প্রণয়তিথি
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
২২.
বিশাল কালো রঙা সিন্দুকটা সামনে রেখে মেঝেতে বসে আছে ক্যামেলিয়া। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করছে সিন্দুকের মুখে ঝুলন্ত তালাটাকে। তালাটা একটা লাল রঙের সুতো দ্বারা প্যাঁচানো। ক্যামেলিয়া সাহস করে তালটা এক হাতে ধরে অন্য হাতে সুতোটা খুলতে শুরু করে। কিছুটা সময় নিয়ে সুতোটা খুলে ফেলতেই সে কেবল তালাটার উপর দৃষ্টিপাত করে।
বিশাল এই তালাটার চাবি খুঁজে বের করা ক্যামেলিয়ার পক্ষে সম্ভব হয় নি। তাই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে তালাটা ভেঙেই ভিতরে কি আছে তা দেখবে। সঙ্গে করে নিয়ে আসা একটা মাঝারি আকারের পাথরের খন্ড নিয়ে ক্যামেলিয়া একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে। এই প্রথম বাবার অজান্তে বাবার কোনো জিনিসের তল্লাশি নিচ্ছে সে। কিছুটা অদ্ভুৎ অনুভূতি হচ্ছে তার। নিজেকে আদব কায়দাহীন সন্তান হিসেবেও মনে হচ্ছে। তবে তার নিজের প্রশ্ন গুলোর উত্তর খুঁজে বের করার জন্য আর কোনো উপায় যে নেই।
নিজের নেকড়ে সত্তার শক্তি ব্যবহার করে পাথর দিয়ে তালার মুখ বরাবর এক আঘাত করে ক্যামেলিয়া। তার বলপ্রয়োগ এর ফলস্বরূপ সঙ্গে সঙ্গে তালার মাথাটা ভেঙে যায়। ক্যামেলিয়া দ্রুত হাতে তালা খুলে ফেলে সিন্দুকটা খোলার জন্য হাত বাড়ায়। তার বুকের ভেতর ধুকপুক করছে কেমন। কিছুটা খুশি, কিছুটা আতংকও কাজ করছে।
কম্পিত হাতে সিন্দুকটা খুলতেই ক্যামেলিয়া চমকায়। উন্মুক্ত সিন্দুকের ভেতরে থাকা জিনিসগুলো দেখে আবেগপ্রবণ হয়। দু চোখের কার্ণিশে এসে জল ভীড় করে। সিন্দুকে থাকা একটা প্রজাপতি আকৃতির চুলের কাঁটা সে হাতে তুলে নেয়। এই চুলের কাঁটাটা তার মা'র। ক্যাথরিনের।
বাবা তবে মা'য়ের জিনিসগুলো এতো যত্নের সহিত এই সিন্দুকে তুলে রেখেছিলো? কিন্তু এতে এতো লুকোচুরির কি আছে? এই জিনিসগুলোর উপর তো ক্যামেলিয়ারও অধিকার আছে। ক্যামেলিয়া এক এক করে সিন্দুকের উপরিভাগে রাখা নিজের মা'য়ের জিনিসগুলো হাতে নিয়ে ছুঁয়ে দেখতে থাকে। অদৃশ্য এক মায়া অনুভব করে সে। প্রতিটা অলংকার, খঞ্জর, ওড়নায় কেমন গভীর মমতা লুকিয়ে আছে!
ক্যামেলিয়া অস্ফুটে বলে উঠে,
“ আমার কি দূর্ভাগ্য দেখো! তোমার চেহারাটাও আমার স্মৃতির পাতায় আবদ্ধ নেই। আমি দুঃখিত মা। “
ক্যাথরিনের জিনিসগুলো দেখতে দেখতে ক্যামেলিয়া হঠাৎ লক্ষ্য করে সিন্দুকের ভেতরটায় আরো বেশ কিছু জিনিস আছে। সঙ্গে সঙ্গে তার ভ্রু যুগলের মাঝখানটায় ভাজ পড়ে। সে অশ্রুসিক্ত চোখ মুছেই উক্ত জিনিসগুলো ঠিক কি, তা খতিয়ে দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রথমেই সে হাতে তুলে নেয় সাত/আট বছরের বাচ্চা ছেলের একটা নোংরা জুতা। ক্যামেলিয়ার মনে প্রশ্ন জাগে এটা কার জুতা হতে পারে? তাদের প্রাসাদে তো কোনো বাচ্চা ছেলে নেই। ক্যামেলিয়ার জানামতে কখনো ছিলও না। তাদের পালের প্রত্যেকটা সদস্য পূর্ণ বয়সে উপনীত হয়েই নেকড়েতে পরিণত হয়ে এই প্রাসাদে এসেছে। তাহলে?
ক্যামেলিয়া জুতাটা রেখে বাকি জিনিস গুলো এক এক করে দেখতে থাকে। অসংখ্য কাগজের সমাহার এখানে। প্রতিটা কাগজেই হাবিজাবি সংকেতিক চিহ্ন এবং অজানা ভাষার ছড়াছড়ি। ক্যামেলিয়া সেসব কাগজে লেখা বস্তুর ভাবর্থ বুঝতে ব্যর্থ হয়। এতো সব জিনিসের মাঝে হুট করেই তার চোখ গিয়ে আটকায় একটা ডায়েরির পানে। ক্যামেলিয়া অবাক হয়ে দেখে সে-ই ডায়েরিটাকে। ডায়েরির প্রচ্ছদ ভাগ দেখেই স্পষ্ট আন্দাজ করা যাচ্ছে অন্তত শতাব্দী বছরের বেশি বয়স হবে এই ডায়েরিটার। মনে হচ্ছে ধরলেই বুঝি পুরোটা খসে যাবে।
ক্যামেলিয়ার কেন যেনো মনে হলো সে এ-ই ডায়েরিটা পড়লেই অনেক কিছু জানতে পাবে। যা তার অজানা এবং যা তার বাবার গোপনতম জীবনের অধ্যায়। আগ্রহী ক্যামেলিয়া কোনো কিছু না ভেবেই ডায়েরিটা হাতে তুলে নিয়ে বিছানার পায়ার সঙ্গে হেলান দিয়ে বসলো। মানসিকভাবে নিজেকে যেকোনো অজানা সত্যের সম্মুখীন হওয়ার জন্য প্রস্তুত করে নিয়েই সে ডায়েরিটা খুলতে নেয়। এমন সময়ই কারো ডাকে সে চমকে পিছনে ফিরে দরজার পানে তাকায়। বিস্মিত স্বরে বলে উঠে,
“ তুমি! “
__________
আজ প্রাসাদে আসতেই খাসদাসীর হতে আগাম সতর্ক বার্তা শুনতে হয়েছে জেইলানের। তাকে কঠোর ভাবে শাসানো হয়েছে যেনো মন দিয়ে সাবধানতার সহিত কাজ করে। রাজমাতা এবারের মতো এই ভুলের বিনিময়ে ক্ষমা ভিক্ষা দিলেও, পরের বার তিনি এধরণের ভুল বরদাস্ত করবেন না। মেডুসা নামধারী জেইলান বাধ্য দাসীর ন্যায় অভিনয় করে বুঝালো এরকম ভুল এই ইহজনমে আর তার দ্বারা হবে না।
খাসদাসী চলে যেতেই ডাকিয়ানা এগিয়ে আসে মেডুসার নিকট। হাফ ছেড়ে সে বলে,
“ তোমার ভাগ্য ভালো যে এতো বড়ো একটা ঘটনার পরও কাউন্ট তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছে। আমি তো ভেবেই নিয়েছিলাম তোমার বোধহয় দন্ড ঘোষণা করা হবে। “
মেডুসা হেসে না বুঝার ভান করে বলে উঠে,
“ কাউন্ট বুঝি খুব নির্দয়? “
পাশ থেকে কাজে ব্যস্ত আরেক দাসী জবাব দিয়ে বসে,
“ মোটেও না। আমাদের কাউন্ট নরম হৃদয়ের পুরুষ। উনার সহৃদয়তার প্রমাণ রাজ্যে প্রজাদের মুখে মুখে ছড়িয়ে আছে। তোমাকে আমার মায়ের কথা বলেছিলাম না, ডাকিয়ানা? ঈশ্বরের কৃপায় কাউন্টের নিযুক্ত করে দেওয়া চিকিৎসকের সেবায় আমার মা এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। “
জেইলান ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে,
“ কাউন্ট কেন তোমার মায়ের জন্য চিকিৎসক নিযুক্ত করবেন? “
দাসীটা জবাবে বলে,
“ আমি নিরুপায় ছিলাম। বাধ্য হয়ে দুঃসাহস দেখাই একদিন। কাউন্ট স্নানঘরে থাকা অবস্থায় দরজার অপার হতে চেঁচিয়ে মিনতি করি। নিজের মায়ের শারীরিক অবস্থার কথা জানাই। সাহায্য ভিক্ষা করি। “
জেইলান আগ্রহী স্বরে প্রশ্ন করে,
“ তারপর? “
“ অতঃপর আমাকে প্রহরীরা টেনে হিচড়ে দরজার কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। আমি সকল আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে চমকে দিয়ে ঠিক পরের দিনই খাসদাসী আমার বাসায় একজন চিকিৎসক নিয়ে উপস্থিত হয়। খাসদাসীর সঙ্গে প্রাসাদে কর্মরত চিকিৎসককে দেখে আমি অবাক হই। তার থেকেও বেশি অবাক হই যখন শুনি আমার এই সৌভাগ্য কাউন্টের মেহেরবানীর দরুণ হয়েছে। “
জেইলান না চাইতেও চুপ হয়ে গেলো। তার সহ্য হচ্ছিলো না ওই বর্বরের এমন ভালো মানুষি রূপের মিথ্যা বর্ণনা। ভন্ডটা প্রজাদের সামনে পরোপকারী লেবাসের মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ায়। কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই জেইলানের মাথায় চট করে একটা বুদ্ধি খেলে যায়। সে ভেবে এসেছিলো আজও ওই কাউন্টের জন্য একটা মরণ ফাঁদ পাতবে সে।
তবে কেমন হয় যদি এর বদলে আজ সে ওই ভন্ড ইয়ানের মুখোশটা সবার সামনে টেনে হিচড়ে খুলে ফেলে? কেমন হয় যদি কাউন্ট ইয়ানকে তারই প্রজাদের দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়? এতে যেমন প্রজারাও ওই অসভ্য কাউন্টের উপর থেকে ভরসা হারাবে, তেমনই কাউন্টের আশেপাশের শত্রুরাও নিজ নিজ জায়গায় নড়েচড়ে বসবে। চারিপাশ থেকে সকলেই প্রস্তুতি নিবে ইয়ান নামক বেজিটাকে ছোবল মারার। মনে মনে নিজের সাজানো নতুন ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা সম্পন্ন করেই জেইলান ক্রুর হাসলো। এই কাজের জন্য এখন তার আব্দুলকে দরকার। দ্রুত নিজের কাজ সেড়ে তার প্রাসাদের বাহিরে অপেক্ষারত আব্দুলের কাছে পৌঁছাতে হবে।
__________
ক্যামেলিয়াকে চমকাতে দেখে কেভ ভ্রু কুচকে তাকায়। লুনা তার কণ্ঠস্বর শুনে এমন ভীত এবং বিস্মিত হলো কেন? সকলের অনুপস্থিতিতে কোনো নিষিদ্ধ কাজ করছিলো নাকি নেকড়ে কন্যা? কেভ দরজার ওখানটায় দাঁড়িয়ে থেকেই সম্পূর্ণ কক্ষে দৃষ্টি বুলায়। লক্ষ্য করে কক্ষের মেঝে জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন জিনিসপত্র।
ক্যামেলিয়া কেভের দৃষ্টি লক্ষ্য করে সঙ্গে সঙ্গে ডায়েরিটা হাতে নিয়েই উঠে দাঁড়ায়। দরজার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা কেভের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে সে বলে উঠে,
“ ওহ! আমি মা'য়ের কিছু জিনিস বের করে দেখছিলাম। তুমি হঠাৎ এখানে? “
কেভ আর ঘাটলো না ব্যাপারটা। সে চোখে মুখে অসন্তোষ নিয়ে বলে উঠে,
“ রাজমাতা আপনাকে প্রাসাদে যেতে বলেছেন। “
ক্যামেলিয়া ততক্ষণে কামরা থেকে বেরিয়ে এসে দরজাটা বাহির থেকে আটকে দিয়েছে। সে চায় না কেভ তার বাবার ব্যক্তিগত জিনিসগুলো দেখুক। ক্যামেলিয়া বলে,
“ শুধুমাত্র এতটুকু বলার জন্য আপনি আমার প্রাসাদে এসেছেন? “
“ আর কি কারণে আসবো? “
বলেই কেভ অনাগ্রহ দেখিয়ে প্রস্থানের জন্য পা বাড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে তার হাত টেনে ধরে কেউ পিছন থেকে। ক্যামেলিয়া ভিতরে ভিতরে ফুঁসছে। সে অনেক সহ্য করেছে এমন আচরণ। এই ঘৃণা ভরা দৃষ্টির পিছনে কারণ কি সেটা তার জানতে হবে। সে প্রশ্ন করে,
“ সমস্যা কি তোমার? আমি নেকড়ে সেটা তুমি বহু বছর আগ থেকেই জানো। এতো বছর তোমার চোখে তো আমি নিজের জন্য কোনো ঘৃণা খুঁজে পাই নি। তাহলে হুট করে কি হলো? এ-ই অসম্ভব ঘৃণা উদয় হওয়ার পিছনে কারণ কি? “
কেভ বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে বলে,
“ আমার হাত ছেড়ে কথা বলুন আপনি। “
ক্যামেলিয়ার রাগ বৃদ্ধি পেলো,
“ এখন আমার ছোঁয়াও বিষাক্ত লাগে তোমার? “
কেভ দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দেয়,
“ যার অস্তিত্বটাই বিষাক্ত এবং অভিশপ্ত তার ছোঁয়া নিশ্চয়ই মধুর মতো লাগবে না আমার? “
কেভের এরকম গা জ্বালানো কথাবার্তায় ক্যামেলিয়ার রাগ তিরতির করে বেড়ে যায়। সে রাগের মাথায় একটা অকল্পনীয় কাজ করে বসে। একহাতে ক্যাভের শার্টের কলারটা টেনে ধরে নিজের কাছে নিয়ে আসে। ছুঁয়ে দের পুরুষালি অধর যুগল। অতঃপর দু কদম পিছিয়ে গিয়ে কেভের বিস্ফোরিত চোখে চোখ রেখে ক্রোধিত স্বরে বলে উঠে,
“ অভিশাপের ভাগ এখন তোমারও হলো। অন্তরে এ-ই বিষাক্ত ছোঁয়ার ছাপ আজীবনের জন্য তুলে রাখো। আরেকটু বেশি করে ঘৃণা করবে এখন থেকে, ঠিকাছে? “
বলেই ক্যামেলিয়া ত্রস্ত পায়ে আরোণের কক্ষে ঢুকে দরজা আটকে দেয়। কেভ হতবিহ্বল ভঙ্গিতে আপন জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়। এ-ই মুহূর্তে কি হলো এটা? কেভ নিজের ডান হাত তুলে নিজের ওষ্ঠদ্বয় ছুঁয়ে দেখে। এইমাত্র ও-ই নেকড়ে কন্যা বিনা অনুমতিতে তাকে চুমু খেয়ে গেলো?
__________
তীব্র জ্বরের প্রকোপে কাবু নাওমির জ্ঞান ফিরতে শুরু করলো সন্ধ্যার দিকে। শরীরের প্রতিটা শিরায় অনুভব হওয়া ব্যথায় অস্ফুটে গোঙাতে থাকলো সে। ভারী চোখের পাতা মেলে তাকানোর শক্তি পেলো না। অবচেতন মন এবং অসুস্থ দেহটা মা'কে খুব করে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কোথায় তার মা? এই-যে জ্বরে কাবু নাওমি মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছে না, তার না বলা কথাগুলোও বুঝে নিতে সক্ষম মা'টাকে সে নিজের পাশে অনুভব করতে পারছে না কেন?
নাওমির বদ্ধ চোখের কার্নিশ ঘেঁষে জল গড়িয়ে পড়ে। নিজেকে বড্ড একা মনে হচ্ছে। অন্ধকার একটা গহব্বরে বুঝি হারিয়ে গিয়েছে সে। কেউ নেই তার কপালে হাত রাখার জন্য। কেউ নেই তাকে দুটো শাসন করে জ্বরের কারণ জানতে চাওয়ার জন্য।
চোখ বুজে রেখেই যখন একাকিত্বে নাওমি ছটফট করছিলো তখন কোথথেকে একটা ভারী শীতল হাত এসে তার আগুনসম উত্তপ্ত কপাল ছুঁয়ে দিলো। ও-ই হাতটা যেনো তার কপালে থাকা জ্বরের উত্তাপটুকু ছেঁকে নিতে চাইছে। চোখ বুজে রাখা নাওমি গভীর ভাবে অনুভব করলো সে-ই ছোঁয়া। কানে ভেসে এলো একটা বিরক্তিমাখা পুরুষ কণ্ঠের শাসন,
“ এ-ই মেয়ে? শুনতে পাচ্ছো? তাড়াতাড়ি নিজের হুশে ফিরে আমাকে উদ্ধার করো। আমার নিকট বন্দী হওয়া সত্ত্বেও অসুস্থ হয়ে সেবা লুটছো। আমি তোমার ভৃত্য নই। “
নাওমির ঠোঁটের কোণে অস্পষ্ট হাসি ফুটে উঠে। জ্বর কাতর অবস্থায় যখন সে চোখ মেলে তাকাতে পারে না, তখন তার মা-ও পাশে বসে সেবার পাশাপাশি শাসন পর্বটা চালিয়ে যায়। নাওমির ভ্রম হচ্ছে। তার মন তাকে চিৎকার করে বলে যাচ্ছে সে একা নেই। এই চরম অসহায়ত্বের মুহূর্তে কেউ আছে তার পাশে। তাকে দেখছে, তার মাথায় ঠান্ডা পানির জলপট্টি দিচ্ছে, বারবার কপাল ছুঁয়ে তাপমাত্রা মেপে নিচ্ছে।
শীতল হাতটা হুট করে নাওমির কপাল ছেড়ে গালটা ছোঁয়। কি উদ্দেশ্যে ছোঁয় তা অজানাই রয়ে যায়। তার পূর্বেই নাওমি নিজের হাত দিয়ে উক্ত হাতটা নিজের গালে চেপে ধরে। ঠোঁট উল্টে কান্নাভেজা স্বরে বলে,
“ পুড়ে যাচ্ছি। হাতটা সরিয়ে নিও না। ঠান্ডা হাতটা আরাম দিচ্ছে। “
নাওমি টের পেলো না তার কথার পিঠে কামরায় উপস্থিত অপর ব্যক্তিটার অস্বস্তি। সে দেখলো না লোকটা কি করে বিব্রত দৃষ্টি মেলে তাকে দেখছিলো। সে কেবল অনুভব করলো ধীরে ধীরে একটার বদলে দুটো বরফ শীতল হাত তার উত্তপ্ত গালের দু পাশে জায়গা দখল করে নিলো। অপর ব্যক্তিটার এহেন কাজের পিছনে দয়া, করুণা নাকি মায়া ছিলো তা-ও অজানা রয়ে গেলো।
নাওমি কেবল ভারী হাত জোড়ার শীতল ছোঁয়া অনুভব করতে করতে অস্ফুটে আপন মনে হওয়া মানুষটার কাছে নালিশ করে গেলো,
“ একটা রাক্ষস আমাকে ট্রান্সেলভেনিয়ায় বন্দী করে রেখেছে, জানো? অমানুষ একটা। আমাকে অভুক্ত রেখেছে ক'দিন ধরে। ও-ই রাক্ষসের রাক্ষসী বোনটা আমার গাল কেটে দিয়েছে। রাক্ষসটা নিজের বোনকে শাস্তি না দিয়ে উল্টো আমাকে শাস্তি দিয়েছে। আমাকে এই নোংরা কারাগারে ফেলে গিয়েছে। এখানে কতো অন্ধকার! আমি খুব ভয় পেয়েছি। ওই… ওই ইঁদুর গুলো আমার পায়ের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে বারবার। আমি আর এভাবে পারছি না। দয়া করো… আমাকে এই নরক থেকে মুক্ত করে নিয়ে যাও। এখানে খুব… অন্ধকার। বারবার মনে হচ্ছে অসংখ্য অতৃপ্ত ছায়া আমার উপর নজর রাখছে। আমাকে তোমার সঙ্গে নিয়ে যাও। দয়া… “
বাকি কথা আর সম্পূর্ণ করতে পারলো না নাওমি। নরম গদির বিছানায় আবারও ঘুমে ডুব দিলো সে। হারিয়ে গেলো স্বপ্নের রাজ্যে। তবে তার পাশে জাগ্রত পুরুষটা কোথাও ডুব দিতে পারলো না। ভ্রু কুচকে উল্টো বলে উঠলো,
“ স্বয়ং রাক্ষসকে বলছো নরক থেকে মুক্ত করে নিয়ে যেতে? তুমি কি চাও বলো তো মেয়ে? যুবরাজ বেহজাদের অধীনে বন্দিত্ব, নাকি রাক্ষসের উপহার দেওয়া স্বাধীনতা? “
তিন বাক্যের প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েই গাল ছেড়ে একটা রুক্ষ হাত ঘুমন্ত রমণীয় চোখের কার্নিশে জমে থাকা জল মুছে দিতে উদ্যোত হলো। জ্বরের ঘোরে এই চরম অসহায়ত্ব প্রকাশ করা মেয়েটাই, জাগ্রত অবস্থায় খুনের হুমকি দিয়ে বেরায়। অথচ বাস্তবিক অর্থে মেয়েটা কখনো কাউকে খুন করতে সক্ষম হবে বলে মনে হয় না বেহজাদের। খুন করতে বুকে নিষ্ঠুরতার লেশ পুষতে হয়। বেহজাদের অন্তরে সেই নিষ্ঠুরতার অস্তিত্ব থাকলেও, এই মেয়েটার মাঝে তার সিকিভাগও খুঁজে পাওয়া গেলো না।
__________
প্রাসাদ থেকে নিজের কাজ শেষ করে সবে বেরিয়েছে জেইলান। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমে এসেছে। প্রাসাদে বাকি দাসীদের মতো বেশভূষায় চললেও, প্রাসাদ থেকে বের হতেই সে একটা ওড়না টেনে মাথা, বুক ঢেকে নিয়েছে। তার এখন আব্দুলের কাছে যেতে হবে। আব্দুল প্রাসাদ থেকেই কিছুটা দূরে বাজারের কাছাকাছি জায়গায় অপেক্ষারত আছে।
জেইলান প্রাসাদ দ্বার দিয়ে বের হওয়ার মুহূর্তেই ঘোড়ায় করে প্রাসাদে প্রবেশ করছিলো জোসেফ। হুট করে অবহেলা পূর্ণ দৃষ্টিতে চারিপাশে চোখ বুলিয়ে সামনে তাকাতেই জোসেফ চমকায়। সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে সে পিছনে ঘুরে তাকায়। ব্যস্ত নয়নে প্রাসাদ দ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সকলের উপর দৃষ্টি বুলায়। উঁহু, যাকে দেখে সে চমকে গিয়েছে সে-ই মানুষটাকে এখন আর খুঁজে পাচ্ছে না সে। তাহলে কি এইমাত্র সে যা দেখলো, তা কেবল তার চোখের ভেলকি ছিলো?
জোসেফের কপালে চিন্তার ভাজ ফুটে উঠে। তার মনে হচ্ছে সে এইমাত্র মাহশাকে দেখেছে। তবে মাহশা তো মৃত! সে এখানে কি করে আসবে? পুরোটাই কি জোসেফের ভ্রম নাকি মাহশা প্রেতাত্মা হয়ে ফিরে এসেছে নিজের অতৃপ্ত আত্মার প্রতিশোধ নিতে?
চলবে…