ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়তিথি

২০তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

প্রণয়তিথি

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

২০.

একটা চিকন নারী কণ্ঠের আর্তনাদের প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে দূর্গের প্রতিটি কোণায়। বেহজাদ হাতের মুঠোয় থাকা চুলগুলোকে শক্ত করে চেপে ধরে পলায়নের চেষ্টাকৃত নাওমিকে পুরোপুরি নিজের দিকে ঘুরায়। সঙ্গে সঙ্গে তার চোখে দৃশ্যমান হয় নাওমির দু গালে পাঁচ আঙুলের আঁচড়ের দাগ। আঁচড় চিরে বিন্দু বিন্দু রক্ত গাল গড়িয়ে পড়ছে। চুল মুঠো করে ধরায় অনুভূত ব্যথার তীব্রতা সইতে না পেরে নাওমি দু চোখ খিচে বন্ধ করে রেখেছে।

গাল গড়িয়ে পড়া বিন্দু বিন্দু রক্ত, ব্যথাতুর মুখভঙ্গি এবং যন্ত্রণার আর্তনাদ কোনটাই বেহজাদের হৃদয়কে নরম করতে সক্ষম হয় না। উল্টো সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

“ সাহসী হওয়া ভালো, তবে দুঃসাহসী নয়। “

নাওমি ব্যথাটুকু হজম করে নিয়ে চোখ মেলে তাকায়। ঘৃণা ভর্তি দৃষ্টি মেলে দেখে বেহজাদকে। কণ্ঠে দৃঢ়তা ঢেলে বলে উঠে,

“ আমার দুঃসাহস সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই তোদের। “

বেহজাদ ধমকে উঠে,

“ এখনো এতো তেজ! “

নাওমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জবাব দেয়,

“ নাওমি হার মানে না। “

“ মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়েও না? “

“ কোনো পরিস্থিতিতেই না। “

নাওমির এতো আত্মবিশ্বাস বেহজাদের নিকট বিষের ন্যায় লাগছিলো। একটুও ভয় নেই এই মেয়ের। উল্টো সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যেনো হিংস্র রূপ ধারণ করছে। উপরের কামরা থেকে এখন আর দরজা ধাক্কানোর শব্দ শোনা যাচ্ছে না। আব্দুল বোধহয় এতক্ষণে জেইলানকে উদ্ধার করে ফেলেছে। বেহজাদ প্রশ্ন করে,

“ আমার বোনকে কামরা বন্ধ করে পালানোর চেষ্টা করেছিলে? “

নাওমি জবাব দেয়,

“ ওহ! তো তোরা দুই নমুনা একে অপরের ভাই বোন। এজন্যই তো বলি এতো মিল কেন? যা-ই হোক, তোর বোনকে শুধুমাত্র কামরা বন্ধ করি নি আমি। প্রথমে যে-ই শিকল দিয়ে আমায় বেধে রেখেছিল ও-ই একই শিকল দিয়ে তোর বোনের সুন্দর গলা প্যাঁচিয়ে ধরি। অতঃপর তোর বোনকে ধাক্কা মেরে ফেলে কক্ষে আগুন ধরিয়ে দিয়ে কামরা বন্ধ করে এসেছি। আশা করছি এতক্ষণে তোর কঞ্চির মতো বোন আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে গিয়েছে। “

বেহজাদের হাতের মুষ্টি দৃঢ় হয়ে আসে। এ-ই মুহূর্তে ছুটে জেইলানের কাছে যেতে ইচ্ছে করলেও, সে নিজের ইচ্ছাটাকে দমিয়ে রাখে। এই মেয়েকে এখন হাতছাড়া করার মানেই হলো চোখের পলকে পালিয়ে যাবে। সেটা হতে দেওয়া যাবে না। তার চেয়ে বরং বেহজাদ অপেক্ষা করে আব্দুলের জেইলানকে নিয়ে নিচে আসার। জেইলানের কতটুকু কি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সেটা দেখে এ-ই ফাজিল মেয়ের উপর শোধ তুলবে সে।

বেহজাদের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না। এর-ই মধ্যে করিডরের শেষ মাথায় থাকা সিঁড়ি বেয়ে একপ্রকার দৌড়ে নেমে আসে জেইলান। দূর হতে নাওমিকে দেখেই সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে,

“ ভাগ্যিস পালাতে পারে নি। “

বেহজাদ সবার আগে লক্ষ্য করে তার বোনের গলায় শিকল প্যাঁচানোর ফলে সৃষ্টি হওয়া লাল এবং কালসিটে রঙের মাঝামাঝি দাগটা। নাওমি জেইলানকে সুস্থ সবল দেখে আফসোসের সুরে বলে,

“ ইশ! থাক অসুবিধা নেই! পরেরবার আমি ঠিকঠাক ভাবে তোকে মেরে পালাবো। “

বেহজাদ রক্তিম দৃষ্টি মেলে নাওমির দিকে তাকায়। ক্রোধের বহিঃপ্রকাশটা নিজের কথা দ্বারা করে সে,

“ আমি বেঁচে থাকতে সে-ই পরের বার কখনো আসবে না। “

কথাটুকু শেষ করেই বেহজাদ নাওমির চুলের মুঠি ধরে দূর্গের পাতাল বন্দীশালার দিকে হাঁটা ধরে। জেইলান ভাইয়ের পিছু পিছু যায় না আর। সে জানে তার ভাই আর যা-ই করুক, অপ্রীতিকর কোনো কিছু করবে না যেটার জন্য ওই মেয়ের পিছু পিছু যেতে হবে তার। সে নিজের গলার কাছটা ডলতে ডলতে তার বরাদ্দকৃত কক্ষের দিকে হাঁটা ধরে। মনে মনে সৃষ্টিকর্তার নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, ওই আগুনের কবল থেকে তাকে রক্ষা করার জন্য।

__________

সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই দেখা যায় ঘুটঘুটে অন্ধকার একটা করিডর। বেহজাদ নিচে নামার পথে নিজের অপর হাতে একটা মশাল তুলে নিয়েছিল বলে কিছুটা দৃশ্যমান ঠেকছে চারিপাশ। মশালে জ্বলজ্বল করা আগুনের আলোয় নাওমি পরখ করে চারিপাশটা। সরু করিডরের দু'পাশ জুড়ে সারিবদ্ধ কিছু বন্দীশালা। মেঝে থেকে শুরু করে দেয়াল সবটাই ভয়ংকর নোংরা এবং দূর্গন্ধযুক্ত। নাওমি বাধ্য হয় হাত দিয়ে নিজের নাক চেপে ধরতে।

বেহজাদ এই নোংরা পরিবেশের তোয়াক্কা করলো না। সে নাওমির চুলের মুঠি চেপে ধরে, তাকে টেনে হিঁচড়ে একটা ছোট্ট খুপরির মতো কারাঘরের ভেতর ছুঁড়ে মারে। বিশ বছরের জমা ধূলোময়লা, মাকড়সার বাসা এবং মেঝে জুড়ে বিচরণ করা পোকাদের রাজত্বে ছিটকে পড়তেই নাওমি চেঁচিয়ে উঠে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে অসভ্য লোকটা কারাঘরের লোহার দরজাটা তালাবদ্ধ করছে। নাওমি দ্রুত উঠে এসে লোহার শিঁকযুক্ত দরজাটা চেপে ধরে। রাগান্বিত স্বরে বলে,

“ আমি তোর বোনকে আঘাত করেছি সেটা তোর চোখে পড়লো। কিন্তু তোর বোন যে আমাকে রক্তাক্ত করেছে সেটা তুই দেখিস নি? নিজের বোনের দোষটা চোখে পড়ে না? “

বেহজাদ তালায় চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে জবাব দেয়,

“ আমার বোন আত্মরক্ষা করেছে কেবল। তাছাড়াও প্রথমে ঝাপিয়ে পড়ার স্বভাব আলবার্টদের। আমরা কেবল তাদের প্রাপ্যটুকু ফিরিয়ে দেই। “

নাওমি বলে উঠে,

“ কি ভেবেছিস? দুনিয়ায় তুই একাই শুধু ভাই? আমারও ভাই আছে। তুই যেরকম আমাকে তোর বোনের উপর আক্রমণ করার শাস্তি দিচ্ছিস, সে-ই একই শাস্তি তুই এবং তোর বোনও পাবি। আমার ভাই এসে আমাকে এই পরিস্থিতিতে দেখে তোদের ছেড়ে দিবে বলে মনে হয়? “

দরজাটাকে তালাবদ্ধ করার কার্যটুকু সম্পন্ন করেই বেহজাদ চাবিটা নিজের পকেটে ভরে ফেললো। অতঃপর বিরক্তিমাখা দৃষ্টি মেলে ক্ষানিক মুহূর্ত নাওমিকে পর্যবেক্ষণ করে। হাতে মশালটা নিয়ে সে উল্টো পথে ঘুরে প্রস্থান করতে করতে বলে উঠে,

“ সময় এলে দেখা যাবে। “

বেহজাদ চলে যায়। পাতালপুরীর মতো এই জায়গাটা মুহূর্তেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে তলিয়ে যায়। সে-ই অন্ধকারে একা রয়ে যায় নাওমি। নগ্ন পায়ের আশপাশ জুড়ে অনুভূত হচ্ছে পোকামাকড়দের বিচরণ। নাকে তীব্রভাবে ঠেকছে উটকো দুর্গন্ধটা।

নাওমি যে ভয় পাচ্ছে না তা নয়। তবে সে নিজের ভয়টা ওই অসভ্যদের সামনে প্রকাশ করতে চাইছে না। তাইতো দু-হাতে নিজের মুখ চেপে ধরে ধীরে ধীরে পিছিয়ে যায় সে। অন্ধকারের মাঝে তার পিঠটা গিয়ে ঠেকে দেয়ালের সঙ্গে। নোংরা সে-ই দেয়ালটায় শরীরের ভর ছেড়ে দিয়ে নাওমি নিঃশব্দে কেঁদে উঠে। তার মরণ বুঝি অবশেষে এসেই গেলো। এই কারাগারের ভেতরটায় ভোরের আলো ফুটা পর্যন্ত তার বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনাই নেই।

__________

দিনের প্রথম প্রহরটা শুরু হলো কেভের ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে। হাতে করে বিশাল একটা গোল করে মোড়ানো কাগজ নিয়ে সে কাউন্টের কক্ষে প্রবেশ করে। ইয়ান তখন কেবল নাস্তা সেড়ে সভায় যাওয়ার জন্য তৈরী হয়েছে। কেভকে দেখতেই সে বলে,

“ এসো। “

কেভ এগিয়ে গিয়ে কক্ষের এককোণে থাকা টেবিলটার উপর নিজের হাতের কাগজটা মেলে রাখে। ইয়ানও এগিয়ে এসে টেবিলের শিয়রে দাঁড়াতেই কেভ কাগজে আঁকা মানচিত্রটা দেখিয়ে বলে,

“ পুরো রোমানিয়ার মানচিত্র এটা। চিহ্নিত শহর গুলোয় ইতিমধ্যে আমাদের খোঁজ অভিযান সম্পন্ন হয়েছে। বাকি শহর গুলোতে এক এক করে অভিযান চলমান থাকবে। “

ইয়ান অস্থির হয়ে বলে,

“ একটা একটা করে শহর খুঁজতে গেলে খুব সময় লাগবে। এতো সময় হাতে নেই আমাদের। দ্রুততম সময়ের মধ্যে নাওমিকে উদ্ধার করা জরুরী। “

কেভ বলে উঠে,

“ সেটা সম্ভব নয় কাউন্ট। প্রিন্সেসের নিখোঁজ হওয়ার খবরটা এখনো গোপন করে রাখা। পুরো রাজ্যে একসঙ্গে খোঁজ অভিযান চালাতে গেলে বিপুল সংখ্যক সৈন্যের প্রয়োজন হবে। আপাতত যারা জানে তারা সকলেই আমার বিশ্বস্ত। তবে বাকি সৈন্যদের ক্ষেত্রে আমি কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারছি না। “

ইয়ানের হুট করেই নিজেকে অসহায় মনে হয়। বোনের অনিশ্চিত জীবনের সম্ভাবনা তাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। কেভ আশ্বস্ত করে বলে উঠে,

“ আপনি দুঃশ্চিন্তা করবেন না কাউন্ট। গ্রীকদের কোনো সন্দেহজনক চলাফেরা এখনো আমাদের নজরে পড়ে নি। আর রাজ্যের সীমান্তের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। প্রিন্সেসকে যে-ই অপহরণ করুক না কেন, সে এই রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে বের হতে পারবে না। আমরা ঠিকই খুঁজে বের করে ফেলবো। “

ইয়ান ফোস করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়ে। মন না বসলেও এ-ই মুহূর্তে তার সভায় যেতে হবে। সন্ধ্যার পর গোসল সেড়ে সে চাচার সঙ্গে নাওমিকে খুঁজতে বের হবে আবার।

__________

কাউন্টের সঙ্গে দেখা করে অভিযান দল নিয়ে প্রিন্সেসের খোঁজ করার উদ্দেশ্যে রওনা দিতে উদ্যত হয় কেভ। ঠিক সে সময়ই কোথা থেকে ঘোড়ার পিঠে করে ছুটে আসে ক্লাডিয়াস। কিছুটা ব্যস্ত স্বরে বলে,

“ সেনাপতি, আমিও আপনাদের সঙ্গে যেতে চাই। “

কেভ অবাক হয়। ক্লাডিয়াসকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“ তোমার কি কাজ আমাদের সঙ্গে? সেনা শিবিরে ফিরে যাও। আজ প্রশিক্ষণ নেই আমার? “

“ প্রিন্সেসকে খুঁজে বের করার জন্য যতটুকু প্রশিক্ষিত হওয়া জরুরী ওতটুকু প্রশিক্ষণ আমার আছে। সেনা শিবিরের থেকে বেশি উপযুক্ত জায়গা এখন আমার জন্য আপনাদের পাশে থাকাটা। আমি সঙ্গে থাকলে আপনাদের দলের সদস্য সংখ্যা এক বেশি হবে, এতে খুঁজতে সহজ হবে। “

কেভ বুঝে উঠতে পারে না প্রিন্সেসের মামলায় ক্লাডিয়াসের এতো আগ্রহের কারণ কি। তবে ক্লাডিয়াসের কথাগুলোও সম্পূর্ণ ফেলে দেওয়ার মতো না। আসলেই এ-ই মুহূর্তে আরো কয়েকজন বিশ্বস্ত সদস্য সঙ্গে পেলে তাদের সুবিধা হয়। আর জোসেফ পুত্রর বিশ্বস্ততা নিয়ে কারোই কোনো সন্দেহ নেই। তাই কেভ ক্লাডিয়াসকে অনুমতি দেয় তাদের সঙ্গে যাওয়ার। দূর হতে প্রাসাদ ভবনের দরজার সামনে থেকে জোসেফ লক্ষ্য করে সম্পূর্ণ দৃশ্যটা। মনে মনে কিছুটা বিস্মিত সে। কি করতে চাইছে তার ছেলে? এক কাউন্ট কি কম ছিলো, যে তার নিজের ছেলেও এখন সন্দেহজনক কাজকারবার শুরু করেছে? জোসেফ বিড়বিড়িয়ে বলে উঠে,

“ এর উপরও নজর রাখতে হবে। “

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন