ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়তিথি

২৮তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

প্রণয়তিথি

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

২৮.

রাতের শেষ প্রহর তখন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভোরের আলো ফুটতে শুরু করবে। সিবিউ প্রাসাদ ছেড়ে নিজ প্রাসাদে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ঘোড়ার পিঠে করে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে ক্যামেলিয়া। তার পিছু পিছু অপর ঘোড়ায় রয়েছে প্রধান সেনাপতি কেভ। রাজমাতার বিশেষ আদেশ পালনেই নেকড়ে কন্যাকে নিরাপদে বুখারেস্ট প্রাসাদে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে কর্তব্যরত সে।

কেভ কিছুটা অবাকই আজ। ক্যামেলিয়া চাইলেই পারে এ-ই মুহূর্তে নিজের নেকড়ে রূপে গিয়ে কিছু পলের ব্যবধানে নিজের প্রাসাদে চলে যেতে। কিন্তু ক্যামেলিয়ার মাঝে সেরকম কোনো ভাবান্তর নেই। সে অনেকটা অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে ঘোড়া নিয়ে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। কেভের মনে প্রশ্ন জাগে। কিছু কি হয়েছে?

ক্যামেলিয়া নিজের চারিত্রিক সত্তার বাহিরে গিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের নীরবতা বজায় চলছে। না চাইতেও ব্যাপারটা কেভের হজম হচ্ছে না। কিছুদিন পূর্বে ঘটে যাওয়া ওই অনাকাঙ্ক্ষিত চুমুর পরে এ-ই নীরব ভূমিকা তো কেভের পালন করার কথা ছিলো। তাহলে ক্যামেলিয়া কেন এমন করছে?

কেভ কিছুটা গলা ঝেড়ে নেয় নিজের। পিছন থেকে সচেতন গলায় বলে উঠে,

“ ঘোড়ার লাগাম সঠিক করে ধরুন। “

ক্যামেলিয়া কেভের কথায় কর্ণপাত করলো কি-না বুঝা গেলো না। তবে আর কিছু কদম এগোতেই সে ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে। সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া স্থির ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে পড়ে। ক্যামেলিয়া বিনাবাক্য ব্যয়ে নেমে যায়। কেভও নিজের ঘোড়াকে স্থির দাঁড় করিয়ে নেমে পড়ে। সে বুঝে উঠতে পারছে না কিছু। ক্যামেলিয়া কি করতে চাইছে?

জঙ্গলের আঁধার পথ চিরে এগিয়ে যাচ্ছে ক্যামেলিয়া। তাকে নীরবে অনুসরণ করছে কেভ। হুট করে কেভ লক্ষ্য করে ক্যামেলিয়া বরফের আবরণে ঢাকা একটা ঐশ্বরিক সুন্দর জায়গায় এসে স্থির হয়েছে। চাঁদের আলোয় স্পষ্ট গোটা জায়গাটা। মাথার উপর খোলা আকাশ জুড়ে নক্ষত্রপুঞ্জরা উঁকিঝুকি মারছে। চারিপাশে চমৎকার সব ফুলের সমাহার! একপাশে ছোট পাহাড়ের ন্যায় একটা জায়গা। সে-ই পাহাড়ের গা ঘেঁষে বয়ে চলেছে ঝর্ণা।

প্রকৃতি থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে সামনে তাকাতেই কেভ লক্ষ্য করে ক্যামেলিয়া একটা পাথরের নামফলকের সামনে বসে আছে। পাথরের গায়ে লেখা নামটা চাঁদের আলোতে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। ক্যাথরিন রদ্রিগেজ। কেভ কিছুটা অবাক হয়। এটাই তবে ক্যামেলিয়ার মা'য়ের সমাধি? এখানেই শায়িত সে-ই নারী, যে জগতের সকল পুরুষ ছেড়ে এক নেকড়ে মানবকে ভালোবেসে অরণ্যে বসবাস শুরু করেছিলো?

মাথায় ঘুরতে থাকা সকল ভাবনাকে ঝেড়ে ফেলে কেভ আপাতত নিজেকে প্রশ্ন করে, ক্যামেলিয়ার এখানে আসার পিছনে কারণটা কি? কোনো কারণে কি লুনার মন খারাপ? কিন্তু কি সে-ই কারণ? কেভ না চাইতেও এগিয়ে যায়। এক হাঁটু গেড়ে বসে ক্যামেলিয়ার পিছনে। মনে দ্বিধা নিয়ে নিজের হাত বাড়িয়ে ক্যামেলিয়ার কাধে রাখে। সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেলিয়া ফিরে তাকায়। অশ্রুসিক্ত দৃষ্টি তার। কেভ চমকায়। ছোট করে প্রশ্ন করে,

“ কি হয়েছে, ক্যামেলিয়া? “

ক্যামেলিয়া মুখ ফিরিয়ে নিয়ে আবার সামনে তাকায়। ছোট সামান্য বিষয়ে কান্নাকাটি করার মতো মেয়ে ক্যামেলিয়া নয়। কেভ ঠাওর করতে পারে ব্যাপারটা বড়ো কিছু। কিন্তু এ-ই মুহূর্তে শান্তনা দেওয়ার জন্য সে কি করতে পারে? ভাবতে ভাবতে কেভ পিছন থেকে আনাড়ি ভঙ্গিতে ক্যামেলিয়ার গলা জড়িয়ে ধরে। কিছুটা নরম স্বরে প্রশ্ন করে,

“ আপনার মন খারাপ? “

ক্যামেলিয়া প্রশ্রয় খুঁজে পায়। সে সঙ্গে সঙ্গে নিজের মাথাটা পিছনে থাকা ব্যক্তির সুঠাম বুকে এলিয়ে দেয়। কান্নামিশ্রিত স্বরে আওড়ায়,

“ আমার জন্য কেন সবাই নিজের জীবন বাজি রাখে? আমি কেন সবার প্রাণনাশের কারণ? আমি তো এমনটা চাই নি। “

ক্যামেলিয়ার কথার অর্থ শুরুতে ঠাওর করতে পারে না কেভ। কিন্তু হুট করেই তার মনে পড়ে যায় কাউন্টের কথা। কাউন্ট ইয়ানের মুখে সে একবার শুনেছিলো, ক্যাথরিন রদ্রিগেজ নিজের মেয়ে ক্যামেলিয়াকে রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছিল। কিন্তু এটা তো প্রায় বিশ-একুশ বছর আগের ঘটনা! হুট করে এ-ই ব্যাপার নিয়ে ক্যামেলিয়া কেনো কান্নাকাটি করবে?

কেভ নিশ্চুপ রয়। তার মনে পড়ে যায় বেশ ক'দিন আগের ঘটনা। কিভাবে ক্যামেলিয়া নিষ্ঠুরভাবে এক নিষ্পাপ শিশুর রক্ত পান করে নিজে সুস্থ হয়েছে। হাহ! তখন কি ক্যামেলিয়ার একটা বারও মনে হয় নি, যে ও-ই বাচ্চাটারও মা-বাবা কিংবা পরিবার আছে? কেভের মনে প্রশ্ন জাগে, ওদিনের ও-ই নিষ্ঠুর ক্যামেলিয়া এবং আজকের এ-ই ভঙ্গুর ক্যামেলিয়া কি একই মানুষ? কেভের মন জবাব দেয়,

“ এ-ই মেয়ের মিথ্যা কান্নায় গলে যাস না কেভ। এ-ই মেয়ে ছলনাময়ী। এ-ই সবটা ছলনা। তোকে ভুলানোর জন্য নাটক সাজিয়েছে। নিজের প্রেমের জালে তোকে ফাঁসাতে চাইছে। সাবধান! একদম পা বাড়াবি না। “

মনের সতর্কবাণী আমলে নেয় কেভ। তার চেহারা থেকে নমনীয়তা উবে যায়। মুখভঙ্গিতে ফুটে উঠে রাগ এবং ঘৃণা। ক্যামেলিয়া তখনও বলে যাচ্ছে,

“ আমার কারণেই কেন বারবার সবার জীবন হুমকির মুখে পড়ে? “

কেভ এবার কঠোরতার সঙ্গে জবাব দেয়,

“ অভিশপ্ত আপনি তাই। আপনার সংস্পর্শে কেউ নিরাপদ নয়। যে-ই আপনার ছায়া মারাবে তারই মৃত্যু নিশ্চিত। এটাই আপনার সত্যতা। আপনি আপনার আশেপাশের সকলের জন্য অভিশাপ সরূপ। আপনার জন্মের পিছনে কারণই বোধহয় এটা। আপনার জীবিত থাকার জন্য অসংখ্য নিষ্পাপ প্রাণকে বলি হতে হবে। “

ক্যামেলিয়ার চোখ গড়িয়ে তখনও পানি পারছে। সে নিশ্চল ভঙ্গিতে শুনলো কঠিন কথাগুলো। অদ্ভুৎভাবে, কেভের কথাগুলো বিন্দুমাত্র ভুল মনে হয় না তার। ঠিকই তো বলেছে প্রধান সেনাপতি। সকল ঝামেলার মূল হলো ক্যামেলিয়া নিজেই! ক্যামেলিয়ার ভাবনার মাঝেই তার গলা জড়িয়ে ধরা হাতটা এক ঝটকায় সরে যায়। মাথার পিছনে বলবান বুকটাও আস্তে আস্তে সরে যায়। কিছু সময়ের ব্যবধানেই কেভ সেখান থেকে প্রস্থান করে। নিজের মায়ের সমাধির শিয়রে ক্যামেলিয়া একা রয়ে যায়।

__________

বিছানার কোণে পা ঝুলিয়ে বসে থাকা নাওমির মুখটা কান্নারত। দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরে সে কান্না না করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে খুব একটা লাভ হচ্ছে না এতে। চোখের জল বাঁধ মানতে নারাজ। তীর বিদ্ধ হওয়া বাম পায়ে অসহনীয় যন্ত্রণা হচ্ছে। টুপটাপ করে পা বেয়ে রক্ত গড়িয়ে সম্পূর্ণ মেঝে নোংরা হয়ে যাচ্ছে।

নাওমির পায়ের ক্ষতস্থানের রক্তপাত বন্ধ করতে ওষুধ তৈরী করতে ব্যস্ত আব্দুল। দ্রুততার সঙ্গে সে নিজের জোগাড় করা ভেষজ পাতা দিয়ে ওষুধ তৈরী করছে। তার কাছাকাছিই দাঁড়িয়ে বেহজাদ। দু-হাত পিঠের পিছনে নিয়ে ভাজ করে শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে সে নাওমিকে আগাগোড়া পরখ করতে ব্যস্ত। যন্ত্রণার আভা প্রিন্সেসের মুখে লক্ষণীয়। নাকের পাটা লাল হয়ে কাপছে। চোখও রক্তবর্ণ ধারণ করেছে।

বেহজাদ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় দরজার নিকট দাঁড়িয়ে থাকা জেইলানের দিকে। যার মুখে অনুতাপের লেশমাত্র নেই। সে বিরক্তি নিয়ে নাওমিকে দেখছে দূর হতে। বেহজাদ একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে গিয়ে জেইলানের হাত ধরে তাকে নিয়ে কামরার বাহিরে চলে যায়। কামরার দরজাটা কিছুটা টেনে দিয়ে সে জেইলানের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে প্রশ্ন করে,

“ এ-ই কাজটা কেন করলে তুমি? “

জেইলান বিস্মিত,

“ কেন করেছি মানে? মেয়েটা পালাচ্ছিলো ভাইজান। আমি ওকে বাঁধা দিয়েছি কেবল। “

বেহজাদ রাগ চেপে রেখে বলে,

“ আমি ওখানে উপস্থিত ছিলাম। আমি ওকে আটকানোর জন্য যথেষ্ট ছিলাম। তোমার এই কাজটা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ছিলো। “

জেইলানের চোখে মুখে অবিশ্বাস। সে রেগে গিয়ে বলে,

“ শত্রুদের উদ্দেশ্যে ছোড়া আমার তীরটাকে আপনি অপ্রয়োজনীয় বলছেন? আপনি ভুলে যাচ্ছেন এই মেয়ে কে? ওর পিতা কি করেছিলো দেনিজ ভাইজানের সঙ্গে আপনি ভুলে গিয়েছেন? “

“ আমি কিচ্ছু ভুলি নি। ওর পরিবারের ভাগের শাস্তি ইতিমধ্যে ও ভোগ করছিলো। তোমার এই পদক্ষেপটা আমার ভুল মনে হচ্ছে, তাই তোমাকে এ-ই ব্যাপারে সতর্ক করছি। “

“ ও শাস্তি ভোগ করছে? এ-ই সামান্য বন্দিত্বকে আপনার শাস্তি বলে মনে হয়, ভাইজান? তিনবেলা এই মেয়েকে সময়মতো আহার দেওয়া হচ্ছে, শীত নিবারণের জন্য গরম কাপড় দেওয়া হয়েছে, নারী হিসেবে ওর যতটুকু মান রাখার সম্পূর্ণটা আমরা রাখছি। এটাকে কোন দিক থেকে আপনার শাস্তি মনে হয়? শাস্তি কোনটাকে বলে জানেন? ও-ই মেয়ের পায়ে তীর ছুড়েছি না? ওটাকে শাস্তি বলে। আমার ভাইয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধের আগুনে যে আমি প্রতিনিয়ত দগ্ধ হচ্ছি, এটাকে শাস্তি বলে। কিন্তু আপনি… আপনি সেটা বুঝবেন না। হাজার হোক, দিনশেষে আমরা এক মায়ের সন্তান না। আমার এবং আপনার কষ্ট কখনোই সমান হবে না। আপনি কখনোই বুঝবেন না, শত্রুকে কাছে পেয়েও তাকে না মারতে পারার যন্ত্রণা কতটা অসহনীয়। যেহেতু আপনি বুঝবেন না, সেহেতু আমি আর সে-ই চেষ্টাটাও করবো না। আপনি আপনার নীতি-নৈতিকতা নিয়ে থাকুন। প্রিন্সেসের সেবা করুন, ওর ভাইয়ের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ না নিন। কিন্তু আমি চুপ থাকবো না। এদের একজনকেও আমি জীবিত ছাড়বো না। সম্পূর্ণ রোমানিয়ান রাজ পরিবারকে দাফন করেই শান্ত হবো আমি। “

এক চাপে বলে যাওয়া কথাগুলোর ইতি টেনে জেইলান হনহনিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করে। বেহজাদ নিজের জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে রয়। জেইলানের কথা গুলো বুকে যন্ত্রণার সৃষ্টি করলেও সে তা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামালো না। মনে মনে নিজেকে শাসায়, জেইলান কথাগুলো রাগের মাথায় বলেছে। রাগের মাথায় বলা কথাগুলোকে মনে পুষে কষ্ট পাওয়াটা নেহাৎ বোকামি বৈ কিছু নয়।

কক্ষের ভেতর হতে আব্দুল এবং নাওমির কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই বেহজাদ দরজা ঠেলে কামরায় প্রবেশ করে। আব্দুল তখন নাওমিকে বোঝাতে ব্যস্ত,

“ ওষুধ লাগানো জরুরী প্রিন্সেস। আপনার জেদ ছাড়ুন। রক্তক্ষরণ বন্ধ না হলে ক্ষতিটা আপনারই হবে। “

নাওমি নিজের জেদে অটল,

“ আমি বলেছি না আমার ব্যবস্থা আমি নিজে করে নিতে পারবো? একদম নাটক করবে না তোমরা আমার সামনে। ওষুধ রেখে আমার চোখের সামনে থেকে বিদায় হও এই মুহূর্তে। “

আব্দুল কিছু বলার পূর্বেই বেহজাদ এবার গম্ভীর স্বরে বলে উঠে,

“ তুমি যাও আব্দুল। নিজের হাতের পট্টি করে নাও। আমি এদিকটা দেখছি। “

আব্দুল কিছুটা অনিশ্চিত ভঙ্গিতে একবার বেহজাদকে দেখে, অতঃপর নাওমিকে। সে কিছু না বলে বেরিয়ে যায়। আপাতত ও-ই ঘাড়ত্যাড়া প্রিন্সেসের সেবা করার থেকে, নিজের হাতের পট্টি করাটা বেশি জরুরী তার কাছে।

আব্দুল চলে যেতেই বেহজাদ ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে নাওমির দিকে। নাওমি রাগ নিয়ে বলে,

“ কানে কথা যায় নি নাকি? যেতে বলেছি। আমি নিজের ব্যবস্থা নিজে করে নিবো। “

বেহজাদ নাওমির রাগকে বিশেষ একটা পাত্তা দিলো না। বরং ওষুধের বাটিটা হাতে নিয়ে নাওমির সামনে গিয়ে এক হাঁটু গেড়ে বসে। নাওমি দৃষ্টি নত করে বেহজাদকে লক্ষ্য করে। কপট রাগ দেখিয়ে বলে,

“ বোন প্রথমে আঘাত করে, আর ভাই সে-ই আঘাতে মলম লাগাতে আসে! চমৎকার! নাট্যশালায় আছি মনে হচ্ছে। “

বেহজাদ এবারও নাওমির কথাকে পাত্তা না দিয়ে হাত বাড়িয়ে তার পা ছুঁতে নেয়। সঙ্গে সঙ্গে নাওমি আঁতকে উঠে,

“ খবরদার! দূরে থাকো। ভুলেও ছুঁবে না। “

বেহজাদ এবার চোখ তুলে তাকায়। স্বভাবসলুভ গম্ভীর স্বরে বলে,

“ তোমাকে নিয়ে কোনো আজেবাজে নিয়ত আমার নেই। তাই নিজের মুখটা বন্ধ করে চুপচাপ বসে থাকো। অহেতুক কথা বলে আমার মেজাজ গরম করবে না। “

নাওমি মনে মনে ক্ষুদ্ধ হয়। তাকে আদেশ দিচ্ছে? এতো দুঃসাহস এই যুবকের? নাওমি রাগে কিছু একটা বলবে ভেবেও আর সুযোগ পায় না। তার আগেই বেহজাদ তার বাম পায়ের পাতাটা আলতো ভঙ্গিতে ধরে নিজের হাঁটুর উপর রাখে। নাওমি চমকায়। তাকে আরেকটু চমকে দিয়ে বেহজাদ বলে উঠে,

“ গাউনটা সামান্য উপরের দিকে তুলো। “

নাওমি কোনো মতে উচ্চারণ করে,

“ দেখো তুমি… “

পুরো কথা শেষ করার সুযোগ না দিয়েই বেহজাদ বলে উঠে,

“ আব্দুলের এ-ই মুহূর্তে নিজের পট্টি করাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জেইলানকে পায়ে ধরেও কেউ তোমার সাহায্য করার জন্য রাজি করাতে পারবে না। বাকি রইলাম আমি, যে এক মুহূর্তের জন্য নিজের সকল অস্বস্তি, ঘৃণা এবং অসম্মতিকে একপাশে রেখে তোমার সাহায্য করতে চাইছি। এ-ই ট্রান্সেলভেনিয়াতে আমি বাদে এ-ই মুহূর্তে কেউ নেই যে সামান্য কিছুক্ষণের জন্য হলেও তোমার জন্য সদয় হবে। অহেতুক যন্ত্রণা হজম করার থেকে, শত্রুর বাড়ানো সাহায্য কবুল করে নেওয়াটা বুদ্ধিমানের মতো কাজ। “

নাওমি আর টু শব্দ করে না। চুপচাপ নিজের গাউনটা কিছুটা উপরে তুলে নেয়। হাঁটু থেকে ক্ষানিকটা নিচের জায়গায় তীরটা এসে বিঁধেছিল তখন। বেহজাদ তাৎক্ষণিক ভাবে তখনই তীরটা টেনে বের করে ফেলেছিলো। কিন্তু তাতে যন্ত্রণা যে খুব একটা কমেছে তা নয়।

বেহজাদ নীরবে আব্দুলের তৈরী করা ওষুধ ক্ষতস্থানে লাগাতে লাগাতে আড়চোখে নাওমির দিকে তাকায়। নাওমি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে। বোধহয় কান্না দমানোর চেষ্টায় ব্যস্ত। বেহজাদ চোখ ফিরিয়ে নিয়ে স্বাভাবিক স্বরে বলে,

“ ব্যথা করলে কান্না করাটা মানুষের স্বাভাবিক একটা বৈশিষ্ট্য। শত্রু বলেই যে তার সামনে কান্না করা যাবে না এমন আইন কোথাও জারি নেই। তুমি জেদি, শক্তিশালী এবং তেজস্বী এই সত্যিটা সামান্য কান্না কখনো বদলাতে পারবে না। “

নাওমি না চাইতেও এবার ডুকরে কেঁদে উঠে। সর্বশেষ চেষ্টাটাও আজ সে করে ফেলেছে। এবারও সে ব্যর্থ হয়েছে। এ-ই ব্যর্থতা তার আসন্ন মৃত্যুর সংকেত। অপমানজক মৃত্যু এখন অবধারিত তার জন্য। কেউ-ই আর তার ভাগ্যের লিখন বদলাতে পারবে না। কেউ না!

__________

সকালের নরম আলোয় আলোকিত চারিপাশ। জেইলানের জন্য নির্ধারিত কক্ষের দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে বেহজাদ। মনে মনে কথা সাজাচ্ছে সে। গতরাতে জেইলানের রেগে যাওয়াটা নিয়ে কিছুটা চিন্তিত সে। সাধারণত ভাইবোনদের সঙ্গে বেহজাদের কখনো রাগারাগি হয় নি। তাই এই রাগ অভিমান ভাঙানোর পর্ব সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা খুবই কম। তবে মনে মনে সে বোনের রাগ ভাঙানোর ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেহজাদ কাঠের দরজার কড়া নাড়ে। স্থির দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সে। তবে কেউ দরজা না খোলায় সে গলা ঝেড়ে ডাকে,

“ জেইলান! “

সময় গড়ায়। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ মেলে না। বেহজাদ কিছু একটা ভেবে এবার দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে। সম্পূর্ণ কামরায় নজর বুলায় সে। উঁহু, জেইলান কোথাও নেই। বেহজাদের খটকা লাগে। সে দ্রুত কামরা থেকে বেরিয়ে গলা উঁচিয়ে ডাকে,

“ আব্দুল! আব্দুল! আব্দুল! “

নিজ কক্ষ হতে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বেরিয়ে আসে আব্দুল। বেহজাদের নিকট এসে দাঁড়াতেই বেহজাদ প্রশ্ন করে,

“ জেইলান কোথায়? “

আব্দুল বিস্মিত স্বরে জবাব দেয়,

“ উনি নিজের কামরায় নেই? “

বেহজাদ রেগে গিয়ে বলে,

“ নেই বলেই তো প্রশ্ন করছি। “

আব্দুল জবাব দিতে পারে না। সে তো নিজের হাতের ব্যথায় ক্লান্ত হয়ে ঘুমোচ্ছিলো। সকাল থেকে একবারও নিজের কামরা থেকে বের হয় নি সে। রাজকুমারীর খবর সে কি করে জানবে? বেহজাদ কোনো জবাবের অপেক্ষা করে না। দৌড়ে নিচে নেমে দূর্গের বাহিরে আসে। আব্দুলও আসে তার পিছু পিছু। দূর্গের বাহিরে আসতেই বেহজাদ লক্ষ্য করে দুটো ঘোড়ার মধ্য থেকে একটা ঘোড়া অনুপস্থিত। সঙ্গে সঙ্গে পুরো ব্যাপারটা আন্দাজ করে নেয় বেহজাদ। সে দৌড়ে অন্য ঘোড়ার নিকট গিয়ে বাঁধন খুলতে খুলতে আব্দুলকে বলতে থাকে,

“ আমি রাজধানী যাচ্ছি। তুমি ও-ই মেয়ের খেয়াল রেখো। শেষ রাতে দেখেছিলাম শরীরে জ্বর আছে। সে-ই অনুযায়ী ওষুধের ব্যবস্থা করে দিও। পায়ে শিকল পড়িও না। কেবল দু চোখ কান খোলা রেখে খেয়াল রাখবে। রেগে দুটি কথা শুনালেও প্রতুত্তর করার প্রয়োজন নেই। আমি ফেরার আগ পর্যন্ত খেয়াল রাখবে। “

কথাটুকু শেষ করেই বেহজাদ দ্রুত ঘোড়ার পিঠে চড়ে দূর্গের সীমানা পেরিয়ে প্রস্থান করে। আব্দুল হতবুদ্ধিকর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়। যুবরাজের এতো গুলো আদেশ ওর হজম হচ্ছে না। সে বুঝে উঠতে পারছে না যুবরাজ আসলে কি চায়। প্রিন্সেসকে শাস্তিও দিতে চায়, আবার প্রিন্সেসের খেয়ালও রাখতে বলে! অসুস্থ তো আব্দুল নিজেও! কই তাকে তো একবারও নিজের খেয়াল রাখতে বললো না যুবরাজ! বিতৃষ্ণা নিয়ে আব্দুল বিড়বিড়িয়ে উঠে,

“ যতই যুবরাজ হোক না কেন, দিনশেষে তো পুরুষ মানুষ! এমনটা তো হওয়ারই ছিলো! “

__________

সময়টা গোধূলি লগ্ন। স্নান কক্ষের একটা বিশাল আকৃতির পিলারের আড়ালে দাঁড়িয়ে জেইলান। এদিকের ঝুলন্ত পর্দাগুলোর কারণে তার উপস্থিতি কারো চোখেই পড়বে না। বহুকষ্টে সবার চোখে ধূলো দিয়ে আজ সে এখানে লুকিয়ে আছে। খাস দাসীর থেকে নিজেকে লুকিয়ে এ-ই কক্ষে রয়ে যাওয়া মোটেও সহজ কাজ ছিলো না। তবুও জেইলান এ-ই অসাধ্য কাজটা সাধন করেছে। এখন কেবল কাউন্ট ইয়ান আলবার্টের আগমনের অপেক্ষা। আজকেই এ-ই ইয়ান নামক অধ্যায়ের ইতি টানবে জেইলান।

বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস ফেলে অপেক্ষার প্রহর গুণতে থাকা জেইলানের অপেক্ষার অবসান হয় অবশেষে। স্নানঘরের দরজা খোলার শব্দ ভেসে আসে কানে। কক্ষে কারো উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে। জেইলানের বুক ধুকপুক করছে। সে কোনোমতে সামান্য নুয়ে নিজের গাউনটা হাঁটুর উপর তুলে। তার হাঁটুর ক্ষানিকটা উপরেই একটা কাপড় দিয়ে বেষ্টনী বাঁধা আছে। সে-ই বাঁধনের ভেতর জেইলান একটা খঞ্জর লুকিয়ে রেখেছে।

একহাতে খঞ্জরটা নিয়েই জেইলান সোজা হয়ে দাঁড়ায়। পর্দার এপাশ হতেই সামান্য উঁকি দিয়ে তাকায় সে। দেখতে পায় তার দিকে পিঠ করে পুকুরের একপাশের মধ্য বরাবর দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষ অবয়বকে। জেইলান বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়। এটাই তবে কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট?

জেইলান ধীরে ধীরে পর্দার আড়াল হতে বেরিয়ে আসে। বিড়ালের মতো প্রতিটা কদম ফেলে নিঃশব্দে এগিয়ে যায় সে। আর কেবল দশ কদমের দূরত্ব তাদের মধ্যে। একটু একটু করে এগোচ্ছে এবং নিজের বুকের ভেতরের ধুকপুক শব্দ আরো জোরে শুনতে পাচ্ছে জেইলান।

দেহের উন্মুক্ত উপরিভাগে গরম পানি ছুঁয়ে যাচ্ছে। উষ্ণ জলের ছোঁয়ায় দু চোখ বুজে নিজের ব্যর্থতার হিসাব গুণতে ব্যস্ত ইয়ান হুট করে অনুভব করে তার ঠিক পিছনেই কেউ উপস্থিত আছে। ধীরে ধীরে তার দিকে এগোচ্ছে অজ্ঞাত কেউ একজন। আগুন্তকের নিঃশ্বাসের প্রখরতা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে সে। ইয়ান চোখ বুজে রেখেই অপেক্ষা করে। নিঃশ্বাসের উপস্থিতি আরো নিকটবর্তী হতেই এবার সে হাত পিছনে নিয়ে নিজের পিছনে উপস্থিত ব্যক্তির ঘাড় চেপে ধরে একটানে তাকে পানির ভেতর এনে ফেলে।

সম্পূর্ণ ঘটনাটা ঘটে চোখের পলকে। ইয়ান চোখ মেলে আগুন্তককে পাকরাও করতে নিবে ঠিক সে-ই মুহূর্তে পানির ভেতর থেকে একটা নারী কায়া বেরিয়ে আসে। চোখের পলকে আগ্রাসী ভঙ্গিতে নিজের হাতে থাকা খঞ্জরটা ইয়ানের বুক বরাবর চালাতে নেয়। আকস্মিক ভাবে দ্রুত ভঙ্গিতে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা সামাল দিতে ইয়ান একহাতে খঞ্জরের ধারালো অংশটা চেপে ধরে এবং অপর হাতে অজ্ঞাত নারীর অন্য হাতটা মুচড়ে ধরে কমোরের পিছনে নিয়ে ধরে সে। সঙ্গে সঙ্গে তার কানে ভেসে আসে একটা পরিচিত বিস্মিত নারী স্বর,

“ এন্ড্রু! “

ইয়ান চমকে তাকায়। নিজের হাতের মধ্যে আবধ্য নারীর মুখখানা সে বিস্ময় নিয়ে পরখ করে। চোখ, নাক, কান সব অবিকল এক! কিভাবে সম্ভব? সত্যিই কি তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা আসল? খঞ্জরের ধারালো অংশ চেপে ধরে রাখায় হাতের তালু কেটে টুপটুপ করে রক্ত ঝরছে। তবে সেদিকে ইয়ানের খেয়াল নেই৷ সে কিছু একটা নিশ্চিত হতে বিস্মিত স্বরে ডাকে,

“ মাহশা? “

দু'জনই বিস্ময় নিয়ে একে অপরকে দেখতে ব্যস্ত। ভিন্ন নামে পরিচিত দু'জন মানুষ অবশেষে নিজেদের আসল পরিচয়ের সঙ্গে একে অপরের মুখোমুখি হয়েছে। দু'জনের মনেই জমে আছে অসংখ্য প্রশ্ন। ক্ষণিকের জন্য দু'জনই ভুলে বসলো নিজেদের চারিপাশের সকল কিছু। কেবল খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে থাকলো একে অপরকে।

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন