প্রণয়তিথি
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
২৩.
সিবিউ প্রাসাদে ক্যামেলিয়ার আগমন ঘটে সন্ধ্যার দিকে। প্রাসাদে এসেই সে আনাস্তাসিয়া এবং স্যাফিরার সঙ্গে দেখা করে। স্যাফিরাকে জড়িয়ে ধরে আশ্বাস দেয় নাওমিকে শীঘ্রই ফিরে পাবার। স্যাফিরা প্রতিক্রিয়াহীন বসে রয়। মেয়ের চিন্তায় কাদতে কাদতে চোখের পানি শুকিয়ে এসেছে তার। এখন আর কান্নাও পায় না। কেবল ভেঙে আসা দূর্বল শরীরটা দম ছাড়ার আগে একদফা নিজের মেয়েকে সুস্থ অবস্থায় দেখতে ব্যকুল।
আনাস্তাসিয়া ক্যামেলিয়াকে আলাদা টেনে উদ্বিগ্ন স্বরে আদেশ করে,
“ কিছুদিন তুই আমার কাছে প্রাসাদেই থাকবি। আমি আরোণ ভাইকে জানিয়ে দিবো। তুই অন্তত আমার কথার অবাধ্য হোস না ক্যামি। ইদানিং বুক ধড়ফড় করছে শুধু। তোরা চোখের সামনে থাকলে বোধহয় কিছুটা স্বস্তি পাবো। “
ক্যামেলিয়া বুঝতে পারে খালার অস্থিরতাটা। সে আনাস্তাসিয়ার গলা জড়িয়ে ধরে বলে,
“ আচ্ছা, আচ্ছা। তুমি এতো চিন্তা করো না তো অ্যানা। আমি তোমার চোখের সামনেই ঘুরঘুর করবো এখন থেকে সারাদিন। খুশি? তুমি বললে ইয়ানের উপরও এই নিয়ম জারি করা যায়। “
ক্যামেলিয়ার দুষ্টুমি মিশ্রিত কথায় আনাস্তাসিয়া মলিন হাসে। তারা দু'জনই ভালো করে জানে ইয়ানকে চাইলেও প্রাসাদে বন্দী করে রাখা সম্ভব নয়। দায়িত্বের তাগিদে প্রাসাদের বাহিরে ইয়ানের কদম ফেলতেই হবে।
আনাস্তাসিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে ক্যামেলিয়া নিজের জন্য নির্ধারিত কক্ষে এসে দ্রুত দরজা আটকে দেয় ভেতর থেকে। বিছানায় পা তুলে বসে সে সঙ্গে করে নিয়ে আসা ডায়েরিটা বের করে। উফ! এটা ফেলে আসলে তার মন এক দন্ডের জন্য টিকতো না এখানে। আপাতত বাবার কাছে ধরা খাওয়ার সম্ভাবনা নেই খুব একটা।
ক্যামেলিয়া আসার পূর্বে ডায়েরি ব্যতীত প্রতিটা জিনিস সিন্দুকে জায়গামতো গুছিয়ে রেখে এসেছে। সিন্দুকের মাথাভাঙা তালাটাও খুব কায়দার সঙ্গে আটকে সেটাকে ওই সুতো দিয়ে এমনভাবে প্যাঁচিয়ে রেখে এসেছে, যেনো তালার ভাঙা অংশটা চোখে না পড়ে। সবশেষে সিন্দুকটা ঠেলে আপন জায়গায় এমনভাবে রেখে দিয়েছে যেনো কেউ আন্দাজ করতে না পারে যে এই সিন্দুক আদৌ কেউ ছুঁয়েছে।
একটা স্বস্তিদায়ক নিঃশ্বাস ছেড়ে ক্যামেলিয়া কোলের পেটমোটা আকারের ডায়েরির প্রথম পাতাটা খুলে। শতাব্দী কাল আগে লেখা কালো কালির অক্ষর গুলোতে সে নিজের মনযোগী নজর বোলাতে শুরু করে। পড়তে থাকে নিজের বাবা এবং নেকড়ে পালের আলফা আরোণ রদ্রিগেজের গোপন এবং একান্ত দিনলিপির শব্দসমূহ। তীব্র আগ্রহে সে নিঃশ্বাসটুকু নিতে ভুলে যায়। দম আটকে পড়ে যায় প্রতিটি পাতা।
__________
নিজ কক্ষের টেবিলটার উপর কিছু দলিলপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছে কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট। পিঠ টানটান করে চেয়ারে বসে উক্ত দলিলপত্র গুলো পরখ করতে ব্যস্ত সে। এইতো আর অল্প কিছুদিনের মাঝেই সৈন্যদের নিয়ে সফরে যেতে হবে তার। সকল প্রস্তুতি প্রায় শেষের পথে। কেবল তুলনামূলক কিছুটা পিছিয়ে আছে নৌ বাহিনীর প্রস্তুতি পর্ব। এর পিছনে কারণটা হলো ম্যাথিউ। নৌ বাহিনীর প্রধান হওয়ার সূত্রে এ-ই বিভাগের সকল কাজের দায়িত্ব তার উপর বর্তায়। কিন্তু বিগত ক'দিন ধরে সে দিন-রাত নিজের মেয়ের খোঁজ করতে ব্যস্ত।
ইয়ান চাচার মনের তুফানটা বাহির থেকে কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারছে। সে নিজেও রাজ্যের কাজ থেকে ফুরসত পেতেই প্রাসাদে এক দন্ড স্থির থাকছে না। বেরিয়ে যাচ্ছে নিজের বিশেষ দলের সঙ্গে কাধে কাধ মিলিয়ে বোনকে খুঁজতে। এখন পর্যন্ত সমগ্র রাজ্যের পাঁচ ভাগের কেবল এক ভাগই খোঁজা সম্পন্ন হয়েছে। তবে উক্ত অংশে নাওমির কোনো হদিস পাওয়া যায় নি। মনে হচ্ছে যেনো মেয়েটা হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে। কোনো সূত্র, কোনো চিহ্ন কিচ্ছুটি পাওয়া যাচ্ছে না।
ইয়ানের মনযোগ ভঙ্গ হয় কক্ষের দরজায় করাঘাতের শব্দে। সে কাগজগুলোতে চোখ বুলাতে বুলাতে অনুমতি দেয় বাহিরে অপেক্ষমাণ ব্যক্তিকে ভেতরে প্রবেশের। সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে কামরায় প্রবেশ করে জোসেফ। ইয়ান চোখ তুলে দেখে তাকে। হাতের কাগজগুলো রেখে প্রশ্ন করে,
“ সর্বশেষ তথ্য কি? “
জোসেফ জবাব দেয়,
“ কাউন্ট, উত্তর দিশার দিকের গোটা জঙ্গল এবং শহরগুলো কেবল খোঁজা শেষ হলো। দূর্ভাগ্যবশত প্রিন্সেসের কোনো হদিস খুঁজে পাওয়া যায় নি। ব্যাপারটা যেমন একদিক দিয়ে হতাশার, অন্যদিক দিয়ে আশারও। আমরা এখনো আশা রাখতে পারি যে প্রিন্সেস জীবিত আছে। এটাই বড়ো ব্যাপার বলে মনে করছি। “
ইয়ান মন উদাস করে বলে,
“ নাওমিকে যে-ই অপহরণ করুক সে যদি আমার শত্রু হয় তবে অন্তত ওকে খুন করবে না এইটা আমি আন্দাজ করতে পারছি। তবে অপহরণকারী আমার শত্রুপক্ষের হলে সে নিশ্চয়ই নাওমিকে আমার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতো। কিন্তু এখনো এরকম কিছু ঘটে নি। কেউ মুক্তিপণের দাবীও করে বসে নি। ব্যাপারটা আমাকে ভাবাচ্ছে খুব। “
জোসেফ কপালে ভাজ নিয়ে বলে,
“ তবে কি প্রিন্সেস শত্রুদের দ্বারা অপহরণ হয় নি বলতে চাইছেন? “
“ জানি না। মাথায় সকল সম্ভাবনাই ঘুরছে আমার। ব্যাপারগুলো খুব ভাবাচ্ছে। “
জোসেফ কিছু একটা ভেবে বলে,
“ এমনও তো হতে পারে কাউন্ট, যে প্রিন্সেস যার কিংবা যাদের হাতে বন্দী হয়েছে তারা প্রিন্সেসের আসল পরিচয় জানে না। প্রিন্সেস নিশ্চয়ই নিজের আসল পরিচয় জানানোর মতো বোকামি করবেন না! হয়তো একারণেই এখনো কেউ মুক্তিপণের দাবি নিয়ে আসে নি। “
জোসেফের কথাও সম্পূর্ণ ফেলে দেওয়ার মতো নয়। ইয়ানকে কিছুটা ভাবুক দেখায়। সে আপন ভাবনায় ডুব দিয়েছে ইতিমধ্যে। এদিকে জোসেফ মনে মনে উশখুশ করছে। চাইলেও প্রাসাদের প্রধান ফটকের ঘটনাটা সে ভুলতে পারছে না। স্মৃতির দন্ডে সে পিষ্ট হয়ে চলেছে। আসলেই কি সে ভুল দেখেছে? মেয়েটা কি মাহশা ছিলো না? কিন্তু দেখতে তো হুবহু মাহশার মতোই মনে হয়েছিল তার। জোসেফ কিছুটা ইতস্তত ভাব নিয়েই বলে উঠে,
“ কাউন্ট, আপনাকে একটা ব্যাপার জানানোর ছিলো। “
ইয়ান ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসে। সরাসরি জোসেফের দিকে তাকিয়ে গলা খানিকটা ঝেড়ে নিয়ে বলে,
“ জি, বলো। “
জোসেফ আমতা আমতা করে বলে,
“ আজ সন্ধ্যার পরে আমি যখন প্রাসাদে প্রবেশ করছিলাম তখন প্রধান ফটকের এখানে বোধহয় মাহ… “
জোসেফের বলা কথাটুকু অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। প্রাসাদের বাহির হতে প্রজাদের একত্রিত সুরে চেঁচামেচির শব্দ ভেসে আসছে। ইয়ান এবং জোসেফ দু'জনেই চমকে বারান্দার দিকে তাকায়। এতো মানুষের মিলিত ধ্বনিতে যেনো প্রাসাদের প্রতিটা ইট কেঁপে উঠছে। ইয়ান ব্যস্ত পায়ে বারান্দার দিকে পা বাড়ায়। জোসেফও এগোয় তার পিছু পিছু। ঘটনা কি ঘটছে তা দেখাটা জরুরী কাজ এ-ই মুহূর্তে।
নিজ কক্ষের বারান্দার কিনারে এসে দাঁড়াতেই ইয়ান দেখে প্রাসাদ প্রাঙ্গণে অসংখ্য প্রজার ভীড়। সকলে চেঁচামেচি করতে ব্যস্ত। হুট করে তাদের এভাবে জমায়েত হওয়ার পিছনে কারণটা এখান থেকে আন্দাজ করা যাচ্ছে না। ইয়ান কক্ষের দিকে পা বাড়াতে নেয় প্রজাদের মুখোমুখি হওয়ার উদ্দেশ্যে। তার জানতে হবে কি ঘটেছে।
তবে ইয়ানের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় জোসেফ। সে ব্যস্ত স্বরে বলে,
“ আপনি সরাসরি হাজির হবেন না কাউন্ট। প্রজাদের এরকম দুঃসাহস দেখানোর পিছনে কারণটা আগে জানা জরুরী। প্রাসাদে এই মুহূর্তে প্রধান সেনাপতি কিংবা আপনার চাচা কেউ-ই উপস্থিত নেই। আপনার নিরাপত্তা সবথেকে জরুরী এই মুহূর্তে। অনুমতি দিন, আমি জেনে আসি ওদের সমস্যার উৎসটা কি? “
জোসেফের কথা ভুল নয়। ইয়ান অনুমতি দিতেই সে সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে প্রজাদের মুখোমুখি হতে। নিজ কামরায় দাঁড়িয়ে থাকা ইয়ানের জন্যও কৌতূহল চেপে রাখা কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা-ই সরাসরি ঘটনাটা শুনতে সে-ও কক্ষ থেকে বের হয়ে করিডর ধরে হাঁটা শুরু করে। ঠিক সে-ই মুহূর্তে পিছন হতে পরিচিত নারী স্বরটা আতংকিত ভঙ্গিতে বলে উঠে,
“ তুমি কোথাও যাবে না, ইয়ান। “
__________
রাজ প্রাসাদের সম্মুখ দ্বার খুলে যায়। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে সেনাপতি জোসেফ। শিনা টানটান করে সে মুখোমুখি হয় জোড়ো হওয়া প্রজাদের। হাতের ইশারায় সকলকে চুপ করতে বলে গলা উঁচিয়ে জানতে চায়,
“ কি হয়েছে? এরকম বিশৃঙ্খলার মানে কি? কি চাও তোমরা? “
প্রজাদের ভেতর থেকে একজন চেঁচিয়ে বলে উঠে,
“ আমরা শুনেছি বিগত বেশ ক'দিন ধরে প্রিন্সেস নিখোঁজ। উনার খোঁজ চলছে সম্পূর্ণ রাজ্যে। এটা কি সত্যি? “
প্রজার মুখে এ-ই কথা শুনে জোসেফ চমকায়। এটা কিভাবে সম্ভব? প্রজাদের কানে এই খবর কে তুলে দিলো? জোসেফ পরিস্থিতি সামাল দিতে বলে উঠে,
“ এরকম গুজব কে রটিয়েছে? কে দেখিয়েছে এরকম দুঃসাহস? “
প্রজারা জোসেফের প্রশ্নের উত্তর দিলো না। বরং বিক্ষিপ্ত স্বরে পাল্টা প্রশ্ন করলো,
“ আমরা জবাব চাই। প্রিন্সেস নাওমি কি সত্যিই নিখোঁজ? যদি এ-ই অভিযোগ মিথ্যা হয় তবে এ-ই মুহূর্তে উনাকে আমাদের সামনে উপস্থিত হওয়ার আহবান জানান। “
জোসেফ চোখ রাঙিয়ে ধমকে উঠে,
“ অসভ্য! প্রিন্সেসকে উপস্থিত হতে বলার অধিকার তোমাদের কে দিয়েছে? নিজেদের সীমা লঙ্ঘন করবে না! “
জোসেফের এরকম আচরণে প্রজারা আরো নিশ্চিত হয়ে যায় যে অভিযোগটা মিথ্যা নয়। তারা তীব্র আক্রোশের সঙ্গে বলে উঠে,
“ মিথ্যাবাদী! কাউন্ট মিথ্যাচার করতে পাঠিয়েছে এ-ই সেনাপতিকে। আমাদের থেকে আসল ঘটনা লুকানো হচ্ছে। “
প্রজারা বিশৃঙ্খল আচরণ শুরু করে। প্রাসাদে উপস্থিত সেনাপতিরা তাদের সামাল দিতে ব্যস্ত। জোসেফ আতংক ভরা দৃষ্টিতে দেখছে গোটা দৃশ্যটা। আজ যদি প্রজাদের নিকট প্রমাণ হয়ে যায় যে প্রিন্সেস নাওমি সত্যি সত্যি নিখোঁজ তাহলে পরিস্থিতি হাতের বাহিরে চলে যাবে। এ-ই ঘটনার পর প্রিন্সেসকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও, উনার গায়ে লাগা কলংকের দাগ কখনো মোছা সম্ভব হবে না। প্রজারা উনাকে নিচু নজরে দেখবেন। নাওমির উপর আরোপ করা হবে বিভিন্ন নোংরা অভিযোগ। মূর্খ প্রজারা ধারণা করবেন প্রিন্সেস শত্রু পক্ষের হাতে অপহরণ হয়ে নিজের সতিত্ব খুইয়ে ফিরেছে। বহু শতাব্দী আগে এরকমই একটা ঘটনা ঘটেছিলো এ-ই রাজ্যে। শত্রুপক্ষের হাতে বন্দী হওয়া প্রিন্সেস যখন মাস খানিক পর মুক্ত হয়ে ফিরে আসে, তখন প্রজারা এরকমই আচরণ করেছিলো। অপমান এবং অভিযোগের ভার বইতে না পেরে সে-ই প্রিন্সেস কৃষ্ণ সাগরের অতলে হারিয়ে গিয়েছিল।
নিজেকে সামলে নিয়ে জোসেফ চেষ্টা চালায় প্রজাদের সামলানোর। কিন্তু তার কোনো কথায় বিশেষ একটা লাভ হয় না। প্রজারা নিজেদের কথায় অনড়। হয় তাদের সত্যিটা জানাতে হবে, আর না-হয় প্রিন্সেসকে তাদের সামনে এনে উপস্থিত করে প্রমাণ দিতে হবে। জোসেফ দিশেহারা হয়ে যায়। ঠিক সে-ই মুহূর্তেই তার পিছনে প্রাসাদের প্রধান দ্বার খুলে যায়। দরজার দুটো পাশ খুলে যেতেই ভেতর থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে দেখা যায় একটা ছায়ামূর্তিকে। জোসেফ ভীত হয়! কাউন্ট নাকি? অসম্ভব! কাউন্ট এভাবে সকলের সামনে আসতে পারেন না। প্রজাদের নিকট একবার উনার মুখশ্রী উন্মোচন হলে উনার নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। জোসেফ মনে মনে বিড়বিড়িয়ে প্রার্থনা করতে থাকে,
“ কাউন্ট! এই ভুল করবেন না। ঈশ্বর, বোকা কাউন্টকে একটু সুবুদ্ধি দিন। “
চলবে…