “

ক্যামেলিয়া চোখের ভেলকির ন্যায় ঘটে যাওয়া ঘটনাটা আরোণকে বলতে নিয়েও আর বলে না। শান্ত হয়ে যায় সে। স্বাভাবিক গলায় বলে,

“ কিছু না বাবা। “

আরোণ মেয়ের কথাটা বিশ্বাস করলো না। সে চারিপাশে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলায়। কোথাও সন্দেহজনক কিছু না দেখতেই সে গম্ভীর স্বরে মেয়েকে বলে,

“ প্রাসাদে ফিরে চলো। “

ক্যামেলিয়া মোটেও বিরোধিতা করে না। সে সকলের সঙ্গে প্রাসাদে ফিরে যেতে উদ্যত হয়। তবে ঠিক সে-ই মুহূর্তে তার কানের পাশ দিয়ে একটা শীতল হাওয়া বয়ে যায়। একটা পুরুষালি স্বর ফিসফিসিয়ে তার কানের কাছে বলে উঠে,

“ চিন্তা নেই, আমি তোমাকে খুঁজে নিবো। “

ক্যামেলিয়া ফের চমকে পিছনে ফিরে তাকায়। এইমাত্র সে স্পষ্ট কারো কণ্ঠস্বর শুনতে পেলো। কিন্তু কে ছিলো সে? এখানে তো কেউ-ই নেই! ক্যামেলিয়া লক্ষ্য করে অদূরে গাছের নিকট একটা জায়গা। কিছুক্ষণ আগে ও-ই লোকটা ঠিক ওখানে দাঁড়িয়েই মাটি হতে ঘাস পাতা ছিঁড়ছিলো। ক্যামেলিয়া মাটির ঠিক ও-ই জায়গাটা লক্ষ্য করতেই দেখে বেশ কিছু ঘাসশূন্য ওই জায়গাটুকুর মাটি কেমন আলগা হয়ে আছে। যেনো এইমাত্র কেউ ওখান থেকে ঘাস ছিঁড়েছে। অর্থাৎ ও-ই লোকটা সত্যিই এখানে ছিলো।

ক্যামেলিয়ার ভাবনার মাঝেই আরোণ তাকে ডাকে,

“ দাঁড়িয়ে পড়লে কেন, ক্যামি? “

ক্যামেলিয়া ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে স্বাভাবিক গলায় জবাব দেয়,

“ আসছি বাবা। “

নেকড়ে পালের সকলে সেখান থেকে প্রস্থান করতেই ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মতো কিছু একটা উড়ে আসতে দেখা যায়। কুণ্ডলীটা ধীরে ধীরে একটা মানুষের রূপ ধারণ করে। আবারও আগের জায়গায় ফিরে সে অজানা ব্যক্তিটি লণ্ঠন হাতে ঘাস লতা ছিঁড়তে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

__________

শক্ত বিছানায় কম্বল গায়ে জড়িয়ে জ্বরের প্রকোপে কাপছে মাহশা। সম্পূর্ণ শরীর তার উত্তপ্ত অগ্নিকুণ্ডের ন্যায় পুড়ে যাচ্ছে। জোয়ান্দ্রা তার শিয়রে বসে মাথায় জলপট্টি দিয়ে দিচ্ছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে মাহশার কক্ষে আসতেই দেখে এ-ই অবস্থা। হুট করে এক রাতের ব্যবধানে এরকম জ্বর কিভাবে বাধিয়ে ফেললো মেয়েটা তা-ই জোয়ান্দ্রা বুঝে উঠতে পারছে না।

জ্বরের ঘোরে মাহশা বিড়বিড়িয়ে নিজ মাতৃভাষায় কিছু একটা বলছে। জোয়ান্দ্রা কান পেতে তা শোনার চেষ্টা করে। তবে স্পষ্ট কথার অর্থ বুঝে উঠতে পারে না সে। আন্দাজ করে নেয় মেয়েটা বোধহয় নিজের মা কে স্মরণ করছে। জোয়ান্দ্রা পরম মমতায় মাহশায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে উঠে,

“ মাহশা? বেশি খারাপ লাগছে? একটু পানি খাবে? “

মাহশা কোনো প্রতুত্তর করে না। চোখ মেলেও তাকায় না। কামরার দরজায় ঠকঠক শব্দ হয়। জোয়ান্দ্রা উঠে গিয়ে দরজা খুলে কামরার বাইরে বেরিয়ে আসে। দরজার ওপারেই দাঁড়িয়ে ছিলো জোসেফ এবং ক্লাডিয়াস। চিন্তিত গলায় জোসেফ প্রশ্ন করে,

“ কি অবস্থা মাশার? “

জোয়ান্দ্রা কপালে ভাজ নিয়ে বলে,

“ ভয়ংকর জ্বর মেয়েটার। “

ক্লাডিয়াস বলে উঠে,

“ কিন্তু আজকে তো উনাকে নিজ রাজ্যে ফেরার উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে। “

জোয়ান্দ্রা চোখ পাকিয়ে বলে,

“ মেয়েটা ঠান্ডা এবং জ্বরে দম ফেলতে পারছে না। এই অবস্থায় কিভাবে ওকে একা ছাড়ি? এই মুহূর্তে সমুদ্রপথে এই লম্বা যাত্রার জন্য উপযোগ্য নয় ও শারিরীকভাবে। “

জোয়ান্দ্রার কথার পিঠে জোসেফ বলে,

“ কাউন্ট যে নিজ উদ্যোগে এই মেয়ের ফেরার ব্যবস্থা করলো, সেটার কি হবে? “

জোয়ান্দ্রা উত্তর দেয়,

“ তুমি কাউন্টের সঙ্গে কথা বলে দেখো। উনাকে মাহশার স্থিতি সম্পর্কে জানাও। মেয়েটা সুস্থ হোক, তারপর না-হয় ফিরে যাবে। “

জোসেফ আর কথা বাড়ায় না। স্ত্রীকে ওই অতিথি মেয়েটার দেখাশোনা করতে বলে সে পুত্র সমেত ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। ক্লাডিয়াস ঘোড়ায় করে সৈন্য শিবিরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। জোসেফ কেবল নিজ জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়। প্রাসাদে গিয়ে এখন আবার তার কাউন্টকে এই সামান্য ব্যাপার নিয়ে বিরক্ত করতে হবে।

__________

বসন্তের শুরুতেই আসন্ন সফরের পরিকল্পনা নিয়ে আজ সভায় মন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছে কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট। দীর্ঘ এই আলোচনায় উপস্থিত আছে তার চাচা ম্যাথিউ। রাজ্যের নৌ বাহিনীর সম্পূর্ণ ভারটাই ম্যাথিউর দায়িত্বে রয়েছে। তা-ই সভায় তার মতামতের গুরুত্বও ব্যাপক।

ঘন্টা দুইয়ের এ-ই আলোচনার পুরোটা সময় জোসেফ রাজসভার বাহিরে অপেক্ষমাণ ছিলো। সভা শেষে এক এক করে সবাই বেরিয়ে আসতেই জোসেফ নড়েচড়ে দাঁড়ায়। ম্যাথিউ বেরিয়ে এসে জোসেফকে দেখতেই প্রশ্ন করে,

“ কি খবর জোসেফ? “

জোসেফ মাথা নত করে সম্মান প্রদর্শন করে বলে,

“ কাউন্টের সঙ্গে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। “

ম্যাথিউ সামান্য হেসে বলে,

“ ভিতরে আছেন। গিয়ে দেখা করে নাও। আর উনার সঙ্গে দেখা করে আনা… মানে রাজমাতার সঙ্গে দেখা করে নিও। তোমাকে খুঁজছিলেন তিনি। আজকাল নাকি তোমার দেখাই পান না তিনি। “

জোসেফ মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে রাজসভার দ্বারে গিয়ে দাঁড়ায়। প্রহরীকে জানায় সে সে কাউন্টের সঙ্গে দেখা করতে চায়। প্রহরী ভেতরে গিয়ে কাউন্টের অনুমতি নিয়ে এসে দরজা খুলে দেয় জোসেফের প্রবেশের জন্য। জোসেফ কিছুটা দ্বিধা নিয়ে সভায় কাউন্টের সামনে হাজির হয়। সম্পূর্ণ সভাকক্ষে তখন সে আর কাউন্ট ইয়ান ব্যতীত কেউ নেই।

জোসেফ এক হাঁটু গেড়ে বসে কাউন্টকে সম্মান জানায়। ইয়ান সিংহাসন ছেড়ে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে,

“ সকালে প্রাসাদে এসেই দেখা করতে চাইলে। ব্যাপার কি? কিছু হয়েছে? “

জোসেফ সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,

“ কাউন্ট, সমস্যাটা হলো মাশাকে নিয়ে। ওর ভয়ংকর জ্বর এসেছে হঠাৎ করে। এ-ই অবস্থায় কি ওর জাহাজ সফর করাটা ঠিক হবে? “

কাউন্ট ইয়ানের কপালে সূক্ষ্ণ ভাজ দেখা দিলো। জ্বর মানে? গতকাল রাতেও তো সুস্থ ছিলো মেয়েটা। হ্যাঁ, হাতে কিছুটা জখম পেয়েছে। কিন্তু ইয়ান তো নিজ হাতে পট্টি করে দিয়ে এসেছিলো। জ্বর তো আসার কথা নয়। ইয়ান কিছুটা নিশ্চিত হতে প্রশ্ন করে,

“ জ্বর আসার কারণ কি? “

জোসেফ ভাবুক স্বরে বলে,

“ নিশ্চিত নই। রাতে যখন বাড়ি ফিরলাম তখন তো সুস্থ ভাবেই দরজা খুলে দিলো। কিন্তু সকালে জোয়ান্দ্রা ওর কামরায় গিয়ে দেখে জ্বরে কাতরাচ্ছে। “

ইয়ান মনযোগ দিয়ে শুনে সবটা। জোসেফের কথা শুনে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে মাহশা কাউকে রাতে জঙ্গলে ঘটে যাওয়া ও-ই ঘটনা সম্পর্কে জানায় নি। কিন্তু কেন? উদ্দেশ্য কি ওই মেয়েটার? এতো রহস্যময় কেন তাকে ঘিরে দাঁড় হওয়া বিষয়বস্তু গুলো? ইয়ানের গভীর ভাবনায় ফাটল ধরে জোসেফের ডাকে,

“ কাউন্ট, আপনার সিদ্ধান্ত কি এই ব্যাপারে? “

__________

মাতাল বাতাসের সঙ্গে আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে তুষার কণা। সমুদ্রের তীরবর্তী বন্দরের অবস্থা এখন সম্পূর্ণ শুভ্রতায় মোড়ানো। যদিও তুষারপাতের পরিমাণ খুব একটা তীব্র নয় তবে বাতাসের প্রকোপটা বেশ। বন্দরে আজ স্বাভাবিকের তুলনায় মানুষও খুব কম।

নির্দিষ্ট জায়গায় এসে ঘোড়া থামতেই কেভ ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে দাঁড়ায়। তার সঙ্গে আরো দুটো ঘোড়া রয়েছে। সে-ই দুই ঘোড়ায় রয়েছে জোসেফ এবং ক্লাডিয়াস। কেভের দেখাদেখি তারাও ঘোড়া ছেড়ে নেমে দাঁড়ায়। এগিয়ে যায় তাদের পিছু পিছু আসা ফিটনের নিকট।

ফিটনের একপাশের দরজা খুলে ক্লাডিয়াস পর্দাটা একপাশে সরিয়ে ধরে। ভেতর থেকে ধীর কদমে নেমে আসে মাহশা। গাউনের উপর নীল রঙের ভারী ক্লক গায়ে জোড়ানো তার। মাথায় প্যাঁচানো একটা কালো রঙের ওড়না। চোখ মুখ খুবই ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে তার৷ শরীরটাও বেশ দূর্বল দেখাচ্ছে। হাতে একটা ছোট কাপড়ের পুটলি। সেই পুটলিতে রয়েছে জোয়ান্দ্রার দিয়ে দেওয়া কিছু শুকনো খাবার, দু একটা পরিধেয় পোশাক এবং সামান্য কিছু উপহার।

মাহশা মলিন চোখ মেলে জোসেফের দিকে তাকায়। জোসেফেরও চোখ পড়ে তার দিকে। না চাইতেও লোকটার বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। সে খুব করে চাইতো এই মেয়েটা দ্রুত নিজের ঠিকানায় ফিরে যাক। কিন্তু এরকম অসুস্থ অবস্থায় মেয়েটাকে পাঠাতে তার মন সায় দিচ্ছে না। কিন্তু কি আর করার? কাউন্টের কড়া নির্দেশ, যেনো মাহশাকে আজই জাহাজে তুলে দেওয়া হয়। দু'দিন আগেও তুলোর মতো নরম হৃদয় নিয়ে ঘোরা কাউন্টের মনে হঠাৎ পাথর জেগে উঠলো কিভাবে তা-ই বুঝে আসছে না জোসেফের। তবে যা হয়েছে একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে। কাউন্ট ইয়ান অন্তত নিজের পিতার মতো প্রেমে মাতাল পুরুষ হয় নি, এটাই স্বস্তির ব্যাপার।

জোসেফ মাহশাকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“ যাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। সাবধানে যেও। জাহাজে থাকা লোকেরা আমার পরিচিত তা-ই অহেতুক ভয় পেও না। “

মাহশা মলিন গলায় বলে,

“ আপনাকে ধন্যবাদ, আমাকে বিগত ক'টা দিন আপনার বাড়িতে আশ্রয় দেওয়ার জন্য। “

জোসেফ আর কিছু বলে না। মাহশা এবার তাকায় ক্লাডিয়াসের দিকে। সামান্য হেসে বলে,

“ তুমি খুব ভদ্র এবং চমৎকার একটা ছেলে ক্লাডিয়াস। ভালো থেকো। “

ক্লাডিয়াসের মুখটা অন্ধকার। তবুও সে নিজের হাতে থাকা ছোট্ট থলেটা মাহশার হাতে ধরিয়ে দিয়ে দু কদম এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলে,

“ এন্ড্রু ভাই আপনার জন্য পাঠিয়েছে এটা। রাখুন। না করবেন না। “

এন্ড্রুর নাম শুনতে বোধহয় কিছুটা চমকায় মাহশা। না চাইতেও আশেপাশে একবার দৃষ্টি বুলায়। উহু, কোথাও নেই সে। সবাই তার সঙ্গে শেষ বারের মতো দেখা করলো। কিন্তু এন্ড্রু বুঝি খুব ব্যস্ত, যে তার দেখা করার সময়টুকুও হলো না। মাহশা একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। আর কিছু বলে না সে। কেভ এবার নিজের গলা কিছুটা ঝেড়ে বলে,

“ চলো, সময় হয়ে গিয়েছে। “

বলেই কেভ জাহাজের দিকে পা বাড়ায়। মাহশাও তার পিছুপিছু মাথা নিচু করে যাওয়া শুরু করে। সিঁড়ি বেয়ে বন্দর হতে জাহাজে উঠার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে সে আরো একবার ফিরে তাকায়। তবে শুধু জোসেফ এবং ক্লাডিয়াস ব্যতীত আর কাউকেই দেখতে পায় না সে। হয়তো আরেকটু ভালো করে লক্ষ্য করলেই সে খেয়াল করতো বন্দরের এক কোণে একটা দোকানের আড়াল হতে ছদ্মবেশে তার উপর লক্ষ্য রাখছে একজোড়া সবুজ নেত্র। পরখ করছে মাহশার মুখে ফুটে উঠা অসুস্থতা এবং দূর্বলতার লেশ। তবে সে-ই মুখখানা সে-ই দৃষ্টির মালিকের মন নরম করতে সক্ষম হলো কি-না তা বুঝা গেলো না। তার দৃশ্য রইলো অতিশয় স্বাভাবিক এবং নির্লিপ্ত। অহেতুক কাজ জমিয়ে রাখা যে তার স্বভাব বহির্ভূত কাজ! একদিন না একদিন মাহশাকে নিজ রাজ্যে ফিরতেই হতো। সে-ই ফেরত যাওয়ার যাত্রাটা যত বিলম্বিত হতো, ততই এ-ই মেয়ের এই রাজ্যের বাতাসের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ার আশংকা থাকতো। তাইতো কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট মাহশার অসুস্থতার তোয়াক্কা না করেই তাকে ফেরত পাঠানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে মাহশা এবং অন্যের নজরে সে যদি জালিম সাব্যস্ত হয়, তাতেও তার কিছু আসে যায় না।

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন