প্রণয়তিথি
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৫০.
প্রাসাদ থেকে ক্ষানিকটা দূরের পথে এক নিরিবিলি সরু গলিতে এক সৈন্যকে ধারালো খঞ্জর তাক করে চেপে ধরে রেখেছে ক্লাডিয়াস। বেশ ভদ্র ভঙ্গিতে সে সৈন্যটাকে নিচু স্বরে প্রশ্ন করে,
“ প্রিন্সেস তোমাকে কি কারণে মুদ্রা দিয়েছে সত্যি করে বলো। “
সৈন্য কিছুতেই নিজের মুখ খুলতে রাজি নয়। সে পাল্টা দাপট দেখিয়ে বলে,
“ তুমি নিজের সীমা পাড় করছো ক্লাডিয়াস। আমি প্রধান সেনাপতির কাছে তোমার নালিশ নিয়ে যাবো। এসব কেমন অসভ্যতা? “
ক্লাডিয়াস শান্ত থেকেই বলে,
“ প্রিন্সেস এবং তোমার মাঝে কি নিয়ে চুক্তি চলছে তা জানাটা আমার জন্য জরুরী। চুপচাপ আমাকে বলে দাও, কেউ-ই জানবে না কিছু আমি কথা দিচ্ছি। কিন্তু তুমি হম্বিতম্বি করলে আমিও আক্রমণাত্মক হতে বাধ্য হবো। “
সৈন্যকে কিছুটা ভীত দেখালো। ক্লাডিয়াস যে মজা করছে না তা স্পষ্ট। ইতিমধ্যে খঞ্জরের ধারালো অংশ তার গলা স্পর্শ করে আছে। কি এক মুসিবত! প্রিন্সেসের গোপন কথা ফাঁস করলে আবার প্রিন্সেসও তার প্রাণ নিয়ে নিবে! সৈন্য রয়েসয়ে বললো,
“ প্রিন্সেস আমাকে একটা জরুরী কাজ দিয়েছেন। ওই যে এই কয়েদী গুলো! ওরা কোথায় থাকতে পারে তার সম্ভাব্য জায়গাগুলোর তালিকা বলেছেন। আমার কাজ তাদের খুঁজে বের করে ধরে আনা। এ-ই আরকি! “
সৈন্যের কথাটায় বিশ্বাস করলো না ক্লাডিয়াস। সে ভালো করেই জানে সৈন্য কথা লুকাচ্ছে। তাই সে আরো একটু চেপে ধরে বললো,
“ আমি সত্য জানতে চেয়েছি। শুধুমাত্র সত্য৷ কোনো বানোয়াট কাহিনী শোনার সময় হাতে নেই। “
সৈন্য এবার বিপাকে পড়লো। আর কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে বাধ্য হয়ে বললো,
“ প্রিন্সেস আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন যেনো আমি ও-ই তিন কয়েদীদের পালাতে সাহায্য করি। ওদের কোনোমতে প্রাসাদ থেকে বের করে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি কিছু করি নি। আমি প্রিন্সেসের আদেশ পালন করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু গিয়ে দেখি ওরা তার আগেই লাপাত্তা। “
ক্লাডিয়াসকে অবাক হতে দেখা গেলো। তার বোধগম্য হলো না পুরো বিষয়টা। সে প্রশ্ন করে,
“ প্রিন্সেস এমন আদেশ কেন দিবেন? “
সৈন্য বিরক্তি নিয়ে বলে,
“ সেটা আমি কিভাবে জানবো? আমার কিসের এতো স্পর্ধা যে উনাকে প্রশ্ন করবো? হয়তো উনি নিজে ওদের কোনো শাস্তি দিতে চাচ্ছেন। “
ক্লাডিয়াস আবারও প্রশ্ন করে,
“ তুমি যেহেতু কাজটা করতে পারো নি সেহেতু তোমাকে মুদ্রা কেনো দিলো প্রিন্সেস? “
“ ও-ই কয়েদীদের খুঁজে বের করার জন্যই অগ্রীম উনি আমাকে মুদ্রা দিয়েছেন। প্রিন্সেসের কড়া আদেশ। বাকি সকলের আগে যেনো আমি ও-ই কয়েদীদের খুঁজে বের করে প্রিন্সেসের হাতে তুলে দেই। “
ক্লাডিয়াস সৈন্যকে ছেড়ে দিলো। ছাড়া পেতেই সৈন্য দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করে। ক্লাডিয়াস ভাবুক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলো। প্রিন্সেসের মনে কি চলছে তা বোঝা দায়। উনি এ-ই কয়েদীদের সঙ্গে কি করতে চাইছেন?
__________
জেইলানের চোখের পাতা বেঁধে তাকে কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। চোখে পট্টি থাকার কারণে বাড়ির ভেতরটা দেখার কোনো সুযোগ নেই। তবে জেইলান আনুমান করে সব মুখস্থ করে নিচ্ছে। পালানোর ক্ষেত্রে এসব তথ্য বেশ কাজে লাগবে। কামরা থেকে বের হতেই বাম দিকে তেরো কদম হেঁটে সিড়ি ধরে নামতে হলো প্রথমে। অতঃপর কিছুটা বায়ে ঘুরে এগারো কদম হেঁটে একটা জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়ালো সে।
দরজা জাতীয় কিছু একটার তালা খোলার শব্দ ভেসে আসছে কানে। জেইলানের ভ্রু জোড়া কুচকে আছে। এ-ই বিধর্মী সাদা চামড়া কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তাকে কে জানে। তবে মনে মনে জেইলান প্রস্তুত। কোনো ঘাপলা অনুভব করলেই সে এই সেনাপতির অবস্থাও একদম কাউন্ট ইয়ান আলবার্টের মতো করে দিবে।
দরজা খুলে যেতেই কেভ বললো,
“ সামনে সিঁড়ি আছে। “
ছোট্ট সতর্কবার্তা। জেইলানের কপাল কুচকালো। এ-ই বাড়িটা কি তিন তলা নাকি? কিন্তু এরকম কাঠের তিন তলা বাড়ি তো সে এই রাজ্যে এখনো তেমন একটা দেখে নি। তাহলে? এসব কিছু ভাবতে ভাবতে জেইলান সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করে। মনে মনে সিঁড়ির ধাপ গুনছে সে। এক… দুই… তিন… পনেরো। কেভ দরজাটা ভালো করে আটকে জেইলানের পিছু পিছু নামে।
জেইলান জানে না তাকে কোথায় নিয়ে আসা হয়েছে। তবে সে অনুভব করলো এই জায়গাটা তুলনামূলক কিছুটা ঠান্ডা। শরীরের লোমকূপে কেমন একটা শিহরণ জাগাচ্ছে। তাপমাত্রার এই পরিবর্তন নিয়ে ভাবুক জেইলান হঠাৎই কিছু শুনতে পেলো। কারো অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ।
জেইলান তড়িৎ প্রশ্ন করে,
“ এখানে কি হচ্ছে? “
কেভ কোনো উত্তর দেয় না বরং সে জেইলানের চোখের বাঁধন খুলে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে জেইলান চোখ মেলে সামনে তাকায়। জানালা বিহীন একটা মাটির তৈরী কক্ষ। সম্পূর্ণ কক্ষ জুড়ে রাখা যাবতীয় শাক সবজি এবং ফলমূল। খাবার সংরক্ষণের এই কামরার ঠিক মধ্যিখানে একটা চেয়ারে হাত-পা এবং মুখ বাধা অবস্থায় বসে থাকা ব্যক্তিকে দেখে জেইলান বেশ অবাক হলো। সে অস্ফুটে বলে,
“ কেরেম! “
তন্মধ্যে কেভ জেইলানের হাতের বাধনও খুলে দিয়েছে। কেরেমের মুখ বাধা থাকায় সে কিছু বলতে পারছে না। তবে তার বলার চেষ্টার ফলে মুখ থেকে গোঙানির মতো শব্দ ভেসে আসছে। জেইলান দেখে কেরেমের দু'পাশে দুটো বলবান সৈন্য দাঁড়িয়ে আছে। তাদের হাতের বল যে কেরেমের উপর তারা প্রয়োগ করেছে, তা কেরেমের মুখ দেখেই স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। জেইলান কেভকে প্রশ্ন করে,
“ এসব কি হচ্ছে? “
কেভ কোনো উত্তর না দিয়ে সৈন্যদের কিছু একটা ইশারা করে। সৈন্যদের একজন ইশারা পেতেই কেরেমের মুখের কাপড়টা খুলে দিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করে। কেরেম মুখ দিয়ে বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস নিচ্ছে। কেভ এবার এগিয়ে গিয়ে কেরেমের চুল মুঠো করে ধরে তার মুখ তুলে কিছুটা ধমকের স্বরে বলে,
“ আমাকে যা যা বলেছিস, সব এখন নিজের রাজকুমারীকে বল। “
কেরেমকে ভীত দেখাচ্ছে। সেই আইগুই করছে। কিছু একটা বলতে চাইছে না। জেইলান দেখে সব। সে প্রশ্ন করে,
“ কি বলার কথা বলছে কেরেম? “
কেভ আরো শক্ত করে কেরেমের চুলের মুঠি চেপে ধরতেই কেরেম আরেক দফা ভয়ংকর মারের ভয়ে বলতে শুরু করে,
“ আমি… আমি মিথ্যা বলেছিলাম রাজকুমারী। যুবরাজ দেনিজের মৃত্যুতে রোমানিয়ানদের কোনো হাত নেই৷ যুবরাজকে কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট খুন করেন নি। “
জেইলানের দৃষ্টিতে অবিশ্বাসের ছাপ। কি বলছে এসব কেরেম? সে বিস্মিত স্বরে বলে,
“ এসব… এসব তোমাকে দিয়ে জোর করে বলানো হচ্ছে? তাই না? এই কেভের শিখিয়ে দেওয়া কথা শোনাচ্ছো আমাকে? “
কেরেম মাথা নেড়ে বলে,
“ না, সত্যি বলছি আমি। বরং এতদিন আপনারা যা জানতেন তা মিথ্যা ছিলো। যুবরাজের মৃত্যুর সঙ্গে এ-ই রাজ্যের কোনো হাত নেই। “
জেইলান জানে না তার প্রতিক্রিয়া এখন কেমন হওয়া উচিত। সে জানে না তার কি বলা উচিত। সে কেবল ফ্যালফ্যাল দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে কেরেমের পানে। তার মনে হচ্ছে, সে একটা মিথ্যা দুনিয়ায় বাস করছে। সবথেকে বড়ো ছলনাটা বুঝি তার সঙ্গে হয়েছে!
কেরেম ভীত স্বরে বলতে থাকে,
“ কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট নির্দোষ। আলবার্টরা সম্পূর্ণ নির্দোষ। ওদের কোনো হাত নেই এসবে। “
জেইলান অস্ফুটে প্রশ্ন করে,
“ তাহলে ভাইজানকে কে মেরেছে? “
“ গ্রীকদের প্রিন্স। প্রিন্স এনাটোডা এবং তার সৈন্যরা। তারা মেরেছে যুবরাজকে। “
জেইলান ধপ করে মাটিতে বসে পড়ে। দু হাতে কপাল চাপড়ে ধরে সে। চোখের সামনে ভাসছে দেনিজের মৃত্যুর পর থেকে এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ ঘটনা। কিভাবে সে তড়পেছে, কিভাবে সে প্রতিশোধের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলো, কিভাবে সে এতো গুলো মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে গিয়েছে! হায়! এতো বিচক্ষণ হওয়া সত্ত্বেও কি-না এই পুরোটা সময় ধরে জেইলান নিজেই একটা মিথ্যা দুনিয়ায় বসবাস করছিলো। এতটা সহজ তাকে বোকা বানানো? তার এই মূর্খতার উপর কি সকলে হাসছে না?
জেইলানকে এভাবে বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে প্রধান সেনাপতি কেভ মনে মনে স্বস্তি পায়। তার কাউন্ট বিনা অপরাধে যেখানে এতটা কষ্ট ভোগ করছে, সেখানে এ-ই মেয়ে তো সম্পূর্ণ একজন অপরাধী। এক মুহূর্তের জন্য জেইলান নিজের ভাবনা হতে দ্রুত সোজা হয়ে বসে। চোখের কোণে জমে থাকা পানি হাতের উল্টো পিঠের সাহায্যে মুছে নিয়ে সে কেরেমের পানে তাকায়। যদিও এমন একটা মিথ্যাচারের জন্য কেরেমকে তার বিষের মতো লাগছে৷ কিন্তু সত্যি এবং সম্পূর্ণ ঘটনা জানতে সে মরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করে,
“ কেনো? ভাইজানকে কেন মারলো? আমার সঙ্গে মিথ্যাচারই বা কেন করা হলো? “
কেরেম মাথা নত করে জবাব দেয়,
“ আমি আদেশের গোলাম, রাজকুমারী। রাজ পরিবারের সদস্যদের আদেশ পালন করাই আমার দায়িত্ব। আমাকে আদেশ দেওয়া হয়েছিলো যেনো আমি আপনাকে এটাই বলি যে, যুবরাজ দেনিজকে কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট খুন করেছেন। “
“ কে তোমাকে এই আদেশ দিয়েছে? “
“ বাদশাহ বেগম আয়েশা। “
জেইলান বিস্ময়ের চূড়ান্ত সীমায়। হিসাব মিলছে না তার৷ বাদশাহ বেগম কখনোই তাকে কিংবা দেনিজকে পছন্দ করতো না, এটা জেইলানের অজানা নয়। তবে সে-ই অপছন্দের জের ধরে তিনি জেইলানকে এরকম একটা ধোকায় ফেলবে? এতে বাদশাহ বেগমের কি লাভ?
এ-ই পর্যায়ে প্রধান সেনাপতি কেভ বলে উঠে,
“ কি ব্যাপার, রাজকুমারী? হিসাব মিলছে না আপনার? আমি বুঝিয়ে বলবো? আচ্ছা, শুরু করি তবে। আপনার সৎ মা অর্থাৎ বাদশাহ বেগম আয়েশা গ্রীকদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে যুবরাজ দেনিজকে খুন করিয়েছেন। বাদশাহ বেগমের স্বার্থ হচ্ছে নিজের ছেলের পথের কাঁটা দূর করা। বাকি রইলো গ্রীকদের স্বার্থ। তবে ওরা দুই রাজ্যের মধ্যে দ্বন্দ লাগিয়ে দিয়ে নিজেদের কোনো স্বার্থ হাসিল করতে চেয়েছে বোধহয়। “
জেইলানকে আর বুঝিয়ে কিছু বলতে হয় না। সে ধীরে ধীরে সবটা বুঝতে পারে। মস্তিষ্কের জটগুলো যেনো আপনাআপনি খুলে যাচ্ছে। এজন্যই ভাইজানের মৃত্যুর পর আয়েশা বেগম শান্তনা দেওয়ার নাম করে এসে জেইলানকে উষ্কে দিয়েছিলো। এজন্যই ও-ই মহিলা জেইলানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে প্রতিশোধের বুলি আওড়াচ্ছিলো বারবার? যেনো জেইলান এই ফাঁদে পা দিয়ে রোমানিয়ায় এসে পৌঁছায়? যাতে হত্যা কিংবা হত্যাচেষ্টার দায়ে রোমানিয়ানদের হাতে জেইলানেরও মৃত্যু হয়? যাতে যুবরাজ বেহজাদের সিংহাসন আরোহণের পথে আর কোনো বাধা না থাকে?
কেভ নীরবে পরখ করে জেইলানের রক্তশূন্য দৃষ্টি। সে আর এখানে সময় অপচয় করে না। সে কেরেমের হাত পায়ের বাধন খুলে তাকে নিজের সঙ্গে করে নিয়ে সিড়ি বেয়ে উঠে বেরিয়ে যায়। যুবরাজের চোখ থেকেও তো মিথ্যার পর্দা সরাতে হবে তার। জেইলান ততক্ষণ এই কামরায় বন্দী থাকুক। কাউন্টের জ্ঞান ফেরার আগ পর্যন্ত এই ছলনাময়ী না-হয় একাকিত্ব, হতাশা এবং প্রতারণার অনলে তড়পাতে থাকুক। ওসব দেখা কেভের বিষয় নয়।
চলবে…