প্রণয়তিথি
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৪০.
গতরাতের পর থেকে বেহজাদ এবং নাওমি সরাসরি একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে না ভুলেও। টুকটাক প্রয়োজনীয় যতটুকু কথা হয়েছে দু'জনের মাঝে, সেটাও দৃষ্টি নত রেখেই সম্পন্ন করেছে তারা। আপাতত ঘোড়ায় করে তারা তুষ দূর্গের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। দু'জনের ভাবখানা এমন যেনো কেউ কাউকে চিনেই না। ভুলক্রমে তারা এক ঘোড়ায় চড়ে বসেছে।
তুষ দূর্গের কাছাকাছি যেতেই বেহজাদ ঘোড়ার গতি ধীর করে। সতর্ক দৃষ্টি তার চারিপাশটা পরখ করছে। নীরব নিস্তব্ধ চারিপাশ। যেনো কোথাও কারো উপস্থিতি নেই। বেহজাদের মনে প্রশ্ন জাগে। আব্দুল এবং কেরেম কি এখনো ফিরে নি? গতরারে পালাতে সক্ষম হয়েছিলো তো তারা? নাকি সৈন্যদের হাতে ধরা পড়েছে।
ট্রান্সেলভেনিয়া ব্যতীত আর কোনো নিরাপদ জায়গা নেই যেখানে নাওমিকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবে বেহজাদ। তাই পরিস্থিতি বুঝার জন্য তুষ দূর্গে ফিরে আসাটা জরুরী ছিলো তার জন্য। যদিও একা আসতে পারলে বেশি ভালো হতো। তবে নাওমিকে একা গুহায় রেখে আসার ভরসা পাচ্ছিলো না সে। এই মেয়ে কখনোই বেহজাদের ফেরার অপেক্ষায় চুপচাপ বসে থাকতো না। বরং অবশ্যই পালানোর চেষ্টা চালাতো।
দূর্গের প্রধান ফটকের নিকটে আসতেই বেহজাদ দেখতে পায় লোহার জং ধরা ফটকটা সম্পূর্ণ খোলা। বেহজাদ নিশ্চিত হয় গতরাতে সৈন্যরা এসে গোটা দূর্গের তল্লাশী নিয়েছিল। বেহজাদের হঠাৎ চোখ যায়, দূর্গের আঙিনার পানে। বরফে ঢাকা যেই জায়গাটায় আব্দুল এবং কেরেম মাটি খুড়ে তিন ডাকাতের লাশ দাফন করেছিল, ঠিক সে-ই জায়গাটার অবস্থা আগের মতো নেই। অর্থাৎ? সৈন্যরা কি মাটি খুড়ে ডাকাতদের লাশ খুঁজে পেয়েছে?
সন্দেহ জেকে ধরতেই বেহজাদ আর ঘোড়ার পিঠ থেকে নামে না। ধীরে ধীরে ঘোড়াকে পিছিয়ে নিতে থাকে সে। নাওমি অবাক হয়। না চাইতেও জানতে চায় কি হয়েছে? বেহজাদ উত্তর দেয় না। সে চারিপাশে দৃষ্টি বুলাতে বুলাতে ঘোড়া ঘুরিয়ে নিতে থাকে। ঠিক এমন সময়ই কোথাও থেকে একটা তীর ছুটে এসে তাদের সামনে মাটিতে গিয়ে গাঁথে। নাওমি চমকে উঠে। ঘোড়ার পায়ের গতি বৃদ্ধি পায়। দূর্গের ভেতর জানালার আড়াল হতে একের পর এক তীর ছুটে আসতে থাকে বেহজাদের দিকে। বেহজাদ দ্রুত মাথা নত করে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে থাকে।
নাওমির জানা নেই আড়াল হতে কারা তাদের দিকে তীর ছুড়ছে। সে কেবল শুনলো হুট করে বেহজাদ আর্তনাদ করে উঠে। নাওমি চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকায়। ভীত দৃষ্টিতে দেখে বেহজাদের বাম হাতে এসে বিদ্ধ হওয়া তীরটাকে। সে নিজেও ঈশ্বরের নাম নিয়ে চেঁচিয়ে উঠে। বেহজাদের বাম হাত থেকে ঘোড়ার লাগাম ছুটে গিয়েছে। সে তীর বিদ্ধ হাত নিয়েই আবার লাগামটা ধরতে নিবে ঠিক সে-ই মুহূর্তে নাওমি নিজেই দু হাতে লাগামটা নিজের আয়ত্তে বুঝে নেয়। তার আন্দাজ মতে তীর ছোঁড়া ব্যক্তিগুলো আর কেউ নয় বরং ডাকাত দল। তাদের নাগাল থেকে পালানো খুব গুরুত্বপূর্ণ। তা-ই সে দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে নিজের পিছনে বসে থাকা বেহজাদকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে,
“ আমাকে ধরে শক্ত হয়ে বসো। আমি ঘোড়ার লাগাম সামলাচ্ছি। তোমার বাম হাতটা নাড়াচাড়া করো না। “
নাওমির পিছনে বসে থাকা বেহজাদ হাতের তীব্র ব্যথাটার মাঝেও নিজের সামনে বসে থাকা রমণীর পানে তাকায়। নাওমি মন থেকে বেহজাদের জন্য দুঃশ্চিন্তা করছে? এটা কি দূর্বলতার লক্ষ্মণ? বেহজাদ আর কিছু ভাবতে পারলো না। তার পূর্বেই সে অনুভব করলো, ঘোড়া চালানোর মাঝে নাওমি নিজেই বেহজাদের ডান হাতটা টেনে নিয়ে নিজের পেটের কাছে রাখলো। কিছুটা জেদি গলায় বলে,
“ সামলে বসো। গতি বাড়াচ্ছি আমি। চিন্তা করো না, ডাকাতরা আমাদের নাগাল পাবে না। “
বেহজাদ সামলে বসে। একটুও চিন্তা করে না সে। তার সঙ্গে রোমানিয়ার প্রিন্সেস মজুদ আছে। ডাকাত হোক কিংবা সৈন্য কেউ-ই তাদের পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে না। জেদি নাওমিকে হারানোর সাধ্যি তাদের কারো নেই।
__________
এক ঝাক সৈন্য দৌড়ে দূর্গের আঙিনায় নেমে এসেছে। প্রত্যেকে দ্রুত যার যার লুকিয়ে রাখা ঘোড়াগুলোকে দূর্গের পেছন থেকে বের করে এনে তাতে চড়ে বসতে তোড়জোড় চালাচ্ছে। প্রিন্সেস এবং ওই অপহরণকারীকে অনুসরণ করতে হবে তো! ক্লাডিয়াসও তার ব্যতিক্রম নয়। সে-ও নিজের ঘোড়ার কাছে দ্রুত কদমে এগোতে নেয়। তবে তাকে হাত ধরে বাঁধা দেয় প্রধান সেনাপতি কেভ। ক্লাডিয়াস ঘুরে তাকাতেই কেভ ক্রোধিত স্বরে বলে উঠে,
“ আমার কথা অমান্য করেছো কেনো, ক্লাডিয়াস? আমি কি বারবার করে বলি নি আমার আদেশ ব্যতীত তীর না ছুড়তে? তাহলে কেনো ছুড়েছো? এ-ই স্পর্ধার কি ব্যাখ্যা দিবে তুমি? হ্যাঁ? “
ক্লাডিয়াসও উত্তেজিত তখন। সে-ও কিছুটা অস্থির ভঙ্গিতে বলে উঠে,
“ ও-ই অপহরণকারীটা পালিয়ে যাচ্ছিলো। ওকে থামানো জরুরী ছিলো। তা-ই তীর ছুড়েছি। “
“ ও-ই অপহরণকারীর জিম্মায় প্রিন্সেসও ছিলো। প্রিন্সেসের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলার দুঃসাহস কিভাবে দেখালে তুমি? অতি তাড়ায় তীর ছুড়েছো, তা-ও ভুল নিশানায়। যদি তীরটা প্রিন্সেসের গায়ে লাগতো? তখন কি হতো? “
“ প্রিন্সেসকে আঘাত দেওয়ার নিয়ত নেই আমার। এখন দ্রুত চলুন, প্রধান সেনাপতি। অনুসরণ করা জরুরী ওদের। “
প্রধান সেনাপতি সঙ্গে সঙ্গে কড়া গলায় আদেশ করে,
“ অনুসরণের জন্য আমরা যথেষ্ট। তুমি ঘোড়া নিয়ে রাজধানীতে ফিরে যা-ও এইমুহূর্তে। তোমাকে কোনো প্রয়োজন নেই আমার। কেবল, এইটুকু মনে রাখবে যে কাউন্টের সাজিয়ে দিয়ে যাওয়া এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার সবটুকু দায়ভার তোমার। আগে নিজের বেপরোয়া আচরণে লাগাম টানতে শিখো, তারপর নিজেকে সৈন্য হওয়ার যোগ্য মনে করবো। “
ক্লাডিয়াস প্রতিবাদ করে বলতে নেয়,
“ কিন্তু আমি… “
প্রধান সেনাপতি নিজের ঘোড়ায় চড়ে বসতে বসতে কঠিন স্বরে বলে,
“ তর্ক করবে না, ক্লাডিয়াস। আমার আদেশ অমান্য করে নিজেকে ইতিমধ্যে অসভ্যের তালিকায় ফেলে দিয়েছো আপাতত রাজধানীতে ফিরতে ফিরতে ভাবো নিজের পিতাকে কি জবাব দিবে। উনাকে তোমার এই আদেশ অমান্য করার ব্যাপারটা অবশ্যই জানাবো আমি। উপযুক্ত শাসন প্রয়োজন তোমার। “
বাকি সৈন্যদের সঙ্গে প্রধান সেনাপতিও প্রস্থান করে। ক্লাডিয়াস দাঁড়িয়ে রয় আপন জায়গায়। রাগে তার পুরো শরীর কাঁপছে! প্রিন্সেসকে প্রায় পেয়ে গিয়েছিলো সে! ইশ! একটুর জন্য ফের প্রিন্সেসকে হারাতে হলো তার। এর মাশুল যদি প্রিন্সেস নাওমিকে গুণতে হয়, তবে ক্লাডিয়াস কক্ষনো নিজেকে ক্ষমা করবে না। কক্ষনো না!
__________
চিকিৎসালয়ের বিছানাটায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে জেইলান। মহিলা চিকিৎসকরা জেইলানের জামা বদলে দিয়ে, তাকে কিছুটা পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার খাইয়ে দিয়েছে। এখন তার পিঠের চিকিৎসা চলছে। কিন্তু জেইলান কেমন মৃত লাশের মতো শুয়ে আছে। উন্মুক্ত পিঠে লাগানো ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় তার মধ্যে কোনো হেলদোল দেখা যাচ্ছে না। তার কানে কেবল বাজছে কাউন্ট ইয়ান আলবার্টের বলে যাওয়া কথাগুলো,
“ নাওমির খোঁজ পেয়ে গিয়েছি। আমার বোন আজ প্রাসাদে ফিরে আসবে। তোমার সঙ্গে যুক্ত বাকি সহযোগীদের প্রাণ তোমার সামনেই নিবো আমি৷ “
ইয়ানের কণ্ঠস্বরে একটা অদৃশ্য নিশ্চয়তা ছিলো। অর্থাৎ সে আসলেই প্রিন্সেস নাওমির খোঁজ পেয়েছে। কিন্তু জেইলানের সকল চিন্তা নিজের ভাইজানকে নিয়ে। বেহজাদ ভাইজান যদি এই অমানুষদের হাতে ধরা খায়? তাহলে কি হবে? জেইলান নিজ চোখের সামনে নিজের ভাইজানের মৃত্যু মোটেও মেনে নিতে পারবে না। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রার্থনা করা ব্যতীত আর কোনো উপায় নেই তার কাছে।
__________
শীতকালীন প্রকৃতিটা এই দুপুরবেলায় হুট করে বৈরী রূপ ধারণ করেছে। সূর্য বিহীন আকাশটা ঘন কালো মেঘে ঢাকা গেলো। আবহাওয়ার সচরাচর নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বুঝি ঝড় শুরু হবে। ইতিমধ্যে তীব্র বাতাস শুরু হয়েছে। নাওমি যতটুকু দ্রুত সম্ভব খুঁজতে খুঁজতে একটা পুরনো চিলেকোঠার ঘর খুঁজে বের করে। ঘোড়া থেকে নেমে বেহজাদকে নামতে সাহায্য করে সে। অতঃপর দ্রুত ঘোড়াটাকে একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে দেয় সে।
নোংরা, পুরনো ঘরটাকে জাপ্টে ধরে ডালপালা বেয়ে উঠে গিয়েছে উপরের দিকে। এক প্রকার লতাপাতায় আচ্ছাদিত ঘরের চারিপাশটা। ঘরের দরজায় ঝুলছে একটা শত বছরের পুরনো জং ধরা তালা। নাওমি আশেপাশে খুঁজে একটা বড়ো পাথর এনে তালাটা ভাঙার চেষ্টা চালাতে থাকে। বেহজাদ তখন একটা গাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে হাত চেপে ধরে রেখেছে। যথাসাধ্য চেষ্টা করছে ব্যথাটা হজম করে নেওয়ার।
এতো পুরনো হওয়ায় দূর্বল তালাটাকে ভাঙতে বেশি সময় লাগলো না নাওমির। সে দরজা খুলতেই ঘরের ভেতরের অবস্থা দেখে ঘাবড়ে যায়। মাকড়সার বাসা এবং পোকামাকড় মিলিয়ে বেশ নোংরা অবস্থা। নাওমি দ্রুত একটা গাছের ডাল নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ে অন্তত একটা কোনা হলেও পরিষ্কার এবং বসার উপযোগ্য করতে। বেহজাদ লক্ষ্য করে নাওমির এই আচরণটা। মেয়েটা সত্যি সত্যিই তার জন্য চিন্তা করছে। কি অদ্ভুৎ!
পুরো ঘরের দরজা জানালা খুলে, ঘরের এককোণের দেয়াল এবং মেঝে কিছুটা পরিষ্কার করে নাওমি বেরিয়ে আসে। নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে প্রবেশ করা ময়লার কারণে তার কাশি উঠেছে। তবে সে নিজেকে সামলে নিয়ে বেহজাদকে ধরে ভিতরে নিয়ে যায়। বেহজাদ প্রবেশ করতেই দেখে এক কক্ষের এই ঘরটার বেশিরভাগ আসবাবপত্র প্রায় অব্যবহার যোগ্য।
নাওমি পরিষ্কার করে রাখা জায়গাটায় বেহজাদকে এনে দাঁড় করিয়ে, নিজের গায়ের ক্লকটা খুলে মেঝেতে বিছিয়ে দেয়। বেহজাদ ধুপ করে মেঝেতে বসে পড়তেই নাওমি তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে। নিজের মনে সাহস জুগিয়ে সে তীরটা শক্ত করে চেপে ধরে এক টানে বের করে ফেলে। বেহজাদ সঙ্গে সঙ্গে ব্যথাতুর স্বরে আর্তনাদ করে উঠে। বাম হাতের ক্ষত জায়গাটা হতে গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে। রক্ত দেখে নাওমি আবার ভীত হয়ে যায়। এবার কি করবে সে? এই ঘরে তো কোনো চিকিৎসা সামগ্রী নেই! ভেষজ গাছগাছালি! এসব সম্পর্কে তো নাওমির কোনো ধারণাই নেই। এই রক্তপাত থামানোর জন্য কি করা যেতে পারে?
অনভিজ্ঞ নাওমি বেহজাদের অনুমতি বিহীনই তার শার্টের বোতাম খুলতে শুরু করে। বেহজাদ ব্যথাটুকু খিচে সহ্য করে নিয়ে কিছুটা অপ্রস্তুত স্বরে প্রশ্ন করে,
“ কি করছো? “
“ পট্টি করা প্রয়োজন হাতের। পট্টি করে দেই আগে। তারপর শার্ট পরে নিও। “
বেহজাদ আর কোনো প্রতিবাদ করে না। বোতাম গুলো খুলে বাম কাধের পাশ হতে শার্টটাকে খুলেই নাওমি দ্রুত নিজের গাউনের পায়ের এদিকের অংশ হতে কতখানি একটানে ছিড়ে ফেলে। পাতলাটা কাপড়টাকে সামান্য ভাজ করে সেটা দিয়ে বেহজাদের বাম হাতের বাহুর ক্ষত জায়গাটা বেঁধে দেয়। আনাড়ি হাতে পট্টি করা শেষে, অতঃপর দৌড়ে বাহিরে যায়। বেহজাদ কিচ্ছু বলে না তাকে। যেনো আজ নাওমি নিজের মর্জির মালিক। দুটো পাথর এবং কিছু শুকনো পাতা হাতে নিয়ে নাওমি ঘরে প্রবেশ করে দোর আটকায়। ঘরের একপাশে সে একটা লণ্ঠন দেখেছিলো। কাশতে কাশতেই সেটাকে পরিষ্কার করে, পাথর এবং শুকনো পাতার সাহায্যে আগুন ধরায় সে। লণ্ঠনটাকে জ্বালিয়ে রেখে, জানালা গুলো ভেতর থেকে আটকে দেওয়া হয়। বাহিরে ইতিমধ্যে ধূলিঝড় শুরু হয়েছে।
নাওমি বেহজাদের শিয়রে বসে তার হাতের অবস্থাটাকে দেখে। রক্তপাত খুব একটা বন্ধ হয় নি। উল্টো নাওমির ছেড়া কাপড়ের অংশটা রক্তে ভিজে উঠেছে। নাওমি উদাস চোখে সেই পানে তাকিয়ে থেকে বলে,
“ আমি চিকিৎসা শাস্ত্রে পরিপক্ক নই। এখানে প্রয়োজনীয় সব জিনিসও মজুদ নেই। তোমার কি ব্যথা করছে খুব? “
ব্যথা বোধহয় কিছুটা করছে বেহজাদের। তবে তার সেদিকে ধ্যান নেই। তার সবটুকু ধ্যান জ্ঞান নাওমির পানে নিবদ্ধ। নাওমি আবারও মন খারাপ নিয়ে বলে,
“ ভয়ংকর ধূলিঝড় হচ্ছে! ঘোড়াটা বাহিরে না জানি কত কষ্ট পাচ্ছে। ওকেও ঘরের ভেতর জায়গা দেওয়া গেলে ভালো হতো। বোবা প্রাণীটা নিজের অসুবিধাটা ঠিকঠাক জাহির করতে পারবে না। আর আমি বুঝতে পেরেও ওর সাহায্য করতে পারছি না। “
বেহজাদ হুট করে উপলব্ধি করে তার সামনে বসে থাকা এই মেয়েটার মনে খুব মায়া। একটা বোবা প্রাণীর জন্য মায়া। একটা নিষ্ঠুর বেহজাদের প্রতি মায়া। একটা অপহরণকারীর প্রতি মায়া! বেহজাদের হাতের পট্টিটা রক্তে আরো ভিজে উঠেছে। নাওমি বিচলিত হয়। সে চারিপাশে চোখ বুলাতে থাকে কিছু খুঁজে পাওয়ার আশায়। কিছু না পেয়ে যখন আবারও নিজের গাউনের এক অংশ ছিড়তে উদ্যোত হয় সে, ঠিক সে-ই মুহূর্তে বেহজাদ তাকে বাঁধা দিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করে বলে,
“ অস্থির হওয়ার কিছু নেই। ঠিক আছি আমি। ঝড় থামলে আমি-ই বেরিয়ে গিয়ে কিছু ভেষজপাতা খুঁজে এটার প্রাথমিক চিকিৎসা সেরে নিবো। স্থির হয়ে বসো তুমি। দেখি, এদিকে এসো। কাল না গলায় লেগেছিলো তোমার? এখনো কি জ্বলছে? “
বলতে বলতে বেহজাদ নাওমির ঘাড়ে একহাত রেখে তার গলার কাঁটা দাগটার অবস্থা দেখতে শুরু করে। এই সামান্য আচরণটুকু নাওমিকে এলোমেলো করে দেয়। এইরকম একটা পরিস্থিতিতেও এই লোক নিজেকে ভুলে, নাওমির ক্ষত নিয়ে চিন্তা করছে? বেহজাদ কিছু বলার উদ্দেশ্যে চোখ তুলে তাকাতেই তার নাওমির সঙ্গে দৃষ্টিমিলন হয়। হুট করেই সে ভুলে যায়, সে কি বলতে নিয়েছিলো। তার যা বলার ছিল, সেটার থেকেও নাওমি হঠাৎ অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ধরা দিলো তার কাছে।
তীব্র প্রলয়ের মাঝে প্রেমের আগমনটা ঘটে দু'জনেরই অজান্তে। অপলক তাকিয়ে থাকা দু'জনের মধ্যকার অদৃশ্য পর্দাটা উড়ে যায় সন্তর্পণে। নীরব দৃষ্টি জোড়ায় মিশে আছে গভীর কোনো আবেগ। সে-ই আবেগটা দু'জনকার নীতিমালা, পাপ-পূণ্য এবং ঠিক-বেঠিকের বিচারে গাঢ় প্রমাণিত হলো।
নাওমির ঘাড় ধরে রাখা হাতটা সরায় না বেহজাদ। উল্টো নাওমিকে কাছে টেনে নেয় সে। নাওমি প্রতিরোধ করে না। নীরব এক সম্মতি তার তরফ থেকেও ছিলো। একটা পর্যায়ে দু'জনের কপাল একে অপরের সঙ্গে ঠেকে। নিঃশ্বাসের গতিবিধি টের পাচ্ছে দু'জনই। দূরত্বটুকু ঘুচলো কাছে আসার মধ্যে দিয়ে। অধর ছুঁয়ে যাওয়া দু'জনেই আরো বেপরোয়া হলো। বেহজাদের হাত জোড়া নাওমির ঘাড় এবং কটি পেঁচিয়ে ধরলো।
ভুলে গেলো দু'জনে নিজেদের পদবীর তাৎপর্যতা। ভুলে গেলো নিজেদের মধ্যকার জাতীয়তা, ধর্ম এবং বয়সের ফারাক। ভাগাভাগি করে নিলো একান্ত অনুভূতিটুকু। গতকাল রাতের চুমুটা ছিলো বিদ্যুতের ন্যায় এক মুহুর্তের জন্য। তবে আজকের এই চুমুর স্থায়িত্বটা দীর্ঘ হলো।
বেহজাদ বেশ অনেকক্ষণ পর নাওমির অধর ছেড়ে ফের তার কপালে কপাল ঠেকিয়ে শান্ত গলায় বলে উঠে,
“ তোমাকে ছোঁয়াও পাপ। “
সরল নাওমির উত্তর,
“ আমিও পাপ করেছি। “
“ দূরে থাকো। “
“ কাছে তুমি টেনেছো। “
“ সামলানো দায়। “
অতঃপর দু'জনেই নিশ্চুপ। বেহজাদ মাথা পেছায়। একহাতের আঙুলের সাহায্যে নাওমির চিবুক তুলে। নাওমি তাকানোর সাহস করে না। আখিঁপল্লব বদ্ধ তার। সেই বদ্ধ আখিঁর পাতায় সযত্নে ঠোঁট ছোঁয়ায় বেহজাদ। সবটা বেহজাদের ছলনা হওয়ার কথা ছিলো। তবে এ-ই মুহূর্তটুকু সেই ছলনার অংশ কি-না কে জানে।
হুট করে দরজায় জোরে করাঘাতের শব্দ হয়। বাহির থেকে ভেসে আসছে বেশ কিছু কণ্ঠস্বর। প্রিন্সেস, প্রিন্সেস ডেকে চেঁচাচ্ছে তারা। দরজাটাও ভাঙার প্রচেষ্টা চলছে। নাওমির কানে ভেসে আসে শব্দগুলো। সে চোখ মেলে তাকায়। দৃষ্টি নিবদ্ধ বেহজাদের পানে। বেহজাদ পিছনের দেয়ালে পিঠ এলিয়ে দিয়েছে। নাওমির দিকে তাকিয়ে সে ম্লান হেসে বলে,
“ অপেক্ষার প্রহর শেষ তোমার। উদ্ধার করতে এসেছে তোমাকে। যাও, দরজা খুলো। “
নাওমির চোখেমুখে অবিশ্বাস। সত্যিই তাকে উদ্ধার করতে এসেছে? সত্যিই তো! ওইতো বাহির থেকে প্রধান সেনাপতি কেভের কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। নাওমি পিছিয়ে যায় কিছুটা। অতঃপর উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে যায় দরজার কাছে। দরজা খোলার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে সে বেহজাদের পানে ফিরে তাকায়। বেহজাদ তখনও তার দিকে তাকিয়ে মলিন হাসছে। নাওমির বুকের ভেতরে যেনো হাতুড়ি পেটা চলছে। যে-ই মুহুর্তের অপেক্ষায় এতদিন সে প্রতিক্ষার প্রহর গুণেছে, আজ অবশেষে সে-ই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো। তবে কেনো এই দ্বিধা? নাওমির মুক্তির অর্থ, বেহজাদের মৃত্যুদণ্ড বলে?
চলবে…