প্রণয়তিথি
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৪২.
প্রাসাদের আঙিনায় প্রজারা জমায়েত হতে শুরু করেছে। আজ আর তাদের তেমন একটা বাঁধা দেওয়া হচ্ছে না। আদেশটা সরাসরি কাউন্টের তরফ থেকেই এসেছে। কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট আজ প্রজাদের উত্তর দিতে প্রস্তুত। সে-ই সঙ্গে প্রস্তুত সরাসরি তাদের মুখোমুখি হতে। অনেক তো নিজেকে আড়াল করে চলেছে সে! আর কতো? এবার না-হয় সবার মুখোমুখি হওয়া যাক! বিপদ আসলে আসুক। চিনে নিক কাউন্ট ইয়ান আলবার্টকে। ইয়ান দূর্বল নয়। সে লড়াই করবে অবশ্যই।
প্রাসাদের সবথেকে উঁচু সম্মুখ মুখী বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাজমাতা আনাস্তাসিয়া এবং নৌ বাহিনীর প্রধান। জনগণের উদগ্রীব চাউনির বিপরীতে আনাস্তাসিয়া কিছু বলতে উদ্যোত হয়। ঠিক সেই মুহূর্তেই তার পিছনে বারান্দার দরজার দুটো পাশ খুলে যায়। শোনা যায় প্রধান সেনাপতির স্বর। যে উচ্চস্বরে কাউন্টের আগমনের এলান করছে। আনাস্তাসিয়া এবং ম্যাথিউ দু'জনই চমকে পিছনে ফিরে তাকায়। তাদের কারো ইলমে এই ব্যাপারটা ছিলো না যে ইয়ান এরকম একটা কাজ তাদের না জানিয়ে করতে পারে।
আনাস্তাসিয়া বারান্দার মধ্যবর্তী জায়গাটা ছেড়ে দিয়ে, এক পা, দু পা করে পাশে সরে যায়। প্রজাদের আগ্রহী দৃষ্টি তখন বারান্দার পানে। ধীর কদমে রাজকীয় পোশাক পরিহিত সুঠাম দেহের এক পুরুষকে এগিয়ে আসতে দেখেই তাদের চোখ চিকচিক করে উঠে। ভালো করে দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজেদের কাউন্টকে। ইয়ান বারান্দার রেলিং এর কার্ণিশ ঘেঁষে ঠিক মধ্যবর্তী জায়গাটায় এসে স্থির ভঙ্গিতে দাঁড়ায়। আশেপাশে কারো পানে না তাকিয়ে স্ব উচ্চ গলায় বলে উঠে,
“ আমি কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট। কাউন্ট রিকার্ডো আলবার্টের পুত্র। এতো বছর ধরে লোকচক্ষু এড়িয়ে চলা ব্যক্তি। দেখে নিন আমাকে। কারো মনে কোনো সন্দেহ আছে? “
উঁহু! কারো মনে কোনো সন্দেহ নেই। ইয়ানের সবুজ নক্ষত্রের মতো চোখ জোড়াই তার রিকার্ডো আলবার্টের পুত্র হওয়ার সবথেকে বড়ো প্রমাণ। তাছাড়া রাজমাতা আনাস্তাসিয়ার মতো হুবহু সোনালী চুলের এই যুবককে দেখে কারো সন্দেহ করার সাধ্য নেই, যে এটা ইয়ান আলবার্ট নয়। এতো বছর পর এই প্রথম নিজেদের কাউন্টকে দেখে যেনো উৎসুক জনতা কিছুটা খুশি হলো। তারা একত্রিত হয়ে কাউন্টের নাম ধরে দীর্ঘায়ু কামনা করে মিলিত ধ্বনিতে চারিপাশ মুখরিত করে তুলে।
ইয়ান বোধহয় কিছুটা স্বস্তি পেলো। মনে মনে সে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলো যে প্রজারা তাকে আদৌ মেনে নিবে কি-না। তবে প্রজাদের প্রতিক্রিয়া যেনো তার সে-ই দ্বিধা মিটিয়ে দিলো। ইয়ান এবার এক হাতের ইশারায় সবাইকে চুপ করিয়ে বলে,
“ প্রিন্সেস নাওমিকে নিয়ে একটা অবান্তর গুঞ্জন ছড়ানো হয়েছিলো আপনাদের মাঝে। আপনারা বিভ্রান্ত হয়ে প্রাসাদ প্রাঙ্গণে এসেছিলেন। রাজমাতা আপনাদের সার্বিক পরিস্থিতিতে জানিয়ে আজকের এই দিনে এসে এখানে উপস্থিত হতে বলেছিলো। আপনারা উপস্থিত হয়েছেন। এবার আপনাদের মনের প্রশ্ন দূর করার পালা। “
ইয়ানের কথাটুকু সমাপ্ত হতেই একটা রাজকীয় গাউন গায়ে জড়ানো প্রিন্সেস নাওমি এসে তার পাশে উপস্থিত হয়। প্রজারা প্রিন্সেসকে দেখতেই যেনো নিজেদের সকল প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যায়। তাদের ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে যায়। দু একজন উচ্চস্বরে নিজেদের অসভ্যের ন্যায় আচরণের জন্য ক্ষমা চায়।
নাওমির পায়ের আঘাত সম্পর্কে ইয়ান অবগত হয়েছে ইতিমধ্যে। তাই সে নাওমিকে বেশিক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখতে চায় না। প্রজাদের দ্রুত বিদায় করতে বলে উঠে,
“ আপনাদের সকল ভুল ধারণা দূর হয়ে থাকলে সকলে নিজেদের ঘরে ফিরে যান। আপনাদের বিশ্বাসটা আমার উপর রাখবেন এখন থেকে। যার তার কথা শুনে গুজবের প্ররোচনায় পড়ে আর যেনো প্রাসাদে না আসে কেউ। “
ইয়ানের শেষ বাক্যটা কিছুটা সতর্কবার্তা সরূপ সকলে আমলে নিলো। সৈন্যরা সকল প্রজাদের প্রস্থানের সুযোগ করে দিলো। ইয়ান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখে প্রজাদের সেই প্রস্থান। অতঃপর ক্লান্ত নাওমির মুখপানে তাকায়। গলার কাঁটা দাগটা ঢাকতে গলায় বাঁধা রুমালটা তার চোখ এড়ায় না। সে একহাতে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
“ ক্লান্ত লাগছে তোকে। কক্ষে ফিরে একটু আরাম কর। সুস্থ হতে হবে দ্রুত। “
নাওমি সামান্য হেসে নিজের বাবার কাছে এগিয়ে যায়। ম্যাথিউ মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে প্রস্থান করতেই আনাস্তাসিয়া এসে ইয়ানের পাশে দাঁড়ায়। দু হাতে রেলিং ধরে রাখা ইয়ানের দৃষ্টি শূন্যে। আনাস্তাসিয়া কিছুটা চাপা ক্রোধ নিয়ে বলে,
“ এভাবে কাউকে কিছু না জানিয়ে প্রজাদের মুখোমুখি হওয়ার মানে কি? “
ইয়ান স্বাভাবিক স্বরে জবাব দেয়,
“ আর কতকাল কাপুরষ হয়ে থাকবো? “
আনাস্তাসিয়া বিস্মিত স্বরে বলে,
“ তোমাকে আড়ালে রাখার পিছনে একমাত্র কারণ হচ্ছে তোমার নিরাপদ নিশ্চিত করা। “
ইয়ান এবার সরাসরি আনাস্তাসিয়ার পানে তাকিয়ে বলে,
“ এটা কাপুরুষতার লক্ষ্মণই, মা। বিপদ হতে পারে বলে কি এখন আমার আজীবন কামরায় তালাবদ্ধ হয়ে বসে থাকা উচিত? বোঝার চেষ্টা করো, আমি একজন কাউন্ট। বিপদকে সঙ্গে নিয়ে চলাই আমার জীবনের অংশ। আমি বিপদ থেকে যত দূরে ভাগবো, বিপদ ততই আমাকে তাড়া করে বেড়াবে। কিন্তু এটা কোনো সমাধান নয়। যা-ই হয়ে যাক, সেটা মোকাবেলা করাটাই একমাত্র সমাধান। “
আনাস্তাসিয়া কিছু বলতে নিয়েও আর বলে না। আজকাল নিজের উপদেশ কিংবা মন্তব্য জানানোটা তার কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। ছেলে তার বড়ো বড়ো সিদ্ধান্ত একাই নিতে শুরু করেছে। যেটা খুব একটা ভুল নয়। কাউন্ট হিসেবে একান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্পূর্ণ অধিকার ইয়ানের আছে। উল্টো কাউন্টের সিদ্ধান্তে বাগড়া দেওয়াটা একটা অশোভনীয় ব্যাপার বলে মনে হয় আনাস্তাসিয়ার। তাই সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, তার এই হুট করে বড়ো হয়ে যাওয়া ছেলেটাকে এখন সমস্তটা একা বুঝে নিতে দেওয়ার সময় এসেছে। রাজমাতা হিসেবে নিজের দায়িত্বের বাহিরে তিনি আর ইয়ানের কোন সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করবে না। কেবল নিজের ছেলেকে দূর হতে সকল বিপদ থেকে রক্ষা করে যাবেন। ব্যস, এইটুকুই।
__________
এতো এতো প্রজাদের ভীড়ে ক্লাডিয়াসও দাঁড়িয়ে ছিলো। দূর হতেই সে দেখেছে প্রিন্সেস নাওমির শান্ত, নিশ্চুপ মুখটা। নাওমির গলার কাছে বাঁধা রুমালটা তার নজর এড়ায় নি। প্রিন্সেস সাধারণত কখনো গলায় এরকম কিছু বাধে না। তবে আজ কেন? কোনো আঘাতের চিহ্ন আড়াল করতে?
ক্লাডিয়াসের ইচ্ছে হলো আটককৃত ওই অসভ্য দুটোকে ধরে জ্যান্ত পুতে দিতে। তবে কারাগারে ও-ই দুই অপহরণকারীর সঙ্গে কাউন্ট ব্যতীত কারো সাক্ষাতের অনুমতি নেই। যদি একবার এই অসভ্য দুটোকে নিজের হাতের নাগালে পেতো ক্লাডিয়াস, তবে তাদের হালাত দেখার মতো রাখতো না সে।
প্রজারা ইতিমধ্যে সবাই প্রস্থান করে ফেলেছে। ক্লাডিয়াসও প্রস্থানের জন্য পা বাড়াতে নেয়। ঠিক সে-ই মুহূর্তে কোথা থেকে জোসেফ এগিয়ে আসে ঝড়ের গতিতে। বলিষ্ঠ হাতে ছেলের এক বাহু চেপে ধরে নিজের সঙ্গে অশ্বশালার দিকে নিয়ে যায়। পিতার এরকম আগমনের কারণ ক্লাডিয়াস আন্দাজ করতে পারে। প্রধান সেনাপতি যা বলে, তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। আজও নিশ্চয়ই তার ব্যতিক্রম করে নি।
অশ্বশালার এক কোণে নিরিবিলি একটা জায়গায় এনে ছেলের হাত ছেড়ে দিয়ে জোসেফ ধমকে উঠে,
“ আদেশ অমান্য করে তীর কেন ছুড়েছিলে তুমি? “
ক্লাডিয়াস সোজাসাপ্টা উত্তর দেয়,
“ অপহরণকারীকে জখম করতে। “
জোসেফ দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“ অপহরণকারীর সঙ্গে ও-ই ঘোড়ায় প্রিন্সেসও ছিলো। তোমার নিশানা যদি ভুল হতো বেকুব ছেলে? তীরটা যদি প্রিন্সেসের গায়ে লাগতো? “
ক্লাডিয়াস আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জবাব দেয়,
“ কখনো না। আমার তরফ থেকে কখনো প্রিন্সেসের কোনো ক্ষতি হবে না। এ-ই নিশ্চয়তা স্বয়ং আমি দিচ্ছি। “
ছেলের কথার ধরণ জোসেফের পছন্দ হলো না। সে রেগে গিয়ে বললো,
“ তুমি নিশ্চয়তা দেওয়ার কে? কি ভাবছো নিজেকে? প্রিন্সেসকে নিয়ে তোমার চিন্তা না করলেও চলবে। উনাকে নিয়ে ভাবার জন্য অনেক মানুষ আছেন। তারা উনার ভালোটা সবথেকে বেশি বুঝবেন। তুমি নিজের কথা ভাবো। মরার জন্য উঠে পড়ে লেগেছো মনে হচ্ছে। “
ক্লাডিয়াস এবার কিছুটা উত্তেজিত হয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,
“ তোমাদের কেন মনে হয় আমি আশেপাশে থাকলে প্রিন্সেসের ক্ষতি হবে? কেন আমাকে ভরসা করো না কেউ? আমি কি খুব অলুক্ষণে? “
জোসেফ ছেলেকে দেখে কিছু পল। অতঃপর বলে উঠে,
“ তুমি প্রিন্সেসের আশেপাশে থাকলে প্রিন্সেসের কোনো ক্ষতি হোক কিংবা না হোক, তবে তোমার ক্ষতি নিশ্চিত। বামন হয়ে চাঁদের দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছো। এই দুঃসাহসই তোমার গর্দান যাওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে। “
“ আমি নিজের সীমা সম্পর্কে অবগত, বাবা। সীমা ভেঙে কখনো উনাকে চাইবো না। দূর থেকে যতটুকু ভালোবাসছি সেটা একান্তই নিজের শান্তির জন্য। এইটুকু শান্তি আমার থাকুক। বাঁধা দিও না আমাকে। “
জোসেফ কিছু বলার পূর্বেই ক্লাডিয়াস সেখান থেকে প্রস্থান করে। জোসেফ হতাশ ভঙ্গিতে তাকিয়ে রয়। তার সন্তান কি করে একটা গাধার বাচ্চা হলো এটাই তার মাথায় ঢুকছে না। আরে, নিজের ভালো তো পাগলেও বুঝে। তাহলে তার ছেলে কেন ছাগলের মতো আচরণ করছে?
__________
পুষ্টিকর খাওয়াদাওয়ার কারণে শরীরের দূর্বলতা কিছুটা কমেছে জেইলানের। তবে পিঠ এবং দু পায়ে চাবুকের আঘাতের ব্যথাটা এখনো কমে নি তার। মনে হচ্ছে চাবুকের আঘাতে মাংসপেশি সম্পূর্ণ পচে গিয়েছে। যদিও চিকিৎসকরা ব্যথা নিরাময়ের ওষুধ দিয়ে চলেছে। তবে তা কার্যকর হতে কিছুটা হলেও সময় লাগবে।
জেইলান একপাশ ফিরে চিকিৎসালয়ের বিছানাটায় শুয়ে আছে। চিকিৎসকরা নিজেদের মতো কাজ করে যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে কোনো কথাই বলছে না জেইলান। বিকেলের দিকে একবার সে একজন চিকিৎসকের কাছে জানতে চেয়েছিলো প্রিন্সেস সমন্ধে। তবে নিজের প্রশ্নের পিঠে কোনো জবাব না পেয়ে অপমানিত বোধ করেছে সে। এই চিকিৎসক গুলোকে অসহ্যকর লাগছে তার। চিন্তায় ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে সে। কে জানে, ভাইজান কোথায় আছে!
জেইলানের আকাশ কুসুম ভাবনার মাঝেই দরজা খোলার শব্দ হয়। জেইলান পিছু ফিরে দেখার প্রয়োজনবোধ করে না কে এসেছে। তবে সে টের পায় এইমাত্র কক্ষে প্রবেশ করা ব্যক্তির উপস্থিতির কারণে সকল চিকিৎসক কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।
ইয়ান তার দিকে পিঠ করে শুয়ে থাকা জেইলানকে লক্ষ্য করে কিছুক্ষণ। অতঃপর এগিয়ে গিয়ে সরাসরি জেইলানের সামনে দাঁড়ায়। জেইলান চোখ তুলে তাকায় না তবুও। তাই ইয়ান নিজেই নীরবতা ভেঙে বলে,
“ নাওমিকে ফিরিয়ে এনেছি। আমার বোন এখন নিজের প্রাসাদেই আছে। সঙ্গে তোমার দুই সহযোগীকেও ধরে আনা হয়েছে। “
সহযোগীর কথা শুনতেই জেইলান চকিতে ইয়ানের পানে তাকায়। দুই সহযোগী মানে? আব্দুল এবং ভাইজান দু'জনই আটক হয়েছেন? জেইলানকে কিছুটা উত্তেজিত দেখালো। সে দ্রুত উঠে বসার চেষ্টা করে। জেইলানের সোজা হয়ে উঠতে অসুবিধা হওয়া দেখে ইয়ান এক মুহূর্তের জন্য এগিয়ে যেতে নেয় সাহায্যের উদ্দেশ্যে। তবে পর মুহূর্তেই সে নিজেকে সামলে নিয়ে কঠোর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়। জেইলান নিজেই উঠে বসে বলে,
“ কি করেছো ওদের সঙ্গে? কোথায় রেখেছো ওদের? “
ইয়ান জবাব দেয়,
“ কারাগারে আছে। এখনো কিছু করি নি। শীঘ্রই করবো। চিন্তা করো না। ওদের পরিণতি দেখার সুযোগ পাবে তুমি। “
জেইলান বুঝতে পারে ইয়ান কিংবা কেউ বোধহয় বেহজাদের আসল পরিচয় সম্পর্কে অবগত নয়। বেহজাদ এবং আব্দুলকে শুধুমাত্র তার সহযোগী হিসেবে ভাবছে ইয়ান। এটাই সুযোগ। নিজের ভাইকে বাঁচানোর জন্য আরেকটু ছলনা করতে কোনো দোষ নেই। তাই জেইলান কিছুটা ধাতস্থ হয়ে ইয়ানকে বলে,
“ তোমাকে মারার এবং তোমার বোনকে অপহরণ করার সম্পূর্ণ পরিকল্পনা আমার ছিলো। তোমার বোনকে আঘাতও কেবল আমি করেছি। ওই দু'জন কেবল হুকুমের দাস। আমি ওদের হুমকি দিয়ে নিজের হুকুম পালনে বাধ্য করেছিলাম। ওদের কোনো দোষ নেই। ওদের ফেরত যেতে দাও তুরস্কে। ওদের পরিবার অপেক্ষা করছে ওদের জন্য। “
ইয়ান কঠিন স্বরে বলে,
“ এসব তোমার আগে ভাবা উচিত ছিলো। ওদের তুমি হুমকি দিয়েছো নাকি না সেটা দেখা আমার বিষয় নয়। আমার কাজ কেবল অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা। যেটা আমি অবশ্যই করবো। কেউ বাধা দিতে পারবে না। “
নিজের কথা শেষ করেই ইয়ান প্রস্থানের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। জেইলানকে অস্থির দেখায়। কি করবে সে? নিজের ভাইকে কিভাবে বাঁচানো যায়? ইয়ান কিছু কদম এগিয়ে যেতেই নিজের বাম হাতে টান অনুভব করে। সে আপন জায়গায় স্থির হয়। ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে ফিরে তাকায়। জেইলান উঠে এসে তার হাত চেপে ধরেছে। চোখে মুখে কাতরতার ছাপ।
ইয়ান নির্বিকার রয়। না কিছু বলে, না নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। জেইলান উপায় না পেয়ে নিজের অহংকার বিসর্জন দেয়। দু হাতে ইয়ানের হাত ধরে রেখেই ধপ করে তার সামনে বসে পড়ে। মাথা নত করে অনুনয় করে,
“ দয়া করো। ওদের যেতে দাও। আমার শাস্তির ভাগ একান্তই আমার। শাস্তি সম্পূর্ণটা মাথা পেতে নিবো আমি। তবে নিজের কারণে নিরীহ সৈন্যদের প্রানঘাতি আমি মেনে নিবো না। ওদের পরিবার আছে, পিছুটান আছে। নিজ রাজ্যে ফিরে যেতে দাও ওদের। আমাকে নিঃসংকোচে মেরে ফেলতে পারো। আমি সকল পিছুটান ছিন্ন করে এখানে এসেছি। “
ইয়ান দেখে নিজের গরিমা ভেঙে অনুনয় করা জেইলানকে। সে এখনো নির্বিকার। জেইলান বলতে থাকে,
“ ওদের যেতে দাও, এন্ড্রু। ওদের দোষ নেই। ছেড়ে দাও ওদের। “
কথাগুলো বলতে বলতে জেইলানের কণ্ঠস্বর কাপে। চোখ দিয়েও বোধহয় এক দু ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। ইয়ান এবার নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নেয় জেইলানের হাত থেকে। অতঃপর নিজের এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে জেইলানের চিবুক ছুঁয়ে তাকে উঠে দাঁড়াতে বাধ্য করে। জেইলান টলতে টলতে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ায়। তার দৃষ্টি এখনো নত। ইয়ান লক্ষ্য করে জেইলান নীরবে কাঁদছে। বড়ো বড়ো চোখ দুটো কার্নিশ ঘেঁষে টুপটুপ করে জল পড়ছে। ঠোঁট এবং নাকের পাতাও মৃদু কাঁপছে। ইয়ান তন্ময় হয়ে দেখে তাকে। অতঃপর সম্মোহনী স্বরে ডাকে,
“ মাহশা! “
জেইলান চোখ তুলে তাকায়। যেনো সত্যি সত্যিই সে মাহশা। ইয়ান কিছুপল পরখ করে নিখুঁত মুখখানা। চিবুক ছেড়ে তার হাত গিয়ে ছুঁয়ে দেয় জেইলানের গাল। বৃদ্ধাঙ্গুলটা আলতো করে মুছে দেয় গাল গড়িয়ে নেমে আসা অশ্রুকণাকে। হুট করেই ইয়ানের মনে পড়ে যায় জেইলানের প্রতারণার কথা। তার দৃষ্টির নমনীয়তা উবে যায় মুহূর্তেই। গাল ছুঁয়ে রাখা হাতটা ধীরে ধীরে নিচে নেমে জেইলানের গলা চেপে ধরে। কঠিন স্বরে বলে,
“ বারবার ছলনা করে জিততে পারবে না তুমি। তোমার এই মুখটা… এটা কেবল একটা ছলনা জাল। আমি কখনো এই ফাঁদে পা দিবো না। “
কথাগুলো শেষ করেই ইয়ান হনহনিয়ে বেরিয়ে যায়। জেইলানের দৃষ্টিতে হতাশা। এই কাউন্টকে কাবু করতেও সে ব্যর্থ হলো। এখন কি করবে সে? কাকে কাবু করে নিজের ভাইকে মুক্তি দিবে সে?
চলবে…