প্রণয়তিথি
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৪৮.
গ্রীক কাউন্ট এবং তার পুত্র প্রিন্স এনাটোডা একত্রে শিকারে বেরিয়েছেন আজ। দু'জনের চোখে মুখেই আসন্ন বিজয়ের চমৎকার হাসি ঝুলি আছে। বিজয় সুনিশ্চিত না হতেই তারা নিজ মনে নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে যে জয় তাদেরই হবে। অগ্রীম জয় উদযাপন তাদের স্বভাবে মিশে আছে যেনো।
গহীন জঙ্গলের অন্তরায় আলিশান আসনে জায়গা পেতে বসে আছেন কাউন্ট। আয়েশ করে বসে তিনি দেখছেন স্বীয় পুত্রের তীর নিশানা। প্রথম নিশানাতেই ছেলে একটা পাখি ঘায়েল করতে সক্ষম হলেই পিতার ঠোঁটের কোণে আত্মবিশ্বাসের হাসি ফুটে উঠে।
প্রিন্স এনাটোডা ঠোঁটের কোণে ক্রুর হাসি নিয়ে পিতার পানে এগিয়ে আসতে আসতে বলে,
“ বুঝলেন, কাউন্ট? পাখি শিকার আপনি পুত্রের জন্য বা হাতের খেল। দু'দিন পর তুরস্কের রাজ পরিবারের একমাত্র পাখিটাকেও শিকার করে নিজের খাঁচায় বন্দী করে ফেলবো আমি। “
কাউন্ট এ-ই পর্যায়ে কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বলে,
“ তোমার মন মস্তিষ্কে কেবল ওই রাজকুমারীই আটকে আছে। “
প্রিন্স এনাটোডা পিতার পাশের আসনটায় বসে একটা তরল পানীয়ের গ্লাস হাতে তুলে নেয়। অতঃপর একটা চুমুক দিয়ে বলে,
“ ও-ই রাজকুমারী সেজে গুজে নিজ কামরায় ফুলের মতো বসে থাকা রমণী নয়। সাহস নিয়ে আগুনে ঝাঁপ দিতে জানা কাঁটা সে। আর কাঁটার প্রতি আপনার ছেলের ঝোঁক ছোটবেলা থেকেই রয়েছে। “
কাউন্ট ছেলের কথায় সামান্য হাসে। অতঃপর কিছুটা চিন্তিত ভঙ্গিতে বলে উঠে,
“ বুড়োটার কৈ মাছের প্রাণ। সে-ই কবে অসুস্থ হলো! এখনো নাকি পুরোপুরি দমটা ফুরোয় নি। একটা সুখবরের অপেক্ষায় আমার দিন রাত্রি কাটছে। কবে যে খবর পাবো যে বাদশাহ কামরান আতাউল্লাহ টপকে গিয়েছে! “
“ আপনি চিন্তা করবেন না পিতা। এক দু'দিনের মধ্যেই দেখবেন সু খবরটা পেয়ে গিয়েছেন। তারপর খেলা জমে ক্ষীর হয়ে যাবে। মূর্খ বাদশাহ বেগমকে আমরা যেভাবে নাচাচ্ছি, সেভাবে তুরস্ক এবং রোমানিয়ার সকলকে নাচাবো। আপনি এবং আমি বসে নৃত্য উপভোগ করবো। “
কাউন্ট ছেলের কথায় সন্তুষ্টির হাসি হাসলো। প্রিন্স এনাটোডা এ-ই পর্যায়ে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলে উঠে,
“ আপনি কেবল প্রার্থনা করুন যেনো ও-ই কাউন্ট ইয়ান এবং যুবরাজ বেহজাদ একে অপরকে খুন করে আমাদের পথ সহজ করে দেয়। বর্তমানে আমাদের সবথেকে বড়ো পথের কাঁটা এই দু'জনই। “
__________
প্রধান সেনাপতি কেভকে আজ বেশ দুশ্চিন্তা ঘিরে ধরেছে। ঠান্ডা মাথায় কিছুক্ষণ ভাবার জন্য সে একাকী প্রাসাদের পিছন দিকের জঙ্গলটায় এসে ঘোরাফেরা করছে। কাউন্টের সঙ্গে এদিকটায় প্রায়ই হাঁটতে আসা হয় তার। এই পথ ধরেই হাঁটতে হাঁটতে কাউন্ট নিজের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা নিয়ে তার সঙ্গে আলোচনা করেন।
তবে আজ যা পরিকল্পনা সাজানোর তা কেভের একাই সাজাতে হবে। আপাতত কাউন্টের শারীরিক পরিস্থিতি এসব ঝুট ঝামেলা সামলানোর মতো নেই। একদিকে রাজমাতার আদেশ। অপরদিকে বেহজাদ এবং জেইলানের আসল পরিচয়। একজন যুবরাজ এবং রাজকুমারীকে তো আর বললেই ফাঁসিতে ঝুলানো যায় না। দুটো রাজ্যের কূটনৈতিক সম্পর্কেও এ-র প্রভাব পরার ঝুঁকি রয়েছে। তাছাড়া এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়ে কাউন্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাদে আর কারো আদেশ পালনে কেভের মন সায় দিচ্ছে না।
কেভ আরো বেশ কিছুক্ষণ একা হাঁটে। কি করা যায়, কি করা যায় ভাবতে ভাবতে অবশেষে সে একটা উপায় খুঁজে পায়। যদিও মনে মনে এখনো সে চিন্তিত, তবে আপাতত এটাই একমাত্র পথ তার জন্য।
__________
নিজ কক্ষে উদাস মনে বসে আছে প্রিন্সেস নাওমি। কেবলমাত্র ভাইয়ের কক্ষ থেকে ঘুরে এলো সে। কাউন্ট ইয়ান আলবার্টের পরিস্থিতি এখনো একই রকম। মাঝে দুপুরের দিকে কিছুক্ষণের জন্য জ্ঞান ফিরেছিল। তবে সেলাই এবং জখমের পীড়ায় ছটফট করছিলো দেখে চিকিৎসকরা আবার ঘুমের ওষুধ দিয়েছে। এখন কাউন্ট ঘুমাচ্ছেন।
এইতো আর কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যা নামবে। অতঃপর রাত। এই রাতেই বেহজাদ, জেইলান এবং আব্দুলের ফাঁসির আদেশ কার্যকর করার হুকুম দিয়েছেন রাজমাতা। সময়ের বালু ঘড়িটা যেনো আজ দ্রুত গড়িয়ে পড়ছে। নাওমির খুব অস্থির লাগছে। বেহজাদ এবং আব্দুলের জন্য মনে মায়া অনুভব করছে সে।
এটা সত্যি যে বেহজাদ তাকে অপহরণ করেছিলো। আব্দুলও কোনো না কোনো ভাবে এই অপহরণের ভাগিদার। এই সত্যটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তবে এসবের জন্য শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের আদেশটা মেনে নিতে নাওমির কষ্ট হচ্ছে। সে তো এরকম আবেগে ভেসে যাওয়া মেয়ে ছিলো না। তাহলে কি হচ্ছে ওর সাথে এসব? কেন হচ্ছে? ঈশ্বর জানেন এই আবেগ তাকে কতদূর ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।
নাওমি কক্ষ জুড়ে পায়চারী করতে থাকে। কিছু একটা অবশ্যই ভাবতে হবে তার। কি করা যায়? কি করে বেহজাদ এবং আব্দুলকে বাঁচানো যায়? কি করে বেহজাদের এ-ই বোন প্রীতি দূর করা যায়? কোনো তো একটা উপায় থাকবে!
হুট করেই নাওমি একটা বুদ্ধি ভেবে পায়। সে স্থির দাঁড়িয়ে রয়। মন স্থির করে যে, যেমন কুকুর তেমন মুগুর মন্ত্র প্রয়োগ করবে সে। ও-ই লোক জেদ দেখাতে জানলে কি হবে? নাওমিও এতো সহজে হাল ছাড়বে না। সে-ও এর শেষটা দেখে ছাড়বে।
_________
প্রাসাদ প্রাঙ্গণে বেশ জোরালো নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে ফাঁসির মঞ্চ সাজানো হয়েছে। প্রাসাদের মধ্যবর্তী বিশাল ঝুল বারান্দাটায় এসে দাঁড়িয়েছে রাজমাতা আনাস্তাসিয়া। তার পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে ম্যাথিউ এবং স্যাফিরা। ক্যামেলিয়া অবশ্য এখানে উপস্থিত হয় নি। সে নিজের ভাইয়ের শিয়রে রয়ে গিয়েছে। তবে প্রিন্সেস নাওমি এবং প্রধান সেনাপতি কেভও রাজমাতার পিছনেই নির্লিপ্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
আনাস্তাসিয়া মনে মনে উদগ্রীব হয়ে আছে। সে চাইছে যত দ্রুত সম্ভব এ-ই আপদ গুলোকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে এদের অধ্যায় শেষ করতে। ম্যাথিউ এবং স্যাফিরারও একই চাওয়া। তাদের মেয়ের অপহরণকারী এবং কাউন্টের হত্যা চেষ্টাকারীদের প্রতি ন্যূনতম সহমর্মিতা নেই তাদের মনে।
সময় গড়ায়। ফাঁসির মঞ্চের সকল প্রস্তুতি শেষ। এবার কয়েদীদের নিয়ে আসার পালা। আনাস্তাসিয়া মনে মনে অস্থির অনুভব করছে। তার মন বলছে ভুল করেও তার ছেলে যদি এখন হুশে ফিরে এ-ই ঘটনা শুনে তবে এই ফাঁসিতে বাধা দিবে। এজন্যই তিনি ক্যামেলিয়াকে বলে এসেছেন যেনো ইয়ানের জ্ঞান ফিরলেও তাকে কিছু না জানানো হয়।
রাজমাতা আনাস্তাসিয়ার এতো সব চিন্তা ভাবনার মাঝেই হন্তদন্ত ভঙ্গিতে একজন সৈন্য এসে ঝুল বারান্দাটায় উপস্থিত হয়। ম্যাথিউ এবং স্যাফিরা সহ আনাস্তাসিয়া ঘুরে তাকায় সৈন্যের পানে। ভীত-সন্ত্রস্ত স্বরে সৈন্য জানায়,
“ রাজমাতা, কয়েদী তিনজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কারাগারের বাহিরে সকল প্রহরীকে মেরে বেহুশ করে রাখা হয়েছে। কারাগার তিনটা সম্পূর্ণ ফাঁকা। “
আনাস্তাসিয়ার প্রতিক্রিয়া বুঝা গেলো না। ম্যাথিউকে রাগে উত্তেজিত দেখালো। স্যাফিরাকে দেখালো চিন্তিত। কেবলমাত্র প্রধান সেনাপতি কেভ এবং প্রিন্সেস নাওমির প্রতিক্রিয়াই বেশ নির্লিপ্ত দেখা গেলো। সামান্যতম বিচলিত হলেন তারা। দু'জনের মুখের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা মুশকিল এই সম্পূর্ণ ঘটনায় আসলে কার হাত আছে?
চলবে…