প্রণয়তিথি
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৪৯.
দো তলার কাঠের তৈরী বাড়িটার আনাচে কানাচে লণ্ঠন ঝুলছে। সে-ই লণ্ঠনের ভেতর জ্বলতে থাকা আগুনে বাড়িটাকে বেশ আলোকিত দেখাচ্ছে। জনমানব পূর্ণ বসতি থেকে ক্ষানিকটা দূরে জঙ্গলের ধারে অবস্থিত এই বাড়িটি মোটামুটি বেশ জায়গা বহুল দেখতে। বাড়ির ধারেই রয়েছে একটা ছোট্ট লেক। আপাত দৃষ্টিতে সাধারণ দেখতে এ-ই বাড়ির চারিপাশে কড়া নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে বেশ কয়েকজন প্রহরী।
বাড়ির ভেতরে দো তলার একটা কামরায় তিনটা কাঠের চেয়ারে হাত পা বাধা অবস্থায় বসে আছে তিনজন ব্যক্তি। তিনজনের ভেতরে দু'জন বেহুশ। একজনের সদ্য জ্ঞান ফিরলো। সে চারিপাশে চোখ বুলিয়ে বোঝার চেষ্টা করে সে কোথায় আছে। যখন কিছু বুঝে উঠতে পারে না তখন নিজের থেকে ক্ষানিকটা দূরে বেহুশ হয়ে থাকা দুই ব্যক্তিকে ডাকতে থাকে,
“ ভাইজান… ভাইজান… আব্দুল। উঠুন আপনারা। চোখ খুলুন। “
জেইলানের ডাকে বেহজাদের ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে প্রথমে। সে চোখ পিটপিট করে মেলে তাকায়। হতবুদ্ধির ন্যায় চারিপাশে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করে সে কোথায় আছে। তখন-ই তার চোখ পড়ে নিজের বোনের পানে। সঙ্গে সঙ্গে সে চিন্তিত ভঙ্গিতে বোনের দিকে এগিয়ে আসার জন্য উঠে দাঁড়াতে নেয়। তবে অনুভব করে তার হাত এবং পা চেয়ারের সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা। বেহজাদ চিন্তিত স্বরে বোনকে প্রশ্ন করে,
“ জেইলান! ঠিক আছো তুমি? “
জেইলান দ্রুত মাথা নেড়ে বলে,
“ আমি ঠিক আছি ভাই। আপনি? ইন্না-লিল্লাহ! আপনার হাতের বাহু থেকে অনেক রক্ত ঝরেছে মনে হচ্ছে। আপনার ঠোঁট নাক থেকেও। “
বেহজাদ জানে আঘাত তার বোনকেও করা হয়েছে। তবে এ-ই মুহূর্তে সেটা নিয়ে প্রশ্ন করে খুব একটা লাভ নেই। বেহজাদের দুই হাত পা বাঁধা। চাইলেও সে এখন ছুটে গিয়ে নিজের বোনকে মুক্ত করতে পারবে না। এই না পারাটা বেহজাদকে খুব অসহায় বোধ করাচ্ছে।
জেইলান বলে উঠে,
“ ভাইজান, আব্দুলকে ডাকুন। “
বেহজাদ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে তার পাশেই এক হাত দূরত্বে একটা চেয়ারে বেহুশ অবস্থায় বাঁধা রয়েছে আব্দুল। মার খেয়ে তারও নাক চোখ মুখ কালো হয়ে গিয়েছে। বেহজাদের খারাপ লাগলো। সে কিছুটা নরম স্বরে ডাকে,
“ আব্দুল! আব্দুল! উঠো। এই আব্দুল। চোখ মেলে তাকাও। “
আব্দুলের ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরতে শুরু করে। জেইলান এবং বেহজাদ তাকে পুরোপুরি সজাগ হওয়ার সময় দেয়। আব্দুল চোখ মেলে সামনে যুবরাজ এবং রাজকুমারীকে জীবিত দেখে আপ্লুত হয়। অতঃপর চারিপাশে চোখ বুলাতেই সে আশ্চর্য স্বরে বলে,
“ এটা কোন জায়গা? কোথায় আছি আমরা? আর আমাদের হাত পা এভাবে বাঁধা কেন? “
বেহজাদ বলে,
“ সেটা তো আমরাও জানি না। আমার যতদূর মনে পড়ে আমাকে খাবার এবং পানি এনে দেওয়া হয়েছিলো। তেষ্টা পেয়েছিলো তা-ই আমি পানিটুকু পান করেছিলাম। তারপর হুট করেই খুব ঘুম পাচ্ছিলো। বাকি আর কিছু মনে নেই আমার। “
জেইলান সুর মিলায়,
“ আমারও। “
আব্দুল দুই ভাই-বোনের কথা শুনে নিজের বেকার মস্তিষ্ক খাটিয়ে একটা যুক্তি খুঁজে বের করে। সে বলে উঠে,
“ ইয়া রাব! ওরা আমাদের অজ্ঞান করে খুন করে ফেলে নি তো? আমরা কি তারমানে মৃত? “
বেহজাদ এবং জেইলান দু'জনই আব্দুলের বেহুদা কথায় বিরক্ত হয়ে বলে উঠে,
“ আজেবাজে বকবে না, আব্দুল। “
আব্দুল দমে না। তাকে ভীত দেখায়। সে ব্যস্ত স্বরে বলে,
“ আমি ভুল নই। আপনাদের কি মনে হয় ওরা আমাদের না মেরে মোহাব্বতের শরবত খাওয়াবে? উঁহু, কক্ষনো না। ওরা নিশ্চিত আমাদের মেরে ফেলেছে। এই-যে আমরা কথা বলছি, এটা বাস্তবিক অর্থে আমরা নই। বরং আমাদের রূহ কথা বলছে একে অপরের সঙ্গে। আল্লাহ জানে, এরা আমাদের লাশ জানাজা পড়িয়ে দাফন করেছে কি-না। “
জেইলান বিরক্তিকর সুরে বলে,
“ ভাইজান, আব্দুল পাগল হয়ে গিয়েছে। গতরাতে বোধহয় সৈন্যরা ওর মাথায়ও মেরেছিল। এজন্য আজেবাজে বকছে। “
আব্দুল এবার কিছুটা রাগান্বিত হয়। নিজের সীমা লঙ্ঘন করে সে বলে বসে,
“ হতে পারে আমি ভুল বলছি। আপনাদের কথা অনুযায়ী মেনে নিলাম আমি ভুল। কিন্তু আপনারা? আপনারা কি ঠিক বলুন? বারবার করে আপনাদের বুঝিয়েছি নিজেদের জেদ ছেড়ে রাজ্যে ফিরে চলুন। আপনারা আমার কথা শুনেন নি। সাধারণ এক প্রজা বলে আমার কথার ভার অবশ্যই সামান্য। তবে আমার আল্লাহ সাক্ষী, আমি একটাও কথা ভুল বলি নি। প্রতিশোধ, প্রতিশোধ, প্রতিশোধ! কি পাবেন প্রতিশোধ নিয়ে? যুবরাজ দেনিজ তার প্রাণ ফিরে পাবে? পাবে না। যে যাওয়ার সে চলে গিয়েছে। আপনাদের উচিত ছিলো যুবরাজের মৃত্যুর পর নিজেদের রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করা। যুবরাজ বেহজাদ, আপনার কি নিজেকে যোগ্য শাসক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পরিশ্রম করা উচিত ছিলো না? রাজকুমারী, আপনার কি উচিত ছিলো না নিজের চৌকষতা রাজ্যের কাজে ব্যবহার করা? কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় আপনারা অন্ধের মতো প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠেছেন। এখানে এসে একটা নিরপরাধ মেয়েকে অহেতুক অপহরণ করে দিনের পর দিন অত্যাচার চালিয়েছেন। কতো গুলো মানুষকে ধোকা দিয়েছেন। আপনারা চাইলেই পারতেন যুবরাজের খুনীদের শাস্তিটা মহান রবের হাতে ছেড়ে দিতে। উনি নিশ্চয়ই খুনীদের সর্বোচ্চ শাস্তিটা দিতেন। কিন্তু আপনারা কি করলেন? নিজেরা শাস্তি দেওয়ার চক্করে নিজেদের হাত নোংরা করলেন। নিজেদের ব্যক্তিত্বকে কুলষিত করলেন। কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট কতটুকু কি অপরাধী আমার জানা নেই। সেটা আল্লাহই ভালো জানেন। তবে এইটুক আমি হলফ করে বলতে পারি, প্রিন্সেস নাওমি নির্দোষ ছিলেন। উনার উপর করা অবিচার, বিভিন্ন মানুষকে দেওয়া ধোকা এগুলো যদি সময়মতো আপনাদের কাছে ফিরে আসে? তখন কি করবেন আপনারা? “
নিজের ইহজনমে আব্দুল কখনো একসঙ্গে এতোগুলো কথা বলেছে কি-না খেয়াল নেই। তবে আজ সে নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে নি। তার সবুরেরও একটা সীমা রয়েছে। সে জানে তার এভাবে বেয়াদবের মতো কথা বলাটা মোটেও ঠিক হয় নি। তবে সে এটাও জানে যে সে ভুল কিছুই বলে নি। তাই সে আর ক্ষমা চাইলো না।
বেহজাদ এবং জেইলানকে শান্ত দেখালো। বেহজাদ অনুভব করলো আব্দুলের প্রতি তার রাগ হচ্ছে না। উল্টো আব্দুলের বলা কথাগুলোকে ঠিক মনে হচ্ছে তার। আসলেই তো! খুন তো ইয়ান আলবার্ট করেছে! এখানে নাওমির তো কোনো দোষ ছিলো না। কিন্তু ও-ই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছিলো নাওমিকে মোহরার মতো ব্যবহার করাটাও প্রতিশোধের অংশ। এই ব্যবহারে কোনো ভুল নেই। প্রতিশোধের খেলায় সবই জায়েজ।
বেহজাদকে কিছুটা বিবর্ণ দেখালো। অন্যায় তো সে এখনো করছে। নিষ্পাপ একটা মনে প্রেমের বীজ বুনে রেখে এসেছে সে। অথচ বাস্তবে এখানে কোনো প্রেমই নেই। কেবল আছে প্রয়োজন। প্রয়োজনের স্বার্থেই তো নাওমির সঙ্গে ছলনা করছিলো বেহজাদ। যেনো সঠিক সময়ে নাওমিকে ব্যবহার করা যায়। তবে এই সম্পূর্ণ সময়টুকুতে বেহজাদের মনে একবারও প্রেম হানা দিয়েছিলো কি-না তা বুঝা দায়।
জেইলান শান্ত হলেও নরম হলো না। তার মস্তিষ্ক তাকে বলছে,
“ ভাই তুমি হারিয়েছো। আব্দুল তোমার জায়গায় নেই। ও কখনোই তোমার কষ্টটা বুঝতে পারবে না। “
বেহজাদ এ-ই পর্যায়ে ক্লান্ত স্বরে ডাকে,
“ জেইলান? “
“ হু, ভাইজান। “
“ প্রিন্সেস উদ্ধার হওয়ার আগের দিন কেরেম এসেছিলো। বাদশাহ বেগম চিঠি পাঠিয়েছিলেন ওর হাতে করে। চিঠিতে লেখা ছিল বাবা খুব অসুস্থ। চিকিৎসকরা আশা ছেড়ে দিয়েছেন। বুঝতে পারছো? সাম্রাজ্যের ভবিষ্যত হুমকির মুখে। প্রতিশোধের এই নেশা ভুলে নিজেদের পিতার খাতিরে আমাদের যেকোনো মূল্যে রাজ্যে ফিরতে হবে। “
এরকম অনাকাঙ্ক্ষিত একটা খবরে জেইলানকে বাকরুদ্ধ দেখালো। বাবা অসুস্থ মানে? বাবাও কি এখন তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পায়তারা করছে না-কি? এটা কেমন কথা? নিজের বলতে তো কেবল তিনটা মানুষই ছিলো জেইলানের জীবনে। মা, বাবা এবং ভাই। মা এবং ভাই তো ইতিমধ্যে তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। এখন বাবা কি তাকে পুরোপুরি একা করে দিতে চাইছে? জেইলানের থেকে নেওয়ার বেলায় প্রকৃতি এতটা নিষ্ঠুর কেন হয় সর্বদা?
__________
সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রাসাদের আঙিনার এক নীরব জায়গায় এসে হাজির হয়েছে প্রিন্সেস নাওমি। মনে তার বেশ ভয় এবং সংশয় কাজ করছে। এ-ই মুহূর্তে কেউ তাকে দেখে ফেললে পুরো তুলকালাম কাণ্ড বেধে যাবে। আঙিনার শেষ মাথায় একজন সৈন্য অপেক্ষারত ছিলো। নাওমিকে দেখতেই সে মাথা ঝুকিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে বলে উঠে,
“ প্রিন্সেস, আমাকে ক্ষমা করুন। “
নাওমি সন্তুষ্ট ভঙ্গিতে হেসে বলে,
“ ক্ষমা চাইছো কেন? চমৎকার কাজ করেছো তুমি। আমি তো… “
সৈন্য সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠে,
“ আপনার কথার মাঝে কথা বলছি। বেয়াদবি মার্জনা করবেন প্রিন্সেস। কিন্তু আপনাকে একটা জরুরী কথা জানানো প্রয়োজন আমার। ওই তিন কয়েদীর নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে আমি জড়িত নই। আমি তো আপনার আদেশ অনুযায়ী নিজের দল নিয়ে কারাগারের ওখানে গিয়েছিলাম। কিন্তু গিয়ে দেখি কয়েদীরা ইতিমধ্যে ফারার হয়ে গিয়েছে। “
নাওমি বিস্মিত স্বরে বলে,
“ কি বলছো তুমি? তুমি যদি কিছু না করে থাকো তাহলে ওরা লাপাত্তা হলো কি করে? কে করেছে ওদের সাহায্য? “
সৈন্য মাথা নেড়ে বলে,
“ আমার জানা নেই প্রিন্সেস। তবে আপনি এতটুকু নিশ্চিত থাকুন ওদের নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে আমাদের কোনো হাত নেই। এখন আপনার কি আদেশ, প্রিন্সেস? “
নাওমি তখন চিন্তার সাগরে ভাসছে। কারো সাহায্য ব্যতীত কারাগার এবং প্রাসাদের সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালানো বেহজাদদের পক্ষে অসম্ভব। নিশ্চয়ই কেউ তাদের সাহায্য করেছে। তবে সে কে হতে পারে? আর বেহজাদরাই বা এখন কোথায়? নিজেদের রাজ্যে ফিরে যাওয়ার জন্য কি রওনা হয়েছে? কিন্তু সেটাও তো সম্ভব নয়। ম্যাথিউ ইতিমধ্যে কয়েদীদের পালিয়ে যাওয়ার পথ রুখে দিতে সকল নৌ বাহন চলাচল বন্ধের আদেশ দিয়েছে। রাজমাতার আদেশে রাজ্যের প্রতিটা গলিতে সৈন্যরা ছড়িয়ে পড়েছে কয়েদীদের খুঁজে বের করতে।
নাওমির প্রচন্ড রাগ অনুভব হচ্ছে। তার পরিকল্পনা তো এমন ছিলো না। ওই জেইলান নামক মেয়েটা পালিয়ে যাক এটা সে কখনো চায় নি। ওই মেয়েটা যদি এভাবে বেঁচে যায় তাহলে তার ভাইয়ের সঙ্গে খুব অন্যায় হবে। ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে নাওমি নিজের গায়ে জোড়ানো ক্লকের ভেতর থেকে একটা মুদ্রার ছোট্ট থলে বের করে সৈন্যের হাতে গছিয়ে দিয়ে বলে,
“ কয়েদীদের খুঁজে বের করো। যে কোনো মূল্যে ওসের খুঁজে বের করো। ওদের কাছে যেনো সবার আগে আমি পৌঁছাই। “
নাওমির কথা শেষ হতে না হতেই পিছন থেকে একটা ডাক ভেসে এলো,
“ প্রিন্সেস! “
নাওমি চমকে পিছনে ফিরে তাকায়। কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ক্লাডিয়াসকে। ক্লাডিয়াস কেবল এদিকে আসছিলো। দূর হতে নাওমির সৈন্যকে মুদ্রার থলি গছিয়ে দেওয়ার দৃশ্যটা সে দেখতে পেরেছে। তবে ঘটনা কি তা ঠিক সে বুঝতে পারছে না।
নাওমি প্রথমে চমকালেও ক্লাডিয়াসকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। সৈন্যকে ইশারায় প্রস্থানের আদেশ দিয়েই সে ক্লাডিয়াসের পানে এগিয়ে যায়। কিছুটা স্বস্তিদায়ক স্বরে বলে,
“ তুমি! আমি ভেবেছিলাম কে না কে! ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। “
ক্লাডিয়াস সন্দিহান গলায় প্রশ্ন করে,
“ আপনি এখানে কি করছেন? “
নাওমি চটপট উত্তর দেয়,
“ আরে! আমার বাজার থেকে একটা জিনিস আনানোর ছিলো। ওটাই ওই সৈন্যকে আনতে পাঠিয়েছি। “
নাওমির বলা মিথ্যা ধরতে ক্লাডিয়াসের খুব একটা অসুবিধা হয় না। কারণ সাধারণত তার এরকম প্রশ্নের পিঠে নাওমির রেগে জবাব দেওয়ার কথা ছিলো,
“ আমি যা ইচ্ছা করবো। তুমি প্রশ্ন করার কে? এক্ষুণি তোমার গর্দান নেবো। “
ক্লাডিয়াস নাওমিকে আর জেরা করে না। হুট করেই দমকা হাওয়া বয়ে যায় চারিপাশে। সঙ্গে সঙ্গে নাওমির কাধ হয়ে সামনে এনে রাখা চুল উড়ে যেতেই তার গলার একপাশ উন্মুক্ত হয়ে যায়। এতো কিছুর মাঝে তার গলায় রুমাল বাঁধার কথা খেয়াল ছিলো না। ফলস্বরূপ তার গলার কাঁটা দাগটা ক্লাডিয়াসের চোখে পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে ক্লাডিয়াস তীব্র ক্ষোভ অনুভব করে। তার দু'হাতের মুষ্টি শক্ত করে বদ্ধ হয়ে যায়। এ-ই কাজ নিশ্চিত ও-ই অপহরণকারীই করেছে। ক্লাডিয়াসের ইচ্ছে করছে অসভ্যটাকে খুন করে ফেলতে। কিন্তু ও-ই কয়েদী কোথায় পালিয়েছে কে জানে!
ঠিক সে-ই মুহূর্তেই সেখানে উপস্থিত হয় জোসেফ। দূর হতে নিজের ছেলে এবং প্রিন্সেসকে এভাবে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জোসেফের চোয়াল হা হয়ে যায়। অতঃপর নিজের ছেলের দৃষ্টি প্রিন্সেসের গলার পানে দেখতেই রাগে সে চেঁচিয়ে উঠে,
“ ক্লাডিয়াস! “
নাওমি এবং ক্লাডিয়াস দু'জনই চমকে পাশ ফিরে তাকায়। এরকম অকস্মাৎ ডাকে নাওমি ভয় পেয়েছে কিঞ্চিৎ। সে বিরক্তি নিয়ে বিড়বিড়িয়ে উঠে,
“ যেমন বাপ, তেমন ছেলে। “
কথাটা ক্লাডিয়াস শুনতে পায়। নাওমি আর অপেক্ষা করে না। সে বিরক্তি নিয়েই সেখান থেকে প্রস্থান করে। ক্লাডিয়াস তার যাওয়ার পানে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। জোসেফ ছেলের এই দূর্দশা দেখে এগিয়ে এসে ছেলের মাথায় একটা গাট্টা মেরে বলে,
“ গাধার বাচ্চা! কি করছো তুমি? তোমার সাহস কি করে হয় প্রিন্সেসের দিকে ওরকম নোংরা দৃষ্টিতে তাকানোর? “
ক্লাডিয়াস বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করে,
“ নোংরা দৃষ্টি? “
জোসেফ রেগে গিয়ে বলে,
“ একদম মাসুম সাজবে না তুমি। কি ভেবেছো আমি দেখি নি তুমি প্রিন্সেসকে কিভাবে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছিলে? অসভ্য কোথাকার! ঈশ্বর, আমার মেয়ে দুটোই তো ভালো ছিলো! শেষ বয়সে এই ছাগলকে আমার ঘরে কেন পাঠালে তুমি? এ তো একা ডুববে না। আমাকে নিয়ে একসঙ্গে ডুববে! “
ক্লাডিয়াস নিজের পিতার কথার অর্থ বুঝতে পারে না। সে তাই আর সময় অপচয় না করে সেখান থেকে প্রস্থান করে। এভাবেও আপাতত তার জরুরী একটা কাজ করতে হবে।
__________
বেহজাদ, জেইলান এবং আব্দুল এভাবে হাত পা বাধা অবস্থায় লম্বা সময় ধরে বসে আছে। এ-ই পর্যায়ে আব্দুল আর না পেরে বলে উঠলো,
“ অনেক সহ্য করেছি। এ-ই সাদা চামড়া গুলোর কি মাথায় আক্কেল জ্ঞান বলতে কিছু নেই নাকি? হাত পা বেধে রাখার কোনো মানে হয়? মানুষের প্রকৃতির ডাক পেলে সে কি করবে? প্রকৃতির ডাকের কি কোনো মূল্য নেই নাকি? “
আব্দুলের কথায় জেইলান এবং বেহজাদ দু'জনই অপ্রস্তুত বোধ করলো। এই বেচারার মাথা আউলে গিয়েছে তা বুঝতে বাকি নেই তাদের। বেহজাদ মৃদু স্বরে ধমকে বলে,
“ চুপ করো, আব্দুল। “
আব্দুল মুখ কালো করে চুপ হয়ে যায়। ঠিক সে-ই মুহুর্তেই কামরার দরজা খোলার শব্দ হয়। বন্দী তিনজনই আগ্রহ নিয়ে তাকায় দরজার পানে। খোলা দরজার দ্বারে দাঁড়িয়ে থাকা প্রধান সেনাপতিকে দেখে তিনজনই বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। কোনো এক অজানা কারণে বেহজাদ ভেবেছিলো এই কাজে নাওমি জড়িত। তবে প্রধান সেনাপতিকে সে এখানে মোটেও আশা করে নি।
কেভ গম্ভীর মুখে কামরায় প্রবেশ করে। তার পিছু পিছু প্রবেশ করে আরো তিন জন প্রহরী। বন্দীদের কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কেভ সরাসরি জেইলানের পানে তাকিয়ে বলে উঠে,
“ তোমাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে। “
বেহজাদ সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে,
“ কোথাও যাবে না ও। “
কেভ অহেতুক শব্দ খরচ করে না। সে কেবল প্রহরীদের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ইশারা করে। সঙ্গে সঙ্গে দু'জন প্রহরী গিয়ে বেহজাদ এবং আব্দুলের পিছনে দাঁড়িয়ে তাদের গলায় ছুরি চেপে ধরে। আব্দুল চেঁচিয়ে উঠে,
“ আরে! আরে! আমি কি করেছি? কি হচ্ছে এসব? আমি তো কেবল শৌচালয়ে যেতে চাচ্ছিলাম। “
আব্দুলের কথাকে কেউ খুব একটা গুরুত্ব দিলো না। কেভ আবারও জেইলানের দিকে তাকিয়ে বলে,
“ সিদ্ধান্ত তোমার। কোনো চালাকি করার চেষ্টা করলে এই দু'জনের গলায় চাকু চালানোর আগে আমার প্রহরীরা একবারও ভাববে না। “
জেইলানের চোখ থেকে আগুন ঝড়ছে। পারলে সে এক্ষুনি কেভকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। তবে বাধ্য হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে সে বলে,
“ আমি যাবো। “
চলবে…