প্রণয়তিথি
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
২৯.
বিছানায় শয্যাশায়ী অবস্থায় আছেন গোটা রাজ্যের বাদশাহ কামরান আতাউল্লাহ। চোখ মুখ জুড়ে ভয়ংকর কোনো এক রোগের ছাপ। উনার বিছানার চারিপাশে নিজেদের দায়িত্বে ব্যস্ত কর্মরত চিকিৎসকগণ। সকলেই প্রাণপণে চেষ্টা চালাচ্ছে বাদশাহকে সুস্থ করে তোলার। তবে তারা এখনো বাদশাহর রোগই শনাক্ত করতে সক্ষম হয় নি। তা-ই না বুঝে কোনো প্রতিশেধকও দিতে পারছেন না।
বাদশাহ বেগম আয়েশা দূরে দাঁড়িয়ে নীরবে দেখছেন স্বামীর এ-ই করুণ দশা। স্বামীর ক্ষীণ হয়ে আসা নিঃশ্বাসের গতি যেনো উনাকে কূল কিনারাহীন সমুদ্রের মাঝে নিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। এ কি এক পরিস্থিতিতে এসে পড়েছেন তিনি!
বাদশাহর অবস্থা আশংকাজনক! তবে স্বামীর তুলনায় এ-ই মুহূর্তে রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি চিন্তিত আয়েশা। ও-ই শূন্য সিংহাসনটা যে তার ছেলের প্রতিক্ষায় আছে! বেহজাদ! আহ বেহজাদ! আবেগে ভেসে বোনকে ফিরিয়ে আনতে গিয়েছে। কিন্তু বোনের থেকে যে এ-ই সিংহাসনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ এটা ওই বোকা ছেলে বুঝলে তো!
ছেলের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কত কিছু করেছে আয়েশা! কিন্তু তার ছেলে সে-ই কদর করলে তো! এখন আপাতত আয়েশা একটাই প্রার্থনা করছে। বাদশাহর দম ফুরানোর আগেই যেনো বেহজাদের নিকট উনার পাঠানো চিঠি পৌঁছে যায়। বেহজাদ যেনো পাগলামি ছেড়ে নিজ রাজ্যে ফিরে আসে। নিজের ক্ষমতা এবং প্রাপ্যটুকু যেনো বুঝে নেয়!
__________
চারিদিকে পিনপতন নিস্তব্ধতা। এ-ই নিগূঢ় নীরবতার মধ্যে ইয়ানের শান্ত দৃষ্টি আগাগোড়া নিজের হাতে আবদ্ধ নারীকে পরখ করতে ব্যস্ত। ইয়ান যে-ই মাহশাকে চিনতো সে-ই মাহশার সঙ্গে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই নারীর চেহারা মিললেও, বেশভূষায় আকাশ পাতাল পার্থক্য। ইয়ান যে-ই মাহশাকে জানতো সে-ই মাহশা নিজেকে আবৃত্ত করে রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতো। কিন্তু তার সামনে উপস্থিত মাহশা এ-ই প্রাসাদের আর দশটা দাসীর ন্যায় পোশাক পরিধান করে আছে। বিশাল গলার এ-ই জামাটাও মাহশার গায়ে খুব দৃষ্টিকটু লাগছে। ইয়ান জিজ্ঞেস করে,
“ বেঁচে আছো তুমি? “
জেইলান তখনও নিজের বিস্ময়তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে নি। এ-ই ছেলে তার সঙ্গে প্রতারণা করেছে তবে? এন্ড্রু পরিচয়ে এতদিন ধরে যাকে সে চিনতো, সে-ই ব্যক্তি আদৌতে কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট ছিলো? জেইলানের মুখ থেকে ধীরে ধীরে বিস্ময়তা সরে যায়। চেহারায় তীব্র ক্ষোভের আভা ছড়িয়ে পড়ে। সে হিসহিসিয়ে উচ্চারণ করে,
“ প্রতারক! “
ইয়ানের চোখের সামনে থেকেও হুট করে মিথ্যার পর্দাটা উড়ে যায়। সে স্পষ্ট দেখতে পায় সত্যিটা। মাহশা নামক এ-ই নারীটা জলদস্যুদের আক্রমণে মারা যায় নি। উল্টো বেঁচে ফিরে এ-ই প্রাসাদে এসে কাজ জুটিয়েছে। এ-ই কাজ জুটানোর পিছনে মতলবটাও কখনো সৎ ছিলো না। মাহশার এ-ই প্রাসাদে আগমনের পিছনে কারণ হলো কাউন্ট ইয়ান আলবার্টকে হত্যা করা। সম্পূর্ণ ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই ইয়ানের চোখে এসে ঘৃণা জমা হয়। সে অস্ফুটে উচ্চারণ করে,
“ ছলনাময়ী! “
জেইলান আগ্রাসী হয়। নিজের হাতের খঞ্জরটা টেনে নিজের আয়ত্ত্বে নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে খঞ্জরের অগ্রভাগ মুঠোবন্দী করে চেপে ধরা ইয়ান এতো সহজে খঞ্জর ছাড়ে না। উল্টো আরো শক্ত করে চেপে ধরে রাখে। রক্তে ভেসে যাওয়া হাত নিয়ে তার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। সে মাহশা নামধারী জেইলানের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করে,
“ এ-ই রাজ্যে তোমার আগমন পরিকল্পিত ছিলো তবে। খুন করতে এসেছো তুমি। তুর্কীদের গুপ্তচর তুমি! “
জেইলান আক্রোশ নিয়ে জবাব দেয়,
“ প্রথম সাক্ষাতেই যদি টের পেতাম তুমিই ইয়ান আলবার্ট, তাহলে আজ এই পর্যন্ত ব্যাপারটা গড়াতো না। কৃষ্ণ সমুদ্রেই তোমাকে খুন করে ভাসিয়ে দিতাম। তোমার সমাপ্তি ওখানেই হয়ে যেতো। “
কথাটুকু বলেই জেইলান খঞ্জরের হাতলের অংশ ছেড়ে অগ্রভাগ চেপে ধরে ইয়ানের হাত থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। তবে হাতাহাতির এক পর্যায়ে খঞ্জরের ধারালো অংশে লেগে তার হাতের তালুও অনেকটা কেটে যায়। না চাইতেও জেইলান চাপা আর্তনাদ করে উঠে। খঞ্জর ছেড়ে হাত নিজের মুখের কাছে এনে ধরে।
মাহশার হাত কেটে গিয়েছে টের পেতেই ইয়ান সঙ্গে সঙ্গে খঞ্জরটা দূরে ছুড়ে ফেলে। নিজের ক্ষত, বিক্ষত, রক্তাক্ত হাত দিয়েই মাহশার কেটে যাওয়া হাতটা ধরে কাটার গভীরতা পরখ করতে থাকে। কপালে তার দুঃশ্চিন্তার ছাপ। জেইলানের দৃষ্টি এড়ায় না কিছু।
ইয়ান চোখ তুলে মাহশার দিকে তাকায়। অতঃপর বলে উঠে,
“ এতো রাগ, এতো আক্রোশ, এতো ঘৃণা? খুন করতে চাও আমাকে? কারণ কি এর পিছনে? “
মাহশা নিজের হাতের যন্ত্রণা ভুলে কণ্ঠে সবটুকু ঘৃণা মিশিয়ে দিয়ে জবাব দেয়,
“ কি ভেবেছিলে? পাপ করে পাড় পেয়ে যাবে? কেউ হিসাব চাইবে না তোমার কাছে? “
ইয়ান বোধহয় আরো কিছু বলতো। তবে ততক্ষণে তাদের ক্ষানিক পূর্বে করা চেঁচামেচির শব্দে দরজা ঠেলে ভেতরে খাস দাসী সহ বেশ কিছু প্রহরী প্রবেশ করে। স্নানঘরে কাউন্টের সঙ্গে একজন দাসীকে এবং দু'জনের হাতের রক্তাক্ত অবস্থা দেখে খাস দাসী আর্তনাদ করে উঠে,
“ হায় ঈশ্বর! “
প্রহরীদের উপস্থিতি টের পেতেই ইয়ান সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠে,
“ সকলে নিজেদের দৃষ্টি নত করো। “
জেইলান নিজেও ততক্ষণে কিছুটা নিচু হয়ে পানির ভেতর নিজেকে আড়াল করার চেষ্টায় ব্যস্ত। রাগ, ঘৃণার এ-ই পর্বে এতক্ষণ সে নিজের বাহ্যিক স্থিতি একবারও খেয়াল করে নি। দাসীদের এ-ই সাদা রঙা পোশাকটা ভেজা পানিতে তার শরীরের প্রতিটা বাক স্পষ্ট বুঝিয়ে দেওয়ার ভূমিকা পালন করছে। না চাইতেও জেইলান তীব্র অস্বস্তি অনুভব করে। কক্ষ ভর্তি এ-ই প্রহরীদের মাঝে সে ভুলেও পানির ভেতর থেকে বের হতে পারবে না।
ইয়ানের এক আদেশে সকল প্রহরী নিজেদের দৃষ্টি নিজেদের পায়ের দিকে স্থির করে। কেবল খাস দাসীই দৃষ্টি ফেরায় না। তিনি দূরে পড়ে থাকা রক্তাক্ত খঞ্জরটা অস্থির স্বরে জেইলানকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠেন,
“ মেডুসা! এতো দুঃসাহস তোমার? কাউন্টের উপর আক্রমণ করেছো তুমি? “
ইয়ান তাকায় জেইলানের চোখের পানে। নিচু স্বরে বলে,
“ ওহ! তবে প্রাসাদে নিজের পরিচয় মেডুসা নাম দিয়ে দিয়েছো! এ-ই কারণেই খ্রিষ্টান বেশভূষা গ্রহণ করতে সংকোচ করো নি। আমাকে সত্যি করে বলো তো, তোমার মাহশা পরিচয়টাও কি মিথ্যা ছিলো? মুসলিম নও তুমি? “
ইয়ানের এ-ই প্রশ্নের জবাব মাহশা কেবল দুই শব্দ দ্বারা দেয়,
“ আমি মুসলিম। “
ইয়ান নিজের উত্তর এই দুই শব্দের মাঝেই খুঁজে পায়। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নারীর ব্যাপারে সে যা কিছু জানতো, সব মিথ্যা ছিলো। এ-ই নারীর একমাত্র সত্যি হলো যে সে মুসলমান। ইয়ানের এ-ই মুহূর্তে রেগে দুনিয়া এফোড় ওফোড় করার কথা হলেও সে তেমন কিছু করে না। বরং নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে জেইলানকে ছেড়ে পানি থেকে উঠে আসে। জেইলান তখন মাঝ সমুদ্রে বৈঠাহীন মাঝির ন্যায় অসহায় অনুভব করছে। তবে তার সে-ই অসহায়ত্বকে দূর করে ইয়ান নিজের লম্বা ক্লক হাতে এগিয়ে আসে। নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে বলে,
“ পানি থেকে উঠে এসে দ্রুত এটা গায়ে দাও। প্রহরীদের দৃষ্টি তোলার আগে কাজটুকু শেষ করো। তোমার জন্য অনন্তকাল দৃষ্টি নামিয়ে রাখতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ নই আমরা। “
জেইলানের দৃষ্টিতে কৃতজ্ঞতা নেই। সে উল্টো কপট রাগ নিয়ে ইয়ানকে দেখে নেয়। অতঃপর আশেপাশের সকলকে পরখ করে দ্রুত পানি থেকে উঠে এসে গায়ে ভেজা জামার উপরই ক্লকটা জড়িয়ে নেয়। ইয়ান এবার তাকায় জেইলানের পানে। দু কদম এগিয়ে গিয়ে জেইলানের মুখোমুখি দাঁড়ায়।
জেইলান জানে তার পালানোর আর কোনো সুযোগ নেই। সে সে-ই বৃথা চেষ্টাও আর করে না। তার আফসোস কেবল এটা নিয়েই যে সে এই প্রতারক ইয়ান আলবার্টকে খুন করতে ব্যর্থ হয়েছে! তবে অসুবিধা নেই। তার অসম্পূর্ণ কাজ বেহজাদ ভাইজান পুরো করবে।
ইয়ান নির্বাক ভঙ্গিতে কিছুক্ষণ জেইলানকে দেখে। অতঃপর নিজের হাতের মুঠোয় থাকা সাদা তোয়ালেটা তুলে ওড়নার ন্যায় জেইলানের মাথা ঢেকে দেয়। এ দফায় না চাইতেও জেইলান চমকায়। তবে ঠিক পরমুহূর্তেই ইয়ান এক কদম পিছিয়ে প্রহরীদের উদ্দেশ্যে কাঠকাঠ গলায় উচ্চারণ করে,
“ বন্দী করো এই ছলনাময়ীকে। প্রাসাদের সবথেকে অন্ধকার কুঠিরে নিক্ষেপ করো ওকে। আহার কিংবা পানি কিচ্ছু দেওয়া হবে না ওকে। “
জেইলানের চেহারা হতে বিস্ময়তা উবে যায়। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে তাচ্ছিল্য পূর্ণ হাসি। কি বোকা সে! এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিলো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই বান্দার মাঝে কোথাও না কোথাও বোধহয় এন্ড্রু লুকিয়ে আছে। যে-ই এন্ড্রু তার জন্য চিন্তা করতো। উঁহু। তার ধারণা ভুল ছিলো। এন্ড্রু একটা নাটকীয় চরিত্র বৈ কিছু নয়। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়ান আলবার্ট হলো দিনের মতো সত্য। ইয়ান আলবার্ট একজন প্রতারক, খুনী এবং জালিম। এর বাহিরে তার অন্য কোনো পরিচয় হতেই পারে না।
দু'জন প্রহরী এগিয়ে আসে। বন্দী করা হয় জেইলানকে। ইয়ানের সামনে থেকে নিয়ে যাওয়া হয় ওই ছলনাময়ীকে। খাস দাসী এ-ই পর্যায়ে দৌড়ে আসে কাউন্টের নিকট। কাউন্টের রক্তাক্ত হাত দেখে আঁতকে চিল্লিয়ে প্রহরীদের চিকিৎসককে তলব করতে বলে। সকলে মুহূর্তেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে কাউন্টকে নিয়ে। এতো চেঁচামেচির ভেতর ইয়ান এক মুহূর্তের জন্য অবহেলা নিয়ে নিজের হাতের পানে। কি জঘন্যভাবে জখম হয়েছে! তবে কোন আঘাতটা বেশি জঘন্য তা ঠাওর করতে পারছে না ইয়ান। মনে লাগা বিশ্বাসঘাতকতার আঘাত নাকি হাতে লাগা খঞ্জরের আঘাত?
__________
সারাদিন শেষে বেহজাদ তুষ দূর্গে ফিরে একাকী। আব্দুলকে চিন্তিত দেখায়। সে জানতে চায়,
“ রাজকুমারী কোথায় যুবরাজ? উনার পিছু গিয়েছিলেন আপনি। উনাকে সাথে নিয়ে ফিরেন নি? “
বেহজাদ ব্যর্থ সৈনিকের ন্যায় মাথা নত করে সিড়ির দিকে অগ্রসর হতে হতে জবাব দেয়,
“ জেইলান পাগলামি করেছে আব্দুল। সারাদিন অপেক্ষা করেছি কিন্তু ও প্রাসাদ থেকে বের হয় নি। সম্ভবত বব্দী হয়েছে আলবার্টদের হাতে। “
বেহজাদ উপরে চলে যায়। আব্দুল হতভম্ব ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়। রাজকুমারী বন্দী হয়েছে! বিগত ক'দিনে আব্দুল বারবার এই দুই ভাইবোনকে বুঝিয়েছে যেনো প্রতিশোধের নেশায় অন্ধ না হয়ে যায়। বারবার সে বলেছিল যেনো, আল্লাহর হাতে বিচারকার্য ছেড়ে দিয়ে নিজেদের রাজ্যে ফিরে যায়। কিন্তু কে শুনে কার কথা! জেদী ভাইবোন দুটো আব্দুলের কথা আমলে নেয় নি।
এখন? এখন কি হবে? যদিও আব্দুল শুরু থেকে বলে এসেছে সে এসব প্রতিশোধের ব্যাপারে জেইলান কিংবা বেহজাদকে একটুও সহযোগিতা করবে না। কিন্তু অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে এই ব্যাপারটায় জড়িয়ে পড়েছে। যুবরাজ এবং রাজকুমারীকে এই ভীন রাজ্যে একা ছেড়ে যেতে তার মন সায় দেয় নি মোটেও।
আব্দুল দু চোখে ধূ ধূ মরুভূমি দেখছে কেবল। একদিকে রাজকুমারী জেইলান, যিনি কি-না আলবার্টদের নিকট বন্দী। অন্যদিকে যুবরাজ বেহজাদ, যিনি তাদের মহান সাম্রাজ্যের একমাত্র ভবিষ্যৎ। অপরদিকে প্রিন্সেস নাওমি, যিনি বিনা অপরাধেও এই বন্দিত্ব কাটাচ্ছেন। এই তিনটা মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ ঘোলাটে ঠেকে আব্দুলের নিকট।
__________
আজ সারাটা দিন ধরে নাওমি ভয়ংকর রকম নিস্তব্ধতার মধ্যে দিয়ে কাটিয়েছে। আব্দুল বেশ কয়েকবার কক্ষে এসেছিলো আহার নিয়ে। তবে নাওমি তা ছুঁয়েও দেখে নি। খাবারের কাজ হলো মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি জোগানো। কিন্তু নাওমির মৃত্যু যেখানে নিশ্চিত, সেখানে খাবার খাওয়াটা বিলাসিতা বৈ আর কিছু নয়।
সারাদিন অভুক্ত থেকে রাতে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ে নাওমি। নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে জানালার দিকে তাকিয়ে রয়। পায়ের ব্যথাটা আর তাকে ছুঁতে পারছে না। জাগতিক কোনো কিছুই আর তাকে ভাবাচ্ছে না। সে বড্ড ক্লান্ত হয়ে ইস্তফা নিতে চাইছে জীবন থেকে।
হঠাৎ দরজায় খাট করে শব্দ হতেই নাওমি নিজের চোখ বুজে নেয়। কারো সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী নয় সে। কামরায় ধীর কদমে প্রবেশ করে বেহজাদ। দরজার ওখান থেকেই আগে নাওমিকে পরখ করে নেয় সে। কক্ষের ছোট্ট গোল টেবিলটার উপরে রাখা খাবার ভর্তি ট্রে-ও তার দৃষ্টি এড়ায় না।
নাওমি স্পষ্ট অনুভব করে কেউ তার দিকে এগিয়ে আসছে ধীর কদমে। এই কেউ-টা যে বেহজাদ তা আন্দাজ করতে তার খুব একটা অসুবিধা হয় না। কিন্তু মুহূর্তেই নাওমি জমে যায়। তার পায়ের উপর দিয়ে কেউ ঝুঁকেছে অনুভব করছে সে। নাওমির হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে। বেহজাদ কি তার পায়ের ক্ষতটা দেখতে চাইছে?
বেহজাদের নিয়ত কি সেটা নাওমির দেখার বিষয় না। কিন্তু তার অনুমতি ব্যতীত যদি এ-ই মুহূর্তে বেহজাদ তার গাউন তুলে পা দেখার দুঃসাহস দেখায় তাহলে আজ সে একটা কেয়ামত ঘটিয়ে ফেলবে এই দূর্গে। বেহজাদের পদক্ষেপ দেখার জন্য নাওমি মরার মতো ঘুমের অভিনয় করে পড়ে রয়। কিন্তু তাকে ভুল প্রমাণ করে বেহজাদ সামান্যতম সীমাও লঙ্ঘন করে না। বরং পায়ের কাছে থাকা চাদরটা টেনে নাওমির গা ঢেকে দেয়।
নাওমি নিঃশ্বাস আটকে পড়ে রয়। সে অনুভব করছে এক জোড়া দৃষ্টি তার উপরই নিবদ্ধ। বড্ড অস্বস্তি লাগছে তার। তবুও সে নড়াচড়া করে না। বেহজাদের সে-ই দৃষ্টি এবং উপস্থিতি ঘন্টা খানেকের জন্য স্থায়ী হয়। অতঃপর সে নীরবে খাবারের ট্রে হাতে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়।
নাওমি এবার চোখ মেলে তাকায়। ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রয় সে দরজার পানে। বুকের ভেতর থেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে তার। চোখ ঘুরিয়ে নাওমি নিজের গায়ে টানা চাদরটাকে দেখে। ঠোঁটের কোণে ব্যথাতুর হাসি ফুটে উঠে তার। বুঝে উঠতে পারে না বেহজাদ নামক এই পুরুষকে ব্যাখ্যা করার জন্য কোন শব্দটা অধিক উপযুক্ত? একদিকে এ-ই দূর্গে নাওমির সম্মান যেমন রক্ষা করে চলেছে, অন্যদিকে গোটা রাজ্যের সামনে নাওমিকে অসম্মানিত করার পায়তারা করে চলেছে। কি অদ্ভুৎ এক গোলকধাঁধা!
চলবে…