ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়তিথি

৩৩তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

প্রণয়তিথি

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৩৩.

আজ বহুদিন পর নিজের মনমতো একটু শান্তিতে স্নান করতে পেরেছে নাওমি। যদিও প্রাসাদে ওর স্নানের প্রহরটুকু কাটতো রাজকীয় কায়দায়। চারিপাশে দাসীরা ওর সেবায় নিয়োজিত থাকতো। কেউ ওর হাতে পায়ে সাবান মেখে দিতো, তো কেউ ওর গায়ে পানি ঢেলে দিতো। স্নান ঘরটাও কি চমৎকার করে সাজানো থাকতো! কিন্তু এখানে, নাওমিকে একাই বসে স্নান সম্পন্ন করতে হয়েছে। তার উপর গায়ে ব্যবহারের সাবানটাও ছিলো কি অদ্ভুৎ! প্রাসাদের সাবানের মতো মোটেও সুগন্ধ নেই এতে।

যাই হোক, সুগন্ধি যুক্ত সাবান না পেলেও নাওমি এটা নিয়ে সন্তুষ্ট যে অন্তত তার গা থেকে আসা গত ক’দিনের নোংরা গন্ধটা দূর হয়েছে। শরীরটাও আগের তুলনায় সতেজ লাগছে। যদিও পায়ের পট্টিটা ভিজে গিয়েছে সম্পূর্ণ। কিন্তু কাপড়ের সঙ্গে নিয়ে যাওয়া প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী দিয়ে সে নতুন করে পট্টি করে নিয়েছে।

আয়নার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ নিজেকে ফ্যালফ্যাল করে দেখে নাওমি। এ-ই মুহূর্তে নিজেকে কোনো প্রিন্সেস মনে হচ্ছে না তার। বরং মনে হচ্ছে কোনো সাধারণ রমণী সে। নাওমি ভেজা চুল গুলো সামান্য আঁচড়ে নিয়ে বেহজাদের রেখে যাওয়া কাঠের বাক্সটার দিকে তাকায়। বাক্সের ভেতরে এক জোড়া পাথরের কানের দুল, একটা প্রজাপতির মতো দেখতে গলার হার এবং চুলের জন্য একটা কাটা আছে।

নাওমি বেশ কিছুক্ষণ অলংকার গুলো দেখে অতঃপর হারটা তুলে নেয়। গলায় হারটা পরে নিয়ে নাওমি কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। সোজা নিচে যেতেই, হলরুমে সে আব্দুলের মুখোমুখি হয়। আব্দুল নীরবে দেখে নাওমিকে। সে এখন কেবল নীরব দর্শক ছাড়া আর কিছুই নয়। বোন যখন আলবার্টদের হাতে বন্দী, যুবরাজ তখন কি-না প্রিন্সেসকে নিয়ে ঘুরতে বের হচ্ছে। এটাই বোধহয় আব্দুলের দেখার বাকি ছিলো। সে আর কি-ই বা বলতে পারে?

নাওমি আব্দুলকে দেখতে দেখতে দূর্গ থেকে বেরিয়ে যায়। দুপুর পর্যন্ত হওয়া তুষারপাতের কারণে দূর্গের আঙিনা অনেকটা পিচ্ছিল হয়ে আছে। নাওমি সাবধানে কদম ফেলে। পায়ে তার বেহজাদের উপহার দেওয়া জুতা জোড়া। দূর্গের প্রধান ফটকের ওপারে ঘোড়ার পাশে দু-হাত পিঠের কাছটায় ভাজ করে দাঁড়িয়ে আছে বেহজাদ। নাওমি পিছন থেকে দেখে বেহজাদকে। সে নীরবে এগিয়ে যায়।

নাওমির উপস্থিতি টের পেতেই বেহজাদ ঘুরে দাঁড়ায়। মাথা থেকে পা পর্যন্ত পরখ করে নিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীকে। শুভ্র মুখখানায় কোনো প্রসাধনীর লেশ নেই। গায়ে জড়িয়েছে হালকা গোলাপি রঙের একটা গাউন। গলায় ঝুলছে বেহজাদের নিয়ে আসা হারটা। এক মুহূর্তের জন্য বেহজাদের মনে হলো, এই মেয়েটা কোনো প্রিন্সেস নয়। কাউন্ট ইয়ান আলবার্টের বোন নয়। নৌ বাহিনীর প্রধান ম্যাথিউর কন্যা নয়। এ-ই মেয়ে একান্তই নাওমি। এ ছাড়া তার দ্বিতীয় কোনো পরিচয় নেই।

ক্ষানিকের এই ভাবনাটাকে বেহজাদ মেনে নিলো কি-না বুঝা গেলো না। সে নাওমিকে পাশ কেটে কালো রঙা ঘোড়ার পিঠে উঠে বসে। নাওমিকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজের এক হাত বাড়িয়ে দেয়। নাওমি ফ্যালফ্যাল দৃষ্টি মেলে কিছুক্ষণ দেখে বেহজাদকে। অতঃপর বাড়িয়ে দেওয়া হাত ধরে বেহজাদের সামনে উঠে বসে। ঘোড়া চলতে শুরু করার পূর্বে নাওমি কেবল নিজের কানের কাছটায় শুনলো বেহজাদের কণ্ঠস্বর,

“ মৃত্যুপুরী ঘুরে দেখা যাক তাহলে। “

__________

নোংরা মেঝেতে শীর্ণ দেহটা উপুড় হয়ে পড়ে আছে। পিঠ এবং দুই পায়ের ব্যথাটা এখন আর টের পাচ্ছে না জেইলান। জায়গাগুলো অবশ হয়ে কেমন অনুভূতিশূন্য মনে হচ্ছে তার। তবে যেটা সে টের পাচ্ছে তা হলো কলিজা ছিড়ে ফেলা ক্ষুধা। পেট এবং বুক ক্ষুধায় জ্বলছে প্রচন্ড। শেষ মনে হয় গতকাল সকালে দূর্গ থেকে বের হওয়ার আগে খেয়েছিলো সে। তারপর থেকে একটা দানাও পেটে পড়ে নি তার। গত একদিনের এই বন্দিত্বে এখনো এক বিন্দু পানিও জুটে নি তার কপালে। যা জুটেছে তা হলো, কেবল চাবুকের আঘাত। সকালে এন্ড্রু এসে কারাগার থেকে ঘুরে যাওয়ার পর হতে যদিও সে-ই চাবুকের আঘাত স্থগিত আছে। সারাদিনে এখনো একবারও ওই খাস দাসী কারাগারে উঁকি দেয় নি।

জেইলান নিজের ক্ষুধা ভুলে ফ্যালফ্যাল দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রয় আঁধার পানে। মনে কিছুটা ভয় কাজ করছে তার। কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট যদি প্রিন্সেসকে খুঁজে বের করে ফেলে? বেহজাদ ভাইজান যদি ওই ইয়ানকে মারতে সক্ষম না হয়? ভাইজানও যদি এই আলবার্টদের হাতে বন্দী হয়ে যায়?

নিজের ভাইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেই জেইলান আতংকিত হয়। উঁহু। দেনিজ ভাইজান তো এখন নেই। বেহজাদ ভাইজানকে অবশ্যই জীবিত থাকতে হবে। নাহলে তার রাজ্যটা শকুনরা খুবলে খেতে মেতে উঠবে।

মনের চিন্তায় বুদ হয়ে জেইলান দোয়া করতে থাকে,

“ আল্লাহ, ভাইজানকে রক্ষা করুন। ভাইজানের জীবন মূল্যবান। উনার উপর আমাদের সাম্রাজ্যের ভবিষ্যত নির্ভর করছে। উনাকে যেকোনো মূল্যে হেফাজত করো। আরেক ভাই হারানোর মতো সহনশীলতা আমার মাঝে অবশিষ্ট নেই। “

__________

ঘোড়া ছুটে চলেছে আপন গতিতে। নাওমির এখন আগ্রহী হয়ে নিজের চারিপাশের এই মৃত্যুপুরীটাকে দেখার কথা ছিলো। কিন্তু ওর মাঝে কোনো আগ্রহের ছিটে ফোটাও নেই। উল্টো নিজের মাথা নত করে বসে আছে। প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য তাকে ছুঁতে ব্যর্থ আজ।

নাওমির এই অনাগ্রহ বেহজাদের দৃষ্টি এড়ায় না। সে জঙ্গলের মাঝে আরেকটু এগিয়ে হুট করে ঘোড়াটা থামায়। নিজে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে গিয়ে, বিনাবাক্য ব্যয়ে নাওমিকেও ধরে ভূমিতে নামায়। অতঃপর সরাসরি নাওমির চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করে,

“ কি হয়েছে তোমার? “

নাওমি মাথা তুলে তাকায় না। বেহজাদ এবার এক হাত বাড়িয়ে নাওমির থুতনি ধরে মুখ তুলে। নাওমি না চাইতেও ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেলে। বেহজাদ বিস্মিত। এই মেয়ে কাদছে কেন? কি হয়েছে? নাওমি কাদতে কাদতে নিজেই বলে উঠে,

“ মিথ্যা বলেছো তুমি। তুমি আমাকে নিয়ে ট্রান্সেলভেনিয়া ঘুরে দেখতে আসো নি। এই জঙ্গলে আমাকে মেরে পুতে দিতে নিয়ে এসেছো। এজন্যই হুট করে এতো ভালো আচরণ করছো, তাই না? এই জুতা, অলংকার দিয়ে আমাকে পাঠার ন্যায় সাজিয়েছো বলি দেওয়ার জন্য। “

বেহজাদ বুঝে উঠতে পারে না তার হাসা উচিত নাকি রাগ হওয়া। এই মেয়ে নিজেকে পাঠার সঙ্গে তুলনা করছে? পাঠাকেও কি অলংকার পরালে এমন চমৎকার দেখতে লাগে? কে জানে! বেহজাদ কিছু বলতে নিবে তার আগেই নাওমি হিচকি তুলে কাদতে কাদতে বলে,

“ আমাকে বোকা ভেবেছিলে তুমি, তাই না? কিন্তু আমি বোকা নই। তোমার দৃষ্টি দেখেই আমি বুঝে গিয়েছিলাম, আমার অন্তিম ঘন্টা বেজে গিয়েছে। কিভাবে খুন করবে তুমি আমাকে? বেশি কষ্টদায়ক মৃত্যু দিবে? আমি… আমি শেষবারের মতো মা, বাবাকেও দেখার সুযোগ পাবো না। ওরা বোধহয় কখনো জানবেও না যে আমি ম… “

নাওমির কথা অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। বেহজাদ তার ঠোঁটে আঙুল চেপে ধরে বলে,

“ হুশ… শান্ত হও। মরবে না তুমি। আমি তোমাকে খুন করবো না, মেয়ে। “

নাওমি বিশ্বাস করতে চাইলো না। সে মাথা নেড়ে বলে উঠে,

“ একদম মিথ্যা বলবে না। খুন করার উদ্দেশ্য না থাকলে তুমি কখনো আমাকে দূর্গ থেকে বের করে নিয়ে আসতে না। তুমি আমাকে সঙ্গে নিয়ে ট্রান্সেলভেনিয়া ঘুরে দেখবে, এটা সম্পূর্ণ একটা বানোয়াট অযুহাত ছিলো তোমার। “

বেহজাদ বোঝানোর চেষ্টা করে বলে,

“ বোকা মেয়ে, তোমাকে খুন করার হলে সেটা আমি দূর্গেই করতে পারতাম। অহেতুক তোমাকে বের করে নিয়ে আসার কষ্ট করতাম কেন? প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বুঝা বন্ধ করো তুমি। “

নাওমি নিজের অশ্রুসিক্ত চোখজোড়া সরু করে বলে,

“ তুমি সত্যি বলছো? “

বেহজাদ অকপটে জবাব দেয়,

“ সত্যি বলছি। “

নাওমি দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে জবাব দেয়,

“ সত্য বলো অথবা মিথ্যা, আমি কখনো তোমাকে বিশ্বাস করবো না। তোমাকে বিশ্বাস করার মানে হলো, শেয়ালের কাছে মুরগী বাগি দেওয়া। “

বেহজাদ এবার না চাইতেও হেসে দেয়। বলে উঠে,

“ আচ্ছা যাও, আমাকে বিশ্বাস করতে হবে না। তুমি কেবল আমার সঙ্গে চলো। তুমি থেকো মুরগীর মতো, আমি থাকবো শেয়ালের মতো। ঠিক আছে? “

নাওমি অশ্রুজল মুছে বেহজাদকে দেখতে থাকে। তার এই অস্বাভাবিক বেহজাদকে মোটেও ভালো লাগছে না। এর থেকে তো ধরো, কাটো, মারো রূপী বেহজাদই ভালো ছিল।

__________

নীরব, নিস্তব্ধ কক্ষটায় নিজ টেবিলের চেয়ারে একাকী বসে আছে কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট। দু-হাত একসঙ্গে মুঠো করে টেবিলে রেখে তার উপর কপাল ঠেকিয়ে রেখেছে। দু চোখ বুজে গভীর কোনো ভাবনায় ডুবে আছে সে। টেবিলের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য কাগজ। এর মধ্যে মূখ্য হলো রাজ্যের মানচিত্রের কাগজটা।

এইতো আর একটা দিন। তারপরই প্রজারা প্রাসাদ প্রাঙ্গণে জমায়েত হবে। তখন ইয়ান ঠিক কি জবাবটা দিবে? ম্যাথিউ চাচা সবসময় ঢালের মতো ইয়ানকে সব বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করে এসেছেন। কিন্তু আজ যখন উনার সন্তানের জীবন বিপদে, তখন ইয়ান কিছুই করতে পারছে না। কি চরম অসহায়ত্ব ঘিরে ধরেছে ইয়ানকে!

নির্ঘুম লাল হয়ে আসা চোখ দুটো মেলে ইয়ান তাকায়। ভালো করে দেখতে থাকে মানচিত্রটাকে। পুরোটা মানচিত্র খোঁজা শেষ সৈন্যদের। মাহশা কোথায় বন্দী করে রেখেছে নাওমিকে? রোমানিয়াতে ঠিক কোন এমন জায়গাটা মাহশা চিনে ফেলেছে, যে-ই জায়গা পর্যন্ত ইয়ান পৌঁছাতে পারছে না এখনো?

ইয়ান বিরক্ত হয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। উন্মাদ বাতাসে তার দু চোখ বুজে আসে। মুহূর্তেই ইয়ানের চোখের সামনে মাহশার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের দৃশ্যপটটা ভেসে উঠে। কোনো এক চন্দ্রিমা রাতে ট্রান্সেলভেনিয়ায় ও-ই কৃষ্ণ সাগরের তীরে মাহশাকে প্রথম দেখেছিলো সে। সেদিন রাতে মাহশাকে দেখে এক মুহূর্তের জন্যও ইয়ানের অনুভব হয় নি, এই মেয়েটা কোনো প্রতারক হতে পারে। কেভ, জোসেফ বারবার সাবধান করেছিলো ইয়ানকে। কিন্তু ইয়ান তাদের কথাকে উপেক্ষা করে মাহশাকে ভরসা করেছিলো। সে-ই ভরসার কি চমৎকার প্রতিদানই না পেলো সে!

হুট করে ইয়ান নিজের ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসে। চট করে চোখ মেলে তাকিয়ে সে দৌড়ে নিজের কক্ষে প্রবেশ করে। টেবিলের কাছটায় দাঁড়িয়ে ভালো করে দেখতে থাকে মানচিত্রটাকে। পুরো রোমানিয়া তাদের খোঁজা শেষ। কেবল একটা জায়গায়ই এখনো খুঁজে দেখা হয় নি। ট্রান্সেলভেনিয়া!

ইয়ানের নিজেকে এ-ই মুহূর্তে চরম বেকুব মনে হয়। কি করে সে ট্রান্সেলভেনিয়ার কথা ভুলতে পারলো? তার মন বলছে ট্রান্সেলভেনিয়াতেই নাওমিকে খুঁজে পাওয়া যাবে। ইয়ান আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে না। দ্রুত প্রহরীকে ডেকে আদেশ করে এ-ই মুহূর্তে প্রধান সেনাপতিকে তলব করতে। প্রহরী চলে যেতেই ইয়ান দ্রুত বেগে তৈরী হতে থাকে। তৈরী হওয়ার মাঝে বিড়বিড়িয়ে বলে উঠে,

“ আরেকটু সবুর কর, নাওমি। ভাই আসছি। তোকে নিয়ে ফিরবো আজ। “

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন