প্রণয়তিথি
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৩৮.
পাঁচটি ঘোড়া এসে থামে তুষ দূর্গের প্রধান ফটক দ্বারে। কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট গভীর নয়নে বাহির হতে দূর্গটাকে দেখতে থাকে। মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায় এক ঝাঁক বাদুড়। বহু বছর ধরে বন্ধ অবস্থায় থাকা জনমানবহীন এই দূর্গটাকে বাহির থেকে দেখে খুব ভুতুড়ে লাগছে। ইয়ানের শরীর লোম কেমন শিরশির করছে। এই দূর্গেই তার জন্ম হয়েছিলো! এই দূর্গের আঙিনাতেই একজন কাউন্ট রিকার্ডো আলবার্ট নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন! ভাবতেই একটা শীতল হাওয়ায় স্রোত তাকে জাপ্টে ধরছে।
কেভ, ক্লাডিয়াস সহ আরো দু'জন সৈন্য ইয়ানের পানে তাকিয়ে আছে। তারা কিছুটা হলেও কাউটের আবেগের ঘনত্বটুকু আন্দাজ করতে পারছে। তা-ই এ-ই মুহূর্তে কাউন্টকে ডেকে বিরক্ত করছে না। তবে তারা না ডাকলেও ইয়ান নিজেই সম্বিত ফিরে পেলো। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘোড়া ছেড়ে নেমে দাঁড়ায়। কাউন্টের দেখাদেখি বাকিরাও ঘোড়া ছেড়ে নেমে।
ইয়ান ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়ায়। পুরনো জং ধরা লোহার এই ফটকটাকে দেখে কিছুটা অবাক হয় ইয়ান। ফটকের মুখে কোনো তালা ঝুলছে না কেন? দূর্গের প্রবেশদ্বারে কি কখনো কোনো তালা লাগানো হয় নি? পরিত্যক্ত শহর বলে এতটা অবহেলায় ছিলো এ-ই দূর্গটা?
মনে প্রশ্ন নিয়েই ইয়ান দু হাতে ফটকের গায়ে সামান্য ধাক্কা দেয়। সঙ্গে সঙ্গে বিরক্তিকর একটা শব্দ তুলে জং ধরা ফটকটা মধ্যে দিয়ে খুলে যায়। ইয়ান একটা বড়ো নিঃশ্বাস টেনে নিয়ে ভেতরে প্রথম কদম রাখে। বরফে আচ্ছাদিত আঙিনায় এক কদম এক কদম করে এগিয়ে যাচ্ছে কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট। কিছুটা সামনে গিয়েই হঠাৎ পা জোড়া থেমে যায় তার। চোখের সামনে ভেসে উঠে একটা শুনে আসা দৃশ্য। দূর্গের প্রধান দ্বার দিয়ে এক গর্ভবতী রমণী দৌড়ে বের হচ্ছে। ভারী পেটের কারণে ঠিকঠাক দৌড়াতে পারছে না সে। নিঃশ্বাসে টান পড়ছে, অল্পতেই হাঁপিয়ে যাচ্ছে। নারীটা ইয়ানের সামনে দিয়েই উদ্ভ্রান্তের ন্যায় ছুটতে ছুটতে ঠিক আঙিনার ডান পাশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার সোনালী চুলগুলো এলোমেলো ভঙ্গিতে উড়ছে।
ইয়ান ঘাড় ঘুরিয়ে দৌড়ে যাওয়া নারীকে নিজ দৃষ্টিতে অনুসরণ করে। সঙ্গে সঙ্গে তার হৃৎযন্ত্র থমকে যেতে চায়। ওইতো, ওইতো এক অতি সুন্দর পুরুষ দাঁড়িয়ে! পুরুষটার দৃষ্টি মাটিতে নিবদ্ধ। দেহ থেকে কেমন আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে! হঠাৎ রমণীর পা থমকে যায়। পুরুষটা নিজের শার্টের বোতাম খুলছে এক এক করে।
দৃশ্যটা দেখতেই ইয়ান নিজের মনে অদ্ভুৎ এক উদ্দীপনা অনুভব করে। রমণীটা কিছু একটা উপলব্ধি করে যে-ই না দৌড়ে এগিয়ে যেতে নিবে তৎক্ষণাৎ একটা লোক পিছন থেকে ছুটে এসে তার হাত ধরে বাঁধা দেয়। ইয়ান চিনে এই লোকটাকে। জোসেফ!
সোনালী চুলের রমণীটা প্রাণপণে চিৎকার করে সবুজ নেত্রের ওই পুরুষকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু কোনো লাভ হয় না। এক পর্যায়ে রমণী নিজের অনাগত সন্তানের দোহাই অব্দি দেয়। তবে সে-ই দোহাইও পুরুষটাকে ফেরাতে পারে না। সে যা করতে চলেছে তা তো নিজের সন্তানের জন্যই!
অসীম সুন্দর পুরুষটা সূর্যের আলোর সংস্পর্শে ধীরে ধীরে আগুনের ফুলকিতে রূপ নেয়। আগুনের ফুলকি গুলো কেমন ছাঁই হয়ে বাতাসে মিশে যাচ্ছে! ইয়ানের দৃষ্টি ছলছল করে উঠে। তার ইচ্ছে করছে ছুটে গিয়ে নিজের জন্মদাতাকে বাঁচাতে। তবে তার পূর্বেই কেউ একজন পেছন হতে ইয়ানকে ডাকে,
“ কাউন্ট! “
ইয়ান সঙ্গে সঙ্গে ফিরে তাকায়। প্রধান সেনাপতি কেভ দাঁড়িয়ে। বোধহয় ইয়ানের অতীত জীবনে হারিয়ে যাওয়াটা সে আন্দাজ করতে পেরেছে। তবে অপচয় করার মতো হাতে সময় নেই তাদের। তাই সাহস করে বলে,
“ দূর্গের ভেতর একবার গিয়ে খুঁজে দেখবেন না? “
ইয়ান বুঝতে পারে এতক্ষণ তার ভ্রম হচ্ছিলো। নাওমির কথা মনে পড়তেই সে মাথা নেড়ে ভেতরে প্রবেশ করার জন্য পা বাড়াতে নেয়। তবে ঠিক সে-ই মুহুর্তেই পেছন থেকে ক্লাডিয়াসের গলা ভেসে আসে,
“ কাউন্ট! জলদি আসুন। দেখে যান। “
__________
ট্রান্সেলভেনিয়ার প্রান্তরে কৃষ্ণ সমুদ্রের তীরে বিভিন্ন বিশাল উঁচু নিচু পাথর ডিঙিয়ে এসে একটা নিরাপদ গুহা খুঁজে পেয়েছে বেহজাদ। ঘোড়াটাকে দূরে অন্য পথের দিশার কাজটায় বেধে রেখে এসেছে সে। আপাতত এর থেকে বেশি আর কোনো নিরাপদ জায়গা খুঁজে পায় নি সে। মনে মনে প্রার্থনা করে যাচ্ছে, সৈন্যরা যেনো খুঁজতে খুঁজতে সমুদ্রের তীরে এসে না পৌঁছায়। আর পৌঁছালেও যেনো ওই ঘোড়াটাকে দেখে ভুল দিশায় চলে যায়।
এই ঘুটঘুটে অন্ধকার গুহাটার ভেতর ভয়ে গুটিয়ে আছে নাওমি। তার কেনো যেনো মনে হচ্ছে গুহার ভেতরে তাকে অনেকগুলো চোখ আড়াল হতে পরখ করছে। যদিও বেহজাদ শুরুতেই গুহাটা ভালো করে পরীক্ষা করে নিয়েছিলো। ভেতরে সাপ কিংবা কিছু না থাকায় নিশ্চিন্তে নাওমিকে নিয়ে থাকার জন্য এই জায়গাটা বেছে নিয়েছে। তবুও নাওমির কেমন অদ্ভুৎ লাগছে।
বেহজাদ গুহার অগ্রভাগে পাথরের সঙ্গে ঠেক দিয়ে বসে চোখ বুজেছিলো। খুব ক্লান্ত লাগছে তার। খিদেও পেয়েছে খুব। খিদে অনুভব হতেই বেহজাদের জেইলানের কথা মনে পড়ে। তার বোন খেয়েছে কি-না কে জানে! আলবার্টরা কি কয়েদিদের খাবার দেয়? নাকি আহারটুকুও দিতে কিপ্টেমি করে ওই জাহিলগুলো?
চাঁদের ওই মৃদু মিঠে আলোটা কেবল গুহার অগ্রভাগ পর্যন্ত আসছে। ওই সামান্য আলোতেই আঁধারে বসে থাকা নাওমি বেহজাদকে লক্ষ্য করতে থাকে খুটিয়ে খুটিয়ে। চোখে মুখে কেমন একটা হতাশার ছাপ! কি হয়েছে এই লোকের? হুট করে এতটা হতাশ কি নিয়ে?
নাওমির ভাবনার মাঝেই বেহজাদ চোখ বুজে রেখেই প্রশ্ন করে,
“ ঠান্ডা লাগছে? “
নাওমি কিছুটা চমকায়। ঠান্ডা তো তার লাগছে। এই পাতলা কাপড়ে শীত মানে নাকি? তবে উত্তরটুকু দিতে আড়ষ্টভাব কাজ করছে তার মাঝে। বেহজাদ অবশ্য উত্তরের অপেক্ষা করলো না। নিজের বুকের কাছে বাধা ক্লকের বাধনটা খুলে ক্লকটা নাওমির দিকে এগিয়ে দেয় নীরবে। নাওমি অবশ্য ফিরিয়ে দেয় না। ক্লকটা নিজের শরীরে পেচিয়ে নিতে নিতে প্রশ্ন করে,
“ তোমার বোন কোথায়? জেইলান? ওকে আজ সারাদিনে কোথাও দেখি নি। “
বেহজাদ জবাব দেয় না কোনো। চোখ বুজে মুখ টিপে পড়ে রয়। নাওমির মুখটা কালো হয়ে যায়। সে প্রশ্ন করে,
“ প্রাসাদে গিয়েছে? আমার পরিবারের ক্ষতির উদ্দেশ্যে? কাকে খুন করবে প্রথমে? “
বেহজাদ এ দফায় চোখ মেলে নাওমির পানে তাকায়। এবারও নিরুত্তর সে। কি জবাব দেবে? যেখানে তার বোনের নিজের জীবনই হুমকির মুখে, সেখানে আলবার্টদের কি-ই বা ক্ষতি করার আছে? নাওমি আবারও বলে,
“ চুপ থেকো না। জবাব দাও। বলো, তোমাদের পরিকল্পনা কি? “
বেহজাদ নিষ্প্রাণ স্বরে জবাব দেয়,
“ জীবন পরিকল্পনা মেনে চলে না। “
নাওমি কথার অর্থটা ঠিক বুঝতে পারে না। কি ইঙ্গিত করতে চাইছে এই লোক? বেহজাদ অবশ্য নাওমিকে এতোকিছু ভাবার সময়ও দেয় না। সে কথা ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“ গলায় এখনো ব্যথা আছে? “
নাওমি কিছুটা অপ্রস্তুত বোধ করে। প্রশ্নটা করার সময় বেহজাদের কণ্ঠে কিছুটা আগ্রহ খুঁজে পেয়েছে সে। বেহজাদ কি তার ভালো মন্দ জানতে আগ্রহী? নাওমি জবাব দেয়,
“ জ্বলছে এখনো। “
বেহজাদ হতাশ গলায় বলে,
“ তাড়াহুড়োতে খেয়াল ছিলো না। তোমার জন্য তৈরী করা ভেষজ ওষুধ গুলো সাথে করে নিয়ে আসা উচিত ছিলো। লাগিয়ে নিলে কাটা জায়গাটা এখন জ্বলতো না। “
বেহজাদের এই সামান্য বলাটাই নাওমির জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। সে আর ওষুধের জন্য মন খারাপ করে না। বরং কথা ঘুরিয়ে প্রশ্ন করে,
“ আমরা এখানে কেন এসেছি? “
বেহজাদ তাকাতেই নাওমি ভেঙে বুঝিয়ে ফের প্রশ্ন করে,
“ মানে ডাকাতরা তো দূর্গ লুট করতে এসেছিলো। ওরা এসে দূর্গ লুট করে চলে যেতো। আমরা আশেপাশে কোথাও লুকালেও পারতাম। এমনকি এখনো এতো গোপনীয়তার প্রয়োজন দেখছি না। ডাকাতরা তো আর সমুদ্রের তীরে আসবে না, তা-ই না? “
নাওমির প্রশ্নটা অযৌক্তিক নয়। মেয়েটার এতটুকু বুদ্ধিমত্তায় বেহজাদ মনে মনে খুশি হয়। অতঃপর বুঝিয়ে উত্তর দেয়,
“ এরা একই দলের ডাকাত সদস্য হতে পারে। আমি ওদের দলের তিনজন সদস্যকে খুন করেছি। ওরা এসে এটা দেখে নিশ্চয়ই খুশি হবে না? আমাদের মারার চেষ্টা করবে। পিছু করতে করতে এখানে চলে এলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। “
নাওমি কিছুটা ভীত হয়ে বলে,
“ সত্যিই, এখানে চলে আসতে পারে? “
বেহজাদ মৃদু হেসে বলে,
“ ভয় পাচ্ছো? তোমাকে মানায় না। বেশ ভালো তলোয়ার চালাতে জানো। আত্মরক্ষা করতে পারবে না? আর আমি তো আছিই। “
এবারও ভালো লাগায় নাওমির দৃষ্টি নত হয়ে আসে। বেহজাদ আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
“ সমুদ্রের তীরে আগে কখনো এসেছো? “
“ বন্দরে গিয়েছি। জাহাজ ঘুরে প্রাসাদে ফিরে গিয়েছি। কখনো সমুদ্রের পানি ছুঁয়ে দেখা হয় নি। “
বেহজাদ কিছু পল নীরব থেকে কিছু একটা ভাবে। অতঃপর হাত পা ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
“ এসো। “
নাওমি প্রশ্নবোধক দৃষ্টি মেলে জিজ্ঞেস করে,
“ কোথায়? “
“ সমুদ্রের সামনে বসে থেকে সমুদ্র বিনা ছুঁয়ে, বিনা অনুভব করে ফিরে যেতে চাও? “
নাওমি কিছুটা আপ্লুত হয়। সে নাকোচ করে না। বেহজাদের হাত ধরে জমিন ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ধীর পায়ে গুহা থেকে বেরিয়ে আসে। এইতো! সামনে অথৈ সমুদ্র। চাঁদের আলোয় কি অপরূপ দেখাচ্ছে! নিজের জুতা খুলে রেখে এসে পাথরের উচ্চতা ডিঙিয়ে সমুদ্রের সমতল তীরে নামে বেহজাদ। তার দেখাদেখি নাওমিও নিজের জুতো খুলে গুহার ভেতরটায় রেখে আসে। উঁচু পাথরের উপর উঠে বসলেও নিচে নামতে কিঞ্চিৎ ঘাবড়াচ্ছে সে। পানি পা রাখতেই যদি পা পিছলে যায় তার?
নাওমির ভয়টুকু নীরবে বুঝে নিয়ে বেহজাদ দু'হাতে তার কোমর আগলে ধরে তাকে সমুদ্রে নামতে সাহায্য করে। পানির সংস্পর্শে আসতেই নাওমি প্রথমে লাফিয়ে উঠে। কৃষ্ণ সাগরের পানি অনেক ঠান্ডা হয় সে শুনেছিলো। কিন্তু তাই বলে এতো ঠান্ডা? বেহজাদ বলে,
“ কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকো। সয়ে যাবে ঠান্ডাটা। শীতকাল হওয়ায় এতো ঠান্ডা লাগছে পানি। “
নাওমি এক পা বাড়িয়ে সমুদ্রের বুকে হাঁটতে চাইলেই বেহজাদ সতর্ক করে,
“ এদিকটায় পাথর খুব। সাবধানে হাঁটো। ধারালো পাথরে পা পড়লে কিন্তু পা কেটে যাবে। “
এই সতর্ক বার্তা শুনে নাওমি আর পা বাড়ায় না। স্থির দাঁড়িয়ে রয় বেহজাদের পাশে। সমুদ্রে সে পা ডুবাতে পেরেছে এইটুকই তার জন্য যথেষ্ট। সমুদ্রকে অনুভব করতে করতে নাওমি প্রশ্ন করে,
“ এতো কিছু কিভাবে জানো তুমি? অপহরণকারী বাদে আর কোনো পেশা আছে তোমার? নিজের দেশে থাকতে কি করতে তুমি? “
যেহেতু নাওমির উপর নজর রাখতে আজকের রাতটা জেগেই পাড় করতে হবে বেহজাদের তাই সে গল্পে মশগুল হয়ে জবাব দেয়,
“ ডুবুরি আমি। সমুদ্রের গহীনে গিয়ে ঝিনুক কুড়াই। সেই ঝিনুকের মুক্তা সংগ্রহ করে অলংকার বানিয়ে বিক্রি করি। “
বেহজাদের সাজিয়ে বলা মিথ্যাটা নাওমি বিশ্বাস করে নেয়। সে আগ্রহী গলায় বলে,
“ সত্যিই? তুমি ডুবুরি? সমুদ্রের ভেতরের জগৎটা দেখেছো? কেমন দেখতে? মাছ কখনো কামড় দেয় নি তোমাকে? “
নাওমির বোকার মতো করা শেষ প্রশ্নটা শুনে বেহজাদ হেসে জবাব দেয়,
“ পুচকে মাছ হয় বেশিরভাগ। কামড় কেবল হিংস্র মাছেরা দেয়। তবে তারা সমুদ্রের বেশ গভীরে থাকে। সমুদ্রের কথা বাদ দাও। তোমাকে ঝিনুক সম্পর্কে প্রচলিত একটা মজার ঘটনা বলি। “
নাওমি সম্পূর্ণ মনযোগ দিয়ে বেহজাদের দিকে তাকায়। বেহজাদ বলতে শুরু করে,
“ বলা হয়ে থাকে যে একটা ঝিনুক ততক্ষণ পর্যন্ত মুক্তা উৎপাদন করে না যতক্ষণ না ঝিনুকটা কোনোভাবে আঘাত পায়৷ মুক্তা হলো মূলত একটা সেরে যাওয়া ক্ষত। যখন কোনো জ্বালাকর পদার্থ ঝিনুকের ভেতর প্রবেশ করে, তখন মুক্তা উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। নিজেকে প্রবেশকৃত ওই জ্বালাকর পদার্থের থেকে রক্ষ করার জন্য, ঝিনুক একটি মসৃণ, চকচকে পদার্থের স্তর নিঃসরণ করে, যা সময়ের সঙ্গে অনুপ্রবেশকারীকে আবরণ করে। এই প্রক্রিয়া ঠিক ততক্ষণ চলতে থাকে যতক্ষণ না একটা সুন্দর মুক্তা তৈরী হয়। সুতরাং কি বুঝলে? একটি অবাণ্ঞ্ছিত কিছু হতে মূল্যবান মুক্তার সৃষ্টি। এবং একটি ঝিনুকের মূল্য নির্ধারিত হয় সে কতো বেশি মুক্তা উৎপাদন করেছে সেটার উপর ভিত্তি করে। “
নাওমি মন দিয়ে পুরো কথাটুকু শুনে। কি চমৎকার বিশ্লেষণ! এই বিশ্লেষণটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে আদৌ কতটুকু গ্রহণযোগ্য নাওমির জানা নেই। তবে বেহজাদের বলার ধরনের কারণে এই ব্যাখাটুকু বেশ গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে তার। বেহজাদ আরো কিছু বলতে নেয়। তবে ঠিক সে-ই মুহূর্তে দূর হতে কিছু ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি শোনা যায়। বেহজাদ এবং নাওমি দ্রুত সতর্ক হয়ে যায়।
বেহজাদ কোনো কথা না বলে দ্রুত নাওমিকে নিয়ে গুহার দিকে এগিয়ে যায়। গুহার ভেতর প্রবেশ করেই নাওমিকে পাথরের সঙ্গে ঠেকিয়ে তার মুখোমুখি দাঁড়ায় তাকে আড়াল করে। সামান্য উঁকি দিয়ে বেহজাদ পরখ করছে আসন্ন ঘোড়াগুলোকে। দুটো ঘোড়ায় করে দু'জন সৈন্য এসে থেমেছে সমুদ্র তীরে। অর্থাৎ বেহজাদের অনুমান ভুল ছিলো না। নিশ্চিত এরা প্রিন্সেস নাওমির খোঁজ করে বেড়াচ্ছে।
সৈন্য দুটো সমুদ্রের তীরের ওপাশটা ভালো করে ঘুরে ঘুরে দেখছে। বেহজাদ সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা ভাবুক হয়ে যায়। নাওমি এই ফাঁকে মাথা বের করে ডাকাতদের দেখতে চায়। তবে বেহজাদ সে-ই সূযোগ দেয় না। একহাতে তার গাল ছুঁয়ে নিজের দিকে ফিরিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,
“ হুশ! মাথা বের করো না। ওরা দেখে ফেলবে। “
বেহজাদের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ছোঁয়ায় নাওমি অপ্রস্তুত হয়। দ্বিধা নিয়ে বেহজাদের পানে তাকায়। বেহজাদও সে-ই মুহূর্তে তার দিকেই তাকিয়ে ছিলো। হুট করে কি হলো কে জানে! নাওমির দৃষ্টিতে সম্মোহনের ছাপ খুঁজে পায় বেহজাদ। কিছুটা বোধহয় এলোমেলো হয় সে। সীমার বলিরেখা টপকে কে প্রথম চুমু খেয়েছিলো সেটা জানা যায় নি। সমুদ্রের কল্লোল ধ্বনি কেবল ভেসে বেড়ায় বাতাসে।
চলবে…