প্রণয়তিথি
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
২৪.
প্রজাদের তীক্ষ্ণ কোলাহল হুট করেই থেমে যায় কারো আগমনে। আগ্রহী দৃষ্টি মেলে সকলে তাকায় সম্মুখ পানে। প্রাসাদের দ্বার হয়ে বেরিয়ে আসেন রাজমাতা আনাস্তাসিয়া। আনাস্তাসিয়ার অবয়ব স্পষ্ট হতেই জোফেস যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচে। যাক, বাঁচা গেলো!
আনাস্তাসিয়া বেরিয়ে এসেই জোসেফকে উদ্দেশ্য করে রাগান্বিত স্বরে প্রশ্ন করে উঠে,
“ কি হয়েছে জোসেফ? ব্যাপার কি? এতো হট্টগোলের পিছনে কারণটা কি? “
প্রশ্নটা করেই আনাস্তাসিয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে প্রজাদের দিকে তাকায়। সঙ্গে সঙ্গে সকল প্রজারা নিজেদের দৃষ্টি নত করে ফেলে। কোনো এক কারণে রাজমাতাকে সকলে জমের ন্যায় ভয় পায়। বিশেষ করে আনাস্তাসিয়ার রাগান্বিত রূপ। বিশ বছর পূর্বে এই প্রাসাদ প্রাঙ্গণেই বেয়াদবি করার শাস্তিস্বরূপ রাজমাতার হাতে এক মন্ত্রীর গর্দান যাওয়ার ঘটনাটা আজও লোকমুখে প্রচলিত।
জোসেফ ব্যস্ত এবং নিচু গলায় বলে,
“ রাজমাতা, প্রজাদের কে যেনো প্রিন্সেস নাওমির নিখোঁজ হওয়ার খবরটা জানিয়ে দিয়েছে। এখন এরা ঘটনার সত্যতা জানতে চাইছে। প্রমাণসরূপ প্রিন্সেসকে সকলের সামনে উপস্থিত করার দাবী করছে। “
আনাস্তাসিয়ার কপালে কিঞ্চিৎ ভাজ দেখা দিলো। মনের ভয়টাকে সে প্রকাশ করলো না। দ্রুত ভাবতে লাগলো কি করে ব্যাপারটা চট জলদি সামলে নেওয়া যায়। এ-ই মুহূর্তে প্রাসাদের সম্মুখে উপস্থিত প্রজার সংখ্যা তূলনামূলক খুব একটা বেশি না। এখন যদি এদের সামাল না দেওয়া হয়, তবে আগামীকাল গোটা রাজ্যের সকল প্রজারা এসে পড়বে সত্যতা যাচাইয়ের জন্য। তখন সকলকে ঠেকানো কঠিন হবে।
চোখের পলকেই আনাস্তাসিয়া কিছু একটা ভেবে নিজের গম্ভীর রূপটা বজায় রেখে বলে উঠে,
“ এরকম একটা বেহুদা গুজব কে ছড়িয়েছে তা খুঁজে বের করে অবশ্যই শাস্তি দেওয়া হবে। তবে আপাতত সকলের জ্ঞানার্থের জন্য স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিচ্ছি, যে প্রিন্সেস নাওমি নিখোঁজ হয় নি। সে নিজের নানির বাসায় গিয়েছেন কিছু দিনের জন্য। “
ভীড়ের মধ্যে থেকে একজন প্রজা দুঃসাহস দেখিয়ে বলে উঠে,
“ আমরা কিভাবে মেনে নেই আপনি যা বলছেন তা মিথ্যা নয়, রাজমাতা? “
এরকম বেয়াদবির পিঠে জোসেফ অস্ত্র হাতে তেড়ে যেতে নেয় উক্ত প্রজার দিকে। তবে আনাস্তাসিয়া সঙ্গে সঙ্গে এক ধমকে তাকে বাধা দেয়। অতঃপর ক্রোধিত নজরে দেখতে থাকে প্রশ্নকারী প্রজাকে। ঠোঁটের কোণে বিদ্রুপের হাসি ফুটিয়ে সে বলে,
“ আমার কথায় সন্দেহ? এতটা তুচ্ছ হয়ে গেলো আমার কথার ভার? আর যে বা যারা প্রিন্সেসকে নিয়ে এরকম অবান্তর একটা গুজব ছড়ালো? তাদের কথার পিঠে একবারও মনে সন্দেহ জাগে নি? এইখানে উপস্থিত একটা ব্যক্তিও কি সে-ই ব্যক্তির কাছে কোনো প্রমাণের দাবী করেছে? “
আনাস্তাসিয়ার প্রশ্নের পিঠে প্রজারা কোনো উত্তর দিতে সক্ষম হয় না। তা-ই কথা ঘোরাতে একজন প্রজা বলে উঠে,
“ এই কথাগুলো তো চাইলে কাউন্টও আমাদের এসে বলতে পারতেন। কিন্তু উনি আমাদের মুখোমুখি হলেন না। প্রজাদের মুখোমুখি হতে কিসের এতো ভয় কাউন্টের? “
আনাস্তাসিয়া বলে উঠে,
“ ওহ! তো কথা ঘোরাতে এখন কাউন্টকে টেনে আনা হচ্ছে! আমি সকলের দুঃসাহস দেখে অবাক হচ্ছি। নিরাপত্তা জনিত ব্যাপারটা মাথায় রেখে কাউন্টের সরাসরি সকলের সামনে না আসার ব্যাপারটা টেনেও এখন প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে! কি চাইছেন আপনারা? ভীড়ে লুকিয়ে থাকা শকুনের নজর কাউন্টকে ভালো করে চিনে যাক? কাউন্টের উপর যেনো শত্রুদের আক্রমণ পন্থা সহজ হয়ে যায়, সেটাই চাইছেন? “
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আনাস্তাসিয়া। তার সামনে উপস্থিত এই জনতাদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতে সে ক্লান্ত। তাই নিজের কথার ইতি টেনে সে বলে উঠে,
“ শীঘ্রই কাউন্ট সফরে যাবেন। উনার সফর যাত্রার সূচনা বাধাগ্রস্ত করতেই বোধহয় কোনো চক্র এ-ই মুহূর্তে প্রিন্সেসকে নিয়ে এরকম একটা গুজব ছড়িয়ে আপনাদের উত্তেজিত করে দিতে চাইছে। আপনারা শত্রুদের ফাঁদে পা দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। যার তার কথা চোখ বুজে বিশ্বাস করে নেওয়া থেকে নিজেদের সংযত করুন। বাকি রইলো, আমার কথার সত্যতার প্রমাণ। তো সেটা আপনারা অতি শীঘ্রই পেয়ে যাবেন। এক সপ্তাহ সময় নিচ্ছি। দ্রুততম সময়ে প্রিন্সেসের নিকট প্রাসাদে ফিরে আসার বার্তা পৌঁছানো হবে। আজ থেকে ঠিক এক সপ্তাহ পর আপনাদের সামনে স্বয়ং প্রিন্সেস নাওমি উপস্থিত থাকবেন। তখন নিজ চোখে সত্য মিথ্যা যাচাই করে নিবেন সকলে। “
নিজের কথাটুকু শেষ করেই রাজমাতা আনাস্তাসিয়া আলবার্ট আর অপেক্ষা করলো না। উল্টো ঘুরে প্রাসাদের ভেতর হাঁটা ধরলো। প্রজারাও আর কথা বাড়ানোর সুযোগ পেলো না। হাতে এক সপ্তাহের চূড়ান্ত ধার্য দিনের হিসাব নিয়ে সকলে নিজ নিজ বাসায় ফিরে যাওয়া শুরু করলো। এতো মানুষের ভীড়ের মধ্যে থেকে একজোড়া কৃষ্ণ মণির দৃষ্টি আটকে রইলো জোসেফের দিকে। জোসেফ এবং রাজমাতার পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য বলা অভিনব মিথ্যা শুনে কুটিল হাসলো সে।
__________
বারান্দা হতে প্রাসাদ প্রাঙ্গণে ঘটে যাওয়া সম্পূর্ণ দৃশ্যটাই এতক্ষণ ধরে নীরবে দেখেছে ক্যামেলিয়া। পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে আছে নিশ্চিত হতেই সে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। ধীর পায়ে কক্ষে ফিরে আসে সে। অতঃপর ধপ করে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় তার পাশে থাকা সে-ই রহস্যময় ডায়েরিটার পানে, যেটার সকল রহস্য এতক্ষণে সে উদঘাটন করে ফেলেছে।
কি ভয়ংকর এক অতীত! কি নিষ্ঠুরতার মধ্যে দিয়ে তার বাবাকে এ-ই নেকড়েমানবের জীবন পেতে হয়েছে, তা এখন ক্যামেলিয়ার অজানা নয়। ক্ষোভে, মায়ায় এবং খারাপ লাগায় তার চোখের কোণে জল এসে ভীড় করে। ডায়েরির প্রতিটা পাতা এই প্রমাণ বহন করছে, যে আরোণ কতো তীব্রভাবে একটা সাধারণ মানবজীবন কামনা করতো! শতাব্দীর পর শতাব্দী বছর ধরে অভিশপ্ত জীবনটাকে টেনে চলা মোটেও সহজ ছিলো না তার জন্য। অথচ ক্যামেলিয়া কখনোই তা টের পায় নি।
ক্যামেলিয়ার খুব আফসোস হয়! ওদিন মা কেনো তাকে বাঁচাতে গিয়েছিল? কেনই বা সঙ্গে করে ওই বিশেষ খঞ্জরটা নিয়ে গিয়েছিল? আজ যদি ওই খঞ্জরটা থাকতো তাহলে বোধহয় আরোণের বাধ্য হয়ে এই জীবনকে বয়ে বেড়াতে হতো না। নিজের মর্জি অনুযায়ী সে নিজেকে মুক্তি দিতে পারতো। কিন্তু এখন! এখন তো এই দূর্ভগ অনন্তকালের!
ক্যামেলিয়া চোখ বুজে যখন নিজের বাবার কষ্টের জীবন সম্পর্কে ভাবছিলো, তখন হুট করেই তার কিছু একটা মনে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেলিয়া চোখ মেলে তাকায়। ধপ করে উঠে বসে সে। চোখে-মুখে তার অবিশ্বাস। যেনো খুব কঠিন কোনো হিসাব মিলিয়ে ফেলেছে সে। ঠিক সে-ই মুহূর্তে পুরো কামরা জুড়ে শীতল বাতাস বইতে শুরু করে। ক্যামেলিয়া টের পায় অদৃশ্য কারো উপস্থিতি। সে উত্তেজিত স্বরে বলে উঠে,
“ তুমি… তুমি মারকিউস রদ্রিগেজ! আমার বাবা আরোণ রদ্রিগেজের পিতা তুমি। তাই না? “
__________
নিজ কক্ষে অস্থির ভঙ্গিতে পায়চারি করছে কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট। তার শিয়রেই দাঁড়িয়ে রাজমাতা আনাস্তাসিয়া। ছেলের এ-ই অস্থির রূপটাকে সে বেশ নির্বাক ভঙ্গিতেই দেখছে। ইয়ান হঠাৎ নিজের চলন্ত পা জোড়াকে স্থির করে। সরাসরি মা'য়ের মুখপানে তাকিয়ে বলে উঠে,
“ প্রজাদের কানে এই খবর তুলে দেওয়া ব্যক্তিটা কোনো না কোনো ভাবে নাওমির অপহরণের সঙ্গে জড়িত। “
আনাস্তাসিয়া জবাব দেয়,
“ বুঝতে যেহেতু পেরেছো, সেহেতু খুঁজতে দেরি কেনো? “
ইয়ানকে চিন্তিত দেখায়। সে বলে উঠে,
“ তোমার কি মনে হয়, মা? এ-ই কাজ করার পিছনে অপহরণকারীদের কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে? কি করতে চাইছে তারা? “
আনাস্তাসিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলের দিকে অগ্রসর হয়। হাত ধরে ছেলেকে কক্ষে উপস্থিত ডিভানটায় বসিয়ে দিয়ে নিজেও পাশে বসে। বিচক্ষণ স্বরে বলে,
“ শত্রুদের উদ্দেশ্য একমাত্র তোমার ক্ষতি করাটাই। সে-ই ক্ষতিটা তারা যেকোনো রূপেই করতে পারে। প্রজাদের প্রশ্নের বিপরীতে তোমাকে হেনস্থা করার অপপ্রয়াসও সে-ই ক্ষতিরই একটা অংশ। আপাতত সবথেকে জরুরী ব্যাপার যেটা, সেটা হলো নাওমিকে খুঁজে বের করা। হাতে কেবল ছয় দিন সময় আছে ইয়ান। আপাতত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য আমি নিচে এই মিথ্যাটা বলতে বাধ্য হয়েছি। আর কোনো পথ খোলা ছিলো না আমার। একজন কাউন্টের জায়গা থেকে এই পরিস্থিতিকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে সেটা এখন তোমার উপর। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নাওমিকে খুঁজে বের করতে না পারলে আমরা মিথ্যাবাদী হিসেবে প্রমাণিত হবো। শত্রুরা বোধহয় এটাই চাইছে, প্রজারা যেনো আমাদের উপর থেকে আস্থা হারায়। তাছাড়া, এ-ই সময়ের পর নাওমিকে খুঁজে পাওয়া গেলেও, প্রজারা তাকে প্রিন্সেস হিসেবে গ্রহণ করবে কি-না সেটাও একটা ব্যাপার। অতীত ঘটনা তুমি জানো। বোনের সম্মানে আঁচড় লাগতে না দেওয়ার দায়িত্বটাও ভাই হিসেবে তোমার উপরই বর্তায়। “
আনাস্তাসিয়ার কথা গুলো মনযোগ দিয়ে শুনে ইয়ান। মনে মনে তাড়না অনুভব করে। মা'য়ের কথার মান এবং বোনের সম্মান রক্ষার্থের খাতিরে তীব্র তাড়না অনুভব করে। ছয়দিন সময় আছে তার হাতে। কেবল ছয়দিন!
আনাস্তাসিয়া ছেলের পিঠে হাত রেখে আশ্বাস দেয়,
“ আমি জানি তুমি পারবে। “
ইয়ান দৃষ্টি তুলে মা'য়ের মুখপানে তাকায়। আজ বিশ বছর ধরে তার জীবনের প্রতিটা ক্রান্তি নিজ হাতে কাটিয়ে দেওয়ার এক দায়িত্ব পালন করে আসছেন এই নারী। আজও প্রজাদের সামনে তার প্রতিনিধিত্ব করে বিগড়ে যাওয়া মামলাটা সামলে নিয়েছে তার মা। এতো কিছুর বিনিময়ে ইয়ান কি করতে পেরেছে? কিচ্ছু না। ইয়ানকে হতাশাগ্রস্ত দেখায়। সে মলিন মুখে বলে উঠে,
“ নিজেকে কাপুরষ মনে হয়। শত্রুদের ভয়ে নিজেকে আড়াল করে চলি। প্রজাদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগটুকুও নেই আমার। “
আনাস্তাসিয়াকে ব্যস্ত দেখায়। সে দু'হাতে ছেলের গাল আগলে ধরে নিজের দিকে ফিরায়। সরাসরি তাকিয়ে বলে উঠে,
“ অহেতুক ভাবনাকে মস্তিষ্কে জায়গা দিবে না এ-ই মুহূর্তে। নিজের মনে জাগা এই দ্বিধাকে মেটানোর সুযোগ আছে তোমার কাছে। আমার কাছে কখনো তোমার নিজেকে প্রমাণ করতে হবে না। তবে নিজের কাছেই নিজেকে প্রমাণ করার জেদ ধরতে পারো। নাওমিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খুঁজে বের করার জেদ! ভাবো, মস্তিষ্ক খাটাও, নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু করো। কোনো না কোনো উপায় অবশ্যই বের করতে পারবে তুমি। “
মা'য়ের কথায় উজ্জীবিত অনুভব করে ইয়ান। এটা তার ভেঙে পড়ার সময় নয়। তার ইচ্ছাশক্তিকে জেদী করে তুলতে হবে, মস্তিষ্ককে রাখতে হবে ঠান্ডা এবং মনকে কাবু করতে হবে।
চলবে…