ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়তিথি

১৯তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

প্রণয়তিথি

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

১৯.

সারাদিন নাওমির খোঁজ শেষে সবেমাত্র নিজ প্রাসাদে ফিরলো ক্যামেলিয়া। মনটা বেশ খারাপ তার। নাওমির জন্য ভীষণ দুঃশ্চিন্তা হচ্ছে। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে নিজের বাবার খোঁজ করতেই সে জানতে পারলো আরোণ প্রাসাদে নেই। কোথায় গিয়েছে সেটাও কেউ জানে না। ক্যামেলিয়ার মনে চিন্তা এসে ভর করলো। ইদানিং বাবা প্রায়ই না জানিয়ে কোথায় যেনো যায়। অতঃপর গভীর রাত করে প্রাসাদে ফিরে। ব্যাপারটা কিছুটা সন্দেহজনক ঠেকে ক্যামেলিয়ার কাছে। বাবাতো কখনো কোনো কিছু তার থেকে লুকায় না। তাহলে এখন কি এমন হয়েছে যে এতো গোপনীয়তা মেনে চলছে আলফা আরোণ রদ্রিগেজ?

ক্যামেলিয়া কিছুটা ক্লান্ত ভঙ্গিতে নিজের কামরার দিকে পা বাড়ায়। মনে মনে ভাবতে থাকে নিজের বাবার কথা। বাবা কি এমন ব্যাপারটা আড়াল করছে তার থেকে? উম! কোনো মেয়ের চক্কর না-তো? ধ্যাৎ! অসম্ভব ব্যাপার! নেকড়ে মানব হওয়ায় আরোণের বয়সটা এখনো যেনো তারুণ্যে থমকে আছে। তার সুদর্শন মুখখানা দেখে কেউ বুঝতে পারবে নে যে সে একটা বিবাহ উপযোগ্য মেয়ের পিতা। সহজেই যেকোনো নারী প্রেমে পড়ে যাবে। তবে আরোণ নিজের স্ত্রীকে এখনো ভালোবাসে। এ-ই জীবনে সে আর কখনো হৃদয়ঘটিত ব্যাপারে জড়াবে বলে মনে হয় না।

মনে মনে এরকম বিভিন্ন ভাবনার বীজ বুনতে বুনতে হুট করে ক্যামেলিয়ার পা জোড়া থমকে যায়। স্থির দাঁড়িয়ে কিছু একটা ভাবে সে। অতঃপর দিক বদলে নিজের কামরার বদলে আরোণের কামরার দিকে অগ্রসর হয়। আরোণের অনুপস্থিতিতে তার কামরায় কেউ প্রবেশ করার দুঃসাহস দেখায় না। তবে ক্যামেলিয়ার ব্যাপারটা ভিন্ন। নিজের বাবার কক্ষে যেতে তার কারো অনুমতির প্রয়োজন পড়ে না।

ক্যামেলিয়া সবার অগোচরে আলফা আরোণ রদ্রিগেজের কামরায় প্রবেশ করে দরজাটা ভেতর থেকে চাপিয়ে দেয়। নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে পরখ করে নেয় গোটা কামরাটাকে। নিজের গোয়েন্দা সত্তাটার প্রভাবে এসে কক্ষের একপাশে থাকা টেবিলটায় সে কিছু একটা অনুসন্ধান করতে থাকে। একে একে বিভিন্ন বই এবং কাগজপত্র উল্টে পাল্টে দেখে সে। উঁহু, এখানে রহস্যজনিত কোনো ব্যাপার নেই।

টেবিলের উপর খুঁজতে খুঁজতে হুট করে ক্যামেলিয়ার দৃষ্টি যায় বিছানার দিকে। বিছানার নিচে সিন্দুক জাতীয় একটা বস্তুর একাংশ দেখা যাচ্ছে। ক্যামেলিয়া আগ্রহবোধ করে। ও-ই সিন্দুকটা ওভাবে আড়াল করে রাখা কেন? কি আছে এ-র মাঝে?

ক্যামেলিয়া টেবিল ছেড়ে বিছানার সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে। ভারী সিন্দুকটা সহজেই সে একটানে বের করে আনে। কালো রঙা সিন্দুকটার মুখেই ঝুলছে একটা বিশাল বড়ো তালা। তালাটা দেখতেও খুব একটা স্বাভাবিক লাগছে না। তালার গায়ে কেমন একটা মোটা সুতো প্যাঁচানো। সুতোটা যে সাধারণ নেকড়েদের সংস্পর্শ এড়াতে লাগানো হয়েছে তা বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হয় না ক্যামেলিয়ার।

তবে ক্যামেলিয়া আর দশটা সাধারণ নেকড়েদের মতো নয়। আলফার কন্যা সে। আলফা আরোণ রদ্রিগেজের রক্ত বইছে তার শরীরে। সে চাইলেই পারবে এ-ই মুহূর্তে তালাটা ভেঙে এই সিন্দুকটা খুলে দেখতে। কিন্তু এতে করে ভাঙা তালা দেখলে আরোণ বুঝে যাবে যে ক্যামেলিয়া তার কক্ষের তল্লাশি নিতে এসেছিলো। তাই তালা ভাঙার ভাবনাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে সে সিন্দুকটা জায়গা মতো রেখে দেয়। বাবা যে তালার চাবিটা কক্ষে কোথাও লুকিয়ে রাখার মতো বোকা নয় তা ক্যামেলিয়ার বেশ ভালো করে জানা আছে। তাই সে অযথা চাবি খোঁজার পিছনে সময় অপচয় করে না। যেভাবে এসেছিলো সেভাবেই সবার অগোচরে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। তবে তার মনটা পড়ে রয় সিন্দুকটার কাছে। কে জানে কি আছে ও-র ভেতরে?

__________

নিজ শয়নকক্ষে থাকা বিছানাটার অগ্রভাগে মায়ের মুখোমুখি বসে আছে কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট। তার দু হাত আনাস্তাসিয়ার আয়ত্ত্বে। চিকিৎসকের তৈরী করে দিয়ে যাওয়া ওষুধি প্রলেপটা ছেলের দু হাতের তালুতে পরম স্নেহের সঙ্গে লাগাতে ব্যস্ত সে। আগুনের ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ করতে গিয়ে ইয়ান দু'হাতে জ্বলন্ত পর্দাগুলো টেনে খুলে ফেলেছিলো। এই কাজ করতে গিয়েই নিজের দু'হাতের তালু পুড়িয়ে ফেলেছে সে।

ছেলের হাতের এ-ই অবস্থা দেখে আনাস্তাসিয়া পুরো প্রাসাদ মাথায় তুলে ফেলেছিলো। অথচ এখন কেমন ঠান্ডা হয়ে বসে আছে। অথচ ভিতরে ঠিকই ঝড় বৈছে তার। ইয়ান নীরবে লক্ষ্য করে মায়ের চিন্তিত মুখ। অতঃপর শান্ত গলায় বলে উঠে,

“ আমি ঠিক আছি, মা। “

আনাস্তাসিয়া কিছু বলে না, নীরব রয়। মন দিয়ে সে ছেলের দু-হাতে পট্টি করতে ব্যস্ত। ইয়ান আবারও বলে,

“ আমি সত্যিই ঠিক আছি। “

আনাস্তাসিয়া এবার মুখ খুলে,

“ আমি খোঁজ নিয়েছি। ও-ই নতুন দাসীটার অবহেলার কারণে এত্তো বড়ো একটা দূর্ঘটনা ঘটেছে। ও কাল থেকে আর এ-ই প্রাসাদে আসবে না। “

ইয়ান কিছুটা প্রতিবাদ করে বলে,

“ তুমি বাড়াবাড়ি করছো এখন। সামান্য একটা ঘটনার জন্য একজনের রুজিরোজগার বন্ধ করার মানে হয় না। ও-ই দাসীকে বলে দিও নিজের দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করতে। “

আনাস্তাসিয়া অবাক হয়ে বলে,

“ এটা সামান্য একটা ঘটনা? “

“ অবশ্যই। তুমি নিজেই তো বললে এটা একটা দূর্ঘটনা ছিলো। দূর্ঘটনা যে কারো দ্বারা ঘটতে পারে। ইচ্ছেকৃত ভাবে তো আর কাজটা করে নি। অহেতুক ও-ই দাসীকে দায়ী করাটা ঠিক নয়। “

আনাস্তাসিয়া এবার ছেলের হাতের পট্টি বাঁধা শেষ করে বলে উঠে,

“ ঠিক বলেছো। দোষটা আসলে ও-ই দাসীর নয়। দোষটা হলো আসলে তোমার। “

“ আমার দোষ? “

আনাস্তাসিয়া এবার কিছুটা গম্ভীর মুখে তাকায় ছেলের দিকে। বিষাদ মাখা স্বরে বলে,

“ তুমি, ক্যামি এবং নাওমি, তোমরা তিনজনই আমাদের সন্তান। তোমরাই আমাদের পরিবার। এই-যে এতো শাসন, বিধি, নিষেধ এগুলো কি অহেতুক করি আমরা? কখনো ভেবে দেখেছো তোমাদের তিনজনের মধ্যে একজনেরও কিছু হলে আমাদের কি অবস্থা হবে? আমি জানি, তোমরা কোনো কিছুর তোয়াক্কা করো না। নিজেদের মর্জির মালিক তোমরা। কিন্তু তোমাদের এই মর্জি চালানোর ফলাফলটা কি? কিছুদিন আগে ক্যামি আহত হলো, এ-ই মুহূর্তে নাওমি নিখোঁজ, আজ তুমি অল্পের জন্য আগুনের কবল থেকে মুক্তি পেয়েছো৷ এই প্রতিটা ঘটনায় আমাদের উপর দিয়ে কি যায় সে-ই সম্পর্কে কখনো ভেবে দেখেছো? ম্যাথিউ এখনো প্রাসাদে ফিরে নি। পাগলের মতো নিজের মেয়েকে খুঁজে যাচ্ছে। স্যাফিরার অবস্থাও তোমার অজানা নয়। আশেপাশের প্রতিটা ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আরেকটু সচেতন হওয়া কি উচিত নয় তোমার? আমার নিজের বলতে একমাত্র তুমি আছো ইয়ান। চারিদিকে শত্রুরা ওঁৎ পেতে আছে। ঈশ্বর না করুক যদি তোমার কিছু হয়ে যায়, তোমার মনে হয় আমি বাঁচবো? “

ইয়ান বুঝতে পারে মা'য়ের দুঃশ্চিন্তাটা। সে কিছু না বলে নিজের মা'কে জড়িয়ে ধরে। আনাস্তাসিয়া ছেলের বুকে মাথা রেখে শান্ত গলায় বলে,

“ বিশ বছর আগে তোমার বাবা এবং আমি একটা যুদ্ধে নামি। যুদ্ধটা হলো তোমাকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই। লড়াইটা এখনো চলমান। ঈশ্বরের দোহাই লাগে তুমি একটু নিজের জীবনের নিরাপত্তার ব্যাপারে সতর্ক হও। আমাকে এবং তোমার বাবাকে হারতে দিও না। “

ইয়ান জবাব দেয়,

“ আমার কিছু হবে না মা। তুমি নিশ্চিত থাকো। আমি কাউকে সে-ই সুযোগ দিবো না। “

আনাস্তাসিয়া সোজা হয়ে বসে বলে,

“ ওয়াদা করো। “

“ ওয়াদা করছি। শুধু এটা নয় বরং আরেকটাও ওয়াদা করছি। নাওমিকেও আমি যেকোনো মূল্যে সহি সালামতে প্রাসাদে ফিরিয়ে আনবো। আমার বোনের অপহরণকারীদের ছেড়ে দিবো না। প্রত্যেকেই তার কর্মফল পাবে। “

আনাস্তাসিয়া ছেলের কথায় কিছুটা আশ্বস্ত হয়। তার ছেলে যেহেতু ওয়াদা করেছে সেহেতু নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে নাওমিকে খুঁজে বের করার। এখন কেবল সে-ই কাঙ্ক্ষিত সময়ের অপেক্ষা।

__________

তূষ দূর্গের দো তলার একটা কামরার দৃশ্য। এ-ই কক্ষে আপাততর জন্য অবস্থান করছে যুবরাজ বেহজাদ। বহু বছর ধরে বদ্ধ কক্ষটাকে কিছুটা পরিষ্কার করে থাকার উপযোগী করার চেষ্টা কামরা জুড়ে লক্ষণীয়। যতটুকু যা পরিষ্কার করা হয়েছে তাতে এই কামরাটাকে সাধারণ মানুষের জন্য থাকার উপযোগী হিসেবে গণ্য করা গেলেও, একজন যুবরাজের থাকার জন্য উপযুক্ত বলা যায় না। তবুও এই অনুপযুক্ত ব্যাপারটার সঙ্গে সহজেই খাপ খাইয়ে নিয়েছে বেহজাদ।

মশালের জ্বলন্ত আলোয় কক্ষ কিছুটা আলোকিত হয়ে আছে। সদ্য দূর্গে ফেরা জেইলান এবং আব্দুল এসে ভীড় জমিয়েছে বেহজাদের কক্ষে। জেইলান এতক্ষণ ভাইকে বলছিলো যে আজ কিভাবে সে কাউন্ট রিকার্ডো আলবার্টকে মৃত্যুর এক ঝলকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়েছে। সব শুনে বেহজাদ কিছুটা রাগ হয়ে বলে,

“ নিষেধ করেছিলাম তোমাকে আমি। এই ঘটনার জন্য যদি তোমাকে কোনো দন্ড দিয়ে দিতো? তখন কি হতো? “

জেইলান নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে হেসে বলে,

“ আপনি আছেন ভাই। আমার দন্ড হলেও কি বা আসে যায়? অসমাপ্ত কাজটা আপনি সম্পন্ন করবেন। “

বেহজাদ চাপা রাগ ঝেড়ে বলে,

“ আমি ঠাট্টা করছি না জেইলান। আগামীকাল থেকে তোমার ও-ই প্রাসাদে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রিন্সেসকে খুঁজতে খুঁজতে আলবার্টরা নিজেরা আমাদের নিকট আসবে। আমাদের পায়ে পরতে বাধ্য হবে। প্রতিশোধটুকু তখনকার জন্য তোলা রাখা উত্তম। “

জেইলানের মুখের হাসি হাসি ভাবটা উবে যায়। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

“ প্রাসাদে আমি অবশ্যই যাবো। প্রতিদিন ওই কাউন্টকে নতুন নতুন কায়দায় মৃত্যুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করাবো। জালিমটার পরিবারের চোখে আতংক দেখে নিজের কলিজা ঠান্ডা করবো। “

কথাটুকু বলার সময় জেইলানের মুখভঙ্গি কতটুকু নিষ্ঠুর দেখাচ্ছিলো তা বেহজাদ এবং আব্দুল দু'জনই লক্ষ্য করে। বেহজাদ কিছু বলতে নিবে তবে তার পূর্বেই জেইলান বলে উঠে,

“ প্রিন্সেসের জ্ঞান কি ফিরেছিলো? “

বেহজাদ জবাব দেয়,

“ হ্যাঁ। সন্ধ্যার দিকে হাত পা খুলে ফল দিয়ে এসেছি খাওয়ার জন্য। আপদটাকে জীবিত রাখার জন্য এখন জঙ্গল ঘুরে ফলের জোগান দিতে হবে আমাদের। “

জেইলান ক্রুর হেসে বলে,

“ আমি গিয়ে মাননীয়া প্রিন্সেসের সঙ্গে দেখা করে আসি। “

জেইলান প্রস্থান করতেই বেহজাদ এবার গম্ভীর স্বরে আব্দুলকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“ জেইলানকে তার মর্জি মতো চলতে দিলে ও একটা বিপদে পড়বে। এমনটা হতে দেওয়া যাবে না। ওকে নিরাপদে রাখা জরুরী। “

আব্দুল বেহজাদের কথার প্রতুত্তর না করে বলে উঠে,

“ আমার বেয়াদবি মার্জনা করবেন যুবরাজ। কিন্তু একটা প্রশ্ন করতে বাধ্য হচ্ছি। নিজেকে একবার প্রশ্ন করে দেখুন তো আপনারা যা করছেন তা ঠিক কি-না? “

বেহজাদ ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে,

“ মানে? “

“ প্রতিশোধ, গুম, খুনের পরিকল্পনা ব্যাপার গুলো কি আপনার কাছে ঠিক মনে হচ্ছে? “

“ শুরুটা আমরা করি নি আব্দুল। তুমি ভালো করেই জানো কি ঘটেছিলো। এতো বড়ো একটা জালিয়াতির পর ছেড়ে দেওয়া উচিত বলে মনে হয় তোমার? “

“ আমার কেবল এতটুকু মনে হচ্ছে যুবরাজ, যে হাত আমরা দিনে পাঁচ বার রবের কাছে মোনাজাতের উদ্দেশ্যে তুলি সে-ই হাতে কারো খুনের রক্ত মানায় না। প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছেন বলে আপনারা এ-ই মুহূর্তে বুঝতে পারছেন না। তবে এ-ই প্রতিশোধের নেশা ধীরে ধীরে আপনাদের অমানবিক করে তুলছে। শুধুমাত্র একটা প্রতিশোধের জন্য আপনাদের কত-শত মিথ্যার আশ্রয় নিতে হচ্ছে, রাজকুমারী জেইলানকে মাথার কাপড় ফেলে খ্রিষ্টান সেজে প্রাসাদে দাসীর কাজ করতে হচ্ছে। এসব কিছু আমার অনুচিত বলে মনে হচ্ছে। আমি যে-ই যুবরাজ এবং রাজকুমারীকে চিনি উনাদের ঈমান এতটা দূর্বল হয়ে যাচ্ছে, ব্যাপারটা আমি মেনে নিতে পারছি না। “

বেহজাদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,

“ আমাদের সঙ্গে যেটা হয়েছে সেটা কি অমানবিকতার কাতারে পড়ে না? “

“ অবশ্যই পড়ে। তবে মহান রব শ্রেষ্ঠ বিচারক। সকল বান্দার আমলনামার হিসাব উনার থেকে উত্তম আর কে জানে? জালিমদের তাদের কৃতকর্মের ফল না-হয় রব বুঝিয়ে দিবেন। আপনারা দয়া করে নিজেদের হাত নোংরা করবেন না। “

বেহজাদ থমথমে স্বরে প্রশ্ন করে,

“ তুমি কি আমাদের সঙ্গী হতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছো? “

“ আমাকে ক্ষমা করবেন যুবরাজ। রাজ্য এবং আপনাদের মঙ্গলের জন্য আমার মতো হাজারো আব্দুল তাদের জান কুরবান করতে কার্পণ্য করবে না। তবে প্রতিশোধ পরায়ণ আচরণ, ছলনা এবং মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ার অনুমতি আমার ধর্মে নেই। আর আমি ধর্মের বিধিনিষেধের বরখেলাপ করার মতো বোকা নই। “

বেহজাদ কিছু বলে না। সে জানে আব্দুলের বলা কথাগুলো মিথ্যা নয়। কিন্তু মন মস্তিষ্কের দোলাচলকে সে কিভাবে এড়িয়ে যাবে? এই-যে ভাই হারানোর আগুনটা যে তার এবং জেইলানের বুকে জ্বলছে, সেটা তো কেবল আলবার্টদের রক্ত হাতে মেখেই নিভবে। আব্দুল মাথা নত করে সালাম দিয়ে বেরিয়ে যায়। আলবার্টদের পরিত্যক্ত দূর্গের নিবিড় কামরাটায় বেহজাদ একাকী রয়ে যায়।

__________

আকাশে আজ কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের দেখা নেই। বিশাল জানালাটার ধারে দাঁড়িয়ে দূর্গের বাহিরটা দেখছে নাওমি। মনে তার আশার প্রদীপ জ্বলজ্বল করছে। এ-ই বুঝি বাবা এবং ভাই আসবে। এ-ই বুঝি তারা নাওমিকে মুক্ত করে নিয়ে যাবে। কিন্তু সময় গড়ালেও কেউ আসে না। কেবল দূর্গকে ঘিরে উড়ে বেড়ানো বাদুড়ের ডানা ঝাপটানোর শব্দ শোনা যাচ্ছে।

হুট করে দরজা খোলার শব্দ কানে ভেসে আসতেই নাওমি সচেতন হয়ে যায়। নিশ্চয়ই ওই বর্বর, অসভ্য, গুপ্তচরটা এসেছে। নাওমি ভুলেও পিছনে ফিরে তাকায় না। আপন জায়গায় শক্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়। সে টের পায় ধীরে ধীরে কেউ এগিয়ে এসে তার পিছনে দাঁড়িয়েছে। নাওমি কিছু বলতে নিবে তার আগেই তাকে অবাক করে দিয়ে একটা নারী স্বর বলে উঠে,

“ নিজের ভাইয়ের অপেক্ষা করছো প্রিন্সেস? “

নাওমি চমকে পিছনে ফিরে তাকায়। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নারী মূর্তির মুখে তখন ক্রুর হাসির ছাপ। নাওমি বিস্ময় নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে অস্ফুটে বলে,

“ তুমি… তুমি তো… মেডুসা না তোমার নাম? “

জেইলান হাসিমুখে বলে,

“ তোমার স্মৃতিশক্তি তো বেশ প্রখর! “

নাওমি বিস্মিত স্বরে বলে,

“ তুমি… এখানে? “

“ আমাকে আশা করো নি বুঝি? “

“ তুমি ওই অসভ্য লোকটার সঙ্গে এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত? “

জেইলান সময় অপচয় করে না। সে সরাসরি প্রশ্ন করে,

“ একটা প্রশ্ন করবো নাওমি। জলদি এবং চটপট উত্তর দিবে। বিলম্ব আমার পছন্দ নয়। সত্যি করে বলবে, ঠিক আছে? তোমার ভাই কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট দেখতে কেমন বলো তো? “

নাওমি এবার বিস্ময়তা কাটিয়ে সতর্ক স্বরে পাল্টা প্রশ্ন করে,

“ সেটা জেনে তোমার কি লাভ? “

জেইলান মিথ্যা বলে না। হাই তুলতে তুলতে জবাব দেয়,

“ তোমার ভাইকে খুন করতে সহজ হবে আমার। “

নাওমির বুকটা ধক করে উঠে। খুন করবে মানে? তার ভাইকে খুন করতে এসেছে এরা? কিন্তু কেন? ভাই কি করেছে?

নাওমি ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে প্রশ্ন করে,

“ কে তোমরা? তোমাদের পরিচয় কি? কি ক্ষতি করেছে আমার ভাই তোমাদের? “

জেইলান দুই কদম এগিয়ে এসে নাওমির কাধে হাত রেখে বলে,

“ শুনো ছোট্ট মেয়ে, ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিকাশ আমরা বুঝে নিবো। তুমি শুধু তোমার ভাইয়ের বাহ্যিক বর্ণনাটুকু বলো। কেমন দেখতে সে? “

নাওমি প্রতিবাদ করে,

“ কক্ষনো বলবো না। “

জেইলান যেনো এরকম উত্তরের জন্য প্রস্তুতই ছিল। সে পাত্তা না দিয়ে হেসে বলে,

“ অসুবিধা নেই। তোমার কি মনে হয়, তুমি না বললে আমি তোমার ভাই পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবো না? হাহ! আজ জানো কি হয়েছে? তোমার ভাইকে প্রায় আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলার ব্যবস্থা করেছিলাম। শয়তানটার কি সৌভাগ্য! ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেলো! “

জেইলানের উচ্চারণ করা কথাগুলো যেনো নাওমির উত্তপ্ত ক্রোধে ঘি ঢালার মতো কাজ করলো। সে নিজের রাগটুকু চেপে রাখতে পারলো না। গাউনের ভাজে থাকা তার ডান হাতে প্যাঁচানো শিকলটাকে মুহূর্তেই অস্ত্রের ন্যায় ব্যবহার করলো সে। চোখের পলকে দু'হাতে জেইলানের গলায় শিকলটা প্যাঁচিয়ে ধরে। আকস্মিক আক্রমণে জেইলান প্রতিরোধের সুযোগ পেলো না। দু-হাতে গলায় প্যাঁচানো শিকলটা ছাড়ানোর চেষ্টা করে সে। তবে শিকল ছুটার বদলে নাওমির চাপে আরো দৃঢ় ভঙ্গিতে গলায় প্যাঁচিয়ে যায়। নাওমি রাগে কাঁপতে কাঁপতে উচ্চারণ করে,

“ আমি জানি না আমার ভাইয়ের সঙ্গে তোদের সমস্যা কি। তবে যদি ভেবে থাকিস আমাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে আমার ভাইয়ের ক্ষতি করতে পারবি, তাহলে তোদের সে-ই ধারণা ভুল। আমার পরিবারের দিকে যে হাত বাড়াবে তার হাত গুড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখি আমি। আমাকে রূপকথার গল্পের নিষ্পাপ রাজকন্যা ভাবার ভুল ধারণা করবি না। আমি নাওমি, আগুন নিয়ে খেলতে ভালোবাসি। “

জেইলান নাওমির কথাগুলো শোনার প্রয়োজন বোধ করলো না। সে শ্বাসে টান পড়ার আগেই দক্ষ কৌশলে নিজের দু'হাতে পিছনে থাকা নাওমির গাল খামচে ধরে। সঙ্গে সঙ্গে নাওমির হাতের বাধন আলগা হয়ে আসে। জেইলান চোখের পলকে নিজের গলা থেকে শিকল টেনে সরিয়ে কাশতে শুরু করে। নখের আঁচড়ের দরুণ দু গাল প্রবল জ্বলছে। রক্তও বুঝি বেরিয়ে এসেছে। নাওমি হিংস্র বাঘিনীর মতো ফুসে উঠে। সে ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে জেইলানকে ধাক্কা মেরে ফেলে কক্ষের এককোণে থাকা আগুনের মশালটা ছুড়ে বিছানায় ফেলে। মুহূর্তেই বিছানায় দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠে। নাওমি দ্রুত দরজার দিকে যায়। জেইলান উঠে আসার পূর্বেই সে দরজার বিশাল ছিটকিনিটা টেনে সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে নামতে শুরু করে। এটাই মোক্ষম সুযোগ। যেকোনো মূল্যে তাকে এ-ই দূর্গ থেকে পালাতে হবে। ভাইয়ের কাছে পৌঁছাতে হবে তার। ভাইকে সতর্ক করাটা অতিব জরুরী বিষয় এখন।

উপরের কক্ষ হতে দরজা ধাক্কানোর শব্দ ভেসে আসছে। আগুন বোধহয় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। উক্ত কক্ষে এক বিন্দু পানিও নেই আগুন নেভানোর জন্য। বেশ হয়েছে। ওই অসভ্য মেয়েটা এবার টের পাবে তার ভাইয়ের ক্ষতি করতে চাওয়ার পরিণাম। নাওমি ভুলেও থামে না। সর্বোচ্চ গতিতে সে দৌড়াতে থাকে। দূর্গে ওই অসভ্য লোকটা উপস্থিত থাকলে তার কানে বোধহয় এতক্ষণে এই দরজা ধাক্কানোর শব্দ পৌঁছে গিয়েছে। ও-ই অসভ্য বাঁধা দেওয়ার পূর্বেই তাকে যেকোনো মূল্যে বের হতে হবে।

প্রায় শ খানেক সিঁড়ি পেরিয়ে নিচে নামতেই নাওমি করিডর ধরে প্রধান ফটকের দিকে ছুটে। এইতো আরেকটু… ফটক পেরিয়ে একবার বের হতে পারলেই আর কোনো বাঁধা নেই। নাওমির প্রাণপণে ছুটে যাওয়াটা মাঝপথেই বাধাগ্রস্থ হয়। একটা বলবান হাত পিছন থেকে তার চুল মুঠি করে ধরে তাকে পিছনের দিকে টেনে ধরে থামায়। আচমকা চুলের মুঠিতে টান লাগতেই নাওমি ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠে। তবে তার সে-ই আর্তনাদকে বিন্দুমাত্র পরোয়া না করে বর্বর পুরুষটা কাউকে আদেশের স্বরে বলে উঠে,

“ আব্দুল, দ্রুত উপরে যাও। জেইলানকে নিয়ে এসো। এ-ই ফাজিল মেয়েকে আমি দেখে নিচ্ছি। “

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন