প্রণয়তিথি
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
২৭.
অন্ধকার কামরার দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে যায়। নীরবে কক্ষে প্রবেশ করে এক ছায়ামূর্তি। প্রতি কদমে তার সতর্কতার ছাপ। অন্ধকারের মাঝেও জানালা দিয়ে প্রবেশ করা চাঁদের আলোয় বিছানায় শুয়ে থাকা নারী কায়া অস্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। ছায়ামূর্তিটা দূর হতে সে-ই ঘুমন্ত নারীকে পরখ করে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সে প্রস্থান করার জন্য উদ্যোত হয়। কিন্তু মুহূর্তেই আবার ঘুরে তাকায়। কি ভেবে যেনো, বিছানার পানে এগিয়ে যায়। বিছানার এককোণে পড়ে থাকা শীত নিবারক চাদরটা দিয়ে নারী দেহটা ঢেকে দিতে নিলেই একটা আকস্মিক ঘটনা ঘটে।
নাওমি ফট করে ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের বাম হাতের মুঠোয় থাকা কাটা চামচটা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে অজ্ঞাত ব্যক্তির উপর আক্রমণ করার চেষ্টা চালায়। তবে তার সাহসী চেষ্টাকে পন্ড করে দিয়ে ছায়ামূর্তিটা তার দু'হাত শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে। চোখের পলকে নাওমি নিজের উপর একটা সুঠাম দেহের ভার টের পায়। আধো আলোতে সে লক্ষ্য করে কৃষ্ণ গভীর চোখ জোড়া। নাওমি ক্রোধান্বিত দৃষ্টি মেলে ভস্ম করে দিতে চায় প্রতিপক্ষকে।
প্রিন্সেসের ক্রোধকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বেহজাদ হিসহিসিয়ে বলে উঠে,
“ ভেবেছিলাম হাল ছেড়ে দিচ্ছো তুমি। কিন্তু তুমি আমাকে অবাক করলে মেয়ে। এখনো এতো হিম্মত? “
নাওমি ঝাঁঝালো স্বরে বলে,
“ মতলব কি? মাঝরাতে আমার কামরায় আসার কারণ কি? মনের কুমতলব মেটানোর খায়েশ জাগলে, আগেই সতর্ক করে দিচ্ছি। আমার থেকে একশো হাত দূরে থাকবি। ভুল করেও আমাকে নিয়ে নোংরা পরিকল্পনা করলে আমার শাপ এবং তলোয়ারের আঘাতে তোর প্রাণ নাশ হবে। “
বেহজাদ কপাল কুচকে বলে,
“ রুচি খারাপ নয় আমার। নিজের তুলনায় অর্ধেক বয়সের মেয়েকে নিয়ে সু কিংবা কু কোনো ধরনের পরিকল্পনা করার মতো অহেতুক সময় নেই আমার। নিজের আকাশ কুসুম ভাবনা নিজের কাছেই রাখো তুমি। “
নাওমি কোনো প্রতুত্তর না করে নিজের হাত ছাড়ানোর প্রচেষ্টা করে। বেহজাদ চাপা বিদ্রুপ নিয়ে বলে,
“ সামান্য একটা কাটা চামচকে আমার বিরুদ্ধে হাতিয়ার বানানোর প্রচেষ্টাটা নেহাৎ তোমাকে বোকার কাতারেই ফেলে। “
নাওমি এবার বলে উঠে,
“ আর প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে লড়াই করার সাহস না দেখিয়ে, তাকে এভাবে এক কামরায় বন্দী করে রাখার ব্যাপারটা তোমাকে কাপুরুষের কাতারে ফেলে। “
বেহজাদের নাকের পাটা ফুলে উঠে। চোখে ক্ষোভ এসে জমা হয়। রাগ মিশ্রিত স্বরে বলে,
“ আমাকে কাপুরষ বলছো? “
“ সন্দেহ আছে? প্রথমে কাপুরষের মতো আমাকে অপহরণ করেছো। অতঃপর নিরস্ত্র আমাকে এই কামরায় বন্দী করে রেখেছো। নিশ্চিত হতে পায়ে শিকল বেধে দিয়েছো। আমাকে এতো ভয় পাও তোমরা? “
নাওমির কণ্ঠে স্পষ্ট বিদ্রুপের ছাপ। বেহজাদ বুঝতে পারে এই মেয়ে তাকে কথার জালে ফাসিয়ে ছলনা করে উস্কে দিতে চাইছে। সে নিজেকে সংযত রেখে বলে,
“ উস্কানোর প্রচেষ্টা ভালো ছিল। “
বলতে বলতেই বেহজাদ কাটা চামচ নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। নাওমি হার মানে না। সে বলে,
“ মিথ্যা বলছি আমি? তোমাদের কার্যক্রম স্পষ্ট প্রমাণ দেয় যে তোমরা আমাকে ভয় পাও। নাহয় এতো সতর্কতা কেন অবলম্বন করছো আমার বিরুদ্ধে? আমাকে যদি ভয় না-ই পাও তাহলে সমানে সমানে লড়াইয়ে নামো। আমার সঙ্গে তলোয়ার যুদ্ধের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। যোগ্যতা থাকলে হারিয়ে দেখাও আমাকে। “
বেহজাদ বাকা হাসে। মূর্খ মেয়ে! একজন যুবরাজকে অস্ত্র যুদ্ধের আমন্ত্রণ জানানোর বোকামি করছে! এ-ই মেয়ে নিজে ঠিক করে তলোয়ার ধরার ক্ষমতা রাখে? দেখে তো মনে হয়, একটা তলোয়ারের ওজনও ও-ই বাঁশের কঞ্চির ন্যায় দেহের তুলনায় বেশি। নাওমি তখনই আবার প্রশ্ন করে,
“ কি হলো? ভয় পেয়ে গিয়েছো? রোমানিয়ার প্রিন্সেসের প্রতিপক্ষ হওয়ার নাম শুনেই কলিজার পামি শুকিয়ে গিয়েছে, বুঝি? “
প্রশ্নটা করে নাওমি মনে মনে প্রার্থনা করতে থাকে। এ-ই অসভ্য যেনো তার বিছানো ফাঁদে পা দেয়। এ-ই মোক্ষম সুযোগটা যেনো নাওমির হাতছাড়া না হয়ে যায়।
__________
মাথার উপর কালো রঙা আকাশের বুকে গোল থালার ন্যায় উজ্জ্বল চাঁদটা উঁকিঝুকি দিচ্ছে। দূর্গের সম্মুখ প্রাঙ্গণে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুই প্রতিদ্বন্দী। হাতে তাদের ধারালো তলোয়ার। একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত তারা। আব্দুলের সঙ্গে আকাশের চাঁদটাও যেনো আজ আয়োজন করে বসেছে এই লড়াই দেখতে।
নাওমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তলোয়ার নিজের হাতে ধরে দাঁড়িয়ে। বেহজাদও এক হাতে তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে আছে। চোখের কোণে তার বিদ্রুপের হাসি। নাওমিকে শেষ বারের মতো জিজ্ঞেস করে,
“ এখনো সুযোগ আছে। চাইলে এই লড়াই এখানেই থামাতে পারো। শেষে হেরে গিয়ে মুখ লুকানোর জায়গা পাবে না। “
নাওমি ক্রোধ নিয়ে বলে,
“ আমি হারতে শিখি নি। তুমি নিজের মুখ লুকানোর জায়গা খোঁজা শুরু করে দাও। আজ খুব বাজেভাবে হারবে তুমি। “
দু'জনের কথার মাঝে আব্দুল কপাল কুচকে দাঁড়িয়ে। মাঝরাতে তাকে ঘুম থেকে টেনে তুলে নিয়ে আসা হয়েছে এই ইদুর বিড়ালের লড়াই দেখার জন্য? বেহজাদ এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের হাতের তলোয়ারটাকে মাটিতে গেথে দাঁড় করিয়ে নিজের পকেট হাতড়াতে থাকে। নাওমি ভ্রু কুচকে তাকায়। এ-ই লোক কি খুঁজছে?
পকেট হতে একটা রুমাল বের করে নিয়ে বেহজাদ সেটা নিজের চোখে বাঁধতে বাঁধতে বলে উঠে,
“ সমান সমান টক্করের কথা বলেছিলে না? এ-ই নাও এবার আমরা সমান প্রতিদ্বন্দী। যদি তোমার তলোয়ার আমার শরীরে একটাও আঁচড় কাটতে সক্ষম হয় তাহলে তুমি জিতে যাবে। আর যদি আমি তোমার তলোয়ার তোমার হাত থেকে ফেলতে সক্ষম হই তবে আমি জিতবো। রাজি? “
নাওমি প্রথমে অবাক হলেও পরে কিছু একটা ভেবে আর প্রতিবাদ করে না। কেউ যদি নিজের চোখ বেধে নিজের পায়ে কুড়াল মারে তাহলে সেটা তার দেখার বিষয় নয়। সে কেবল উৎসুক গলায় জানতে চায়,
“ যদি আমি জিতি, তাহলে আমি কি পাবো? “
বেহজাদ স্মিত হেসে বলে,
“ মুক্তি। বিনা বাঁধায় ট্রান্সেলভেনিয়া ছেড়ে যেতে পারবে। কেউ তোমাকে আটকাবে না। “
বেহজাদের কথার পিঠে আব্দুল বিস্মিত হয়। যুবরাজ কি বলছে এসব? এ-ই মেয়ের সঙ্গে কি ঠাট্টা করছে কোনো? তাছাড়াও এভাবে চোখ বেধে তলোয়ার যুদ্ধে নামার মানে কি? যদি উনার কিছু একটা হয়ে যায়? আব্দুল সতর্ক করার উদ্দেশ্যে বলতে নেয়,
“ কিন্তু… “
বেহজাদ থামিয়ে দিয়ে বলে,
“ কোনো কিন্তু শুনতে চাচ্ছি না আব্দুল। তুমি শুধু এ-ই মেয়ের উপর নজর রাখবে। যদি মাঝপথে পালাতে চায় তাহলে সোজা চুলের মুঠি চেপে ধরবে। “
নাওমি নাক ফুলিয়ে বলে,
“ মাঝপথে পালাবো না। “
__________
লড়াই শুরু হয়। নাওমি শুরু থেকেই আগ্রাসী ভঙ্গিতে তলোয়ার দিয়ে বেহজাদকে আঘাতের চেষ্টা চালাতে থাকে। কালো কাপড়ে চোখ বাঁধা বেহজাদ নিজের দীর্ঘ দিনের প্রশিক্ষণ এবং ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের সহয়তায় নাওমির প্রতিটা প্রচেষ্টাকে সহজেই একহাতে প্রতিরোধ করতে থাকে। আব্দুলের বুক ধুকপুক করছে। যদিও সে জানে যুবরাজ কখনো না জেনে বুঝে এমন একটা ঝুঁকি নিবে না। তবুও একটা আতংক তো মনে রয়েই যায়!
বেহজাদকে হারানোর জেদ নাওমিকে ক্ষিপ্র করে তুলে। সে সুকায়দায় প্রতিবার তলোয়ার ঘুরিয়ে বেহজাদের বুকে চালানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু এই লোক! অদ্ভুৎ ভাবে এই লোক প্রতিবার নিজের তলোয়ার দিয়ে নাওমির ঘাতগুলোকে প্রতিহত করে চলেছে।
নাওমি অন্য মনস্ক হয়ে পড়ে। এটা কিভাবে সম্ভব? কোনো সাধারণ যুবকের পক্ষে এভাবে তলোয়ার চালাতে জানাটা অসম্ভব ব্যাপার! তারমানে কি এই লোক কোনো সাধারণ কেউ নয়? বেহজাদ নামটার আড়ালে কি বিশেষ কোনো পরিচয় লুকিয়ে আছে?
আবারও নাওমির ছুড়ে দেওয়া ঘাত প্রতিহত করতেই বেহজাদ নিজের কানের কাছে একটা তেজী নারী স্বর শুনতে পায়,
“ কে তুমি? “
বেহজাদ ঘুরে গিয়ে হাতের তলোয়ার চালিয়ে নাওমিকে প্রতিরোধ করতে করতে জবাব দেয়,
“ কোন পরিচয়টা জানতে চাইছো? “
“ এভাবে চোখ বদ্ধ অবস্থায় তলোয়ার চালানোটা কোনো সাধারণ যুবকের পক্ষে সম্ভব না। এর জন্য প্রয়োজন কঠিন প্রশিক্ষণ। সে-ই প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্যও সেরকম পদমর্যাদা প্রয়োজন। “
বেহজাদ কোনো জবাব দেয় না। নীরব রয়। নাওমি বুঝতে পারে বেহজাদ উত্তর দিতে আগ্রহী নয়। তবে এভাবে চলতে থাকলে নিজের জেতার খুব একটা সুযোগ দেখতে পাচ্ছে না নাওমি। ভারী তলোয়ার তুলে চালাতে চালাতে তার দু'হাতের বাহু ব্যথা করছে। অপরদিকে বেহজাদ ভুলেও আক্রমণ করছে না, কেবল নাওমিকে প্রতিরোধ করছে। এই কৌশল কিছুটা হলেও নাওমি আন্দাজ করতে পারছে। আগ্রাসী নাওমি একবার ক্লান্ত হয়ে গেলেই বেহজাদ তার উপর আক্রমণ করবে। আর তারপর? তারপর নাওমির পরাজয় নিশ্চিত। পরাজয় বলতে নাওমির মুক্তির সুযোগ হাতছাড়া হওয়া।
উঁহু। এই লড়াই শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকলে নাওমি কখনোই মুক্তি পাবে না। পালানোর হলে তার এখনই পালাতে হবে। নাওমি লড়াইয়ের মাঝেই দু কদম পিছিয়ে যায়। আড়চোখে আব্দুল এবং বেহজাদকে লক্ষ্য করে নেয় একবার। অতঃপর কিছু একটা ভেবে তলোয়ার হাতে নিয়ে সে চোখের পলকে আব্দুলের দিকে অগ্রসর হয়ে আব্দুলের একহাতে ধারালো অংশ দিয়ে আঁচড় কাটে। এই কাজটুকু নাওমি করে যেনো আব্দুল তার পিছু নিতে না পারে।
আব্দুল ‘আহ’ বলে মৃদু আর্তনাদ করে। নাওমি ততক্ষণে দূর্গের প্রধান ফটকের দিকে ছুটতে শুরু করেছে। আব্দুলের আর্তনাদের শব্দ এবং কারো দৌড়ে পালানোর শব্দ কানে ভেসে আসতেই বেহজাদ একটানে নিজের চোখ বাঁধা কাপড়টা খুলে ফেলে। চোখের সামনে সম্পূর্ণ দৃশ্য স্পষ্ট হতেই বেহজাদ প্রথমে লক্ষ্য করে হাত চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আর্তনাদ করা আব্দুলকে। অতঃপর ওর চোখ যায় প্রধান ফটকের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া নাওমির দিকে।
বেহজাদ কোনো কিছু না ভেবে হাতের তলোয়ারটা ছুড়ে ফেলে নাওমির পিছু ছুটে। তবে ঠিক সে-ই মুহূর্তে বাতাসের গতিতে কোথা থেকে একটা তীর ছুটে এসে নাওমিকে ঘায়েল করে। চোখের সামনে নাওমি আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। বেহজাদ বিস্মিত হয়। তার পা জোড়া থেমে যায়। সে চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখতে পায় দূর্গের দ্বিতীয় তলার একটা কক্ষের জানালার নিকটে ধনুক হাতে দাঁড়িয়ে থাকা জেইলানকে। বেহজাদ ঘাড় ঘুরিয়ে আবার তাকায় মাটিতে পড়ে থাকা নাওমির দিকে। পরিস্থিতি তাদের কোন মোড়ে নিয়ে যাচ্ছে তা বোঝা মুশকিল হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
চলবে…