প্রণয়তিথি
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৪৭.
দীর্ঘ এক রাতের শেষে অবশেষে সকাল হলো। ইয়ানের মূল চিকিৎসা ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। তবে তাকে এখনো পুরোপুরি আশংকামুক্ত বলা যাচ্ছে না। পেটের জখমটার স্থিতি সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে বুঝা যাবে। চিকিৎসকরা প্রার্থনা করছে যেনো তাদের তৈরী ওষুধ কাজে লাগে এবং সেলাই গুলো যেনো শুকিয়ে যায়। সেলাই যদি ঠিকঠাক না শুকায় তবে আরেক ঝামেলা হবে। শরীরের ভেতর জীবাণু প্রবেশের আশংকা রয়ে যায়।
ইয়ানের জ্ঞান অবশ্য এখনো ফিরে নি। তাকে ঘুমের ওষুধের মাধ্যমে ঘুম পারিয়ে রাখা হয়েছে। তার বিছানার এককোণেই নিরলস ভঙ্গিতে বসে আছেন রাজমাতা আনাস্তাসিয়া। আনাস্তাসিয়ার শিয়রেই দাঁড়িয়ে আছে ক্যামেলিয়া। দু'জনেই সারারাত ধরে জেগেছিল। অবশ্য প্রাসাদে উপস্থিত প্রায় সকলেই নিজেদের কাউন্টের চিন্তায় নির্ঘুম রাত পাড় করেছে।
দরজায় করাঘাতের শব্দ হয়। আনাস্তাসিয়া নড়েচড়ে বসে। ইশারায় অনুমতি দিতেই ক্যামেলিয়া এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে। আরোণ এসেছে। খবর পেতেই ছুটে এসেছে সে। কক্ষে প্রবেশ করেই সে সোজা ইয়ানের শিয়রে গিয়ে দাঁড়ায়। ভালো করে দেখে ছেলেটার অবস্থা। গায়ে কোনো শার্ট না থাকায় ইয়ানের দেহের উপরাংশ উন্মুক্ত। পেটে করা পট্টি এবং বুকের সেই বিশ্রী আঁচড়ে লেপ্টে লাগানো ওষুধও আরোণের নজর এড়ায় না।
আরোণ কোনো কথা না বলে নিজের নেকড়ে সত্তার কিছুটা অলৌকিক শক্তি ব্যবহার করে। ইয়ানের বুকের আঁচড়ের উপর সে আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয়। কক্ষে উপস্থিত আনাস্তাসিয়া এবং ক্যামেলিয়া নীরবে দেখে সবটা। হাত বুলিয়ে দিয়ে আরোণ সরাসরি আনাস্তাসিয়ার পানে তাকিয়ে বলে,
“ দাগ মিলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা নেই আমার। সেটা বোধহয় ওর শরীরে আজনম রয়ে যাবে। তবে আঁচড়ের জায়গাটুকুতে আর কোনো ব্যথা অনুভব করবে না। “
এট্টুক বলেই আরোণ আবার ইয়ানের পেটের পট্টির পানে তাকায়। সেদিকে তাকিয়ে থেকেই সে বলে উঠে,
“ নেকড়ে হওয়ার দরুণ আঁচড়ের ব্যথা উপশমের ক্ষমতা আছে আমার। তবে এটা বেশি গভীর ক্ষত। এ-র কোনো উপশম আমার কাছে নেই। “
আনাস্তাসিয়া রা শব্দ করে না। কি বলবে সে? আরোণ যে তার ছেলের এক বিন্দু যন্ত্রণা কমাতে সক্ষম হয়েছে সেটার জন্যই সে কৃতজ্ঞ। বাকি যন্ত্রণাটুকু না-হয় সময় এবং প্রকৃতিই কমিয়ে দিবে। ইয়ান কেবল সুস্থ হওয়াটাই জরুরী।
__________
কাউন্টের কক্ষ থেকে বেরিয়ে করিডর ধরে হেঁটে প্রাসাদের উন্মুক্ত ঝুল বারান্দাটায় এসে দাঁড়ায় ক্যামেলিয়া। ভোরের মুক্ত বাতাসে চোখ বুজে নিঃশ্বাস নেয় সে। ভেতরটা কেমন অস্থির লাগছে তার। গতরাতে ইয়ানের অবস্থা দেখে তার পাগল প্রায় অবস্থা ছিলো। সে সুযোগ বুঝে একা নিজের কক্ষে ছুটে গিয়েছিলো। দরজাটা ভেতর থেকে আটকে কক্ষে ওরেল রদ্রিগেজকে আহবান জানিয়েছিলো সে।
ওরেল এসেছিল। ক্যামেলিয়া কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে ওই অতৃপ্ত আত্মাটার কাছে সাহায্য চেয়েছিল। তবে ওরেল স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, অন্য কারো কোনো ধরনের সাহায্য করার ক্ষমতা তাকে দেওয়া হয় নি। তার ক্ষমতার কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। ক্যামেলিয়া অতঃপর জানতে চেয়েছিল, ক্যামেলিয়ার এমন কোনো ক্ষমতা আছে কি-না যেটা ব্যবহার করে সে নিজের ভাইয়ের সাহায্য করতে পারবে?
ক্যামেলিয়ার প্রশ্নের জবাবে ওরেল কেবল হেসে বলেছিল,
“ তুমি খুব বোকা ক্যামেলিয়া। তোমার ধারণা তোমার নেকড়ে সত্তা তোমাকে বিশেষ এবং ক্ষমতাধর বানিয়েছে। তবে তোমার ধারণা ভুল। আদৌতে তুমি খুবই দূর্বল প্রকৃতির একটা নেকড়ে মানবী। নিজের রূপ বদল এবং হাওয়ায় বেগে দৌড়ানোর ক্ষমতা বাদে আর বিশেষ কোনো ক্ষমতাই নেই। এর পিছনে দায়ী তোমার পিতামাতার রক্ত। ভিন্ন দুটো সত্তার রক্ত তোমার দূর্বলতার কারণ। না তুমি পুরোপুরি মানুষ হিসেবে বাঁচতে পারছো আর না তো নেকড়ে হিসেবে বাঁচতে পারছো। “
এতটুকু বলেই ওরেল হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছিলো। তবে তার বলে যাওয়া কথাগুলো ক্যামেলিয়ার মন এবং মস্তিষ্কে গেঁথে রয়ে গিয়েছে। এখনো এই কথাগুলো তার মাথায় ঘুরছে। ক্যামেলিয়ার ভাবনার মাঝেই বারান্দায় এসে কেউ উপস্থিত হয়। ক্যামেলিয়া টের পায় তার উপস্থিতি। তবে নিজ থেকে সেধে কিছু বলে না সে। কেভই গলা ঝেড়ে কথা শুরু করে,
“ আপনার এখন বিশ্রাম নেওয়া উচিত লুনা। সারারাত জেগে ছিলেন। কাউন্টের প্রাথমিক চিকিৎসা ঠিকঠাক ভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। “
ক্যামেলিয়া শূন্যে তাকিয়ে জবাব দেয়,
“ আমার চিন্তা আপনার না করলেও চলবে, প্রধান সেনাপতি। হিংস্র জানোয়ার আমি, ভুলে গেলেন? সহজে ক্লান্তি ধরে না আমাকে। “
কেভ থতমত খায়। অতঃপর হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে। একটা ভুল বুঝাবুঝির জন্য বুঝি এখন তাকে সারাজীবন ত্যাড়া কথা শুনে যেতে হবে? কেভ নিজের হতাশা চেপে গিয়ে বলে,
“ আমি আবারও ক্ষমা চাইছি। ভুল বুঝেছিলাম আপনাকে। না জেনেশুনে এতো গুলো কথা শোনানো ঠিক হয় নি আমার। “
ক্যামেলিয়া এবার বিরক্ত হয়। সে সরাসরি কেভের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,
“ আপনার ভুল বুঝাবুঝি এবং ক্ষমা চাওয়ার পর্ব শেষ হলে আপনি যেতে পারেন। দয়া করে আমাকে একা ছেড়ে দিন। সবকিছু বিষাক্ত লাগছে আমার, আপনার উপস্থিতিটাও। “
অন্য সময় হলে বোধহয় কেভ অপমানিত বোধ করে সঙ্গে সঙ্গে এখান থেকে প্রস্থান করতো। তবে আজ সে গেলো না। বরং দাঁড়িয়ে থেকে ক্যামেলিয়ার পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করলো। প্রশ্ন করলো,
“ কি হয়েছে লুনা? আমাকে বলতে পারেন। আপনাকে অস্থির দেখাচ্ছে। “
ক্যামেলিয়ার মন খারাপ ছিলো। সে-ই খারাপ মনটাকে সে বেশিক্ষণ লুকিয়ে রাখতে পারলো না। হতাশ ভঙ্গিতে দু'হাতে কপাল চেপে ধরে বলে,
“ আমি কি? মানুষ নাকি নেকড়ে? আমার পরিচয় কি? নিজেকে নেকড়ে বলতে গেলে আমি আটকে যাই৷ কারণ আমি পুরোপুরি নেকড়ে নই। নেকড়েদের মতো বিশেষ বিশেষ কোনো ক্ষমতা নেই। নামমাত্র কেবল গতিশক্তি এবং রূপ বদলানোর ক্ষমতাটুকুই আছে আমার। আবার মানুষ… আমি তো মানুষও নই। তাহলে কি আমি? এতো অদ্ভুৎ কেন আমার জীবন? তোমাদের সবার মতো সাধারণ একটা মানুষ হলেও আমার জীবনটা কি সুন্দর হতো! আমার মা তো মানুষ ছিলেন। উনি আমাকে পেটে ধারণ করেছিলেন। তাহলে আমি উনার মতো স্বাভাবিক মানুষ হলাম না কেন? আর যদি নেকড়েই হতে হতো, তাহলে পুরোপুরি একটা নেকড়ে কেন হলাম না আমি? “
আরোণ সবেই কাউন্টের কক্ষ থেকে বেরিয়ে এদিক দিয়ে যাচ্ছিলো। পথিমধ্যে ক্যামির কণ্ঠ শুনে সে এক পলের জন্য দাঁড়ায়। শুনে নিজের মেয়ের মন খারাপের গল্প। অতঃপর সঙ্গে সঙ্গেই সেখান থেকে প্রস্থান করে।
কেভের হঠাৎ খুব মায়া হয়। সে নরম গলায় বলে,
“ আপনি ক্যামেলিয়া। ক্যামেলিয়া রদ্রিগেজ। এটাই আপনার পরিচয়। “
ক্যামেলিয়ার এহেন শান্তনা বাক্য শুনতে মোটেও ভালো লাগে না। সে কথা না বাড়িয়ে দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করে। কেভ এক মুহূর্তের জন্য দাঁড়িয়ে রয় বারান্দাটায়। অদ্ভুৎ ব্যাপার হলো তার মনটাও এখন খারাপ লাগছে। মন খারাপ লাগাটা কি কোনো সংক্রমণ রোগ নাকি?
__________
মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে বেহজাদ। সৈন্যদের হাতে মার খেতে খেতে শেষ রাতের দিকে বেহুশ হয়েছে সে। হাত খোলা থাকা অবস্থায় তাকে সামাল দিতে বেগ পোহাতে হচ্ছিলো বলে, সৈন্যরা তার দু-হাত নিয়ে পিঠের পিছনে বেধে পরে তাকে মেরেছে। আব্দুলের অবস্থায়ও ব্যতিক্রম নয়। জেইলানকে অবশ্য চাবুক দ্বারা আঘাত করে রক্তাক্ত করা হয়েছে।
মেঝেতে পড়ে থাকা বেহজাদের জ্ঞান ফিরলো তার মুখে এক পশলা পানি ছিটিয়ে মারার পর। বেহজাদ পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাতে চায়৷ তবে পারে না। তবে সে অনুভব করে কেউ একজন তার হাতের বাধন খুলছে। চোখ বুজে রেখেও বেহজাদের বুঝতে অসুবিধা হয় মানুষটা কে হতে পারে। তবে সে অস্ফুটে উচ্চারণ করে,
“ জেইলান! “
দঁড়ির বাধন খুলতে ব্যস্ত নাওমির হাত জোড়া থেমে যায়। সে থম মেরে কিছুক্ষণ বসে থাকে। অতঃপর উঠে এসে বেহজাদের মুখোমুখি বসে। বেহজাদ ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায়। উঠে বসার বৃথা চেষ্টা করে না। শরীরে একবিন্দু শক্তি নেই তার। নাওমিকে নিজের সামনে দেখতেই সে সবার আগে প্রশ্ন করে,
“ জেইলান? ও কোথায়? ও ঠিক আছে? “
নাওমি নীরবে দেখে বেহজাদকে। মুখে বেশ ভালোই মারের দাগ দেখা যাচ্ছে। ঠোঁটের একপাশ কেটে রক্ত বের হচ্ছে। নাওমি হাত বাড়িয়ে একবার ছুঁয়ে দিতে চায় ঠোঁটের একপাশটা। পরমুহূর্তেই নিজেকে সংযত করে সে ঘৃণা মিশ্রিত স্বরে বলে,
“ তোমার বোনের কারণে আমার ভাই মরতে বসেছিলো। “
বেহজাদ এসবের তোয়াক্কা করলো না। সে আবার প্রশ্ন করে,
“ জেইলান কেমন আছে? “
নাওমি আবারও রাগ নিয়ে উত্তর দেয়,
“ আমার ভাইকে খুন করার চেষ্টা করেছে ওই মেয়ে। “
বেহজাদও এবার রাগী স্বরে চেঁচায়,
“ জেইলান কোথায়, নাওমি? “
নাওমি এবার ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
“ তোমার শুধু ওর জন্যই পরোয়া? “
বেহজাদ অকপটে স্বীকার করে,
“ হ্যাঁ। “
নাওমি মাথা নত করে একটা হতাশার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। অতঃপর বেহজাদের পানে তাকিয়ে বলে,
“ ফাঁসি হবে তোমাদের তিনজনের। রাজমাতা আদেশ দিয়ে দিয়েছেন। আজই এই শাস্তি কার্যকর করা হবে। “
বেহজাদ এ-ই পর্যায়ে উঠে বসার চেষ্টা করলো। নাওমি ওকে সাহায্য করে। বেহজাদ চিন্তিত ভঙ্গিতে কিছু একটা ভাবছে। নাওমি তাকে আশ্বস্ত করে বলে,
“ সিদ্ধান্ত নাও। শোধবোধের কথা বলেছিলাম না? আমি শোধবোধ করতে প্রস্তুত। তোমাকে এবং আব্দুলকে পালাতে সাহায্য করতে প্রস্তুত আমি। কেউ কিছু জানবে না। “
বেহজাদ সাথে সাথে বলে,
“ অসম্ভব। জেইলানকে রেখে আমি কখনো কোথাও যাবো না। প্রয়োজন নেই আমার কোথাও যাওয়ার। “
নাওমি জেদ নিয়ে বলে,
“ বুঝার চেষ্টা করো। তোমাকে এবং আব্দুলকে ক্ষমা করতে পারবো আমি। কিন্তু তোমার বোনকে নয়। ওকে আমি কক্ষনো ক্ষমা করতে পারবো না। ওর মতো একটা মাথামোটা মেয়ের জন্য তুমি এবং আব্দুল কেন নিজেদের জীবন শেষ করবে? “
বেহজাদ সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক করে,
“ মুখ সামলে। কাকে মাথামোটা বলছো তুমি? “
নাওমিরও মেজাজ গরম হয়। সে রাগ নিয়ে বলে,
“ নিজের বোনপ্রীতি নিয়ে নরকে যাও তুমি। কিন্তু আমি ওকে কক্ষনো ক্ষমা করবো না। নিজের ভাইয়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে রাজি নই আমি। “
বলেই নাওমি উঠে হনহনিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে যায়। বেহজাদ দুঃশ্চিন্তা নিয়ে বসে রয়। আজকে সত্যি সত্যিই তাদের ফাঁসি কার্যকর হবে? আজকেই তাদের মৃত্যু হবে? জেইলানকে রক্ষা করার এতো প্রচেষ্টা সব তবে বৃথা গেলো?
চলবে…