প্রণয়তিথি
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৩৪.
ক্যাথরিনের সমাধির নাম ফলকের সামনে এক হাঁটু গেড়ে বসে আছে আরোণ। আলতো হাতে কবরের উপর জমে থাকা তুষার কণা গুলো সরিয়ে দিচ্ছে সে। যেনো এই তুষার কণার কারণে মাটির ভেতর শায়িত মানুষটার খুব ঠান্ডা লাগছে। আরোণের পিছনেই দাঁড়িয়ে থাকা ক্যামেলিয়া নীরবে দেখছে এই চমৎকার দৃশ্য। কে বলে ক্যামেলিয়া দূর্ভাগ্যবতী? এ-ই যে তার মা বেঁচে নেই, তবুও নিজের বাবার মাধ্যমে এখনো সে নিজের মা-বাবার সম্পর্কের ভালোবাসার সাক্ষী হতে পারছে। এর থেকে উত্তম আর কি-ই বা হতে পারে?
ক্যামেলিয়া মলিন হেসে এগিয়ে গিয়ে আরোণের পাশে দু হাঁটু গেড়ে বসে। নিজের হাতে থাকা ফুলের চারাগাছটা কবরের একপাশে লাগানোর কাজে লেগে পড়ে সে। এই চারাটা হলো লাল রঙের ক্যামেলিয়া ফুল গাছের। এই চারাগাছটা লাগিয়ে ক্যামেলিয়া যেনো নিজের মা'কে বলতে চাইছে,
“ তুমি এখানে একা নেই, মা। আমি সবসময় তোমার পাশেই আছি। দেখো তুমি। “
আরোণ নীরবে দেখে মেয়েকে। অতঃপর সামান্য ঝুকে পাশ হতে ক্যামেলিয়ার কপালে চুমু এঁকে দেয়। ক্যামেলিয়ার মাঝে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। সে আপনমনে চারাগাছ লাগাতে থাকে। হুট করে স্বাভাবিক স্বরে ডাকে,
“ বাবা? “
আরোণ জবাব দেয়,
“ হ্যাঁ, জান। “
“ তোমার কি কখনো স্বাভাবিক মানুষের মতো মৃত্যুর স্বাদ পাওয়ার সাধ হয়েছে? “
আরোণ মেয়ের প্রশ্নের পিঠে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই স্বাভাবিক স্বরে জবাব দেয়,
“ প্রতিদিন হয়। “
ক্যামেলিয়ার হাত জোড়া থেমে যায়। কেমন থমকে যায় সে। ডায়েরির পাতায় সে পড়েছিলো তার পিতার মৃত্যুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সাধ সম্পর্কে। তবে সরাসরি আরোণের মুখ থেকে এই কথাটা যেনো তাকে ভেতর থেকে এলোমেলো করে দিয়েছে। ক্যামেলিয়া সামান্য ঢোক গেলে জিজ্ঞেস করে,
“ কেন? অমরত্ব তোমার পছন্দ নয়? এতো ক্ষমতা তোমাকে আনন্দ দেয় না? “
“ সময়ের সঙ্গে এই অমরত্ব এবং ক্ষমতাকে মেনে নিয়ে আমি খুশি থাকতে শুরু করেছিলাম। তবে ক্যাথ এবং তুমি জীবনে আসার পর টের পেলাম যে এই অমরত্ব এবং ক্ষমতা আমার সবথেকে বড়ো কাল। আর দশটা সাধারণ মানুষের মতো হলে বোধহয় জীবনটা বেশি সহজ হতো আমার জন্য। “
ক্যামেলিয়া ফের প্রশ্ন করে,
“ মা'য়ের উপর কখনো রাগ হয় না তোমার? মা যদি তোমার ও-ই বিশেষ খঞ্জরটা ব্যবহার না করতো তাহলে আজ তোমার কাছে একটা এবং সবশেষ সুযোগ থাকতো। চাইলে মৃত্যুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারতে। “
আরোণ মলিন হেসে বলে,
“ যদি বলি, এ-ই একটা সুযোগ আমার থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার কারণে আমি তোমার মা'কে অভিযোগের দায় থেকে কখনো মুক্ত করবো না, তবে কি তুমি মন খারাপ করবে? “
ক্যামেলিয়া মাথা নেড়ে বলে,
“ উঁহু, করবো না। “
“ এ-ই পৃথিবীতে আমি প্রায় শত সহস্র বছর ধরে বিচরণ করছি ক্যামি। আশেপাশের বহু রাজ্য ঘুরে দেখা শেষ আমার। জীবনের অধ্যায়ে এক মৃত্যু বাদে আর এমন কিছু নেই যেটার অভিজ্ঞতা আমার বাকি আছে। “
ক্যামেলিয়া এবার চোখ তুলে সরাসরি আরোণের পানে তাকিয়ে বলে উঠে,
“ এই মৃত্যুর পথ খুঁজতেই তুমি প্রায়ই প্রাসাদ থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে যাও। একে একে ঘুরে বেড়াও বিভিন্ন জাদুকর এবং জোতিষ্যিদের নিকট। তাই না, বাবা? “
আরোণ চমকে তাকায়। ক্যামেলিয়ার মুখভঙ্গি স্বাভাবিক। আরোণ প্রশ্ন করে,
“ আমার পিছু নিতে তুমি? “
“ উঁহু। তোমার অনুমতি ব্যতীত তোমার ডায়েরিটা পড়েছি। সেটা পড়ে আন্দাজ করে নিয়েছি তুমি প্রায়ই কোথায় যেতে পারো। “
আরোণ মেয়ের স্বীকারোক্তি শুনে বলে,
“ ভালো আন্দাজ করতে শিখেছো তো! “
“ তুমি সত্যিই মৃত্যুর উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছো, বাবা? “
প্রশ্নটা ধরা গলায় করে ক্যামেলিয়া। আরোণ সত্যটা আর বলে না। আদৌতে সে কেবল নিজের মৃত্যুর পথ খুঁজে বেড়াচ্ছে না। সে-ই সঙ্গে ক্যামিকে একটা স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার পথও খুঁজছে। আরোণ মেয়ের দিকে নিরুত্তর তাকিয়ে রয়। ক্যামেলিয়া নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
“ আমি যদি বলি, তুমি যা খুঁজছো সেই উপায় আমার কাছে আছে? “
আরোণকে বিস্মিত দেখা যায়। ক্যামেলিয়া নেকড়েদের আলফার মৃত্যুর উপায় জানে? যেই উপায় কোনো জাদুকরের জানা নেই, সে-ই উপায় ক্যামেলিয়ার জানা আছে? কিভাবে? কি করে সম্ভব এটা?
আরোণ বলে উঠে,
“ কি সেই উপায়? “
ক্যামেলিয়া গলা ঝেড়ে বলে,
“ তার আগে তোমাকে একজনের সঙ্গে পরিচয় করানো জরুরী। “
কথাটুকু বলেই ক্যামেলিয়া চোখ বুজে নেয়। বিড়বিড় করে তন্ত্রমন্ত্র জাতীয় কিছু একটা পড়তে শুরু করে। আরোণ হতবাক হয়ে দেখছে মেয়েকে। ক্যামি তন্ত্র শিখেছে? কার কাছ থেকে? আরোণ বেশিক্ষণ ভাবার সুযোগ পায় না। ক্যামেলিয়ার মন্ত্র পাঠের সঙ্গেই চারিপাশের স্থির পরিবেশটা অস্থিতিশীল হয়ে উঠে। তীব্র বাতাস বইতে শুরু করে চারিপাশে। বাতাসের সঙ্গে কারো অদৃশ্য কারো অস্তিত্ব অনুভব করে আরোণ। হুট করেই অদৃশ্য সত্তাটা ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,
“ আমাকে স্মরণ করেছো, ক্যামেলিয়া? “
আরোণ উঠে দাঁড়ায়। কৌতূহলী দৃষ্টি মেলে চারিপাশে তাকায়। এই কণ্ঠের উৎস খুঁজে পাচ্ছে না সে। ক্যামেলিয়া মন্ত্র পড়া থামিয়ে চোখ মেলে তাকায়। উঠে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক স্বরে বলে,
“ দেখা দাও। “
আরোণ অপ্রস্তুত স্বরে প্রশ্ন করে,
“ এসব কি হচ্ছে, ক্যামি? “
ক্যামেলিয়া পিতার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে শূন্যে তাকিয়ে বলে,
“ দেখা দাও বলছি। “
এবার ধীরে ধীরে তাদের সামনে একটা ছায়া উদয় হয়ে তা মনুষ্য রূপ নিতে শুরু করে। আরোণ কপালে ভাজ নিয়ে দেখতে থাকে গোটা দৃশ্যটা। তবে ধীরে ধীরে তার কপালের ভাজটা মিলিয়ে যায়। পরিচিত একটা চেহারা তার সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কি আশ্চর্য!
ছায়াটা সম্পূর্ণ মানুষের রূপ ধারণ করতেই আরোণ হতবাক ভঙ্গিতে এক কদম পিছিয়ে যায়। তার দৃষ্টিতে কেবল অবিশ্বাসের লেশ। অস্ফুটে বলে উঠে,
“ বাবা! “
ওরেল রদ্রিগেজ মৃদু হেসে বলে,
“ অবশেষে আমাদের দেখা হলো, আরোণ। “
আরোণ তখন অবিশ্বাস নিয়ে নিজের মেয়ের পানে তাকায়। এই লোকটাকে দেখে সে যতটা না চমকেছে তার থেকে বেশি সে অবাক হচ্ছে এটা ভেবে, যে এই লোকের সঙ্গে ক্যামির কি সূত্র রয়েছে?
__________
শা শা করে বাতাস বৈছে। অরণ্যের বুকে তীব্র গতিতে ছুটছে ঘোড়া। ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা বেহজাদ দুই হাতে ঘোড়ার লাগাম ধরে রেখেছে। তার দু হাতের বেষ্টনীর মাঝে বসে আছে নাওমি। একটু আগেও নিজের মৃত্যুর কথা ভেবে কান্না করা মেয়েটা এখন অনেকটা ধাতস্থ হয়েছে। কিছুটা আগ্রহ নিয়েই দেখে চলেছে কালের পরিক্রমায় ঘন জঙ্গলে রূপান্তর হওয়া ট্রান্সেলভেনিয়াকে।
বেহজাদেরও ট্রান্সেলভেনিয়াই দেখার কথা ছিলো। তবে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার দৃষ্টি ঘুরেফিরে নাওমির মুখপানে গিয়ে স্থির হচ্ছে। বাতাসের বেগে উড়তে থাকা নাওমির চুলগুলো এসে হুটহাট তার মুখের উপর পড়ছে। সোনালী রঙা এই চুলগুলো এবং আকাশে উদিত চাঁদের আলোর মাঝে খুব একটা পার্থক্য খুঁজে পায় না বেহজাদ। দুটোকেই তার একই রঙের মনে হয়।
নাওমির প্রতি মগ্ন হওয়া বেহজাদ অসাবধানবশত ঘোড়ার লাগাম কিছুটা ঢিলে ছেড়ে দেয়। মুহুর্তেই ঘোড়া বেলাগাম ভঙ্গিতে দৌড়ের মাঝে লাফিয়ে উঠতেই, বেহজাদ এবং নাওমি দু'জনেই তাল হারিয়ে চলন্ত ঘোড়ার পিঠ হতে পড়ে যায়। পড়ে যাওয়ার মুহূর্তে সম্বিত ফিরে পেতেই বেহজাদ নিজের ডান হাতটা নাওমির মাথার নিচে এগিয়ে দেয়। সৌভাগ্যবশত এতে নাওমি মাথায় আঘাত পাওয়া হতে বেঁচে যায়। ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে বেহজাদের মতো শক্তপোক্ত যুবরাজের কিছু না হলেও, নাওমি নিজের পায়ের জখমে চোট পায়। সে চোখ বুজে মৃদু আর্তনাদ করে উঠে।
বেহজাদের সঙ্গে সঙ্গে খেয়াল হয় নাওমির পায়ের কথা। সে নাওমির দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে প্রশ্ন করে,
“ বেশি ব্যথা করছে? “
নাওমি পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায়। ব্যথা কিছুটা করছে, তবে তা সহনীয় পর্যায়ে। আপাতত তার মনযোগ আর সেই ব্যথার দিকে নেই। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখছে মুক্ত আকাশে অসংখ্য নক্ষত্রপুঞ্জির মেলা। উপরে খোলা আকাশ এবং জমিনে ঘন জঙ্গলের মাঝে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা নাওমি। মাথার এবং ঘাড়ের নিচটায় বালিশের বদলে রয়েছে বেহজাদের শক্ত হাতখানা৷ এরকম অভিজ্ঞতা নাওমির ইতিপূর্বে হয় নি কখনো।
নিরুত্তর নাওমির মুগ্ধ দৃষ্টি বেহজাদ লক্ষ্য করে। অনুভব করে প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতি নাওমির টান। ঘোড়াটা কিছুদূর গিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। বেহজাদও এবার নিজের মাথাটা জমিনে এলিয়ে দিয়ে আকাশ দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পাশ হতে নাওমির কৌতূহলী কণ্ঠস্বর ভেসে আসে,
“ দেখো, দেখো। ওই বড়ো নক্ষত্রটাকে দেখো। কি সুন্দর জ্বলজ্বল করছে! “
বেহজাদ ঘাড় ঘুরিয়ে নাওমির দিকে তাকিয়ে জবাব দেয়,
“ দেখছি। “
“ জানো? আমার ছোটবেলা থেকেই এই ট্রান্সেলভেনিয়ার প্রতি অনেক আগ্রহ ছিলো। কিন্তু কড়া বিধি ডিঙিয়ে কখনো ট্রান্সেলভেনিয়ায় কদম রাখার সাহস করা হয়ে উঠে নি। তাছাড়া কিছুটা গা ছমছমে ভাবও কাজ করতো এই জায়গার কথা ভাবলে। ইতিহাস অনুসারে জায়গাটা খুব একটা সুবিধার না৷ “
বেহজাদ সামান্য আগ্রহী স্বরে প্রশ্ন করে,
“ সুবিধার নয় বলতে? শতাব্দী পূর্বে প্লেগ মহামারীতে মারা যাওয়া মানুষদের প্রেতাত্মার কথা বলছো? নাকি তোমাদের সাম্রাজ্যের ওই তথাকথিত রক্তচোষাদের কথা বলছো? “
নাওমিকে এবার কিছুটা গম্ভীর দেখা যায়। সে পাশ ফিরে বেহজাদের চোখে চোখ রেখে বলে উঠে,
“ তথাকথিত নয়, এ-ই সাম্রাজ্যে সত্যিই ভ্যাম্পায়াররা ছিলো। আমার বাবাও ভ্যাম্পায়ারদের একজন ছিলেন। আর এখানে প্রেতাত্মাদের আনাগোনার ঘটনাও মিথ্যা নয়। অনেক গা হীম করা ঘটনা ঘটেছে এই ট্রান্সেলভেনিয়ায়। মুক্তি না পেয়ে অসংখ্য অতৃপ্ত আত্মা এখনো এখানে ঘুরে বেড়ায়। “
বেহজাদ নাওমির বলা কথা আমলে না নিয়ে খানিকটা উপহাসের সুরে বলে,
“ তোমার পিতা ভ্যাম্পায়ার ছিলো? তারমানে তুমি ভ্যাম্পায়ারের কন্যা? আমার কি তবে এখন থেকে তোমাকে রক্তচোষা মেয়ে বলে ডাকা উচিত? “
নাওমি ক্ষুদ্ধ স্বরে প্রতিবাদ করে,
“ আমি রক্তচোষা নই। যদি আমার কাছে ভ্যাম্পায়ারদের ক্ষমতা থাকতো তাহলে সবার আগে আমি তোমার রক্ত খেতাম। তখন বুঝতে আমাকে অপহরণ করার শাস্তি কতটা ভয়ংকর হয়! “
বেহজাদ কথা ঘুরিয়ে বলে,
“ তোমার রূপকথার গল্প তোমার কাছে রাখো, মেয়ে। এসব রক্তচোষা এবং প্রেতাত্মা বলতে কিছু হয় না। জ্বিন সত্য তবে প্রেতাত্মা নয়। “
নাওমির কপালে ভাজ দেখা গেলো। সে প্রশ্ন করে,
“ জ্বিন কি জিনিস? “
বেহজাদ এ-ই প্রশ্ন এড়িয়ে গেলো না আর। সে আকাশের পানে তাকিয়ে বলতে থাকে জ্বিন জাতি সম্পর্কে। নাওমি কৌতূহল নিয়ে তার পানে তাকিয়ে শুনছে সবটা। যতই শুনছে ততই অবাক হচ্ছে সে। এই জগতের কতো কিছুই তার অজানা! এই সব অজানার প্রশ্নোত্তর কি এই লোকটার জানা আছে? হুট করেই বেহজাদকে কোনো অপহরণকারী বলে মনে হচ্ছে না নাওমির। বরং তার মনে হচ্ছে বেহজাদ হচ্ছে তার জীবনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ কোনো চরিত্র। যার উপস্থিতিতে নাওমি জীবনের কাঙ্ক্ষিত সকল অভিজ্ঞতা গুলো উপভোগ করতে পারে।
চলবে…