প্রণয়তিথি
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৪৫.
মাঝরাতে কক্ষের দরজায় করাঘাতের শব্দে ক্যামেলিয়ার ঘুম ভাঙে। সে কপাল কুচকে উঠে বসে খোলা জানালা দিয়ে বাহিরটা দেখে। প্রকৃতি এখনো কালো অন্ধকারে তলিয়ে। অর্থাৎ এখনো গভীর রাত। এই এতো রাতে কে এভাবে বেক্কলের মতো দরজা ধাক্কাচ্ছে?
ক্যামেলিয়া হাই তুলতে তুলতে উঠে বসে গলা উঁচিয়ে বলে,
“ কে? “
দরজার ওপার থেকে একজন প্রহরীর গলা শোনা যায়,
“ প্রধান সেনাপতি আপনার জন্য একটা সন্দেশ পাঠিয়েছেন। “
প্রধান সেনাপতির নাম শুনতেই ক্যামেলিয়া চমকায়। দ্রুত বিছানা ছেড়ে নেমে গিয়ে দরজা খুলে। প্রহরী তার দিকে একটা ছোট্ট চিরকুট জাতীয় কাগজ এগিয়ে দিতেই ক্যামেলিয়া সেটা লুফে নিয়ে দ্রুত দরজা লাগিয়ে ভেতরে এসে বসে। বিছানার দু'পাশে বড়ো বড়ো মোমদানিতে মোম জ্বলছে মিটিমিটি।
ক্যামেলিয়া চিরকুট হাতে মোমদানির পাশে এসে দাঁড়ায়। কিছুটা অপ্রস্তুত ভাব নিয়ে চিরকুটটা খুলে সে।
“ লুনা, ঘুমে ব্যাঘাত ঘটানোর জন্য দুঃখিত। আমার আপনার সঙ্গে জরুরী কথা ছিলো। প্রাসাদের অশ্বশালায় দেখা করতে আসবেন? আমি অপেক্ষা করছি… “
ক্যামেলিয়া ভ্রু কুচকে আরো কয়েকবার চিরকুটটা পড়লো। প্রধান সেনাপতি কি মাঝরাতে মাথায় আঘাত পেয়েছে নাকি? শিয়ালের মুখে না-হয় হঠাৎ কোকিলের ডাক কেন? আর ক্যামেলিয়ার সঙ্গেই বা কি জরুরী কথা থাকতে পারে? নেকড়ে পালের জীবন বৃত্তান্ত নিয়ে এই মধ্যরাতে বিষদ আলোচনা করতে চায় না-কি?
মনে এরকম প্রশ্নের ঝুলি নিয়ে ক্যামেলিয়া ধীর গতিতে তৈরী হতে থাকে। তার পৈশাচিক মন বলছে ইচ্ছে করে দেরি করে যাওয়ার কথা। এই বাহানায় ওই নাক উঁচু সেনাপতি একটু ঘোড়ার বিষ্ঠার গন্ধের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকুক।
__________
চিকিৎসক এবং প্রহরীর হাতে দুটো স্বর্ণের ছোট থলি বুঝিয়ে দিয়ে প্রিন্সেস নাওমি তাদের কড়া গলায় শাসায়,
“ আমি কারাগারে এসেছিলাম এই কথা যদি কারো কানে যায়, তাহলে আমি নিজে তোমাদের দু'জনকে বস্তায় বেঁধে কৃষ্ণ সাগরের মাঝে নিয়ে ফেলে আসবো। মনে থাকবে? “
চিকিৎসক এবং প্রহরীকে কিছুটা ভীত দেখায়। চিকিৎসক সঙ্গে সঙ্গে নিজের ইনাম বুঝে নিয়ে মাথা নেড়ে সেখান থেকে প্রস্থান করে। তবে প্রহরী মাথা নত করে আপন জায়গায় ঠাই দাঁড়িয়ে রয়। নাওমি তাকে উদ্দেশ্য করে নিচু স্বরে বলে,
“ কারাগারের পাহারাদারদের মুখ বন্ধ করার দায়িত্ব তোমার। কেউ যদি নিজের মুখ খুলেছে তবে সেটার হিসাব আমি তোমার থেকে নিবো। যাও, কাজে লেগে পড়ো। “
প্রহরী প্রস্থান করতেই নাওমি কারাগারের ভেতর প্রবেশ করে। বেহজাদ তখন ক্লান্ত ভঙ্গিতে নিজের মাথাটা দেয়ালে এলিয়ে রেখেছে। নাওমির কিছুটা মায়া লাগলো কি-না বুঝা গেলো না। সে এগিয়ে এসে বেহজাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
“ বিনা বাধায় আমাকে সৈন্যদের হাতে সমর্পন করার জন্য ধন্যবাদ। শোধবোধের কথা বলছিলাম না? আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি তোমার এবং আব্দুলের তুরস্কে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিবো আমি। “
বেহজাদের খুশি হওয়ার কথা ছিলো। তবে সে খুশি হলো না। উল্টো বললো,
“ শোধবোধ করার খুব ইচ্ছে জাগলে, জেইলানকে এই প্রাসাদ থেকে পালাতে সাহায্য করো। ওটাই আমার জন্য যথেষ্ট হবে। জেইলানকে ফেলে আমি কখনো যাবো না। “
নাওমি নীরবে দেখে ভাই-বোনের মধ্যের এই অদ্ভুৎ বন্ধন। কখনো বোন নিজের ভাইয়ের মুক্তির জন্য মিনতি করে, কখনো ভাই নিজের বোনকে পালানোর জন্য সাহায্য চায়। নাওমি তবুও থমথমে গলায় বলে,
“ আমার ভাইকে হত্যার চেষ্টা করেছে তোমার বোন। “
বেহজাদ কিছুটা করুণ স্বরে বলে,
“ তোমার ভাইও আমার ভাইকে হত্যা করেছে। “
নাওমি রেগে গিয়ে বলে,
“ তোমাদের দুই ভাইবোনের মুখে সারাদিন একই জপ। আমার ভাই তোমাদের ভাইকে খুন করেছে! অথচ খুনের কোনো উপযুক্ত প্রমাণ নেই তোমাদের নিকট। “
বেহজাদ রেগে গেলেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। কিছুটা থমথমে স্বরে বলে,
“ উপকারের ঋণ শোধ করার বেশি শখ জাগলে করো। না-হয় এখান থেকে যাও। আমাকে অহেতুক রাগিও না। “
নাওমি কিছু বলতে নিয়েও আর বলে না। কিছুক্ষণ বেহজাদকে পরখ করে নিয়ে বেরিয়ে যায়। বেহজাদ একা কারাগারে বসে রয়। মনে মনে কিছুটা শঙ্কা কাজ করছে তার। নাওমি আদৌ তাদের সাহায্য করবে তো?
__________
প্রধান সেনাপতি কেভ লম্বা সময় ধরে অশ্বশালার পিছনে দাঁড়িয়ে ক্যামেলিয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। অপেক্ষার প্রহর যে কতো লম্বা হয় তা সে এই প্রথম বুঝতে পারছে। ধৈর্যের চরম পরীক্ষা দিচ্ছে সে। একে-তো মশার কামড়, তার উপর রাতের শীতল আবহাওয়া এবং সে-ই সঙ্গে ঘোড়ার বিষ্ঠার গন্ধ। কেভের কপালে কুচকানোর ছাপ স্পষ্ট।
ক্যামেলিয়া এসে উপস্থিত হয় আরো বেশ ক্ষাণিক সময় পরে। তার চোখে মুখে বিরক্তির ভাব। যেনো তার ঘুম ভাঙিয়ে এভাবে রাত বিরাতে দেখা করতে চেয়ে কেভ বিশাল কোনো পাপ করে ফেলেছে। তবে সে-ই বিরক্তি ভাব কেভ লক্ষ্য করলো না। সে কেবল লক্ষ্য করলো, এই মাঝরাতে তার পানে হেঁটে আসা এক অসম্ভব সুন্দর রমণীকে। দেখে মনে হচ্ছে বেশ আয়োজন করে তৈরী হয়ে এসেছে।
গায়ের টকটকে লাল রঙের গাউনটায় ক্যামিকে দেখতে সদ্য প্রস্ফুটিত একটা ক্যামেলিয়া ফুলের মতোই লাগছে। কেভ চোখ নামিয়ে ছোট্ট করে ঢোক গিলে। এই রাত বিরাতে তার মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মানে কি! ক্যামেলিয়া অবশ্য কেভকে বিশেষ পাত্তা দিলো না। সে কেভের পাশ কেট এগিয়ে যায় ক্ষানিকটা দূরে। কেভ নীরবে ক্যামেলিয়ার পিছু নেয়। এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে তারও ভালো লাগছিলো না।
অশ্বশালা থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে স্থির ভঙ্গিতে দাঁড়ায় ক্যামেলিয়া। ঘুরে তাকায় কেভের পানে। দৃষ্টি তার প্রশ্নবোধক। এই দৃষ্টির পিঠে কেভ কিছুটা অপ্রস্তুত অনুভব করে। কোথা থেকে কথা শুরু করবে বলে ভেবে রেখেছিলো তা ভুলে গিয়েছে ও। ক্যামেলিয়া টু শব্দও করে না। সে অপেক্ষা করে কেভের নিজ থেকে কিছু বলার। বেশ সময় নিয়ে কেভ গলা ঝেড়ে কাশে। অতঃপর আরেকবার ঢোক গিলে গলা ভিজিয়ে নিয়ে বলে,
“ আসলে আমি ক্ষমা চাইতে আপনাকে ডেকেছি। আমি ভেবেছিলাম আপনি বাচ্চা খেয়ে ফেলেছেন। সামান্য একটা ভুল বুঝাবুঝি হয়ে গিয়েছে আরকি… “
এতদূর বলেই কেভ থেমে যায়। এসব কি বলছে সে? বাচ্চা খেয়ে ফেলা আবার কি জিনিস? কি অদ্ভুৎ লাগছে শুনতে। ক্যামেলিয়ার কপালের ভাজ গাঢ় হয়। কেভ আবারও নিজেকে শুদ্ধ করে নিয়ে বলে,
“ দুঃখিত। আপনি বাচ্চা খান নি। আমি ভেবেছিলাম বাচ্চা আপনাকে খেয়ে ফেলে… “
কেভ আবারও থেমে যায়। অসভ্য মুখটা আজ আবোলতাবোল বকছে কেন? তার ইজ্জত কি মাটিতে মিশিয়ে ছাড়বে না-কি? ক্যামেলিয়ার ধৈর্য্য হয় না রাত জেগে পাগলের প্রলাপ শুনতে। সে বিরক্তি নিয়ে প্রস্থানের জন্য পা বাড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে কেভ দুঃসাহস দেখিয়ে ক্যামেলিয়ার হাতের কব্জি আঁকড়ে ধরে। ক্যামেলিয়া চকিতে ফিরে তাকায়। কেভ এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এক নাগাড়ে বলতে থাকে,
“ আমি আপনাকে ভুল বুঝেছিলাম। ভুল বুঝে অনেক কটূ কথাও শুনিয়েছি। সম্ভব হলে ক্ষমা করে দিন। “
ক্যামেলিয়া নীরবে পরখ করে কেভের মুখ। অপরাধবোধের ছাপ মুখে স্পষ্ট ফুটে আছে। ক্যামেলিয়া ধীমি স্বরে বলে,
“ কটূ কথা শুনাও নি, সত্যি কথা বদলেছো। আমি নেকড়ে, আমি অভিশপ্ত, আমি জানোয়ার। কিছুই ভুল বলো নি। তাই ক্ষমা চাওয়ার কোনো প্রশ্নই উঠে না। তবুও যেহেতু ক্ষমা চেয়েছো, দিলাম ক্ষমা। “
কেভ কিছু বলতে নিয়েও বলার সুযোগ পায় না। তার আগেই ক্যামেলিয়া নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে চোখের পলকে সেখান থেকে প্রস্থান করে। কেভের মনে অস্থিরতা রয়ে যায়। এ কেমন ক্ষমা! মনের অপরাধবোধ যেনো কমার বদলে কয়েকগুণ বেড়ে গেলো আরো। দমবন্ধকর অনুভূতি নিয়ে কেভ আকাশের পানে তাকায়। উপলব্ধি করে, এই অপরাধবোধের ভার থেকে মুক্তি পাওয়ার পথটা সহজ হবে না মোটেও।
__________
জেইলানের এ-ই মুহূর্তে গভীর ঘুমে তলিয়ে থাকার কথা। কিন্তু তার দু চোখে ঘুম নেই। যে-ই মুহূর্ত থেকে সে শুনেছে যে বেহজাদকে কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছে সে-ই মুহূর্ত থেকে তার মন অস্থির অনুভব করছে। সে ভালো করেই জানে আলবার্টরা তার ভাইকে মোটেও দয়া দেখাবে না। আর এই সত্যিটা জানা সত্ত্বেও হাত গুটিয়ে বসে থাকা জেইলানের পক্ষে সম্ভব নয়। তাকেই কিছু একটা করতে হবে।
চিকিৎসালয়ের এই কক্ষটায় আপাতত জেইলান একাই অবস্থান করছে। চিকিৎসকরা তাকে রাতের প্রয়োজনীয় ওষুধ লাগিয়ে দিয়ে ঠিক পাশের কক্ষটায় গিয়েছে একটু ঘুমিয়ে নিতে। যদিও কামরার বাহিরে প্রহরীর কড়া পাহারা রয়েছে। জেইলানের যেকোনো অসুবিধায় তারা সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসককে ডাকতে প্রস্তুত।
জেইলান ধীরে সুস্থে উঠে বসে। পিঠের ব্যথা কিছুটা কমলেও এখনো চিৎ হয়ে শুতে পারছে না সে। পিঠ কোনো কিছুর সংস্পর্শে লাগলেই আত্মা বের হয়ে যাওয়ার অবস্থা হচ্ছে তার। চিকিৎসকদের মতে ঘা পুরোপুরি সারতে প্রায় মাস খানেক লাগবে। ততদিন জেইলানের এভাবেই সতর্ক হয়ে শোয়া বসা করতে হবে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো যে পায়ের আঘাতটা এতো গুরুতর নয়। এখন মোটামুটি ধীরে সুস্থে হাঁটতে পারছে জেইলান।
বিছানা ছেড়ে নেমেই জেইলান ভাবতে থাকে কি করে এই কক্ষ থেকে বের হতে পারে। সে-ই মুহূর্তেই তার চোখ পড়ে কক্ষের কোণে থাকা মাঝারি আকৃতির মোমদানির পানে। জেইলান এগিয়ে গিয়ে মোম সরিয়ে রেখে মোমদানিটা হাতে নিয়ে একটু পরখ করে। ধাতুর তৈরী মোমদানিটা বেশ শক্ত এবং মজবুত।
মোমদানি হাতে নিয়ে জেইলান দৌড়ে গিয়ে বিছানায় বসে। একটা শাল মাথা এবং গায়ে পেঁচিয়ে নেয় সে। অতঃপর মোমদানিকে কম্বলের নিচে দ্রুত লুকিয়ে সে ক্লান্ত গলায় ডাকে,
“ কেউ আছো? “
দরজা খুলে যায়। বাহির থেকে একজন প্রহরী উঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“ কিছু প্রয়োজন? “
জেইলান পটু অভিনেত্রীর মতো নিজের অভিনয়ের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে পেট চেপে ধরে বলে,
“ প্রচন্ড খিদে পেয়েছে। ক্ষুধায় বুক পেট ব্যথা করছে। কিছু খাবার পাওয়া যাবে? তোমাদের ওইসব নোংরা খাবার কিংবা শূয়রের গোস্ত নয়। একটু হালাল কোনো খাবার। ভেড়া কিংবা দুম্বার গোস্ত হলে ভালো হতো। একটু পেট ভরে খেতে পারতাম। “
প্রহরীর কপাল কুচকে আসে। সে বুঝে পায় না এই মেয়ে কোন শ্রেণীর কয়েদী? এর আচরণ দেখে তো মনে হয় গোটা প্রাসাদ এবং কাউন্টের মাথাটা কিনে রেখে দিয়েছে। ঢং কতো! মাঝরাতে তাকে খাবার এনে দিতে হবে। তা-ও আবার দুম্বা কিংবা ভেড়ার গোস্ত। আবার তাদের সুস্বাদু খাবারকেও নোংরা বলছে।
প্রহরীর মন চাইছে মেয়েটাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বড়ো হাড়িতে ফেলে উনুনের জ্বাল বাড়িয়ে দিয়ে পাকাতে। কিন্তু কাউন্টের কারণে এসব কিছু সম্ভব নয়। কাউন্ট কড়া করে বলে দিয়েছে যেনো এই মেয়ের খাওয়াদাওয়ায় কোনো অসুবিধা না হয়। এ-ই কয়েদি যা, যেভাবে খেতে চাইবে তাই যেনো দেওয়া হয়। মুসলিম বলে, এই মেয়ের প্রতি সম্মান রেখে কেবল হালাল খাবারটাই যেনো পরিবেশন করা হয়।
প্রহরী পেঁচার মতো মুখ কালো করে দরজা আটকে দিয়ে খাবার আনতে চলে যায়। জেইলান লক্ষ্য করেছিলো দরজার বাহিরে মোট দু'জন প্রহরী রয়েছে। এর মধ্যে একজনকে সে ছল করে দূরে পাঠিয়ে দিলো কেবল। বাকি এবার আরেকজন।
জেইলান একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে মোমদানিটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভেতর থেকে দরজার কড়া নেড়ে দ্রুত দরজার একপাশে লুকিয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে একজন প্রহরী দরজা খুলে ভেতরে উঁকি দেয়। জেইলানকে নিজ বিছানায় না দেখে সে দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই, জেইলান পিছন থেকে মোমদানিটা দিয়ে সজোরে তার মাথায় আঘাত করে। শক্ত বস্তুর আঘাতে ভারী দেহের প্রহরীটা মাথা চেপে ধরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
জেইলান মোমদানিটা ফেলে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে কামরা ছেড়ে বের হয়। বিশাল এই প্রাসাসের ঠিক কোন দিকে যেতে হবে জেইলান ঠাওর করতে পারে না। সে ছোট করিডর ধরে এগিয়ে হলরুমের দিকে যেতে নিলেই কয়েকজন প্রহরীকে দেখে একটা পিলারের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। প্রহরী গুলো রাতের সময়টায় এদিকে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে। জেইলান অতি সতর্কতার সাথে এক পিলার থেকে আরেক পিলারের পিছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে।
হলরুমের চারকোণে দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরীদের দেখে সে বিরক্তবোধ করে। এরা কি পেঁচা নাকি? রাতে একটু ঘুমাতে টুমাতে পারে না? জেইলানের হালকা ঝাপসা মনে আছে যে ওদিন এন্ড্রু তাকে দো তলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে চিকিৎসালয়ে নিয়ে গিয়েছিলো। অর্থাৎ কারাগারে যেতে হলে তার প্রথমে দো তলায় পৌঁছাতে হবে। অতঃপর ডান দিকের করিডোর ধরে শেষ মাথায় গিয়ে ওই অন্ধকার ছোট্ট সিঁড়িপথ ধরে নেমে কারাগারে পৌঁছাতে হবে।
জেইলান ভালো করেই জানে বেহজাদের পর্যন্ত পৌঁছানো তার পক্ষে সহজ হবে না। তবুও সে চেষ্টা না করে হাতে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে চায় না। জেইলান যখন কিভাবে হলরুম পেরিয়ে সিঁড়ির কাছে পৌঁছানো যায় ভাবছিলো তখনই একটা ঘটনা ঘটে। চিকিৎসালয়ের ওদিক থেকে কারো চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ ভেসে আসে। হলরুমে উপস্থিত প্রহরীরা চমকে চিকিৎসালয়ের ওদিকে ছুটে যায়।
এ-ই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জেইলান এক দৌড়ে সিঁড়ির কাছে গিয়ে দ্রুত উপরে উঠতে থাকে। ইতিমধ্যে নিচে জানাজানি হয়ে গিয়েছে যে চিকিৎসালয়ে থাকা কয়েদি একজন প্রহরীকে আঘাত করে লাপাত্তা হয়ে গিয়েছে। দাসী, প্রহরী সকলে হন্য হয়ে জেইলানকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
জেইলান নিঃশ্বাস আটকে দো তলার বাম দিকের করিডরের একটা পিলারের পর্দার পিছনে লুকিয়ে আছে। কারাগারে যাওয়ার পথে কড়া নিরাপত্তা। বাকি সব প্রহরী জেইলানকে খুঁজতে ছোটাছুটি করলেও তারা আপন জায়গায় অনড়। হুট করেই জেইলান লক্ষ্য করে ক্ষানিকটা দূরের এক কক্ষের দুয়ার খুলে সদ্য ঘুম থেকে জাগ্রত কাউন্ট বেরিয়েছেন। প্রহরীদের মুখে জেইলানের উধাও হওয়ার খবর শুনতেই সে ক্রোধান্বিত হয়ে প্রহরীদের ধমকালো। অতঃপর তাদের তাড়া দিলো গিয়ে জেইলানের খোঁজ করতে। প্রহরীরা ছুটে যেতেই ইয়ান নিজেও দ্রুত কক্ষের ভেতর যায় বোধহয় তৈরী হতে।
জেইলানের মস্তিষ্কে সঙ্গে সঙ্গে একটা বুদ্ধি খেলে যায়। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে ক্রুর হাসি। আশেপাশে কোনো প্রহরী না থাকায় সহজেই সে কাউন্টের কক্ষের দিকে এগিয়ে যায়। ইয়ান তখন দ্রুত নিজের রাতের পরিধেয় পাতলা কাপড়ের ঢিলেঢালা শার্টের উপর একটা ক্লক গায়ে জড়াচ্ছিলো। হুট করে পিছনে কিছু একটার শব্দ হতেই সে ঘুরে তাকায়। সঙ্গে সঙ্গে তার ক্রোধ উড়ে যায়। শীতল দৃষ্টি মেলে দেখে দরজা ভেতর থেকে আটকে দিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জেইলানকে।
জেইলান যতটা ঘৃণা নিয়ে ইয়ানের পানে তাকিয়ে, ইয়ান ঠিক ততটাই শান্ত চোখে জেইলানকে পরখ করছে। ইয়ান বেশ স্বাভাবিক স্বরে বলে,
“ ওহ, তবে পালাও নি! “
“ পালিয়ে যাওয়া আমার ধাঁচে নেই। “
ইয়ান ধীর কদমে জেইলানের পানে এগিয়ে যেতে যেতে প্রশ্ন করে,
“ তো এতো রাতে আমার কক্ষে কি কাজ তোমার? এন্ড্রুকে খুব মনে পড়ছিলো বুঝি? না দেখে থাকতে পারছিলে না? “
জেইলান ইয়ানের চোখে চোখ রেখে সম্মোহনী স্বরে বলে,
“ হ্যাঁ। খুব মনে পড়ছিলো। তোমাকে না দেখতে পেয়ে তৃষ্ণার্ত পথিকের মতো ছটফট করছিলাম। “
ইয়ান ততক্ষণে জেইলানের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। দু'জনের মধ্যবর্তী দূরত্ব কেবল একহাত। ইয়ান জানে মাহশা আবারও ছলনা করছে। তা-ই সে সতর্ক থেকেই নিজের এক হাত মাহশার পাশ দিয়ে নিয়ে দরজায় ঠেক দিয়ে রাখে। অতঃপর মাহশার পানে তাকিয়ে বলে,
“ কারণ কি? এন্ড্রুর প্রতি খুব ভালোবাসা তোমার? ওকে চোখে হারাও? “
ইয়ান এতো কাছাকাছি এসে দাঁড়ানোতে জেইলান অস্বস্তি বোধ করে। দূরত্ব বাড়াতে সে এক কদম পিছাতেই তার পিঠ গিয়ে ঠেকে দরজার সঙ্গে। পিঠের ক্ষতটার ব্যথা মুহূর্তেই কাবু করে ফেলে জেইলানকে। না চাইতেও সে চোখ মুখ খিচে আর্তনাদ করে উঠে।
জেইলানের আকস্মিক আর্তনাদ এবং ব্যথায় মুখের রঙ নীল বর্ণ ধারণ করা দেখে ইয়ান কিছুটা অস্থির হয়। সে অনুমান করে নেয় যে জেইলান কোথায় ব্যথা অনুভব করছে। দ্রুত জেইলানের এক হাত ধরে তাকে দরজার কাছ থেকে সরিয়ে এনে জিজ্ঞেস করে,
“ এই? বেশি ব্যথা পেয়েছো? বেহুশের মতো দরজায় পিঠ ঠেকাতে গেলে কেনো? “
জেইলান জবাব দিতে পারে না। বিষাক্ত ব্যথায় তার চোখের কোণে এক বিন্দু এসে জমা হয়েছে। ইয়ান এতে আরেকটু ব্যস্ত হয়ে নিজের নিরাপত্তা এবং সতর্কতা ভুলে জেইলানকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে প্রশ্ন করে,
“ মাহশা? বেশি ব্যথা করছে? চিকিৎসক ডাকবো? “
জেইলান লক্ষ্য করে ইয়ান এ-ই মুহূর্তে তাকে নিয়ে ব্যস্ত। তার খেয়াল নেই যে এই সুযোগে জেইলান চাইলেই যেকোনো কিছু করতে পারে। আপাতত তার সকল চিন্তা হচ্ছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই রমণীকে নিয়ে। নিজের মাথায় ইয়ানের হাত অনুভব করতেই জেইলানের অশ্রুর জলধারা আরেকটু বেড়ে যায়। বহুদিন ধরে কেউ তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় না।
জেইলানের কান্নার গতি বাড়তে দেখে ইয়ান এবার নিজেদের মধ্যকার প্রতিহিংসা ক্ষনিকের জন্য ভুলে বসে। জেইলানের মাথাটা বুকে টেনে নিয়ে সে তার চুলের ভাজে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। জেইলানের হুট করেই মনে পড়ে তার এখানে আসার কারণ। সঙ্গে সঙ্গে সে সময় অপচয় না করে শালের ভেতর লুকিয়ে রাখা খঞ্জরটা বের করে। ইয়ান লক্ষ্য করার আগেই ধারালো খঞ্জরটা ইয়ানের পেটের একপাশে ঢুকিয়ে দেয় সে।
ইয়ান অবাক হওয়ার সময়টুকুও পেলো না। জেইলান তার পূর্বেই খঞ্জরটা বের করে আরো একবার তার পেটে ছুরিকাঘাত করে। জেইলান অনুভব করলো ইয়ান ধীরে ধীরে এক দু কদম পিছিয়ে তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। জেইলানের খুব ইচ্ছে ছিলো কাউন্ট ইয়ান আলবার্টকে নিজের সামনে তড়পাতে দেখার। কিন্তু এই মুহূর্তে অজানা কোনো কারণে সে চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। দৃষ্টি নিজের পায়ের পানে নিবদ্ধ রেখেই সে নীরবে কেঁদে চলেছে।
ইয়ান তখনও অবিশ্বাস্য দৃষ্টি মেলে জেইলানকে দেখছে। আরো একবার! আরো একবার ছলনা করলো এই মেয়ে। আরো একবার ইয়ানের বিশ্বাস ভাঙলো। কি চমৎকার, নিখুঁত অভিনয় জানে মাহশা! পেট দিয়ে গলগলিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। ইয়ান আর দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি খুঁজে পেলো না। তার শরীরটা মেঝেতে এলিয়ে পড়লো। এবার না চাইতেও ইয়ানকে দেখতে হলো জেইলানের। সে তাকাতেই দেখলো ইয়ান তার পানেই তাকিয়ে আছে। ছুরিকাঘাতের তুলনায় প্রতারিত হওয়ার বেদনা যেনো বেশি তীব্র তার দৃষ্টিতে।
ইয়ানের রক্তে মেঝে ভেসে যাচ্ছে। সে-ই প্রবাহিত রক্তের ধারা এসে জেইলানের নগ্ন পায়ের পাতা ছুঁয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে জেইলান হাঁটু গেড়ে বসে ইয়ানের সামনে। ভাইয়ের মৃত মুখখানা স্মরণ করে হাতের খঞ্জরটা দিয়ে ইয়ানের বুকের এপাশ থেকে ওপাশে বড়ো করে একটা টান দেয় ও। শার্টের কাপড় এবং বুকের চামড়া কেটে বুকটাও রক্তে ভিজে উঠে। ইয়ান একটাও টু শব্দ করে না। করতে পারেও না। তার মনে হচ্ছে তার গলায় কাঁটাতার পেঁচিয়ে আছে। তবে বুকে টানা আঁচড়টার যন্ত্রণায় তার চোখের কার্নিশ ঘেঁষে এক বিন্দু অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। জেইলানের চোখে পড়ে সে-ই দৃশ্য। আরো একবার খঞ্জর চালাতে চায় সে। তবে এ-ই দফায় তার হাত মাঝপথেই থেমে যায়। অদৃশ্য কিছু একটা যেনো তার হাত চেপে ধরে বাঁধা দিচ্ছে। জেইলান এবার হাতের খঞ্জরটা ছুড়ে ফেলে দু-হাতে মুখ ঢেকে ফুপিয়ে কেদে উঠে। চোখ বুজার আগে ইয়ান সে-ই দৃশ্যটাই শেষ দেখে নেয়।
চলবে…