ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়তিথি

৪৩তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

প্রণয়তিথি

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৪৩.

নাওমির ফিরে আসার খবর পেতেই প্রাসাদে ছুটে এসেছে ক্যামেলিয়া। আরোণও এসেছে তার সঙ্গে। নাওমিকে পাওয়া যাওয়ার খুশি মনে কাজ করলেও, মুখটা থমথমে দেখাচ্ছে তার। ক্যামেলিয়া আপাতত নাওমির মাথায় গাট্টা মেরে তাকে শাসাতে ব্যস্ত। বড়ো বোন হিসেবে শাসনের সুরে বলছে,

“ আর কখনো একা একা যাবি প্রাসাদের বাহিরে? হ্যাঁ? তোকে উচিত কামরাবন্দী করে রাখা। আমাদের আত্মার পানি শুকিয়ে গিয়েছিলো। দেখি, গলায় কি ব্যথা পেয়েছিস? আর কোথাও লেগেছে তোর? “

নাওমি ক্লান্ত গলায় বলে,

“ কিচ্ছু হয় নি। ঠিক আছি আমি। এখন যাই? “

কক্ষে উপস্থিত সকলেই টের পায় নাওমির ক্লান্তি। আরোণ ক্যামেলিয়াকে বলে,

“ প্রিন্সেস এখন একটু বিশ্রাম করুক? পরে উনার সঙ্গে কথা বলো তুমি। আমাদের সবারই উচিত এখন একটু উনাকে একা ছেড়ে দেওয়া। “

কক্ষে উপস্থিত সবাই সম্মতি প্রকাশ করে একে একে বেরিয়ে যায় কক্ষ থেকে। কেবল রয়ে যায় ইয়ান। নাওমি ভাইকে দেখে অনড় আপন জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়। ইয়ান এগিয়ে এসে পালঙ্কের একপাশে বসে। হাত দিয়ে নাওমিকেও ইশারা করে বসার জন্য। নাওমি মাথা নত করে চুপচাপ ভাইয়ের পাশে এসে বসে। ইয়ান নাওমির মুখপানে তাকিয়ে বলে উঠে,

“ জানি তুই ক্লান্ত, তোর বিশ্রাম দরকার। কিন্তু এ-ই মুহূর্তেই তোর সঙ্গে আমার কথা বলা জরুরী। আমাকে শুরু থেকে সব খুলে বল নাওমি। যেদিন তুই অপহরণ হয়েছিলি সেদিন থেকে শুরু করে আজ উদ্ধার হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তোর সঙ্গে যা যা হয়েছে সব বল আমাকে। আমি সব জানতে চাই। “

নাওমি জানে ভাইকে এ-ই মুহূর্তে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই সে শুরু থেকে সব খুলে বলতে শুরু করে। কিভাবে সে ইয়ানের পিছু নিয়েছিলো, কিভাবে সে ট্রান্সেলভেনিয়াতে হারিয়ে যায়, কিভাবে বেহজাদ নামক এক যুবক তাকে অপহরণ করে। সঙ্গে জানায় বেহজাদের দুই সহযোগী আব্দুল এবং জেইলানের সম্পর্কেও। তবে বেহজাদের সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত কিছু মুহূর্ত সম্পর্কে সে আর খোলাসা করে না। ওসব লুকনো কথা একান্তই নিজ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখে সে।

ইয়ান শুনে সবটা। কিভাবে জেইলান নাওমির উপর জুলুম করেছে সে-ই বর্ণনাও সে শুনে। তার দৃষ্টি নত হয়ে আসে। হাতের মুষ্টিও বদ্ধ হয় শক্ত ভঙ্গিতে। নাওমি পুরো ঘটনার বিবরণের ইতি টেনে শান্ত হয়ে বসে। ইয়ান আশা করেছিলো নাওমি জানতে চাইবে অপহরণকারীদের আসল পরিচয়। কিন্তু নাওমি কোনো প্রশ্ন না করায়, সে-ও জেইলানের রাজকুমারী হওয়ার সত্যটা চেপে যায়। চুপচাপ উঠে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যায়।

__________

প্রশস্ত করিডোর ধরে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছে ক্যামেলিয়া। গভীর কোনো ভাবনায় বিভোর সে। ওরেল রদ্রিগেজের বলা কথাগুলো তাকে খুব ভাবাচ্ছে। এক দিকে নিজের পিতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়ার বাসনা, অপরদিকে সম্পূর্ণ নেকড়ে পালের নিশ্চিত মৃত্যুর পন্থা। কি করবে সে? আরোণের ইচ্ছা পূরণে সম্মতি জানানো উচিত তার? নাকি স্বার্থপরের মতো বাবাকে অনুরোধ করবে, এই নরক জীবনটা অনন্তকালের জন্য বয়ে বেড়াতে?

নিজের বাবার ইচ্ছে পূরণে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে কখনো দ্বিধা করবে না ক্যামেলিয়া। কিন্তু বাকি নেকড়ে পাল? তারা কি আদৌ রাজি হবে নিজেদের এই নেকড়ে মানব জীবনের ইতি টানতে? দ্বিধা দ্বন্দ্বে জর্জরিত ক্যামেলিয়ার চোখের কোণে পানি এসে জমে। সে দু'হাতে নিজের মুখ ঢেকে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। ঠিক সে-ই মুহূর্তে করিডোরের বাক ঘুরতে নিয়ে কারো সঙ্গে ধাক্কা খায় সে। নেকড়ে শক্তির অধিকারী ক্যামেলিয়ার কিছু হয় না। তবে তার সঙ্গে ধাক্কা লাগা ব্যক্তিটা ‘আহ’ বলে আর্তনাদ করে উঠে।

ক্যামেলিয়া মুখ থেকে হাত সরিয়ে সামনের ব্যক্তির পানে তাকায়। আর্তনাদ করা ব্যক্তিটাও রাগ ঝাড়তে ক্যামেলিয়ার মুখপানে তাকাতেই চুপ হয়ে যায়। ক্যামেলিয়া দৃষ্টি ফিরিয়ে নে। কোনো টু শব্দ না করে দ্রুত পালিয়ে যায় প্রধান সেনাপতির সামনে থেকে। কেভ কিছুটা বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে ক্যামেলিয়ার যাওয়ার পানে। ক্যামেলিয়ার মুখের কান্না আবহটা তার দৃষ্টি এড়ায় নি। এটাই মূলত তার অবাক হওয়ার কারণ। নেকড়ে কন্যা কি কান্না করছিলো? কিন্তু কি কারণে? উনার আবার কিসের দুঃখ? কেভ খুব একটা তোয়াক্কা করে না। সে নিজ গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যায়।

__________

তখন মোটামুটি গভীর রাত। বেশ অনেকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে নিজের কক্ষ থেকে বের হয়েছে নাওমি। তবে সঙ্গে সঙ্গে দরজার প্রহরীদের প্রশ্নের সম্মুখীন হয় সে। একজন প্রহরী বলে উঠে,

“ প্রিন্সেস? কোথায় যাচ্ছেন আপনি? “

নাওমি ভ্রু কুচকে বলে,

“ তোমরা আমাকে প্রশ্ন করছো? তোমাদের জবাবদিহি করতে বাধ্য আমি? “

প্রহরী কাটকাট বলে,

“ ক্ষমা করবেন প্রিন্সেস। কিন্তু কাউন্ট এবং রাজমাতার আদেশ। আপনাকে একা ছাড়তে নিষেধ করা হয়েছে। “

নাওমি বুঝতে পারে নিজের পরিবারের চিন্তাটা অযৌক্তিক নয়। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,

“ প্রাসাদের বাহিরে যাচ্ছি না। নিচে চিকিৎসালয়ে যাবো একটু। নজর রাখতে চাইলে তোমাদের মধ্যে থেকে একজন আমার সঙ্গে চলতে পারো। “

প্রহরীরা এই প্রস্তাবে রাজি হয়। একজন নাওমির পিছুপিছু চিকিৎসালয় পর্যন্ত আসে। ভেতরে প্রবেশের পূর্বে নাওমি প্রহরীকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“ তুমি এখানেই অপেক্ষা করো। “

__________

জেইলান জেগেই ছিলো। হুট করে দরজা খোলার শব্দে সে মাথা ঘুরিয়ে তাকায়। প্রিন্সেস নাওমি কক্ষে প্রবেশ করেই সবার আগে জেইলানের পানে তাকায়। অতঃপর কিছুটা গম্ভীর স্বরে উপস্থিত চিকিৎসকদের আদেশ দেয়,

“ আমাদের একান্তে ছেড়ে দেওয়া হোক। “

প্রিন্সেসের আদেশ মেনে সকলে মুহূর্তেই কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। জেইলান মৃদু হেসে বলে,

“ ফিরতে পেরেছো, অবশেষে! “

নাওমি কয়েক কদম এগিয়ে এসে জেইলানের শিয়রে দাঁড়িয়ে বলে,

“ ভালোই শাস্তি পেয়েছো দেখছি। কারাগারে বন্দী সময়টা কেমন কেটেছে তোমার? আমার উপর করা জুলুমের কিছুটা হলেও টের পেয়েছো? “

জেইলান কিছু বলে না। নাওমি নিজেই বলে উঠে,

“ মাহশা হয়ে আমার ভাইয়ের জীবনে এসেছিলে। বোকার মতো তখন ভেবে বসেছিলাম ভাইয়ের সঙ্গে বোধহয় তোমার কিছু একটা হবে। ঈশ্বর আমার ওই ভুল চাওয়াটা যেনো কখনো সত্যি না করে, সে-ই প্রার্থনাই করছি। “

জেইলান সোজা হয়ে বসে বলে উঠে,

“ নিশ্চিন্তে থাকো, তোমার ভাইয়ের প্রতি আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। আমার চিন্তা কেবল আমার ভাইজানকে নিয়ে। সম্ভব হলে আমার সাহায্য করো। ভাইজান এবং আব্দুলকে তোমার ভাই কারাগারে বন্দী করে রেখেছে। কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট এখনো জানে না উনি আমার ভাইজান। জানলে সবার আগে উনার গর্দান নিবেন, আমার উপর শোধ তুলতে। তোমার সঙ্গে হওয়া সকল অন্যায়, অত্যাচার আমি করেছি। ভাইজান উল্টো তোমার ক্ষতে মলম লাগিয়েছে। আব্দুল? ও তিনবেলা তোমার জন্য আহার তৈরী করেছে। ন্যূনতম কৃতজ্ঞতা বোধ থাকলে উনাদের এই বিপদ থেকে উদ্ধার করো। পালাতে সাহায্য করো উনাদের। আমি আমার এক ভাই হারিয়েছি তোমার ভাইয়ের কারণে। যদি সামান্য অনুতপ্ত হয়ে থাকো, তাহলে বেহজাদ ভাইজানের জীবন বাঁচিয়ে দাও। “

নাওমি সবটা শুনে নীরবে। জেইলানের কথা শেষ হতেই দরজার ওপারে কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট এসে উপস্থিত হয়। কক্ষের বাহিরে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরীকে দেখেই সে বুঝতে পারে নাওমি ভেতরে আছে। ইয়ানও চিকিৎসালয়ে প্রবেশের জন্য পা বাড়াতেই কামরার ভেতর থেকে নাওমির কণ্ঠ শুনতে পায়,

“ আমি বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত নই। আমার ভাইকে মিথ্যা দায়ে অভিযুক্ত করা বন্ধ করো। তোমার ভাইজানের মৃত্যুর পিছনে আমাদের পরিবারের কোনো হাত নেই। “

জেইলান কিছুটা রেগে বলে,

“ এতটা নিশ্চিত হয়ে কিভাবে বলছো? কোনো প্রমাণ আছে তোমার কাছে? প্রমাণ আছে যে তোমার ভাই নির্দোষ? “

নাওমি শান্ত গলায় বলে,

“ একই প্রশ্ন তো আমিও পাল্টা তোমাকে করতে পারি। আমার ভাই-ই যে তোমার ভাইয়ের খুনী এর কোনো প্রমাণ আছে তোমার কাছে? কোন প্রমাণের ভিত্তিতে তুমি আমাদের পরিবারকে ক্রমাগত অপবাদ দিয়ে যাচ্ছো? “

জেইলান রাগের মাথায় বলে উঠে,

“ সমুদ্র অভিযানে বেরিয়েছিলেন ভাইজান। তোমাদের সীমান্তে জাহাজ আসতেই তোমার ভাই এবং তার সৈন্যরা সেই জাহাজে হামলা চালায়। কেবল ভাইজানকে খুন করেই ক্ষ্যান্ত হয় নি। জাহাজে থাকা আমাদের পতাকাকে হটিয়ে তোমার রাজ্যের পতাকাও উত্তোলন করা হয়। এই সম্পূর্ণ ঘটনার সাক্ষী হলো কেরেম। সে নিজ চোখে তোমার ভাই কাউন্ট ইয়ান আলবার্টকে দেখেছে আমার ভাইজানকে খুন করতে। ইয়ানের সঙ্গে তোমার পিতাও জাহাজে উপস্থিত ছিলো। নৌ বাহিনীর প্রধান না তোমার পিতা? “

নাওমিকে এবারো শান্ত দেখালো। সে প্রশ্ন করে,

“ কেরেম? তোমার ভাষ্যমতে যদি আমার ভাই এবং পিতা খুনী হয় তাহলে তারা কেরেমকে হত্যা করে নি কেন? সাক্ষী জীবিত রেখে তাদের কি লাভ? “

“ কেরেম লুকিয়ে ছিলো। সম্পূর্ণ ঘটনা ও নিজের চোখে দেখে। অতঃপর তোমার ভাই এবং পিতা কেরেমকে লক্ষ্য করার আগেই সে জাহাজ থেকে ঝাপিয়ে নিজের জীবন বাঁচিয়ে ফিরে। “

দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে আড়িপাতা ইয়ান শুনে সবটা। নাওমিকে আবার প্রশ্ন করতে শোনা যায়,

“ কেরেম যদি স্বচক্ষে ভাইকে দেখে থাকে, তাহলে ওর তো কাউন্ট ইয়ান আলবার্টকে চেনার কথা। ও তোমাকে ভাইয়ের মুখ আদলের বিবরণ দেয় নি? ভাই দেখতে কেমন তোমাকে জানায় নি? আমার ধারণা, জানায় নি। কারণ জানালে প্রথম সাক্ষাতেই তুমি ভাইকে চিনতে পারতে। এবার একবার নিজেকে প্রশ্ন করো জেইলান৷ কেরেম তোমাকে কেন আসল অপরাধীর মুখ বিবরণ দেয় নি? আমি বলছি, কারণ আমার ভাই খুনী না। ভাইকে কখনো কেউ দেখে নি। আজ প্রথম ভাই নিজে প্রজাদের মুখোমুখি হয়েছে। আমার ভাইয়ের উপর অপবাদ লাগানোর আগে নিজেকে প্রশ্ন করো তুমি। ভেবে দেখো অংকের কোথায় গড়মিল হচ্ছে। যে-ই কেরেমের কথাকে বিশ্বাস করে তুমি এখানে নিজের জীবন বাজি রেখে প্রতিশোধ নিতে এসেছো, সে-ই কেরেম আদৌ সত্যি বলেছিলো তো? নাকি কাছের কেউ-ই তোমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে? “

ইয়ান আর কিছু শোনার অপেক্ষায় থাকে না। সে নীরবে সেখান থেকে প্রস্থান করে। তার মস্তিষ্কের জটলা গুলো ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেছে। নাওমি তখন বলেছিলো যে ডাকাতের হামলার শিকার হওয়ার সময় সে বেহজাদ এবং আব্দুলের সঙ্গে তাদের আরেকজন সহযোগীকে দেখেছিলো। সহযোগীর নাম হলো কেরেম। নাওমির দেখা কেরেম এবং জেইলানের বলা কেরেম কি একই ব্যক্তি? দু'জনেই যদি একই ব্যক্তি হয় তবে এই কেরেমকে খুঁজে বের করা এখন সবথেকে জরুরী কাজ। ইয়ান ভালোই বুঝতে পারছে যে, একটা বিশাল ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে সে। এ-ই ষড়যন্ত্র যে-ই সাজিয়েছে তার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দুই রাজ্যের মধ্যে একটা দাঙ্গা লাগানো। শুধুই কি এইটুকু? নাকি আরো কোনো ভয়ংকর পরিকল্পনা লুকিয়ে আছে এখানে?

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন