ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়তিথি

১৮তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

প্রণয়তিথি

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

১৮.

বিশাল কক্ষের মাঝখানটায় চতুর্ভুজ আকৃতির একটা পুকুরের ন্যায় স্নান করার জায়গা রয়েছে। এই কক্ষের স্নানখানাটা একান্তই কেবল রাজ্যের কাউন্ট ব্যবহার করেন। অন্য কারো, এমনকি রাজ পরিবারের অন্য কোনো সদস্যরও এই কক্ষ ব্যবহারের অনুমতি নেই। ক্ষানিক ক্ষণ আগে কাউন্ট বার্তা পাঠিয়েছেন যেনো স্নানঘরটা প্রস্তুত করা হয়। তিনি কিছুক্ষণের মধ্যেই স্নান করতে আসবেন।

কাউন্টের বার্তা পেতেই সব দাসীরা উঠে পড়ে লেগেছে দ্রুত সময়ের মধ্যে স্নানঘর প্রস্তুত করতে। দাসীদের সঙ্গে উপস্থিত আছে জেইলান নিজেও। আজ তার প্রাসাদে কাজ করার প্রথম দিন। স্নানঘরের জন্য নিযুক্ত দাসীদের আওতাভুক্ত সে। মনে মনে অবশ্য এ নিয়ে বিদ্রুপের হাসি হাসছে সে। তুরস্কের রাজকুমারী কি-না রোমানিয়ায় এসে একে সামান্য দাসীতে পরিণত হয়েছে! কিন্তু এ নিয়ে জেইলানের কোনো অভিযোগ নেই। পরিকল্পনা অনুযায়ী নিজের কাজ সমাপ্ত করতে পারলেই তার এই দাসীর অভিনয় করা স্বার্থক হবে।

স্নান ঘরের পর্দাগুলো টেনে ঠিক করতে ব্যস্ত দাসীটার নাম হলো ডাকিয়ানা। ডাকিয়ানা লক্ষ্য করে মেডুসা নামক নতুন দাসীটা অন্যমনস্ক হয়ে এককোণে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো কাজ করছে না সে। ডাকিয়ানা বিরক্তি নিয়ে ডেকে বলে,

“ মেডুসা! এভাবে দাঁড়িয়ে কি ভাবছো? দ্রুত কাজ করো৷ “

জেইলান নিজের সম্বিত ফিরে পায়। সে চমকে তাকায় ডাকিয়ানার দিকে। অতঃপর কিছুটা অনভিজ্ঞ অভিনয় করে বলে,

“ আমি কি করবো? কিছু বুঝতে পারছি না। আমাকে একটু দয়া করে কোনো কাজ বলে দিবে? “

জেইলানের কথা শুনে ডাকিয়ানার এবার কিছুটা মায়া হয়। সে-ও যখন এই প্রাসাদে প্রথম দাসী হিসেবে এসেছিলো, তখন সে-ও এরকমই অনভিজ্ঞ ছিলো। ইশ! সেদিন সে কাউকে পায় নি একটু সহজে কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য। সময়ের সাথে নিজেরই পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে সব বুঝে নিতে হয়েছে। ডাকিয়ানা নরম স্বরে বলে,

“ ও-ই পাশটায় তাকাও। দেখো থালাতে করে আমি কিছু সুগন্ধি যুক্ত মোমবাতি এনে রেখেছি। তুমি মোমবাতি গুলো জ্বালিয়ে চারিপাশে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখো। “

সামান্য কাজটুকু সহজে বুঝে নিলো জেইলান। সে সঙ্গে সঙ্গে কাজে লেগে পড়ে। মনে মনে কিছুটা অস্থিরও বোধ করছে সে। এইতো আর কেবল কিছুক্ষণের অপেক্ষা। এরপরই কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট এই কক্ষটায় প্রবেশ করবে। জেইলান দু চোখে দেখবে ওই জালিমের মুখখানা।

ডাকিয়ানা পাশ থেকে তাড়া দিলো,

“ জলদি করো মেডুসা! কাউন্ট যেকোনো সময় এসে পড়বেন। উনার আসার পূর্বেই আমাদের কাজ শেষ করে বেরিয়ে যেতে হবে। “

জেইলান চমকায়। অবাক স্বরে প্রশ্ন করে,

“ বেরিয়ে যেতে হবে কেন? “

ডাকিয়ানা ভ্রু কুচকে বলে উঠে,

“ তোমার কি ধারণা, কাউন্ট আমাদের সামনে স্নান করবেন? এখানে এমনটাই নিয়ম। কাউন্টের আগমনের পূর্বেই আমাদের নিজেদের কাজ সমাপ্ত করে বেরিয়ে যেতে হবে। “

জেইলান প্রশ্ন করে,

“ তার মানে তোমরা কেউ কখনো সরাসরি কাউন্টকে দেখো নি? “

ডাকিয়ানা আফসোসের সুরে বলে,

“ আমরা স্নানঘরের দায়িত্বে থাকা দাসী। নিজেদের কাজের বাহিরে এক দন্ড প্রাসাদে অবস্থান করার অনুমতি নেই। আমরা কি করে উনাকে দেখবো? “

জেইলানের মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়লো। কিসের জন্য সে এই প্রাসাদে দাসী হিসেবে প্রবেশ করলো? ওই জালিমের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগটাই যদি সে না পায়, তাহলে তার ইন্তেকাম কিভাবে সফল হবে?

ডাকিয়ানা তখনও কাজ করতে করতে বলে যাচ্ছে,

“ কাউন্টকে খুব কম মানুষই সরাসরিই দেখেছে। প্রাসাদের স্থায়ী দাসী যারা তারা কাউন্টকে দেখার সৌভাগ্য পেয়েছেন। তবে কাউন্ট দেখতে কেমন সে-ই বর্ণনা কাউকে বলাও নিষিদ্ধ তাদের জন্য। আসলে রাজমাতা কাউন্টের জীবন নিয়ে খুবই চিন্তায় থকেন। উনার আদেশেই এতো নিরাপত্তা। রাজবংশের একমাত্র পুরুষ হলেন কাউন্ট। যতদিন উনার কোন উত্তরাধিকার না আসছেন, ততদিন উনার ব্যাপারে এই বাড়াবাড়ি গুলো চলবে বলে আমার মনে হয়। “

জেইলান এক এক করে সবগুলো মোমবাতি জ্বালাতে জ্বালাতে মন দিয়ে ডাকিয়ানার কথা শুনতে থাকে। সম্পূর্ণটা শুনেই সে মনে মনে বিদ্রুপের হাসি হাসে। বিড়বিড়িয়ে বলে,

“ উত্তরাধিকার ভূমিষ্ট হওয়ার জন্য আগে কাউন্টের বেঁচে থাকতে হবে। জালিম ইয়ান আলবার্ট আগে আমার ছোবল থেকে বেঁচে দেখাক। তারপর না-হয় নিজের রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবে। “

মেডুসার বিড়বিড়িয়ে বলা কথা শুনে ডাকিয়ানা আগ্রহী সুরর প্রশ্ন করে,

“ কি বলছো তুমি? “

জেইলান সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠে,

“ কিছু না। মোম জ্বালানো শেষ। আমি এগুলো সাজিয়ে রেখে আসছি। “

কথাটুকু বলেই মেডুসা কক্ষের চারিপাশে এক এক করে সুগন্ধি যুক্ত মোমবাতি গুলো সাজিয়ে রাখতে শুরু করে। বাকি দাসীরা ততক্ষণে নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পন্ন করে দ্রুত কদমে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। ডাকিয়ানার কাজও প্রায় শেষ। সে গলা উঁচিয়ে ডাকে মেডুসাকে,

“ মেডুসা! দ্রুত করো। বের হতে হবে আমাদের। সকলে বের হলেই খাস দাসী এসে আমাদের বের হওয়ার দরজা আটকে দিয়ে যাবেন। দেরি করলে উনি খুব বকবেন। “

“ এইতো, শেষ প্রায়। “

কথাটুকু বলে জেইলান দ্রুত মোমবাতি গুলো রাখতে থাকে। ইতিমধ্যে মোম গলে জেসমিন ফুলের চমৎকার ঘ্রাণ বেরিয়েছে। পুরো কক্ষটা ফুলের সে-ই ঘ্রাণে মৌ মৌ করছে। অথচ কক্ষ জুড়ে একটা কোনো ফুল নেই। শেষ মোমবাতিটা রাখার সময় জেইলান আড়চোখে ডাকিয়ানার দিকে তাকায়। ডাকিয়ানার মনযোগ তখন দরজার পানে নিবদ্ধ। এ-ই সুযোগে মেডুসা ইচ্ছে করে মোমটাকে ঝুলন্ত পর্দার কাছটায় এমন অবস্থায় রেখে দিলো যেনো সামান্য বাতাসের প্রকোপেই একটা চরম দূর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। নিজের কাজটুকু ডাকিয়ানার দৃষ্টির অগোচরে সম্পন্ন করেই জেইলান উঠে দাঁড়ায়। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে এগিয়ে গিয়ে ডাকিয়ানার সঙ্গে স্নানঘর হতে প্রস্থান করে। পিছনে ফেলে যায় একটা আশংকাজনক পরিস্থিতি।

__________

সারাদিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। দিনের আলো ম্লান হয়ে আঁধারে মিলে গিয়েছে। পুরোটা দিন ধরে নাওমি তুষ দূর্গের সবথেকে উঁচুতে অবস্থিত কক্ষের মেঝেতে পড়েছিল। এক মুহূর্তের জন্য কেউ আসে নি। তাকে খাবার দেওয়ার কিংবা একটা পরিষ্কার কক্ষ দেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করে নি ওই বর্বর লোকটা। ক্ষুধায় এবং পোকা মাকড়ের জ্বালাতনে নাওমি কত্তো চেঁচিয়েছে! কিন্তু তার আওয়াজ কারো কানে পৌঁছে নি।

অন্ধকার, বদ্ধ কামরার দরজাটা কটকট শব্দ তুলে ধীরে ধীরে খুলে যায়। কক্ষে প্রবেশ করে বেহজাদ। একহাতে তার আগুনের মশাল এবং অন্য হাতে একটা থালা। বেহজাদ লক্ষ্য করে ময়লা মেঝেতে শুয়ে থাকা ঘুমন্ত নাওমিকে। না চাইতেও এই মেয়েটাকে আপাতত তার জীবিত রাখতে হবে। যদি কোনো কারণে জেইলান নিজের কাজে ব্যর্থ হয়, তাহলে এ-ই মেয়েটাকে ব্যবহার করে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করবে সে।

হাতের মশালটা কক্ষের এককোণে দেয়াল সংলগ্ন একটা জায়গায় রেখে নাওমির দিকে এগিয়ে আসে বেহজাদ। এক হাঁটু গেড়ে বসে হাতের থালাটা মেঝেতে রাখে। পুরো কক্ষে একবার নজর বুলায় সে। উঁহু! কক্ষে এরকম কোনো বস্ত নেই যেটা দিয়ে এই মেয়ে তার বিরুদ্ধে লড়তে পারবে। নিশ্চিত হয়ে বেহজাদ হাত বাড়ায় নাওমির পিঠের পেছনে নিয়ে করা হাতের বাধনটা খুলতে।

নাওমি খুব গভীর ঘুমে ছিলো না। হাতে সামান্য ছোঁয়া অনুভব করতেই তার তন্দ্রা কেটে যায়। চোখ মেলে তাকায়। দেখে অসভ্য লোকটা তার উপর দিয়ে ঝুকে গিয়ে পিঠের কাছে বাধা হাত জোড়া খুলছে। নাওমি অবাক হয় কিছুটা। লোকটা তার হাত খুলছে কি কারণে? তাকে কি মুক্ত করে দেওয়া হবে?

হাত এবং পা জোড়া শিকলের বাধন মুক্ত হতেই নাওমি সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসার চেষ্টা করে। কিন্তু এতো লম্বা সময় ধরে হাত এবং পা বাধা অবস্থায় থাকার কারণে সে স্বাভাবিক ভাবে হাত পা নাড়াত পারে না। মনে হচ্ছে যেনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্পূর্ণ অবশ হয়ে গিয়েছে। বেহজাদ সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে লক্ষ্য করে ব্যাপারটা। তবে তার বিন্দুমাত্র মায়া হলো না। সে কেবল ফলের থালাটা ঠেলে নাওমির সামনে দিয়ে উঠে চলে যেতে নেয়। নাওমি সঙ্গে সঙ্গে ক্রোধ মিশ্রিত স্বরে বলে উঠে,

“ অমানুষ কোথাকার! আমাকে সারাদিন এ-ই জাহান্নামে বন্দী করে রেখে এখন মানবতা দেখানো হচ্ছে! তোর মানবতা এবং দয়া আমি গ্রহণ করবো ভেবেছিস? আমার হাত এবং পা যদি বিকল হয়ে যায় আমি তোকে ছেড়ে দিবো না। ঈশ্বর, আমার হাত! “

শেষের বাক্যটা ব্যথা সিক্ত স্বরে বলে উঠে নাওমি। বেহজাদ ঘুরে তাকায়। তার কপালে বিরক্তির ভাজ। সে থমথমে স্বরে বলে উঠে,

“ খাবে নাকি অভুক্ত থেকে মরবে সেটা তোমার ইচ্ছা। কিন্তু আরেকবার যদি আমার সঙ্গে বেয়াদবি করার ভুল করেছো, তবে বিশ্বাস করো খুব খারাপ হবে। আমাকে খারাপ হতে বাধ্য করো না। “

নাওমি কোনো মতে উঠে বসে তেঁতে উঠে,

“ খারাপ হওয়ার বাকিটা আছে কি? বিগত রাত থেকে আমি একটা শয়তানের হাতে বন্দী। আমার পরিবার বোধহয় পুরো রাজ্য তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়াচ্ছে আমাকে। অথচ আমি কি-না জনমানবহীন ট্রান্সেলভেনিয়ার তুষ দূর্গের পোকামাকড়ে ঘেরা এই নোংরা কামরাটায় আটক। সারাটা দিন পেরিয়ে গেছে, অথচ আমি এক ফোটা পানিও পান করতে পারি নি। তার উপর এখন আমার হাত পা অবশ লাগছে, আমি কিছু অনুভব করতে পারছি। আর কি খারাপ হওয়ার বাকি আছে? হ্যাঁ? “

শুরুতে ক্রোধান্বিত স্বরে কথা শুরু করলেও ধীরে ধীরে নাওমি নরম হয়ে যায়। তার চোখ ফেটে জল গড়িয়ে পড়ে। কথার মাঝে নিঃশ্বাসে টান পড়ে। তবুও সে বলতে থাকে,

“ সম্পূর্ণ… সম্পূর্ণ দোষ আমার। ঈশ্বর আমাকে শাস্তি দিচ্ছেন। মা বাবার কথার অবাধ্য হওয়ার ফল এটা। আমার সাথে কি কি হতে পারে ভেবেও আমার মাথায় যন্ত্রণা হয়ে যাচ্ছে। একবার মনে হচ্ছে আমাকে খুন করে ফেলা হবে, আবার মনে হচ্ছে আমাকে… “

নাওমির কথাটুকু অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। তবে সে-ই অসম্পূর্ণ কথার পূর্ণাঙ্গ ভাবার্থটা বুঝতে বেহজাদের বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় না। সে কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে নীরবে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। দরজার অপারে গিয়েই বেহজাদ দরজা তালাবদ্ধ করে দেয়। কক্ষের ভেতর থেকে তখন ভেসে আসছে প্রিন্সেসের হিচকি তুলে কাদার শব্দ। বেহজাদ অবাক হয় না। যতই তেজ দেখাক না কেনো, কখনো না কখনো তো অসহায় হবারই ছিলো এই মেয়ের।

__________

সারাদিনের চিন্তা এবং ক্লান্তির ভারটা কিছুটা কমাতে এ-ই সন্ধ্যা বেলায় স্নান করতে এসেছে কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট। গায়ের শার্টটা একপাশে খুলে রেখে সে ধীর পায়ে নেমে যায় কক্ষের মাঝে কুসুম গরম পানিতে ভর্তি ছোট্ট পুকুর জাতীয় জায়গাটায়। ঠান্ডা আবহাওয়ায় এই গরম পানিতে শরীরের ভারটুকু ছেড়ে দিয়েই চোখ বুজে নেয় ইয়ান। মাথায় ঘুরছে তার হাজারটা চিন্তা। তবে আপাতত সবথেকে বড়ো চিন্তাটা হলো নাওমিকে নিয়ে।

গতরাত থেকে নাওমির খোঁজ চলছে। এখনো কিছুই খুঁজে পায় নি তারা। ম্যাথিউ চাচা! উনি এখনো প্রাসাদে ফিরেন নি। লেডি স্যাফিরার অবস্থাও খুব একটা সুবিধাজনক নয়। এমন অবস্থায় রাজ্যের কাজ নিয়ে ইয়ানের ব্যস্ততা দেখানোটা সমীচীন নয়। তাছাড়াও ভ্রাতৃত্বের জায়গা থেকে ইয়ানেরও নাওমিকে নিয়ে ভয় হচ্ছে। তার এই বোন বাঁধনছাড়া, চঞ্চল এবং উড়নচণ্ডী প্রকৃতির হলেও বেশ নাজুক। এই-যে প্রহর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা এতো নিচে নামছে, ব্যাপারটা ইয়ানকে খুব চিন্তিত করে তুলছে। নাওমি ঠান্ডা সহ্য করতে পারে না। কে জানে মেয়েটা এখন কোন অবস্থায় আছে! গায়ে কোনো শীতের পোশাক আছে কি-না সেটাও বা কে জানে?

কক্ষ জুড়ে বিদ্যমান জেসমিন ফুলের ঘ্রাণের তীব্রতা হুট করে ম্লান হয়ে আসতে শুরু করে। তার বদলে কেমন পোড়া পোড়া একটা ঘ্রাণ এসে নাকে ঠেকছে। ইয়ান সঙ্গে সঙ্গে চোখ মেলে তাকায়। পোড়া ঘ্রাণের উৎস খুঁজতে আশেপাশে তাকাতেই সে লক্ষ্য করে কক্ষের দক্ষিণ পাশে পুকুর আবৃত করার জন্য ঝুলন্ত পর্দা গুলোতে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। সম্পূর্ণ কক্ষ জুড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে কালো ধোঁয়া। চোখের সামনেই আগুনটুকু মহামারির ন্যায় ছড়িয়ে পড়ছে।

ইয়ান সঙ্গে সঙ্গে গলা উঁচিয়ে কক্ষের বাহিরে পাহারার জন্য মজুদ ভৃত্যকে ডাকে। নিজেও ঝড়ের বেগে স্নানের পুকুর ছেড়ে উঠে এসে আগুনের ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারটায় বাঁধা দিতে ব্যস্ত হয়ে যায়। কাউন্টের চেঁচানোর স্বর শুনতেই দু'জন ভৃত্য হুড়মুড়িয়ে স্নানঘরে প্রবেশ করে। সঙ্গে সঙ্গে তারা দেখতে পায় ভয়ংকর দৃশ্যটা। দু'জনেই চেঁচিয়ে আরো মানুষকে ডেকে দৌড়ে এগিয়ে যায় কাউন্টকে নিরাপদে আগুনের কাছ থেকে সরিয়ে আনতে।

স্নানঘরের চেঁচামেচি মুহূর্তেই ছড়িয়ে যায় সম্পূর্ণ প্রাসাদে। সবাই এসে জোড়ো হতে থাকে সেখানে। একটা পর্যায়ে আনাস্তাসিয়ার কানেও শব্দ যেতেই সে-ও স্যাফিরাকে ছেড়ে দৌড়ে স্নানঘরের দিকে যায়। রাজমাতাকে দেখে স্নানঘরের বাহিরে ভীড় করা সকলে দু'পাশে সরে দাঁড়িয়ে আনাস্তাসিয়াকে জায়গা করে দেয়। আনাস্তাসিয়া দরজার সামনে থেকেই অবিশ্বাস্যকর দৃষ্টি মেলে দেখে স্নানঘর জুড়ে জ্বলতে থাকা দাউদাউ আগুন। এক দল ভৃত্য ব্যস্ত পায়ে আগুন নেভানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে কোথাও ইয়ান নেই। আনাস্তাসিয়া ভীত স্বরে সেখানে উপস্থিত খাস দাসীকে জিজ্ঞেস করে,

“ আমার ছেলে কোথায়? “

খাস দাসী জবাব দেয়,

“ কাউন্ট ঠিক আছেন রাজমাতা। আপনি চিন্তা করবেন না। উনাকে ভিন্ন দরজা দিয়ে উদ্ধার করে উনার কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। “

আনাস্তাসিয়া আর এক দন্ড অপেক্ষা করলো না। দ্রুত দৌড়ে যায় ছেলের কক্ষের উদ্দেশ্যে। সম্পূর্ণ দৃশ্যটা নীরবে দেখে ঘটনাস্থলে কেবল উপস্থিত হওয়া জেইলান। মনে মনে কিছুটা আশাহত হয় সে। প্রথমত তো কাউন্ট ইয়ান আলবার্টকে আগুন ছুঁতে পারে নি। দ্বিতীয়ত কাউন্ট আবারও লোকচক্ষু এড়িয়ে পালিয়ে গেলো। জেইলান ওই জালিমের মুখখানা দেখার সুযোগ পেলো না। তবে এভাবে আনাস্তাসিয়াকে ভীত-সন্ত্রস্ত মুখে দেখে জেইলানের মনে আলাদাই প্রশান্তি কাজ করছে। আলবার্টদের শান্তির দিনের সমাপ্তি ঘন্টা শুরু হয়েছে। যেই রাজপরিবারের প্রিন্সেস নিখোঁজ এবং কাউন্ট মৃত্যুর দুয়ারের কাছ থেকে ঘুরে এসেছে, সে-ই রাজপরিবার কিভাবে শান্তির ঘুম দিবে সেটাই জেইলান দেখে ছাড়বে।

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন