ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়তিথি

৩১তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

প্রণয়তিথি

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৩১.

সাক্ষাৎ কক্ষে নিজের জন্য বরাদ্দকৃত আসনে বসে আছে রাজমাতা আনাস্তাসিয়া। উনার সংকুচিত দৃষ্টি স্থির সেনাপতি জোসেফের উপর। জোসেফ নত মস্তকে বলে যাচ্ছে মাহশার সঙ্গে ইয়ানের দেখা হওয়া থেকে শুরু হয়ে সম্পূর্ণ ঘটনাটা। এ-ই শীতল আবহাওয়াতেও সে ঘামছে প্রচুর। বুকটাও দুরুদুরু কেপে চলেছে অবিরত।

সবটুকু বলা শেষ করেই জোসেফ ভয়ে ভয়ে চোখ তুলে রাজমাতাকে দেখে নেয়। আনাস্তাসিয়ার দৃষ্টি তখন অত্যন্ত শীতল। জোসেফ এ-ই শীতলতাকে ঝড়ের আগের নীরবতা হিসেবে ধরে নেয়। তার উপর দিয়ে আজ নিশ্চিত কোনো ঝড় যাবে। কাউন্টের ব্যাপারে এতো বড়ো একটা তথ্য গোপন করার অপরাধে রাজমাতা যদি তার গর্দানও নিয়ে নেয়, তাহলেও জোসেফ অবাক হবে না।

তবে জোসেফকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে আনাস্তাসিয়া কোনো দন্ডই দিলো না। না কোনো রাগ দেখালো। বরং, হতাশ গলায় বলে,

“ শুনলাম সব। আমি আর এ-ই ব্যাপারে কি বলবো? তোমাদেরকে আমার আর কিছুই বলার নেই। তোমরা যেহেতু এখন আমাকে গোপন করে সকল সিদ্ধান্ত নিতে শিখেই গিয়েছো, সেহেতু আমি এখানে নিজের মতামত জানানোর আর কোনো প্রয়োজনীয়তাই দেখছি না। “

জোসেফ কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে বলে,

“ রাজমাতা, দুঃসাহস ক্ষমা করবেন। আমি বাধ্য ছিলাম কাউন্টের আদেশ মান্য করতে। তবে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি, কাউন্ট এবং মাহশার উপর নজর রাখার। এক মুহূর্তের জন্য ভয় পেয়েছিলাম, এ-ই বুঝি কাউন্ট ওই মেয়েটার প্রতি দূর্বল হয়ে যাচ্ছে। তবে আপনি নিশ্চিত আমার উপস্থিতিতে এরকম কোনো অঘটনই আমি ঘটতে দেই নি। “

আনাস্তাসিয়াকে এই দফায় অন্যমনস্ক দেখা যায়। সে গভীর ভাবনায় ডুবে বলে উঠে,

“ অঘটন তো ঘটে গিয়েছে, জোসেফ। তুমি সেটা আটকাতে পারো নি। ইয়ান ভুল মানুষকে বিশ্বাস করার মূল্য চোকাচ্ছে। বিশ্বাসঘাতকতার থেকে বড়ো শাস্তি আর কি হতে পারে? বহু বছর আগে, ওর মতো একই ভুল আমিও করেছিলাম, তোমাদের কাউন্ট রিকার্ডোকে বিশ্বাস করে। “

জোসেফ আর কিছু বলতে পারে না। সে জানে না কাউন্ট ইয়ানের এ-ই অঘটনের জল কতদূর গড়িয়েছে। আপাতত সে এতটুকু নিয়ে বেশ চিন্তিত যে মাহশার মতো এতো ভয়ংকর একটা মেয়ে এতদিন তার বাসায় ছিলো। যদি এ-ই মেয়ে ঘুমে তলিয়ে থাকা জোসেফ এবং তার পরিবারকে রাতের অন্ধকারে টপকে দিতো? জোসেফ মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, এ-ই জীবনে সে আর কখনো কাউকে নিজের বাসায় আশ্রয় দিবে না।

__________

সদ্য ভোরের প্রথম আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারিপাশে। নাওমি আড়মোড়া ভেঙে চোখ মেলে তাকায়। অন্যদিনের তুলনায় আজ খুব বেশি-ই যেমন ঠান্ডা অনুভব করছে সে। চাদরের ভেতর থেকে মাথা বের করে বাহিরে তাকাতেই নাওমি চমকায়। জানালার কাঁচ দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বাহিরের দৃশ্য।

তুষারপাত হচ্ছে আজ! শীঘ্রই বসন্ত আসতে চলেছে। বোধহয় বছরের শেষ তুষারপাত এটা। বন্দীদশায়ও নাওমির আত্মা জুড়িয়ে যায় এই চমৎকার দৃশ্য দেখে। সে দ্রুত চাদর সরিয়ে উঠে বসে। সাবধানে কদম ফেলে বিছানা থেকে নেমে এগিয়ে যায় জানালার নিকট। তুষ দূর্গের আঙিনা সাদা বরফ কণায় ঢাকা পড়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে। নাওমির খুব ইচ্ছে করছে তুষার কণা গুলো একবার নিজ হাতে ছুঁয়ে দিতে। কিন্তু এ-ই জং ধরা জানালা খুলে নিজের মনের ইচ্ছাটুকু পূরণ করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।

নাওমি কিছু একটা ভেবে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। যদিও দরজা খোলা থাকবে এই আশা সে করে না। তবুও একবার খতিয়ে দেখতে তো বারণ নেই। দরজার হাতল ধরে সামান্য টান মারতেই নাওমি আরেক দফা অবাক হয়। দরজাটা খোলা রাখা আছে! রাতে কি বেহজাদের দরজা তালা মেরে যাওয়ার কথা মনে ছিলো না না-কি! না-কি ইচ্ছে করেই দরজাটা খোলা রেখে গিয়েছে ও? নাওমিকে কি পরীক্ষা করতে চাইছে?

নাওমি আর মাথা ঘামালো না। সে জানে, এ-ই তীর বিদ্ধ হওয়া পা নিয়ে সে চাইলেও এই দূর্গ হতে দৌড়ে পালাতে পারবে না। তবে অন্তত দূর্গের আঙিনায় একটু হাঁটাচলা তো করাই যায়! কে জানে, এটাই বোধহয় তার জীবনের শেষ তুষার বিলাস।

নিজ কক্ষ থেকে বের হয়ে ধীরে ধীরে করিডর পেরিয়ে সিড়ির দিকে এগিয়ে যায় নাওমি। সিড়ি ধরে নামতে শুরু করতেই নাওমি ব্যথায় চোখ মুখ কুচকে ফেলে। পায়ের এই চোট নিয়ে সমতল জায়গায় হাঁটলে যতটুকু না ব্যথা হচ্ছে, তার থেকে কয়েকগুণ বেশি ব্যথা হচ্ছে এই সিড়ি বেয়ে হাঁটতে গিয়ে। নাওমি মনে মনে নিজেকে বুঝ দেয়, এক দু'দিনের মাঝে যখন সম্পূর্ণ রাজ্যে তার অপহরণের ঘটনা ছড়িয়ে যাবে তখন তো সে এভাবেই আত্মহত্যা করে নিবে। আর একবার মারা গেলে আর এসব ব্যথা অনুভূত হবে না।

সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে প্রধান দরজার কাছাকাছি এগিয়ে আসতেই নাওমি আরেক দফা চমকায়। এ-ই দরজাও ভেতর থেকে আটকানো না! ও-ই তিন জালিম কি ইচ্ছে করে তার সঙ্গে মজা নিচ্ছে? নাকি তিনজন দূর্গেই উপস্থিত নেই? কিন্তু দূর্গে না থাকলে তো তাদের আরো নাওমিকে তালাবদ্ধ করে রেখে যাওয়ার কথা!

মনের বিস্ময় চেপে গিয়ে নাওমি দরজা খুলে ধীরে ধীরে নেমে আসে আঙিনায়। তার নগ্ন পা জোড়া তুষার ছুঁতেই সে সামান্য কেপে উঠে। নিজের প্রাসাদে সে বহুবার তুষার বিলাস করেছে। কিন্তু কখনো এভাবে খালি পায়ে তুষারের উপর বিচরণ করা হয় নি তার! নাওমি এক পা এক পা করে সামনে এগোচ্ছে এবং প্রতি কদমেই তার পা বরফকণার আবরণের ভেতর তলিয়ে যাচ্ছে।

নাওমি মৃদু হাসে। তীব্র ঠান্ডায় পা অবশ হয়ে আসলেও সে থামে না। এইতো শেষ সুযোগ। পরে আর এই সুযোগ নসিব হবে কি-না কে জানে! ভাবনায় বিভোর নাওমি লক্ষ্য করে না, তার পিছনে কারো উপস্থিতি। সে আরেক কদম এগোতে নিলেই হুট করে পিছন থেকে একটা শক্তপোক্ত হাত তার পেট জড়িয়ে তাকে ভূমি থেকে কিছুটা উপরে তুলে ফেলে। নাওমি বিস্ময় নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। দু হাতে নিজের পেটে পেচানো হাতটা ধরে ভারসাম্য স্থির রাখার চেষ্টা করে। ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকা বেহজাদকে পরখ করে সে হকচকিয়ে বলে,

“ কি সমস্যা? এ কেমন দুঃসাহস? নামাও বলছি আমাকে… “

বেহজাদ কোনো জবাব দেয় না। এক পলক নাওমিকে দেখে নিয়ে, নিজের পায়ের জুতো ছেড়ে সে এক কদম পিছিয়ে যায়। অতঃপর নাওমিকে নিচে নামিয়ে দেয়। পায়ের দিকে তাকাতেই নাওমি দেখে এবার তার পা আর বরফ স্পর্শ করছে না, বরং ওঁম দায়ক বুট জুতার ভেতর তাই পা জোড়া ঠাই পেয়েছে। এ-ই সামান্য ব্যাপারটা নাওমিকে গভীর ভাবনার দিকে ঠেলে দেয়। সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় আবার বেহজাদের পানে। বেহজাদ স্বাভাবিক গলায় প্রশ্ন করে,

“ তুষারপাত পছন্দ? “

নাওমি বুঝে উঠতে পারছে না কিছু। বেহজাদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, নাওমি বোধহয় নিজের স্বাভাবিক জীবনেই আছে। একটুও মনে হচ্ছে না যে নাওমি এই দূর্গের সীমানার ভেতর বন্দি জীবন পাড় করছে। কোনো উত্তর না পেয়ে বেহজাদ আর কিছু বলে না। নাওমিও নিরুত্তর নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে সামনের দিকে এগোতে নেয়। তবে বিধিবাম! বেহজাদের বড়ো জুতা জোড়া এই তুষারের স্তুপের ভেতর নাওমির হাঁটার জন্য মোটেও উপযুক্ত ছিলো না। সে তাল হারিয়ে ধপাস করে তুষারের ভেতর পড়ে গেলো।

বেহজাদ ঠিক নাওমির পিছনেই দাঁড়িয়ে ছিলো। সে চাইলেই পারতো নাওমিকে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে নিতে। কিন্তু সে এরকম কিছুই করে নি। উল্টো নাওমির পড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে নীরবে মিটিমিটি হাসছে। কোমর চেপে ধরে ব্যথায় চোখ কুচকে ফেলা নাওমি পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাতেই দেখে বেহজাদের এই ঠোঁট টিপে হাসির দৃশ্য। প্রথমে সে চমকালেও, পরমুহূর্তেই তার মেজাজ গরম হয়ে যায়। তার উপরে হাসছে এই অসভ্য? এতো বড়ো দুঃসাহস?

নাওমি হাতের মুঠোয় এক দলা বরফ নিয়ে বেহজাদের দিকে তা ছুড়ে মেরে চেঁচিয়ে উঠে,

“ খুব হাসি পাচ্ছে তোমার? “

নাওমির অতর্কিত বরফ হামলায় বেহজাদের মুখ থেকে সঙ্গে সঙ্গে হাসি উড়ে যায়। সে চোখ সরু করে তাকাতেই, নাওমি রাগে গজগজ করতে করতে একা একা উঠে দাঁড়ায়। প্রবল রাগ দেখিয়েই সে বেহজাদের জুতা জোড়া ছেড়ে খালি পায়েই আঙিনার অন্য প্রান্তের দিকে পা বাড়ায়। তবে বেশি দূর যেতে পারে না নাওমি। তার পূর্বেই বেহজাদ নিজের জুতো পরে এসে নাওমিকে পাজাকোলে তুলে নেয়।

আজ সকাল থেকে একের পর এক এতো চমক নাওমির হজম হচ্ছে না। এ-ই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটাও তার হজম হলো না। সে চকিতে দু'হাতে বেহজাদের গলা জড়িয়ে ধরে। চেঁচিয়ে উঠে,

“ আরে… আরে! সমস্যাটা কি তোমার? বারবার এতো কাছাকাছি আসার চেষ্টা করছো কেন? “

বেহজাদ স্বাভাবিক স্বরে সামনে এগিয়ে যেতে যেতে জবাব দেয়,

“ রোমানিয়ার প্রিন্সেস নগ্ন পায়ে হেঁটে বেড়াবে, ব্যাপারটা বেশ বেমানান। তাই এতটুকু দয়া করছি। একটা গোটা রাজ্যের প্রিন্সেসকে দয়া অনুদান করার অনুভূতি সম্পর্কে অবগত হতে চাইছিলাম। “

জবাবটা নাওমির ঠিক পছন্দ হলো না। সে পানিবিহীন মাছের ন্যায় লাফালাফি শুরু করলো,

“ তোমার দয়া চাই না আমি। এক্ষুণি নামাও আমাকে। না নামালে এখনই তোমার গলা চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলবো। “

“ চেষ্টা করে দেখতে পারো, মেয়ে। খুব একটা সুবিধা করতে পারবে না। তোমার হাত আমার শ্বাসরোধ করার জন্য উপযুক্ত নয়। বেশ নাজুক প্রকৃতির কি-না। আমার শ্বাসরোধ করার জন্য একজন যোদ্ধার হাত হওয়া প্রয়োজনীয়। “

নাওমি প্রতিবাদ করে কিছু বলতে নিবে তার পূর্বেই বেহজাদ তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,

“ লাফালাফি বন্ধ করো। পায়ে জখম নিয়ে এভাবে খালি পায়ে তুষারের উপর হাঁটলে তোমারই অসুবিধা হবে। পা অবশ হয়ে আসবে, পেশীর যন্ত্রণাও বাড়বে। “

নাওমি আসলেই স্থির হয়। আর একটুও লাফালাফি করে না। ফ্যালফ্যাল দৃষ্টি মেলে বেহজাদকে পরখ করে কতক্ষণ। বেহজাদ ভুলেও তার দিকে তাকাচ্ছে না। নাওমি অস্ফুটে বলে উঠে,

“ তুমি কি আমাকে নিয়ে চিন্তা করছো? “

বেহজাদ এবার নিজের পা জোড়া থামায়। মাথা খানিকটা নত করে নাওমির দিকে তাকায়। তবে কোনো প্রতুত্তর করে না সে।

ফজরের নামাজ শেষে ক্ষানিকক্ষণ ঘুমিয়ে কেবল উঠলো আব্দুল। দূর্গের দো তলায় নিজ কক্ষের বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙছিলো সে। হুট করে তার চোখ আটকে যায় দূর্গের আঙিনা প্রান্তে। সাদা বরফে ঢাকা আবরণের উপর বেহজাদ এবং নাওমিকে এমন অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখে সে বিষম খায়। সে কি ভুল দেখছে? দ্রুত চোখ কচলে আবারও ভালো করে তাকায় সে। নাহ! সে মোটেও ভুল দেখছে না৷ যুবরাজ ওই প্রিন্সেসের সঙ্গে এরকম বেলাজের মতো… নাহ! আর ভাবতে পারে না আব্দুল। তার মাথা দিয়ে যেনো গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। লজ্জায় সে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে বিড়বিড়িয়ে উঠে,

“ লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আযীম। আল্লাহ, যুবরাজকে ধর্মের পথে ফিরে আসার বুঝ দাও। সামনে সুন্দরী রমণী দেখে উনি পথভ্রষ্ট হয়েছেন। উনাকে ক্ষমা করো, মালিক। যতই বীর বাহাদুর সাজুক, দিনশেষে প্রিন্সেসের রূপের সামনে মাথা নত করতেই হলো। “

আব্দুল নিজের লজ্জা, শরম সমেত দ্রুতই বারান্দা ছেড়ে কামরায় ফিরে যায়। শুভ্র আঙিনার বুকে বিচরণ করে বেড়ায় দু'জন জানে শত্রু। তবে দু'জন যে একে অপরের শত্রু তা বুঝার কোনো উপায় নেই। যে কেউ প্রথম দেখায় ভেবে বসবে এরা বুঝি আজন্মের প্রেমিক যুগল। প্রেমে আহত একজোড়া যুগল!

__________

কারাগারের নির্দিষ্ট একটা আংটার সঙ্গে হাতজোড়া বেধে আটকে রাখা হয়েছে জেইলানকে। উন্মুক্ত পিঠ এবং পা জোড়ায় অবিরত পড়ে চলেছে চাবুকের নিক্ষেপিত আঘাত। নির্দয়ের মতো প্রতিটা আঘাত করে চলেছে খাস দাসী। তার চোখে প্রকাশ পাচ্ছে বন্দিনী এই মেয়েটার প্রতি অসীম ঘৃণা। প্রতারক মেয়েটা কি কৌশলেই না তাদের কাউন্টকে খুন করতে চেয়েছিল!

প্রতিটা চাবুকের আঘাতে জেইলানের রুহ বেরিয়ে আসতে চাইছে। তবে সে দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে শক্ত দেখানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও এতে খুব একটা লাভ হচ্ছে না। ভয়ংকর আঘাত গুলো তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে আর্তনাদ করতে বাধ্য করছে। ওর আর্তনাদ শুনে যেনো খাস দাসী আরো জোরে জোরে আঘাত করতে থাকে।

জেইলানের পক্ষে আর এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। গতরাত হতে শুরু হওয়া এই শাস্তি তাকে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দিয়েছে ইতিমধ্যে। পা এবং পিঠ ব্যথায় এখন অসাড় হয়ে আসছে। যেকোনো মুহূর্তে মনে হচ্ছে তার প্রাণ প্রদীপটা আঘাতের দমকে নিভে যাবে।

জেইলান মাথা নত করে ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিতে থাকে। ঠিক সে-ই মুহূর্তে খাস দাসী পিছন থেকে এসে শক্ত করে তার চুলের মুঠি ধরে বলে উঠে,

“ এখনো মুখ খুলবি না তুই? বলবি না প্রিন্সেস কোথায় আছে? হ্যাঁ? এখনো সহ্যক্ষমতা অবশিষ্ট আছে তোর মধ্যে? আমি আরো কঠিন হই এটাই চাচ্ছিস তো? “

জেইলানের গলাটা খা খা মরুভূমির ন্যায় পানির তৃষ্ণায় তড়পাচ্ছে। তবুও সে নিজেকে শক্ত রেখে, তেজী গলায় বলে,

“ এতটা দূর্বল রোমানিয়ান সৈন্যবাহিনী? একজন প্রিন্সেসকে খুঁজে পেতে অক্ষম এরা? তা-ও নিজেদের রাজ্যের জমিনে? খুন করে ফেলো মারতে মারতে, আমি কখনো বলবো না প্রিন্সেস কোথায়। প্রিন্সেসের ঠিকানা আমি নিজের সঙ্গে কবরে নিয়ে যেতেও প্রস্তুত। “

জেইলানের এরকম তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বলা কথা শুনে খাস দাসীর মেজাজ আরো বিগড়ে যায়। গতরাত থেকে কাউন্টের আদেশ অনুযায়ী চাবুক দিয়ে মারতে মারতে এ-ই মেয়ের পিঠের ছাল তুলে ফেলেছে সে। হাতের পাশাপাশি সম্পূর্ণ পিঠ এবং দু পা হতেও রক্ত ঝরছে। তবুও এই ত্যাড়া মেয়ে মুখ খুলতে রাজি হচ্ছে না। এ-ই পর্যায়ে এসে তো খাসদাসীর নিজেরই দু হাতের তালু লাল হয়ে গিয়েছে মারতে মারতে। উনার নিজেরই আর ধৈর্য্য কুলাচ্ছে না আর এক দন্ড এই চাবুক হাতে ধরে রাখতে। এখন?

খাস দাসী কিছুক্ষণ ফোসফাস করতে করতে কিছু একটা ভাবে। এ-ই শাস্তিতে যে এই মেয়ের মুখ খুলবে না তা সে ভালো করেই বুঝেছে। অন্য কোনো শাস্তি কি দিয়ে দেখবে? কিন্তু কাউন্ট তো অন্য কোনো আদেশ দেয় নি। খাস দাসী মনে মনে নিজেকে বুঝায়, মেয়েটা জীবিত থাকলেই তো হলো! এছাড়া সত্য বের করার জন্য এ-ই মেয়েকে যা-ই শাস্তি দেওয়া হোক না কেন তা নিয়ে নিশ্চয়ই কাউন্টের কোনো আপত্তি থাকবে না!

নিজের ভাবনা অনুযায়ী খাস দাসী হাত হতে চাবুকটা ফেলে দিয়ে, কোমরবন্ধনের পাশ হতে একটা খঞ্জর বের করে হাতে নেয়। ভালো করে একবার খঞ্জরটা দেখে নিয়ে সে একহাতে জেইলানের চুল গোড়া থেকে মুঠি করে ধরে। খঞ্জরটা ঠিক চুলের গোড়ার নিকট ধরে সে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,

“ আচ্ছা। সত্য না বলে শাস্তি মেনে নিতে চাইছো যেহেতু, সেহেতু তোমাকে শাস্তিই দেওয়া হোক। আচ্ছা বলো তো, তোমার এই সুন্দর চুলগুলো যদি এই মুহূর্তে আমি গোড়া থেকে একদম ছেটে ফেলে দেই তাহলে তোমাকে কেমন দেখতে লাগবে? “

জেইলানের শরীর সঙ্গে সঙ্গে ঝিমঝিম করে উঠে। এই মহিলা কি সত্যি সত্যিই তার চুল কেটে ফেলে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে? অসম্ভব! জেইলানের ভেতরটা কাঁপতে থাকে। একজন নারী হিসেবে এটা তার কাছে চূড়ান্ত অপমানজনক একটা ঘটনা হবে। সে চোখ বুজে ফেলে নিজের। না চাইতেও তার চোখের কার্নিশ হয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। নাওমির ঠিকানা সে কোনো মূল্যেই বলবে না। তবে এরকম একটা শাস্তির সম্মুখীনও সে হতে চাইছে না। এই পরিস্থিতি থেকে রেহাই পাওয়ার কি কোনো উপায় নেই?

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন