ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়তিথি

৩২তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

প্রণয়তিথি

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৩২.

কেভকে সঙ্গে নিয়ে কারাগারে প্রবেশ করে কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট। জেইলানের কাছ থেকে নাওমির ব্যাপারে কোনো তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে কি-না, তা জানতেই সে কারাগার পরিদর্শনে এসেছে। মনের গহীন কুঠিরে বোধহয়, শাস্তিপ্রাপ্ত জেইলানের বর্তমান স্থিতি দেখার সুপ্ত ইচ্ছাটাও রয়েছে। তবে তা বাহির থেকে দেখে বুঝার উপায় নেই। ও-ই গম্ভীর মুখোশের আড়ালের সত্যতাটা দেখার সাধ্যি কারো নেই।

কারাগারের নির্দিষ্ট কক্ষটার ধারে এসে দাঁড়াতেই ইয়ানের চোখে পড়লো অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যটা। খাস দাসী একহাতে জেইলানের চুল মুঠো করে ধরে অপর হাতে খঞ্জর ধরে রেখেছে। কানে কানে ফিসফিসিয়ে জেইলানকে গা হীম করা হুমকিটা ছুড়ে দিচ্ছে। জেইলানের ভীত মুখে তখন অশ্রুর আনাগোনা। চোখ বুজে বোধহয় সাহায্যের প্রার্থনা করছে মনে মনে।

খাস দাসী নিজের হাতের খঞ্জরটা চালাতেই নিবে ঠিক সে-ই মুহূর্তে কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট দু হাত পিঠের পিছনে ভাজ করে বলে উঠে,

“ সরে যাও। “

কাউন্টের গলার আওয়াজ শুনতেই খাস দাসী চমকে ফিরে তাকায়। দ্রুত পিছনে সরে গিয়ে সে নিজের মাথা নত করে নেয়। জেইলানের অজান্তেই তার বুক থেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। কলিজায় যেনো পানি ফিরে পেয়েছে সে। চোখ বুজে রেখেই সে উঁচু করে বেধে রাখা হাতে মাথাটা ঠেকিয়ে দেয়।

ইয়ান ইশারা দিতেই সঙ্গে সঙ্গে প্রধান সেনাপতি এবং খাস দাসী কারাগার থেকে প্রস্থান করে। গোটা কারাগারে রয়ে যায় কেবল ইয়ান এবং জেইলান। ইয়ান এবার নিজের দৃষ্টি স্থির করে জেইলানের পানে। গতরাতের জখম হওয়া হাতটা সারা রাত ধরে বাধা থাকায় রক্ত শুকিয়ে কেমন কালসিটে বর্ণ ধারণ করেছে। গাউনের ভেতর আবৃত্ত পা জোড়ার অবস্থাও যে বেশ বিশ্রী তা-ও জেইলানের অস্থিতিশীল দাঁড়িয়ে থাকা দেখেই আন্দাজ করা যাচ্ছে। লম্বা চুলগুলো খোলা অবস্থায় পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে আছে বলে উন্মুক্ত পিঠের আঘাতের দাগ গুলো দেখা যাচ্ছে না।

ইয়ান নির্বিকার ভঙ্গিতে কারাগারের কক্ষটার ভেতর প্রবেশ করে। এক পা, দু পা করে এগিয়ে গিয়ে ঠিক জেইলানের পিছনে স্থির হয়ে দাঁড়ায়। জেইলান বোধহয় টের পায় নিজের পিছনে ইয়ানের উপস্থিতি। সে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায়। তবে ঘাড় ঘুরিয়ে আর পিছনে ফিরে তাকায় না।

ইয়ান এবার একহাত বাড়িয়ে জেইলানের চুল গুলো ঠেলে কাধের সামনে দিয়ে দিতে নেয়। সঙ্গে সঙ্গে জেইলান ক্লান্ত স্বরে বলে উঠে,

“ থেমে যাও। নিজের সীমা ভুলে যেও না। শাস্তি বরদাস্ত করে নিবো, কিন্তু সীমা লঙ্ঘন না। “

ইয়ানের দৃষ্টি পিছন থেকেই জেইলানের মুখপানে নিবদ্ধ। সে জেইলানের বলা কথার তোয়াক্কা করলো না। সবগুলো চুল কাধের সামনে ঠেলে দেয়। জেইলান রাগে চোখ বুজে নেয়। ইয়ান লক্ষ্য করে তা। সে ভুল করেও জেইলানের উন্মুক্ত পিঠের পানে দৃষ্টিপাত করে না। তবে নিজ আন্দাজে হাত বাড়িয়ে গাউনের পিঠের দিকের চেইনটা টেনে উপরে তুলে দেয়।

পুরোটা সময় জেইলান ফোসফাস করছিলো। ইয়ান নিজের হাতটা সরিয়ে নেয়। অতঃপর নিচু স্বরে জেইলানের কানের কাছে বলে উঠে,

“ প্রতারক হতে পারি, তবে চরিত্রহীন নই। “

জেইলানের মাঝে বিশেষ কোনো ভাবান্তর দেখা গেলো না। ইয়ানও কিছু না বলে একহাত তুলে জেইলানের হাতের বাধন মুক্ত করে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে জেইলান ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ে। এই এতদূরই সে জোর করে দাঁড়িয়ে ছিলো। আর সম্ভব হচ্ছে না তার পক্ষে। আঘাতে আঘাতে মনে হচ্ছে পা বুঝি পচে গিয়েছে। ইয়ান লক্ষ্য করে করে সবটা। সে জেইলানের ভাই হত্যার প্রসঙ্গে নিজেকে বেকসুর প্রমাণ করতে একটুও সাফাই গায় না। সাফাই এমন ব্যক্তিকে দিতে হয়, যে সত্য মিথ্যা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। তবে যারা নিজেরাই সবটা বিচার করে, নিজেদের বিশ্বাসকে চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে মেনে নেয় তাদেরকে সাফাই দেওয়া সময় অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। ইয়ান কেবল বলে,

“ চমৎকার জেদ! একজন রাজকুমারীর এতটুকুই জেদি হওয়া জরুরী। তবে জানো তো, আমার বোনের পদও তোমার সমকক্ষই? নাওমিও একজন প্রিন্সেস। ওর জেদ সম্পর্কে কিছুটা হলেও আশা করছি ধারণা হয়েছে তোমার। তোমাকে ওর ব্যাপারে আর একটাও প্রশ্ন করা হবে না। আমার বোনকে আগামী আটচল্লিশ ঘন্টার মধ্যে আমি খুঁজে বের করে নিবো। বাকি রইলে তুমি। একবার ভেবে দেখো তো, তোমার এখন কি হবে? কি ভেবেছো, ক্ষমা করে দিবো? উঁহু। এ-ই মুহূর্ত থেকে তুমি নিজের শেষ নিঃশ্বাসের প্রহর গুণতে শুরু করে দাও। তোমার মৃত্যু নিশ্চিত। আমি নিজে তোমার মৃত্যুদণ্ডের দলীলে সাক্ষর করবো। তোমার লাশটার সঙ্গে কি করা যায়, তা আপাতত ভাবছি। বাক্সবন্দী করে তোমার পিতার কাছে পাঠাবো? নাকি কৃষ্ণ সাগরে ভাসিয়ে দিবো? কি চাও, মাহশা? “

মাহশা চোখ তুলে তাকায়। তিরস্কারের হাসি হাসে সে। এ-ই ছেলে এখনো তাকে মাহশা বলে ডাকছে? জেইলানের আসল পরিচয়টা এখনো মেনে নিতে পারে নি যে-ই ছেলে তার মুখে কি এতো বড়ো বড়ো কথা মানায়? ইয়ান উদগ্রীব। সে আবারও প্রশ্ন করে,

“ কি চাও তুমি, মাহশা? “

জেইলান শীতল স্বরে জবাব দেয়,

“ তোমার জীবন। “

ইয়ানের দৃষ্টি বোঝা দায়। সে কি হতাশ হলো নাকি রাগ কে জানে! এক হাঁটু গেড়ে জেইলানের সামনে বসে সে। জেইলান নির্বাক ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকে। তবে মুহুর্তেই ইয়ান নিজের একহাত জেইলানের মাথার পিছনে নিয়ে তার চুলগুলো মুঠো করে ধরে। উঁহু। খাস দাসীর মতো আগ্রাসী ভঙ্গিতে নয়, বরং বেশ আলতো করেই। চকিতেই জেইলান অনুভব করে কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট তার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়েছে। এলোমেলো নিঃশ্বাস অনুভব করতে পারছে সে। জেইলান চোখ বুজে নেয়। কিছুক্ষণ আগে তীক্ষ্ণ স্বরে সীমা লঙ্ঘনের বুলি আওড়ানো সে ক্ষানিক সময়ের জন্য ভুলে যায় নিজের তৈরী করা সীমারেখার তালিকা। কানে ভেসে আসে কাতর স্বরের প্রশ্ন,

“ তুমি মরে গেলে না কেনো, মাহশা? তুমি মরে গেলে সত্যিটা কখনো আমার সামনে আসতো না। আমার তোমাকে ঘৃণা করতে হতো না। “

জেইলান অস্ফুটে পাল্টা প্রশ্ন করে,

“ তুমি কেন এন্ড্রু হলে না? শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আমার স্মৃতিতে রয়ে যেতে। আমার তোমাকে ঘৃণা করতে হতো না। “

দু'জনের প্রতিটা নিঃশ্বাসই বলে দেয় তীব্র আফসোস, দূরত্ব এবং অজানা কোন অনুভূতি সম্পর্কে। তবে কেউ-ই তা প্রকাশ করতে নারাজ। কয়েক পল গড়ায়। জেইলান নিজের সম্বিত ফিরে পায়। সঙ্গে সঙ্গে সে দু'হাতে ইয়ানকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে চোখ মেলে তাকায়। ইয়ানও অল্প সময়ের মায়াজাল ছেড়ে বেরিয়ে আসে। অপ্রস্তুত ভাব দু'জনের মুখশ্রীতেই স্পষ্ট ফুটে আছে। ইয়ান দ্রুত উঠে দাঁড়ায়। জেইলান নিজেকে কঠোরতায় মুড়িয়ে নিয়ে বলে উঠে,

“ অতীত ভুলে যাও। মাহশা নামের কেউ ছিলো তা ভুলে যাও। কেবল বর্তমানটা মনে রাখো। আমি জেইলান, তোমার সামনে উপস্থিত। আমি একজন ছলনাময়ী, অপহরণকারী এবং হত্যা চেষ্টাকারী, এইটুকু কেবল মূখ্য হওয়া উচিত তোমার কাছে। “

ইয়ান শুনে সবটা। অতঃপর বলে,

“ চিন্তা করো না। তোমার এই চমৎকার পরিচয়গুলো আমি কখনো ভুলবো না। এর প্রমাণ তুমি ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েই উপলব্ধি করবে। “

ইয়ান বেরিয়ে যায় কারাগার থেকে। জেইলান একা বসে রয় মেঝেতে। দৃষ্টি তার শূন্যে নিবদ্ধ।

__________

নিজ কক্ষের বারান্দায় দাঁড়িয়ে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে তুষারপাত দেখছে ক্যামেলিয়া। বিশাল এই বুখারেস্ট প্রাসাদটায় বিগত ক'দিন ধরে আরোণের আনাগোনা নেই। ক্রিয়াসকে সঙ্গে নিয়ে বিশেষ কোনো কাজে নিরুদ্দেশ হয়েছে সে। কাউকে বলেও যায় নি, যে সে-ই জরুরী কাজটা কি? এ নিয়ে নেকড়ে পালের সবার মাঝেই চাপা আগ্রহ কাজ করছে। ইদানীং যে আলফা প্রায়ই হুটহাট নিরুদ্দেশ হচ্ছে এটা কারোই চোখ এড়াচ্ছে না।

ক্যামেলিয়ার ধ্যান ভাঙে ঝড়ের গতিতে প্রাসাদের মূল ফটক দিয়ে দু'জনকে প্রবেশ করতে দেখে। সে বুঝতে পারে তার বাবা ফিরে এসেছে। কিন্তু অন্য সময়ের মতো সে আর দৌড়ে বাবার কাছে ছুটে যায় না। বরং নিজ জায়গাতেই দাঁড়িয়ে রয়। আরোণই মেয়ের খোঁজ করতে করতে তার কক্ষে চলে আসে।

ক্যামেলিয়া আরোণের উপস্থিতি টের পেলেও পিছনে ফিরে তাকায় না। আরোণ নিজেই এগিয়ে এসে মেয়েকে আলতো করে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে,

“ ফিরে তোমাকে প্রাসাদে পাবো আশা করি নি। এতো চমৎকার তুষারপাত হচ্ছে। তোমার তো এখন পশু শিকারের উদ্দেশ্যে অরণ্যে ছুটে বেড়ানোর কথা। “

ক্যামেলিয়া কোনো জবাব দেয় না। মলিন মুখটা নীরব রয়৷ আরোণ একবার ভালো করে মেয়ের মুখ পরখ করে নেয়। অতঃপর সচেতন স্বরে প্রশ্ন করে,

“ মন খারাপ কেন? “

ক্যামেলিয়া তাকায় নিজের বাবার দিকে। বুঝে উঠতে পারে না তার কি জবাব দেওয়া উচিত। আদৌতে তার মন কি কারণে খারাপ? নিজের পিতার গোপন রাখা বিষয়বস্তু সম্পর্কে জেনে? নাকি নিজের দাদার বলে যাওয় অভিশাপ মুক্তির পন্থা সম্পর্কে জেনে? আর নাকি ও-ই প্রধান সেনাপতির কারণে? উঁহু, ক্যামেলিয়া এর একটাও বলে না। বরং একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

“ নাওমিকে আর খুঁজে পাওয়া গেলো না বাবা। কে জানে কোথায় আছে ও। ওকে খুব মনে পড়ছে। “

আরোণ ভালো করেই জানে তার মেয়ে তার চোখে চোখ রেখে মিথ্যা বলছে। তবে ক্যামেলিয়ার আড়াল করে যাওয়া সত্যটা আরোণ ইচ্ছে করেই আর ঘাটলো না। ক্যামেলিয়ার আড়াল করে যাওয়া অনেক কিছুই তো সে জানে। যেমন - ক্যামেলিয়া যে তার ওই গোপন সিন্দুকটা খুলে সে-ই সিন্দুক হতে ডায়েরিটা নিয়েছিলো, এটাও আরোণের অজানা নয়। তবে এ-সব নিয়ে ইচ্ছে করেই সে ক্যামেলিয়াকে জেরা করে না। বরং কিছুটা শান্তনা দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে,

“ আশা ছেড়ো না। ওকে খুঁজে পাওয়া যাবে। একদিন না একদিন অবশ্যই মিলবে। “

ক্যামেলিয়া আর কিছু বলে না। আরোণ সবে বাইরে থেকে ফিরেছে। স্নান সেড়ে পোশাক পরিবর্তন করা জরুরী আপাতত তার। সে তাই ক্যামেলিয়াকে একা ছেড়ে দিয়ে প্রস্থানের উদ্দেশ্যে পা বাড়াতে নিলেই ক্যামেলিয়া পিছু ডেকে বলে উঠে,

“ সন্ধ্যার পর আমাকে মা'র কাছে নিয়ে যাবে, বাবা? “

আরোণ থমকায়। পিছু ফিরে তাকায় না ক্যামেলিয়ার পানে। ক্যামেলিয়া তখন জবাবের জন্য উদগ্রীব। বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর তার সরাসরি নিজের বাবার মুখ থেকে শোনা প্রয়োজন। মা'য়ের সামনে দাঁড়িয়ে নিশ্চয়ই বাবা মিথ্যা বলবে না? আরোণ সামান্য মাথা নেড়ে বলে,

“ আচ্ছা। নিয়ে যাবো। তৈরী থেকো। “

__________

সৈন্য শিবিরে নব্য সৈন্যদের প্রশিক্ষণ পর্ব চলছে। প্রত্যেক সৈন্যই জোড়া হয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে তলোয়ার প্রশিক্ষণের অনুশীলন করে চলেছে। নব্য হলেও ক্লাডিয়াস ছোট বেলা হতে নিজের পিতার দরুন তলোয়ার চালানোতে বেশ পটুই বলা চলে। প্রশিক্ষণ পর্বে তাকে সহজে হারানোও বেশ কঠিন কাজ।

তবে বিগত ক'দিন ধরে তার অন্যমনস্ক থাকার ফলে প্রতি দফায় সে হেরে যাচ্ছে প্রতিপক্ষের নিকট। আজও তার ব্যতিক্রম নয়। অজানা ভাবনায় ডুবে থাকার ফলে বারবার তাকে হেরে যেতে হচ্ছে। প্রশিক্ষণ ময়দানে যথাযথ টক্কর না পেয়ে তার প্রতিপক্ষ বেশ বিরক্ত হয়ে উঠেছে ইতিমধ্যে। সৈন্য শিবির পরিদর্শন আসা জোসেফের চোখে পড়ে সম্পূর্ণ দৃশ্যটা। সে দূর হতে ছেলের এহেন দশা দেখে আলাদা করে প্রশিক্ষক সৈন্যের সঙ্গে কথা বলে। প্রশিক্ষক বেশ চিন্তিত সুরে জানায় বিগত ক'দিন ধরে ক্লাডিয়াসের অনুশীলন পর্ব এরকম জঘন্যই যাচ্ছে।

সবটা শুনে জোসেফ চিন্তিত হলো নাকি ক্রোধিত তা ঠিক বুঝা গেলো না। তবে সে অনুশীলন ময়দানে গিয়ে ক্লাডিয়াসকে ডেকে নিজের সঙ্গে নিয়ে এককোণে গেলো। শিবিরের এদিকটা বেশ নিরিবিলি। আশেপাশে কোনো সৈন্যের আনাগোনা নেই। তবুও জোসেফ সতর্ক ভঙ্গিতে একবার চারিপাশে চোখ বুলিয়ে নিয়ে নিজের ছেলের পানে তাকায়। বেজায় রাগ নিয়ে সে ক্লাডিয়াসের ঘাড়টা চেপে ধরে নিচু স্বরে বলে উঠে,

“ বেটা! তোর সমস্যাটা কি? মনযোগ কোথায় তোর? “

ক্লাডিয়াস ভাবলেশহীন গলায় জানায়,

“ প্রতিটা সৈন্যের কর্মদক্ষতা যে সবসময় একই থাকবে এমন ভাবনাটা ভুল, বাবা। “

জোসেফের রাগ যেনো বেড়ে গেলো। সে আশেপাশে তাকিয়ে বলে উঠে,

“ কি ভেবেছিস তুই? আমি কিছু বুঝি না? এসব তোর প্রেমের ভূতের প্রভাব তা আমি টের পাবো না মনে করেছিস? “

ক্লাডিয়াস বুঝতে পারে তার পিতা আজ ভালোই রেগে আছে। সাধারণত জোসেফ কখনো সন্তানদের তুমি থেকে নেমে তুই সম্বোধন করে না। তবে আজ যেহেতু তা করছে, তার মানে পরিস্থিতি গম্ভীর। ক্লাডিয়াস নিচু স্বরে জবাব দেয়,

“ তুমি বেশি ভাবছো, বাবা। “

জোসেফ ছেলেকে শাসায়,

“ আমি বেশি ভাবছি নাকি ঠিক সেটা আমি বুঝবো। তুই নিজের ভেতর সংযম নিয়ন্ত্রণ কর। প্রিন্সেসের সাথে নিজের সম্পর্কটা নিয়ে একাকী বসে ভাব। উনার সামনে তোর মর্যাদা একজন ভৃত্যর থেকে বেশি না। আর যেনো উনার প্রতি তোর মনে অনুভূতি পুষে রাখার দুঃসাহস না দেখি। “

বলেই জোসেফ সেখান থেকে চলে যায়। ক্লাডিয়াস মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রয়। তার মস্তিষ্কে জোসেফের বলে যাওয়া ভৃত্য শব্দটা তীরের মতো বিধে গিয়েছে যেনো।

__________

আজ সারাদিন ধরে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছে নাওমি। সেটা হলো জেইলান নামক ওই কাল নাগিনীটা দূর্গে নেই। তবে অবাক করার বিষয় হলো অন্যান্য দিন জেইলানের সঙ্গে কোনো এক পুরুষও অনুপস্থিত থাকতো। তবে আজ বেহজাদ এবং আব্দুল দু'জনই দূর্গে আছে। অর্থাৎ ও-ই মেয়ে একা গিয়েছে আজ।

নাওমি জানে না এই তিন অসভ্যের পরবর্তী পরিকল্পনা কি। তবে সে কেবল মনেপ্রাণে প্রার্থনা করে যাচ্ছে এদের কোনো চেষ্টা যেনো সফল না হয়। তার পরিবারের যেনো কোনো ক্ষতি না হয়। গোধূলি লগ্নে বিছানায় বসে যখন নাওমি এসব আকাশ কুসুম ভাবনায় মগ্ন, ঠিক সে-ই মুহূর্তে তার কক্ষের দরজা খুলে যায়। কামরায় একটা মাঝারি আকৃতির বক্স হাতে বেহজাদ প্রবেশ করে।

নাওমি নড়েচড়ে বসে৷ আজ সকাল থেকেই বেহজাদকে তার স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। সাধারণত তো বেহজাদের দৃষ্টি দেখলেই সবসময় তার মনে হয় এই বুঝি নাওমিকে লবণ মরিচ দিয়ে ডলে খেয়ে ফেলবে। তাহলে আজ এই অসভ্যের দৃষ্টি এতো স্বাভাবিক কেন? হুট করে ওই রাক্ষসী ভাব কোথায় উধাও হলো?

বেহজাদ নাওমির সামনে দাঁড়িয়ে সামান্য গলা ঝেড়ে বলে,

“ সারাদিন দূর্গে বন্দী থাকতে হাসফাস লাগে না তোমার? “

নাওমি ভেংচি কেটে পাল্টা প্রশ্ন করে,

“ তোমার কবে থেকে আমাকে নিয়ে এতো দুঃশ্চিন্তা শুরু হলো? “

বেহজাদ জবাব দেয় না। নাওমি পা ঝুলিয়ে বিছানার পাশে বসে ছিলো। বেহজাদ এক কদম এগিয়ে এসে নাওমির সামনে এক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। নাওমি বিস্মিত হয় প্রথমে। পর মুহূর্তেই নিজের পা গুটিয়ে নিয়ে চেঁচিয়ে উঠে,

“ এই! একদম না। পা ঠিকঠাক আছে আমার। দূরে থাকো। চিকিৎসক সাজতে হবে না তোমার। “

বেহজাদ এবারও কোনো প্রতুত্তর না করে নিজের নিয়ে আসা মাঝারি আকৃতির কাঠের বাক্সটা খুলে। বাক্সের ভেতর একপাশে সবুজ রঙের মখমলের কাপড়ের ভাজে কিছু একটা আছে। অন্যপাশে আরেকটা ভাজ করা মখমলের কাপড়ের উপর রাখা সামান্য কিছু অলংকার সামগ্রী। নাওমি বুঝে উঠতে পারছে না, যে বেহজাদ কি করতে চাইছে। তার মনে জমা হওয়া প্রশ্নের উত্তর হিসেবে বেহজাদ সবুজ মখমলের কাপড়ের ভাজের ভেতর থেকে এক জোড়া চমৎকার সুন্দর জুতা বের করে। অতঃপর নিজ হাতে সে-ই জুতা জোড়া নাওমির পায়ে পরিয়ে দেয়। সম্পূর্ণ দৃশ্যটা নাওমি বাকরুদ্ধ হয়ে বসে দেখে। তার জানা নেই বেহজাদ কখন গিয়ে এই জুতা কিনে এনেছে। তার এটাও জানা নেই এই জুতার মাপ হুবহু তার পায়ের মাপ অনুযায়ী কি করে হলো। সে কেবল জানে, তার মন ভয়ংকর এক দোলাচালে ফেঁসে গিয়েছে।

বেহজাদ চোখ তুলে তাকায়। কাঠের বাক্সটা বিছানার একপাশে রেখে বলে,

“ কতদিন ধরে এই নোংরা অবস্থায় আছো, বলো তো? গোসল সেরে তৈরী হয়ে নাও। দূর্গে দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার। তোমাদের মৃত্যুপুরী ট্রান্সেলভেনিয়াটা একটু ঘুরে দেখবো ভাবছি। মন বলছে সঙ্গী হিসেবে তুমি মন্দ হবে না। “

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন