প্রণয়তিথি
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৩০.
রাতের এই গভীর প্রহরেও সম্পূর্ণ সিবিউ প্রাসাদ সজাগ আজ। কাউন্টের উপর প্রাণঘাতী হামলা হয়েছে এ-ই ঘটনাটা বারুদের মতো চারিপাশে ছড়িয়ে পড়েছে ইতিমধ্যে। রাজমাতা আনাস্তাসিয়া গোটা প্রাসাদ মাথায় তুলে ফেলেছেন। এক এক করে প্রহরী এবং দাসীকে চাকরিচ্যুত করছেন তিনি। এতো দাসী এবং প্রহরী রেখে কি লাভ যদি উনার ছেলের জীবনের নিরাপত্তাই নিশ্চিত না হয়?
ইয়ানের হাতের চিকিৎসা চলছে। প্রাসাদের সম্পূর্ণ চিকিৎসক দল এ-ই মুহূর্তে তার ব্যক্তিগত কামরায় হাজির। যদিও জখমটা কেবল হাতের তালুতেই হয়েছে। তবে জখমের ধরনটা বেশ বিশ্রী এবং গভীর। ঠিকঠাক মতো কাটা জায়গা না শুকালে অবস্থা আরো ভয়ংকর হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
হাতের এই ভয়ংকর অবস্থা নিয়েও ইয়ান শান্ত ছেলের ন্যায় চুপ হয়ে বসে আছে। এতকিছু হয়ে যাচ্ছে কিন্তু তার মুখ দিয়ে সামান্য উফটুকুও বের হয় নি। চিকিৎসকরা নিজেদের কাজটুকু শেষ করে হাতটা ভালো করে পট্টি করে দিয়ে বেরিয়ে যেতেই, কক্ষে উপস্থিত আনাস্তাসিয়া ছেলের নিকট এগিয়ে আসে। ইয়ানের শিয়রে দাঁড়িয়ে ক্রোধ মিশ্রিত স্বরে বলে,
“ ও-ই মেয়েকে আগামীকাল জনসম্মুখে ফাঁসি দিবে। না, না। ফাঁসি নয় বরং ওর শিরচ্ছেদ করবে। ঈশ্বর আজ রক্ষা করেছেন। তুমি যদি টের না পেতে তাহলে… “
ইয়ান শান্ত স্বরে বলে,
“ কামরায় যাও, ঘুমাও। আমি ঠিক আছি। কিচ্ছু হয় নি। “
আনাস্তাসিয়া বলতে নেয়,
“ কিন্তু ও-ই মেয়ে… “
ইয়ান আবারও শান্ত গলায় বলে,
“ আমি একা থাকতে চাইছি মা। “
“ ও-ই মেয়ের শাস্তি… “
ইয়ান এবার নিজের ক্রোধ সামলাতে না পেরে চেঁচিয়ে উঠে,
“ ও-ই মেয়ের শাস্তি হবে, মা। মাহশাকে আমি ক্ষমা করবো না। ওকে বিশ্বাসঘাতকতার সর্বোচ্চ শাস্তিটা দিবো আমি। “
আনাস্তাসিয়া চুপ হয়ে যায়। ইয়ানের এহেন ক্রোধ তাকে হতবাক করে দিয়েছে। আনাস্তাসিয়ার মাথায় আরেকটা প্রশ্নও জাগে। মাহশা? মেডুসাকে ইয়ান মাহশা কেন বললো? এমন কিছু কি আছে যেটা আনাস্তাসিয়ার অজানা? আনাস্তাসিয়া জানে নিজের মনে জাগা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সে কোথায় পেতে পারে। জোসেফ! জোফেসকে জেরা করতে হবে এই মুহূর্তে!
__________
অন্ধকার এক বন্দীশালার নোংরা মেঝেতে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে জেইলান। চোখ বুজে মনে মনে কালেমা পড়ে যাচ্ছে। বারবার মনে হচ্ছে এ-ই বুঝি জল্লাদের বেশে আজরাইল এসে হাজির হবে। তখন বোধহয় কালেমা পাঠের সুযোগ মিলবে না। তা-ই আগেভাগে মৃত্যুর প্রস্তুতি নিচ্ছে জেইলান।
হুট করেই দূর হতে কারো পদচারণের শব্দ ভেসে আসে। জেইলান চোখ মেলে তাকায়। নিজের মনকে শক্ত করে সে। আগুনের মশাল হাতে একটা ছায়ামূর্তি এসে উপস্থিত হয় ওপাশে। অন্ধকার কুঠুরিটা আগুনের মশালের কারণে মৃদু আলোকিত হয়ে উঠে।
স্পষ্ট হয়ে আসা ছায়ামূর্তিকে চিনতে খুব একটা অসুবিধা হয় না জেইলানের। মৃদু হেসে বলে,
“ স্বাগতম, কেভ! “
প্রধান সেনাপতি কেভ নিজের হাতের মশালটা রেখে চাবি দিয়ে দরজা খুলে কুঠুরির ভেতর প্রবেশ করে। জেইলান উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বলতে থাকে,
“ তোমাদের অভিনয়ের প্রশংসা না করে পারছি না। কি চমৎকার পারদর্শী অভিনেতা তোমরা! আমার মতো দূরদর্শী মেয়েও ধোকা খেয়ে গেলো। আচ্ছা, আমি আন্দাজ করছি। এন্ড্রুর আসল পরিচয় যদি কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট হয়, তাহলে তুমি নিশ্চয়ই তার বিশ্বস্ত সহচর কিংবা সেনাপতি? “
কেভ থমথমে স্বরে বলে,
“ যা প্রশ্ন করবো, চুপচাপ সেগুলোর জবাব দিবে তুমি? “
জেইলান ইচ্ছে করে ঠাট্টা করে বলে,
“ চুপও থাকতে বলছো আবার জবাবও চাইছো? “
কেভ জেইলানের ঠাট্টাকে পাত্তা না দিয়ে প্রশ্ন করে,
“ কে পাঠিয়েছে তোমাকে? “
জেইলানের সোজাসাপ্টা উত্তর,
“ নিজের মর্জিতে এসেছি। “
“ কাউন্টকে খুন করতে চাওয়ার পিছনে কারণ কি? “
“ তোমার কাউন্ট আমার নিরপরাধ ভাইজানকে খুন করেছিল। তা-ই আমিও তাকে খুন করতে চাই। হিসাব বরাবর করতে হবে তো! “
কেভ চমকায়। কাউন্ট মাহশার ভাইকে খুন করেছে মানে? কবে? কখন? কিভাবে? কি বলছে এই মেয়ে? কেভ জিজ্ঞেস করে,
“ তোমার কাছে প্রমাণ আছে যে কাউন্ট তোমার ভাইকে খুন করেছে? “
“ নিজের ভাইয়ের মৃত্যু নিয়ে ঠাট্টা করবো মনে হয়? “
কেভ রেগে যায়। এটা কোনো উত্তর হলো? কোনো প্রমাণ ছাড়া একজনকে খুন করতে চাওয়ার স্পর্ধা কি করে হলো এই মেয়ের? জেইলান বুঝতে পারে কেভ রেগে গিয়েছে। সে হেসে বলে উঠে,
“ একটা সত্যি কথা বলি? আমাকে ঠিকঠাক ভাবে শাস্তি দিও। আমি বেঁচে গেলে তোমাদের কাউন্টের মৃত্যু নিশ্চিত এটা আমি লিখে দিতে পারি। “
কেভ নিজের ক্রোধটুকু চেপে রেখে বলে,
“ নিজের আসল পরিচয় বলো। “
জেইলান এবার অনাগ্রহ দেখিয়ে বলে,
“ তোমাকে বলতে আগ্রহী না। তোমার কাউন্টকে ডাকো। তাকে বলতে অসুবিধা নেই আমার। “
কেভ কিছু বলতে নিবে এর পূর্বেই একটা কণ্ঠস্বর তাকে আদেশ করে,
“ তুমি এখন যেতে পারো, কেভ। “
কেভ মাথা ঘুরিয়ে পিছনে ফিরে তাকায়। ইয়ানের উপস্থিতি দেখে জেইলান হাসে। তারমানে এতক্ষণ আড়ালে দাঁড়িয়ে সব কথাই শুনেছেন কাউন্ট। কেভ বলে উঠে,
“ কিন্তু কাউন্ট… “
সম্পূর্ণ কথা শেষ করতে না দিয়েই ইয়ান আদেশ দেয়,
“ আমি ওর সঙ্গে একান্তে কথা বলতে চাইছি। “
ইয়ানের আদেশ অমান্য করার সাধ্য কেভের নেই। সে নীরবে বন্দীশালা থেকে বেরিয়ে যায়। এ-ই অন্ধকার কুঠিরে তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি শূন্য হতেই ইয়ান দু হাত পিঠের পিছনে নিয়ে ধীর কদমে এগিয়ে আসতে আসতে প্রশ্ন করে,
“ তো নিজের ভাইয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে এসেছো? তুমি জানো আমি তোমার ভাইকে মেরেছি। আমি নিশ্চিত এ-ই ব্যাপারটা তুমি নিজের চোখে দেখো নি, নিশ্চয়ই কেউ তোমাকে বলেছে যে কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট তোমার ভাইয়ের মৃত্যুর পিছনে দায়ী। সেই কেউ টা কে? আমি জানতে চাই কে তোমার মনে এই বিষ পুষেছে? “
জেইলান ফুসে উঠে বলে,
“ নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাইছো তুমি? তোমার কি মনে হয়, তোমার এই নাটক দিয়ে আমাকে আবার ভুলিয়ে নিতে পারবে? এক ভুলের পুনরাবৃত্তি আমি দ্বিতীয়বার করি না কখনো। “
ইয়ান দু কদম এগিয়ে এসে নিজেদের মধ্যবর্তী দূরত্ব ক্ষীণ করে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“ আমাকে নাটকবাজ বলছো? আমাকে? নাটক বুঝি তুমি করো নি? “
জেইলান জবাব দেয় না। তার চোখ দিয়ে আগুন ঝরছে যেনো। সে ইয়ানের নিকট স্থিতি দেখে রাগ নিয়ে বলে,
“ দু কদম পিছিয়ে গিয়ে কথা বলো। “
ইয়ান বিদ্রুপের হাসি হেসে বলে,
“ খুব অস্বস্তি লাগছে? মেডুসা পরিচয়ে এই প্রাসাদে দাসীদের মতো বেশভূষায় চলতে অস্বস্তি লাগে নি? নাকি প্রতিশোধের আগুনে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলে? “
জেইলান কোনো জবাব দেয় না। নীরব রয়। ইয়ান নিজেই পিছিয়ে যায় কয়েক কদম। মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার মাহশাকে পরখ করে। ভেজা পোশাক গায়েই শুকিয়ে গিয়েছে। হাতের জখমটাও এখনো অযত্নে উন্মুক্ত অবস্থায় আছে। রক্ত শুকিয়ে কেমন নোংরা দেখাচ্ছে হাতের তালুটা। ইয়ানের কিছুটা মায়া হলো কি-না বুঝা গেলো না। সে থমথমে স্বরে জানায়,
“ আমার জানা নেই কে তোমার ভাই কিংবা কিভাবে তার মৃত্যু হয়েছে। তবে তুমি যে ভুল ধারণা পুষে আমাকে খুন করার চেষ্টা চালিয়েছো তা স্পষ্ট। ভেবো না যে তোমার ভুল ধারণার কারণে তোমাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। শাস্তি তোমার হবেই। একজন রাজ্যের কাউন্টকে হত্যাচেষ্টার সর্বোচ্চ শাস্তিটাই তুমি পাবে মাহশা। “
নিজের কথাটুকু শেষ করেই ইয়ান উল্টো ঘুরে বেরিয়ে যেতে নেয়। সঙ্গে সঙ্গে পিছন হতে জেইলান বলে উঠে,
“ এখনো মাহশা ডাকছো? আমার আসল পরিচয় জানতে চাইবে না? জানতে চাও না আমার আসল নাম কি? “
ইয়ান থেমে যায়। আসলেই তো! সে কেনো মাহশার আসল পরিচয় জানতে চাইলো না? ইয়ানের মন কি মাহশাকে অন্য কোনো নামে চিনতে নারাজ? জানে না ইয়ান। এই প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পায় না সে। ধীরে ধীরে পিছু ঘুরে মাহশার পানে তাকায়। মাহশার ঠোঁটের কোণে মিহি হাসি। ইয়ান নির্বিকার ভঙ্গিতে সে-ই হাসি দেখে। প্রথম সাক্ষাতের পর থেকে এখন পর্যন্ত বোধহয় একবারও মাহশার হাসিমুখ দেখা হয় নি ইয়ানের। আজ সেটাও পূরণ হয়ে গেলো। ইয়ান বলে উঠে,
“ কে তুমি? “
মাহশা হাসিমুখে এগিয়ে আসে কয়েক কদম। অতঃপর ইয়ানের চোখে চোখ রেখে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,
“ জেইলান। বাদশাহ কামরান আতাউল্লাহর মেয়ে জেইলান। তুরস্কের রাজকুমারী জেইলান। “
ইয়ান বিস্ফোরিত দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রয়। জেইলানের মুখটা ভালো করে আরেকবার পরখ করে। এই চন্দন রাঙা মুখে ফুটে থাকা রাজকীয় ছাপের রহস্য তবে এটা? ইয়ান হতবাক। জেইলান হাসি মুছে গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করে,
“ এবার মনে পড়েছে? আমার ভাইজান দেনিজ আতাউল্লাহকে চিনতে এখন নিশ্চয়ই অসুবিধা হচ্ছে না তোমার? মনে পড়ছে তোমার নির্মমতার কথা? “
ইয়ান নীরবে শুনে জেইলানের কথাগুলো। কোনো জবাব দেয় না সে। নিজের সাফাইয়ে এক বাক্যও খরচ করে না। তার মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ ছক বুঝতে পারছে। যুবরাজ দেনিজের মৃত্যুর ব্যাপারে ইয়ানকে যে-ই অভিযুক্ত করেছে, সে পাক্কা খেলোয়াড়। পরিকল্পিত ভাবে বিশাল ষড়যন্ত্রের ফাঁদ সাজানো হয়েছে। জেইলানকে ক্ষেপিয়ে দিয়ে তার হাতে ইয়ানকে খুন করিয়ে নিজের রাস্তা সাফ করতে চাইছে। প্রবাদ বাক্য অনুসারে, ‘সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না।’
জেইলান বলে উঠে,
“ কি হয়েছে? বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছো? তোমার সামনে একজন রাজকুমারী দাঁড়িয়ে আছে, ব্যাপারটা অবিশ্বাস্যকর লাগছে? “
ইয়ান লম্বা একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে কেমন একটা স্বরে আওড়ালো,
“ আমাদের সাক্ষাৎটা বোধহয় অন্য কোনো পরিস্থিতিতে হলে ভালো হতো। যেখানে আমাদের মাঝে কোনো মিথ্যার পর্দা থাকতো না। যেখানে তুমি জেইলান এবং আমি ইয়ান হতাম। ”
জেইলান হঠাৎ ইয়ানের কথার পিঠে নিভে গেলো। অর্থবহ কথাটি তাকে কোনো এক গভীর ভাবনার দিকে ঠেলে দিলো। আসলেই তো, ভিন্ন কোনো পরিস্থিতিতে তাদের দেখা হলে কেমন হতো? ইয়ান আলবার্ট যদি তার ভাইয়ের হত্যাকারী না হতো তাহলে কেমন হতো এ-ই বর্তমানটা? জেইলানের মনে এই যুবকটার প্রতি কোনো ঘৃণাই থাকতো না তাহলে!
ভাবনার জগৎ চিরে বেরিয়ে আসে জেইলান। অল্প ক্ষণের জন্য সে ভড়কে গিয়েছিলো। কীসব ভাবছিল সে! উঁহু। নিজের মুখে কাঠিন্যতা ফিরিয়ে এনে জেইলান ইয়ানের বলা কথা সম্পূর্ণ পাশ কেটে গিয়ে বলে,
“ আমার আরেকটা পরিচয় এখনো জানানো বাকি তোমাকে। তোমার বোন প্রিন্সেস নাওমি… তোমার বোন নিখোঁজ হওয়ার পিছনে আমার হাত আছে। প্রিন্সেস আমার জিম্মায় আছে। “
ইয়ানের বিস্ময়তার মাত্রা ছাড়ায়। নাওমির ব্যাপারে জেইলানের হাত থাকতে পারে এই ব্যাপারটা এতক্ষণ একবারও তার মাথায় আসে নি। ইয়ান বলে উঠে,
“ নাওমি? ওকে তুমি অপহরণ করেছো? কিন্তু কেনো? ওর কি অপরাধ? তোমার জানামতে তো তোমার ভাইয়ের খুনী আমি। “
জেইলান বলে,
“ প্রিন্সেস আমার দূরদর্শী পরিকল্পনার অংশ। যদি আমি তোমাকে মারতে সফল না হই, তাহলে তোমাকে মৃত্যুর কাছে পৌঁছানোর জন্য একটা মহরার প্রয়োজন ছিলো আমার। নাওমি হলো সে-ই মহরা। তবে তোমার বোন বেশ উশৃঙ্খল গোছের। গতকালও পালানোর চেষ্টা করেছিলো, নিজ হাতে তীর মেরে আটকেছি৷ “
ইয়ানের বুকে চেপে রাখা রাগের সাগর আগুনের লাভার ন্যায় বেরিয়ে আসে। সে মুহূর্তেই সকল নমনীয়তা ভুলে এগিয়ে গিয়ে জেইলানের গলা চেপে ধরে। ঝড়ের গতিতে সম্পূর্ণ জেইলানকে দেওয়ালে ঠেকিয়ে তার গলায় প্যাচানো হাতের চাপটা তীব্র করে। জেইলানের নিঃশ্বাস আটকে আসে। তার মনে হয়, ইয়ান তাকে দেয়ালের সঙ্গে পিষে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলতে চাইছে বোধহয়। চোখ উল্টে আসার উপক্রম হতেই জেইলানের কানের কাছে ভয়ংকর স্বরটা শুনতে পায়,
“ নাওমি কোথায়, মাহশা? আমার ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিও না। কসম করে বলছি, তোমাকে খুন করে ফেলবো আমি। “
জেইলান দু পাশে মাথা নাড়ে। অর্থাৎ সে বলবে না। ইয়ান এতে আরো রেগে যায়। সঙ্গে সঙ্গে সে অপর হাতে জেইলানের ক্ষত হওয়া হাতটার তালু চেপে ধরে মুচড়ে বলে,
“ বিশ্বাস করো, আমি একটুও দয়া দেখাবো না তোমাকে। আমার বোন কোথায় বলে দাও। তোমার ধারণা নেই, এ-ই মুহূর্তে আমি তোমার সাথে কি কি করতে পারি। “
জেইলান কোনোমতে বলে উঠে,
“ কখনো বলবো না। “
ইয়ান দাঁত কিড়মিড় করতে করতে দেখে জেইলানকে। জেইলান মরতে প্রস্তুত, তবে মুখ খুলতে নয়। ইয়ান হাতের বাঁধন ঢিল করে জেইলানকে মেঝেতে ছুড়ে ফেলে। অতঃপর হন্তদন্ত ভঙ্গিতে কারাগার থেকে বেরিয়ে যায় সে। জেইলান তখন গলা চেপে ধরে কাশতে ব্যস্ত। তার কানে ভেসে আসছে কারাগারের ওপাশে ইয়ানের রাগী স্বর,
“ নাওমির নিখোঁজ হওয়ার পিছনে মাহশার হাত আছে। ওকে বেঁধে চাবুক আঘাত করতে বলো দাসীকে। যতক্ষণ না নিজের মুখ খুলবে ততক্ষণ যেনো আঘাত না থামে। “
জেইলান দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে হাসে স্বল্প। তার অবচেতন মন ভেবেছিলো এন্ড্রু বোধহয় তার প্রতি কঠোর হবে না। কিন্তু সে বারবার ভুলে যাচ্ছে এই ব্যক্তিটা এন্ড্রু নয়, বরং কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট। কঠোরতা, নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা এসব তো ইয়ান আলবার্টকেই মানায়। নিজের প্রতি তাচ্ছিল্যের হাসি ছুড়ে দিয়ে জেইলান বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস নিতে থাকে।
__________
হন্তদন্ত ভঙ্গিতে নিজ কক্ষে প্রবেশ করে কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট। তার পিছু পিছু আসে প্রধান সেনাপতি কেভ। ইয়ান কক্ষে থাকা নিজের টেবিলটার শিয়রে দাঁড়িয়ে কপালে এক হাত চেপে জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলতে থাকে। কেভ কিছু বলতে নিয়েও আর বলে না। সম্পূর্ণ ব্যাপারটা মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় দেয় কাউন্টকে।
অবাক তো কেভ নিজেও কম হয় নি। মাহশাকে যে সে জীবিত দেখতে পাবে, তা-ও কাউন্টের হত্যা চেষ্টাকারী হিসেবে তা কি সে কখনো কল্পনা করেছিলো? তার উপর আবার ওই মেয়ে নাকি প্রিন্সেসের অপহরণেও জড়িত। কেভ মনে মনে হতাশার দীর্ঘশ্বাস ফেলে। নারী জাতিটাই এমন, ছলনাময়ী!
কেভের ভাবনার ইতি ঘটে ভাঙচুরের শব্দে। সামনে তাকাতেই দেখতে পায় এক বিধ্বংসী দৃশ্য। ইয়ান এক টানে টেবিলের উপর রাখা সব বস্তু মেঝেতে ছুড়ে ফেলছে। আহত হাতটা দিয়েই এই ভয়ংকর কাজটুকু করেছে ইয়ান। মুহূর্তেই সফেদ পট্টির কাপড়টা লাল রক্তে ভিজে উঠে।
কেভ দৌড়ে এগিয়ে গিয়ে ইয়ানকে হাত ধরে স্থির করার চেষ্টা করে। ইয়ান শান্ত হলেও, স্থির হয় না। অস্থির ভঙ্গিতে বারান্দার দিকে এগিয়ে যায় সে। কেভও যায় পিছু পিছু। বারান্দার রেলিঙ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ইয়ান নিজের মাথার চুল টেনে ধরে। কেভ পিছনে দাঁড়িয়ে বলে,
“ আপনার হাত থেকে আবার রক্ত ঝরছে কাউন্ট। একটু স্থির হোন। হাতের পট্টিটা সম্পূর্ণ ভিজে উঠেছে। “
ইয়ান কোনো মতে উচ্চারণ করে,
“ আমি ওকে বিশ্বাস করেছিলাম, কেভ। আমার বিশ্বাস ভেঙেছে ও। আমি প্রতিটা ক্ষণ অনুতাপে পুড়ছিলাম। ওর মৃত্যুর জন্য কোথাও না কোথাও নিজেকে দায়ী করছিলাম আমি। সম্পূর্ণ দায়টা আমি নিজের ভাগে বুঝে নিয়েছিলাম। “
কেভ বুঝতে পারে ইয়ান কার কথা বলছে। এই ভয়টাই পাচ্ছিলো সে। কাউন্টের এই প্রতিক্রিয়াই বলে দিচ্ছে উনি মাহশার প্রতি কিছুটা হলেও দূর্বল। আচ্ছা, মাহশা কি সত্যি সত্যিই মারা গেলে ভালো হতো? কোন সত্যটা কাউন্টকে কম পীড়া দিতো? মাহশার মৃত্যু নাকি মাহশার ছলনা? কেভ শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করে,
“ ওর শাস্তি কি স্থগিত করবো, কাউন্ট? “
ইয়ান সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলে উঠে,
“ কক্ষনো না। নাওমি ওর কাছে বন্দী। নাওমির হদিস খুঁজে পাওয়াটা জরুরী। একটুও দয়া দেখাবে না ওকে। ও আমার বোনের গায়ে তীর ছুড়েছে। “
কেভ কিছু বলে না আর। কাউন্টের হাতটা দূর থেকে পরখ করে সে। অতঃপর চিকিৎসককে তলব করার উদ্দেশ্যে যেতে নেয়। সঙ্গে সঙ্গে কাউন্ট পিছু ডাকে। কেভ থেমে পিছু ফিরে তাকাতেই ইয়ান বলে উঠে,
“ মাহশার আসল নাম জেইলান। তুরস্ক সাম্রাজ্যের রাজকুমারী ও। বাদশাহ কামরান আতাউল্লাহর একমাত্র কন্যা। ওর পরিচয় তুমি, আমি বাদে যেনো তৃতীয় আর কেউ যেনো জানতে না পারে। নাওমিকে পাওয়ার আগ পর্যন্ত ওকে আমার জীবিত রাখতে হবে। “
চলবে…