প্রণয়তিথি
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৪৪.
ক্যামেলিয়াকে রাজধানীতে রেখে বুখারেস্ট প্রাসাদে ফিরে এসেছে আরোণ। রাত তখন গভীর। আকাশে আজ চাঁদের দেখা নেই। প্রকৃতিতে ঠান্ডা আবহাওয়াটার প্রকোপ ধীরে ধীরে কমে আসছে। এই বুঝি বসন্ত এলো বলে। পরিবর্তন কেবল ঋতুর নয় বরং অনেকের জীবনেরও বোধহয় ঘটতে চলেছে।
ওদিনের পর ওরেল রদ্রিগেজের আর দেখা পায় নি আরোণ। ক্যামেলিয়াকেও ইদানিং বেশ চুপচাপ দেখায়। আরোণ অবশ্য এতো চিন্তিত নয়। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে যে, যতই কষ্ট অনুভব হোক না কেন সে এই জীবনটা বয়ে বেড়াবে। নিজের মেয়ের এবং বাকি নেকড়ে পালের সদস্যদের জীবনের বিনিময়ে তার অভিশাপ মুক্তি চাই না। চলুক জীবন যেভাবে চলছে। অসুবিধা কোথায়?
নিজের কক্ষে প্রবেশ করতেই আরোণ টের পেলো বারান্দার খোলা দরজা দিয়ে শা শা করে বাতাস প্রবেশ করছে। কক্ষটাতেও মুহূর্তেই ঠান্ডা আবহাওয়া ছড়িয়ে পড়ে। আরোণ অবাক হয়। সে তো কেবল বাইরে থেকে এলো। এতক্ষণ তো গাছের একটা পাতাও নড়তে দেখে নি সে। হুট করে প্রকৃতি রূপ বদলালো কেন?
“ আরোণ। “
বাতাসের সঙ্গে কক্ষে ভেসে বেড়ানো ডাক শুনে আরোণ উপলব্ধি করে প্রকৃতি নিজের রূপ বদলায় নি। বরং অনাকাঙ্ক্ষিত কারো আগমনে তার কামরার আবহাওয়াই রূপ বদলেছে। জাদুকর লোকটা তবে আজ নিজ থেকে এসেছে আরোণের শিয়রে। তাহলে দেখা দিচ্ছে না কেন? লুকোচুরি খেলতে চাইছে? আরোণ দরজা ভেতর থেকে আটকে দিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে,
“ ভনিতা না করে সামনে এসো। “
ওরেল সঙ্গে সঙ্গে মনুষ্য অবয়বে আরোণের সামনে হাজির হয়। আরোণ নির্বাক ভঙ্গিতে দেখে তাকে। ওরেল সরাসরি প্রশ্ন করে,
“ কি সিদ্ধান্ত নিলে? “
আরোণের ভ্রু দ্বয়ের মাঝে ভাজ দেখা যায়। সে প্রশ্ন করে,
“ তোমার খুব তাড়া মনে হচ্ছে। কি হয়েছে? তোমার আত্মা বুঝি মুক্তি পাওয়ার জন্য ছটফট করছে? “
ওরেলকে মৃদু হাসতে দেখা গেলো। সে পাল্টা প্রশ্ন করে,
“ কেন? তুমি বুঝি মুক্তি চাও না? নিজের ভালোবাসা বিহীন এই পৃথিবীতে আরো বাঁচতে চাও? “
আরোণ শক্ত মুখে জবাব দেয়,
“ আমার ক্যামি আছে। ওর জন্য বাঁচবো আমি। ওকে উৎসর্গ করে কোনো মুক্তি চাই না আমি। “
ওরেল খানিকটা তাচ্ছিল্য করে বলে,
“ বোকা আরোণ! ওকে উৎসর্গ করতে কে বলেছে? তুমি কি আমার কথা ওদিন মন দিয়ে শোনো নি? “
“ মানে? তুমি-ই তো বলেছো। আমার সঙ্গে সম্পূর্ণ নেকড়ে পালের উৎসর্গও গুরুত্বপূর্ণ। “
“ হ্যাঁ। কিন্তু ক্যামেলিয়া তোমাদের একজন নয়। ও পালের সদস্য নয়। “
আরোণ ক্রোধিত স্বরে বলে,
“ কি যা-তা বলছো! ক্যামি আমার মেয়ে। আলফা আরোণ রদ্রিগেজের মেয়ে। “
ওরেল ইঙ্গিতের সুরে বলে,
“ ও কেবল তোমার মেয়ে নয়। ক্যামেলিয়া ক্যাথরিনেরও মেয়ে। ওর সত্তাটা সম্পূর্ণ নেকড়ের নয়। মনুষ্য রক্ত এবং বৈশিষ্ট্যও আছে ওর মাঝে। ওর শরীরে বয়ে যাওয়া ক্যাথরিনের রক্ত ওকে সম্পূর্ণ তোমার পালের সদস্য হতে দেয় নি। এটা তুমিও ভালো করে জানো। ও নেকড়েদের সঙ্গে থেকেও সম্পূর্ণ নেকড়ে নয়। ও দূর্বল, তোমাদের মতো শক্তিশালী নয় ও। “
এই সত্যটুকু আরোণের অজানা নয়। সে ভালো করেই জানে তাদের মোকাবেলায় ক্যামেলিয়া যথেষ্ট দূর্বল। তাকে ভাবুক দেখায়। ওরেল এবার প্রশ্ন করে,
“ ওকে উৎসর্গের বিনিময়ে মুক্তি চাও না বলেছো। কিন্তু নিজেকে এবং নিজের পালকে উৎসর্গ করতে পারবে ওর জন্য? নিজের মেয়ের জীবনের একমাত্র অভিশাপ মুছতে নিজেকে বলি দিতে পারবে তুমি? “
আরোণ কেমন হতভম্ব ভঙ্গিতে দেখছে ওরেলকে। তার মনে কি চলছে তা বুঝা দায়। তার সিদ্ধান্তই বা কি হবে তা-ও অজানা।
__________
নিজ কক্ষের বারান্দার ডিভানে গা এলিয়ে দিয়ে বসে আছেন কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট। অত্যন্ত ক্লান্ত অনুভব করছে সে। তবে ঘুমও পাচ্ছে না। বারান্দায় বসে থেকেও আজ স্বস্তি অনুভব করছে না সে। না আকাশে চাঁদ আছে, আর না প্রকৃতিতে দেহ মন শীতলকারী বাতাস!
কক্ষের ভেতর থেকে দরজায় করাঘাতের শব্দ ভেসে এলো। ইয়ান চোখ বুজে রেখেই উঁচু স্বরে বলে,
“ এসো। “
দরজা খুলে যায়। কক্ষ পেরিয়ে বারান্দায় এসে উপস্থিত হয় এক ব্যক্তি। ইয়ান চোখ না মেলেই তার উদ্দেশ্যে বলে,
“ সৈন্যদের কাজ বুঝিয়ে দিয়ে এসেছো? “
প্রধান সেনাপতি কেভ জবাব দেয়,
“ জ্বি, কাউন্ট। আশা করছি দ্রুততম সময়ে কেরেম নামক ওই অসভ্যকে ধরতে সক্ষম হবো আমরা। এবার ট্রান্সেলভেনিয়া সহ গোটা রাজ্যে খোঁজ করার হুকুম দিয়েছি। “
ইয়ান বলে উঠে,
“ দ্রুত এই ঝামেলা মেটাতে হবে কেভ। সফরের সময় ঘনিয়ে আসছে। আমি সফরে যাওয়ার পূর্বে রাজ্য স্থিতিশীল অবস্থায় রেখে যেতে চাই। “
কেভ এবার কিছুটা সাহস নিয়ে বলে,
“ কৌতূহল মার্জনা করবেন কাউন্ট। কিন্তু তিনজন অঅপরাধীকে তো ইতিমধ্যে আটক করা হয়েছে। তাদের শাস্তির ব্যাপারে আপনি কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? “
ইয়ান এবার চোখ মেলে তাকায়। নীরবে শূন্যে তাকিয়ে রয় সে। কাউন্টের নীরবতার প্রতি সম্মান রেখে কেভ আর কোনো প্রশ্ন করে না। বরং সে প্রস্থানের অনুমতি চাইতেই কাউন্ট ইয়ান তাকে পাশে বসার জন্য ইশারা করে। প্রধান সেনাপতি কিছুটা দ্বিধা নিয়ে কাউন্টের পাশে বসে। ইয়ান এবার নিকষকালো আঁধারে চোখ স্থির রেখেই কেভকে প্রশ্ন করে,
“ আমার জায়গায় তুমি থাকলে মাহশাকে কি শাস্তি দিতে? “
কেভ সামান্য হেসে বলে,
“ আমি আপনার জায়গায় নেই কাউন্ট। একজন কাউন্ট হিসেবে ওই হত্যা চেষ্টাকারীকে কি শাস্তি দেওয়া যায় সে-ই সম্পর্কে কল্পনাও করি না আমি। কারণ তাহলে আমার নিজেকে আপনার জায়গায় বসিয়ে ভাবতে হবে। “
ইয়ান বোধহয় এই বিশ্বস্ততায় কিছুটা খুশি হয়। সে আবার ভাবনায় হারিয়ে গিয়ে বলে উঠে,
“ সব যেনো হুট করেই বদলে গিয়েছে কেভ। নাওমি, ক্যামি এবং আমিও বোধহয়। নাওমি ফেরার পর থেকে ও কোনো গভীর ভাবনায় ডুবে থাকছে দিনভর। ক্যামিকেও দেখতে কেমন উদাস দেখাচ্ছে। ওদের পাশাপাশি নিজেকেও বুঝতে পারছি না আমি। “
কেভ এবার আগ্রহ দমাতে না পেরে সুযোগ বুঝে বলে উঠে,
“ প্রিন্সেস এতদিন বন্দীদশায় ছিলো। প্রাসাদে ফিরে এলেও বোধহয় উনি এখনো ওই স্মৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন না। তাই অন্যমনস্ক মনে হচ্ছে উনাকে। কিন্তু লুনা? উনার উদাস হওয়ার কোনো কারণ দেখছি না। “
ইয়ান হতাশ গলায় বলে,
“ ও বোধহয় ওই লোককে আহার হিসেবে গ্রহণ করার স্মৃতি এখনো ভুলতে পারে নি। “
কেভের ভ্রু দ্বয়ের মধ্যে ভাজ দেখা যায়। সে সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করে,
“ লোককে আহার হিসেবে গ্রহণ করার স্মৃতি? দুঃখিত কাউন্ট। আমি বুঝতে পারছি না। “
“ ওহ! তুমি বোধহয় জানো না। কিছুদিন পূর্বে ক্যামি যখন আহত হয়েছিলো না? তখন ওর সুস্থ হওয়ার জন্য মানুষের রক্ত, মাংস খাওয়া জরুরী ছিলো। তো ওর জন্য তখন একটা লোককে তুলে আনা হয়েছিলো। ও-ই লোকটাকে আহার হিসেবে গ্রহণ করার পর যদিও ও সুস্থ হয়েছে। কিন্তু অপরাধবোধ থেকে এখনো বের হতে পারছে না। “
কেভ কিছুটা বিস্মিত ভঙ্গিতে প্রশ্ন করে,
“ আমি তো দেখেছিলাম একটা বাচ্চাকে উনার জন্য নিয়ে আসা হয়েছিলো। “
ইয়ান এ-ই পর্যায়ে বলে,
“ হ্যাঁ, ক্রিয়াস নিয়ে এসেছিলো। কিন্তু নেকড়ে সত্তার কারণে আমার বোনকে অমানুষ আখ্যা দেওয়া যায় না। বিবেকবোধ আছে ওর। ও বাচ্চাটাকে ছেড়ে দেয়। ওর গ্লানি কমাতে ওর পিতা এমন একজনকে তুলে আনে যে এভাবেই আত্মহত্যা করতে চলেছিলো। তবুও ক্যামি ওই লোককে আহার হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি হয় না। সবার চাপে পড়ে বাধ্য হয়ে ও এই কাজটা করে। বারবার বলছিলো, কোনো মানুষের জীবন বিনিময়ে সুস্থতা ও চায় না। এখনো এই গ্লানি বয়ে বেড়াচ্ছে বোধহয় ও। “
ইয়ানের কথার পিঠে কেভকে বাকহারা দেখালো। কি ভয়ানক একটা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল! লুনাকে ভুল বুঝে সে নির্দয়ের মতো কতো কথা শুনিয়েছিল! এত্তো বড়ো একটা ভুল কিভাবে করলো কেভ? লুনাকে তার মায়ের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে এতো গুলো কথা শোনানো মোটেও ঠিক হয় নি। কেভকে অস্থির দেখায়। সে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে অনুমতি চায়,
“ কাউন্ট, একটা জরুরী কাজের কথা মনে পড়ে গেলো। আপনার অনুমতি থাকলে আমাকে এখন যেতে হবে। “
ইয়ান কিছুক্ষণ কেভকে পরখ করে অনুমতি দেয়,
“ তুমি যেতে পারো। “
প্রধান সেনাপতি কেভ আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করে না। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আসে কাউন্টের কামরা থেকে। এখন কি করা উচিত তার? লুনার কাছে ক্ষমা চাইবে? লুনা আদৌ তাকে ক্ষমা করবে?
__________
অন্ধকার কারাগারে চোখ এবং হাত বাধা অবস্থায় বসে আছে বেহজাদ। তার অনুমান অনুযায়ী এখন রাত কিংবা ভোর হওয়ার কথা। মনে মনে প্রহর গুনে চলেছে সে। সে-ই সঙ্গে আন্দাজ করার চেষ্টা করছে জেইলান কোথায় থাকতে পারে। তার বোনকে আলাদা কোনো কারাগারে বন্দী করেছে কি-না কে জানে!
হুট করে কারাগারের দরজা খোলার শব্দ হতেই বেহজাদ কিছুটা সতর্ক হয়। বুঝার চেষ্টা করে কে এসেছে। নীরবে কেউ একজন কারাগারের ভেতর প্রবেশ করে। মুহূর্তেই এই বিদঘুটে গন্ধের কারাগারে যেনো মধু, দারুচিনি এবং নাম না জানা কোনো ফুলের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে। বেহজাদের ঠোঁটের কোণে বুঝি মিহি হাসি ফুটে উঠলো। কোথাও না কোথাও সে নিশ্চিত ছিলো এই ব্যক্তি তাকে দেখতে অবশ্যই আসবে। তার আন্দাজ তবে ভুল প্রমাণিত হয় নি।
ছায়া মানবী বিড়ালের ন্যায় ধীর কদমে এগিয়ে এসে বেহজাদের সামনে এক হাঁটু গেড়ে বসে। অতঃপর এক হাত বাড়িয়ে বেহজাদের চোখে থাকা কাপড়ের বাধনটা খুলে দেয়। লম্বা সময় ধরে চোখ বাধা অবস্থায় থাকায় বেহজাদের চোখ মেলে তাকাতে কিছুটা সময় লাগলো। কিন্তু পিটপিট করে তাকাতেই সে দেখলো এই অন্ধকার কারাগারে লণ্ঠন হাতে তার সামনে বসে থাকা এক অপরূপ সুন্দর রমণীকে।
রেশমের কাপড়ের তৈরী হাল্কা ঘিয়া রঙা গাউনটা লণ্ঠনের আলোয় কেমন সোনালী আভা ধারণ করেছে। সোনালী চুলগুলোও সুন্দর করে বেণী করে কাধের একপাশে এনে রাখা হয়েছে। বেণীর খাঁজে খাঁজে ছোট ছোট দু একটা জংলী ফুল গুজে রাখা। তবে এই চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যের ভীড়ে বেহজাদের চোখ গিয়ে আটকায় রমণীর গলায় বাধা রুমালের পানে। সে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাতেই নাওমি বলে উঠে,
“ পানি খাবে? “
নিজের অপহরণকারীকে কারাগারে দেখতে এসে কোনো মানুষ তাকে পানির কথা জিজ্ঞেস করতে পারে বলে ধারণা ছিলো না বেহজাদের। তবে গরম মেজাজের প্রিন্সেসের এই নরম আচরণটা তাকে স্বস্তি দেয়। অর্থাৎ প্রিন্সেসকে সে কাবু করতে সক্ষম হয়েছে। এখন এই বোকা মেয়ের থেকে স্বার্থ হাসিল করা অত্যন্ত সহজ হয়ে যাবে। বেহজাদ সামান্য মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলতেই নাওমি হাতের লণ্ঠনটা জমিনে রেখে উঠে গিয়ে কারাগারের এককোণে থাকা মাটির কলসি হতে একটা কাঁসার গ্লাসে করে পানি ঢেলে নিয়ে আসে।
পানির গ্লাস হাতে বেহজাদের সামনে বসে নাওমি নিজেই বেহজাদকে সাহায্য করে পানি খেতে। বেহজাদ কোনো টু শব্দ করে না। চুপচাপ পানিটুকু পান করে বিড়বিড়িয়ে কিছু একটা বলে সে। নাওমি অবাক হয়। প্রশ্ন করে,
“ কি বললে? “
“ আলহামদুলিল্লাহ। “
“ এটার অর্থ কি? “
“ কোনো কিছু খাওয়ার পর আমরা মুসলমানরা সবসময় আলহামদুলিল্লাহ বলি। আমাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি এর মাধ্যমে। “
“ ওহ। “
নাওমি এবার সামান্য ঝুকে নিজের দুই হাতের সাহায্যে বেহজাদের হাতের বাধনও খুলে দেয়। সারাদিন এক চাপে বাধা অবস্থায় থাকার কারণে বেহজাদের হাত দুটো ব্যথা করছিলো। এখন মুক্ত হওয়ার পর কিছুটা আরাম অনুভব করলেও ব্যথা পুরোপুরি কমে যায় না তার। শার্ট পরিহিত অবস্থায় থাকায় বেহজাদের বা হাতের অবস্থা ক্ষতের অবস্থা দেখার সুযোগ নেই। নাওমি তাই কিছু না ভেবেই শার্টের বোতাম খুলতে উদ্যোত হলেই বেহজাদ ডান হাতের সাহায্যে নাওমির হাতের কব্জি ধরে তাকে বাঁধা দেয়। সামান্য ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে,
“ কি হচ্ছে এসব? এখানেও শুরু হয়ে গেলে? আমাকে দেখলে বুঝি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলো নিজের উপর? “
বেহজাদের এরকম বেহুদা এবং সস্তা কথায় নাওমি বিরক্ত হয়। চেহারায় রাগ ফুটিয়ে বলে,
“ তীর বিদ্ধ হয়েছিলে তুমি। ভুলে গিয়েছো? হাতের জখমটা দেখতে চাইছি কেবল। “
বেহজাদ নাওমির হাত না ছেড়েই বলে,
“ আমার জখম দেখা তোমার কাজ নয়। “
নাওমি গোঁড়ামির সুরে জবাব দেয়,
“ আমার জখম পট্টি করাও তোমার কাজ ছিলো না। তবুও তুমি করেছো। আমি শোধবোধ করতে চাইছি। “
বেহজাদ এবার কিছুক্ষণ নাওমির চেহারা পরখ করে প্রশ্ন করে,
“ একটুও ভয় নেই তোমার? আমার হাতের বাঁধন খুলে দিয়েছো কিসের ভরসায়? যদি আমি তোমার কোনো ক্ষতি করে এখন এখান থেকে পালিয়ে যাই? “
নাওমি আত্মবিশ্বাসী সুরে জবাব দেয়,
“ কাউকে ভয় করি না আমি। তোমার হাতের বাঁধন খুলেছি নিজের ভরসায়। প্রয়োজনে আত্মরক্ষা করতে জানি আমি। “
বেহজাদ মৃদু হাসে। অতঃপর নাওমির হাতটা নিজের বুকের বা পাশে চেপে ধরে ঘোর লাগা গলায় বলে,
“ দেখো তো, এখানে কোনো জখম খুঁজে পাও নাকি। “
নাওমি কিছুটা হকচকায়। সে বিভ্রান্তিকর দৃষ্টি মেলে বেহজাদের পানে তাকিয়ে থাকে। বেহজাদ উত্তরের অপেক্ষায় কাতর নয়নে তাকিয়ে। নাওমি নিজেকে সামলে নেয়। এবার কোনো ভুল করে না সে। ধীর ভঙ্গিতে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে মাথা নত করে বলে,
“ তোমার বোন আমাকে অনুরোধ করেছে যেনো তোমাকে পালাতে সাহায্য করি। “
বোনের কথা শুনতেই বেহজাদ সম্বিত ফিরে পেলো। সে দ্রুত জিজ্ঞেস করে,
“ জেইলান? কোথায় আছে ও? ঠিক আছে? “
নাওমি দেখে বোনের প্রতি বেহজাদের দুঃশ্চিন্তা। সে কিছুটা ভাবলেশহীন স্বরে বলে,
“ ঠিক আছে। কারাগারে নেই। বিশেষ জায়গায় আরামেই দিন পাড় হচ্ছে ওর। তুমি নিজের চিন্তা করো। এই প্রাসাদে তোমার বোনের মতো তোমার দিনগুলো সুখকর হবে না। “
বেহজাদকে বিচলিত দেখালো না। সে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে,
“ জীবন কখনো সুখকর হয়-ও না। এমনটা আশা করা বোকামি। এরকম বোকামি আশা আমি রাখি না। “
নাওমি কথা বাড়াতে নিয়েও আর বাড়ায় না। তার চোখ পড়ে বেহজাদের শার্টের হাতার দিকে। রক্তের ছোপ ছোপ দাগ দেখা যাচ্ছে। নাওমি অপেক্ষা না করে গলা উঁচিয়ে কাউকে ডাকতেই একজন চিকিৎসক গোছের লোক হাতে একটা পুটলি হাতে কারাগারে প্রবেশ করে। বেহজাদ লোকটাকে দেখে ক্ষানিকটা অবাক হয়। নাওমি চিকিৎসককে বুঝিয়ে বলে,
“ দুপুরে বাম হাতের বাহুতে তীর বিদ্ধ হয়েছিলো। কাপড় দিয়ে বেধে দেওয়া হয়েছিলো রক্তপাত বন্ধের জন্য। এখন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পুরোটা দ্রুত সম্পন্ন করুন। আমি এখানেই আছি। ভয় নেই। “
চিকিৎসককে ক্ষানিকটা বিব্রত দেখালো। ভদ্রলোককে এই রাতের বেলা প্রিন্সেস তুলে নিয়ে এসেছে একজন কয়েদীর চিকিৎসা করার জন্য। কি অদ্ভুৎ ব্যাপার স্যাপার। বিব্রত মুখ নিয়েই চিকিৎসক নিজের কাজে লেগে পড়ে। বেহজাদের সেদিকে হুশ নেই। তার সম্পূর্ণ মনযোগ নাওমির পানে।
লম্বা সময় ধরে চলা চিকিৎসকের কাজ সম্পন্ন হতেই তিনি উঠে দাঁড়ায়। নাওমি উনাকে সঙ্গে নিয়ে কারাগারের বাহিরে যায়। বেহজাদ এই ফাঁকে তার হাতের পুরনো পট্টির কাপড়টা যেটা কি-না নাওমির কাপড়ের অংশবিশেষ, সেটা লুকিয়ে নিজের প্যান্টের পকেটে ভরে নেয়। ঠিক সে-ই মুহূর্তে বেহজাদের খেয়াল হয় বাদশাহ বেগম আয়েশার পাঠানো সে-ই চিঠির কথা। বেহজাদ হন্ন হয়ে নিজের প্যান্ট এবং শার্টের পকেটে চিঠিটার খোঁজ করে। কিন্তু বিধিবাম! সে চিঠিটা কোথাও খুঁজে পায় না।
বেহজাদকে কিছুটা চিন্তিত দেখায়। চিঠিটা কি তুষ দূর্গ অথবা ট্রান্সেলভেনিয়ার কোথাও পড়ে গিয়েছে? ধ্যাৎ! বেহজাদ দোয়া করে যেনো চিঠিটা ভুল করেও কারো হাতে না লাগে। নাহলে তার পরিচয় খোলাসা হওয়া কেবল মুহূর্তের ব্যাপার।
চলবে…